আল মাহমুদের মুখোমুখি

প্রেক্ষণ : আপনি একসময় ঢাকাকে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী বলে ঘোষণা করেছিলেন । সম্প্রতি আবার সে কথা অস্বীকার করেছেন একটি কলামে । ব্যাপারটি কি আমাদের আরেকটু পরিস্কার করে বলবেন ?
আল-মাহমুদ : আসলে বাংলা কবিতার এখন যে পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে , সেটা আমি বিশ্লেষণ করতে চেয়েছি । বাংলা কবিতায় এই মুহূর্তে একটা রিপিটেশন দেখতে পাচ্ছি । মনে হচ্ছে “তুমি” ছাড়া কবিরা আর কোন বিষয় খুঁজে পাচ্ছেনা । ঠিক আছে , “তুমি” একটা বিষয়; কিন্তু এর কোন এনথ্রোপলজি আমি খুঁজে পাইনা , “তুমি” একটি মেয়ে অথবা “তুমি” একটি ছেলে , এ দুটির খুপিনাটি বর্ণনা , এ দুটির অবস্থান এবং গ্রহণযোগ্যতা দেশ-কালের মধ্যে যদি স্থান করতে পারতো , তাহলে এর স্বার্থকতা খুঁজে পেতাম । তো, বাংলা কবিতা মানে বাংলাদেশের কবিতার এই যে প্রেক্ষিত, এটা আমি বিশ্লেষণ করতে চেয়েছি ।
বাংলাদেশে নিশ্চয়ই সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রে ভালো কাজ হচ্ছে । সব খবর তো আর আমি রাখি না । তবে, যেহেতু কবিতা আমার প্রিয় বিষয় , সেহেতু কবিতার ব্যাপারটি বিশেষ করে বলতে চাই । সবক্ষেত্রে বেশি শুঁকে , বেশি হাতড়ে বেড়াতে চাইনা । তার মানে ; এটা আমি বলতে চাইনা যে, কেউ কিছু লিখতে পারছে না । আমি অস্বীকার করতে পারিনা । আমার বয়স হয়েছে । আমার মধ্যে চিন্তার স্থবিরতা হয়তো আছে । এটা আমি অস্বীকার করিনা ।
প্রেক্ষণ : কলকাতায় বাংলাভাষা এখন মরনোন্মুখ । সেখানকার ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে ক্রমেই বাংলাভাষা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে । কয়েক বছর আগে কবি মতিউর রহমান মল্লিক পশ্চিমবঙ্গ সফর করে এসে একটি ছড়ায় লিখেছেন , “কবিগুরুর কলকাতাতে/বাংলা ভাষা হাওয়া / বাংলা কথা বলার মত / যায়না মানুষ পাওয়া ” সম্প্রতি এদেশের কয়েকটি টিভি চ্যানেল বাংলা ভাষা চর্চার হালচাল নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করেছে । তাতেও একই চিত্র ভেসে উঠেছে । । বিষয়টি সম্পর্কে আমরা আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই ।
আল-মাহমুদ : এটা আমার কাছে অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় । এখানে আমি আমার একটা বিষ্ময়ের কথা বলি । সম্প্রতি কলকাতা থেকে শ্যামল কান্তি সম্পাদিত “কবি সম্মেলন” বলে একটা কাগজ আমার ওপর একটা প্রবন্ধ ছেপেছে । মজার ব্যাপার হলো , আমাকে যে মৌলবাদী বলা হয়, সেখানে তার ঘোর বিরোধীতা করা হচ্ছে ।
আমার মনে হচ্ছে, কলকাতায় বাংলা ভাষার প্রতি যে উৎসাহহীনতা এটার একটা প্রতিক্রিয়া আজ না হোক, কাল শুরু হবেই । এই শুরুটা ঠেকানোর ব্যাপারটা পশ্চিমবঙ্গ বর্তমান শাসকসম্প্রদায়ের জন্য দারুন অস্বস্তির কারন হবে ।
আমার নিজের ধারনা , বাংলা ভাষার প্রতি যে অবজ্ঞা ও অবহেলা কলকাতায় সৃষ্টি হয়েছে তা ওখানকার বাংলা ভাষার মূল প্রতিষ্ঠান , শান্তি নিকেতন , বিশ্বভারতী কিংবা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও বলা যায় , তারা সহজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিবে না । । অন্যদিকে , বাংলাদেশের প্রতি পশ্চিমবঙ্গেও বাঙালী মাত্রই একটা দরদ সৃষ্টি হয়েছে । তারা সেটা বুকে চেপে রাথখে বটে , কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ যখন ঢাকায় আসে , ফেব্রুয়ারী মাসে, তখন তাদের আবেগ থেকে, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের উদ্দ্বীপনা থেকে আমরা আন্দায করতে পারি ।
প্রেক্ষণ : সামগ্রীকভাবে বাংলাদেশে বাংলা কবিতার যে চর্চা হচ্ছে , আর মধ্যে একটা বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে । আগে যেমন ঢাকা কবিতার কেন্দ্র ছিলো , সেটা এখন আর সেরকম থাকছে না ; বরং উল্টোটি ঘটছে বলেই আমার মনে হয় । ঢাকায় থেকে সত্যিকার কবিতা লেখা মনে হয় কঠিন হয়ে পড়েছে । বিভিন্ন জেলা শহর , বিভাগীয় শহরগুলোতে বসে অনেকেই দুর্দান্ত সব কবিতা লিখছেন । বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন ?
