মূলপাতা বই আসহাবে রাসূলের জীবনকথা - ৩য় খন্ড


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
ভূমিকা
আল-হামদুলিল্লাহ। ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা (তৃতীয় খণ্ড)’ প্রকাশিত হচ্ছে। ইচ্ছা ছিলো আরো আগে প্রকাশ করার; কিন্তু তা হয়নি। নানা কারণে বিলম্ব ঘটে গেছে। এ খণ্ডে বিশজন আনসারী সাহাবীর জীবনকথা এসেছে। আগের দু’টি খণ্ডের মত এখানেও অল্প কথায় এই মহান সাহাবীদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। প্রথম থেকেই পাঠকদের কাছে আমাদের অঙ্গীকার ছিল, অল্প কথায় সাহাবায়ে কিরামের রা. পরিচয় তুলে ধরার। আমরা তা রক্ষার চেষ্টা করেছি। তবে যে কথাগুলি বলা হয়েছে তার একটিও আমাদের নিজের নয়। সবই নির্ভরযোগ্য সূত্রসমূহ থেকে গৃহীত হয়েছে।
‘জীবনকথা (১ম খণ্ড ও ২য় খণ্ড)’ পাঠকদের হাতে পৌঁছার পর অনেকেই তাকীদ দিয়েছেন, আরো একটু বিস্তারিতভাবে লেখার জন্য। বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কারো পরামর্শই গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা মনে করি, তাঁদের ইচ্ছা পূরণ করবেন অন্যরা। সাহাবায়ে কিরামের কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখার অনেক কিছুই আছে।
যাঁরা আমার এ লেখার ধারা অব্যাহত রাখার পেছনে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক এ. কে. এম. নাজির আহমাদ, যিনি সর্বক্ষণ আমাকে লেখার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছেন, তাঁর প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দু’আ করি, আল্লাহ তা’য়ালা যেন তাঁকে সর্বোত্তম বিনিময় দান করেন।
পরিশেষে, বিনীতভাবে স্বীকার করছি, এ বই-এ যদি কোন ভুল ও অসংগতি থেকে থাকে অথবা সাহাবায়ে কিরামের প্রতি কোথাও বিন্দুমাত্র অশ্রদ্ধার ভাব প্রকাশ পেয়ে থাকে, তা সবই আমার নিজের ত্রুটি। সেগুলি আমার দৃষ্টিতে আনার জন্য সহৃদয় পাঠকদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।
আল্লাহ পাক আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে দীনের ন্যূনতম খিদমাত হিসাবে কবুল করুন। আমীন।
১লা সেপ্টেম্বর, ১৯৯৩
১৩ই রবী’উল আওয়াল, ১৪১৪
মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ
সহকারী অধ্যাপক,
আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
ঢাকা-১০০০।

মদীনার আনসারদের পরিচয়
আরবী ‘আল-আনসার’ শব্দটি বহুবচন। একবচনে ‘নাসের’ অর্থঃ সাহায্যকারী। রাসূলুল্লাহর সা. মক্কা হতে মদীনায় হিজরাতের পর সেখানকার যে সকল মুসলমান তাঁকে খোশ আমদেদ জানান ও সাহায্য করেন, তাঁদেরকে বলা হয় ‘আনসার’। মূলতঃ তাঁরা ছিলেন মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের জনগণ।
প্রাচীনকালের আরবের অধিবাসীদের তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। যথাঃ ১. আল-’আরাব আল-বায়িদা, ২. আল-’আরাব আল-’আরিবা, ৩. আল-’আরাব আল-মুসতা’রাবা। হযরত নূহের আ. প্লাবনের পর যেসব গোত্র আরবে শাসন কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং শেষে বিলীন হয়ে যায়, তাঁদের বলা হয় ‘বায়িদা’। ’আদ, সামুদ, ’আমালিকা, ত্বাসাম, জাদীস প্রভৃতি জাতি এর অন্তর্ভুক্ত। আর বায়িদার সমসাময়িক অন্যসব গোত্র, যারা তাদের পরে আরবের কর্তৃত্ব লাভ করে তাদের বলা হয় ’আরিবা। কাহত্বান, সাবা, হিমইয়ার, মুঈন প্রভৃতি তাদেরই শাখাসমূহ। আর মুসতা’রাবা বলা হয় ঐ সব গোত্রকে যারা ছিল নবী হযরত ইসমা’ঈলের আ. বংশধর এবং মূলতঃ তারা ছিল আরবের উত্তর অঞ্চলের অধিবাসী।
