মূলপাতা বই ইসলাম ও জাহেলিয়াত

ইসলাম ও জাহেলিয়াত
[১৯৪১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পেশোয়ার ইসলামিয়া কলেজের মজলিশে ইসলামিয়াতের সভায় ভাষণ দেয়ার জন্যে মাওলানাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এটি সে সভায় প্রদত্ত ভাষণ, যা পরবর্তীকালে ‘ইসলাম ও জাহেলিয়াত’ শিরোনামে পুস্তিকারে প্রকাশিত হয়।]

জীবনের কর্মক্ষেত্রে মানুষকে যতো বস্তুরই সংস্পর্শে আসতে হয় তার প্রত্যেকটির প্রকৃতির গুণাগুণ ও অবস্থা এবং এর সাথে তার সম্পর্ক সম্বন্ধে সর্বপ্রথমেই একটি সুস্পষ্ট মত নির্দিষ্ট করে নেয়া একান্তই আবশ্যক। পূর্বেই এমত নির্দিষ্ট না করে কোনো একটি জিনিসকেও কোনো কাজে প্রয়োগ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। সে মত মূলত ভুল কি নির্ভুল সে প্রশ্ন গৌণ, কিন্তু মত যে একটি নির্দিষ্ট করে নিতে হয়, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আর এ নির্ধারণের পূর্বে কোন্‌ বস্তুর সাথে কিরূপ ব্যবহার ও আচরণ করতে হবে, কার সাথে কিরূপ কর্মনীতি গ্রহণ করতে হবে চূড়ান্তভাবে তার ফায়সালা করাও কিছুতেই সম্ভব নয়। একথা বুঝাবার জন্য বিশেষ কোনো যুক্তির অবতারণা করার কোনোই আবশ্যকতা নেই। কারণ ইহা প্রত্যেকেই রাত-দিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা হতেই বুঝে নিতে পারে। কারো সাথে প্রথম সাক্ষাত হলে তার সম্পর্কে জেনে নিতে হয় যে, কে এই ব্যক্তি, কি এর সম্মানও মর্যাদা? কোন্‌ ধরনের গুণ ও যোগ্যতা এর মধ্যে রয়েছে এবং আমার সাথে তার কোন্‌ ধরনের সম্পর্ক বিদ্যমান? এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর না জেনে তার সাথে কোন্‌ ধরনের ব্যবহার বা আচরণ অবলম্বন করতে হবে, তা নির্ধারণ করা কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না। এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্ভুল জ্ঞান লাভ করা যদি একান্ত অসম্ভবই হয়ে পড়ে, তবুও বাহ্যিক নিদর্শনসমূহ হতে যথাসম্ভব এসব প্রশ্নের অন্তত একটি আনুমানিক উত্তর অবশ্যই ঠিক করে নিতে হয়। অতপর তার সাথে যে ধরনেরই আচরণ করা হোকনা কেন, তা পূর্ব নির্ধারিত এই মতের ভিত্তিতেই করতে হয়। মানুষ খাদ্য হিসেবে যেসব দ্রব্য গ্রহণ করে, তা মানুষের খাদ্য প্রয়োজন পূরণ করে- এই জ্ঞান বা ধারণার ফলেই তা সম্ভব হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে মানুষ যা পরিত্যাগ করে বা দূরে নিক্ষেপ করে, যা মানুষ নিজের কোনো না কোনো কাজে ব্যবহার করে, যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মানুষ যত্ন নেয়, যেসব জিনিসের প্রতি সম্মান বা উপেক্ষা প্রদর্শন করে, যাকে মানুষ ভয় করে বা ভালবাসে, সেসব সম্পর্কেই তাদের সত্তা ও গুণাগুণ এবং তাদের সাথে মানুষের সম্পর্ক সম্বন্ধে পূর্ব নির্ধারিত ধারণার ভিত্তিতেই উক্তরূপ আচরণ ও ব্যবহার হয়ে থাকে।

পরন্তু বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কে স্থিরিকৃত এ ধারণা নির্ভুল হলে এর সাথে অবলম্বিত আচরণও নির্ভুল হবে এবং এ ধারণা ভ্রান্ত, ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ হলে এর প্রতি মানুষের ব্যবহার তদনুরূপ হবে। এই ব্যবহারে তারা পরস্পরের উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু স্বয়ং সেই ধারণাটির শুদ্ধাশুদ্ধি কিসের উপর নির্ভর করে? তা নির্ভর করে বস্তুটি সম্পর্কে মত নির্ধারণের পন্থার উপর। সেমত হয় নির্ভুল বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা হয়, নতুবা শুধু আন্দায-অনুমান, অমূলক ধারণা কিংবা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ উপায়ের উপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, একটি শিশু আগুন দেখতে পায় এবং নিছক বাহ্যলব্ধ জ্ঞানের উপর নির্ভর করে তাকে ‘চমৎকার খেলনা’ বলে মনে করে। আগুন সম্পর্কে এমত ঠিক করার ফলেই শিশু উহা ধরবার ও উঠিয়ে নেয়ার জন্য হস্ত প্রসারিত করে দেয়। অন্য এক ব্যক্তি সেই আগুন দেখে নিছক ধারণা-অনুমানের উপর নির্ভর করে সে সম্পর্কে এমত পোষণ করতে শুরু করে যে, এর মধ্যে ঐশ্বরিক সত্তা রয়েছে অথবা এটা ঐশ্বরিক বাহ্যরূপ। এ মতের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত করে যে, তার সাথে তার প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া এবং তার সম্মুখে মাথা নত করাই কর্তব্য। তৃতীয় এক ব্যক্তি আগুন দেখে তার প্রকৃত রূপ, তার অন্তর্নিহিত গুণাগুণ, শক্তি ও ক্ষমতার অনুসন্ধান করতে শুরু করে এবং চিন্তা ও গবেষণার পর এমত নির্ধারণ করে যে, এটা উত্তাপ দানকারী পদার্থ, অতএব এটাকে একান্ত চাকরের ন্যায় ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। এ মতের উপর ভিত্তি করে আগুনকে সে খেলনা মনে করে না। উপাস্য দেবতা হিসেবেও একে গ্রহণ করে না বরং প্রয়োজন মতো একে কখনো খাদ্য প্রস্তুত কার্যে, কখনো কিছু ভস্ম করার কাজে ব্যবহার করে। একই আগুনের সাথে এরূপ বিভিন্ন প্রকার আচরণের মধ্যে শিশু ও অগ্নিপূজকের আচরণ নিতান্ত অজ্ঞতা ও অন্ধতামূলক, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ আগুনকে খেলনা মনে করা সম্পর্কে শিশুর ধারণা বাস্তব অভিজ্ঞতায় সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়। অগ্নি উপাসকের মতো আগুনের খোদা হওয়া বা তাতে খোদার আত্মপ্রকাশ করার বিশ্বাসও কোনো বৈজ্ঞানিক অকাট্য প্রমাণ ভিত্তিক নয়। বরং এরূপ ধারণা নিছক খোশখেয়াল, কল্পনা ও অমূলক আন্দায-অনুমানের উপর নির্ভর করে গ্রহণ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে আগুনকে সেবা পরিচর্যার কাজে নিযুক্ত করা, এর সাহায্যে মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর কাজ সম্পন্ন করা নির্ভুল বৈজ্ঞানিক কর্মপন্থা সন্দেহ নেই। কারণ আগুন সম্পর্কে এই যে মত নির্ধারণ করা হয়েছে, ইহা জ্ঞান ও নির্ভুল বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে।