আল-মাহমুদ : এটা নিয়ে আমি অবশ্য খুব চিন্তা করার অবকাশ পাইনি । তবু যারা ঢাকার বাইরে থেকে উল্ল্যেখযোগ্যভাবে বাংলা ভাষায় কাব্যচর্চা করেছে, আমার ধারনা তারা অচিরেই নিজেদের প্রকাশের , জানার ও জানান দেয়ার একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে ।
প্রেক্ষণ : বহুজাতিক কোম্পানীগুলো আমাদের দেশে যে ভূমিকা রাখছে , তাতে করে আমরা একটা সাংস্কৃতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছি । তারা নানা ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করছে , নানা ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে । এসবের অধিকাংশই আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না । আপনার কাছে ব্যাপারটি কেমন মনে হচ্ছে ?
আল-মাহমুদ : এটাতো আমার কাছে খুবই বিশিষ্ট ব্যাপার মনে হচ্ছে না । আমাদের এখানকার সংস্কৃতির মানসিকতা হচ্ছে পরান্নভোজী ।
প্রেক্ষণ : আপনি কবিতার ব্যাপারে বলেছেন যে , আমাদের কবিতায় একটা রিপিটেশন চলছে । তো, এটা কেন হচ্ছে ? কবিতা কেন এই ঘোর-প্যাচ থেকে বের হতে পারছে না ?
আল-মাহমুদ : এখানে দেখতে হবে যে , কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্র হচ্ছে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পৃষ্ঠা । পৃষ্ঠাগুলো সম্পাদনা করে কারা ? যারা পৃষ্ঠাগুলো সম্পাদনা করে , তারা নিজেরা কবি-যশোপ্রার্থী । তারা অন্যদের কবিতা প্রকাশের সুযোগ করে দিচ্ছে । কবিতা সম্পাদনা করার যোগ্যতা তাদের নেই । আমি ঢালাওভাবে কথাটি বলতে চাইনা । কারো কারো হয়তো আছে , কিন্তু অনেকের নেই । কবিতার এই দুর্গতি হচ্ছে সম্পাদনা ছাড়া প্রকাশ পাওয়ায় । যা লেখা হচ্ছে , তাই প্রকাশ হচ্ছে । এটা কবি হিসেবে আমি মানতে পারছি না ।
প্রেক্ষণ : কবিতার পাশাপাশি কথা সাহিত্যেও আপনার একটা বিশিষ্ট্য অবস্থান রয়েছে । , তো , দেশের সমকালীন কথাসাহিত্য নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই ।
আল-মাহমুদ : আমি অন্যের লেখা নিয়ে এই মুহুর্তে কোন মন্তব্য করতে চাইনা । আমার ব্যাপারে যখন প্রশ্ন করা হয়েছে, তখন আমার কথাটিই বলি । আমি গল্প উপন্যাস লিখি , সেটা আগে থেকেই । আমার একটা ধারনা হয়েছে যে , উপন্যাস লিখলেই যে তিনশ পৃষ্ঠা হতে হবে , এর কোন তাৎপর্য নাই । অনেকে পড়তেও চায় না । আমি ছোট উপন্যাস লেখা শুরু করেছি । । আংগীকের দিক থেকে সেগুলোকে বড়গল্প মনে হলেও তাতে উপন্যাসের বিভঙ্গ আছে ; প্রেম-প্রীতি , আনন্দ-বেদনা আছে । অনেকে এধরনের উপন্যাসকে মাইক্রো উপন্যাস বলে । তবে সব মিলিয়ে আমার যে কাজ , সেটা একজন কবির ই কাজ । কবির কাজ, কিন্তু সেটা শুধু কবিতার আঙ্গীকে প্রকাশ পায় নি , নানা আঙ্গীকে প্রকাশ পেয়েছে । আমার একটাই লক্ষ্য ।তা হচ্ছে , লেখাটার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোন রস সৃষ্টি হয়েছে কিনা ; সেটা দেখা । রস হচ্ছে লেখার গ্রাহ্য গুণ । যদি এই গ্রাহ্য গুণ থাকে তবে লেখাটা স্বার্থক হয়েছে ।
প্রেক্সণ : একুশ শতকের শুরু থেকে পৃথিবী বড় বেশি অস্থির হয়ে উঠেছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আফগানিস্তান ও ও ইরাক আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে আপনি বেশ কিছু কবিতা লিখেছেন । “ইগল থাকবে ইতিহাস থাকবে না”এরকম কবিতা, যেগুলো উড়ালকাব্য গ্রন্হে সঙ্কলিত হয়েছে । তো , এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আপনি পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় একটি একক শক্তি হিসেবে দেখছেন । এই একক শক্তির বিপরীতে কী কোন শক্তির পদধ্বনি আপনি শুনতে পান ?