মদীনার আনসারদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এই যে, তারা আল-আরাব আল-’আরেবার বংশধর। এরই ভিত্তিতে আরবের নসববিদগণ তাদের নসবনামা কাহ্ত্বান ইবন ’আবের পর্যন্ত পৌঁছিয়ে থাকেন, যিনি আল-আরাব ’আরিবার উত্তরাধিকারী। তবে কাহত্বান থেকে নসববিদগণ দু’ভাগে ভাগ হয়ে যান। একদল বলেন, কাহ্ত্বান নিজেই এক স্বতন্ত্র খান্দানের প্রতিষ্ঠাতা। পক্ষান্তরে অন্যদল তাঁকে পৃথক কোন শাখা খান্দান মনে করেন না। তাঁরা কাহ্ত্বানকে নাবিত ইবন ইসমা’ঈলের সন্তান বলে মনে করেন। কালবী ও কতিপয় ইয়ামনবাসী এ মৃত পোষণ করেছেন। তাঁরা হযরত ইসমা’ঈলকে আ. সমগ্র আরবের পিতৃ-পুরুষ বলে মনে করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৭) তবে মাস’উদী বলেন, ইয়ামনবাসীরা যে কাহত্বানকে নাবিতের সন্তান মনে করে, একথা ঠিক নয়। বরং তারা কাহত্বানকে ’আবিরের সন্তান বলে থাকে। (কিতাবুত তানবীহ ওয়াল-আশরাফ-৮১)
যাই হোক, কাহ্ত্বান একটি স্বতন্ত্র খান্দান এবং একটি স্বতন্ত্র রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা। ইয়ামনে তাদের বংশধরগণ বহুকাল ক্ষমতার অধিকারী ছিল।
আরব ঐতিহাসিকরা আনসারদেরকে কাহত্বানের বংশধর বলে মনে করেন। এ কারণে তারা আনসারদের ইতিহাস কাহত্বানের সময় থেকে শুরু করেন। এই বংশে ’আবদি শামস নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা উপাধি ছিল ‘সাবা’। তাঁকেই ইয়ামনের ‘সাবা’ রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়। হিমইয়ার ও কাহ্লান নামে তাঁর দুই ছেলে ছিল। মৃত্যুর পূর্বে তিনি দুই ছেলে, রাজবংশের সদস্যবৃন্দ ও রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ডেকে অসীয়াত করে যান যে, ‘আমার বড় ছেলে হিমইয়ারকে রাজ্যের ডান ভাগ এবং ছোট ছেলে কাহ্লানকে বাম ভাগ দেবে।’ যেহেতু ডান হাতের জন্য তরবারি, চাবুক, কলম এবং বাম হাতের জন্য লাগাম, ঢাল ইত্যাদির প্রয়োজন। এজন্য সবাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, হিমইয়ার রাজা হবেন এবং রাজ্যের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করবেন কাহ্লান। এভাবে হিমাইয়ার রাজা হলেন। তারপর বংশ পরম্পরায় তারা সিংহাসনে অধিকারী হলেন। এবং কাহ্লানের বংশধরগণ রাজ্যের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করে চললেন।
রাজা আল-হারেস আর-রায়িশ-এর সময় ’আমর আল-মুযাইকিয়া এই একই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এই আমরের স্ত্রী তুরাইফা বিন্তু জাবর ছিল একজন ‘কাহেনা’ বা ভবিষ্যদ্বক্তা। এক রাতে সে স্বপ্ন দেখে যে, একটি ঘন, কালো মেঘ গোটা ইয়ামনকে ঘিরে ফেলেছে। বিদ্যুতের ঝলকানি এবং বজ্রপাতের দুর্বিসহ গর্জনে চারিদিক প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে। যেখানেই বজ্রপাত হচ্ছে, তা ধ্বংস্তূপে পরিণত হচ্ছে। সে ভীত-শংকিত অবস্থায় ঘুম থেকে উঠে আমরের কাছে স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে বলে, এখন আর কোন উপায় নেই। আমর জিজ্ঞেস করলেন, এখন আমাদের করণীয় কি? সে বললোঃ খুব তাড়াতাড়ি ইয়ামন ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে।
’আমর ছিলেন প্রচুর ধন-দৌলত, জীব-জন্তু ইত্যাদির অধিকারী। ইচ্ছা করলেই হঠাৎ কোথাও চলে যেতে পারেন না। তাছাড়া মানুষকে কী বলে যাবেন? এ জন্য এক বুদ্ধি আঁটলেন। বড় ছেলে সা’লাবাকে বললেন, আমি তোমাকে মানুষের সামনে একটা কাজের নির্দেশ দেব, আর তুমি তা পালন না করার ভান করবে। আমি ধমক দিলে তুমি আমার গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেবে। সা’লাবাকে বললেন, আমি তোমাকে মানুষের সামনে একটা কাজের নির্দেশ দেব, আর তুমি তা পালন না করার ভান করবে। আমি ধমক দিলে তুমি আমার গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেবে। সা’লাবা বললো, এমন কাজ আমার দ্বারা কেমন করে সম্ভব? ’আমর বললেন, ‘কল্যাণ এতেই রয়েছে।’ পরিকল্পনা অনুযায়ী ’আমর নেতৃস্থানীয় লোকদের খাবারের দা’ওয়াত দিলেন। সবাই উপস্থিত হলে তিনি সা’লাবাকে একটি কাজের নির্দেশ দিলেন এবং সে তা পালনে অস্বীকৃতি জানালো। ’আমর তাকে মারার জন্য নিযা হাতে উঠিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে সা’লাবা পিতার গালে জোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ’আমর বলে উঠলেন, ‘এমন অপমান!’ সা’লাবার ভাই তাকে মারার জন্য দাঁড়িয়ে গেল। ’আমর তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ছেড়ে দাও, আমি আমার বিষয়-সম্পত্তি বিক্রী করে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছি। এ ধৃষ্টতার জন্য আমি তাকে এক কপর্দকও দেবনা। এভাবে ’আমর তাঁর বিষয়-সম্পদ উচ্চমূল্যে বিক্রী করে নিজের পরিবার-পরিজনসহ ইযামন থেকে বেরিয়ে পড়েন। এরপর ’আরাম বাঁধ ভেঙ্গে গোটা ইয়ামন তলিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
’আমর ‘মারিব’ থেকে বের হয়ে প্রথমে আক্কায় আশ্রয় নেন এবং তাঁর তিন ছেলে- হারেস, মালিক ও হারেসাকে সামনে এগিয়ে যেতে বলেন। তারা ফিরে আসার পূর্বেই ’আমর মারা যান এবং তার বড় ছেলে ‘সা’লাবাতুল ’আনকা’ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। পরবর্তীকালে তারা এ আক্কা থেকেও হিজরাত করে এবং আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং হিজাযের মক্কায় খুযা’য়া, শামে গাস্সান এবং ইয়াসরিবে (মদীনা) আউস ও খাযরাজ বসতি স্থাপন করে। এভাবে ‘সাবায়ে উলা’ বা প্রথম সাবা রাজত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। আর তখন থেকেই আরবী প্রবাদ ‘তাফাররাকূ আইদী সাবা’- সাবাদের ক্ষমতার মত বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে- প্রচলিত হয়।
কেউ কেউ এটাকে একটা বানোয়াট কাহিনী বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
আবার অনেকে আনসারদেরকে নাবিতের বংশধর বলেছেন। তারা মনে করেন, নাবিতের সময় থেকে আনসারদের ইতিহাসের সূচনা। তাহলে আনসাররা ’আল-আরাব আল-মুস্তা’রাবার অন্তর্ভুক্ত হবেন।
আরবীতে নাবিত, হিব্রুতে নায়াবুত। তাওরাতে তাঁকে হযরত ইসমা’ঈলের আ. সন্তানদের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে হযরত ইসমা’ঈলের আ. জ্যেষ্ঠ পুত্র বলা হয়েছে। আরব ঐতিহাসিকরা খুব সংক্ষেপে তাঁর পরিচয় দিয়েছেন। তাবারী বলেছেনঃ আল্লাহ নাবিত ও কাইদার-এর দ্বারা আরবদের বংশবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। (তাবারী- ১/৩৫২) ইবন হিশাম তাঁর সীরাতে লিখেছেনঃ হযরত ইসমা’ঈলের আ. পরে কা’বার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব তাঁর ছেলে নাবিতের হাতে পৌঁছে।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬৩) এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় নাবিত মক্কার অধিবাসী ছিলেন এবং হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমা’ঈল নির্মিত কা’বা ঘরের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব লাভ করেন। এছাড়া তাঁর সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় না।
মক্কা ছিল শুষ্ক পাহাড়ী ভূমি। এ কারণে নাবিতের মৃত্যুর পর তাঁর নিজের ও তাঁর ভাইদের সন্তানরা আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। নাবিতের সন্তানরা আরবের উত্তর-পশ্চিম অংশে আবাসন গড়ে তোলে। তবে কাইদার-এর সন্তানরা তখনও মক্কায় থেকে যায়। পরবর্তীকালে মুদাদ বিন হামী মক্কার কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নিলে তারা মক্কা ছেড়ে কাজেমা, গুমার জীকুন্দাহ, শা’ছামীম প্রভৃতি অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, নাবিতের সন্তানরা হিজাযের উত্তর এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল। এখানে তারা হযরত ’ঈসার জন্মের চার শো বছর পূর্বে ‘আনবাত’ নামে একটি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। খ্রীস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে এই নাবাতী সাম্রাজ্য খুবই প্রতাপশালী হয় এবং উত্তর আরব থেকে সাবা সাম্রাজ্যের মূলোৎপাটন করে। খ্রীঃ পূঃ ৬২ সনে হারেস সিংহাসন লাভ করেন। তিনি এ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় প্রতাপশালী বাদশাহ ছিলেন। মোটকথা, খ্রীস্টীয় দ্বিতীয় শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত এই নাবাতীরা অত্যন্ত প্রতাপের সাথে রাজত্ব করেন।
