মূলপাতা বই আসহাবে রাসূলের জীবনকথা - ৬ষ্ঠ খন্ড

ভূমিকা
নম্র স্বভাব ও কোমল হৃদয়- একজন সৎ মানুষের বড়ো দুইটি গুণ। এমন গুণসম্পন্ন মানুষই সকল প্রকার উপদেশ, নীতিকথা, শিক্ষা-দীক্ষা, সত্য ও সঠিক পথের দিশা গ্রহন করতে সক্ষম হয়। ফুলের পাঁপড়ি প্রভাতের মৃদুমন্দ বায়ূর নীরব গতিতে হেলে যায়; কিন্তু শক্ত দণ্ডধারী বৃক্ষকে প্রবল ঝড়ো হাওয়া বিন্দুমাত্র হেলাতে পারে না। চোখের দৃষ্টি শিখা আয়না ভেদ করে যায়; কিন্তু পাথরের তীক্ষনধার তীরও কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। মানুষেরও ঠিক একই অবস্থা। নরম স্বভাব ও কোমল অন্তরের মানুষ সত্যের প্রতিটি আহবান মেনে নেয়: কিন্তু কঠিন হৃদয় ও রুক্ষ্ম মেজায মানুষের উপর বড় বড় মু‘জিযাও কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। এ ধরনের পার্থক্যের বিক্ষিপ্ত দৃষ্টান্ত সর্বত্র পাওয়া যেতে পারে। তবে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস পুরোটাই এ জাতীয় দৃষ্টান্তে ভরা।

কাফিরদের মধ্যে এমন অনেক দুর্ভাগার নাম আমাদের জানা আছে যারা হাজারো চেষ্টার পরও আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের সামনে মাথা নত করেনি। কিন্তু সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এমন হাজারো বুযুর্গ ছিলেন যাঁরা তাওহীদের আওয়ায শোনার সাথে সাথে ইসলামের বেষ্টনীতে প্রবেশ করেন। সাহাবীদের সাথে সাহাবিয়াত বা মহিলা সাহাবীরাও এই মর্যাদার অংশীদার।

শুধু অংশীদারই নন, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁরা পুরুষেরও অগ্রগামী। কোন রকম চেষ্টা-তদবীর ও জোর-জবরদস্তি ছাড়াই খাদীজা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের সামনে মাথা নত করেন। রাসূলে কারীম (সা) বলেছেন:

‘আমি সোমবার দিন নবুওয়াত লাভ করি, আর খাদীজা সেই দিনের শেষ ভাগে নামায পড়ে। ‘আলী পরের দিন মঙ্গলবার নামায পড়ে। তারপর যায়িদ ইবন হারিছা ও আবূ বকর নামাযে শবীক হয়।’

রাসূরুল্লাহর (সা) এ বাণী দ্বারা প্রমাণিত হয়, রিসালাত-সূর্য উদয় হওয়ার প্রথম দিনে এ বিশ্বের দিগন্তে যে আলো ফেলে, সে আলো এক কোমল হৃদয়, এক পবিত্র-আত্মা মহিলার জ্যোতির্ময় অন্তরকে ভেদ করে।

ইসলামের সূচনাপর্বে ইসলাম কবুল করার চেয়ে ইসরামের ঘোষণা দানের জন্য সাহস, নির্ভীকতা ও শক্ত মনোবলের প্রয়োজন ছিল। বেশী। কাফিরদের বাধা-বিপত্তি ও জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও পুরুষ সাহাবীদের পাশাপাশি মহিলা সাহাবীরাও চূড়ান্ত রকমের সাহস ও দৃঢ়তার সাথে নিজেদের ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন।