মানব জীবনের মৌলিক সমস্যা
এ ভূমিকা হৃদয়-মনে বদ্ধমূল করে নেয়ার পর খুঁটিনাটি ব্যাপার হতে মূলনীতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বিষয়টি আলোচনা করতে হবে। মানুষ এ পৃথিবীর উপর নিজেকে বর্তমান দেখতে পায়, এর একটি শরীর বা দেহও রয়েছে, তাতে অসংখ্য প্রকার শক্তি, ক্ষমতা ও প্রতিভা নিহিত রয়েছে ; তার সম্মুখে আকাশ ও পৃথিবীর এক বিশাল বিস্তৃত এলাকা বিদ্যমান, তাতে রয়েছে অসংখ্য প্রকার দ্রব্য-সামগ্রী ; মানুষের মধ্যে তা ব্যবহার করার এবং নিজের প্রয়োজনে তা হতে উপকৃত হওয়ার মতো শক্তি পুরাপুরি বর্তমান রয়েছে। তার চতুর্দিকে রয়েছে অসংখ্য মানুষ, জন্তু, উদি্‌ভদ, গুল্ম, লতা, প্রস্তর ইত্যাদি। এ সবের সাথে মানুষের জীবন নানা দিক দিয়ে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে। এমতাবস্থায় প্রথমে নিজের সম্পর্কে অন্যান্য জন্তু, বস্তু ও দ্রব্য-সামগ্রী সম্পর্কে এবং এদের সাথে তার নিজের সম্পর্ক সম্বন্ধে কোনো মত ঠিক না করে এদের প্রতি কোনোরূপ আচরণ অবলম্বন করা মানুষের দ্বারা কিরূপে সম্ভব হতে পারে? মানুষের উপর কি কোনোরূপ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে না হয়নি, সে সম্পূর্ণ স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী না কারো অধীন কারো অধীন হয়ে থাকলে সে কার অধীন, কার নিকট তাকে জবাবদিহি করতে হবে, এ পার্থিব জীবনের কোনো পরিণতি আছে কি নেই, থাকলে তা কি প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর ঠিক না করে এবং এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে নিজের জীবনের জন্য কোনো পথই মানুষ বেছে নিতে পারে না। মানুষের যে দেহ এবং দেহের মধ্যে যেসব শক্তি নিহিত রয়েছে, তা তার নিজের মালিকানাস্বত্ব, না অন্য কারো দান মাত্র ; সেগুলোর হিসেব গ্রহণকারী কেউ আছে কি নেই, সেগুলোর ব্যয়-ব্যবহারের নীতি সে নিজে নির্ধারিত করবে না অন্য কেউ তা করে দিবে, এসব প্রশ্নের উত্তর ঠিক না করে সে তার নিজের শক্তি-প্রতিভাকে কোনো কাজেই নিযুক্ত করতে পারে না। চারিদিকে যে বস্তু ও দ্রব্য-সামগ্রীর অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে, তার মালিক ও স্বত্বাধিকারী সে নিজে না অন্য কেউ ; সেগুলোর উপর তার ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার সীমাবদ্ধ না অসীম, সীমাবদ্ধ হলে সে সীমা কে নির্ধারিত করেছে, এসব প্রশ্নের জবাব নির্দিষ্ট না করে মানুষ তার চতুষ্পার্শে অবস্থিত বস্তু ও দ্রব্যাদি ব্যবহার করার কোনো নীতিই নির্ধারিত করতে পারে না। অনুরূপভাবে মানুষ কাকে বলে, মানুষ ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য ও বৈষম্য করার ভিত্তি কি ; বন্ধুত্ব, শত্রুতা, মতৈক্য ও অনৈক্য, সহযোগিতা ও অসহযোগিতাই বা কিসের ভিত্তিতে করা হবে। এ বিষয়ে কোনো মত স্থির করার পূর্বে মানুষ পরস্পরের সাথে কোনোরূপ ব্যবহার আচরণের নীতি ঠিক করতে পারে না। পরন্তু এই বিশ্ব-প্রকৃতির স্বরপ এবং এর ব্যবস্থা কোন্‌ ধরনের এবং এখানে মানুষের অবস্থান কোন্‌ স্তরে তা ঠিক না করে কোনো মানুষই সমষ্টিগত এই দুনিয়ার সাথে কোনোরূপ ব্যবহার করতে পারে না।

উপরোল্লিখিত ভূমিকার ভিত্তিতে একথা অকুণ্ঠভাবে বলা যেতে পারে যে, ঐসব সম্পর্কে একটা না একটা মত স্থির না করে এর কোনো একটিকেও কোনো কাজে ব্যবহার করা অসম্ভব, আর বস্তুতই এসব প্রশ্নের কোনো না কোনো উত্তর চেতনায় হোক কি অচেতনায় পৃথিবীর মানুষের মনে বর্তমান থাকেই, এর উত্তর ঠিক করতে মানুষ একান্তভাবে বাধ্য। যেহেতু এ মত নির্ধারণের পূর্বে সে কোনো কাজই করতে সমর্থ হয় না। অবশ্য প্রত্যেকের মনের যে এসব প্রশ্নের দার্শনিক উত্তর বর্তমান থাকবে, প্রত্যেকটি মানুষকেই যে দার্শনিক যুক্তি দ্বারাই এদের উত্তর নির্ধারণ করতে হবে এবং এক একটি প্রশ্নের সূক্ষ্মভাবে যাচাই করে এর সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত মনের মধ্যে বদ্ধমূল করে নিতে হবে, এমন কোনো কথা নয়। কারণ সকলের পক্ষে তা সম্ভব হয় না অনেক লোকের মনে এসব প্রশ্ন আদৌ কোনো নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে না ; স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ঐসব বিষয়ে অনেক সময় একটু চিন্তাও হয়ত অনেকে করে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রত্যেকটি মানুষই ঐসব প্রশ্নের অত্যন্ত অস্পষ্ট ও মোটামুটিভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক উত্তর নিশ্চয়ই স্থির করে নেয়। ফলে তার জীবনের যে নীতিই হোক না কেন তা যে ঐ মতেরই অনিবার্য পরিণতি তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ থাকতে পারে না।

