d.

ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার

মৌলিক অধিকার বলতে কি বুঝায়?

মৌলিক অধিকার বলতে বুঝায় এমন সব অধিকার, যা সমাজের লোক হিসেবে জীবন যাপনের জন্যে একজন মানুষের পক্ষে একান্তই অপরিহার্য। যা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকা কিছুতেই সম্ভবপর নয়, উচিত নয়। এ অধিকারগুলো নির্দিষ্ট হয়ে রয়েছে, ব্যক্তির নিজের প্রাণ সংরক্ষণ, তার আজাদী এবং তার ব্যক্তিগত সম্পদ-সম্পত্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে। এ অধিকারগুলো যথাযথরূপে সংরক্ষিত না হলে মানুষের মানবিক মর্যাদা অরক্ষিত ও বিপন্ন হতে বাধ্য।

রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এ অধিকারগুলোকে দু’টো বড় বড় ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম- সাম্য ও সমতা, দ্বিতীয়- আযাদী বা স্বাধীনতা। সমতা বা সাম্য কয়েক ভাগে বিভক্ত। তা হলোঃ আইনের দৃষ্টিতে সাম্য, বিচারের ক্ষেত্রে সাম্য ও সমতা। আযাদীও এমনিভাবে কয়েক ভাগে বিভক্ত। তা হলোঃ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মালিকানা অর্জন ও রক্ষণের স্বাধীনতা, বাসস্থান অর্জনের ও গ্রহণের স্বাধীনতা, আকীদা-বিশ্বাস ও ইবাদাত-উপাসনার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের ও শিক্ষার স্বাধীনতা। -আদ দিমোক্রাতিয়াতুল ইসলামিয়া লিদ দাক্তুর উসমান খলীল, ২৩ পৃষ্ঠা।

আলোচনার পদ্ধতি

ইসলামী শরীয়াত প্রদত্ত জনগণের সাধারণ অধিকার সমূহ সম্পর্কে আমরা এখানে আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হবো। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এ অধিকারগুলোকে যেভাবে বিভিক্ত করা হয়েছে, আমরা বিষয়টিকে ঠিক সেভাবে ভাগ করেই আলোচনা করতে চাই। ইসলামের ছত্রছায়ায় এ অধিকারগুলো সাধারণ মানুষ কিভাবে এবং কতখানি উপভোগ করতে পারে, তা বিশ্লেষণ করাই হলো আমাদের এ আলোচনার লক্ষ্য। এ জন্যে আমরা বিষয়টিকে মৌলিকভাবে দু’পর্যায়ে ভাগ করবো। প্রথমে আমরা সাম্য ও সমতা সম্পর্কে আলোচনা করবো এবং পরে আযাদী বা স্বাধীনতা সম্পর্কে।

সাম্য ও সমতা

ইসলামী শরীয়াতে সাম্যের গুরুত্বঃ
ইসলামী শরীয়াতে সাম্য ও সমতার গুরুত্ব বিরাট। সব মানুষ মৌলিকভাবেই সমান বলে ইসলাম ঘোষণা করেছে। ইসলাম মূলের দিক দিয়েই সব মানুষের মাঝেও অভিন্ন সাম্য কায়েম করতে বদ্ধপরিকর। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মাঝে পার্থক্য হতে পারে কেবল নেক আমল ও কল্যাণময় কার্যক্রমের ভিত্তিতে। আল্লাহ তায়ালা এ কথাই ঘোষণা করেছেন কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতেঃ

“হে মানুষ! আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি পুরুষ ও স্ত্রী থেকে। আর তোমাদের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রে বিভক্ত করেছি তোমাদের পারস্পরিক পরিচিতি লাভের জন্যে। তবে আসল কথা হলো, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সবচাইতে বেশী সম্মানার্হ, যে তোমাদের মধ্যে সবচাইতে বেশী আল্লাহভীরু।“ আল-হুজুরাতঃ ১৩

এ আয়াত স্পষ্ট বলছে, মানুষ মৌলিকভাবেই এক, অভিন্ন ও সর্বতোভাবে সমান। মানুষ হিসেবে তাদের মাঝে কোনই পার্থক্য নেই। আর মানুষকে যে বিভিন্ন গোত্র, গোষ্ঠী ও বংশ সম্ভুত করে সৃষ্টি করা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য মানুষকে নানাভাবে বিভক্ত এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও নিসম্পর্ক করে দেয়া নয়, বরং তার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষের পারস্পরিক পরিচিতি লাভ ও পারস্পরিক সহযোগিতার গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ সব জিনিসের ভিত্তিতে পরস্পর গৌরব-অহংকার করা এবং নানাভাবে পার্থক্য ও ভেদাভেদের পাহাড় খাড়া করা কখনো এর উদ্দেশ্য নয়, তা করা জায়েজও নয় কারুর জন্যে। এর ভিত্তিতে কেউ কারুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব, প্রাধান্য ও বৈশিষ্ট্যের দাবী করতে পারে না। বস্তুত ইসলামের এ মহান আদর্শ মানব সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও ভেদাভেদের মূলকেই উৎপাটিত করে দিয়েছে, শেষ করে দিয়েছে সব বংশীয় ও বর্ণীয় গৌরব অহংকার। অতপর প্রশ্ন ওঠে, তা হলে কি মানুষের মাঝে পার্থক্য ও তারতম্য করার কোন ভিত্তিই নেই? পার্থক্য করার বস্তুনির্ভর কোন ভিত্তি যে নেই তা চূড়ান্ত। ইসলাম এ পার্থক্যের একটি ভিত্তিই শুধু উপস্থাপিত করেছে এবং তা এমন, যা মানুষের নিজস্ব গুণ ও ইচ্ছা প্রণোদিত হয়ে অর্জন করতে পারে, যে কোন মানুষ তা লাভ করতে পারে। তার পথে কোন বংশগত বা অর্থ-সম্পদগত মর্যাদা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

বস্তুত ইসলামী শরীয়াতে সাম্য ও সমতার শিকড় অতি গভীরে নিবদ্ধ। শরীয়াতে যাবতীয় বিধি-বিধান ও আইন-কানুনেই এ সাম্য পূর্ণমাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা এখানে এ পর্যায়ের কয়েকটি দিকের উল্লেখ করছি। এর মধ্যে আইনের দৃষ্টিতে সাম্য ও বিচার-ব্যবস্থার সাম্যের দিকটি সবচাইতে বেশী উল্লেখ্য।

আইনের দৃষ্টিতে মানুষের সাম্যঃ

আইনের দৃষ্টিতে মানুষের সাম্য, সাম্যের এক পরম প্রকাশ। ইসলাম যে সুবিচার নীতি উপস্থাপিত করেছে এ তারই চূড়ান্ত রূপ। ইসলামে আইন সকল মানুষের প্রতিই সমানভাবে প্রযোজ্য। আইন প্রয়োগে মানুষে মানুষে কোনরূপ ভেদাভেদ করার নীতি ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, না বংশের দিক দিয়ে না বর্ণ, ভাষা ও সম্পদ পরিমাণের ভিত্তিতে। এমনকি আকীদা, বিশ্বাস, আত্মীয়তা, নৈকট্য, বন্ধুত্ব ইত্যাদির কারণেও আইন প্রয়োগে মানুষের মাঝে কোনরূপ পার্থক্য করা চলবে না। হাদীসে নবী করীম (স)-এর এ ঘোষণাটি এক বিপ্লবী ঘোষণা হিসেবেই উদ্ধৃত হয়েছেঃ

