মানব জীবনের জটিল সমস্যাবলী সম্পর্কে সামান্য মাত্র জ্ঞানও যার আছে, এই নিগূঢ় সত্য সম্পর্কে সে ভাল করেই অবহিত হবে যে, মানব সমাজের যাবতীয় ব্যাপারের কর্তৃত্ব ও চাবিকাঠি কার হাতে নিবদ্ধ --এই প্রশ্নের উপরই মানব জীবনের শান্তি, স্বস্তি, নিরাপত্তা এবং ভাঙ্গন-বিপর্যয় ও অধপতন একান্তভাবে নির্ভর করে। গাড়ি যেমন সব সময় সেই দিকেই দৌড়িয়ে থাকে যে দিকে তার পরিচালক --ড্রাইভার চালিয়ে নেয় এবং তার আরোহীগণ ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক --সেই দিকেই ভ্রমন করতে বাধ্য হয়; অনুরূপভাবে মানব সমাজের গাড়ীও ঠিক সেই দিকে অগ্রসর হয়ে থাকে যেদিকে তার নেতৃবৃন্দ ও কর্তৃত্বশীল লোকেরা নিয়ে যায়। পৃথিবীর সমগ্র উপায়-উপাদান যাদের করায়ত্ব হয়ে থাকবে; শক্তি, ক্ষমতা, ইখতিয়ারের সব চাবিকাঠি যাদের মুঠির মধ্যে থাকবে, সাধারণ জনগণের জীবন যাদের হাতে নিবদ্ধ হবে, চিন্তাধার, মতবাদ ও আদর্শের রূপায়ণ-বাস্তবায়নের জন্যে অপরিহর্য উপায়-উপাদান যাদের অর্জিত হবে, ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্র পুনর্গঠন, সমষ্টিগত নীতি-ব্যবস্থার বাস্তবায়ন এবং নৈতিক মূল্য (Values) নির্ধারণের ক্ষমতা যাদের রয়েছে, তাদের অধীন জীবনযাপনকারী লোকগণ সমষ্টিগত ভাবে তার বিপরীত দিকে কিছুতেই চলতে পারেনা।
এই নেতৃবৃন্দ ও কর্তৃত্বশীল লোকগণ --যদি আল্লাহর অনুগামী, সৎ ও সত্যাশ্রয়ী হয়, তবে সেই সমাজের লোকদের জীবনের সমগ্র গ্রন্থী ও ব্যবস্থাই আল্লাহভীতি, সার্বিক কল্যাণ ও ব্যাপক সত্যের উপর গড়ে উঠবে। অসৎ ও পাপী লোকও সেখানে সৎ ও পুন্যবান হতে বাধ্য হবে । কল্যাণ ও সৎ ব্যবস্থা এবং মঙ্গলকর রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, উৎকর্ষ ও বিকাশ লাভ করবে। অন্যায় ও পাপ নিঃশেষে মিটে না গেলেও অন্তত তা উন্নতিশীল এবং বিকশিত হতে পারবে না। কিন্তু নের্তৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি আল্লাহদ্রোহী, ফাসেক, পাপী ও পাপলিপ্সু লোকদের করায়ত্ত হয়, তবে গোটা জীবনব্যবস্থায়ই স্বতস্ফুর্তভাবে আল্লাহ দ্রোহিতা জুলম, অন্যায়, অনাচার ও অসচ্চরিত্রতার পথে চলতে শুরু করবে। চিন্তাধারা আদর্শ ও মতবাদ জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-শিল্প ও রাজনীতি, অর্থনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান, নৈতিক চরিত্র ও পারষ্পরিক কাজকর্ম বিচার ও আইন-সমষ্টিগতভাবে এ সবকিছুই বিপর্যস্ত হবে । অন্যায় ও পাপ ফুলে-ফলে সুশোভীত হবে। কল্যাণ, ন্যায় ও সত্য পৃথিবীর কোথাও একবিন্দু খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবী ন্যায় ও সত্যকে স্থান দিতে, বায়ু ও পানি তার লালন-পালন করতে অস্বীকার করবে।
আল্লাহর এই পৃথিবী অত্যাচার জুলুম, শোষণ ও নিপীড়ন-নিষ্পেষণের সয়লাব স্রোতে কানায় কানায় ভরে যাবে। এরূপ পরিবেশে অন্যায়ের পথে চলা সকলের পক্ষেই সহজ হবে। ন্যায় ও সত্যের পথে চলা-চল নয় শুধু দাঁড়িয়ে থাকাও হবে অত্যন্ত কঠিন। একটি জনাকীর্ণ মিছিলের সমগ্র জনতা যেদিকে চলে সেদিকে চলার জন্য উক্ত মিছিলের অন্তর্ভুক্ত কোন ব্যক্তির পক্ষে বিশেষ শক্তি ব্যয় করতে হয় না, ভিড়ের চাপেই সে স্বতই সম্মুখের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, কিন্তু তার বিপরীত দিকে চলার জন্য প্রবল শক্তি ব্যয় করে এক কদম পরিমান স্থান অগ্রসর হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এরূপ অবস্থায় বিপরীতদিকে সামান্য চললে ভিড়ের প্রবল ও অপ্রতিরোধ্য চাপে দশ কদম পশ্চাতে সরে পড়তে বাধ্য হয় --এটা এক স্বতসিদ্ধ ও সর্বজনবিদিত সত্য। মানুষের সমষ্ঠিগত জীবনের ধারা যখন অসৎ ও পাপাশ্রয়ী লোকদের নেতৃত্ব কুফরী ও ফাসেকী পথে অগ্রসর হতে থাকে, তখন (উপরোক্ত উদাহরণের ন্যায়) স্বতন্ত্রভাবে ব্যক্তিদের পক্ষে অন্যায়ের পথে চলা তো খুবই সহজ --এতই সহজ হয় যে, সেদিকে চলার জন্য নিজের কোন শক্তি ব্যয় করতেই হয় না --কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে চলতে চাইলে নিজের দেহ-মনের সমগ্র শক্তি নিয়োজিত করেও তার পক্ষে ন্যায় পথে দৃঢ় হয়ে থাকতে পারলেও সমষ্টিগতভাবে তার জীবন মানব সমষ্টির অনিবার্য চাপে পাপ ও অন্যায়ের পথেই চলতে বাধ্য হয়।
