মূলপাতা বই আমরা সেই সে জাতি - ৩য় খন্ড

ইবনে জাহাশের কাফেলা

মহানবীর (সা) শিশু রাষ্ট্র মদীনা তখন উত্তাল সাগর ঘেরা এক দ্বীপের মত। মক্কা থেকে হিজরত করার পর তখন এক বছর গত হয়েছে। ক’দিন আগে মক্কা থেকে প্রেরিত কাফেলা কুরাইশদের একটা বাহিনী কুর্জ ইবনে জাবেরের নেতৃত্বে গোপনে এসে অতর্কিতে মদীনার এক প্রান্তরে চড়াও হয়ে মুসলমানদের একটা পশুপাল ধরে নিয়ে গেল।
এমন ধরনের আরও আক্রমণের আশংকা মদীনার মুসলমানদের চিন্তিত করে তুলল। খবর এল, বড় একটা আয়োজন করেছে মক্কার কাফেররা। মদীনায় তারা বড় কিছু ঘটাতে চায়।
একটা কাফেলা সাজালেন মহানবী (সা)। কাফেলার যাত্রী ৮ জন মুসলামন চারটি উটে। কাফেলার অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ।
কাফেলা কোথায় যাবে, কি করবে কেউ জানে না। কাফেলার অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশও নয়।
যাত্রার মুহূর্তে মহানবী (সা) একটি চিঠি খুলবে। চিঠির নিদের্শ অনুসারে কাজ করবে। তবে কাউকে তা করতে বাধ্য করবে না।
দু’দিন চলার পর চিঠি খুলল আবদুল্লাহ। দেখল চিঠিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে অবস্থান করে গোপনে মক্কার কাফেরদের গতিবিধির উপর নিয়মিত খবর পাঠাতে হবে মদীনায়।
অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ। বন্দী ও মৃত্যু অবধারিত, এমন এক বিপজ্জনক শত্রু-পুরীতে বসে তাদের কাজ করতে হবে।
বিষয়টি কাফেলার সবাইকে জানিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ঘোষণ করলেন, ভাইসব, কোন জোর নেই, কোন জবরদস্তি নেই। যার ইচ্ছা হয় দেশে ফিরে যান। আর ইসলামের জন্য, আল্লাহর জন্য শহীদের গৌরবজনক মুত্যু যাদের অভিপ্রায়, তারা আমার সাথে আসুন।
বলে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ কারো দিকে না তাকিয়ে নবীর (সা) আদেশ পালনের জন্য রাখলার দিকে পা বাড়ালেন।
দেখা গেল, আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের পেছনে সমান তালে পা ফেলে এগিয়ে চলল অবশিষ্ট সাতজন।
কারো দৃষ্টিই ফেলে আসা পেছনের দিকে নয়। শহীদি মৃত্যুও হাতছানিতে তারা যেন ভুলে গেছে পেছনের সব।

জান্নাতের সুগন্ধ

আনাস ইবনে নযর বদর যুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। মুসলমানদের প্রথম অগ্নি-পরীক্ষায় শরীফ হতে না পারায় ভীষণ দুঃখ তাঁর। দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি একদিন মহানবী (সা)-কে বললেন, আল্লাহ যদি মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোন সুযোগ আমাকে দেন, তাহলে দেখবেন কিভাবে যুদ্ধ করি।
সুযোগ এলো আনাস ইবনে নযরের জীবনে।
ওহোদ যুদ্ধের দিন।
প্রচণ্ডযুদ্ধ।
এক মহাসন্ধিক্ষণে মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।
ওদের (কাফেরদের) কাজের সাথে আমার সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করছি।
তারপর ছুটলেন আনাস ইবনে নযর যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। পথে দেখা হলো সা‘আদ ইবনে মু’য়াযের সাথে। বললেন আনাস সা‘আদকে, ‘এ মুহূর্তে জান্নাতই আমার একমাত্র কাম্য, ওহোদের প্রান্তভাগ থেকে আমি জান্নাতের সুগন্ধি পাচ্ছি।’
যুদ্ধের পরে আনাস ইবনে নযরকে শহীদ অবস্থায় পাওয়া গেল যুদ্ধক্ষেত্রে। তাঁর দেহে তলোয়্রা, বর্শা ও তীরের আশিটিরও অধিক জখম। মুশরিকরা নাক, কান কেটে ও চোখ উপড়িয়ে তাঁর লাশকে এতোটাই বিকৃত করেছিল যে বোন ছাড়া আর কেউ তাকে চিনতে পারেনি।
ধারণা করা হয়, কুরআন শরীফের এই আয়াত “মুমিনদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক আল্লাহর কাছে কৃত তাদের ওয়াদা বাস্তবে রূপ দিয়ে দেখিয়েছেন”- আনাসের শাহাদাত উপলক্ষেই নাযিল হয়।

অজেয় যে বাহিনী

বদর যুদ্ধের প্রান্তর।
যুদ্ধ তথনও শুরু হয়নি।
মক্কার কুরাইশদের মুশরিক (কাফের) বাহিনী এবং মহানবী (সা)-এর নেতৃত্বে মদীনার মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি দণ্ডায়মান।
কুরাইশদের সহস্রাধিক সৈন্য বিপুল যুদ্ধ-সাজে সজ্জিত। কুরাইশ বাহিনীর শুধু সামনের কাতারেই আপাদমস্তক লৌহ বর্মে আচ্ছাদিত শতাধিক ঘোড়সওয়ার দেখা যাচ্ছে।
এহানবীর (সা) বাহিনীতে একটি মাত্র ঘোড়া। তলোয়ার ও তীর ছাড়া আর কোন অস্ত্র নেই তাদের।
যে কোন মুহূর্তে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে।
চারদিকে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা।
এহানবী (সা) মুসলিম বাহিনীর প্রতিটি ব্যুহ, প্রতিটি ছত্র পরিদর্শন শেষে সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আদেশ করলেন, সকলে সাবধান! তোমরা আগে আক্রমণ করবে না। বিপক্ষরা আক্রমণ করলে তীর নিক্ষেপ করে বাধা দেবে। সাবধান! আমি আদেশ না দেয়া পর্যন্ত আক্রমনণ করবে না।
তারপর মহানবী (সা) প্রবেশ করলেন তাঁর জন্যে তৈরী কাপড়-ঘেরা বিশ্রাম স্তানে।
এ সময় কুরাইশ সৈন্যের পক্ষ থেকে তীর বর্ষণ শুরু হলো। একটি তীর এসে মুসলিম বাহিনীর মেহজা নামক সাহাবীর বক্ষ বিদীর্ণ করল। ঢলে পড়ল তার রক্তাক্ত দেহ মাটিতে। শাহাদাৎ বরণ করলেন তিনি।
মুসলিম সৈন্যের সকলের তীর তখনও তুনিরে আবদ্ধ। আক্রমণের হুকুম নেই মহানবীর। নীরবে তারা সকলে দেখল সাথীর মৃত্যু।
মহানবী (সা)-এর আরেকজন সাহাবী হারেছ ইবনে সুরাকা পানি পান করতে যাচ্ছিলেন। বিপক্ষের একটা তাঁর কণ্ঠনালি বিদ্ধ করল। তিনিও শাহাদাৎ বরণ করলেন।
কিন্তু মুসলিম বাহিনী পাথরের মত স্থির, নিশ্চলভাবে দ-ায়মান্ শান্ত, অচঞ্চল চোখে তার দেখলো আরেক সাথীর মৃত্যু। মহানবীর আদেশ নেই তাই একটা তীরও তুনির থেকে বেরুলো না, একটা তরবারিও কোষমুক্ত হলো না। কারও চোখে প্রতিশোধের একটা স্ফুলিঙ্গও জ্বলল না।
কুরাইশ বাহিনীর ওমের ইবনে আহর ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়েছিল ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীর অবস্থা, সংখ্যা, রণসজ্জা দেখার জন্যে। মুসলিম বাহিনীর চারদিকে ঘুরে দেখার পর ফিরে গিয়ে সে বলল, মুসলমানদের সংখ্যা তিনশ‘র বেশী হবে না। ওদের পেছনে সাহায্যকারী কেউ নেই এবং আত্মরক্ষার জন্যে তরবারি ছাড়া কোন অস্ত্র নেই তাদের। কিন্তু তাদের দেখে মনে হলো, একটি প্রাণের বিনিময় না দিয়ে তাদের একটি প্রাণন্শা করতে আমরা পারবো না। এমন বাহিনীকে জনয় করা কঠিন।