“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে কেবল এ বিভেদ নীতির ফলে যে, তাদের সমাজের ‘ভদ্রলোকেরা’ যখন চুরি করতো, তখন তাদের কোন শাস্তি দেয়া হতো না। পক্ষান্তরে তাদের মাঝে দুর্বল লোকেরা যখন চুরি করতো, তখন তারা তাদের ওপর কঠোর অনুশাসনই চাপিয়ে দিতো। আল্লাহর শপথ, মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করে, তাহলে তার হাতও কেটে দেয়া হবে”। (তায়সীরুল উসূল, ২য় খন্ড, ১৪ পৃষ্ঠা)

আইনের দৃষ্টিতে সাম্যের গুরুত্বঃ

বস্তুত জনসম্পদে এরূপ নির্বিশেষ সমতা বিধানের ফলেই রাষ্ট্রের জনগণ সন্তোষ এবং নিশ্চিন্ততা লাভ করতে পারে। তারা কার্যত দেখতে পায় যে, এখানে কারুর প্রতিই কোনরূপ অবিচার বা যুলুম করা হয় না, করা হয় না কারুর প্রতি একবিন্দু পক্ষাপাতিত্ব, এখানে নির্বিশেষে সকলেরই অধিকার পূর্ণমাত্রায় সংরক্ষিতহ হয়। তখন তারা রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য পোষণ করে। এ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্যে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করতে কুণ্ঠিত হয় না।

কিন্তু এ সাম্য যদি কখনও লংঘিত হয় আর আইন যদি কেবল দু্র্বলদের ওপরই কার্যকর হতে থাকে, তখন জনগণ এ রাষ্ট্র সম্পর্কে চরম নৈরাশ্য পোষণ করতে শুরু করে। রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি তাদের মনে থাকে না কোনরূপ আন্তরিকতা। তখন তারা এর স্থিতি ও প্রতিরক্ষার জন্যে কোনরূপ ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত হয় না। আর এর ফলেই জনগণের উপর যুলুম হতে শুরু হয়। এখানে কেবল শক্তিশালীদেরই কর্তৃত্ব চলে। শক্তিই হয় চূড়ান্ত ফায়সালাকারী, আইন নয়। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এ-ই হয় এখানকার অবস্থা সম্পর্কে সঠিক কথা। আর কোন রাষ্ট্র যখন এ অবস্থায় পৌছে যায়, তখন তার স্থায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ জন্যে আরবী ভাষায় এ কথাটি প্রচলিত হয়েছেঃ

“সুবিচারকারী রাষ্ট্র কাফের হলেও টিকে থাকে আর যালেম রাষ্ট্র মুসলিম হলেও টিকে থাকে না।“

একটি দৃষ্টান্তঃ
‘খলীফায়ে রাশেদ’ হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর খিলাফতের আমলে মিসরের শাসনকর্তা হযরত আমর ইবনুল আছ (রা) একজন কিবতী নাগরিককে অকারণ চপেটাঘাত করেছিলেন। কিবতী হযরত ওমর (রা)-এর নিকট অভিযোগ করলো। পরে ইবনে আমর যখন খলীফার দরবারে হাযির হলেন, তখন তিনি কিবতীকে হাযির করে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাকে এই লোক মেরেছিলো? কিবতী বলল, হ্যাঁ, এ লোকই আমাকে অকারণ চপেটাঘাত করেছিলো।“ খলীফা বললেনঃ “তাহলে তুমিও ওকে মারো।“ এ আদেশ পেয়ে সে ইবনে আমরকে মারতে শুরু করলো। পরে খলীফা ওমর (রা) আমর ইবনুল আছকে লক্ষ্য করে বললেনঃ

“হে আমর! কবে থেকে তুমি লোকদের গোলাম বানাতে শুরু করলে, অথচ তাদের মায়েরাতো তাদের স্বাধীন রূপেই প্রসব করেছিলো?”

বিচারের ক্ষেত্রে সাম্যঃ

ইসলামী রাষ্ট্রে দেশের সকল নাগরিকই বিচারের ক্ষেত্রে সমান ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী। সেখানে যেকোন লোকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা যায় এবং আদালত যেকোন লোককে বিচারের সম্মুখীন হতে বাধ্য করতে পারে। বিচারালয়েও বাদী বিবাদীর মাঝে কোনরূপ পার্থক্য করা চলে না। এমনকি কোন শত্রুও যদি আদালতের সামনে ফরিয়াদী হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সে ঠিক তেমনি আচরনই পাবে যেমন আচরণ পাবে একজন মিত্র বা স্বদেশের নাগরিক। এই কথাই আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতেঃ

“হে ঈমানদার লোকগণ! খোদার ওয়াস্তে সত্য নীতির উপর স্থায়ীভাবে দন্ডায়মান ও ইনছাফের সাক্ষ্য দাতা হও। কোন বিশেষ দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এতদূর উত্তেজিত করিয়া না দেয় যে, (তাহার ফলে) ইনছাফ ত্যাগ করিয়া ফেলিবে। ন্যায় বিচার কর। বস্তুত খোদাপরস্তির সহিত ইহার গভীর সামঞ্জস্য রহিয়াছে। খোদাকে ভয় করিয়া কাজ করিতে থাক। (আল-মায়েদাঃ ৮)

তিনি আরো স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন এ ভাষায়ঃ

“তোমরা যখন লোকদের মাঝে বিচার কার্য করবে, তখন অবশ্যই সুবিচার করবে।“ –আন-নিসাঃ ৫৮

বস্তুত আইনের দৃষ্টিতে সাম্য ও বিচারের ক্ষেত্রে সাম্য –এ দুটোই ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। খলীফা হযরত ওমর (রা) গভর্ণর
হযরত আবু মুসা আশআরীকে লিখেছেনঃ

“তোমরা বৈঠকে, চেহারায় ও বিচারে পূর্ণ সাম্য রক্ষা করবে লোকদের মাঝে, যেন কেউ তোমার দোষ ধরতে না পারে এবং দুর্বল লোকেরা যেন তোমার সুবিচার থেকে নিরাশ হয়ে না যায়।“
(এলামুল মুওয়াওবেকীন, ১ম খন্ড, ৭২ পৃষ্ঠা)

বস্তুত ইসলামের এ সাম্যনীতি এতোই উন্নত যে, আধুনিক কালে কোনো রাষ্ট্র ব্যবস্থাও এর সমান হওয়ার দাবী করতে পারে না।

ব্যক্তি স্বাধীনতা

ব্যক্তি স্বাধীনতার সংজ্ঞাঃ

রাষ্ট্র বিজ্ঞানে ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে বুঝায়, রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাধীন, অবাধ চলাফেরা ও যাতায়াতের অধিকার, শত্রুর শত্রুতা থেকে আত্মরক্ষা করার অধিকার; এ অধিকার যে, তার মালিকানাধীন সম্পদ ও সম্পত্তি অকারণে কেউ হরণ করে নেবে না, কেউ তার ওপর অকারণ অত্যাচার যুলুম করবে না, কেউ তাকে বিনা অপরাধে আটক করবে না। দেশের বৈধ আইন মুতাবিকই সে জীবন যাপন করতে পারবে এবং তার সাথে আইন-সম্মতভাবেই আচরণ করা হবে। সে নিজের ইচ্ছায় দেশের বাইরেও যেতে পারবে, আবার সময় মত নিজের ঘরেও আসতে পারবে।

