মূলপাতা বই আমরা সেই সে জাতি - ১ম খন্ড

খাববাবের আকাংখা

একদম প্রাথমিক পর্যায়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন, খাববার তাঁদের মধ্যে একজন। বোধ হয় ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে পাঁচ ছয় জনের পরই তাঁর স্থান হবে। তিনি এক জন মহিলার ক্রীতদাস ছিলেন। মহিলাটি ছিল নিষ্ঠুরতার জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি। যখন সে জানতে পারল খাববার ইসলাম গ্রহন করেছেন, তখন তাঁর উপর নির্মম অত্যাচার শুরু হলো। অধিকাংশ সময় তাঁকে নগ্নদেহে তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে রাখা হতো। যার ফলে তাঁর কোমরের গোশত গলে পড়ে গিয়েছিল। ঐ নিষ্ঠুর রমণী মাঝে মাঝে লোহা গরম করে তাঁর মাথায় দাগ দিত।
অনেকদিন পর হযরত উমারের রাজত্বকালে হয্রত উমার একদিন তাঁর উপর নির্যাতনের বিস্তৃত বিবরণ জানতে চাইলেন। খাববার তখন বললেন, “আমার কোমর দেখুন।” হযরত উমার কোমর দেখে আঁৎকে উঠে বললেন, “এমন কোমর তো কোথাও দেখিনি?” উত্তরে খাববাব খলীফাকে জানালেন, “আমাকে জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর শুইয়ে চেপে ধরে রাখা হতো, ফলে আমার চর্বি ও রক্তে আগুন নিভে যেত।”
এই নির্মম শাস্তি ভোগ করা সত্ত্বেও ইসলামের যখন শক্তি বৃদ্ধি হল এবং মুসলমানদের বিজয় সূচিত হলো, তখন খাববাব রোদন করে বলতেন, “খোদা না করুন আমার কষ্টের পুরষ্কার দুনিয়াতেই যেন লাভ না হয়।”
মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হযঅরত খাববারের মৃত্যু হয় এবং সাহাবাদের মধ্যে সর্ব প্রথম তিনিই কুবায় কবরস্থ হন। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত আলী (রা) একদিন তাঁর কবরের পাশ দিয়ে যাবার সময় বলেছিলেন, “আল্লাহ খাববাবের উপর রহম করুন। তিনি নিজের খুশীতেই মুসলিম হয়েছিল। নিজ খুশীতেই হিজরত করেছিলেন। তিনি সমস্ত জীবন জিহাদে কাটিয়ে দিয়েছিলেন এবং অশেষ নির্যাতন ভোগ করেছিলেন।”
হযরত আবুযর আরবের গিফার গোত্রের লোক। মক্কা থেকে অনেক দূরে বাস করেন তিনি। সত্যানুসন্ধানী আবুযর শুনলেন মক্কায় একজন নবী আবির্ভূত হয়েছেন।

তাওহীদের মহাবণী গোপন রাখতে পারবনা
আবুযর মক্কায় গিয়ে তাঁর সাক্ষাত লাভের মনস্থ করলেন। কিন্তু কুরাইশদের শ্যেন দৃষ্টির সামনে তাঁকে খুঁজে বের করে সাক্ষাত করা নিরাপদ নয়। তবু আবুযর মক্কায় চললেন। সত্যসন্ধানী আবুযরকে সত্য প্রচারকের সাক্ষাত যে পেতেই হবে। মক্কায় গিয়ে তিনদিন মৌন অনুসন্ধানের পর আবুযর মহানবীর (সা.) সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করলেন। নবীর সাক্ষাত পেয়েই সত্যের জন্য পাগল পারা আবুযর ইসলাম গ্রহন করলেন। মহানবী (সা.) আবুযরকে উপদেশ দিলেন, “ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখে তুমি নীরবে দেশে ফিরে যাও।”