মহিলা সাহাবীরা খুব সহজে শুধু ইসলাম গ্রহণই করেননি, বরং তাঁরা অতি স্বচ্ছন্দভাবে ইসলামের প্রচারও করেছেন। সহীহ বুখারীর তায়াম্মুম’ অধ্যায়ে এসেছে, সাহাবয়ে কিরাম তাঁদের েএক অভিযানে একজন মহিলাকে বন্দী করে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে হাজির করেন। তার নিকট মশক ভর্তি পানি ছিল। সাহাবয়ে কিরাম পানির প্রয়োজনে তাকে বন্দী করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তার পানি নেন, তবে তার মূল্য পরিশোধ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) এমন সততায় মহিলাটি ঈমান আনে এবং তার প্রভাবে তার গোটা গোত্র মুসলমান হয়ে যায়। উম্মু শরাইক (রা) মক্কায় প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর মধ্যে এই উপলব্ধি সৃষ্টি হয় যে, যে সত্য তিনি লাভ করেছেন তা অন্যদের সামনেও তুলে ধরা একান্ত কর্তব্য। তিনি মক্কার বিভিন্ন বাড়ীতে গিয়ে মহিলাদের নিকট ইসলামের দা‘ওয়াত পৌছাতে থাকেন। বিষয়টি জনাজানি হয়ে গেলে কুরাইশ পাষণ্ডরা তাঁকে ধরে তাঁর গোত্রের লোকদের হাতে তুলে দেয়। তাদের হাতে তিনি অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হন। অবশেষে তাঁর মাধ্যমে তার গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেন।

পুরুষ সাহাবীদের সাথে মহিলা সাহাবীরাও অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও জুলু-অত্যাচার সহ্য করেন। সুমাইয়্যা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কর কাফিররা তাঁর উপর নানা রকম অত্যাচারের কসরত চালায়। মক্কার উত্তপ্ত বালুর মধ্যে লোহার বর্ম পরিয়ে দুপুরের রোদে দাঁড় করিয়ে রাখতো। তারপরেও তিনি ইসলামের উপর অটল থাকতেন। একদিন দুপুর রোদে লোহার বর্ম পরিয়ে তপ্ত বালুর উপর উপুড় করে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন সময় রাসূল (সা) সেই পথ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। সুমাইয়্যাকে (রা) লক্ষ্য করে বললেন : ‘ধৈর্য ধর্ জান্নাতই হবে তোমার ঠিকানা।’ এত অত্যাচার করেও কাফিররা তৃপ্ত হয়নি। অবশেষে আবূ জাহল বর্শা বিদ্ধ করে তাঁকে শহীদ করে দেয়।

হযরত ‘উমারের (রা) বোন ইসলাম গ্রহণ করলেন। সেকথা তাঁর কানে গেলে এমন নির্দয়ভাবে তাঁকে মারপিট করেন যে, তাঁর সারা দেহ রক্তে ভিজে যায়। তারপরেও তিনি বিন্তুমাত্র টললেন না। ‘উমারের (রা) মুখের উপর সাফ বলে দিলেন, যা ইচ্ছা করুন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেই ফেলেছি। ইসলাম গ্রহণের কারণে দাসী লুবাইনাকে (রা) ‘উমার (রা) মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে থেমে যেতেন। তখন বলতেন, তোমার প্রতি দয়া ও করুণাবশতঃ থেমে যাইনি, ক্লান্ত হয়ে থেমেছি। লুবাইনাও (রা) ছাড়ার পাত্রী নন। তিনি বলতেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ না করতেল আল্লাহও আপনাকে এমন শাস্তি দেবেন।[আনসাব আল-আশরাফ-১/১৯৭; ইবন হাজার এ সাহাবিয়ার নাম লাবীবা এবং ডাকনাম উম্মু ‘উবাইস বলেছেন। (আল-ইসাবা-৪/৩৯৯, ৩৭৫)

