অবাধ্য সন্তানের জন্য জান্নাত হারাম
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণীর লোকের জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। ১. মাদকাসক্ত ব্যক্তি, ২. মাতা-পিতার নাফরমান ব্যক্তি ও ৩. অসৎ স্ত্রীর স্বামী যে নিজের পরিবারে দুষ্কর্মের সমর্থন করে।৩
--------------------------------------------------------------------------------------------
আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, চার শ্রেণীর লোককে জান্নাতে প্রবেশ করতে না দেয় এবং জান্নাতের নিয়ামত উপভোগ করতে না দেয়া আল্লাহ তাআলার হক বা অধিকার। ১. মদ্যপায়ী, ২. সুদখোর , ৩. অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের মাল ভক্ষণকারী এবং ৪, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান। ১
অবাধ্য সন্তান জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না :
আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, পাঁচশত বছরের রাস্তা থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাওয়া যায়। (কিন্তু তিন ব্যক্তি জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবে না) ১. যে ব্যক্তি দান করে খোঁটা দেয় ২. মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, (অথ্যাৎ যে সন্তান-পিতাকে কষ্ট দেয় তাদেরকে অসন্তুষ্ট রাখে ও ৩. যে ব্যক্তি মদপানে অভ্যস্থ।২
হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, আমরা এক জায়গায় এক হয়েছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে আমাদের মাঝে এসে বললেন, হে মুসলিম জনসমষ্টি! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখো। কেননা সম্পর্ক অটুট রাখার চাইতে দ্রুত কবুল যোগ্য সওয়াবের কাজ আর নেই। আর তোমরা বাড়া-বাড়ি সীমালংঘন করা থেকে দূরে থাকো। সীমালংঘন করার চাইতে দ্রুত শাস্তিযোগ্য অপরাধ আর নেই। তোমরা মাতা-পিতার নাফরমানী করা থেকে দূরে থাকে কেননা এক হাজার বছরের রাস্তা থেকে জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। আল্লাহর কসম! মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, বৃদ্ধ ব্যাভিচারী এবং গর্বভরে টাখনুর নীচে কাপড় পরিধানকারী জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না...........।৩
হযরত ইবন উমার (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণীর লোকের প্রতি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। ১. মাতা-পিতাকে কষ্টদানকারী অবাধ্য সন্তান, ২. পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও ৩. দাইয়্যূস। আর তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতের প্রবেশ করবে না। ১. মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, ২. মদপানে আসক্ত ব্যক্তি, ও ৩. দান করে খোঁটাদানকারী।৪
--------------------------------------------------------------------------------------------
১. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩ খ, পৃ. ৩২৮ : (আল মুস্তাদরাক বরাত)
২. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩ খ, পৃ. ৩২৭ (তারাবানী জামে আস সগীর, বরাত)
৩. আত-তারগীব ওয়াত তাবহীব, ৩ খ, পৃ. ৩২৯-৩৩০; তাবারানী, আল আওসাত, বরাত
৪. নাসাঈ, অধ্যায় ; যাকাত, অনু ; ৬৯; দান করে খোঁটা দানকারী;
মায়ের সাথে নাফরমানীর শাস্তি :
