ইসলামী নৈতিকতা বলতে আমরা যা বুঝে থাকি, কুরআন ও হাদীসের শিক্ষানুযায়ী এর চারটি ক্রমিক পর্যায় রয়েছে । প্রথম ঈমান, দ্বিতীয় ইসলাম, তৃতীয় তাকওয়া এবং চতুর্থ ইহসান। বস্তুত এ চারটি পর্যায় পরস্পর এমন স্বাভাবিক শ্রেণী পরম্পরা অনুযায়ী সুসংবদ্ধ হয়ে আছে যে, প্রত্যেকটি পরবর্তী পর্যায়ই পূর্ববর্তী পর্যায় হতে উদ্ভূত এবং অনিবার্যরূপে এরই উপর প্রতিষ্ঠিত। এজন্য নিম্নবর্তী পর্যায় যতক্ষণ না দৃঢ় পরিপক্ক হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এর উপরের পর্যায়ের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে কল্পনাও করা যায় না। এই সমগ্র ইমারতের মধ্যে ঈমান হচ্ছে প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর। এরই উপর ইসলামের স্তর রচিত হয়, তার উপর ‘তাকওয়া’এবং সকল পর্যয়ের উপরে হয় ‘ইহসানের’ প্রতিষ্ঠা। ঈমান না হলে ইসলামে তকওয়া কিংবা ‘ইহসান’ লাভ করার কোন সম্ভবনাই হতে পারে না। ঈমান দুর্বল হলে তার উপর উচ্চতর পর্যায় সমূহের দূর্বহ বোঝা চাপিয়ে দিলেও তা অতিশয় কাঁচা, শিথিল ও অন্তসারশুন্য হয়ে পড়বে । এই ঈমান সংকীর্ণ হলে যতখানি তার ব্যপ্তি হবে, ইসলাম এবং ইহসান ঠিক ততখানি সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ হবে, তাতে সন্দেহ নেই । অতএব ঈমান যতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ সুদৃঢ় ও সম্প্রসারিত না হবে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তিই তার উপর ইসলাম, তাকওয়া কি ইহসান প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তাও করতে পারে না।
অনুরূপভাবে ‘তাকওয়ার’ পূর্বে ‘ইসলাম’ এবং ‘ইহসানের’ পূর্বে ‘তাকওয়া’ বিশুদ্ধকরণ সুষ্ঠতা বিধান এবং স¤প্রসারিতকরণ অপরিহার্য । কিন্তু সাধারণত আমরা এটাই দেখতে পাই যে, এই স্বাভাবিক ও নীতিগত শ্রেণী পরস্পর ার প্রতি চরম উপেক্ষা প্রদর্শন করা হয় এবং ঈমান ও ইসলামের পর্যায়ে পূর্ণতা সাধন ছাড়াই তাকওয়া ও ইহসানের আলোচনা শুরু করে দেয়া হয়। এটা অপেক্ষাও দুঃখের বিষয় এই যে, সাধারত লোকদের মনে ঈমান ইসলাম সম্পর্কে অত্যন্ত সংকীর্ণ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে। এজন্যই শুধু বাহ্যিক বেশ -ভুষা, ও পোশাক -পরিচ্ছদ, উঠা -বসা, চলা- ফেরা, খানা-পিনা প্রভৃতি বাহ্যিক আচার -আনুষ্ঠানসমূহ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে করতে পারলেই তাকওয়ার, পূর্ণতা সাধন হয়ে গেলে। আর ইবাদতের মধ্যে নফল নামায, দুরূদ, অজিফা পাঠ এই ধরনের কয়েকটি বিশেষ কাজ করলেই ইহসানের উচ্চতম অধ্যায় লাভ হয় বলে ধারণা করে। অথচ এ ধরনের তাকওযা ও ইহসানের সংগে সংগে লোকদের জীবনের এমন অনেক সুস্পষ্ট সিদর্শনও পাওয়া যায় যার ভিত্তিতে অসায়াসে বলা চলে যে, তাকওয়া ও ইসলাম তো দূরের কথা, আসল ঈমানই এখন পর্যন্ততার মধ্যে পরিপক্কতা ও সুষ্টুতা লাভ করেনি।
এরূপ ভুল ধারণা ও ভূল দীক্ষা পদ্ধতি আমাদের মধ্যে যতদিন বর্তমান থাকবে ততদিন পর্যন্ত আমরা ইসলামী নৈতিকতার অপরিহার্য অধ্যায়সমূহ কখনো অতিক্রম করতে পারব বলে আশা করা যায় না। এজন্যই ঈমান, ইসলাম, তাকওয়া, ইহসান ---- এই চারটি অধ্যায় সম্পর্কে পূর্ণ সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা এবং সেই সংগে এদের স্বাভাবিক ও ক্রমিক শ্রেণী পরম্পরাও অনুধাবন করা একান্তই অপরিহার্য।
Post new comment