শরীয়াতে ব্যক্তি স্বাধীনতাঃ

বস্তুত ইসলামী শরীয়াতে এ অর্থে ব্যক্তিগত অধিকার পুরামাত্রায় স্বীকৃত। বরং ইসলামী রাষ্ট্রে কার্যত ব্যক্তিদেরকে এর চাইতেও ব্যাপক ও প্রশস্ততর অধিকার দেয়া হয়েছে। জনগণের ওপর কোনরূপ বাড়াবাড়ি করা যুলুম। আর যুলুম ইসলামে চিরদিনের তরে হারাম। এখানে রাষ্ট্র ব্যক্তির যাবতীয় অধিকার রক্ষার জন্যে দায়িত্বশীল। ব্যক্তি জীবন, দেহ-ইজ্জত-আবরু ও সম্পদ সম্পত্তি সংরক্ষিত রাখার জন্যে রাষ্ট্র সতত তৎপর হয়ে থাকবে। ইসলামী শরীয়াত এ কথাই ঘোষণা করেছে স্পষ্ট ভাষায়। এ জন্য যুলুমকারীকে শাস্তি ও দন্ড দিতে রাষ্ট্র একান্তভাবে বাধ্য। শরীয়াতে এ শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যক্তিকে কোনরূপ শাস্তি ভোগের সম্মুখীন হতে হয় তখন, যখন শরীয়াতি আইনের প্রকাশ্য বিচারে তার অপরাধ সপ্রমাণিত হবে এবং শাস্তি ঠিক ততটুকুই দেয়া হবে যতটুকু শাস্তি তার অপরাধের জন্যে শরীয়াতে বিধিবদ্ধ রয়েছে। এখানে একজনের অপরাধের জন্যে অন্যজনকে শাস্তি ভোগ করতে হয় না। যার অপরাধ, তাকেই শাস্তি ভোগ করতে হবে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

“একজনের বোঝা অপরজন কখনও বহন করবে না।“
-বনী-ইসরাঈলঃ ১৫

নিজের ঘরের বাইরে, নিজ দেশের যেখানে-সেখানে এবং দেশের বাইরে ভিন্ন দেশে যাতায়াত করার অধিকারও প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, শরীয়াতে এ জন্যে রীতিমত উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কুরআন মজীদে প্রশ্ন তোলা হয়েছেঃ

“লোকেরা কি যমিনের যত্রতত্র ঘুরে বেড়াবে না এবং তাদের পূর্ববর্তী লোকদের কি পরিণতি হয়েছে তা স্বচক্ষে দেখবে না?” – ইউসুফঃ ১০৯

ব্যবসায়ের জন্যে বিদেশে ভ্রমণ করারও নির্দেশ রয়েছে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

“তোমরা যমীনের পরতে পরতে চলাফেরা কর এবং তার ফলে উপার্জিত রেজেক আহার করো। শেষ পর্যন্ত তারই নিকট ফিরে যেতে হবে তোমাদের সকলকে। -আল-মুলকঃ ১৫

অবশ্য কোন কারণে কোন ব্যক্তিকে যদি বাইরে যেতে না দেয়াই আইনসম্মত বিবেচিত হয়, তাহলে সে লোকের যাতায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে। হযরত ওমর ফারুক (রা) তাঁর খেলাফত আমলে বড় বড় সাহাবীদের মদীনার বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন, যেন রাষ্ট্রীয় জটিল ব্যাপারে সময় মত তাদের সাথে পরামর্শ করা যায়। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের কারণে যখন এ নিয়ন্ত্রণ আরোপ সংগত, তখন জাতীয় কল্যাণের দৃষ্টিতেও অবশ্যই সংগত হবে।

ব্যক্তির ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা সরকারী দায়িত্ব

ব্যক্তির জীবন, দেহ ও সম্পত্তি রক্ষা করাই রাষ্ট্রের একমাত্র দায়িত্ব নয়। সেই সংগে ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা এবং তা কারুর দ্বারা ক্ষুন্ন হলে তার প্রতিবিধান করাও সরকারের দায়িত্ব। রাষ্ট্র-সরকার নিজে কাউকে অকারণ অপমান করবে না, কেউ অপমান করলে তা বরদাশতও করবে না। কেননা মুসলিম মাত্রই সম্মানিত; তার সম্মান চির সংরক্ষিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ “ইজ্জত-সম্মান সবই আল্লাহ, রসূল এবং সকল মুমিনদের জন্যে”। অতএব কেউ লজ্জিত বা অপমানিত হোক তা ইসলামী রাষ্ট্র কিছুতেই বরদাশত করতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ ইসলামের রিসালাত উত্তরকালীন দায়িত্ব পালন করতে পারে কেবলমাত্র স্বাধীন, সম্মানিত ও মর্যাদাবান মুসলমান। এ জন্যে ইসলামী রাষ্ট্র জনগণকে ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদার তাৎপর্য শিক্ষা দিতে চেষ্টা করবে এবং যেসব কাজে তা ব্যবহৃত ও ক্ষুন্ন হয় তার প্রতিরোধ করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। হযরত ওমর ফারুক (রা) তার শাসনকর্তাদের বলেছিলেনঃ

“তোমরা মুসলিম জনগণকে অন্যায়ভাবে প্রহার করবে না, কেননা তাহলে তোমরা তাদের অপমান করলে”।

এ জন্যে তিনি হজ্জের সময় সমবেত জনতার সামনে তাদের হাজির করতেন এবং লোকদের সামনে ভাষণে দিয়ে ঘোষণা করতেনঃ

“হে জনতা, আমি আমার শাসকবর্গকে তোমাদের ওপর নিয়োগ করেছি এ জন্যে নয় যে, তারা তোমাদের জান-মাল ও ইজ্জতের ওপর হস্তক্ষেপ করবে। বরং তাদের নিয়োগ করেছি এ উদ্দেশ্যে যে, তারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ইনসাফ কায়েম করবে, সরকারী ভাণ্ডার থেকে জাতীয় সম্পদ প্রয়োজনমত তোমাদের মাঝে বণ্টন করবে। এদের কেউ যদি এর বিপরীত কিছু করে থাকে, তাহলে এই জনসমাবেশে তার বিরুদ্ধে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ফরিয়াদ করো”। (তাবকাতে ইবনে সায়াদ, ৩য় খণ্ড, ২৯৩ পৃষ্ঠা)

অমুসলিম ব্যক্তি স্বাধীনতা

ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের জন্যেও পূর্ণমাত্রায় ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষিত থাকে। এ পর্যায়ে ইসলামী আইনবিদরা যে ফর্মুলা ঠিক করেছেন তা হলোঃ

“আমাদের জন্যে যেসব অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা তাদের জন্যেও তাই এবং আমাদের ওপর যেসব দায়িত্ব তাদের ওপরও তাই”।

হযরত আলী (রা) বলেছেনঃ

“অমুসলিম নাগরিকরা জিযিয়া আদায় করে এ উদ্দেশ্যে যে, তাদের ধন-মাল ও জান-প্রাণ মুসলিম নাগরিকদের মতই সংরক্ষিত হবে”। (আলমুগনী, ৮ম খণ্ড, ৪৪৫ পৃষ্ঠা)

বস্তুত ইসলামী শরীয়াত ভিত্তিক রাষ্ট্রে অমুসলিমরা যে বিরাট অধিকার ও সর্ববিদ সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছে, দুনিয়ার অপর কোন আদর্শিক রাষ্ট্রেও তার কোন তুলনা নেই। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমাজতন্ত্র বিরোধী মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় কি? সেখানে সুযোগ-সুবিধা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা তো দূরের কথা, সমাজতন্ত্র বিরোধী কোন আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের বেঁচে থাকারও অধিকার নেই। অথচ ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিক শুধু বেঁচেই থাকে না, বেঁচে থাকে সর্ববিধ অধিকারও লাভ করে। অমুসলিম নাগরিকদের জন্যে স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই নিরাপত্তার জিম্মাদার।