সোনার টুকরোরা

ওহোদ যুদ্ধের প্রাক্কাল।
এহানবীর মদীনা ধ্বংসের জন্যে কালবৈশাখীর মত ধেয়ে আসা কুরাইশ বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে উপস্থিত।
এহানবীর নেতৃত্বে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করেছে।
ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী। কুরাইশদের তিন হাজারের মুকাবিলায় মাত্র সাতশ’ জন।
ছোট কিশোরদের বাহিনীতে নেয়া হয়নি।
কিন্তু কয়েকজন নাছোড়বান্দ।
তবু তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন মহানবী (সা)।
তাদের একজন রাফে নিজেকে বড় করে তোলার জন্যে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ভর করে উঁচু হয়ে নিজের বড়ত্বকে প্রমাণ করতে চাইল।
সবাই বললো, রাফে একজন উৎকৃষ্ট তীরন্দাজ। সকলের অনুরোধে মহানবী (সা) তাকে বাহিনীতে শামিল করলেন।
এটা দেখে আরেক বারক সামরা ইবনে কোন্দা ছুটে এলো মহানবীর কাছে। অভিমানী কণ্ঠে বললো, ‘কুস্তিতে রাফেকে আমি হারিয়ে দিয়ে থাকি। সে যুদ্ধের অনুমতি পেলো, আর আমাকে ফিরে যেতে হচ্ছে!’
বালকের এ্ই অভিমানে আনন্দ পেলেন মহানবী (সা)। হাসিমুখে আদও করে বললেন, লড়ো দেখি কুস্তি রাফের সাথে।
সত্যই মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো দুই বালকের মধ্যে।
জিতে গেলো অভিমানী সামরা।
মহানবী (সা) হেসে বললেন সামরাকে, বেশ তোমাকেও যুদ্ধের অনুমতি দেয় হলো।
এই সোনার টুকরোরাই, ঈমানের এই জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গরাই পরবর্তীকালে অর্ধেক পৃথিবীর উপর ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিল।

যে নিরাপত্তার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়

বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা।
মক্কায় কুরাইশরা বদর যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাগল হয়েছে তখন।
রাত-দিন তারা ব্যস্ত শলাপরামর্শ আর আয়োজনের তৎপরতায়। মহানবী (সা) কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খোঁজ-খবর নেবার জন্যে একটা অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করলেন।
দশজনের সে দলটির নেতৃত্ব দিলেন আসেম ইবনে সাবিত।
অনুসন্ধানী এ দলটি মক্কা ও উসফানের মধ্যবর্তী হাদয়াহ পর্যন্ত পৌঁছলে তা টের পেয়ে গেল হোযায়েল গোত্রের বনু লেহিয়ান শাখা।
খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ওরা দু’শ’ তীরন্দাজের একটা বাহিনী প্রেরণ করল নবী (সা) প্রেরিত অনুসন্ধানী দলকে ধরার জন্যে।
ক্ষুদ্র দলটি ওরা ঘিওে ফেলল।
আসেম ইবনে সাবিতের নেতৃত্বাধীন ১০ জনের ক্ষুদ্র বাহিনীটি ঘেরাও হয়ে পড়ার পর একটা পাহাড়-শীর্ষে উঠে দাঁড়াল।
শত্রুবাহিনি পাহাড়টির চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের আত্মসমর্পণের আহবান জানিয়ে বলল, তোমাদের একজনকেও হত্যা করব না।
চারদিক আসেম ইবনে সাবিত পাহাড়-শীর্ষ থেকে বললেন, আল্লাহর শপথ, কাফেরের প্রদ্ত্ত নিরাপত্তায় আমরা পাহাড় থেকে নামব না।
চারদিকে থেকে বৃষ্টির মত তীর বর্ষণ শুরু হলো। একে একে ওরা ঢলে পড়তে লাগল মৃত্যুও কোলে। তীরে তীরে ক্ষত-বিক্ষত আসেম ইবনে সাবিতেরও সময় ঘনিয়ে এল। প্রার্থনার জন্য হাত তুললেন তিনি। বললেন, “হে আল্লাহ, আমাদের অবস্থার খবর আপনার নবীকে জানিয়ে দিন।”

ওহোদ গিরিপথের দৃষ্টান্ত

ওহোদ যুদ্ধের এক মহা সন্ধিক্ষণ। মুসলিম বাহিনীর জয় বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। মুসলিম বাহিনীর পেছনে ওহোদ পাহাড়ের এক গলিপথে মহানবী (সা) ৫০ জনের একটি ক্ষুদ্র দলকে পাহারায় রেখেছিলেন। তাদের উপর নির্দেশ ছিল, তাদের শরীরের গোস্ত পাখিরা ঠুকরে যদিও খায় এবং রণাঙ্গনের মুসলিম সৈন্য সবাই যদি মরেও যায় তবু তারা যেন নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত গলিপথ ত্যাগ না করে। সুদক্ষ সেনাপতি মহানবী (সা) নিশ্চিতই বুঝেছিলেন যে, মুসলিম বাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণের জন্য মক্কার মুশরিক বাহিনী অবশ্যই কিছু লোক এ গলিপথের পেছনে রাখবে।
যুদ্ধ জয়ের আনন্দে পাহাড়ের এই গলিপথে মোতায়েন সৈন্যদের অধিকাংশ গলিপথ ত্যাগ করে শত্রুমুক্ত রণক্ষেত্রের দিকে ছুটতে শুরু করেছিল।
মোতায়েন এই ক্ষুদ্র দলের সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের প্রাণপণ চেষ্টা করলেন মহানবীর (সা) আদেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওদের নিবৃত্ত করতে। ‘আমাদের সম্পূর্ণ জয় হয়েছে, এখন এখানে আর বসে থাকবে কেন’- এই যুক্তি তুলে তারা দলনেতা আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের নিষেধ উপেক্ষা করল।
কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের কয়েকজন সাথী নিয়ে মহানবী (সা) নির্দেশিত স্থান থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণও নড়লেন না।
পাহাড়ের সেই গলিপথে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে পাহাড়ের পেছনে ওত পেতে থাকা মুশরিক সৈন্যেও দু’শ’ অশ্বারোহীর একটা বাহিনী এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এবং তাঁর কয়েকজন সাথীর উপর। তাঁরা কয়েকজন প্রথমে তীর ছুড়ে, তারপর তলোয়ার দিয়ে শত্রুদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করলো। তাদের আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে এক এক কওে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অক্ষত থাকা অবস্থায় একজন শত্রু সৈন্যকেও তাদেরকে অতিক্রম করতে দেয়নি।

