n. ভুল ধারণার অপনোদন

উপসংহারের কয়েকটি জরুরি কথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করছি। দীর্ঘকালের ভুল ধারণার কারণে সাধারণ মুসলমানের মনে খুঁটিনাটি কাজ ও বাহ্যিক অনুষ্ঠানসমূহের গুরুত্ববোধ তীব্র হয়ে রয়েছে। দীন ইসলামের মূলনীতি ও সামগ্রিক তথ্য এবং দীনদারী ও ইসলামী নৈতিকতার নিগূঢ় ভাবধারার দিকে অসংখ্যবার তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তারা এর গুরুত্ব অনুভব করতে পারে না। লোকদের মন-মস্তিষ্কে ঘুরে-ফিরে সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ ও সামান্য সামান্য বাহ্যানুষ্ঠানের গুরুত্বই তীব্র হয়ে ওঠে। তাদের দৃষ্টি এতো ক্ষুদ্র ও গুরুত্বহীন কাজগুলোর অন্তরালে গভীর সত্য পর্যন্ত পৌছায় না, বস্তুত ছোট ছোট ও ক্ষুদ্র কাজগুলোকেই দীন ইসলামের মূলভিত্তি বলে গণ্য করা হয়েছে। জামায়াতের বহু সদস্য এবং সমর্থকদের উপরও এই ভুল ধারণার মারাত্মক প্রভাব থাকতে পারে। দীন ইসলামের মূল তত্ত্ব ও প্রকৃত নিগূঢ় সত্য কি, তাতে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্ব কোন্‌ জিনিসের এবং কোন্‌টি মূখ্য আর কোন্‌টি গৌণ এসব কথা সঠিকরূপে বুঝাবার জন্য আমি পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেছি। কিন্তু এতদসত্ত্বেও অনেকের মধ্যে সেই বাহ্যিক অনুষ্ঠান প্রিয়তা এবং মূলনীতি অপেক্ষা খুঁটিনাটি ব্যাপারে গুরুত্বদানের সংক্রামক ব্যাধি তাদেরকে জর্জরিত করে দিয়েছে। জামায়াতের লোকদের দাড়ির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করার জন্য, পায়ের গিটের উপরে উঠিয়ে পায়জামা পরার জন্য এবং এই ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে চাপ দেয়ার জন্য আমাকে বারবার বলা হচ্ছে। কোনো কোনো লোক আবার ‘জামায়াতে ইসলামীতে’ ‘মারেফাতের’ অভাব অনুভব করছেন। কিন্তু মূলত মারেফাত কি জিনিস তারা নিজেরা হয়তো তা জানেন না। এজন্যই তারা আসল লক্ষ্য ও কর্মনীতি জামায়াতে ইসলামীরই ঠিক রেখে কোনো খানকাহ হতে আত্মশুদ্ধি সাধন ও আধ্যাত্মিক দীক্ষাদানের কার্যসূচী গ্রহণ করার প্রস্তাবও করছেন। এ দৃষ্টে মনে হয়, দীন ইসলামের প্রকৃত ধারণা এদের মনে আদৌ বর্তমান নেই।

একটু পূর্বেই আমি ঈমান, ইসলাম, তাকওয়া ও ইহসানের ব্যাখ্যা করেছি। এই ব্যাপারে কুরআন-হাদিসের বিপরীত কোনো কথা যদি আমি বলে থাকি, তবে অকুণ্ঠভাবে এর প্রতি অংগুলি নির্দেশ করুন। কিন্তু আপনি যদি স্বীকার করেন যে, কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী উক্ত চারটি জিনিসের মূলতত্ত্ব বর্ণিত রূপ ভিন্ন আর কিছু নয়, তবে যেখানে ঈমান তার যাবতীয় ব্যাপকতা ও গভীরতা সহকারে ফুটে ওঠেনি এবং যেখানে তাকওয়া ও ইহসানের মূল শিকড়ই বর্তমান নেই সেখানে কোনো প্রকারেই ‘মারেফাত’ (আধ্যাত্মিকতা) সন্ধান করে পাওয়া যেতে পারে না, তা আপনাদের নিজেদেরই চিন্তা করা উচিত। আর যেসব খুঁটিনাটি ও গৌণ বিষয়কে দীন ইসলামের প্রাথমিক ও মৌলিক দাবি বলে আপনারা ধরে নিয়েছেন সেগুলোর নিগূঢ় তত্ত্ব পুণরায় আমি আপনাদেরকে বলে দিচ্ছি। আমি এই দিক দিয়ে আমার সমগ্র দায়িত্বই পূর্ণরূপে পালন করতে চাই।