আল-মাহমুদ : এখনতো পুঁজিবাদের দশদিকে দশ হাত বেরিয়ে পরেছে । পুঁজিবাদের চরম শক্তিশালী ও বিববর্তনের সময় এটা। এখন দেখতে হবে পুঁজিবাদ কাকে তাদের মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে । পুঁজিবাদ যাদেরকে মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে ; আমাদের ধরে নিতে হবে তারাই এর বিরুদ্ধে সংগ্রামরত শক্তি ।
প্রেক্ষণ : একটা স্থুল বিতর্কের সূত্র ধরেই আপনাকে একটা প্রশ্ন করি । আমাদের জাতিস্বত্ত্বার পরিচয় চিহ্নিত করতে গিয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ নামে দুটো বিপরীতমূখী স্রোত দেখা যাচ্ছে । ইতিহাস ও নৃত্বত্ত্বের আলোকে আমাদের পরিচয়সূত্রটি আসলে কি ?
আল-মাহমুদ : আমি অবশ্য বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছি । এজন্য আমাকে গ্রাম্য বলে আখ্যায়িত করতেও সমালোচকরা ছাড়েন নি । তবে , অনেক উদার হলেও বাংলাদেশের একটা আলাদা সাংস্কৃতিক চারিত্রিক-বৈষিষ্ট্য শেষপর্যন্ত উপচে উঠতে চাইছে । আমাদের সবক্ষেত্রে কিন্তু এটা ডালপালা মেলে দিতে সহজতার মধ্যে চেষ্টা করছে ।
প্রেক্ষণ : যারা নতুন , সৃজনশীলতার অঙ্গনে প্রবেশ করতে চাইছে , লেখালেখি করতে চাইছে , তাদের জন্য আপনার কোন পরামর্শ বা বক্তব্য থাকলে বলুন ।
আল-মাহমুদ : উপদেশ দিয়ে তো প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যের কোন উপকার হয় না । তাছাড়া , তরুন লেখকরা উপদেশ নেবেন কেন ? তবে বহুদিন আমি যেহেতু নিজে সাহিত্য বা কাব্যচর্চা করি , সেজন্য এর অনেক ভালো মন্দের সাথে আমাকে বসবাস করতে হয়েছে । আমার কথা হলো , যারা লিখতে এসেছেন , তাদের একটা দৃঢ়তার মনোভাব থাকা দরকার যে , শেষ পর্যন্ত তিনি লিখেই যাবেন । আর যদি মনে হয় , এ পথটা তার জন্য সহজতর হবেনা ; সুযোগ পেলে অন্য কিছু করবেন , তাহলে এখনি তাদেরকে সে সুযোগটা গ্রহণ করা উচিত । আর যদি প্রতিজ্ঞ হন যে , তিনি কবি বা সাহিত্যিক হবেন , তাহলে এব্যাপারে উদাসীন হলে তো হবে না ! শেষ পর্যন্ত তাকে একটা জীবন এর জন্য ব্যায় করতে হবে । সাহিত্য পার্টটাইম কাজ নয় । এর জন্য একটা আস্ত জীবনকে বাজী ধরতে হয় । তবে এ ধরনের বাজী ধরা মানুষ শেষ পর্যন্ত হেরে গেছে , এমনটা আমি দেখিনি । যদিও ব্যর্থতার অনেক ইতিহাস আমার জানা আছে । আমাদের সাহিত্যের আয়োজনটা শুরু হয়েছে অনেক কম প্রতিভাবান লেখকদের সমাগমে এবং অযাচিতভাবে আশাতীত মূল্য দিয়ে । এখন অবশ্য এই কম প্রতিভাবানরা তাদের কাজের কোন স্থায়ীত্ব ধরে রাখতে পারছেনা । এটা একটা ক্রাইসিস বা সঙ্কট । আমি এ সঙ্কট থেকে উদ্ধারের কোন পথ দেখতে পাইনা । কোন প্রতিবাদের সাহস ও আমার নেই । আমি সমালোচনাও করিনা ।
: প্রক্ষণ পত্রিকার আল-মাহমুদ সংখ্যায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকার
: সময়কাল সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০০৭
সাম্প্রতিক মন্তব্য
1 week 3 days ago
2 weeks 3 days ago
3 weeks 6 days ago
12 weeks 2 hours ago
17 weeks 3 hours ago
20 weeks 8 hours ago
20 weeks 1 day ago
20 weeks 1 day ago
22 weeks 1 day ago
25 weeks 5 days ago