ইসলাম গ্রহণ করে আবুযর কিন্তু আর স্থির থাকতে পারলেন না। যে সত্য গ্রহণের জন্য এতদিন তিনি পাগল প্রায় ছিলেন, সে সত্য প্রচারের জন্য এতদিন তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁর মনে কাঁটার মত বিঁধতে লাগলো। ফুল শয্যায় শয়ন করে কাল কাটাবার জন্য আবুযর ইসলাম গহন করেননি কিংবা নিরাপদে মুসলমান হয়ে থাকার বাহবাও তো আবুযরের জন্য নয়। তাহলে আবুযর ছুপ করে থাবে কেন? এই চিন্তা আবুযরকে চুপ থাকতে দিলো না, স্থির হতে দিলোনা। হয্রত আবুযর বিনীতভাবে মহা নবীর (সা) কাছে নিবেদন করলেন, “তাওহীদের মহাবাণী আমি গোপন রাখতে পারবো না, কাফিরদের মধ্যে গিয়ে চেঁচিয়ে তা ঘোষনা করব।”
যে আবুযর কাফিরদের ভয়ে মক্কায় মহানবীর (সা) নাম পর্যন্ত নিতে সাহস করেননি, সকলের চোখ এড়িয়ে গোপনে তিনদিন ধরে যে আবুযর মহানবীকে (সা) খুঁজে ফিরেছেন কালেমা তাওহীদ উচ্চারণের পর সেই আবুযর সমস্ত ভয়-ভীতি, অত্যাচার, এমন কি মৃত্যুভয়ের আশংকাকেও জয় করে নিলেন। কিছুই আর তাঁকে পেছনে টান্তে পারলোনা। মহা নবীর (সা) কাছ থেকে হযরত আবুযর ছুতে এলেন কাবার চত্বরে। সেখানে অনেক কুরাইশ জতলা পাকিয়ে বসেছিল। আবুযর কাবা গৃহের সামনে গিয়ে বজ্র নির্ঘোষে ঘোষ্ণা করলেন, “আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। মুহাম্মাদ (সা) তাঁর রাসূল।”
হযরত আবুযরের তাওহীদ ঘোষণা বোধয় কুরাইশদের হৃদয়ে তীরের মত বিদ্ধ হয়েছিল। তারা আহত হিংস্র পশুর মত ছুটে এল আবুযরকে লক্ষ্য করে। সবাই মিলে চারদিক থেকে নির্মম প্রহার শুরু করল তাঁর উপর। আঘাতে আঘাতে আবুযররের দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেল। রক্তে ভিজে গেল কাপড় চোপড়। ঢলে পড়লেন মাটিতে। তিনি মুমূর্ষ।
সেখানে হযরত আব্বাস উপস্থিত চিলেন। তিনি তখনও মুসলমান না হলেও ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদকে (সা) অত্যন্ত ভালবাসতেন। তিনি মুমূর্ষু আবুযরের দেহকে নিজের দেহ দিয়ে আড়াল করে উন্মাদ প্রায় কুরাইশদের বলতে লাগলেন, “কি সর্বনাশ! এ যে গিফার গোত্রের লোক। সিরিয়া যাওয়ার পথেই এদের নিবাস। এর এভাবে মৃত্যু হলে সিরিয়ার ব্যবসা বাণিজ্য করার পথই যে আমাদের বন্ধ হয়ে যাবে।” একথা শুনে কুরাইশদের সম্বিত ফিরে এলো। তাদের মনে হলো, আব্বাস তো ঠিকই কথা বলেছেন। তারা আবুযরকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়াল। এ অমানুষিক নিপীড়ন হযরত আবুযরকে সত্যের প্রচার থেকে বিরত রাখতে পারেনি। এই ঘটনার পরও তিনি পরপর দু’দিন কাবার চত্বরে গিয়ে উচ্চ কণ্ঠে তাওহীদের বাণী ঘোষণা করেছেন। অত্যাচার-নিপীড়নেরও পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কিন্তু আবুযর সত্যের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সব কিছুকেই মেনে নিয়েছেন হাসি মুখে। অদ্ভুত শক্তি তাওহীদের। মনে প্রানে একবার এ কালেমা পাঠ করলে মানুশের মনে যে শক্তির বন্যা আসে, তার সামনে থেকে জগতের সব অত্যাচার, সব যুলুম আর তার ভয় তৃণ খণ্ডের মত ভেসে যায়।