সর্বপ্রথম শান্ত মনে এই প্রশ্নের জবাব নির্ধারণ করুন যে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে নবী কেন প্রেরণ করেন? দুনিয়াতে কোন্‌ বস্তুর অভাব রয়েছে, এখানে কোন্‌ ত্রুটি ও দোষ রয়ে গিয়েছিল, যা দূরিভূত করার জন্য আল্লাহ নবীদের প্রেরণ করার প্রয়োজনীতা বোধ করলেন। দুনিয়ার অধিবাসীগণ দাড়ি রাখত না, তা রাখার জন্য কি আল্লাহ তায়ালা নবী পাঠিয়েছেন? কিংবা সব লোক পায়ের তালু পর্যন্ত ঝুলিয়ে পায়জামা বা লুঙ্গি পরিধান করত বলে এটা বন্ধ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নবী পাঠিয়েছেন? অথবা যেসব ‘সুন্নাত’ দেশময় প্রচলিত করার জন্য আপনারা ব্যস্ত হয়েছেন, তা যথাযথভাবে প্রতিপালিত করার জন্যই দুনিয়াতে নবীর আবির্ভাব অপরিহার্য হয়েছিল? এসব প্রশ্ন সম্পর্কে একটু গভীর দৃষ্টিতে চিন্তা করলে আপনারা সকলেই স্বীকার করবেন যে, বস্তুত এটা কোনো মৌলিক দোষ-ত্রুটি নয়, নবী আগমনেরও এটা মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না। তবে কোন্‌ মূল দোষ-ত্রুটির জন্য নবী আগমনের প্রয়োজনীয়তা হয়েছিল? এই প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তর হতে পারে এবং তা এই যে, আল্লাহর দাসত্ব বিমুখতা, ধর্মহীনতা, আল্লাহর আনুগত্য করে চলার প্রতি উপেক্ষা, নিজেদের মনগড়া নিয়ম-বিধানের অনুসরণ এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করার অনিবার্যতা সম্পর্কে অবিশ্বাস এগুলোই ছিলো দুনিয়ার মূলগত দোষ-ত্রুটি। এ কারণেই মানুষের নৈতিক চরিত্রে চরম ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। জীবনযাপনের জন্য ভ্রান্ত রীতিনীতির প্রচলন হয়েছিল, গোটা পৃথিবী চরম ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল। বস্তুত মানুষের মধ্যে আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য করে চলার অকৃত্রিম নিষ্ঠা এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করার প্রতি সন্দেহাতীত বিশ্বাস সৃষ্টি করার জন্যই দুনিয়াতে আম্বিয়ায়ে কেরাম এসেছিলেন। উন্নত নৈতিক চরিত্রের বিকাশ সাধন এবং সুষ্ঠু মূলনীতির ভিত্তিতে মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করা, মঙ্গল ও কল্যাণের স্বতস্ফূর্ত ফল্‌গুধারা প্রবাহিত করা এবং অন্যায় ও পাপের সকল উৎস বন্ধ করাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিলো। বস্তুত দুনিয়াতে নবীদের আগমনের এটাই ছিলো একমাত্র উদ্দেশ্য এবং সর্বশেষ এই বিরাট মহান উদ্দেশ্যের জন্যই এসেছিলেন সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)। এখন নবী করীমের (সা) কর্মনীতি ও পদ্ধতি যাচাই করে দেখতে হবে, দেখতে হবে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তিনি কোন্‌ ক্রমিক ও পর্যায়মূলক নীতি গ্রহণ করেছিলেন। সকলেই জানেন সর্বপ্রথম তিনি ঈমানের দাওয়াত পেশ করেছেন। অতপর এই ঈমানের অনিবার্য দাবি ও পরিণতি অনুযায়ী ক্রমশ শিক্ষা-দীক্ষাদানের সাহায্যে ঈমানদার লোকদের মধ্যে বাস্তব আনুগত্য অনুসরণ (অর্থাৎ ইসলাম), নৈতিক পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা (অর্থাৎ তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি গভীর ভালবাসা ও অকৃত্রিম নিষ্ঠা (অর্থাৎ ইহসান ইত্যাদি) গুণাবলী ফুটিয়ে তুলেছেন। এরপরই এই নিষ্ঠাবান ঈমানদার লোকদের সংগঠিত চেষ্টা ও সাধনার সাহায্যে প্রাচীন জাহেলী যুগের অস্বাভাবিক ও ক্ষয়িষ্ণু জীবন-ব্যবস্থাকে নির্মূল করে তদস্থলে আল্লাহর বিধানের নৈতিক ও তামাদ্দুনিক মূলনীতিসমূহের ভিত্তিতে এক নির্মল সুষ্ঠু ও সত্যতাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এভাবে এসব লোকই যখন নিজেদের মন, মস্তিষ্ক, নৈতিক চরিত্র, চিন্তাধারা ও কাজ-কর্ম সকল দিক দিয়েই প্রকৃত মুসলিম, মুত্তাকী ও মুহসিন হলো এবং আল্লাহ খাঁটি নিষ্ঠাবান বান্দাহদের প্রকৃতিই যে কতর্ব্য পালন করা উচিত তাতে নিযুক্ত হলো তারপরই বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, কাটছাঁট পোশাক পরিচ্ছদ উঠাবসা, চলাফিরা এবং এভাবে অন্যান্য বাহ্যিক কাজ-কর্মসমূহের মধ্যে মুত্তাকীদের শোভাবর্ধক ভদ্রতামূলক নিয়মনীতির শিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। অন্য কথায় সর্বপ্রথম তিনি কাঁচা তামাকে উজ্জল বিশুদ্ধ স্বর্ণে পরিণত করেছেন, তারপর তার ‘আশরাফীর’ (আরবিয় স্বর্ণ মুদ্রা) ছাঁচ বা নকশা অংকিত করেছেন) প্রথমে খাঁটি যোদ্ধা ও বীর সৈনিক তৈয়ার করেছেন, তারপরই তাকে পোশাক পরতে দিয়েছেন। বস্তুত কুরআন-হাদিসের গভীর ও সুক্ষ্ন অধ্যয়ন করার পর নিঃসন্দেহে জানা যায় যে, ইসলামী আন্দোলনের এটাই একমাত্র সঠিক পন্থা এটাই হচ্ছে এ কাজের পর্যায়মূলক ক্রমিক ধারা। নবী করীম (সা) আল্লাহ তায়ালার মর্জি অনুযায়ী যে পন্থায় কাজ করেছিলেন সেই পন্থা অনুসরণকেই যদি ‘সুন্নাত’ পালন মনে করা হয় তবে উক্ত কর্মনীতি অনুযায়ী কাজ করাই সুন্নাত বলতে হবে এবং এ জন্যই লোকদেরকে প্রকৃত মু’মিন, মুসলিম, মুত্তাকী মুহসীন এ পরিণত না করে তাদেরকে মুত্তাকীদের বাহ্যিক পোশাক ও চাল-চলন অনুসারী এবং মুহসীনদের কতোকগুলো প্রসিদ্ধ ও সর্বজনপ্রিয় কাজের অনুকরণকারী বানাতে চেষ্টা করা কোনোক্রমেই ‘সুন্নাত’ হতে পারে না। শুধু তাই নয়, এটা সুন্নাতের স্পষ্ট বিরোধীতা, ‘সুন্নাতের’ নামে মনগড়া নীতির প্রচার ; তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এটা ঠিক সীসা ও তামা খণ্ডের উপর ‘আশরাফীর’ নকশা অংকিত করে বাজারে চালাবার অপচেষ্টা এবং সৈনিকতা, নিষ্ঠা, আত্মোৎসর্গীকৃত মনোভাব সৃষ্টি না করেই নিছক উর্দী পরা কৃত্রিম যোদ্ধাকে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড় করানোর অনুরূপ নির্বুদ্ধিতামূলক কাজ। আমার মতে এটা প্রকাশ্য জাল ও প্রতারণামূলক কৃত্রিমতা ভিন্ন আর কিছুই নয়। আর বস্তুত পক্ষে এই জাল ও কৃত্রিমতার ফলেই বাজারেও যেমন এই কৃত্রিম মুদ্রার কোনোই মূল্য নেই, যুদ্ধক্ষেত্রেও এই কৃত্রিম ও প্রদর্শনীমূলক সৈনিক দ্বারা কোনো কঠিন সংগ্রাম পরিচালনা করাও সম্ভব হচ্ছে না।