নবী করীম (স) ঘোষণা করেছেনঃ

“যে লোক ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিককে কোনরূপ কষ্ট দেবে, আমি নিজেই তার বিপক্ষে দাঁড়াবো এবং আমি যার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে আমি মামলা দায়ের করবো”। (আল-জামেউস সাগীর লিসসুয়ুতী, ২য় খন্ড, ৪৭৩ পৃঃ)

অমুসলিম নাগরিকদের সম্পর্কে নবী করীম (স) যেসব অছীয়ত করেছেন, তার ভিত্তিতে ইসলামী আইন পারদর্শীগণ স্পষ্ট করে বলেছেন যে, অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান ওয়াজিব এবং তাদের কোনরূপ কষ্ট দেয়া সম্পূর্ণ হারাম। ফকীহ কারাফী বলেছেনঃ অমুসলিম নাগরিককে যদি কেউ কষ্ট দেয়, একটি খারাপ কথাও বলে, তাদের অসাক্ষাতে তাদের ইজ্জতের ওপর একবিন্দু আকমণও কেউ করে কিংবা তাদের সাথে শত্রুতার ইন্ধন যোগায় তাহলে সে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের এবং দীন ইসলামের দায়িত্বকে লংঘন করলো।

আল্লামা ইবনে হাজাম বলেছেনঃ এ ব্যাপারে ইসলামী আইন-বিদদের ইজমা হয়ে গেছে যে, ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়মিত অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করার জন্যে যদি কোন বৈদেশিক শত্রু এগিয়ে আসে, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো তার বিরুদ্ধে লড়াই করে তাকে রক্ষা করা।
(আল-ফরুক লিকিরাকী, ৩য় খণ্ড, ১৪ পৃঃ)

আকীদা ও ইবাদাতের স্বাধীনতা

ইসলাম কোন লোককে ইসলামী আকীদা গ্রহণের জন্য বলপূর্বক বাধ্য করে না। ইসলামে ধর্মমত গ্রহণে এবং পূজা-উপসনা ও আরাধনা করার ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই, এ কথা কুরআন মজীদে স্পষ্টভাষায় বলা হয়েছে এভাবেঃ লা ইকরাহা ফীদদীন, - দীন গ্রহণ করানোর ব্যাপারে কোন জোড়-জবরদস্তি করা চলবে না’। অন্য কথায় ইসলাম নিজে এ ব্যাপারে কোনরূপ বল প্রয়োগ করতে প্রস্তুত নয়, বলপ্রয়োগ করাকে সমর্থনও করে না। ইসলাম ধর্ম প্রচারে বলপ্রয়োগ নয়, শান্তি ও শৃঙ্খলা সহকারে প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মন ও চিন্তার পরিবর্তন সাধনে বিশ্বাসী। এ জন্যে ইসলাম দাওয়াতী কাজের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। কুরআন মজীদে ইরশাদ করা হয়েছেঃ

“তোমরা তোমাদের আল্লাহর দিকে লোকদেরকে দাওয়াত দাও। যুক্তিপূর্ণ কথাবার্তা ও উত্তম ওয়াজ-নছীহতের মাধ্যমে এবং বিরোধীদের সাথে উত্তম পন্থায় মুকাবিলা করো”। -আন-নাহালঃ ১২৫

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর ধর্মের ব্যাপারে জোর-জবরদস্তী করা সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

“দীন বা ধর্মের ব্যাপারে কোনরূপ জোর-জবরদস্তী করা যেতে পারে না। কেননা প্রকৃত হেদায়াতের পথ ও আদর্শ কোনটি এবং কোনটি পথভ্রষ্টতা তা স্পষ্ট হয়ে গেছে”। -আল-বাকারাঃ২৫৬

এ পর্যায়ে শরীয়াতের নির্দিষ্ট ফর্মুলা হলোঃ

“তাদের এবং তারা যা কিছু পালন করে তা ছেড়ে দিলাম”। অতএব অমুসলিমদের ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাস ও ইবাদাত-উপসনার ব্যাপারে ইসলামী রাষ্ট্রের কিছুই করণীয় নেই। নবী করীম (স) নাজরানবাসীদের সাথে সন্ধিচুক্তি করেছিলেন, তাতে লিখেছিলেনঃ

“নাজরানবাসীরা এবং তাদের সঙ্গি সাথীরা আল্লাহ ও তাঁর রসূল মুহাম্মাদ (স)-এর নিরাপত্তা লাভ করবে, তাদের ধন-মালে তাদের গীর্জা ও উপসনাগারে এবং আর যা কিছু তাদের রয়েছে সে ব্যাপারে”। (কিতাবুল খারাজ, আবু ইউসুফ, ৯১ পৃঃ)

এরপর ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন হওয়া সত্ত্বেও খৃষ্টান ও অন্যান্য বিধর্মীরা তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেছে। তারা রাষ্ট্রের তরফ থেকে বা মুসলিম জনগণের তরফ থেকে কোনরূপ ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। কোন অপকারিতাই তাদের স্পর্শ করেনি এবং তারা পূর্ণ স্বাধীনতা সহকারে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করতে পেরেছে।

বস্তুত ব্যক্তির আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইসলামী আইনে যতখানি আজাদী ভোগ করার সুযোগ রয়েছে, তত সুযোগ দুনিয়ার অন্য কোন আইনে স্বীকৃত হয়নি। ইমাম শাফেয়ী (র) বলেছেন, স্বামী-স্ত্রীর একজন যদি মুসলিম এবং অপরজন খৃষ্টান হয়, তাহলে ইসলামী শরীয়াত তাতে কোন বাদ সাধবে না। কেননা তা যদি করা হয়, তাহলে ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়। অথচ কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা হলো, অমুসলিমদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বা জোর-জবরদস্তি করা হবে না। (শারহুল কানজ, ২য় খণ্ড, ১৭৪ পৃঃ)

তবে এ পর্যায়ে মুর্তাদকে শাস্তিদানের ইসলামী ব্যবস্থা নিয়ে কোনরূপ ভুল ধারণার সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়। কেননা, সেটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যাপার। একজন মুসলিম নাগরিক যদি মুসলিম থাকার পর ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলাম ত্যাগ করে ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করে তাহলে তাকে মুর্তাদ বলা হয়। ইসলামী রাষ্ট্র তাকে কঠোর শাস্তি দেবে। কেননা, সে যখন নিজেকে একবার মুসলিম বলে ঘোষণা দিয়েছে, তখন তাকে মুসলিম হয়েই ইসলামী রাষ্ট্রে বাস করতে হবে। যদি সে তা না করে তাহলে সে ইসলামী রাষ্ট্রেরই ক্ষতি সাধন করে। আর দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রেই কোন নাগরিকের রাষ্ট্রের এরূপ ক্ষতিকে বরদাশত করতে প্রস্তুত হতে পারে না বরং এটা অতীব যুক্তসংগত কথা।

বাসস্থানের স্বাধীনতা

ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেকটি নাগরিকই তার বসবাসের স্থান গ্রহণের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে। তার অনুমতি ও সন্তোষ ছাড়া কেউই তার ঘরে প্রবেশ করার অধিকার পেতে পারে না। কেননা, বসবাসের স্থান হলো প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব গোপন এলাকা। এখানে তার সাথে তার স্ত্রী ও পরিবারবর্গ বাস করে। কাজেই এখানে যদি কেউ অপর কারুর ঘরে ও বসবাসের স্থানে বিনানুমতিতে প্রবেশ করে, তা হলে তা হবে তার অনধিকার চর্চা। আর ইসলামী রাষ্ট্রে কাউকেই কারুর ওপর অনধিকার চর্চার অধিকার দেয়া যেতে পারে না। কুরআন মজীদে এ জন্যে স্পষ্ট নিষেধবাণী উচ্চারিত হয়েছে ওজস্বিনী ভাষায়ঃ

“হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা অপর লোকদের ঘরে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না সে ঘরের লোকদের কাছ থেকে অনুমতি পাবে ও তাদের প্রতি সালাম করবে। তোমরা যদি বুঝতে পারো তবে এই নীতিই তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। তোমরা সে ঘরে যদি কাউকে বর্তমান না পাও, তাহলে সেখানে তোমরা প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না অনুমতি দেয়া হবে। আর যদি তোমাদের ফিরে যেতে বলে তাহলে তোমরা ফিরেই যাবে। এই ফিরে যাওয়াই তোমাদের জন্যে পরিবত্রতার নীতি। জেনে রাখবে, তোমরা যা কিছু করো, সে বিষয়ে আল্লাহ খুব ভালভাবেই অবহিত রয়েছেন।“

কর্মের স্বাধীনতা

শরীয়াত সম্মত যে কোন কাজই ইসলামে সম্মানার্হ। অতএব ব্যক্তিকে শরীয়াত সম্মত যে কোন কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে ইসলামে। হাদীসে স্পষ্ট করে বলা হয়েছেঃ

“ব্যক্তি তার নিজের শ্রমে উপার্জিত যে খাদ্য খায়, তার চাইতে উত্তম খাওয়া আর কিছু হতে পারে না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ)-ও নিজের শ্রমে অর্জিত খাদ্য খেতেন।“

অতএব ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক ব্যক্তিকে ব্যবসায়, শিল্পে ও কৃষি প্রভৃতি বিভিন্ন উপার্জন কাজে শুধু স্বাধীনতাই দেয়া হয় না, সে জন্যে রীতিমত উৎসাহিতও করা হয়। তবে শরীয়াত বিরোধী কোন কাজের সুযোগ দেয়া হয় না ইসলামী রাষ্ট্রে। কেননা, সেরূপ কাজ করা হলে হয় তাতে অপরের প্রতি যুলুম হবে, না হয় তা নৈতিকতা বিরোধী কাজ হবে। আর এ ধরনের কাজে যে সমাজের সাধারণ মানুষেরই ক্ষতি সাধিত হয়, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এভাবে ব্যক্তি যদি শরীয়াত সম্মত কোন কাজে ব্রতী হয় তাহলে ইসলামী রাষ্ট্র তার সাথে পূর্ণ সহযোগিতা করবে এবং সে কাজের ফলাফল সে-ই ভোগ করবে। কেননা, প্র্রত্যেকেরই নিজের শ্রমের ফল ভোগ করার স্বাভাবিক ও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে। আল্লাহ কোন আমলকারীর আমলের ফল বিনষ্ট করেন না- সে আমল বৈষয়িক উপার্জন সংক্রান্ত হোক কি পরকালীন, তা কুরআনেরই ঘোষণা।

তবে তার মানে নিশ্চয়ই এ নয় যে, ইসলামে প্রত্যেক ব্যক্তিকে এমন নিরংকুশ স্বাধীনতাই দেয়া হয়েছে যে, কাউকে কোন কাজের জন্যে কৈফিয়তও জিজ্ঞাসা করা হবে না। যেমন সরকারী কর্মচারীরা যদি সরকারী দায়িত্বে নিযুক্ত থাকা অবস্থায় উপার্জন সংক্রান্ত অন্য কোন কাজ করে তবে সে অধিকার কাউকে দেয়া যেতে পারে না। এ কারণেই হযরত ওমর ফারুক (রা) তাঁর নিয়োগকৃত সরকারী কর্মচারীদের ধন-মালের হিসেব নেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এদের একজন যখন বললোঃ
“আমি ব্যবসায় করেছি এবং তাতে মুনাফা পেয়েছি, এতে কার কি বলবার থাকতে পারে?”

“জওয়াবে হযরত ওমর (রা) বলেছিলেনঃ “আমিতো তোমাকে ব্যবসায়ের জন্যে নিযুক্ত করিনি।“
(মাআলেমুশ শারহিল ইসলামী, আহমদ বারাকা)

ব্যক্তি যে কাজ যতক্ষণ করতে চাইবে সে ততক্ষণই করবে এবং যখন সে কাজ ত্যাগ করার ইচ্ছা করবে, তখনই সে তা ত্যাগ করতেও পারবে। কিন্তু এ অধিকার এই শর্তের অধীন যে, তার এই কাজ ত্যাগ করায় অপর কারুরই যেন একবিন্দু ক্ষতি সাধিত না হয়। এ জন্যে ইসলামী আইনবিদরা বলেছেনঃ

“সর্বসাধারণের জন্যে জরুরী ও অপরিহার্য শিল্প ও ব্যবসায়ের কাজে তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বাধ্য করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে রাষ্ট্র সরকারের এবং সে জন্যে তাদের ন্যায্য মজুরী দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।“
(আত-তুরুকুল হুকমীয়্যাতু ইবনে কাইয়েম)”

এ কারণে এ সব ক্ষেত্রের কর্মচারীদের সাধারণ ধর্মঘট করার কোন অধিকারই ইসলামী রাষ্ট্রে দেয়া যেতে পারে না। কেননা, তার ফলে সাধারন জন মানুষের জীবনে কঠিন বিপর্যয় নেমে আসার আশংকা রয়েছে। তবে তারা কাজ উপযোগী ন্যায্য মজুরীর দাবী জানাতে পারে ও সে জন্যে নিয়মতান্ত্রিক চাপ সৃষ্টিও করতে পারে। আর রাষ্ট্র তাদের কাজ অনুপাতে ন্যায্য মজুরী নির্দিষ্ট করে দিতে বাধ্য। কেননা সর্ব পর্যায়ে ইনসাফ কায়েম করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর শ্রমিকদের জন্যে ন্যায্য মজুরীর ব্যবস্থা ইনসাফেরই অন্তর্ভুক্ত কাজ। এরূপ মজুরী দিতে মালিক পক্ষ যদি অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে রাষ্ট্র তাতে হস্তক্ষেপ করবে এবং মজুরী দানের ক্ষেত্রে পূর্ণ ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত করবে। তাহলে এর ফলে না শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না মালিক পক্ষ। বরং এর ফলে সামাজিক সাম্য ও শান্তি স্থাপিত হবে।

ব্যক্তিগত মালিকানা রাখার অধিকার

ইসলামী শরীয়াত ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত মালিকানা রাখার অধিকার দিয়েছে। অতএব ইসলামী রাষ্ট্রে কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত মালিকানার ওপর অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করা চলবে না। বরং তা রক্ষা করার দায়িত্বই পালন করতে হবে রাষ্ট্রকে। যদি কেউ তার ওপর হস্তক্ষেপ করে তবে তার প্রতিরোধের জন্যে সরকারকে অবিলম্বে এগিয়ে আসতে হবে। অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

ইসলামে ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত এবং মালিক তার মালিকানা ভোগ ব্যবহার করার অবাধ অধিকারই লাভ করে থাকে। তবে তা শর্তহীন ও নিরংকুশ নয়। সে জন্যে কতগুলি জরুরী ও অপরিহার্য শর্ত পালন করতে হবে। এ শর্তগুলো মালিকানা লাভ, বৃদ্ধিসাধন ও তার ব্যয় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরোপিত এবং যেসব দিক দিয়ে তা অন্য মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট সেসব দিক দিয়ে তা অবশ্য লক্ষ্যণীয়।

