সাহিত্য প্রগতির অন্যতম প্রধান অন্তরায় মুসলিম জনগণের অহেতুক রোমান্টিক মনোভাব, অন্যদিকে আধুনিক মুসলিমের শ্লোগানপ্রিয়তা। মুসলিম জনগণ মুসলিম রাষ্ট্র, মুসলিম শাসক ও মুসলিম সাহিত্য চেয়ে এসেছেন যুগ যুগ ধরে। কিন্তু তারা দেখেননি তাঁদের রাষ্ট্রে সংস্কৃতিতে ও সাহিত্য ইসলামের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ সম্যকভাবে রূপায়িত হয়েছে কিনা। আবার আধুনিকেরা মুসলিম জনগণের এই মনোভাবকে ইসলামের নামে চালিয়ে দিয়ে ইসলামকে বুঝতে, চিনতে ও রূপায়িত করতে অপরাগ হয়ে পড়েছেন। সার্থক সাহিত্য সৃষ্টি করতে গেলে নিজস্ব জীবনবোধের ওপর শ্রদ্ধাশীল থেকে প্রচীন ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি, পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সস্কৃতি, ইসলামী সাহিত্য ও সস্কৃতিকে মন্থন করতে হবে। তারপর এই সাধনাকে নিজের জবানীতে স্বতন্ত্রতা ও স্বকীয়তার মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। সত্য চিরদিনের; কিন্তু সে সত্যকে অক্ষুন্ন রেখে নিজের জীবনবোধ ও আঙ্গীকের মারফত প্রকাশ করা চাই। দেশের মাটির আকর্ষন, ইতিহাসের ধারা ও বিশ্ব-সংযোগ অক্ষুন্ন রেখে সংযম ও স্থৈর্যের মারফত জাতির অসীম বাসনা, অযুত বেদনা ও অতন্দ্র সাধনা বিকাশ লাভ করবে।
মানুষের কাছে যা মূল্যবান, কিন্তু বাইরে থেকে চোখে পড়ে না, তাকে উদঘাটন করতে হবে। নিজস্ব প্রাণ-মনকে অবলম্বন করেই হবে আমাদের সৌন্দর্যের ও অমরত্বের সাধনা। এজন্য ইতিহাস শিক্ষা প্রণালীর রদবদল করতে হবে। অত্যাচার হিন্দু বা মুসলমানের একচেটিয়া নয়। অজ্ঞনতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে সমাজ-জীবন থেকে দূর করতে হবে। জীবনের সাধনায় জীবন গঠনের উপাদান শরীফ হওয়া আমাদের চিরন্তন অধিকার। জগতের জন্য আমাদের ভূমিকা শেষ হয়ে যায়নি। মানুষে মানুষে মিলনের আসল বস্তুটি মুখের নয়, বুকেরও । যারাই সত্য-সুন্দরের অভিসারে যাত্রা করেছেন, তারা যে দেশের বা যে জাতিরই হোন, তাদের সবাইকে আমরা যেন সশ্রদ্ধ সালাম জানাতে শিখি। আমাদের সাহিত্যও সংঘাত চলছে। তার ফলে আমাদের সাহিত্য এখনো শৃঙ্খলা ও আত্মশক্তি খুঁজে পায়নি, নতুন সংস্কৃতি সম্পর্কে সুষ্ঠু মানসচেতনা জাগেনি। সাহিত্য অতীত নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না; কিন্তু অতীতকে সঙ্গে নিয়েই চলবে। কারণ মানুষের রসবোধ ও জীবনবোধ অতীতের সঙ্গে যুক্ত। অতীতকে শুধু সংগ্রহ করলে হবে না, তাকে উপলদ্ধি করে সাধারণ জীবনে কার্যকরী করতে হবে। তবু সত্য ও কল্যাণের সন্ধান করতে হবে। নিছক অতীতমুখী গোরস্তান মানসিকতা ও পশ্চাদমুখিতা ত্যাগ করে পরমতম সহিষ্ণুতা ও নিজস্ব জীবনবোধের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে সাহিত্য নতুন মোড় নিতে হবে।
নিজেদের প্রচেষ্টার সামান্যের দেশে যেন আমরা ক্ষুন্ন না হই। একটি জীবন্ত জাতির জীবন, সাহিত্য ও সংস্কৃতিও গতিশীল ও বলিষ্ঠ হতে বাধ্য। কিন্তু এ সহজলভ্য নয়, সাধনা ও অনুশীলনসাপেক্ষ। চিত্তের স্বাভাবিক স্ফুর্তি ও সংযম চাই। ইসামের সমগ্রতা পৌছে দিতে হবে মানুষের সামনে। সত্যিকার মুসলিম অন্য জাতিকে ঘৃণা করে না। (পাগলা কানাই, লালন ফকির) আমর সার্থক সাহিত্য সৃষ্টির যে পথের কথা বলেছি, সেই পথে চললে বাঙালী মুসলিমের মধ্যে মনীষার ও শক্তিশালী সাহিত্যিকের আবির্ভাব অসম্ভব কল্পনা নয়। আমাদের জীবনবোধ অন্ধ গোষ্ঠীবাদ বা একটি ভাষার সীমায় আবদ্ধ নয়। জীবনবোধই মুসলিমদেরকে এক করেছে ও জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সমগ্র মানুষকে ভালবাসতে শিখিয়েছে। আমাদের জীবনবোধের মাধ্যমে জাতীয় জীবনের সমস্যার সমাধান ও সাহিত্য তার প্রাণধর্মী প্রকাশ অপরিহার্য। দুনিয়ার সব ভাষার মারফতেই এই জীবনবোধ বিকাশ লাভ করতে পারে। অহেতুক আরবী হরফ ও আরবী-ফারসী আমাদের জীবনবোধের একমাত্র বাহন মনে করার হীন সঙ্কীর্ণতার ফলে আমাদেরকে চিন্তাশীল লোকদের বিদ্বেষ কুড়াতে হয়েছে।
জীবনের পারিপার্শ্বিকতার দিকে জাগ্রত দৃষ্টি দিয়ে স্বকীয় আদর্শ অক্ষুন্ন রেখে ঢেলে সাজাতে হবে। এ জীবন্ত জীবনবোধই হবে আমাদের সাহিত্যের জীবনকাঠি। মুসলিম মানসের সেই ঔদার্য, ব্যাপকতা ও সর্বজনীনতা আবার আনতে হবে। স্বীয় দু:খ-কালিমাকে লুকিয়ে না রেখে সেগুলো সাধারণো প্রকাশ করে, অনুশীলন করে, আত্মস্থ করে, দুঢ় প্রত্যয় নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। তবেই আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্য নবজীবন লাভ করে স্বগৌরবে প্রদীপ্ত হবে ও আমরা নতুন পথে অগ্রসর হতে পারব।
Post new comment