আল্লাহর নিকট যে কোনো বস্তুর প্রকৃত মূল্য কি হবে তাও চিন্তা করে দেখতে হবে। মনে করুনঃ এক ব্যক্তির অকৃত্রিম ঈমান আছে, কর্তব্যজ্ঞান আছে, উন্নত নির্মল চরিত্রের গুণে সে গুণান্বিত, আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহ রক্ষা করে চলে, আল্লাহর আনুগত্য ও ঐকান্ত্রিক নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ; কিন্তু বাহ্যিক বেশ-ভুষার দিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ এবং বাহ্যিক সভ্যতার মানদণ্ডে পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ হতে পারে না। এটাকে খুববেশি খারাপ বললেও শুধু এতোটুকু বলা যেতে পারে যে “চাকরটি আসলে ভালো, কিন্তু একটু অসভ্য এই যা।” তার এই ‘অসভ্যতা’র দরুন হয়তো সে উচ্চতম মর্যাদা লাভ করতে পারবে না। কিন্তু শুধু এতোটুকু অপরাধের দরুনই কি তার সকল নিষ্ঠা ও আনুগত্য নিষ্ফল হয়ে যাবে? এবং কেবল উত্তম বেশ-ভূষায় সম্পন্ন না হওয়ার অপরাধেই তার মনিব তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে? এটাকি কোনো মতেই বিশ্বাস করা যায়? মনে করুনঃ অন্য এক ব্যক্তির কথা, সে সবসময়ই শরীয়তী পোশাক পরিধান করে থাকে এবং সভ্যতার আচার অনুষ্ঠান ও আদব-কায়দা যারপরনাই সতর্কতা ও দৃঢ়তার সাথে পালন করে চলে, কিন্তু তার নিষ্ঠা ও আনুগত্যের বিশেষ অভাব রয়েছে তার কর্তব্যজ্ঞান জাগ্রত নয়, তার ঈমানী মর্যাদাবোধেও তেজস্বী নয় এমতাবস্থায় তার এই আভ্যন্তরীণ দোষ-ত্রুটির বর্তমানে আল্লাহর নিকট তার বাহ্যিক বেশ-ভূষার কতোখানি মূল্য হতে পারে। বস্তুত এটা জটিল ও গভীর আইনগত ব্যাপার নয়, যা বুঝার জন্য বড় বড় কিতাব সন্ধান করে বেড়াতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষ নিজেই সাধারণ জ্ঞান দ্বারাই বুঝতে পারে, এ দু’টি জিনিসের মধ্যে প্রকৃত মর্যাদা কোন্‌টি হতে পারে ? দুনিয়ার কম বুদ্ধিমান লোকদের মধ্যেও একটা জ্ঞান থাকে এবং প্রকৃতপক্ষে যে জিনিসটি সন্ধান পাওয়ার যোগ্য, আর যেটির সৌন্দর্য মৌলিক নয় এই দু’টির মধ্যে তারাও পার্থক্য করতে পারে। ভারতের অধুনালুপ্ত ইংরেজ সরকার এই ব্যাপারে একটি চমৎকার উদাহরণ। এরা যে কতো বাবু ও ফেশনপ্রিয় এবং বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের জন্য এরা যে কতো প্রাণ দিয়ে থাকে তা সর্বজনবিদিত, কিন্তু তাদের নিকট প্রকৃত মূল্য ও মর্যাদা কোন জিনিসটি পেয়ে থাকে, তা ভেবে দেখেছেন কি? যে সামরিক কর্মচারী তাদের রাষ্ট্রের বিজয় পতাকা উড্ডীন রাখার জন্য নিজের মন, মস্তিষ্ক ও দেহ-প্রাণের সকল শক্তি ব্যয় করতো এবং আসল সংকট সময়ে সে জন্য কোনোরূপ আত্মদানে কুণ্ঠিত হতো না, ঠিক তাকেই তার মর্যাদা দান করতো উচ্চতম পদে তাকেই অভিষিক্ত করতো। বাহ্য দৃষ্টিতে সে শত অসভ্য গোঁয়ার, অমুন্ডিতশ্মশ্রু বিশিষ্ট, বেকায়দায় পোশাক পরিহিত পানাহারে অনিয়মিত ও কৃতকার্যে অপটু হোক না কেন, তাতে তার পদোন্নতির কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি হতো না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বিলাসপ্রিয়, সভ্যতা এবং সমাজের সর্বজনপ্রিয় রীতিনীতিগুলোর পূর্ণমাত্রায় অনুসরণকারী কিন্তু আনুগত্য ও আত্মোৎসর্গের ব্যাপারে পশ্চাদপদ এবং আসল কাজের সময় নিজের সুযোগ-সুবিধাগুলোর প্রতিই বিশেষ লক্ষ্য রাখে, ইংরেজগণ তাকে কোনো সম্মানিত পদ দেয়া তো দুরের কথা, তাকে কোট মার্শাল করতেও দ্বিধাবোধ করতো না। দুনিয়ার সামান্য বুদ্ধিবিশিষ্ট লোকদের যখন এরূপ অবস্থা তখন আল্লাহ সম্পর্কে কি ধারণা করা যায়? তিনি স্বর্ণ ও তামার পার্থক্য না করে শুধু বাহ্যিক নকশা ছাঁচ দেখে এতে স্বর্ণ মুদ্রার মূল্য দান করবেন? আল্লাহ সম্পর্কে এরূপ ধারণা করা কি কোনো মতেই সমীচীন হতে পারে?