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওয়া (রা) বলেন, আমরা নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, একজন যুবকের মুমূর্ষ অবস্থা। লোকজন তাকে (কালিমা) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ার উপদেশ দিচ্ছে, কিন্ত সে পড়তে পারছে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন : এ ব্যক্তি কি নামায আদায় করতো? সে বলল, জী হ্যাঁ। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠে (যুবকটির উদ্দেশ্যে) রওয়ানা করলেন। আমরাও তাঁর সাথে চললাম। তিনি যুবকের কাছে গিয়ে তাকে কালিমা পড়ার তালকীন দিলেন অর্থাৎ বললেন : কেন কি হয়েছে? লোকটি বলল, সে তার মায়ের সাথে নাফরমানী করত। নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন : তার মা কি জিবীত আছে? লোকেরা বলল, হ্যাঁ, জীবিত আছেন। তিনি তাঁকে ডেকে আনার নির্দেশ দিলেন। তার বৃদ্ধ মাতা আসলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, একি তোমার ছেলে? বৃদ্ধা বলল, হ্যাঁ, আমার ছেলে। তিনি বৃদ্ধাকে বললেন, তুমি কি মনে করো, যদি একটা ভয়ংকর আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হয় এবং তোমাকে বলা হয়, যদি তুমি ছেলের জন্য সুপারিশ করো তাহলে তাকে এ আগুন থেকে নিষ্কৃতি দেয়া হবে। অন্যথায় তাকে এ আগুনে ফেলে পুড়িয়ে মারা হবে। এ অবস্থায় তুমি কি সুপারিশ করবে? বৃদ্ধা বলল, জি, হ্যাঁ, সুপারিশ করব। একথা শুনে নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : তাহলে তুমি আল্লাহ ও আমাকে সাক্ষী রেখে বলো, তুমি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বলছো। বৃদ্ধা বলল, হে আল্লাহ! আমি তোমাকে এবং তোমার রাসূলকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার কলিজার টুকরা সন্তানের প্রতি রাজী হয়ে গেছি। তখন নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবকটির প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, বলো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহাদাহু লা-শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু (সন্তানের প্রতি মায়ের সন্তুষ্টির বরকতে যুবকটির মুখ খুলে গেলো এবং তৎক্ষনাত) সে কালিমা পাঠ করল। নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা করলেন আর বললেন : সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমার অসিলায় এ যুবককে জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে নাজাত দিয়েছেন।১
--------------------------------------------------------------------------------------------
১. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩ খ, পৃ. ৩৩৩. আরো দ্র. মুসনাদে আহমদ ও তারাবানী;
নাফরমান সন্তানের ধ্বংস অনিবার্য :
হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা মিম্বারের কাছে এসো জামায়েত হও। আমরা সকলে মিম্বারের কাছে এসে জামায়েত হলাম। তিনি মিম্বারের প্রথম ধাপে আরোহান করে বললেন: আমীন। দ্বিতীয় ধাপে আরোহন করে পুনরায় বললেন আমীন। তৃতীয় ধাপে আরোহন করে আবারো বললেন : আমীন। তিনি মিম্বার থেকে অবতরণ করার পর আমরা তাঁর নিকট আরয করলাম, আজ আমরা আপনার কাছ থেকে এমন কিছু কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। তিনি বললেন, জিবরাঈল (আ) (এইমাত্র) আমাকে এসে বললেন, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমযান মাস পেয়েছে, অথচ তার গুনাহ মাফ হয়নি। আমি বললাম আমীন (আল্লাহ কবুল করুন)। আমি দ্বিতীয় ধাপে আরোহণ করলে তিনি (জিবরাঈল)(আ) বললেন: সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলো, অথচ সে দরূদ পড়ল না। আমি বললাম : আমীন। আমি মিম্বারের তৃতীয় ধাপে আরোহণ করলে জিবরাঈল (আ) বললেন, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে মাতা-পিতা উভয়কে অথবা তাঁদেরকে কোন একজনকে পেল, কিন্তু তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালো না। আমি বললাম : আমীন।২