] এমনিভাবে যিন্নীরার (স্ত্রীর দাসী) উপরও কঠোর নির্যাতন চলাতেন। উম্মু শুরাইককে (রা) রুটি ও মধু খাইয়ে দুপুরের প্রচণ্ড রোদে উত্তপ্ত বালুর উপর রাখা হতো। পিপাসায় বুক শুকিয়ে যেত, এক ফোটা পানির জন্য কাৎরাতেন, পানি দেওয়া হতো না।

পুরুষ সাহাবীরা যখন ঈমান আনলেন তখন কাফিরদের সাথে তাদের সকল আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু এতে তাঁদের ঈমানী শক্তিতে কোন রকম তারতম্য সৃষ্টি হয়নি। মহিলা সাহাবীদের অবস্থা এ ব্যাপারে পুরুষ সাহাবীদের চেয়ে বেশী নাজুক ছিল। মানুষ যদিও তার সকল আত্মীয়-বন্ধুর সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে, তবে একজন নারীর জীবনের সকল নির্ভরশীলতা স্বামীকে কেন্ত্র করে গড়ে উঠে। জীবনের কোন অবস্থায়ই সে স্বামীর উপর বির্ভরতা ছাড়া চলতে পারে না। পিতা পুত্রের সাথে এবং পুত্র পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু একজন নারী স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একেবারে অসহায় হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও মহিলা সাহাবীরা এমন এক স্পর্শকাতর সম্পর্ককেও ছিন্ন করে ফেলেছেন এবং নিজেদের কাঠফর স্বামীদের থেকে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। সুতরাং হুদাইবিয়ার সন্ধির পর যখন এ আয়াত- (আরবী***********)[ নূরা আল-মুমতহিনা-১০] (তোমরা কাফির নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখ না) নাযিল হলো, তখন পুরুষ সাহাবী তাঁদের কাফির স্বামীদের ছেড়ে হিজরাত করে মদীনায় চলে যান এবং তাই হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন:[ বুখারী : কিতাবুশ শুরূত; যিকরু সুলহিল হুদায়বিয়া। (সাত পৃষ্ঠা)]

‘আমরা এমন কোন মুহাজির মহিলার কথা জানি না যে ঈমান এনে আবার মুরতাদ হয়েছে।’ পুরুষদের ক্ষেত্রে মুরতাদ হওয়ার দৃষ্টান্ত আছে।

কাফিররা মহিলা সাহাবীদেরকে নানা রকম শাস্তি দিত। কিন্তু তাঁদের কারও মুখ থেকে কালেমায়ে তাওহীদ ছাড়া শিরকমূলক কোন কথা কোনদিন উচ্চারিত হয়নি। উম্মু শুরাইক (রা) ঈমান আনলেন। তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা তাঁকে নিয়ে প্রচণ্ড রোদে দাঁড় করিয়ে দিল। তিনি যখন সূর্যের উত্তাপে জ্বলছেন, তখন তাঁকে রুটির সাথে মধুর মত গরম জিনিস খেতে দিত। পানি পান করতে দিত না। এ অবস্থায় যখন তিন দিন চলে গেল তখন জালিমরা বললো : ‘যে দ্বীনের উপর তুমি আছ তা ত্যাগ কর।’ তিনি িএমনই বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন যে, তাদের কথার অর্থ বুঝতে পারলেন না। যখন তারা আকাশের দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বুঝালো যে, তুমি তাওহীদ বা আল্লাহর একত্বকে অস্বীকার কর, তখন তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো, “আল্লাহর কসম, আমি তো এখনও সেই বিশ্বাসের উপর অটল রয়েছি”।[তাবাকাত-৮/১৫৪; নিসা’ হাওলার রাসূল০২৪৫]