আমি আবার বলব, আমার একথা হতে মনে করবেন না যে, আমি মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে চাচ্ছি, কিংবা মানব জীবনের বাহ্যিক দিকসমূহের সংশোধন ও সুষ্ঠুতা বিধানের জন্য প্রবর্তিত বিধি-নিষেধসমূহ পালন করা অপ্রয়োজনীয় প্রমাণ করতে চাচ্ছি এটা মাত্রই সত্য নয়। আমি বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ ও রসূলের প্রত্যেকটি হুকুমই যথাযথ ভাবে পালন করা প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিরই অবশ্য কতর্ব্য। আর দীন ইসলাম মানুষের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় দিককেই সুন্দর ও সুষ্ঠু করে গঠন করতে চায়, তাও আমি পূর্ণরূপে স্বীকার করি কিন্তু এটা সত্ত্বেও আমি শুধু একথাই আপনাদের বুঝাতে চেষ্টা করছি যে, মানুষের আভ্যন্তরীণ দিকই মূখ্য ও সংস্কারযোগ্য বাহ্যিক দিক সেরূপ নয়। প্রথমে মানুষের মূল সত্যের মণিমঞ্জুষা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে হবে তারপর এই আভ্যন্তরীণ দিক অনুসারেই তার বাহ্যিক দিককেও গঠন করতে হবে। আল্লাহর নিকট যেসব গুণের প্রকৃত মূল্য রয়েছে এবং যে গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধন ও ক্রমবিকাশ দানই ছিলো আম্বিয়ায়ে কেরামের আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য, সর্বপ্রথম সেগুলোর দিকেই দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে এবং সর্বাগ্রে তা অর্জন কতে হবে। পরন্তু বাহ্যিক দিকের সংস্কার প্রথমত উক্ত গুণাবলীর অনিবার্য পরিণাম স্বভাবতই সম্পন্ন হবে তার পরও কোনো অসম্পূর্ণতা থাকলে ক্রমিক অধ্যায়সমূহ অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গেই তা পূর্ণতা লাভ করবে, তাতে সন্দেহ নেই।