উপরোক্ত কথা ব্যষ্টি সম্পর্কে যতোখানি সত্য, বিভিন্ন জাতি বা দল সম্পর্কেও তা অনুরূপভাবে সত্য ও প্রযোজ্য। এই প্রশ্নসমূহ মানব জীবনের মৌলিক সমস্যার সহিত সংশ্লিষ্ট বলে এ সবের উত্তর ঠিক করার পূর্বে সমাজ ও সভ্যতার জন্য কোনোরূপ বিধান এবং মানব সমষ্টির জন্য কোনোরূপ কার্যসূচী গ্রহণ করা আদৌ সম্ভব নয়। এসব প্রশ্নের যে উত্তর নির্ধারিত হবে সে অনুসারেই নৈতিক চরিত্র সম্পর্কেও একটি বিশেষ মত স্থিরকৃত হবে, এর স্বরূপ অনুযায়ী জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগের বাস্তব রূপায়ণ হবে। এক কথায় ঐ প্রশ্নের উত্তর অনুযায়ী সমগ্র সমাজ সংস্কৃতি গড়ে উঠবে এ ব্যাপারে কোনোরূপ ব্যতিক্রম আদৌ সম্ভব নয়। ব্যষ্টি কিংবা সমষ্টি উভয় বিষয়েই এসব প্রশ্নের যে উত্তর হবে, বাস্তবক্ষেত্রে তা-ই রূপায়িত হবে। এমন কি, এক ব্যক্তি বা একটি সমাজের আচার-আচরণ এবং কাজ-কর্মের যাচাই ও পুংখানুপংখু বিশ্লেষণ করে এর পশ্চাতে উক্ত মৌলিক প্রশ্নসমূহের কোন্‌ উত্তর কার্যকরী রয়েছে তা অতি সহজেই জানতে পারা যায়। কারণ, এসব প্রশ্নের উত্তর যে ধরনের হবে, ব্যক্তিগত বা দলগত আচরণ এর বিপরীত হওয়া মোটেই সম্ভব নয়। মৌলিক দাবি এবং বাস্তব আচরণের মধ্যে পার্থক্য নিশ্চয়ই হতে পারে; কিন্তু উল্লিখিত প্রশ্নসমূহের যে উত্তর প্রকৃতপক্ষে মানব মনের গভীরতম পটে মুদ্রিত রয়েছে, তার স্বরূপ ও প্রকৃতি এবং বাস্তব আচরণের প্রকৃতিতে কোনোরূপ পার্থক্য হতে পারে না।

এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। মানব জীবনের উক্ত মৌলিক প্রশ্নসমূহ মনের মধ্যে যার কোনো উত্তর ঠিক না করে মানুষ এ দুনিয়ার কোনো কাজে এক বিন্দু পদক্ষেপও করতে পারে না বলে প্রমাণিত হলো মূলত এ সবই অদৃশ্য বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। বিশ্বপ্রকৃতির ললাটে এর কোনো উত্তর এমনভাবে লিখিত হয়নি, যা প্রত্যেকটি মানুষ ভূ-পৃষ্ঠে পদার্পণ করার সংগে সংগেই পাঠ করে নিজ যোগ্যতার বলে সঠিক উত্তর জেনে নিবে। অধিকন্তু প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর এমন সহজ ও সুস্পষ্ট নয় যে, প্রত্যেকটি মানুষই তা স্বতঃই জেনে নিবে। এ জন্যই উল্লিখিত প্রশ্নাবলীর নির্দিষ্ট একটি উত্তর সকল মানুষ একত্রিত হয়েও গ্রহণ করতে পারেনি। এই উত্তর সম্পর্কে সকল সময়ই মানুষের মধ্যে বিরাট মতবৈষম্য বর্তমান রয়েছে। আর সত্য কথা এই যে, বিভিন্ন পন্থায়ই উল্লিখিত প্রশ্নাবলীর উত্তর দিতে চিরদিন চেষ্টা করেছে। বস্তুত উল্লিখিত প্রশ্নাবলীর উত্তর নির্ধারণের কোন্‌ কোন্‌ পন্থা সম্ভব হতে পারে এবং আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে সে জন্য কোন্‌ পন্থা গ্রহণ করা হয়েছে, আর সেই বিভিন্ন পন্থায় কোন্‌ ধরনের উত্তর লাভ করা যায়, তা জেনে নেয়া একান্তই আবশ্যক।

উল্লিখিত প্রশ্নাবলীর উত্তর নির্ধারণের একটি উপায় হচ্ছে নিজের বাহ্যেন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করা এবং তদলব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে উক্ত প্রশ্নাবলীর উত্তর নির্ধারণ করা। দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ এবং এর সাথে অনুমান ধারণার যোগ করে একটি নীতি ঠিক করা। তৃতীয় পন্থা হচ্ছে পয়গাম্বর আল্লাহর প্রেরিত পুরুষগণ প্রত্যক্ষভাবে নিগূঢ় সত্য জ্ঞানের ধারক হওয়ার দাবি করে উক্ত প্রশ্নাবলীর যে উত্তর দিয়েছেন তা গ্রহণ করা।

মানব জীবনের উল্লিখিত মৌলিক প্রশ্নসমূহের উত্তর নির্ধারণের জন্য দুনিয়াতে আজ পর্যন্ত এই তিনটি পন্থাই অবলম্বিত হয়েছে। আর সম্ভবত এই কাজের জন্য এতদ্ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ও বর্তমান নেই। এর মধ্যে প্রত্যেকটি পন্থাই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়। প্রত্যেকটির উত্তর হতে একটি বিশেষ আচরণ নীতি লাভ করা যায়; একটি বিশেষ নৈতিক আদর্শ এবং সমাজ ও সংস্কৃতির ব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করে। এদের প্রত্যেকটিই নিজ নিজ মৌলিক বিশেষত্বের দিক দিয়ে অন্যান্য সকল উত্তর হতে উদ্‌ভুত আচরণ নীতিসমূহ হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। এসব বিভিন্ন পন্থা হতে উক্ত প্রশ্নাবলীর কি কি উত্তর লাভ করা গিয়েছে এবং প্রত্যেকটি উত্তর হতে কোন্‌ ধরণের আচরণ নীতি লাভ হয়েছে, অতপর আমি তাই বিস্তারিতভাবে দেখাতে চেষ্টা করবো।

খালেছ জাহেলিয়াত বা নিরেট অন্ধতা
নিছক বাহ্যেন্দ্রিয়ের উপর একান্তভাবে নির্ভর করে মানুষ যখন উল্লিখিত প্রশ্নসমূহের উত্তর লাভ করতে চেষ্টা করে এবং এই উপায়ে কোনো মত নির্দিষ্ট করে নেয়, তখন এ চিন্তাপদ্ধতির অতি স্বাভাবিক পরিণতি ক্রমেই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হয় তা এই যে, সৃষ্টিজগতের এই বিরাট ও বিস্ময়কার ব্যবস্থা নিছক একটি আকস্মিক ঘটনার বাস্তব প্রকাশ মাত্র। এর পশ্চাতে কোনো সদিচ্ছা বা মহৎ উদ্দেশ্য বর্তমান নেই, ইহা স্বতস্ফূর্তভাবেই অস্তিত্ব লাভ করেছে, নিজস্ব শক্তির সাহায্যে এর কার্যক্রম চলছে এবং শেষ পর্যন্ত নিজে নিজেই চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। এই বিরাট বিশ্ব প্রকৃতির কোনো স্বত্বাধিকারী কোথাও বর্তমান নেই। আর তা থাকলেও মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষকে এক প্রকার ‘জন্তু’ বলেই মনে করা হয় এবং সম্ভবত এক দূর্ঘটনার ফলেই এই পৃথিবীতে জন্মলাভ করেছে বলে ধারণা করা হয়। তাকে কেউ সৃষ্টি করেছে, না নিজেই তার সত্তা লাভ করেছে, তা সকলেরই অজ্ঞাত। আর মূলত এই প্রশ্ন এখানে অবান্তর। মানুষকে এই পৃথিবীতে জীবন্ত ও বিচরণশীল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে নানাবিধ ইচ্ছা, বাসনা ও লালসা রয়েছে, তার প্রকৃতি নিহিত শক্তি এর চরিতার্থ করার জন্য অহর্নিশ প্রবলভাবে উত্তেজনা দেয়। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অস্ত্র-সরঞ্জাম রয়েছে ; সে সবের সাহায্যে তার অন্তর্নিহিত লালসা-বাসনা চরিতার্থ করা যেতে পারে। মানুষের চতুষ্পার্শ্বের এই বিশাল বিস্তৃত ভূমির বুকে সীমা-সংখ্যাহীন উপাদান-উপকরণ বিদ্যমান রয়েছে, এ সবের উপর মানুষ নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অস্ত্র-শস্ত্র প্রয়োগ করে নিজের বাসনা পূর্ণ করতে পারেঃ