দেহ যাদের ঢাল হল

ওহোদ যুদ্ধের মর্মন্তুদ ও মহোত্তম দৃশ্য।
যুদ্ধে বিপর্যয় ঘটেছে। বিপর্যয়ের মধ্যে বিপর্যয়। খবর রটল যে, মহানবী (সা) নিহত হয়েছেন।
মুসলিম বাহিনীর পতাকাধারী মুছআব নিহত হওয়ার থেকেই এই খবর রটে। রাসূলুল্লাহর (সা) চেহারার সাথে তাঁর চেহারার বাহ্যিক কিছুটা সাদৃশ্য দর্শনে মক্কার মুশরিক ইবনে কামিয়া এই খবর রটিয়ে দেয়।
মুহূর্তেই খবরটি যুদ্ধক্ষেত্রে আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল। বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে এই খবরটি যাচাই করা অধিকাংশের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে এই খবর মক্কার মুশরিক সৈন্যদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও নতুন শক্তির সঞ্চার করলো। বিপর্যয়ের মধ্যে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের জন্যে তারা বন্যার তীব্র স্রোতের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্যদিকে বিপর্যয় ও মহা দুঃসংবাদ একসাথে হয়ে অনেক মুসলিম সৈন্যেও সব শক্তি ও সাহস কেড়ে নিল। তারা হতাশ হয়ে পড়ল যে, মহানবী (সা) জীবিত আছেন, তখন তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালেন মহানবী (সা)।
মুসলিম বাহিনীর বিশৃঙ্খল ও বিপর্যয়কর অবস্থায় পরিস্থিতিটা অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াল।
যুদ্ধক্ষেত্রের একটি স্থানে সাহাবীদের একটি ক্ষুদ্র দল তাদের দেহ দিয়ে মহানবীকে আড়াল কওে চারদিক থেকে বন্যাবেগের মত ছুটে আসা মুশরিক সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করছিল। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে এক এক করে তারা ঢলে পড়ল। অবশিষ্ট থাকলো মাত্র তালহা এবং সা’আদ।
দু’জনেই মদীনার অব্যর্থ-লক্ষ্য তীরন্দাজ। তাঁরা ঘুরে ঘুরে তাঁদের দেহ দিয়ে মহানবীর দেহকে আড়াল করে অবিরাম তীর ছুড়ে কাফেরদের হত্যা করছিল ও তাদের ঠেকিয়ে রাখছিল। সা‘আদ একাই সেদিন দু’খানা ধনুক ভেঙ্গেছিলেন এবং সহস্রাধিক তীর ছুড়েছিলেন। এক কঠিন মুহূর্তে তালহা তীর ধনুক বাদ দিয়ে নিজের ঢাল ও নিজের হে দিয়ে মহানবীকে আচ্ছাদন করতে লাগলেন। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়ল তাঁর দেহ। এ সময় দুর থেকে আবু দোজানা ছুটে এলেন এ দৃশ্য দেখে। যোগ দিলেন তিনি তালহা ও সা‘আদের সাথে। দেখলেন আবু দোজানা বুক দিয়ে মহানবীকে আচ্ছাদন করে পৃষ্ঠদেশ এগিয়ে দিলেন বর্শার দিকে। বর্শা তার পৃষ্ঠদেশ বিদ্ধ করল।
উম্মে আমারা আহত মুসলিম সৈন্যদের পানি পান করাচ্ছিলেন। তিনি শুনতে পেলেন মহানবী (সা) বলেছেন, “সেই বিপদের সময় দক্ষিণে, বামে যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি উম্মে আমারা আমাকে রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করছে।”
সোনার মানুষের যখন তাঁকে ঘিরে এভাবে লড়াই করছেন, তখন এই সোনার মানুষগুলো যাঁর হাতে গড়া সেই মহানবী (সা) অচঞ্চল পর্বতের মত দ-ায়মান। ভয় নেই, ভীতি নেই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই, শোচনীয় অবস্থা দর্শনে অবসাদ নেই, বিসণœতা নেই। পর্বতের মত দাঁড়িয়ে ক্ষুদ্র বাহিনীকে তিনি নির্দেশ দিচ্ছিন, পরিচালনা করছেন।
এক শত্রুর আঘতে তার লৌহ শিরস্ত্রাণের দুই কড়া যখন তার মাথায় ঢুকে গেল, রক্তের দরবিগলিত ধারায় তাঁর মুখম-ল ও দেহ যখন রঞ্জিত হচ্ছিল তখন তিনি প্রার্থনা করলেন, “হে আমার প্রভু, আমার জাতিকে তুমি ক্ষমা কর। কারণ তারা অজ্ঞ।”
সেদিন মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় পরাজয় পর্যন্ত পৌঁছেনি অকুতোভয় ঐ সব সোনার মানুষদের কারণেই। মুসলিম বাহিনী হামজা, মুছআব প্রমুখের মত ৭০ জনের জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে বিপর্যয় রোধ করেছিল। ৩ হাজার সৈন্যের বিশাল মুশরিক বাহিনীকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল মক্কায়।

সহস্র জীবন দিয়েও চাই যে মরণ

ওহোদ যুদ্ধ। মুসলমানদের জয় বিপর্যয়ে পরিণত হবার পরের মুহূর্ত। মহানবী (সা) তখন যুদ্ধেও কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন। পেছন থেকে শত্রুর আকস্মিক আক্রমণে বিজয়-আনন্দরত মুসলিম সৈন্যরা একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরেধে এগিয়ে আসতে পারল না। বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে তারা।
মুষ্টিমেয় মুসলিম সৈন্যেও ছোট্ট একটি দল মহানবী (সা)-কে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে। মক্কার মুশরিক সৈন্যরা একে মহা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল। মহা আস্ফালন চারদিকে কাঁপিয়ে মুশরিক সৈন্যরা ঝড়ের বেগে অগ্রসর হলো মহানবী (সা)-কে লক্ষ্য করে। এই ঝড় প্রতিহত করতে হলে এর চেয়েও দুরন্ত গতির আরেক ঝড় প্রয়োজন। মহানবী (সা) তাকালেন তাঁর চারদিকের সাথীদের দিকে। ধ্বনিত হলো তার তেজদীপ্ত গম্ভীর কণ্ঠ, ‘নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে শত্রুর গতিরোধ করতে পারে, এমন কে আছে?’ মহীনবীর (সা) ঠোঁটের শেষ শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাবার আগেই আনসার যুবক জিয়াদ তেজদীপ্ত কণ্ঠে হুংকার দিয়ে বলে উঠল, ‘আমি আমি।’
কণ্ঠে তার সেকি তেজ! দু’চোখে তার ভক্তির কি অপূর্ব বিচ্ছুরণ!
এহানবীর (সা) আদেশ নিয়েই জিয়াদ পাচ-সাতজন আনসার যুবককে সাথে নিয়ে ভীষণ গতির এক ঝড় তুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রুর উপর।
এ যেন বেগ-এর উপর এক মহাবেগ-এর আঘাত। শত্রুর গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। চলল মরণপণ ক্ষুদ্র একটি দলের সাথে আক্রমণকারী বাহিনীর লড়াই। পেছনে হটে গেল মুশরিক বাহিনী অনেক ক্ষতি স্বীকার করে। শত্রু সরে গেলে দেখা গেল, জিয়াদ-এর ক্ষুদ্র বাহিনীর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। শহীদ হয়েছেন বেশিরভাগ। জিয়াদ তখন মুমূর্ষু। মহানবী (সা) যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জিয়াদকে তুলে আনার নির্দেশ দিলেন।
মুমূর্ষু জিয়াদের মাথা মহানবী (সা) নিজের পদযুগলের উপর রাখলেন। প্রার্থনা করতে লাগলেন জিয়াদের জন্যে। জিয়াদেও প্রাণটা যেন এ মহাসৌভাগ্যেরই অপেক্ষা করছিল।
মুমূর্ষু জিয়াদের মুখটি গড়িয়ে গিয়ে তার গ- মহানবী (সা)-এর পদযুগল স্পর্শ করল। পর মুহূর্তেই তার প্রাণপাখি উড়ে গেল। উড়ে গেল যেন জান্নাতের উদ্দেশ্যে।
কবির ভাষায় : একি মরণ! গহস্র জীবন উৎসর্গ করেও এমন জীবনের সাক্ষাত পাওয়া যায় না।