সকল দেশে এবং সবকালে মেয়েরা সাধারণত প্রাচীন রীতি-নীতি, প্রথা ও প্রচলিত বিশ্বাস ও সংস্কার শক্তভাবে আঁকড়ে থাকে। আর আরবে অংশীবাদী চিন্তা-বিশ্বাস দীর্ঘকাল যাবত প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত থাকায় মানুষের অন্তরে তা শক্তভাবে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্তু মহিলা সাহাবীরা ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে প্রচলিত সকল বিশ্বাস ও সংস্কারকে অত্যন্ত প্রবলভাবে অস্বীকার করেন। আরববাসী মনে করতো, যদি কোন ব্যক্তি মূর্তির দোষ-ত্রুটি বলে বেড়ায় তাহলে সে শক্ত কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে হযরত যিন্নীরা (রা) ইসলাম গ্রহণের পর অন্ধ হয়ে গেলে কাফিররা বলতে শুরু করে যে, লাত ও ‘উয্যা তাকে অন্ধ করে দিয়েছে। একথা শুনে তিনি সাফ বলে দিলেন, লাত ও ‘উয্যার তার পূজারীদের কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমার যা কিছু হয়েছে, সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।[উসুদুল গাবা, খণ্ড-৫ (যিন্নীরা)]

জাহিলী যুগে আরবরা শিশুদের বিছানার নীচে ক্ষুর রেখে দিত্ তারা বিশ্বাস করতো, এতে শিমুরা ভূত-প্রেতের আছর থেকে নিরাপদ থাকে। একবার আয়িশা (রা) একটি শিশুর শিথানে ক্ষুর দেখতে পেয়ে এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এ ধরনের কুসংস্কারকে মোটেই পসন্দ করতেন না।[আদাবুল মুফরাদ: বাবু আত-তায়র]

আরবে শিরকের প্রধান উপকরণ ও কেন্দ্র ছিল মূর্তি। প্রতিটি বাড়ী, এমনকি প্রতিটি ঘরেই মূর্তি শোভা পেত। কিন্তু মহিলা সাহাবীরা ইসলাম গ্রহণের পর প্রতি মুহূর্তে, প্রত্যেকটি সুযোগে মূর্তির সাথে তাঁদের নেতিবাচক সম্পর্কের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। হিন্দ বিন্ত উতবা (রা) ঈমান আনার পর তাঁর ঘরে যে মূর্তি ছিল তা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলেন। তারপর মূর্তিকে লক্ষ্য করে বলেন, “আমরা তোর ব্যাপারে বড় ধোঁকার মধ্যে ছিলাম”। [তাবাকাত, খণ্ড-৮ (হিন্দ বিনত ‘উতবা)]

প্রখ্যাত সাহাবী আবূ তালহা (রা) যখন উম্মু সুলাইমকে (রা) বিয়ের প্রস্তাব দিলেন তখন তিনি বললেন : ‘আবূ তালহা১ তোমার কি একথা জানা আছে, যে খোদার তুমি পূজা করো তা একটি কাঠের তৈরী মূর্তি, সেই গাছ মাটিতে জন্মেছিল এবং অমুক হাবশী দাস সেটি কেটে মূর্তি তৈরী করেছিল। আবূ তালহা বললেন: ‘সেকথা আমার জানা আছে।’ উম্মু সুলাইম বললেন : ‘তাহলে তার পূজা করতে তোমার লজ্জা হয় না?’ যতক্ষণ পর্যন্ত আবূ তালহা মূর্তিপূজা ত্যাগ করে কালেমায়ে তাওহীদ উচ্চারণ করেননি, উম্মু সুলাইম (রা)তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হননি।[তাবাকাত, খণ্ড-৮ (উম্মু সুলাইম)]