সাধারণ প্রচলিত কাজ ও শ্রমের পরিণামে অর্জিত সম্পদ, মীরাস সূত্রে প্রাপ্ত ও পারস্পরিক লেন-দেন ও চুক্তি ব্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জিত ধন ঐশ্বর্যে ব্যক্তিগত মালিকানা ইসলামী শরীয়াতে বৈধ মালিকানারূপে স্বীকৃত। কিন্তু তাতে যদি চুরি, লুটতরাজ, জুয়া, মাত্রাতিরিক্ত মূল্য গ্রহণ, ঘুষ ও সূদ ইত্যাদি ধরনের কোন আয় জড়িত হয়, তবে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অতএব শরীয়াতের দৃষ্টিতে কারুর মালিকানা বৈধ প্রমাণিত হলে তার ব্যয় ও ব্যবহারের অধিকারও নিসন্দেহে স্বীকৃত হবে এবং তা সে শরীয়াত সম্মত পথে নিয়োগ করে তার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারবে। ধোঁকা-প্রতারণা, সুদী কারবার, মওজুদ করণ ও অতিরিক্ত মূল্য গ্রহণের মাধ্যমে সম্পদ ও সম্পত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করার অধিকার কারুর নেই। তা কেউ করলে তা সরকারের বাজেয়াপ্ত হবে।

শরীয়াতে ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় প্রয়োজনে ও শরীয়াতের কল্যাণ দৃষ্টিতে ন্যায্য মূল্যের বিনিময়ে ব্যক্তি মালিকানা হরণও করা যেতে পারে।

ব্যক্তি মালিকানার ওপর ইসলামী শরীয়াত অনেকগুলি শর্ত ও অধিকার ধার্য করেছে। যে লোকই ব্যক্তি মালিকানার অধিকারী তাকে এ সব শর্ত পূরণ এবং অধিকার আদায় করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এ শর্তগুলোর মধ্যে মোটামুটি উল্লেখযোগ্য হলো (১) নিকটাত্মীয়দের অধিকার আদায়, (২) যাকাত দান ও (৩) অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা। অভাবগ্রস্ত ও দরীদ্র জনের সাহায্য দান করার কাজটি অপরিহার্য হবে তখন, যদি যাকাত ফান্ড ও সরকারী ব্যবস্থাপনা তাদের অভাব মেটাতে ও প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট না হয় এবং রাষ্ট্রের বায়তুলমাল এ কাজে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়ে।

মতপোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা

ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যক্তির মত পোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ অধিকার হরণ করার এবং এ থেকে জনগণকে বঞ্চিত করার অধিকার কারুর নেই। বস্তুত ব্যক্তির চিন্তা ও মানসিক প্রতিভার ষ্ফুরণের জন্যে ব্যক্তির মতের স্বাধীনতা থাকা একান্তই অপরিহার্য। এ না থাকলে মুসলমানরা তাদের দীনী দায়িত্ব ও কর্তব্যও পালন করতে পারে না। ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ তো মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য। আর চিন্তা ও মতের স্বাধীনতা থাকলেই এ কাজ বাস্তবায়িত হতে পারে। কুরআন মজীদে এ জিনিসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং এ কাজকে মানুষের ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ

“কালের শপথ, মানুষ মাত্রই ধ্বংসের মুখে উপস্থিত। তবে যারা ঈমান এনেছে, নেক আমল করেছে এবং সত্য ও ধৈর্য্যাবলম্বনের জন্যে উপদেশ দেবে-তারা এ থেকে বাঁচতে পারবে।“ –আল-আছর

বলা হয়েছেঃ

“মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রী পরস্পর বন্ধু। তারা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ ব্রতে ব্রতি হয়ে থাকে।“ –আত-তাওবাহঃ ৭১

আর এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছেঃ

“তোমাদের মধ্য থেকে একটি সুসংহত বাহিনী এমন তৈরী হতে হবে, যারা কল্যাণের দিকে আহবান জানাবে, ন্যায়ের আদেশ করবে ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে।“ –আলে-ইমরানঃ ১০৪

হাদীসে নবী করীম (স)-এর স্পষ্ট ঘোষণাও উদ্ধৃত হয়েছে এ পর্যায়ে-

“তোমাদের মাঝে যে লোক অন্যায় দেখতে পাবে, সে যেন তা তার শক্তি দিয়ে প্রতিহত করে, শক্তি না থাকলে মুখে যেন তার বিরুদ্ধে কথা বলে। আর মুখে বলবার মত অবস্থা না হলে অন্তত মনে মনেও যেন তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। যদিও এ অত্যন্ত দুর্বল ঈমানের পরিচয়।“

শাসন কর্তৃপক্ষের ওপর তীব্র-তীক্ষ্ণ সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং তাদের কোন ত্রুটি গোচরিভূত হলে তার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা প্রত্যেকটি নাগরিকেরই কর্তব্য। আর এ সব কাজ সম্ভব হতে পারে ঠিক তখন যদি ব্যক্তির মত পোষণ ও প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকৃত থাকে।

পারস্পরিক পরামর্শ বিধান এ কাজে যে মতবিরোধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তাতেও চিন্তা ও মতের স্বাধীনতা অপরিহার্য, বরং তা না থাকলে পারস্পরিক পরামর্শের ইসলামী বিধান কার্যকরই হতে পারে না।

এ সব কারণে ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যক্তিদের নিজস্ব চিন্তা ও মতের স্বাধীনতাকে পূর্ণ গুরুত্ব সহকারে রক্ষা করা হয়। ব্যক্তিদের অনুরূপ পরিবেশ দিয়ে লালন ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং শাসন-কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে জনগণকে সব সময়ই উৎসাহ দান করে থাকে। কেউ যদি এ অধিকার ভোগ না করে তাহলে বরং তাদের কড়া শাসন করা হয়। এ পর্যায়ে ঐতিহাসিক ঘটনার কোন শেষ নেই। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে লক্ষ্য করে এক ব্যক্তি বললোঃ ‘হে ওমর! তুমি আল্লাহকে ভয় কর।‘ তখন হযরত ওমর (রা) বললেন, “হ্যাঁ আমাকে তাই বলবে। না বললে বরং তোমরা কোন কল্যাণ লাভ করতে পারবে না। আর আমরাও কোন কল্যাণ লাভ করতে পারবো না, যদি তা না শুনি।“

তবে ব্যক্তির স্বাধীন মতপোষণ ও প্রকাশের শুধু সুযোগ থাকাই যথেষ্ট নয় বরং সে জন্যে তাদের মাঝে প্রবল মনোবল, সৎ সাহস ও বীরত্ব বর্তমান থাকা আবশ্যক। শাসকদের ব্যাপারে তাদের সম্পূর্ণ নির্ভীক হতে হবে, তবেই তারা এ সুযোগের পুরোমাত্রায় সদ্ব্যবহার করতে পারবে। কেননা ভয়, ত্রাস ও শংকা মানুষকে তার স্বাধীন মত প্রকাশ থেকে বিরত রাখে, সুযোগ হলেও কোন কথাই তাকে বলতে দেয় না। আর কোন জাতি যদি এমনি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে তাহলে সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য। সে জাতি আল্লাহর রহমত থেকেও বঞ্চিত। এ জন্যে নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ

“তুমি যখন আমার উম্মাতকে দেখবে যে, সে জালেমকেও জালেম বলতে ভয় পায়, তখন তুমি তার কাছ থেকে বিদায় নিবে।“