বে-নজীর অগ্নি-পরীক্ষা

ওহোদ যুদ্ধের দিবাগত রাত।
রাত তখন গভীর।
বনি খোজায়া গোত্রের প্রধান মা’বাদ এলেন মদীানায়। বনি খোজায়া মুসলমানদের মিত্র গোত্র। ওহোদ যুদ্ধে মুসলমানদের অসুবিধার খবর পেয়ে মুসলমানদের সমবেদনা জানাবার জন্যে রাতেই মা’বাদ মদীনা যাত্রা করেছিলেন। আসার পথে হামরাউল আসাদ স্থানে এসে দেখলেন, মক্কার আবু সুফিয়ানের বাহিনী মক্কার পথ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার মদীনা আক্রমণের জন্যে অগ্রসর হচ্ছে। শুনলেন তিনি, মুসলমানদের অনেক নিহত আহত অধিকাংক সাহাবী রাসূলুল্লহ্সহ। এই সুযোগে মদীনার মুসলমানদের ধ্বংস না করে ফিরে গেলে এই সুবর্ণ সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। এই চিন্তা করেই তারা মদীনা ধ্বংসের জন্যে অগ্রসর হচ্ছে। মা’বাদ এই খবর নিয়ে দ্রুত মদীনা এসেছেন মুসলমানদের সাবধান করার জন্যে। মহানবী (সা) মা’বাদের কাছ থেকে সব শুনলেন।
ডাকলেন তিনি হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রা)-কে পরামর্শের জনে। পরামর্শে ঠিক হলো, ফজরেই যুদ্ধযাত্রা করতে হবে। বেলাল (রা)-কে মহানবী (সা) নির্দেশ দিলেন ফজরের আযানের সময় যুদ্ধযাত্রার ঘোষণা ও অন্যান্য আদেশ সকলকে জানিয়ে দেবার জন্যে।
বেলাল (রা) ফজরের আযান দিলেন এবং সেই সাথে ঘোষণা দিলেন : ‘মুসলিম বীরবৃন্দ প্রস্তুত হও, এখনই যুদ্ধযাত্রা করতে হব্ েকুরাইশ বাহিনী মদীনা আক্রমণের জন্যে অগ্রসর হচ্ছে।’ এই সাথে বেলাল মহানবরি (সা)-এর পক্ষ থেকে আরও ঘোষণা করলেন, “গতকালের যুদ্ধে যারা উপস্থিত হয়েছিলেন, অদ্য কেবল তারাই যুদ্ধে যেতে পারবেন।”
মদীনার ঘরগুলো তখন বিপর্যস্ত। অধিকাংশ আহত সাহাবীর আহত স্থানের রক্ত তখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ৭০ জন শহীদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের কান্না তখনও প্রশমিত হয়নি। ক্লান্তি ও অবসাদে ভেঙ্গে পড়া সকলের দেহ। স্বয়ং মহানবী (সা) আহতক। তাঁর কপালে গভীর দু’টি ক্ষত। তাঁর সামনের চারটি দাঁত পাথরের আঘাতে নড়ে যাওয়। কিন্তু বেলালের আহবান যখন তাদেও সকলের কানে গেল, মুহূর্তেই আহত স্থানের বেদনা-যন্ত্রণা কোথায় চলে গেল, শরীরের ক্লান্তি-আবসাদ কোথায় যেন ভেসে গেল। নতুন জীবন নিয়ে মদীনার গোটা মুসলিম পল্লী গেগে উঠলো। চারদিকের শত কণ্ঠের আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে উৎসবের জোয়ার জাগলো মদীনায়।
আগের দিনের রক্ত-রঞ্জিত পোশাক ও রক্তে গোসর করা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছুটলো সকলে মদীনার মসজিদ নববীর দিকে।
নামায শেষে মহানবী (সা) যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সকলের আগে যাত্রা করলেন। তাঁর পেছনে পায়েহাঁটা ছ‘শ’ মুসলমানের বাহিনী। মুসলমানদের এই যুদ্ধ-যাত্রার খবর মদীনামুখী মুরাইশ সৈন্যের প্রধান আবু সুফিয়ান পেলে স্তম্ভিত হলো স্।ে তার মনে হলো মুসলমানরাই যেন যেন কুরাইশদের ধ্বংসের লক্ষ্য দিয়ে আসছে। ভয় পেয়ে গেল আবু সুফিয়ান। আহত সিংহ আরও ভয়াবহ হয়ে থাকে।
সঙ্গে সঙ্গেই আবু সুফিয়ান তার বাহিনীর গতি মদীনার দিক থেকে মক্কার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন।
মক্কার মুশরিক বাহিনীর পলায়নের খবর মহানবী (সা) পেলেন। তবু তিনি হামরাউল আসাদ প্রান্তরে ক’দিন অপেক্ষা করে ফিরে গেলেন মদীনায়।