ইসলামের প্রথম যুগের এই সুযোগ্য মহিলারা তাঁদের সন্তানদেরকে এমন যোগ্য করে গড়ে তোলেন যে, বিশ্ববাসী অবাক-বিস্ময়ে তাঁদের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকিয়ে দেখে। তাঁরা ইসলামকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন তাঁরা খিলাফতের প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র পরিচালনা, সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠা, সুষম অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন, মোটকথা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ইমন সব উদাহরণ পেশ করেন যা আজো মানুষকে বিস্শয়ে অভিভূত করে। যেমন : আসমা’ বিন্ত আবী বকর ও তাঁর ছেলে ‘আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবাইর, ফাতিমা বিনত আসাদ ও তাঁর ছেলে ‘আলী (রা), আন-নাওয়ার বিনত মালিক ও তাঁর ছেলে যায়দ ইবন ছাবিত, সাফিয়্যা বিন ‘আবদিল মুত্তালিব ও তাঁর ছেলে জা“ফর, উম্মু আইমান ও তাঁর ছেলে উসামা (রা) এবং আরো অনেকে।

এই মহিয়সী নারীগণ আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধ)- এর দায়িত্বও সে যুগে পালন করেছেন।

শিক্ষায়ও মহিলারা পুরুষের থেকে কোন অংশে পিছিয়ে থাকেননি। অসংখ্য ‘আলিম পুরুষ সাহাবীর নাম পাওয়া যায়ং। তবে তার পাশাপাশি মহিলাদের সংখ্যাও কম নয়। সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস যে সাতজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন তার সপ্তমজন মহিলা। তিনি উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশা (রা)। আল-আনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে, শরী’আতের হুকুম-আহকামের ইসতিমবাত ও ইজতিহাদে মহিলারা পুরুষের মতই দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

সমাজে সকল শ্রেণীর মানুষকে যে ইসলাম সমানভাবে দেখর নির্দেশ-দিয়েছে, কেবল পুরুষগণই তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং মহিলাগণও তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছেন। উহুদ যুদ্ধে হামযা (রা) ফুফু, ভাইয়ের কাফনের জন্য দুই খণ্ড কাপড় নিয়ে এলেন। দেখলেন হামযার (রা) রাশের পাশে আরেকজন আনসারী ব্যক্তির নগ্ন লাশ পড়ে আছে। ইসলাম সাফিয়্যার মধ্যে যে মূল্যবোধ সৃষ্টি করেছিল তা এই নগ্ন আনসারীর লাশকে উপেক্ষা করতে পালো না। তিনি একখানা কাপডড় এই আনসারীর কাফনের জন্য দানের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু কোনটি দেবেন? কার‘আর লটারী মাধ্যমে তা নির্ধারণ করেন। এভাবে তিনি সাম্য ও সমতার প্রতীকে পরিণত হন।[আল-মুফাসসাল ফু আহকাম আল-মারআতি ওয়াল বায়ত আল-মুসলিম-৪/৩৩৫৮, ৩৫৯ আল-ইসতী‘আব-৪/৩৩৫]

ইসলামের সেবায় ধন-সম্পদ উজার করে দিয়েছেলেন কি কেবর পুরুষরা? না, তা নয়। আমরা আবূ বকর (রা)ত, ‘উছমান (রা) ও অন্যদের দানের কথা জানি। কিন্তু উম্মুল মু‘মিনীন খাদীজার (রা) অঢেল সম্পদ রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভুলি কি করে? একদিন মদীনায় রাসূল (সা) হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভুলি কি করে? একদিন মদীনায় রাসূল (সা) একটি ঈদের সমাবেশে দান-খায়রাতের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করলেন। উক্ত সমাবেশে মহিলারাও ছিলেন। তাঁরা তাঁদের হাতের বালা, কানের দুল, গলার হার, হাতের আংটি কুলে খুলে রাসূলে কারীমের (সা) হাতে তুলে দেন। আসমার (রা) ছিল একটি মাত্র দাসী। তিনি সেটি বিক্রী করে সকল অর্থ ফী সাবীল্লিাহ দান করেন। উম্মুল ম’মিনীন যায়নাব বিনত জাহাস (রা) নিজ হাতে চামড়া দাবাগাত করতেন এবং তার বিক্রয় লব্ধ অর্থ গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন্