এই আনবাতের বংশধরদের অন্য একটি শাখা আছে। তারা কোন এক অজ্ঞাত যুগে ইয়ামনে বসতি স্থাপন করে। তারা আয্দ অথবা আসাদ গোত্র। তারা নাবিত ইবন মালিকের বংশধর। সম্ভবতঃ ইসমা’ঈলীদের ইয়ামনে বসতি স্থাপনের সময় বা তার পরে এই লোকেরা সেখানে যায়। তারা মা’রিব-এ বসবাস করতো। কালক্রমে তাদের লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অভাব ও অন্যসব অসুবিধার কারণে তারা মা’রিব ছাড়তে বাধ্য হয়। যখন তারা মা’রিব ত্যাগ করে তখন তাদের নেতা ছিলেন ’আমর ইবন ’আমের। তিনি ইতিহাসে ‘মুয়াইকিয়া’ নামে খ্যাত। মূলত তিনিই গোটা আনসার সম্প্রদায় ও গাস্সানীদের আদিপুরুষ। আনসারদের ইতিহাস তাঁর সময় থেকেই পরিষ্কারভাবে জানা যায়।
’আমর প্রথমতঃ মালিক ইবন ইয়ামন ও আয্দ গোত্রকে সংগে করে মা’রিব থেকে বের হন। আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু যুগ ধরে তাঁর বংশধরগণ বসবাস করতে থাকে। ইতিহাসের এক পর্যায়ে এই ’আমরের অধস্তন পুরুষরা ইয়াসরিব ও তার আশে-পাশে বসতি স্থাপন করে। তারাই মদীনার বিখ্যাত আউস ও খাযরাজ গোত্রের পূর্বপুরুষ।
আনসারদের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে যত কথাই প্রচলিত থাক না কেন, প্রকৃতপক্ষে মদীনার আনসারদের সবগুলি গোত্র আউস ও খাযরাজ নামের দু’ব্যক্তি থেকে উৎসারিত। তাদের পিতার নাম হারেসা এবং মাতার নাম কাইলা বিনতু ’আমর ইবন জাফনা। ’আদী নামে তাঁদের আর এক ভাই ছিলেন, তাঁর বংশধরগণও মদীনায় বিদ্যমান ছিল। খাযরাজ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে আউস সম্পর্কে এতটুকু জানা যায় যে, তিনি একজন খতীব (বক্তা) ও শা’য়িব (কবি) ছিলেন। তাঁর নামে বর্ণিত কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা সংরক্ষিত আছে। এই আউস, খাযরাজ ও ’আদীর বংশধরগণ ইয়াসরিবে বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন উপগোত্রে বিভক্ত হয়। যথাঃ
’আদীঃ তাঁর নামে পৃথক কোন শাখা গোত্র নেই। অনেকের ধারণা তাঁর সন্তানরা আউস ও খাযরাজের সাথে মিলে এক হয়ে গেছে। কারণ, আরবে ভাতিজারা চাচার খ্যাতির কারণে তাঁর সন্তান রূপে প্রসিদ্ধি পায়। (উসুদুল গাবা- ৫/২০৪)
আউসঃ মালিক নামে তাঁর ছিল এক ছেলে। আর এই মালিকের ছিল পাঁচ ছেলে, যারা প্রত্যেকেই পৃথক শাখা গোত্রের উর্ধতন পুরুষ। যথাঃ ’আমর ইবন মালিক, ’আওফ ইবন মালিক, মুররা ইবন মালিক, ইমরাউল কায়েস ইবন মালিক ও জাশাম ইবন মালিক।
খাযরাজঃ খাযরাজের ছিল পাঁচ ছেলেঃ ’আমর আওফ, জাশাম, কা’ব ও হারেস। রাসূলুল্লাহর সা. দাদা আবদুল মুত্তালিবের মাতুল গোত্র বনু নাজ্জারের সকল শাখাই ছিল ’আমর ইবন খাযরাজের বংশধর।
আনসারদের পূর্ব-পুরুষের মদীনায় আগমণের পূর্বেই সেখানে ইহুদীরা বসতি স্থাপন করেছিল। অনেকের মতে তারা হযরত সুলাইমানের আ. সময়ে, আবার অনেকের মতে বখ্তে নাসরের বায়তুল মাকদাস ধ্বংসের পরে তারা আরবে আসে এবং ইয়াসরিব ও তার আশে-পাশের এলাকায় অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে আউস ও খাযরাজের পূর্বপুরুষরা এসে দুর্গ ও বাড়ীঘর তৈরী করে বসবাস শুরু করে। তারা ইহুদীদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করে; কিন্তু কালক্রমে তাদের সংখ্যা বেড়ে গেলে ইহুদীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয় এবং পরে তা শত্রুতায় পরিণত হয়।
আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা প্রথমে ইয়াসরিবের একই এলাকায় বসবাস করতো। পরে ইহুদীদের শক্তি কিছুটা খর্ব হলে তারা সেখানকার গোটা নিচু ও উঁচু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে পৃথক বসতি অঞ্চল গড়ে তোলে।
আউস ও খাযরাজ গোত্র দু’টি দীর্ঘকাল পরস্পর মিলেমিশে বসবাস করে। কিন্তু এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হয় এবং তারা একের পর এক ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইসলামের আবির্ভাব না হলে তারা হয়তো পৃথিবী হতে বিলীন হয়ে যেত। ‘খুলাসাতুল ওয়াফা’ গ্রন্থের লেখক বলেনঃ ‘অতঃপর তাদের মধ্যে এত বেশী যুদ্ধ সংঘটিত হয় যে, অন্য কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে তার চেয়ে বেশী ও দীর্ঘ যুদ্ধের কথা আর শোনা যায় না।’ ‘সামীর’ যুদ্ধ থেকে শুরু ‘বুয়াস’ যুদ্ধে তার পরিসমাপ্তি। ‘বুয়াস’ যুদ্ধটি হয় রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পাঁচ বছর পূর্বে। এই দুই যুদ্ধের মাঝখানে কত যুদ্ধ যে হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। ইতিহাসে শুধু বড় যুদ্ধগুলির কথা বর্ণিত হয়েছে। (আল কামিল ফিত তারীখ-১/৫০৩)
আনসারদের প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস
আনসারগণ যদি নাবিত ইবন ইসমা’ঈলের বংশধর হন তাহলে আদিতে তাদের ধর্মবিশ্বাসও তাই ছিল, যা ইসমা’ঈল আ. ও তাঁর সন্তানদের ছিল। পরবর্তীকালে ’আমর ইবন লুহাই যখন আরবে মূর্তিপূজার প্রচলন করে তখন অন্য ইসমা’ঈলীদের মত তারাও মূর্তিপূজা শুরু করে। আনসারদের পূর্বপুরুষের ইয়ামান অবস্থানকালের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ইয়াসরিবে বসবাসের পর থেকে তাদের সম্পর্কে মোটামুটিভাবে জানা যায়। খাযরাজ বংশের আদিপুরুষ থেকে চতুর্থ অধঃস্তন পুরুষ হলেন নাজ্জার। তিনিই বনু নাজ্জারের আদি পুরুষ। ইতিহাসে তার আসল নাম ‘তাইমুল লাত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (তাবারী-১/১০৮৫) কিন্তু পরে পরিবর্তন করে ‘তাইমুল্লাহ’ রাখা হয়। ইবন হিশাম তাঁর সীরাতে এ নামটি উল্লেখ করেছেন। সম্ভবতঃ আনসারদের ইসলাম গ্রহণের পর এ পরিবর্তন ঘটেছে। পরিবর্তনের এমন নজীর আরো আছে। জাহিলী যুগের ‘বনু সাম্মা’ ইসলামী যুগে ‘বনু সুমাই’য়া নাম ধারণ করে। এ নাম রাখেন খোদ রাসূল সা.। (উসুদুল গাবা- ৫/১৭৯) গোত্রের মত বহু ব্যক্তিরও নামের পরিবর্তন ঘটেছে।
যাই হোক, ‘তাইমুল লাত’ দ্বারা বুঝা যায়, আনসারদের মধ্যে ‘লাত’ দেবীর পূজা হতো। আনসারদের কোন কোন গোত্র ‘আউসুল্লাহ’ বলে পরিচয় দিত। হতে পারে পূর্বে তা ‘আউসুল লাত’ ছিল। আরব ঐতিহাসিকরা ‘মানাত’কে আনসারদের দেবী বলে উল্লেখ করেছেন। এই ‘মানাত’ ছিল নাবাতীদের দেবী। কুরআনের সূরা ‘নাজম’-এ এর কথা এসেছে। ‘মু’জামুল বুলদান’-এ বলা হয়েছে, ইসমা’ঈলের বংশধরদের সবচেয়ে পুরাতন দেবী হচ্ছে ‘মানাত’। (৮/১৬৭) তারপর ‘লাত’-এর পূজা শুরু হয়। (৭/৩১০) আউস, খাযরাজ ও গাস্সানের লোকেরাও মানাত-এর পূজা করতো। (তাবাকাত- ১/১০৬) তাছাড়া আরবের অন্যান্য গোত্র, যেমন হুজাইল, খুযা’য়া, আয্দ শানওয়া, বনী কা’বও এর পূজারী ছিল।
একথা ঠিক নয় যে, ইয়াসরিববাসী শুধু লাত ও মানাত-এর পূজা করতেন, অথবা আরবের আর কোন গোত্র এ দু’দেবীর পূজা করতো না। বরং লাত ও মানাত-এর পূজা করতেন, অথবা আরবের আর কোন গোত্র এ দু’দেবীর পূজা করতো না। বরং লাত ও মানাত ছাড়া অন্যান্য ছোট-বড় আরো অনেক দেব-দেবীর পূজা ইয়াসরিববাসী যেমন করতেন, তেমনি আরবের অন্যান্য গোত্রও লাত-মানাত-এর পূজা করতো।