তিমির অন্ধকারে সূর্যোদয়ের কোরাস

কুরাইশদের নেতৃত্বে ইহুদি এবং গোটা পৌত্তলিক আরব একজোট হয়ে আসছে মদীনা আক্রমণের জন্যে।
মহানবী (সা) সকলের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করালেন, এবার মদীনায় অবস্থান করেই মদীনার প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
পারস্যের সাহাবী সালমান ফারসির পরামর্শে পরিখা খনন করে মদীনার উপকণ্ঠে শত্রু বাহিনীর গতিরোধ করার সিদ্ধান্ত হলো।
শুরু হলো পরিখা খনন।
মহানবী (সা) তাঁর ৩০০০ সাহাবীকে ১০ জনের এক এক গ্রুপে বিভক্ত করে প্রতি গ্রুপকে দশ গজ গভীর দশ গজ চওড়া পরিখা খননের নির্দেশ দিলেন।
সময বেশী নেই। দিন রাত অবিরাম পরিখা খনন শুরু হলো। এই খনন কাজে সবাই শ্রমিকে পরিণত হলো। স্বয়ং মহানবী (সা) দশ জনের একটা গ্রুপের সদস্য হলেন।
একদিকে প্রচ- দৈহিক পরিশ্রম, অন্যদিকে প্রকট খাদ্যাভাব। অবস্থা এক সময় একন দাঁড়াল যে, পরপর কয়েক সন্ধ্যা কারোরই খাবার জুটল না। কোমর সোজা করে দাঁড়ালোও কঠিন হয়ে দাঁড়াল অনেকের। কিন্তু কাজের বিরাম নেই। কোমরকে সোজা ও শক্ত রাখার জন্য আরবয়ি রীতি অনুসারে পেটে পাথর বাঁধা হলো।
এহানবীর পেটেও বাঁধা একই পাথর। তাঁর গ্রুপের কয়েকজন মাটি কাটছেন, আর কয়েকজন সে মাটি বহন করছেন। মহানবী (সা) এই বহনকারী দলের একজন হয়ে মাথায় করে মাটি বয়ে নিচ্ছেন।
মহানবীর (সা) এই অবস্থা দর্শনে সংকোচ জরজর, বেদনা-কাতর কোন সাহাবী সাহায্য করতে এল তিনি হাসি মুখে বিদায় দিচ্ছেনখ। যার ভার তারই বহন করা দরকার।
দশ গজ গভীর ছয় হাজার হাত দীর্ঘ পরিখা খননের কাজে প্রতিটি সাহাবী তাঁর সর্ব শক্তি, সব আন্তরিকতা ঢেলে দিয়েছেন যেন। কঠোর পরিশ্রমে ভেঙ্গে পড়া তাঁদের দেহ, ক্ষুধার জ্বালায় সকলে অস্থির, পিঠের সাথে লেগেহ থাকা পেটে পাথর বাঁধা তাঁদের। কিন্তু তাঁদের মুখে ক্লান্তি বা কষ্টের কোন ছাপ নেই। তার জায়গায় তাদের মুখে ধ্বনিত হচ্ছে সুন্দর এক কোরাস :
আমর সেই তারা, যারা
মুহাম্মাদের হাতে জিহাদের
বাইয়াত করেছি।
সমস্বর কণ্ঠের এই কোরাস সৃষ্টি করেছে সেখানে উৎসবের এক আমেজ।

বিপদের বেষ্টনিতে বিশ্বাসের সঞ্জীবনী

খন্দক যুদ্ধের মুহূর্ত। মক্কার কুরাইশদের নেতৃত্বে দশ হাজার মুশরিক সৈন্য মদীনার প্রায় উপকণ্ঠে এসে পৌঁছেছে।
একদিকে বাইরে এই বিপদ, অন্যদিকে রয়েছে মদীনার ষড়যন্ত্রকারী ইহুদী এবং মুনাফিকদের ভেতর থেকে অভ্যুত্থানের আশংকা।
বাইরের আক্রমণকে বাধা দেয়ার জন্য পরিখা খনন করা হয়েছে।
ভেতরের ইহুদী মুনাফিকদের অভ্যুত্থান রোধের জন্যে মহানবী (সা) ছালমা ইবনে আছলাম ও যায়েদ ইবনে হারেসার নেতৃত্বে দুটি নগর রক্ষা বাহিনী গঠন করলেন। ছালমার বাহিনীতে দু‘শ’ আর যায়েদের বাহিনীতে থাকল তিনশ’ লোক। ভেতরের যে কোন ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের দায়িত্ব দেয়া হলো এই দু’টি দলের উপর।
দশ হাজার মুশরিক সৈন্য যখন মদীনার উপকণ্ঠে পৌঁছল, তাদের রণহুংকার, তাদের নানারকম আস্ফালন আর চিৎকারে ছোট শহর মদীনায় এক ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করলো।
মুসলিম সেনা দলে পনের বছরের বালকদের শামিল করার পরেও মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র তিন হাজার। নারী ও শিশুদের নগরীর এক প্রান্তে এক সুরক্ষিত বাড়ীতে আশ্রয় দেয়া হয়েছে।
মহানবী (সা) সর্বসাকুল্যে আড়াই হাজার সৈন্য নিয়োগ করতে পারলেন পরিখা রক্ষা ও পরিখা অতিক্রমে শত্রুদের বাধা দেয়ার জন্য।
মদীনার আকাশ বাতাস তখন কাঁপছে মহা বিপদেও ঘনঘটায়।
মহানবী (সা) প্রতিরক্ষার আশু ব্যবস্থাগুলো সম্পন্ন করার পর অন্যদিকে মনোযোগ দিতে যাচ্ছেন, এমন সময় খবর এল, মদীনার ইহুদি গোত্র বনি কোরাইজাও বিদ্রোহ করেছে।
সমগ্র মদীনায় মুসলমানরা ছাড়া এই একমাত্র বনি কোরাইজা সন্ধিসূত্রে মুসলমানদের মিত্র ছিল। অন্য দুই ইহুদি গোত্র আগেই মুশরিক পক্ষে যোগ দিয়েছে। বনি কোরাইজ বিদ্রোহ করার পর মদীনায় মুসলমানদের মিত্র বলতে কেউ আর থাকলো না।
এই খবর মুসলমানদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক হল। সর্বশেষ একটি বড় আঘাত হিসেবে খবরটি মুসলমানদের অন্তরকে গেন ক্ষত-বিক্ষত কওে দিল।
যেন তারা ভেতর ও বাইরে থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল।
সকলের মুখেই তখন মহাডবপদেও এক কাল ছায়া। কিন্তু মহানবী (সা)-এর মুখে কোনই ভাবন্তর নেই। বার্তা-বাহকের মুখ থেকে খবর শোনার পরেই শান্ত, অথচ অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করলেন, ভয় কি, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। তিনি সর্বশক্তিমান, তিনি একাই সকলের পক্ষে যথেষ্ট। মহানবীর (সা) এই একটি বাক্য যেন সকলের দেহে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের কাজ করল।
সমবেত কণ্ঠে আল্লাহু আকবার ধ্বনি মুহূর্তের জড়তা-উদ্বেগ কোথায় যেন দূর করে দিল।

‘সে আমর, আমিও আলী’

