c . দ্বিতীয় দফা : সুদ উচ্ছেদ

সমাজ হতে দুর্নীতির অবসান ও জুলুমতন্ত্রের বিলোপ সাধনের উদ্দেশ্যে সর্ব প্রথম ও সর্বপ্রধান যে মোক্ষম আঘাতটি হানা হয়েছে তা হচ্ছে সুদের উচ্ছেদ। সুদ ও সুদভিত্তিক সমস্ত কারবার ও লেনদেন চিরকালের জন্যে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে-
আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।

সূরা আল বাকারাহ : ২৭৫ আয়াত

রাসূলে কারীম (সা) বলেন-

তোমাদের মধ্যে যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের হিসাব লেখে এবং সুদের সাক্ষ্য দেয় তারা সবাই সমান পাপী।
তিরমিযী, মুসলিম

ইসলামী অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় যাবতীয় অসৎ কাজের মধ্যে সুদকে সবচেয়ে পাপের জিনিস বলে গণ্য করা হয়েছে। বস্তুত : সুদের মতো সমাজবিধ্বংসী অর্থনৈতিক হাতিয়ার আর দুটি নেই। সুদের কুফলগুলির প্রতি একটু লক্স্য করলেই বোঝা যাবে কেন চিরতরে হারাম ঘোষিত হয়েছে।

সমাজ শোষণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম : একদল লোক বিনাশ্রমে অন্যের উপার্জনে ভাগ বসায় সুদের সাহায্যেই। ঋণগ্রহীতা যে কারণে টাকা ঋণ নেয় সে কাজে তার লাভ হোক বা না হোক সুদের অর্থ তাকে শোধ করতেই হবে। এর ফলে বহু সময়ে ঋণগ্রহীতাকে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে হলেও সুদসহ আসল টাকা পরিশোধ করতে হয়। সুদ গ্রহীতারা হচ্ছে সমাজের পরগাছা। এরা অন্যের উপার্জন ও সম্পদে ভাগ বসিয়ে জীবন যাপন করে। সমাজের প্রত্যক্ষে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এদের কোন অবদান থাকে না।

দরিদ্র আরও দরিদ্র এবং ধনী আরও ধনী হয় :

দরিদ্র অভাবগ্রস্থ মানুষ সাহায্যের কোন দরজা খোলা না পেয়ে, উপায়ন্তর না দেখে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। সেই ঋণ অনুৎপাদনী দুরকম কাজেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিশেষ করে অনুৎপাদনী কাজচে ঋণের অর্থ ববহারের ফলে তার ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাই লোপ পায়। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে করযে হাসানার কোন সুযোগ না থাকায় অনুৎপাদনী খাতে তো দূরের কথা, উৎপাদনী খাতেও বিনা সুদে ঋণ মেলে না। বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো তাকে সুদ শোধ করতে হয়। ফলে সে তার শেষ সম্বল যা থাকে তাই বিক্রি করে উত্তমমর্ণের ঋণ শুধরে থাকে। এই বাড়তি অর্থ পেয়ে উত্তমর্ণ আরও ধনী হয়। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকে সামাজিক শ্রেণী বৈষম্য।

ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় :

কৃষকেরা ফসল ফলাবার তাগিদে নিজেরা খেতে না পেলেও ঋণ করে জমি চাষ করে থাকে। এই ঋণ শুধু যে গ্রামের মহাজনের কাছে থেকেই নেয় তা নয়, বিভিন্ন এনজিও ও সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকেও নেয়। যথোপযুক্ত বা আশানুরূপ ফসল হওয়া সব সময়েই অনিশ্চিত। তাছাড়া, প্রকৃতিক দুর্বিপাক তো রয়েছেই। যদি ফসল আশানুরূপ না হয় বা প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের ফলে ফসল খুবই কম হয় বা মোটেই না হয় তবু কিন্তু কৃষককে নির্দিষ্ট সময়ান্তে সুদসহ ঋণ শোধ করতে হবে। তা না পারলে কি মহাজন, কি ব্যাংকে-সকলেই আদালতে নালিশ ঠুকে কৃষকের সহায়-সম্পত্তি ক্রোক করিয়ে নেবে। নীলামে চড়াবে দেনার দায়ে। এভাবেই বিশ্বের সমস্ত পুঁজিপতি দেশে ক্ষুদ্র চাষীরা ক্রমেই ভূমিহীন চাষী হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশ তার ব্যতিক্রম নয়।