আর মুসলমানদের মনোবল, সাহস, হিম্মত ও বীরত্বের মূল উৎস হচ্ছে তাদের তওহিদী আকীদা। এ আকীদা যদি তাদের মনে বদ্ধমূল হয় এবং তারা গভীরভাবে এর তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে, তাহলে তাদের মনে জাগবে এ সাহস ও বীরত্ব। মুসলমানদের এ কথাই বুঝতে হবে যে, ক্ষতি-উপকার সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ, অন্য সবই আল্লাহর দাসানুদাস মাত্র, রাষ্ট্রপ্রধান ও অন্যান্য সরকারী কর্মচারী সকলে আল্লাহরই সৃষ্ট, আল্লাহর নিকট তাদেরও হিসাব দিতে হবে। তাহলেই তারা সুস্পষ্ট ভাষায় নিজেদের মত প্রকাশ করার সাহস পাবে এবং এ ব্যাপারে তারা কাউকেই ভয় পাবে না।

ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা

অবশ্য এ কথা মনে রাখতে হবে যে, ব্যক্তির মত পোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা নিরংকুশ ও উচ্ছৃংখল হতে পারে না। বরং সে জন্যে কিছু শর্ত এবং কিছু কিছু নিয়ম-নীতি অবশ্যই রয়েছে। তার আসল শর্ত হলো, তার মূলে সদিচ্ছা নিহিত থাকতে হবে, কল্যাণের উদ্দেশ্যেই এ অধিকার প্রয়োগ করতে হবে। আর আল্লাহকে সন্তুষ্ট করাই হতে হবে তার চরম লক্ষ্য। মত প্রকাশের এ স্বাধীনতা থেকে সামগ্রিক কল্যাণ লাভ করাই উদ্দেশ্য হতে হবে। আর এ শর্ত ইসলাম প্রদত্ত অপরাপর অধিকার ভোগের মতই অত্যন্ত যুক্তিসংগত। দ্বিতীয় শর্ত এই যে, ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করে নিজের বীরত্ব ও বাগাদুরী জাহির করা চলবে না, চলবে না তা করে অন্যকে হীন প্রমাণ করার চেষ্টা করা। কিংবা অপর কোন বৈষয়িক স্বার্থ লাভ করার চেষ্টা করা।

তৃতীয় শর্ত এই যে, এ অধিকার ভোগ করার সময় ইসলামের মৌলিক আকীদা ও ইসলামের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বৈধতার বিরোধিতা করা চলবে না। ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও জীবনাদর্শের সমালোচনা করা চলবে না এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ইসলামী আদর্শের কোন দোষ প্রচার করার অধিকারও কাউকে দেয়া যেতে পারে না। কেননা, এ কাজ মুসলিমকে মুর্তাদ বানিয়ে দেয়, সে জন্যে তার শাস্তি হওয়াই বিধেয়। আর চতুর্থ শর্ত এই যে, ইসলামের নৈতিক নিয়ম-নীতিকে পূর্ণ মাত্রায় বহাল রাখতে হবে তাকে লংঘন করা চলবে না। কেউ কাউকে গালাগাল করতে পারবে না, মিথ্যা দোষারোপ করতে পারবে না কেউ কারে ওপর। কেননা, সেরূপ করার স্বাধীনতা দেয়ার মানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়।

এ পর্যায়ে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারী দায়িত্বশীল কর্মচারীদের কাজকর্ম ও চরিত্রে কোনরূপ অন্যায় দেখতে পেলে তার বিরুদ্ধে কথা বলারও পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে প্রত্যেকটি নাগরিকের। কিন্তু তাই বলে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীত্মক কথা বলার অধিকার কাউকে দেয়া যেতে পারে না। বিপরীত মতাদর্শের সাথে মতবিরোধ করার অধিকার রয়েছে, তার সমালোচনা ও দোষত্রুটি বর্ণনাও করা যেতে পারে; কিন্তু কারুর সভা-সম্মেলনে গোলযোগ করার অধিকার কারুর থাকতে পারে না। আর যতক্ষণ কেউ বিপরীত মত পোষণ করা সত্ত্বেও কোনরূপ অশান্তিকর অবস্থার সৃষ্টি না করবে, ততক্ষণ সরকারও তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। ব্যক্তিগত মত পোষণ ও প্রকাশের ব্যাপারে এই হলো সীমা নির্দেশ। এ সীমা রক্ষা করাই সকল শ্রেণীর নাগরিকদের কর্তব্য। এ পর্যায়ে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো, হযরত আলী (রা)-এর খিলাফত আমলে বিরোধী মতাবলম্বী খাওয়ারিজদের প্রতি তাঁর গৃহীত নীতি। তাদের লক্ষ্য করে খলীফা বলেছিলেনঃ

“তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত কোনরূপ অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি না করবে ততক্ষণ তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই শুরু করবো না।“
(নাইলুল আওতার, ৭ম খন্ড, ১৫৭ পৃঃ)

বস্তুত বিরোধী মতাবলম্বীরা যতক্ষণ জনগণকে তাদের মত গ্রহণে বলপূর্বক বাধ্য করতে না চাইবে ততক্ষণ ইসলামী রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোন কঠোর দমন নীতি গ্রহণ করবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত বরং সরকারের কর্তব্য হলো তাদের বুঝানো, ভালো শিক্ষা দান ও উপদেশ-নছীহতের মাধ্যমে তাদের মনের পরিবর্তন করতে চেষ্টা করা। খাওয়ারিজদের সম্পর্কে এ নীতিই গৃহীত হয়েছিল। বলা হয়েছে, তারা ইনসাফ পূর্ণ সমাজে বসবাস করা সত্ত্বেও যদি তাদের মতাদর্শ নিয়ে বেশী বাড়াবাড়ী করে তাহলে রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো তাদের মতাদর্শের দোষ-ত্রুটি ও মারাত্মকতা লোকদের সামনে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা। তাহলে তারা সে ভুল মত ত্যাগ করে সত্য ও নির্ভুল মতাদর্শ গ্রহণ করে সমাজের সাথে শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
(ইমতাউল আসমা, ১০১ পৃঃ)

শিক্ষা লাভের অধিকার

ইসলামে জ্ঞান ও শিক্ষার এবং জ্ঞানী ও শিক্ষিত লোকদের মর্যাদা সর্ব্বোচ্চ। ইসলাম মানুষকে জ্ঞানলাভের জন্যে তৎপর হতে, জ্ঞানবৃদ্ধির জন্যে চেষ্টা করতে ও সে জন্যে আল্লাহর নিকট দোয়া করতে নির্দেশ দিয়েছে। কুরআন মজীদে ইরশাদ করা হয়েছেঃ

“তুমি বলো, হে রব, আমার জ্ঞান ও বিদ্যা বাড়িয়ে দাও।“

আর আসল কবুল হওয়ার জন্যে ইলম তো একান্তই জরুরী। কেননা সে আমল কেবল আল্লাহর নিকট কবুল হতে পারে, যা হবে খালেছভাবে কেবল মাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে, যা হবে শরীয়াতের বিধান মুতবিক নির্ভুল ও সঠিক। আর ইলম-জ্ঞান ও বিদ্যা ছাড়া এরূপ হওয়া সম্ভব নয়।