শারীরিক অসুস্থতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও আমি এই দীর্ঘ বক্তৃতা আপনাদের সামনে করলাম শুধু এ জন্যই যে, প্রকৃত সত্য কথা পরিপূর্ণতা ও ব্যাপকতার সাথে আপনাদের সামনে সুস্পষ্টরূপে পেশ করে আল্লাহর নিকট আমি সকল দায়িত্ব হতে মুক্তিলাভ করতে চাই। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই কার আয়ূ কখন শেষ সীমান্তে এসে পৌঁছবে, তা কেউ জানে না, কেউ বলতেও পারে না। এজন্য সত্যের বাণী পৌঁছাবার যতোখানি দায়িত্ব আমার উপর রয়েছে, আমি তা যথাযথভাবে পৌছাতে চাই। এখনো কোনো কথা অস্পষ্ট বা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ থেকে গেলে জিজ্ঞেস করে নিন এবং সত্যের বিপরীত কোনো কথা আমি বলে থাকলে আপনারা তার প্রতিবাদ করুন। আর প্রকৃত সত্য কথা যথাযথভাবে আপনাদের নিকট যদি আমি পৌছিয়ে থাকি, তবে আপনারা তার সাক্ষ্য দিন। (সভাস্থল হতে ধ্বনি উঠলোঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি) আমার এই দায়িত্ব পালনের আপনারাও সাক্ষী থাকুন আল্লাহও যেন সাক্ষী থাকেন। আমি দোয়া করছি। আল্লাহ আপনাদেরকেও আমাকে দীন ইসলামের নিগূঢ় সত্য হৃদয়ঙ্গম করার তওফীক দিন এবং জ্ঞান অনুযায়ী দীন ইসলামের সমগ্র দাবি পূরণের তদনুযায়ী জীবন ও যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দেয়ার ক্ষমতাও দান করুন। আমীন।

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • You may use [inline:xx] tags to display uploaded files or images inline.

More information about formatting options

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

ফেসবুক ফ্যান


সাম্প্রতিক মন্তব্য

পড়া লেখা

নতুন সদস্য

  • Tasria
  • Naimul Islam
  • omarfarukbdin
  • mukul1942
  • Zakaria Ahmed
  • Maidul_Islam
  • smhusain.2002
  • rinkufahad
  • Ali Jinnah
  • Tarifdu

অনলাইনে আছেন

There are currently 0 users and 9 guests online.