দ্রব্যমূল্য ক্রমেই বৃদ্ধি পায় :

সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী উৎপাদন খরচের উপর পরিবহন খরচ, শুল্ক (যদি থাকে) এবং স্বাভাবিক মুনাফা যোগ করে পণ্যসামগ্রীর বিক্রি মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু সুদভিত্তিক অর্থনীতিতে দ্রব্যের এই স্বাভাবিক মূল্যের উপর উপর্যুপুরি সুদ যোগ করে দেওয়া হয়। দ্রব্যবিশেষের উপর তিন থেকে চারবার পর্যন্ত ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশীবার সুদ যোগ হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের দেশের বস্ত্রশিল্পের কথাই ধরা যেতে হয়। এই শিল্পের তুলা আমদানীর জন্য আমদানীকারকের কাছ হতে ব্যাংকে দেয় ঋণের জন্যে যে সুদ নেয় তা যুক্ত হয় তুলার উপর। ঐ তুলা থেকে সূতা তৈরীর সময়ে বস্ত্রকল যে ঋণ নেয় তার সুদও যুক্ত হয় কাপড়ের উপর। এরপর কাপড়ের পাইকারী বিক্রেতা তার ব্যবসার উদ্দেশ্যে যে ঋণ নেয় তার সুদও যোগ করে ঔ কাপড় যখন খুচরা দোকানে আসে, বা প্রকৃত ভোক্তা ক্রয় করে তখন সে আসল মূল্যের চেয়ে বহু গুণ বেশী করে দিয়ে থাকে। এমনিভাবে সমাজে দৈনন্দিন জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির প্রত্যেকটিতেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুদ জড়িয়ে আছে। নিরুপায় ভোক্তাকে বাধ্য হয়েই সুদের জন্যে সৃষ্ট এই চড়া মূল্য দিতে হয়। কারণ, সুদনির্ভর অর্থনীতিতে এছাড়া তার গত্যন্তর নেই। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনীতির জন্যে সুদ কত মারাত্মক।

এরই বিপরীতে ইসলামী অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা হলে বিনিয়োগের জন্যে যেমন অর্থের অব্যাহত চাহিদা থাকবে তেমনি সঞ্চয়ের সদ্ব্যবহার হবে। ফলে নতুন নতুন কল-কারখানা স্থাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের মাধ্যমে অধিক উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সম্পদের পূর্ণবন্টন ঘটবে। তাছাড়া প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। একচেটিয়া কারবার হ্রাস পাবে। অতি মুনাফার সুযোগ ও অস্বাভাবিক বিনিয়োগ প্রবণতা দূর হবে। এই সমস্ত উদ্দেশ্য সাধন ও সব ধরনের শোষণের পথ বন্ধ করে দেবার উদ্দেশ্যেই ইসলামে সুদকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • You may use [inline:xx] tags to display uploaded files or images inline.

More information about formatting options

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

ফেসবুক ফ্যান


সাম্প্রতিক মন্তব্য

পড়া লেখা

নতুন সদস্য

  • Beeboutcell
  • saifulalam21
  • sohail.ahsan
  • meardoleandor
  • biplob.haque
  • ladislavapene44
  • melrkdmopo
  • lepelerorm
  • mehelroler
  • filipaurelia91

অনলাইনে আছেন

There are currently 0 users and 16 guests online.