অতএব তার অন্তর্নিহিত যাবতীয় শক্তি ও ক্ষমতার সাহায্যে নিজস্ব লালসা-বাসনা পূর্ণরূপে চরিতার্থ করা ভিন্ন এর ব্যবহার ক্ষেত্র আর কিছু নেই এবং সমগ্র দুনিয়া অফুরন্ত দ্রব্য-সামগ্রীর একটি ভান্ডার ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ তার উপর হস্ত প্রসারিত করবে এবং নিজের ইচ্ছামত দ্রব্য-সামগ্রী হস্তগত করবে পৃথিবীর এটাই একমাত্র কাজ। এর উপর এমন কোনো শক্তিসম্পন্ন ও কর্তৃত্বশীল সত্তা নেই, যার নিকট মানুষ জবাবদিহি করতে বাধ্য হতে পারে। মানুষের জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য অপরিহার্য আইন-বিধান লাভ হতে পারে সত্যজ্ঞান ও পথনির্দেশ লাভের এমন কোনো উৎস কোথাও নেই। ফলত মানুষ স্বাধীন, দায়িত্বহীন ও স্বাধিকার সমন্বিত এক সত্তা।

নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইন-বিধান রচনা, তার অন্তর্নিহিত শক্তিসমূহের ব্যবহার ক্ষেত্র নির্ধারণ করা এবং পৃথিবীতে বর্তমান সকল প্রকার জীব-জন্তু ও বস্তুর সাথে নিজের সম্পর্ক ও কর্মনীতি নির্ধারণ করা তাদের নিজেদেরই কাজ। এ ব্যাপারে কোনোরূপ পথনির্দেশ লাভ করতে হলে জন্তু-জানোয়ারের জীবনে, প্রস্তর-পর্বতের ইতিকাহিনীতে এবং স্বয়ং মানুষেরই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান সম্ভারের উপর নির্ভর করতে হবে। মানুষ কারো নিকট দায়ী নয়, কারো নিকট তাকে যদি একান্তই জবাবদিহি করতে হয় তবে তা তার নিজের নিকট ; অথবা জনগণের মধ্য হতে উদ্ভুত ও সমাজের ব্যক্তিদের উপর প্রভাবশীল রাষ্ট্রশক্তির নিকটই তাকে জবাবদিহি করতে হবে অন্য কারো নিকট নয়। পরন্তু মানুষের ইহকালীন জীবনই একমাত্র ও চূড়ান্ত জীবন, সকল প্রকার কাজের প্রতিফল এই জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ও সমাপ্তব্য। কাজেই কেবল এ দুনিয়াতে প্রকাশিত কর্মফলের ভিত্তিতেই কোনো নীতির শুদ্ধ-অশুদ্ধ, ভুল-নির্ভুল, উপকারী-ক্ষতিকর, গ্রহণযোগ্য-বর্জনীয় ইত্যাদি সবকিছুই নির্ধারিত করতে হবে।

বস্তুত এটা একটি পরিপূর্ণ জীবন-দর্শন, এতে মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণের সাহায্যে মানব জীবনের সকল প্রকার মৌলিক প্রশ্নের জবাব দান সকল প্রকার সমস্যার সমাধান পেশ করা হয়েছে। এই জবাবের প্রত্যেকটি অংশই অন্যান্য অংশের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, একটির সাথে অন্যটির স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগত সামঞ্জস্য এবং সাদৃশ্য বিদ্যমান। এ জন্যই এ জীবন দর্শন গ্রহণকারী মানুষ দুনিয়াতে সংগতি ও সামঞ্জস্য পূর্ণ জীবনধারা গ্রহণ করতে পারে। এই উত্তর এবং তদোদ্‌ভূত আচরণ ও জীবনধারা মূলত শুদ্ধ না ত্রুটিপূর্ণ সে প্রশ্ন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

মানব জীবনের মৌলিক প্রশ্নসমূহের উক্ত জবাবের ভিত্তিতে মানুষ এই দুনিয়ার বাস্তব জীবনক্ষেত্রে যে নীতি ও ভূমিকা গ্রহণ করে, অতপর তাই আলোচনা করে দেখতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনে উক্তরূপ দৃষ্টিভংগি ও জীবন দর্শন গ্রহণ করার ফলে মানুষ প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পুরাপুরি স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বহীন কর্মপন্থা গ্রহণ করে সে নিজেকে নিজের, নিজ দেহ ও দৈহিক শক্তিসমূহের একচ্ছত্র মালিক মনে করতে শুরু করে, নিজের ইচ্ছামতই এর প্রয়োগ ও ব্যবহার করে। পৃথিবীর যে বস্তুই তার করায়ত্ব হবে, যে লোকদের উপর তার কর্তৃত্ব স্থাপিত হবে, এই বুæবাদী ব্যক্তি তার সাথে তার মালিক হিসেবেই ব্যবহার করবে। নিছক প্রাকৃতিক নিয়মে ও সমাজ জীবনের সংঘবদ্ধ জীবনধারা ভিন্ন আর কোনো শক্তিই তার ক্ষমতা ও স্বাধীন অধিকারকে কিছুমাত্র ক্ষুন্ন বা সীমাবদ্ধ করতে পারে না। তার নিজের হৃদয়-মনে কোনো নৈতিক অনুভূতি-দায়িত্বজ্ঞান ও জবাবদিহি করার ভয় হবে না, যা তার বল্‌গাহারা জীবনধারা কিছুমাত্র ব্যাহত করতে পারে। যেখানে বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা কিছুই নেই, কিংবা তা থাকা সত্ত্বেও একে উপেক্ষা করে নিজ ইচ্ছামতো কাজ করা সম্ভব। সেখানে এই মত ও জীবন দর্শনের অনিবার্য ফলে সে অত্যাচারী-বিশ্বাসঘাতক, দুর্নীতিপরায়ণ, দুষ্প্র্রবৃত্তিশীল জন্মপাপী ও ধ্বংসকারী অবশ্যই হবে। স্বভাবতই সে হবে স্বার্থপর, জড়বাদী ও সুবিধাবাদী (opportunist)। তার নিজের প্রবৃত্তির লালসা-বাসনা ও পাশবিক প্রয়োজন পূর্ণ করা এবং একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাওয়া ভিন্ন তার জন্ম ও জীবনের আর কোনো লক্ষ্যই থাকে না এবং যেসব জিনিস তার এই জীবন উদ্দেশ্যের আনুকূল্য করবে, কেবলমাত্র তাই তার দৃষ্টিতে মূল্যবান ও গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীত হবে। বস্তুত ব্যক্তিগতভাবে লোকদের মধ্যে এরূপ মনোভাব ও স্বভাব-প্রকৃতির উদ্‌ভব হওয়া আলোচ্য মতের স্বাভাবিক ফল, এ ধরনের লোক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক কারণে সহানুভূতিশীল হতে পারে, স্বার্থত্যাগ ও আত্মদানের ভাবধারা তার মধ্যে থাকতে পারে, তখন এক কথায় সমগ্র জীবনে একপ্রকার দায়িত্বপূর্ণ নৈতিক অনুভূতির পরিচয় সে দিতে পারে এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তার বাস্তব কাজ-কর্ম ও আচরণের বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বুঝতে পারা যাবে যে, মূলত এটা তার স্বার্থপরতা ও আত্মম্ভরিতারই সম্প্রসারিত রূপ মাত্র। বস্তুত সে নিজে দেশের ও জাতির কল্যাণ এবং উন্নতিতে নিজেরাই উন্নতি এবং কল্যাণ দেখতে পায় আর এ জন্যই সে তার দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে। এ ধরনের মানুষ খুব বেশি কিছু হলে একজন জাতীয়তাবাদীই হতে পারে, অন্য কিছু নয়।