ব্যাখ্যা : বৃদ্ধ বয়সে মানুষ দ্রুত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। শরীর ক্রমাগত শক্তিহীন, দুর্বল ও নিস্তেজ হতে থাকে। কর্মদক্ষতা ও আত্ম নির্ভরশীলতা হারিয়ে ফেলে। এমনকি এক পর্যায়ে চলা-ফেরা করার ক্ষমতা ও তাঁদের থাকে না। তখন দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব তাঁদেরকে গ্রাস করে ফেলে। ফলে তাঁরা পরনির্ভরশীল তথা সন্তান-সন্ততির ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অপর দিকে বার্ধক্যের চাপে ও
======================================================
১. সহীহ মুসলিম, সদ্ব্যবহার, অনু: ৩, যে ব্যক্তি বৃদ্ধা মাতা-পিতাকে পেয়েও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেনি তার নাক ধুলি মলিন হোক, ৪ খ, পৃ. ১৯৭৮, নং. ২৫৫১
২. আল-মুস্তাদরাক, ৪. খ. পৃ. ১৫৪; নাদরাতুন নাঈম, ১০ খ, পৃ. ৫০১৪; আল ইহসান বি-তারতীবে সহীহ ইবন হিব্বান ১ খ, পৃ. ৩১৫
চতুর্মুখী রোগ যাতনায় তাঁদের মেজায খিটখিটে, কথা-বার্তা কর্কশ, আচার-আচরণ রূঢ় হয়ে যায়। এ সময়টা হয় মানুষের জন্য চরম দুর্দিন। বান্দার এ অসহায় ও দুর্দিনে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি বিশেষ করুণায় হাত প্রসারিত করেন এবং দয়া ও রহমতের দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ফলে সন্তানের জন্য মাতা-পিতার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁদের অসুন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসুন্তুষ্টি হিসাবে পরিগণিত করা হয় এবং তাঁদেরকে সন্তানের জন্য জান্নাত ও জাহান্নাম হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ মাতা-পিতার এ কঠিন মুহূর্তে তাঁরা যে সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট হন আল্লাহ তাআলা ও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য জান্নাতের ফায়সালা করে দেন।
পক্ষান্তরে যে সন্তান তার অস্তিত্ব, জন্ম, শৈশব ও কৈশোর জীবনে তার জন্য মাতা-পিতার কষ্ট ও তার প্রতি মাতা-পিতার অবদানকে অবলীলাক্রমে ভূলে যায় এবং মাতা-পিতার এ চরম অসহায় অবস্থায় তাঁদের সেবা-যত্নে আত্নোনিয়োগ করার পরিবর্তে তাঁদের অবাধ্য হয় এবং তাঁদের নাফরমানী করে ও তাঁদের মনে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হয়ে তার জন্য জাহান্নামের ফায়সালা করে দেন।
বৃদ্ধা মাতা-পিতাকে বা তাদের কোন একজনকে পেয়েও যারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেনি তারা ধ্বংস হোক-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ কথাটা জিবরাঈল (আ) বললেও এ কথাটা জিবরাঈল (আ) হচ্ছেন বানী বাহক মাত্র। আল্লাহ তাআলার এ ফায়সালার প্রতি জিবরাঈল (আ) এর পূর্ণ সমর্থন ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আল্লাহর এ ফায়সালাকে বিআ বাক্যে গ্রহণ করেছেন। বরং তিনি এর সাথে পূর্ণ একাত্ম হয়ে এ ফায়সালা কার্যকরী করার জন্য আমীন বলে আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতের প্রতি অত্যন্ত রহমদিল ছিলেন। উম্মতের শাস্তির কথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন। উম্মতের ইহকাল ও পরকালীন সুখ-শান্তি ও কল্যাণ সাধন করাই ছিল তাঁর নবুয়তী জীবনের মিশন। তা সত্বেত্ত মাতা-পিতার নাফরমান এবং তাঁদের মনে কষ্ট দানকারী সন্তানের ধ্বংসের জন্য তিনি বদদুআ করেছেন। কাজেই তাদের ধ্বংস অনিবার্য। তবে যদি তারা তওবা করে এবং নিজেদের ভূল শিকার করে মাতা-পিতার পায়ে ক্ষমা চেয়ে নেয়। তাঁদের সেবা-যত্নে আত্মনিয়োগকরে তাঁদের সন্তুষ্টি অর্জন করে। আর মাতা-পিতা মারা গেলে নিজেদের কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর দরবারে খালেসভাবে তওবা করে, মাতা-পিতার জন্য দুআ ও দান-সাদাকা করতে থাকে এবং মাতা-পিতার পক্ষের আত্মীয়-স্বজনের সাথে ও মাতা-পিতার বন্ধু-মহলের সাথে সদ্ব্যবহার করতে থাকে, তাহলে আশা করা যায় যে, তারা অনিবার্য ধ্বংস থেকে রেহাই পাবে।
Post new comment