ঐতিহাসিক তাবারী রাসূলুল্লাহর সা. হিজরাত প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। একবার হযরত আলীকে রা. মদীনার কুবায় একজন মুসলিম মহিলার গৃহে কয়েক রাত অবস্থান করতে হয়। এ সময় তিনি প্রতিদিন রাতে দরযা খোলার শব্দ শুনতে পেতেন। মহিলাটি দরযা খুলে বাহির থেকে কিছু জিনিস ঘরে উঠিয়ে রাখতেন। তিনি ছিলেন বিধবা। একদিন আলী রা. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, প্রতিদিন রাতে এভাবে দরযা খোলা হয় কেন? তিনি বললেন, আমি এক অনাথ মহিলা। এ কারণে সাহ্ল ইবন হুনাইফ রাতের বেলা তার গোত্রের মূর্তি ভেঙ্গে গোপনে তার কাঠগুলি আমার জ্বালানীর জন্য দিয়ে যায়। (তাবারী- ৩/১২৪৪) এতে বুঝা যায় ইয়াসরিববাসীদের গৃহে কাঠের তৈরী বহু মূর্তি ছিল।
আমর ইবন জামূহ ছিলেন বনী সুলামার একজ অতি সম্মানিত ব্যক্তি। হযরত মু’য়াজ ইবন জাবাল রা. মুসলমান হওয়ার পর ‘আমরের মানাত’ নামক কাটের বিগ্রহটি রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে উঠিযে নিয়ে দূরে ফেলে আসতেন। আমর আবার তা কুড়িয়ে আনতেন। এমনিভাবে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গৃহে নিজস্ব বিগ্রহ ছিল। তাছাড়া প্রায় প্রত্যেক গোত্রের মূর্তি উপাসনার জন্য মন্দির ছিল। ইয়াকূত আল-হামাবী বলেছেনঃ আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মত মানাত দেবীর এত বেশী সম্মান আর কোন গোত্র করতো না। (মু’জামুল বুলদান- ৮/১৬৮)
আউস ও খাযরাজ গোত্রে এমন কিছু লোক ছিলেন যাঁরা মূর্তিপূজা করতেন না। তাঁরা ছিলেন এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তাদের অনেক মদীনা ও খাইবারের ইহুদীদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। অনেকে আবার ‘হানীফী’ ধর্মেরও অনুসারী ছিলেন। আনসারদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে ইবন হিশাম বলেছেনঃ ‘আউস ও খাযরাজরা ছিলেন মুশরিক। তাঁরা মূর্তিপূজা করতেন। তাঁরা জান্নাত, জাহান্নাম, কিয়ামত, হাশর, নশর, কিতাব, হালাল ও হারাম কিছুই জানতেন না। (সীরাত- ১/৩০৪)’ সামগ্রিক অবস্থা ছিলো এটাই।
আনসারদের মধ্যে ইসলামের সূচনা
জাহিলী যুগে মক্কার সাথে আনসারদের যোগাযোগ ছিল হজ্জ, ’উমরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি উপলক্ষে তাঁরা মক্কায় আসতেন। নিজেদের গৃহযুদ্ধ এবং ইহুদীদের শত্রুতার কারণে তাঁরা মক্কার সমর্থন ও সাহায্য লাভের আশায় সেখানে আসতেন। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকদের মক্কাবাসীদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। মক্কা ও মদীনার লোকদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ও মৈত্রী চুক্তিও ছিল।
বর্ণিত আছে, মদীনাবাসীদের মধ্যে সর্বপ্রথম সুওয়ায়িদ ইবন সামিত রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে ইসলামের দা’ওয়াত লাভ করেন এবং তাঁর মুখ থেকে পবিত্র কুরআন শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি ছিলেন মদীনার ’আমর ইবন ’আওফ গোত্রের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। সেই জাহিলী যুগেই তিনি আরববাসীর নিকট থেকে ‘কামিল’ উপাধি লাভ করেন। মক্কায় গেলে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ইসলামের দাওয়াত শুনে তিনি বলেনঃ ‘আপনার নিকট যা আছে, আমারও নিকট প্রায় একই জিনিস আছে।’ রাসূল সা. প্রশ্ন করলেনঃ আপনার কী আছে? তিনি বললেনঃ ‘সাহীফা-ই-লুকমান’। রাসূল সা. কিছু শোনার ইচ্ছাপ্রকাশ করলে তিনি কিছু শোনালেন। রাসূল সা. সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেনঃ আমার কাছে এর চেয়ে ভালো জিনিস আছে। আর তা হচ্ছে ‘কুরআন’। তিনি কুরআন শুনে মুগ্ধ হলেন। ফল এই দাঁড়ালো যে, ইবন হিশামের মতে, ‘তিনি ইসলাম থেকে দূরে থাকলেন না।’ তিনি মদীনায় ফিরে গেলে খাযরাজীদের হাতে নিহত হন। ‘আমর ইবন ’আওফ গোত্রের ধারণা, তিনি মুসলমান অবস্থায় মারা গেছেন। এটা বু’য়াস যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১৬)