এতদ্ব্যতীত, এ ধরণের মনোবৃত্তিসম্পন্ন লোকদের সমন্বয়ে যে সমাজ গঠিত হবে তার বিভিন্ন দিকের অবস্থা নিম্নরূপ হবেঃ এর রাজনীতি মানব প্রভুত্বের উপর স্থাপিত হবে। তা এক ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারেরও হতে পারে অথবা বিশেষ কোনো শ্রেণীর বা জনগণের প্রভুত্বও হতে পারে। আর সর্বাপেক্ষা উন্নত যে সংঘ কায়েম করা যেতে পারে, তা হবে রাষ্ট্রসংঘ। কিন্তু সকল অবস্থায়ই আসল আইন প্রণয়নকারী হবে মানুষ। আর নিছক ইচ্ছা, লালসা, বাসনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সকল প্রকার আইন রচনা এবং এর রদবদল করা হবে। সুযোগ-সন্ধানী ও সুবিধাবাদী দৃষ্টিতে সকল কাজের নীতি নির্ধারণও পরিবর্তন করা হবে। সর্বাপেক্ষা অধিক ধূর্ত, শঠ, শক্তিশালী, কপট, প্রতারক, মিথ্যাবাদী, পাষাণমনা এবং পাপিষ্ঠ আত্মার লোকই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্র আধিপত্য লাভ করতে পারবে এদের উপর অর্পিত হবে সমাজের নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা ও অধিকার। তাদের বিধানগ্রন্থে শক্তিরই নাম হবে সত্য, আর দুর্বল বাতিল বলে অভিহিত হবে।

এমতাবস্থায় সমাজ ও সভ্যতার সমগ্র ব্যবস্থায়ই আত্মপূজার ভিত্তিতে স্থাপিত হবে। সকল প্রকার স্বাদ-আস্বাদন, নৈতিক বিধি-বন্ধন হতে মুক্ত হলে যেরূপ নৈতিক মানদণ্ড স্থাপিত হবে এর ফলে উদগ্র লালসার চরিতার্থতায় খুব বেশি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হতে পারবে না।

শিল্প-সাহিত্য ও অনুরূপ মানসিকতায় প্রভাবান্বিত হবে, নগ্নতা ও পাশবিকতার ভাবধারা উত্তরোত্তর তীব্র হতেও তীব্রতর হয়ে দেখা দিবে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কখনো সামন্তবাদ ও জায়গীরদারী প্রথার বিস্তার ঘটবে, কখনও পুঁজিবাদ ও ধনতন্ত্র এর স্থানে এসে দাঁড়াবে, আবার কখনো মজুর-শ্রমিকগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে বিপ্লব সৃষ্টি করে তাদের নিজেদের নিরংকুশ একনায়কত্ব (dictatorship) কায়েম করবে। সেখানে কোনো সুবিচারপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কোনো মতেই সম্ভব হবে না। কারণ পৃথিবী এবং এর ধন-দৌলত সম্পর্কে এহেন সমাজে প্রত্যেকটি ব্যক্তির মৌলিক আচরণ সম্পূর্ণরূপে বস্তুবাদী হবে এবং প্রত্যেকেরই ধারণা হবে যে, এই পৃথিবী একটি লুণ্ঠনক্ষেত্র সময় সুযোগ দেখে এবং ইচ্ছামতো ‘হাত সাপাই’ করে যতোদূর ইচ্ছা সম্পদ আত্মসাৎ করতে কোনোরূপ বাধা নেই। এই সমাজে ব্যক্তি-চরিত্র গঠনের জন্য শিক্ষা-দীক্ষার যে ব্যবস্থা চালু হবে, তার স্বভাব-প্রকৃতিও এই জীবন দর্শন এবং এই আচরণেরই অনুরূপ হবে। এই সমাজের প্রত্যেকটি নবোদ্‌ভূত বংশ ও অধস্তন পুরুষের মন-মগযে পৃথিবী, মানুষ এবং পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কে পূর্ববর্ণিত রূপ-ধারণাই বদ্ধমুল করে দেয়া হবে। সকল প্রকার তথ্য ও জ্ঞানকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে শাখা সম্পর্কে হোক না কেন এমনভাবে সজ্জিত ও গঠিত করা হবে যেন জীবন সম্পর্কে এই ধারণা স্বতঃই তাদের মন ও মস্তিষ্কে বদ্ধমূল হয়ে যায়। উপরন্তু বর্তমান জীবনেই উক্তরূপ আচরণ গ্রহণ করা এবং অনুরূপ সমাজে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের সাথে স্থান লাভ করার উপযোগী করে তুলার জন্যই তাদেরকে তৈয়ার করা হবে। এরূপ শিক্ষা-দীক্ষার পরিচয় সম্পর্কে আপনাদের নিকট কিছু বলতে হবে বলে মনে করি না এর বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্তমান সমাজ হতেই লাভ করা যায়। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এদেশের লোকজন শিক্ষালাভ করছে তা সবই এ মতাদর্শের ভিত্তিতেই স্থাপিত হয়েছে, যদিও এর নাম রাখা হয়েছে ‘ইসলামিয়া কলেজ’ ও ‘মুসলিম ইউনিভার্সিটি’।