খন্দকের যুদ্ধ।
পরিখার ওপারে দশ হাজার মুশরিক সৈন্য। আর এপাড়ে প্রতিরোধের জন্য দাঁড়ানো আড়াই হাজার মুসলিম।
মদীনায় প্রবেশের মুখে পরিখা দেখে মুশরিক বাহিনী বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। কারণ পরিখা খনন করে প্রতিরোধের কৌশলের সাথে আরবরা পরিচিত নয়। বিমূঢ় ভাব তাদের কেটে যাবার পর তার অস্থির হয়ে পড়ল। পরিখা অতিক্রমের জন্যে অগভীর ও প্রশস্ত কোন জায়গা তার তালাশ করতে লাগল। পাহাড়ের কিনারে যেখানে পরিখা শেষ হয়েছে, সেখানে এমন একটি সুবিধামত জায়গা তার পেয়ে গেল।
তার পরিকল্পনা করল এই পথে তারা দুর্ধর্ষ ও অজেয় একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করবে। তার ওপাড়ে গিয়ে পরিখার এই অংশকে শত্রুমুক্ত রাখবে এবং সেই সুযোগে অবশিষ্ট সৈন্য ঐ পথে নগরে প্রবেশ করবে। তার ক্ষুদ্র বাহিনীর সেনাধ্যক্ষ নির্বাচন করল আরবের সর্বজনবিদিত শ্রেষ্ঠ বীর আমর ইবনে আব্দে ওদ্দ এবং অমিত সাহসী তরুণ সেনাধ্যক্ষ আকরামা ইবনে আবু জেহেলকে। আরবের মানুষের সাধারণ ধারণা, আমর একাই এক হাজার যোদ্ধার সাথে লাড়াই করে জিততে পারবে। আমর প্রথমে তার ঘোড়া নিয়ে লাফিয়ে পরিখা অতিক্রম করল। তারপর অন্যান্যরা। আমর ওপাড়ে পার হয়েই ভয়াল আকারে তর্জন-গর্জন শুরু করে দিল, কে আছ একেতো শত্রুর একটি দল পরিখা অতিক্রমে সমর্থ হয়েছে! তার উপর পরিখা অতিক্রম করেছে আমর-এর মত পালোয়ান। প্রথমটায় মুসলমানরা চমকে েিগয়ে কিছুটা বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। সে কারণেই আমর প্রথম দিকে তার আস্ফালনের কোন জবাব পেল না। আমরের তর্জন-গর্জন অব্যাহত। আহবান জানাচেহ্ছ কাউকে সে যুদ্ধের। ‘এই যে আমি আছি’ বলে শেরে খোদা হযরত আলী বেরিয়ে এলেন। আমরের তুলনায় হযরত আলী বালক-সদৃশ। আমর মহাবীর ও বহুদর্শী এক বিশাল পালোয়ান। আর হযরত আলী মাত্র এক নব্য তরুণ। মহানবী (সা) হযরত আলীকে লক্ষ্য করে ত্বরিত কণ্ঠে বললেন, ‘জানো তো, সে আমর।’ হযরত আলী ঘুরে দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে বললেন, ‘সে আমর, আমিও আলী।’ বলেই হযরত আলী মহানবীর অনুমতি নিয়ে উলংগ তরবারী হাতে ছুটলেন আমরের দিকে। শুরু হলো যুদ্ধ। মুহূর্তেই ধুলায় অন্ধকার হয়ে গেল স্থানটা। অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া কিছুই দৃষ্টিগোচর হলো না কারও। ভয়াবহ এই যুদ্ধের একদিকে শক্তি, অন্যদিকে ঈমানের তেজ। শক্তির সাথে ঈমানের তেজের লড়াই। মহানবীর (সা) কণ্ঠে তখন করুণ প্রার্থনা, হে আল্লাহ, বদর যুদ্ধে ওবায়দাকে গ্রহণ করেছে, ওহোদের অনল পরীক্ষায় হামজাকে তুমি নিয়েছ, আর এই আলী তোমার সন্নিধানে উপস্থিত। সে আমার পরমাত্মীয়। আমাকে একদম স্বজন-বর্জিত করো না। মুসলমানরা বাক্হীন রুদ্ধশ্বাসে ধুলায় অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে। তাদের উদ্বিগ্ন, অচঞ্চল চোখ অপেক্ষা করছে ফলাফলের। এক সময় ধুলায় অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে আল্লাহু আকবার নিনাদ ধ্বনিত হলো হযরত আলীর কণ্ঠে। সংগে সহস্র কণ্ঠে আবেগ আনন্দ-আপ্লুত প্রতিধ্বনি উঠল, আল্লাহু আকবার।
এই বিজয় আনন্দের বন্যাবেগ সৃষ্টি করল মুসলমানদে মধ্যে।

খালিদের দুর্ধর্ষ বাহিনীও অবসন্ন

খন্দকের যুদ্ধ চলছে। আরব-খ্যাত বীর হযরত আলীর তাতে নিহত এবং ইকরামা ইবনে আবু জেহেল ব্যর্থ হবার পর এবার মক্কায় মুশরিক সৈন্যেও শেষ বড় ভরসা খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এগিয়ে এলন।
খালিদ বাছাই করা সৈন্য নিয়ে একটা অজেয় বাহিনী গঠন করলেন। দীর্ঘ পরিখা পর্যবেক্ষণ করার পর খালিদ আক্রমণের জন্যে সে স্থানটিই বেছে নিলেন যেখানে মহানবী অপেক্ষা করছেন।
তার কৌশল হলো, মহানবীর (সা অবস্থান স্থলে যদি আস্কিক সর্বাত্মক আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করা যায়, যদি কোনভাবে মহানবীর অবস্থান এলাকায় বিপর্যয় ঘটানো যায়, তাহলে মুসলমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত ও দুর্বল করা যাবে এবং সেই সুযোগে অরক্ষিত এ স্থান দিয়ে পরিখা অতিক্রম করা সম্ভব হবে। এই পরিকল্পনা অনুসারে দুর্ধর্ষ সেনাপতি খালিদ তার কথিত ‘অজেয়’ বাহিনী নিয়ে আস্মিকভাবে প্রচ- আক্রমণ পরিচালনা করলেন মহানবীর অবস্থান স্থলের উপর। ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। খালিদের লক্ষ্য হলো পরিখার তীর থেকে মহানবীর বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে তাদের পরিখা পাড় নিরাপদ করা, আর মুসলিম বাহিনীর সেষ্টা মুশরিক বাহিনেিক পরিখার তীর থেকে দূরে রাখা। আক্রমণের বিরতি নেই। আক্রমণের ঢেউ একের পর এক এসে আঁছড়ে পড়ছে। এ যেন সাগরে অফুরন্ত ঢেউ-এর অব্যাহত আঘাত। যুদ্ধ এমন এক ভয়াবহ পর্যয়ে পৌঁছল যে, মহানবী (সা এবং তার সাথীরা নামায পড়ার সময় পর্যন্ত কেউ বের করতে পারলেন না। খালিদ এভাবে তাঁর আক্রমণ কয়েকদিন পর্যন্ত অব্যাহত রাখলেন। কিন্তু শেষে তাঁর ‘নির্বাচিত দুর্ধর্ষৎ‘ সৈন্যরা ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ল। কিন্তু পরিখার ওপারে মুসলমানরা তখনও অস্ত্র উচিয়ে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ সেদিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে ভাবতে বাধ্য হলেন, পরিখা রক্ষাকারী মুসলিম সেনা-প্রাচীন ভেদ করা বা ভাঙ্গ তাদের পক্ষে সম্ভব নয় এবং পরিখা পার হবারও তাদের কোন সুযোগ নেই।

যেমন ছেলে তেমনি মা

খন্দক যদ্ধের একটি মুহূর্ত।
মদীনার আনসার প্রধান সা’আদ ইবনে মা’আজ বিশেষ এক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মনে তাঁর আনন্দ। পরিখা মুশরিক বাহিনীকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে। ওদের তর্জন-গর্জন এখন সবই ওপাড়ে। সংখ্যার জোরে মুহূর্তে মুসলমানদের পিষে ফেলার পর্বতপ্রমাণ অহংকার নিয়েওরা ছুটে এসেছিল। দশতাহ গভীর ৬ হাজার হাত দীর্ঘ পরিখায় ওদের অহংকার এসে থুবড়ে পড়েছে। নিশ্চিন্ত মনে কাজ করছিলেন সা’আদ ইবনে মা’আজ। হঠাৎ আগুনের মত ছড়িয়ে পড়া খবর সা’আদ ইবনেমা’আজও শুনলেন। মুশরিক বাহিনী সর্বাত্মক এক আক্রমণ পরিচালনা করেছে। ওরা পরিখা পার হওয়ার চেষ্টা করছে। খবর শোনার সাথে সাথে সা’আদ উঠে দাঁড়ালেন। পাশ থেকে বর্শা তুলে নিয়ে ছুটলেন তিনি পরিখার পাড়ে। তিনি ছুটছেন আর আবৃত্তি করছেন একটা কবিতার অংশ :
একটু পূর্ণ হইলে মরণ তো আসিবেই, সুতরাং করণে আর ভয় কি?
পাশেই সা’আদ ইবনে মা’আজের বাড়ি। মা’আজের উচ্চ কণ্ঠস্বর শুনে তার মা বেরিয়ে এলেন। দেখলেন সা’আদকে এবং শুনলেন খবরও। শুনেই উত্তেজিত ও আবেগময় কণ্ঠে সা’আদের মা সা’আদকে লক্ষ্য কওে চিৎকার কওে বললেন, ‘বৎস পিছিয়ে পড়েছো, দ্রুত অগ্রসর হও।’ মায়ের উৎসাহ ও আশীর্বাদে দ্রুততর হলো সা’আদ ইবনে মা’আজের গতি। তিনি পরিখা তীরে পৌঁছতেই শত্রুপক্ষের একটা তীর এসে বিদ্ধ করল তাঁকে। গুরতর আহত হলেন তিনি। এই আঘাত তাকে শাহাদাতের দিকে নিয়ে গেল। অচিরেই শাহাদাতের অমৃত সুধা পান করলেন তিনি।