এরপর ’আবদুল আশহাল গোত্রের কয়েক ব্যক্তিকে সংগে করে আবুল মাইসার আনাস ইবন রাফে ’আসেন মক্কায়। উদ্দেশ্য, কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করা। এই দলে ছিলেন ইয়াস ইবন মু’য়াজ। মক্কায় তাঁদের উপস্থিতির সংবাদ পেয়ে রাসূল সা. তাঁদের সাথে দেখা করে ইসলামের দা’ওয়াত দেন। ইয়াস ছিলেন তরুণ। রাসূলুল্লাহর সা. মুখে কুরআন শুনে তিনি সঙ্গীদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘তোমরা যে কাজের জন্য এসেছো এটা তার চেয়ে ভালো। মদীনায় ফিরে তিনি মারা যান। রাসূলুল্লাহর সা. এই স্বল্প সুহবতে তিনি ইসলামকে এতটুকু বুঝেছিলেন যে, জীবনের শেষ মুহুর্তে শুধু তাকবীর উচ্চারণ করেছিলেন এবং মানুষকে আল্লাহর হাম্দ ও সানা শুনিয়েছিলেন। তাঁর গোত্রের লোকদের ধারণা, তিনি মুসলমান ছিলেন। (মুসনাদ- ৫/৪২৭)
মদীনাবাসীদের মধ্যে প্রথম মুসলমান কে, এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ আছে। এ ব্যাপারে যাঁদের নাম বিভিন্ন ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন, তাঁরা হলেনঃ রাফে ’ইবন মালেক যারকী, মু’য়াজ ইবন ’আফরা’, আস’য়াদ ইবন যুরারাহ্, জাকওয়ান ইবন ’আদী, জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ রা. প্রমুখ। (দ্রঃ তাবাকাত- ১/১৪৬; যারকানী- ১/৩৬১)
প্রকৃতপক্ষে মদীনার আনসারদের মধ্যে ইসলামের প্রচার-প্রসারের সূচনা ’আকাবার প্রথম বাই’য়াত থেকে। ’আকাবা বলা হয় পর্বতাংশকে। এখানে ’আকাবা বলতে বুঝায় ’মিনার জমরায়ে ’আকাবার সাথে মিলিক পর্বতাংশকে। এ স্থানে মদীনা থেকে আগত আনসারগণের তিন দফায় বাই’য়াত নেয়া হয়। প্রথম দফায় নেয়া হয় নবুওয়াতের একাদশ বর্ষে। তখন মোট ছয়, মতান্তরে আটজন লোক ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত নিয়ে মদীনায় ফিরে যান। এটা ’আকাবার প্রথম বাই’য়াত। এতে মদীনার ঘরে ঘরে ইসলাম ও নবী কারীমের সা. চর্চা শুরু হয়। পরবর্তী বছর হজ্জের মওসুমে বারো জন লোক সেখানে একত্রিত হন। এঁদের পাঁচজন ছিলেন আগের এবং সাতজন নতুন। তাঁরা সবাই রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করেন। এটা ’আকাবার দ্বিতীয় বাই’য়াত। তাঁরা রাসূলুল্লাহর কাছে আবেদন জানান যে, তাঁদের কুরআনের তা’লীম দানের উদ্দেশ্যে সেখানে কাউকে পাঠানো হোক। তিনি হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমারকে রা. পাঠালেন। তিনি মদীনার মুসলমানদের কুরআন পড়ান ও ইসলামের তাবলীগ করেন। ফলে মদনিায় ইসলামের দ্রুত ও ব্যাপক প্রসার ঘটে।
অতঃপর নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে সত্তর, মতান্তরে তিহাত্তর জন পুরুষ ও দুই জন মহিলা হজ্জ মওসুমে আবার ’আকাবায়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মিলিত হন এবং বাই’য়াত করেন। এ হলো ’আকাবার তৃতীয় বা সর্বশেষ বাই’য়াত। সাধারণতঃ বাই’য়াতে ’আকাবা বলতে একেই বুঝানো হয়্ এ বাই’য়াতটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও কাজ, কাফিরদের সাথে জিহাদ এবং মহানবী হিজরাত করে মদীনায় গেলে তাঁর হিফাজত ও সাহায্য সহযোগিতার জন্য নেয়া হয়। বাই’য়াতের পর রাসূল সা. তাঁদের মধ্য থেকে বারো জন নাকীব বা প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। তাঁরা সবাই ফিরে গিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পথ ও পরিবেশ তৈরী করেন।
এই তৃতীয় বা সর্বশেষ আকাবায় যে ৭২/৭৫ জন লোক অংশগ্রহণ করেন তাঁদের মধ্যে ১১ জন আউস গোত্রের এবং দু’জন মহিলাসহ মোট ৬৪ জন খাযরাজ গোত্রের (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/২৪৯-২৫৫)