বস্তুত যেরূপ আচরণের বিশ্লেষণ এখানে করা হলো, এটা খালেছ ‘জাহেলিয়াতের’ আচরণ, এটা সেই শিশুর আচরণেরই অনুরূপ যে শুধু বাহ্যেন্দ্রীয়ের সাহায্যে স্থুল পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে আগুনকে একটি সুন্দর খেলনা বলে মনে করতে থাকে। তবে এতোটুকু পার্থক্য আছে যে, শিশুর পর্যবেক্ষণের ভুল সঙ্গে সঙ্গেই এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মারফতেই ধরা পড়ে যায়। কারণ, যে আগুনকে শিশু খেলনা মনে করে একে স্পর্শ করার আচরণ গ্রহণ করেছে, তা ভস্মকারী আগুন ; স্পর্শমাত্রই প্রমাণ করে দেয় যে, এটা খেলনা নয় আগুন। পক্ষান্তরে সমাজ জীবনের এই পর্যবেক্ষণ নীতির ভ্রান্তি বহু বিলম্বেই প্রমাণিত হয়, অনেকের নিকট হয়তো সারা জীবনেও তা কখনো ধরা পড়ে না। কারণ, এরা যে ‘আগুনে’ হস্তক্ষেপ করে এর আঁচ ইষদুষ্ণ, সহসাই এবং স্পর্শমাত্রই এর তাপ দুঃসহভাবে অনুভূত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তা শতাব্দীকাল পর্যন্ত উত্তপ্ত করতে থাকে। এতদসত্ত্বেও এ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করার কারো ইচ্ছা হলে তারও যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে এ মতাদর্শের বদৌলতে জনগণের বেঈমানী, শাসকদের যুলুম-পীড়ন, বিচারকদের অবিচার, ধনীদের স্বার্থপরতা ও শোষণ এবং সাধারণ লোকদের অসচ্চরিত্রতা ও দুর্নীতিপরায়ণতার যে তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ হয় এবং এ মতাদর্শের ফলে জাতি-পূজা, জাতি-প্রীতি, সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম দেশ জয় ও জাতি হত্যার যে অগ্নিস্ফুলিংগ নির্গত হয় তা প্রত্যক্ষ করে অতি সহজেই ধরে নেয়া যেতে পারে যে, এটা নিরেট অন্ধতা ও খালেছ জাহেলিয়াতেরই আচরণ, তাতে সন্দেহ নেই। বস্তুত এটা কোনো বৈজ্ঞানিক আচরণ নয়, বুদ্ধিভিত্তিক ও চিন্তামূলক আচরণও এটা নয়। কারণ নিজের এবং বিশ্ব-চরাচরের ব্যবস্থা সম্পর্কে যে ধারণা নির্দিষ্ট করে মানুষ উক্তরূপ আচরণ অবলম্বন করেছে তা প্রকৃত অবস্থা ও সত্যিকার ঘটনার অনুরূপ নয়। তাহলে এর পরিণতি যে এরূপ খারাপ হতে পারতনা, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

অতপর জ্ঞান লাভের অন্যান্য প্রচলিত পন্থারও যাচাই করে দেখা আবশ্যক। মানব জীবনের মৌলিক সমস্যার সমাধান, মৌলিক প্রশ্নের জবাব দান করার দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে নিছক ধারণা ও আন্দায-অনুমানের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করা এবং জীবনের উক্ত বিষয় সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত মত নির্দিষ্ট করা। এ পন্থা হতে তিনটি বিভিন্ন মত কায়েম করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি মত হতেই একটি বিশেষ ধরনের আচরণ উদ্ভুত হয়েছে।

শির্ক
একটি মত হচ্ছে এই যে, বিশ্ব প্রকৃতির এই বিরাট ব্যবস্থা যদিও কোনো ‘রব’ ব্যতীত চালু হওয়া সম্ভব হয়নি, কিন্তু এর খোদা (ইলাহ ও রব) একজন মাত্র নয়, তারা অসংখ্য বহু। বিশ্বজগতের বিভিন্ন শক্তির গোড়ার সূত্র বিভিন্ন খোদার হাতে নিবদ্ধ ; মানুষের সৌভাগ্য, দুর্ভাগ্য, সাফল্য, ব্যর্থতা, লাভ-লোকসান ইত্যাদি অসংখ্য ঐশ্বরিক সত্তার অনুগ্রহ ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। এ মতাদর্শ অবলম্বনকারীগণ আন্দায-অনুমানের সাহায্যে উক্ত খোদাসূলভ শক্তিসমূহের উৎস ও অবস্থান নির্ধারণের জন্য বিশেষ চেষ্টা করছে। ফলে এই অনুসন্ধান ব্যাপদেশে যে যে শক্তির উপরই তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে, তাদেরকেই এরা ‘খোদা’ মনে করেছে। এ মত গ্রহণ করার পর মানবজীবনে যেরূপ আচরণ স্বতঃই কার্যকরী হয়, তার পরিচয় নিম্নরূপঃ

প্রথমঃ এর ফলে মানুষের সমগ্র জীবন অবাস্তব আন্দায-অনুমানের পাদপীঠে পর্যবসিত হয়। মানুষ তখন বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিসম্মত পন্থা ছাড়া নিছক আন্দায-অনুমানের সাহায্যে অসংখ্য বস্তুকে অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন বলে মনে করতে শুরু করে, তারা অলৌকিক ও অতি প্রাকৃতিক পন্থায় মানুষের ভাগ্যের উপর ভালো কিংবা মন্দ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম বলে মনে করে। এ জন্য মানুষ উক্ত মতের বিশ্বাসী ব্যক্তি ভালো প্রভাবের অবাস্তব আশায় এবং মন্দ প্রভাবের অবান্তর ভয়ে নিমজ্জিত হয়ে নিজের বিপুল শক্তি অর্থহীনভাবে অপচয় করে। কোথাও কোনো সমাধির প্রতি আশা পোষণ করতে শুরু করে যে, এটা তার অসাধ্য কাজ সুসম্পন্ন করে দিবে ; কোথাও কোনো দেবতার উপর ভরসা করা হয় এবং সে মানুষের ভাগ্য ভালো করে দিবে বলে আশা করা হয়। এরূপ কাল্পনিক উপাস্য ও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিকে খুশি করার জন্য এসব মানুষ চেষ্টা করে। কোথাও এতোটুকু কু-লক্ষণ দেখতে পেলে এদের মন ভেঙ্গে পড়ে হতাশায় কাতর হয়। আবার কোথাও ভালো লক্ষণের উপর আশা ভরসার কাল্পনিক প্রাসাদ রচনা করে বসে। এই জিনিসই তার মতবাদ, চিন্তাধারা এবং তার চেষ্টা-সাধনাকে স্বাভাবিক পন্থা হতে বিচ্যুত ও বিভ্রান্ত করে এক সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক পথে পরিচালিত করে।

দ্বিতীয়ঃ এ মতের কারণেই পূজা পাঠ, মানত, উপহার, অর্ঘ্য এবং অন্যান্য অসংখ্য প্রকার আচার-অনুষ্ঠানের এক দীর্ঘ কর্মতালিকা রচিত হয়ে পড়ে। আর তাতে জড়িত হওয়ার কারণে মানুষের কর্ম প্রচেষ্টার একটি বিরাট অংশ অর্থহীন কার্যকলাপে ব্যয়িত হয়।

তৃতীয়ঃ এই মুশরেকী কল্পনা-পূজার কুসংস্কারে তারা নিমজ্জিত হয়, ধূর্ত ও শঠ ব্যক্তিগণ তাদেরকে নিজেদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে অর্থ লুণ্ঠন করার বিরাট সুযোগ লাভ করতে পারে। ফলে কেউ রাজা বা বাদশাহ হয়ে বসে এবং সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য দেবতার সাথে নিজের বংশের সম্পর্ক দেখিয়ে লোকদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাতে চেষ্টা করে যে, তারাও অন্যতম খোদা ; আর তোমরা তাদের দাস। কেউ পুরোহিত সেজে বসে এবং বলে যে, যাদের হাতে তোমাদের লাভ-ক্ষতির মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের নিকট সম্পর্ক বিদ্যমান ; কাজেই তোমরা আমাদের মাধ্যমে তাদের নিকট পর্যন্ত পোঁছাতে পার। কেহ পণ্ডিত, ব্রহ্মণ ও পীর হয়ে বসে, তাবীজ-তুমার, ঝাড়-ফুঁক, মন্ত্র-তন্ত্র এবং সাধনা বা ‘হাসিলিয়াতের’ জাল বিস্তার করে, আর লোকদের মনে এই দৃঢ় প্রত্যয় জন্মাতে চায় যে, আমাদের এসব জিনিস অলৌকিক ও অতি প্রাকৃতিক উপায়ে তোমাদের সকল প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারে দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে পারে, ব্যথা-বেদনা প্রশমিত করতে পারে। এরপর এসব চতুর লোকের পরবর্তী বংশ একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র মর্যাদা সম্পন্ন পরিবার বা শ্রেণীতে পরিণত হয়। ফলে তাদের অধিকার, মর্যাদা, স্বাতন্ত্র এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি কালের অগ্রগতির সংগে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত, সম্প্রসারিত ও গভীরতর ভিত্তিতে সুদৃঢ় হতে শুরু করে। এর দরুন এরূপ বিশ্বাস-মতবাদের দৌলতে জনসাধারণের মাথার উপর রাজ পরিবার, ধর্মীয় পদাধিকার ও আধ্যাত্মিক নেতাদের খোদায়ী মজবুতভাবে স্থাপিত হয়। এবং কৃত্রিম খোদা লোকদেরকে একান্ত দাসানুদাসে পরিণত করে মনে হয় যেন এরা তাদের জন্য দুগ্ধ দান, ভারবহন ও যানবাহনের কাজ করার জন্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।