যুদ্ধের ময়দানেও কিছু সংখ্যক মহিলা সাহাবীকে উপস্থিত দেখা যায়। তাঁরা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ দুইভাবেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

সাফিয়্যা (রা) তো এক ইহুদীর মাথা কেটে ছুড়ে মারেন। এই বীরাঙ্গনাদের মধ্যে উম্মু সুলাইমের (রা) নামটিও শোভা পায়্ হুনাইন যুদ্ধে খঞ্জর হাতে উম্মু সুলাইম (রা) দ৭াড়িয়ে, রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন : এ খঞ্জর দিয়ে কি করবে? বললেন : শত্রু নিধন করবো।

ঈছার তথা অন্যের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের উপর অগ্রাধিকার দান সর্বযুগের সকল মানুষের নিকট নৈতিকতার উচ্চতম স্তরের গুণ বলে স্বীকৃত। এ গুণ অর্জন করা অত সোজা নয়। পুরুষ সাহাবীদের সধ্যে এ গুণের বিকাশ ব্যাপকভাবে আমরা লক্ষ্য করে থাকি। জীবনের অন্তিম ক্ষণে এক ঢোক পানি নিজে পান না করে পাশে আহত আরেক ভাইকে দেওয়ার জন্য ইঙ্গিত করছেন, তিনি আবার অন্যকে দেওয়ার ইঙ্গিত করছেন। এভাবে একগ্লাস পানি তিনজনের নিকট ঘুরে আবার যখন প্রখমজনের নিকট আসে তখন দেখা যায় তিনি আর বেঁচে নেই। এভাবে একে একে পরবর্তী দুইজনের একই পরিণতি হয়। তিনজনের প্রত্যেকেই নিজের জীবনের চেয়ে অন্যের জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটা পুরুষ সাহাবীদের জীবনের একটি চিত্র।

এ ক্ষেত্রে মহিলা সাহাবীরাও কিন্তু পিছিয়ে ছিলেন না। এ গুণটিরা ব্যাপক বিকাশ তাঁদের মধ্যেও ঘটেছিল। আয়িশা (রা) একদিন রোযা আছেন। ইফতারের জন্য ঘরে কেবল এক টুকরো রুটি আছে। ইফতারের আগে এক দুঃস্থ মহিলা এসে কিছু খেতে চায়। তিনি দাসীকে রুটির টুকরোটি তাকে দিতে বলেন। দাসী বলে, আপনি ইফতার করবেন কিভাবে? বললেন, ‘রুটির টুকরোটি তাকে দাও, ইফতারের কথা পরে চিন্তা করা যাবে।’

একদিন রাসূল (সা) বললেন, যে আজ রাতে এই লোকটিকে মেহমান হিসেবে নিয়ে যাবে আল্লাহ তার প্রতি সদয় হবেন। আবূ তালহা ৯রা) তাকে সংগে করে বাড়ীতে এলেন্ বাড়ীতে সেদিন ছোট ছেলে-মেয়েদের খাবার ছাড়া অতিরিক্ত কোন খাবার ছিল না। তাই স্ত্রী উম্মু সুলাইম (রা) বুলিয়ে বালিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়ালেন। তারপর যে সামান্য খাবার ছিল তা মেহমানের সামনে হাজির করেন এক ছুতোয় আলো নিভিয়ে নিজেরা কাবার না খেয়ে বসে থাকেন, আর মেহমান তা বুঝতে না পেরে পেট ভরে আহার করেন।