আনসারগণ ইসলামের সাহায্য ও সহযোগিতায় কোনরূপ ত্রুটি করেননি। নিজেদের নজীরবিহীন কুরবানী ও সাহায্য দ্বারা ইসলামের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তাঁদের বীরত্ব ও ত্যাগের কাহিনীতে ইতিহাস পরিপূর্ণ। বদর যুদ্ধে দু’শো তিরিশ জন আনসার শরীক হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৭০ জন ছিলেন খাযরাজ গোত্রের এবং বাকী আনসার আউস গোত্রের। এ যুদ্ধে ব্যবহৃত সর্বমোট ৭০টি উটের মধ্যে হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা আল-খাযরাজী একাই ২০টি উট দান করেছিলেন। এ বদরের যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী চৌদ্দ জনের আটজনই ছিলেন আনসার। উহুদের যুদ্ধে বহু সংখ্যক আনসার অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সত্তর জন (৭০) শহীদের মধ্রে ছেষট্টিজনই (৬৬) ছিলেন আনসার। কারো কারো শরীরে ৭০ টি আঘাত লেগেছিল। বি’রে মা’উনার শহীদদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলেন আনসার। (ইসলামী বিশ্বকোষ- ১ম খণ্ড, আনসার)
ইসলামের জন্য আনসারদের ত্যাগ তিতিক্ষার বিবরণ অল্প কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁরা তাঁদের জান-মালসহ সবকিছু ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেন। মদীনা আগত মুহাজিরদের জন্য তাঁরা নিজেদের অর্থ সম্পদ ও বাড়ী-ঘর ভাগ করে দেন। তাঁরা যে সততা ও উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, মানব ইতিহাসে তা খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। এ কারণে তাদের প্রতি রাসূলের সা. গভীর মুহাব্বত ছিল। তিনি তাদের অবদান, ত্যাগ ও কুরবানী যথার্থ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। তিনি কথা ও কাজের দ্বারা তাঁদের এ অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। আনসারদের প্রতি ভালোবাসাকে তিনি ঈমানের অংশ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাসী কোন ব্যক্তিই আনসারদের প্রতি বৈরিতা পোষণ করতে পারেনা। আনসারদের প্রতি বিদ্বেষকে তিনি মুনাফিকের স্বভাব-প্রকৃতি বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি আনসার ও তাঁদের সন্তান-সন্তুতির ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষণের জন্য দু’আ করেছেন। তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টি থেকে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনের একাধিক স্থানে আনসার শব্দটি এসেছে। তার মধ্যে সূরা তাওবার ১০০ ও ১১৭ নং আয়াতের একাংশ মদীনার আনসার মুসলমানদের প্রতি সরাসরি প্রযুক্ত হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ
১. ‘আর যারা সর্বপ্রথম হিজরাতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হলো মহান কৃতকার্যতা।’ (আত-তাওবা-১০০)
২. ‘আল্লাহ দয়াশীল নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সংগে ছিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি, নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়।’ (আত-তাওবা-১১৭)
এছাড়া কুরআনের আরো বহু আয়াতে, কোথাও প্রত্যক্ষ আবার কোথাও পরোক্ষভাবে আনসারদের সাহসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন সূরা আল-হাশর-এর ৯ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ
‘যারা মুহাজিরদের আগমণের পূর্বে মদীনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে, মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করেনা এবং নিজেরা অভাবগ্রস্থ হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে। যারা কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।’


পিডিএফ লোড হতে একটু সময় লাগতে পারে। নতুন উইন্ডোতে খুলতে এখানে ক্লিক করুন।




দুঃখিত, এই বইটির কোন অডিও যুক্ত করা হয়নি