চতুর্থঃ এই মতাদর্শ যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য এবং পুর্ণাঙ্গ সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতির জন্য কোনো স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ভিত্তি উপস্থিত করতে পারে না, অনুরূপভাবে এহেন কাল্পনিক ‘খোদা’দের নিকট হতে মানুষ অনুসরণযোগ্য কোনো প্রকার জীবন ব্যবস্থাও লাভ করতে পারে না। মানুষ এই কাল্পনিক ‘খোদাদের’ অনুগ্রহ ও সাহায্য লাভের আশায় পূজা-উপাসনা ও কয়েকটি নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান যথারীতি পালন করতে থাকবে এই খোদাদের সাথে সম্পর্ক এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। মানব জীবনের বৃহত্তর ও বিশালতর ক্ষেত্রে জীবনের বাস্তব কাজ-কর্মের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইন-কানুন রচনা করা ও কর্মনীতি নির্ধারণ করা মানুষের নিজেদের সম্পূর্ণ স্বাধিকারমূলক কাজ হবে মাত্র। এভাবে ‘মুশরিক’ শির্‌ক ভিত্তিক সমাজ কার্যত নিরেট অন্ধতার খালেছ জাহেলিয়াতের পূর্ববর্ণিত পথেই চলতে বাধ্য হয়। নৈতিক চরিত্র, বাস্তব কাজ-কর্ম, সামাজিক ধরণ-পদ্ধতি, রাজনীতি, অর্থব্যবস্থা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য সকল ক্ষেত্রেই শির্‌ক ভিত্তিক জীবন-দর্শন উদ্‌ভূত আচরণ খালেছ জাহেলিয়াতের আচরণেরই অনুরূপ, নীতিগতভাবে এদের মধ্যে কোনোই পার্থক্য হয় না।

বৈরাগ্যবাদ
বাস্তব পর্যবেক্ষণের সাথে অমূলক আন্দায-অনুমান সংমিশ্রণের ফলে মানব-জীবনের মৌলিক প্রশ্নের দ্বিতীয় যে উত্তরটি ঠিক করা হয়েছে, এক কথায় বলা যায় বৈরাগ্যবাদ। এ মতাদর্শের গোড়ার কথা এই যে, পৃথিবী এবং মানুষের শারীরিক সত্তা স্বয়ং মানুষের জন্য একটি ‘শান্তি কেন্দ্রবিশেষ’ আর মানুষের আত্মাকে একটি দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদীর ন্যায় পিঞ্জিরাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বস্তু জগতের সাথে একটি জড় সম্পর্ক বর্তমান থাকায় মানুষের মধ্যে লোভ-লালসা, ইচ্ছা-বাসনা এবং প্রয়োজনীয় যা কিছুই রয়েছে মূলত তা সবই বন্দীখানার শৃংখল বিশেষ। এই পৃথিবী এবং এর দ্রব্য সামগ্রীর সাথে মানুষ যতোই সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে, ততোই তার এই শৃংখলের বন্ধন দৃঢ়তর হবে এবং সে ততোধিক কঠোর শাস্তির যোগ্য বিবেচিত হবে। এই শাস্তি হতে মুক্তিলাভের একমাত্র উপায় হচ্ছে জীবনের সকল প্রকার সম্পর্ক সম্বন্ধ ও ধান্ধা- ঝামেলা পরিপূর্ণ সাফল্যের সাথে এড়িয়ে স্বাভাবিক লোভ-লালসা ও ইচ্ছা-বাসনাকে কঠোরভাবে অবদমিত করা, স্বাদ-আস্বাদন পরিহার করা, শারীরিক প্রয়োজন এবং প্রবৃত্তির দাবি ও প্রেরণাকে দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করা ; রক্ত-মাংসের বাস্তব সম্পর্কের কারণে হৃদয় মনে যে প্রেম-ভালবাসার উদ্রেক হয়, পূর্ণরূপে তার মূলচ্ছেদ করা এবং এই শত্রুকে মন ও দেহকে কঠোর ও অন্তহীন কৃচ্ছসাধনার সাহায্যে এমনভাবে নিস্পেষিত করা যেনো আত্মার উপর এর কোনরূপ প্রভাব-প্রভুত্ব আদৌ স্থাপিত হতে না পারে। এর ফলে আত্মা লঘু ও পবিত্র হবে এবং মুক্তির উচ্চতম মার্গে উড্ডীন হওয়ার শক্তি লাভ করতে পারবে। এরূপ মতাদর্শের ফলে মানবজীবনের নিম্নলিখিত রূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। প্রথমত, এর প্রভাবে মানুষের সমগ্র ঝোঁক-প্রবণতা সমষ্টিবাদ হতে ব্যষ্টিবাদের দিকে এবং সমাজ ও সভ্যতা হতে বর্বরতার দিকে নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষ পৃথিবী এবং জীবনধারা হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ হয়ে পড়ে। কোনো জৈবিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় না, তার সমগ্র জীবন অসহযোগ ও সম্পর্কহীনতার বাস্তব প্রতিমূর্তিতেই পরিণত হয়। তার চরিত্র সম্পূর্ণ নেতিবাচক (negative) ভাবধারায় নিস্ত্র্নিয় হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, এই মতাদর্শের প্রবল প্রভাবে সমাজের উত্তম ও সৎলোকেরা পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্জন একাকীত্বের নিভৃততম কোণে আশ্রয় নেয় এবং নিজের ব্যক্তিগত মুক্তি সাধনায় একান্তভাবে আত্মনিয়োগ করে। ফলত পৃথিবীর সকল প্রকার দায়িত্ব ও কর্তৃত্বপূর্ণ কাজ কর্মের চাবিকাঠি সমাজের সর্বাপেক্ষা দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, সমাজ ও সভ্যতার ক্ষেত্রে এ মতের যে প্রভাব আবর্তিত হয়, তার ফলে লোকদের মধ্যে নেতিবাচক (negative) নৈতিকতা, সমাজবিরোধী (individualistic) ভাবধারা এবং নৈরাশ্যব্যঞ্জক মতবাদ সৃষ্টি হয়। তাদের কর্মশক্তি ও কার্যদক্ষতা ক্ষীণ হতেও ক্ষীণতর হয়ে যায়। অত্যাচারীদের জন্য তারা ‘সহজভোগ্য’ হয়ে পড়ে এবং সকল দুর্ধর্ষ নিপীড়ক সরকার তাদেরকে অতি সহজেই হস্তগত করে নিতে পারে। বস্তুত এই মতাদর্শ জনগণকে যালেম লোকদের পক্ষে বিনয়াবনত ও পোষমানা (tame) বানিয়ে দিতে যাদুর মতো অব্যর্থ।