এই মহিলা সাহাবীগণ সতহ্য উচ্চারণে কারো চোখ রাঙ্গানি ও ভীতি প্রদর্শনকে পরোয়া করেননি। উমাইয়্যা খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা মু‘আবিয়া (রা) যখন ‘আয়িশার (রা) সংগে দেখা করতে আসেন তখন তিনি তাঁকে তাঁর কিচু কাজের জন্য তিরস্কার করেন। ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) ঘাতক স্বৈরাচারী হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ আসমার (রা) সাথে দেখা করতে এলে তিনি তাঁকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেন। এমনকি তাকে মিথ্যাবাদী ও দাজ্জাল বলে আখ্যায়িত করেন। দোর্দাণ্ড প্রতাপশালী উমাইয়্যা খলীফা আবদুল মালিক একদিন রাতে তাঁর এক চাকরতে কোন ত্রুটির কারণে অভিশাপ দেন। ঘটনাক্রমে সে রাতে প্রখ্যাত সাহাবিয়্যা উম্মুদ দারদা (রা) খলীফার মহলে অবস্থান করছিলেন। সকালে তিনি খলীফাকে ডেকে বলেন, গত রাতে তুমি চাকরকে অভিশাপ দিয়েছো। অথচ রাসূল (সা) কাউকে অভিশাপ দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। খলীফা লজ্জিত হন।

এভাবে জীবনের একেকটি দিক যদি খতিয়ে দেখা যায় তাহলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মহিলা সাহাবীগণ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমানভাবে এগিয়ে গেছেন। আসহাবে রাসীলের জীবনকথা, ৬ষ্ঠ খণ্ডে আমরা তাঁদের জীবনের এ সকল দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

আমাদের একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে, সাহাবয়ে কিরাম, পুরুষ ও মহিলা নির্বিশেষে অনেকের ইসলামী জীবন অতি সংক্ষিপ্ত। তাঁদের জীবনের বেশী সময় কেটেছে জাহিলী যুগে। তাই তাঁদের জীবনের পূর্ণ ইতিহাস পাওয়া যায় না। মানক জাতির ইতিহাসের বিস্ময়কর নায়ক ‘উমারের (রা) জাহিলী জীবনের দু‘একটি ঘটনা ছাড়া পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে অন্যদের ইসলাম-পূর্ব জীবন কতটুকু জানা সম্ভব তা সহজেই অনুমেয়।

প্রকৃতপক্ষে আমরা মহিলা সাহাবীদের পূর্ণাঙ্গ জীবন ইতিহাস রচনা করতে পারিনি। কারণ, সে তথ্য আমাদের হাতে নেই। যেটুক আমরা করেছি, তা তাঁদের জীবনের একটি খণ্ডচিত্র বলা যেতে পারে। তবে এসব চিত্র যেন একেকটি আলোর ঝলক। যুযগে যুগে মুসলিম মহিলারাও যাতে মহিলা সাহাবীদের জীবনকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে তাঁদের অনুসরণ করতে পারেন, এই লক্ষ্যে আমাদের প্রয়াস। পাঠক-পাঠিকাগণ যদি এ লেখা দ্বারা সামান্য উপকার পান তাহলে শ্রম সার্থক হবে।

আরেকটি কথা যা না বললেই নয়, তা হলো আসহাবে রাসূলের জীবনকথা লেখার পরিকল্পনা আসলে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম নাজির আমহদ সাহেবের। বেশ কয়েক বছর আগে এ বিষয়ে লেখার জন্য তিনি উৎসাহিত করেন। সেই যে শুরু করেছি, তারপর থেকে এ পর্যন্ত আমার প্রতিটি ধাপে তিনি নানাভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এর উত্তম প্রতিদান দিন- এই দু‘আ করি।

পরিশেষে পাঠক-পাঠিকাদের নিকট বিনীত নিবেদন, তাদের দৃষ্টিতে কোন ভুল ত্রুটি ধরা পড়লে তা লেখককে অবহিত করবেন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে তাঁর মর্জি মত কাজ করার তাওফীক দান করুন! আমীন!!

২৩ ডিসেম্বর ২০০৪

মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ

প্রফেসর

আরবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


পিডিএফ লোড হতে একটু সময় লাগতে পারে। নতুন উইন্ডোতে খুলতে এখানে ক্লিক করুন।




দুঃখিত, এই বইটির কোন অডিও যুক্ত করা হয়নি