এখানে আমি যা বলছি তা এমন কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত নয়, যার সত্যতা প্রমান করার জন্য কোন যুক্তিতর্কের আবশ্যক হতে পারে। বাস্তব ঘটনা প্রবাহই একে অনস্বীকার্য সত্যে পরিণত করেছে। কোন সুস্থ দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিই এর সত্যতা স্বীকার না করে পারে না। এই বইয়ের প্রত্যেক পাঠকই আমার উক্ত কথার সত্যতা যাচাই করতে পারেন। বিগত এক শতাব্দীকালের মধ্যে আমাদের এই দেশের লোকদের মতবাদ, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভংগী রূচি ও স্বভাব-প্রকৃতি, চিন্তা- পদ্ধতি ও দৃষ্টিকোণ গভীরভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে, সভ্যতা ও চরিত্রের মানদণ্ড এবং মূল্য ও গুরুত্বের মাপকাঠি বদলে গেছে। আমাদের একটি জিনিসও অপিরিবর্তিত থাকতে পারেনি। এই বিরাট পরিবর্তন আমাদের এই দেশে আমাদেরই দৃষ্টির সম্মূখে সাধিত হলো। মূলত এর কি কারণ হতে পারে, তা কি একবারও ভেবে দেখেছেন ? আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, এর একটি মাত্র কারন রয়েছে আর আপনিও যতই চিন্তা করেন, এছাড়া অন্য কোন কারণ নির্ধারণ করা আপনার পক্ষেও সম্ভব হবে না। এর একটি মাত্র কারণ রয়েছে আর আপনিও যতই চিন্তা করেণ সে কারণ শুধু এটাই যে, যেসব লোকের হাতে এদেশের সর্বময় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব নিবদ্ধ ছিল- সমাজ পরিচালন ও দেশ শাসনের ক্ষমতা - ইখতিয়ার যাদের করায়ত্ত ছিল তারাই সমগ্র দেশের নৈতিক চরিত্র, মনোবৃত্তি, মনস্তত্ব, কাজকর্ম ও পারষ্পারিক লেন -দেন ও আদান-প্রদান এবং সমাজ - সংস্থা ও ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরুপে নিজেদের ইচ্ছা ও রুচি অনুসারেই ঢেলে গঠন করেছিলো । এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করার জন্য যেসব শক্তি মস্তক উত্তোলন করেছিলো, তারা কতখানি সাফল্য লাভ করতে পেরেছে, আর ব্যর্থতা তাদেরকে কতখানি অভিনন্দিত করেছে, তাও একবার গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। একথা কি সত্য নয় যে, পরিবর্তন বিরোধী আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে যারা নেতৃত্ব দান করেছেন, তাদেরই সন্তান অধস্তন পুরুষ শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন স্রোতের গড্ডালিকা প্রবাহে তৃণখন্ডের ন্যায় ভেসে গেছে ?
বহির্বিশ্বের যাবতীয় বিবর্তিত রীতিনীতি, আচার – অনুষ্ঠান ও ধরন - পদ্ধতি সবকিছুই তাদের ঘরবাড়ী নিমজ্জিত করে দিয়েছে ? এটা কি কেউ অস্বীকার করতে পারে যে, অসংখ্য সম্মানিত ধর্ম নেতার বংশে আজ এমনসব লোকের জম্ম হচ্ছে, যারা আল্লাহর অস্তিত্ব এবং অহী ও নবুয়াতের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রবল সন্দেহ পোষণ করছে ? জাতীয় জীবনের এই বিরাট বিপর্যয় এই বাস্তবতা পর্যবেক্ষনণ ও অভিজ্ঞতার পরও কি একথা অস্বীকার করা যায় যে, মানব জীবনের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে নেতৃত্বের সমস্যাই হচ্ছে সবচেয়ে জটিল এবং সর্বধিক গুরুত্বপূর্ণ। আর সত্যকথা এই যে, এই জিনিসটির এহেন গুরুত্ব কেবল বর্তমানেই তীব্র হয়ে দেখা দেয়নি, এটা এক চিরন্তন সত্য ও চিরকালীন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার । “জনগণ নেতৃবৃন্দেরই আদর্শানুসারী হয়ে থাকে” কথাটি বহু পুরাতন। হাদীস শরীফে জাতীয় উখান - পতন, গঠন ও ভাংগনের দায়ী করা হয়েছে জাতীসমূহের আলেম, পন্ডিত. শিক্ষিত লোক এবং নেতৃবৃন্দকে। কারণ, সমাজের নের্তৃত্ব ও পথপ্রদর্শনের গুরুদায়িত্ব চিরদিনই এদের উপর অর্পিত হয়ে থাকে।
Post new comment