চতুর্থত, মানব প্রকৃতির সাথে এই বৈরাগ্যবাদী জীবন দর্শনের চিরস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং প্রায়ই এটা সংগ্রামে পরাজিত হয়। এটা পরাজিত হলে নিজের দুর্বলতা গোপন করার জন্য তারা নানা ফন্দি ও কূটকৌশলের সাহায্যে আত্মপ্রতারণা করতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন প্রাচীণ ধর্মে ‘কাফ্‌ফারা’ এশকে মাজাযী দুনিয়া ত্যাগের আবরণে দুনিয়া পূজার এই যে পংকিল ও লজ্জাকর অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট হয়েছে, তার মূল কারণ এখানেই নিহিত রয়েছে।

সর্বেশ্বরবাদ
অবাস্তব আন্দায-অনুমানভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের ফলে তৃতীয় যে মতটির সৃষ্টি হচ্ছে, তা হচ্ছে সর্বেশ্বরবাদ (pantheism)। অর্থাৎ মানুষ ও বিশ্বজগতের সমগ্র জিনিসই মূলত অপ্রকৃত। এদের আদৌ কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই। বস্তুত একটি সত্তাই এ সমগ্র বস্তুজগতকে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমরূপে গ্রহণ করেছে মাত্র এবং তাই এ সকলের মধ্যে স্বতস্ফূর্তভাবে প্রকাশমান। বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করলে এ মতাদর্শের অসংখ্য রূপ প্রকাশিত হয়। সমগ্র সৃষ্টিজগত, বস্তুজগত একটি মাত্র সত্তারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। মূলত সেই সত্তাই বর্তমান, অন্যান্য যা কিছু পরিদৃষ্ট হয় আসলে তা কিছুই নয় এই একটি মাত্র সত্তাই হচ্ছে এর সারকথা।

এ মতাদর্শের ফলে মানুষের মনে সৃষ্টি হয় সংশয়বাদ। তার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেই তার মনে জেগে উঠে সন্দেহের নিরন্ধ্র তমিস্রা। ফলে তার দ্বারা বাস্তব দুনিয়ার কোনো কাজই যে স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে সম্পন্ন হতে পারে না, তা বলাই বাহুল্য। সে নিজেকে একটি কাষ্ঠ নির্মিত পুত্তলিকা মনে করতে শুরু করে, যাকে অন্য কেউ অন্তরালে থেকে নাচাচ্ছে, অথবা অন্য কেউ তার মধ্যে থেকে নৃত্য করছে। সে তার এই অমূলক কল্পনার গভীর পংকে আত্মনিয়োগ হয়ে পড়ে। তার নিজের জীবনের কোনো উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যই থাকতে পারে না, কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপথও নয়। সে মনে করে আমি নিজে তো কিছুই নই আমার করারও কিছু নেই। আর আমার করার কিছু থাকতেও পারে না। মূলত সেই সার্বিক সত্তা যা আমার মধ্যে ও সমস্ত সৃষ্টিজগতের পরতে পরতে বিকাশমান যা অজ্ঞাত আদি হতে অনন্তকাল পর্যন্ত চলে আসছে, সকল কাজ তারই, সকল কর্ম সে-ই সম্পন্ন করে। সত্তা যদি পরিপুর্ণ হয়ে থাকে, তবে আমিও পরিপূর্ণ, অতএব আমার চেষ্টা-সাধনা করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর সেই সত্তাই যদি নিজের পূর্ণতা বিধানের জন্য চেষ্টিত হয়ে থাকে, তাহলে যে বিশ্বব্যাপক গতি সহকারে সে নিজের পূর্ণতা লাভের দিকে অব্যাহতভাবে ছুটে চলেছে। একটি অংশ হিসেবে এর দিকে আবর্তনে পড়ে আমিও সে দিকে পৌঁছতে পারবো। আসলে আমি একটি অংশবিশেষ, সার্বিক সত্তা কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় যেতে চাচ্ছে, তা আমি কিছুই জানি না। এরূপ চিন্তা পদ্ধতির বাস্তব ফল বৈরাগ্যবাদী জীবন দর্শনের অনুরূপই হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমত গ্রহণকারীদের কর্মনীতির সাথে খালেছ জাহেলিয়াতের অনুসারীদের কর্মনীতির সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়। কারণ এদের সকলেই নিজেদের সমগ্র জীবনকে নিজেদের প্রবৃত্তি ও অন্ধ লালসার দাসানুদাসে পরিণত করে। ফলে তাদের প্রবৃত্তি তাদেরকে যে দিকে নিয়ে যায়, তারা নির্বিচারে ও নির্বিকার চিত্তে সে পথেই ছুটতে থাকে। তারা মনে করে যে, তারা নিজেরা মোটেই চলছে না, যা ঘটছে তা সার্বিক সত্তাই করছে।

বস্তুত শেষোক্ত তিনটি মতাদর্শও প্রথমোল্লিখিত মতের ন্যায় জাহেলিয়াতের বিষাক্ত ভাবধারায় ভরপুর। ফলে এ মতের অনুসারীদের সমগ্র জীবন জাহেলিয়াতের বিষক্রিয়ায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। কারণ প্রথম কথা এই যে, এসব মতাদর্শের কোনো একটিরও কোনো বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, নিছক কল্পনা ও আন্দায-অনুমানের উপর একান্তভাবে নির্ভর করেই বিভিন্ন প্রকার মত রচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এসব মতাদর্শ প্রকৃত ও বাস্তব অবস্থার যে সম্পূর্ণ বিপরীত, তা বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে প্রমাণিত হয়। এসবের মধ্যে একটি মতও যদি প্রকৃত অবস্থার অনুরূপ হতো তবে তদনুযায়ী কাজ করলে খারাপ ফল হওয়ার কোনোই কারণ থাকতে পারে না। একটি জিনিস ভক্ষণ করলেই যখন নিশ্চিতরূপে মানুষের পেটে ব্যথার সৃষ্টি হতে দেখা যায় তখন আমরা সকলেই একথা নির্ভুল বলে বুঝতে পারি যে, পাকস্থলীর গঠন প্রকৃতি এবং এর হজম-শক্তির সাথে এই জিনিসটির বস্তুতই কোনো সামঞ্জস্য নেই। অনুরূপভাবে শির্‌ক, বৈরাগ্যবাদ এবং সর্বেশ্বরবাদের মতাদর্শ গ্রহণ করলে সমগ্র মানবতা যখন নিশ্চিতরূপে বিপর্যস্ত ও সর্বতোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর এই ব্যাপারে যখন আর কোনো সন্দেহ নেই, তখন সংশ্লিষ্ট মতাদর্শের কোনো একটিও যে বাস্তব অবস্থা ও প্রকৃত সত্যের অনুরূপ নয়, তাতেও বিন্দুমাত্র সংশয় থাকতে পারে না।


পিডিএফ লোড হতে একটু সময় লাগতে পারে। নতুন উইন্ডোতে খুলতে এখানে ক্লিক করুন।




দুঃখিত, এই বইটির কোন অডিও যুক্ত করা হয়নি