যে যুদ্ধ অস্ত্রের নয় ধৈর্যের

মক্কা বিজয়ের অনেক আগের ঘটনা। হোদাবিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে। যুদ্ধটা অস্ত্রের নয়, ধৈর্যের। দুর্বলরা অপমান, অবমাননা বাধ্য হয়ে সহ্য করে। কিন্তু শক্তিমান, সামর্থবানরা অপমান, অবমাননা সহ্য করে সংযত থাকা অস্ত্রের যুদ্ধে জেতার চেয়ে কঠিন। এই কঠিন যুদ্ধেরই মুখোমুখি হলো মুসলমানরা হোদায়বিয়ায়। হজ্বেও জন্যে মক্কার দ্বার শত্রু-মিত্র সকলের জন্যে উন্মুক্ত, এটাই আরবের প্রচলিত প্রথা। কিন্তু মুসলিম হজ্বযাত্রীর মক্কায় প্রবেশ করতে দেয়া হলো না। কুরাইশ ছাড়া মক্কার আশেপাশের অন্যান্য গোত্র কুরাইশদের এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়নি তবুও। উপরন্তু, নিরস্ত্র প্রায় মুসলমানদের উপর চড়াও হবার জন্যে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের নেতৃত্বে কয়েকশ’ কোরাইশ সৈন্য ঝড়ের বেগে অগ্রসর হলো মুসলমানদের উদ্দেশ্য। মহানবী (সা) যুদ্ধ এড়াবার জন্যে ভিন্ন পথ দিয়ে মক্কায় সন্নিকটে হোদায়বিয় প্রান্তরে গিয়ে উপনীত হলেন। এই বৈরিতার উত্তরে মহানবী (সা) কুরাইশ সর্দারদের কাছে শান্তির প্রস্তাব পাঠালেন এবং তাদের পক্ষ থেকে একজন আলোচনাকারীকে আহবান করলেন। কোরাইশদের পক্ষ থেকে একজন আলোচনাকারীকে আহবান করলেন। কোরাইশদের পক্ষ থেকে একজন আলোচনাকারী এলেন। এলেন বটে, কিন্তু শান্তির জন্যে নয়, গ-গোল পাকানোর লক্ষ্যে। কুরাইশ সর্দার উরওয়া এমন আচরণ করলেন এবং এমন সব কথা বললেন যে, সেই অপমান ও অবমাননা হযরত আবু বকরের পক্ষেও হজম করা সম্ভব হলো না। কঠোর ভাষায় তিনি উরওয়াকে আক্রমণ করলেন। উরওয়া চলে গেলেন। পরে মহানবী (সা.) তাঁর শান্তি ও শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে নিজের প্রিয় উটে চড়িয়ে খেরাশ নামক সাহাবীকে পাঠালেন মক্কায় শান্তির প্রস্তাব নিয়ে। মক্কার লোকেরা মহানবীর এই শুভেচ্ছার জবাব দিলেন হযরতের উটকে হত্যা করে। খেরাশকেও তারা হত্যা করতে যাচ্ছিলো। মক্কার পাশের এক গোত্র সর্দার তাকে বাঁচিয়ে নিরাপদে ফেরত পাঠালেন হোদায়বিয়ায়। ঠিক এই সময়েই মক্কার একটি গুপ্ত ঘাতক দল মুসলমানদের একটা অংশের উপর চড়াও হতে এলো। তার সবাই প্রেফতার হলো কিন্তু মহানবী (সা.) তাদের সঙ্গে সঙ্গেই মক্কায় ফেরত পাঠালে। পরে মহানবী (সা) হযরত উসমান হত্যা করা হয়েছে। গর্জে উঠলো দেড় হাজার মুসলমানের ক্ষুদ্র বাহিনী। তার মহানবীর হাতে হাত রেখে শপথ নিলো ‘মৃত্যুর জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যুদ্ধ করবো, কোন অবস্থায়ই একপদ পশ্চাৎবর্তী হবো না, আল্লাহর নামে আমাদের এই প্রতিজ্ঞা।’ কোরাইশরা মুসলমানদের চেনে। এই শপথের খবর মক্কায় পৌঁছার সাথে সাথে তাদের বীরত্বের আগুনে পানি পড়লো। উসমান (রা)-কে ছেড়ে দিয়ে তাঁর সাথেই সন্ধির বার্তা নিয়ে লোক পাঠালো মহানবীর কাছে। হোদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হলো। সন্ধির শর্ত অনুসারে মুসলমানদের এবার হজ্ব না করে ফিরে যেতে হবে। এছাড়া সন্ধির অন্যসব শর্তও সম্পূর্ণভাবে কোরাইশদের পক্ষে গেলো। এই সন্ধি সকল মুসলমানের মানে অপমানের অসহ্য জ্বালা ধরিয়ে দিলো। হযরত উমরের মত মহানবীর অতি ঘনিষ্ঠ সাথীর কণ্ঠেও উত্তেজিত প্রতিবাদ উঠলো। কিন্তু এরপরও মহানবীর নির্দেশ সবাই ভগ্ন হৃদয়ে মেনে নিলো। অসহ্য অপমান, অবমাননার বিরুদ্ধে ধৈর্যের জয় হলো। যে পরীক্ষা মুসলমানদের মক্কার ১৩ বছরে দিতে হয়নি, যে পরীক্ষা তাদের বদর, ওহোদ ও খন্দক যুদ্ধেও দিতে হয়নি, সেই পরীক্ষা তাদের দিতে হলো হোদায়বিয়ায়। পরীক্ষা যেন তাদের সম্পূর্ণ হলো। তাই বোধহয় হোদায়বিয়ায় সন্ধির পর মুসলমানদের ‘মহাবিজয়’ (ফতহুম্ মুবিন)-এর খোশ খবর এলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের তরফ থেকে।

‘........ শুকনো রুটি সম্বল করে’