ইলমও কয়েক প্রকারের রয়েছে। কিছু ইলম তো অর্জন করা ‘ফরজে আইন।‘ যেমন আকীদা ও ইবাদাত সংক্রান্ত ইলম। আর কতকগুলো রয়েছে ‘ফরজে কেফায়া’। এ জ্ঞান সাধারণভাবে সমাজ ও জাতির লোকদের কারো মধ্যে থাকলেই হলো। মানুষের দীনের বিস্তারিত রূপ, শিল্প-ব্যবসায়-বাণিজ্যে, রাষ্ট্র শাসন বিধি, আইন-কানুন ইত্যাদি সংক্রান্ত জ্ঞান এ পর্যায়ে গণ্য। এ সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জনও জরুরী বটে; এবং রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে জনগণের মধ্যে এ সব জ্ঞান বিস্তারের জন্যে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নবী করীম (স)-এর কর্মপদ্ধতি থেকে এ পর্যায়ে সরকারী দায়িত্বের কথা স্পষ্ট হয়ে উঠে। বদর যুদ্ধে যেসব কুরাইশ বন্দী হয়েছিল তাদের মুক্তিপণ হিসেবে ঠিক করে দেয়া হয়েছিল, প্রত্যেক লেখাপড়া জানা বন্দী অন্তত দশজন মুসলমানকে লেখা পড়া শেখাবে। কেননা তখন মুসলমানদের মধ্যে লেখা-পড়া জানা লোকদের সংখ্যা অত্যন্ত কম ছিল। রসূলে করীম (স) রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে লোকদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন।

ভরণ-পোষণের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা লাভের অধিকার

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকই খাদ্য-পানীয়-বস্ত্র-বাসস্থানের নিরাপত্তা লাভের অধিকারী। কোন নাগরিকই এ সব মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে না। যে লোক নিজের সামর্থে স্বীয় প্রয়োজন পূরণে সমর্থ হবে না, সমাজ ও রাষ্ট্র তার সে প্রয়োজন পূরণের জন্য দায়ী। এ সব মৌলিক প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকতে কেউই বাধ্য হয় না ইসলামী রাষ্ট্রে।

ইসলামী রাষ্ট্রের এরূপ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো এই যে, ইসলামী সমাজই হলো পারস্পরিক সাহায্য-ভিত্তিক সমাজ। এ সমাজের প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতে প্রস্তুত। কেননা মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলোঃ

“তোমরা সবাই পরস্পরের সাহায্য কাজে এগিয়ে যাও। নেক কাজ ও তাকওয়া সংক্রান্ত বিষয়াদিতে এবং গুনাহের কাজ ও আল্লাহদ্রোহীতায় কোনরূপ সাহায্য করো না কারুর।“

আর অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির অভাব মোচনের চাইতে বড় নেক কাজ কি হতে পারে। পারস্পরিক সাহায্য সংক্রান্ত কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সচ্ছল অবস্থার লোকেরা অভাবগ্রস্ত ও গরীব লোকদের সাহায্য করবে। তাতে তার মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হবে। নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ

“যার খাবার বেশী আছে সে তাকে তা দেবে, যার খাবার নেই। আর যার পাথেয় বেশী আছে সে তা সেই পথিককে দেবে যার পথের সম্বল নেই।“
(আন-মাহাল, ইবনে হাযম, ৬ষ্ঠ খন্ড, ১৫৬ পৃঃ)

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ

“যার কাছে দু’জনার খাবার আছে, সে যেনো তিনজনকে খাওয়ায়। আর যার কাছে চার জনের খাবার আছে, সে যেনো পাঁচ জন কিংবা ছয় জনকে খাওয়ায়। (আন-মাহাল, ২য় খন্ড, ৫৭ পৃঃ)

বস্তুত রাষ্ট্র হলো সমাজ সমষ্টিরই প্রতিভূ, সমাজের লোকদের প্রতিনিধি। কাজেই এ হাদীসের মূল প্রতিপাদ্য অনুযায়ী আমল করা সমাজ-সমষ্টির পক্ষ থেকে রাষ্ট্র-সরকারেরই দায়িত্ব। অতএব এ কথা প্রমাণিত যে, ইসলামী রাষ্ট্র দেশের সমস্ত অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র জনের অভাব মেটানোর জন্যে দায়িত্বশীল। এ পর্যায়ে আরো একটি হাদীস উল্লেখ্য। তাতে সরকারের এ দায়িত্বের কথাই প্রমাণিত হয়। বলা হয়েছেঃ

“যে মু’মিন মরে যাবে ও ধন-সম্পদ রেখে যাবে, তার নিকটাত্মীয়রাই তার ওয়ারিস হবে। আর যে মুমিন ঋণ রেখে বা অক্ষম সন্তান রেখে যাবে, তাদের দায়িত্ব আমার ওপর বর্তাবে, আমিই তাদের গার্জিয়ান হবো।“

নবী করীম (স) এ দায়িত্ব পালন করতেন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে, রাষ্ট্রীয় বায়তুল মাল থেকে, নিজের সম্পত্তি থেকে নয়। কাজেই এ ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো।

সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছেঃ

“তোমাদের প্রত্যেকেই অপরের জন্যে দায়ী এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অতএব জনগণের রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের জন্যে দায়ী, তাকে জনগণের জন্যে জবাবদিহি করতে হবে।“

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী লিখেছেনঃ “এ হাদীসে ‘দায়িত্বশীল’ বলে এ কথা বুঝানো হয়েছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তার অধীন যাবতীয় বিষয়ে দেখাশুনা করা, তাদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করা এবং দীন ও দুনিয়ার দিক দিয়ে তাদের পক্ষে কল্যাণকর যাবতীয় বিষয়ে ইনসাফ করার দায়িত্ব পালন করতে হবে।“ আর জনগণের বৈষয়িক কল্যাণ হচ্ছে তাদের যাবতীয় বৈষয়িক প্রয়োজন পূরণ করে দেয়া, যদি তারা নিজেরা তা পূরণ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এ প্রয়োজন পূরণ হলেই তাদের আল্লাহর বন্দেগী সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনও সহজ হতে পারে। কেননা, এ কথা সর্বজনবিদিত যে, যারা তাদের বৈষয়িক প্রয়োজন পূরণে অক্ষম হয়, তারা সে চিন্তায় এমন কাতর হয়ে পড়ে যে, তারা আল্লাহর বন্দেগীর কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয় না।

ব্যক্তির অধিকার আদায়ে শরীয়াতের বিধান

ব্যক্তির অধিকার আদায় করার জন্যে ইসলামী শরীয়াতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত করা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইসলামী রাষ্ট্র এ ব্যাপারে জনগণকে সাধারণ নিরাপত্তার কথা ঘোষণা করে। এ জন্যে যে ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে তা কয়েক পর্যায়ে বিভক্তঃ

প্রথমঃ ব্যক্তির শ্রম ও কাজ। এ পর্যায়ে মৌলিক কথা হলো, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি নাগরিকই নিজের প্রয়োজন নিজে পূরণ করবে। সে কাজ করবে, উপার্জন করবে। সে জন্যে অপর কোন মানুষের সামনেই ভিক্ষার হাত দরাজ করবে না। কেননা, ইসলামের দৃষ্টিতে “ওপরের হাত নিচের হাতের তুলনায় অনেক উত্তম।“ অতএব গ্রহণের চাইতে দান ভালো। আর দান সম্ভব হয় যদি ধন থাকে এবং ধন শ্রম ও উপার্জন ব্যতিরেকে হস্তগত হওয়া সম্ভবপর নয়। হাদীস শরীফে উদ্ধৃত হয়েছেঃ

“যার হাতে আমার প্রাণ নিবদ্ধ তাঁর নামে কসম করে বলছি, তোমাদের

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • You may use [inline:xx] tags to display uploaded files or images inline.

More information about formatting options

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

ফেসবুক ফ্যান


সাম্প্রতিক মন্তব্য

পড়া লেখা

নতুন সদস্য

  • tausif699
  • Tasria
  • Naimul Islam
  • omarfarukbdin
  • mukul1942
  • Zakaria Ahmed
  • Maidul_Islam
  • smhusain.2002
  • rinkufahad
  • Ali Jinnah

অনলাইনে আছেন

There are currently 1 user and 6 guests online.

Online users

  • tausif699