এক বিপদ যায়, আরেক বিপদ আসে।
হোদায়বিয়ার সন্ধির পর কোরাইশদের দিক থেকে মহানবী (সা) নিশ্চিত হলেন। কিন্তু বিপদ ছুটে এল ইহুদীদের দিক থেকে। যড়যন্ত্রকারী ও চির মুসলিম-বিদ্বয়ী ইহুদীরা যখন বুঝলো মক্কার কুরাইশদের আর শক্তি নেই মুসলমানদের ধ্বংস করার, তখন কায়বরের ইহুদী গোত্রগুলো পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী গাতফান ও অন্যান্য পৌত্তলিক গোত্রকে নানা প্রকার আশা ও প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মদীনা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করলো। তারা মুসলমানদের উত্যক্ত ও দুর্বল করার জন্য মুসলমানদের একটা বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ করে অনেককে হতাহত করল এবং সবকিছু লুণ্ঠন করে নিয়ে গেল। এর কিছুদিন পর আরও দুঃসাহসী হয়ে তার কদীনার উপকণ্ঠে জ-ফারাদ প্রান্তরে মহানবী (সা) ও তাঁর সাহাবাদের পশুপালে আক্রমণ চালিয়ে প্রহরী এক মুসলমানকে হত্যা করে লোকটির স্ত্রীসহ গোটা পশুপালকে লুট করে নিয়ে গেল। মহানবী (সা) গুপ্তচর পাঠিয়ে খবর নিয়ে জানলেন, ইহুদী ও গাতফানীরা মদীনা আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত। যে কোন সময় তারা মদীনার উপর আপতিত হতে পারে। মহানবী (সা) ১৪শ’ পদাতিক ও দু’শ সওয়ারী নিয়ে খায়বর যাত্রা করলেন। তিনি এমনভাবে তাঁর বাহিনী পরিচালনা করলেন যাতে গাতফানীদের থেকে খায়বরের ইহুদীদের বিচ্ছিন্ন করা যায়। তাই হলো। গাতফানীরা মনে করল মুসলমানরা তাদের ফাঁদে আটকাবার চেষ্টা করছে। তারা ভয়ে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে তাদের এলাকায় দুর্গে আশ্রয় নিল। ইহুদীরাও সম্মুখ যুদ্ধ এড়িয়ে খায়বরে তাদের সুরক্ষিত দুর্গে গিয়ে প্রবেশ করল এবং মিত্র গাতফানীদের আগমনের অপেক্ষা করতে লাগল। তারা আরও ভাবল, দুর্গ অবরোধ করে মুসলমানরা তাদের কাবু করতে পারবে না। বেশীদিন দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকার মত রসদ মুসলমানদের নেই। ইহুদীদের এই হিসাব সত্য। মুসলমানদের তখন খুবই আর্থিক দুর্দিন। মুসলমানরা মাত্র কিছু ছাতু সম্বল করে খায়বর অভিযানে এসেছিল। সে ছাতু ক’দিনেই নিঃশেষ হয়ে গেল। অনাহার-অর্ধাহারের কালছায়া নেমে এল মুসলিম শিবিরে। অবরোধের সময় যত বাড়ল, মুসলমানদের দুঃখ দুর্দশা ততই বৃদ্ধি পেতে লাগল। তার উপর দুর্গ প্রকার থেকে ইহুদীরা মাঝে মাঝেই তীর, বর্ষা, পাথর ইত্যাদি নিক্ষেপ কওে মুসলমানদের হতাহত করতে লাগল। ইহুদীদের ধারণা হলো, অনাহার-অর্ধাহারে মুসলমানরা বিপর্যস্ত হয়ে অচিরেই অবরোধ উঠিয়ে পালিয়ে বাঁচবে। এদিকে মহানবী (সা) যখন দেখলেন যে, ইহুদীরা কোন মতেই আত্মসমর্পণ বা সন্ধি করবে না, তখন একদিন তিনি সাথীদেরকে দুর্গ দখলের নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ অমৃত হয়ে দেখা দিল মুসলমানদের জন্য। ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্বালা তারা ভুলে গেল। মুহূর্তেই দুর্বল শরীর তাদের সবল হয়ে উঠল। শুরু হলো ঘোরতর যুদ্ধ। একের পর এক ইহুদী দুর্গে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হতে লাগল। ইহুদীদের সর্ব বৃহৎ দুর্গ কা’মুছ। তিনদিন যুদ্ধ চালাবার পর মুসলমানরা এ দুর্গ দখল করে নিল। কা’মুছ দুর্গের পতনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে খায়বরের সকল ইহুদী দুর্গের পতন ঘটল। যুদ্ধে মুসলমানরা যে কতটা দক্ষতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, যুদ্ধের ফলাফল থেকেই তা আঁচ করা যায়। ৪ সপ্তাহের যুদ্ধে শহীদ হয়েছেলেন ১৫ জন মুসলিম, আর অন্যপক্ষ মার গিয়েছিলেন ৯৩ জন ইহুদী। অনাহার, অর্ধাহার আর সংখ্যা স্বল্পতা মুসলমানদের বিজয় ঠেকাতে পারেনি। আর প্রাচুর্য, সংখ্যাধিক্য এবং সুরক্ষিত দুর্গ পারেনি ইহুদীদের বিজয় দিতে।

সীমাহীন বৈরিতার সীমিত শাস্তি

মদীনায় হিজরতের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদীরা বার বার বিশ্বাসঘাতকতা করছে। নানরকম ষড়যন্ত্র তারা অবিরাম করে গেছে। খন্দক যুদ্ধের আয়োজন প্রকৃতপক্ষে তারাই করেছিল। আরবের দশ হাজার সৈন্য তার ডেকে এনেছিল মুসলমানদের ধ্বংসের জন্যেই। সে আয়োজন যখন ব্যর্থ হলো, তখন খায়বরকে কেন্দ্র করে অন্যান্য গোত্রের সাহায্য নিয়ে নিজেরাই মদীনা থেকে মুসলমানদের মুছে ফেলার আয়োজন করেছিল। কিন্তু খায়বর যুদ্ধেও তার পরাজিত হলো। জাগতিক নিয়মে এবং তদানীন্তন করা, তাদের সক্ষম পুরুষদের হত্যা করা এবং অন্যান্যদের দাসে পরিণত করা। কিন্তু মহানবী (সা) ইহুদীদের সাথে যে ব্যবহার করলেন তখন পর্যন্ত জগতের ইতিহাসে তার কোন তুলনা ছিল না। যুদ্ধ শেষে মহানবী (সা) ঘোষণা করলেন:
(ক) ইহুদীরা আগের মতই স্বাধীনভাবেই ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারবে। কেউ কোন প্রকার বিঘœ সৃষ্টি করতে পারবে না।
(খ) তাদেরকে কোন যাকাত, ওশর দিতে হবে না, যা মুসলমানরা দিয়ে থাকে।
(গ) তাদেরকে মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হবে না।
(ঘ) তাদের কতকগুলো দুর্গের স্বর্ণ ও রৌপ্য স্পর্শ কর হবে না।
(ঙ) তাদের কতকগুলো দুর্গের স্বর্ণ ও রৌপ্য স্পর্শ করা হবে না।
(চ) তবে দেশের সমস্ত জমির মালিকানা মদীনা রাষ্ট্রের অধীন থাকবে। জনগণ জমির শস্যের একটা ভাগ মদীনার সরকারকে দেবে এবং
(ছ) ভাগ আগের মতই অর্ধাংশ হবে।
এই ঘোষণা যখন হলো, তখন ইহুদীদেরই চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হল। তাদের সীমাহীন বৈরিতার বিনিময়ে এই বদন্যতা পাবে, কল্পনাও করতে পারেনি তারা।


পিডিএফ লোড হতে একটু সময় লাগতে পারে। নতুন উইন্ডোতে খুলতে এখানে ক্লিক করুন।




দুঃখিত, এই বইটির কোন অডিও যুক্ত করা হয়নি