‘আমি ঠকিনি বন্ধু’
মক্কার ধনী উমাইয়া।ধনে-মনে সব দিক দিয়েই কুরাইশদের একজন প্রধান ব্যক্তি সে। প্রাচুর্যের যেমন তার শেষ নেই, ইসলাম বিদ্বেষেও তা কোন জুড়ি নেই। শিশু ইসলামকে ধ্বংসের কোন চেষ্টারই সে কোন ত্রুটি করে না। এই ঘোরতর ইসলাম বৈরী উমাইয়ার একজন ক্রীতদাস ইসলাম গ্রহন করেছে। তা জানতে পারল উমাইয়া। জানতে পেরে ক্রোধে ফেটে পড়লো সে। অকথ্য নির্যাতন সে শুরু করলো। প্রহারে জর্জরিত সংজ্ঞাহীন-প্রায় ক্রীতদাসকে সে নির্দেশ দেয়, “এখনও বলি, মুহাম্মাদের ধর্ম ত্যাগ কর। নতুবা তোর রক্ষা নেই।”
কিন্তু তার ক্রীতদাস বিশ্বাসে অটল। শত নির্যাতন করেও তাঁর বিশ্বাসে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরানো গেল না। ক্রোধে উন্মাদ হয়ে পড়ল উমাইয়া। শাস্তির আরো কঠোরতর পথ অনুসরণ করল সে।
একদিনের ঘটনা। আরব মরুভূমির মধ্যাহ্ন। আগুনের মত রৌদ নামছে আকাশ থেকে। মরুভূমির বালু যেন টগবগিয়ে ফুটছে। উমাইয়া তার ক্রীতদাস্কে নির্দয় প্রহার করল। তারপর তাকে সূর্যমুখী করে শুইয়ে দেওয়া হল। ভারি পাথর চাপিয়ে দেওয়া হল বুকে। ক্রীদাসের মুখী কোন অনুনয়-বিনয় নেই। মনে নেই কোন শংকা। ছোখে কোন অশ্রু নেই, মুখে কোন আর্তনাদও নেই। উর্ধমুখী তাঁর প্রসন্ন মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে আল্লাহর প্রসংসা ধ্বনি-‘আহাদ’, ‘আহাদ’।
ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন হযরত আবু বকর (রা)। ‘আহাদ’ ‘আহাদ’ শব্দ তাঁর কানে গেল। অনুসন্ধিৎসু হয়ে শব্দ লক্ষ্যে তিনি মরুভূমির বুকে শায়িত ক্রীতদাসের সমীপবর্তী হলেন। উমাইয়াকে দেখে সব ব্যাপারটাই তিনি মনে মনে বুঝে নিলেন। বললেন, “উমাইয়া, আপনাকে তো ধনী ও বিবেচক লোক বলেই জানতাম। কিন্তু আজ প্রমাণ পেলাম, মার ধারণা ঠিক নয়। দাসটি যদি এতই না পসন্দ, তাকে বিক্রি করে দিলেই পারেন। এমন নির্দয় আচরন কি মানুষের কাজ? ”
হযরত আবু বকরের ঔষুধে কাজ হলো। উমাইয়া বললেন, “এত বাহাদুরী দেখাবেন না। দাস আমার এর উপর সদাচার-কদাচার করবার অধিকার আমারই। তা যদি এতই দয়া লেগে থাকে, তবে একে কিনে নিলেই পারেন”?
হযরত আবু বকর (রা) এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি চত করে রাজী হয়ে গেলেন। একজন শ্বেতাংগ ক্রীতদাস ও দশটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে কিনে নিলেন কৃষ্ণাংগ ক্রীতদাসকে। হযরত আবু বকর (রা) মরুভূমির বুক থেকে তেনে তুলে গা থেকে ধূলো ঝেড়ে দিলেন। উকাইয়া বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন, “কেমন বোকা তুমি বলত? এ অকর্মন্য ভৃত্যটাকে একটি সুবর্ন মুদ্রার বিনিময়েই বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলাম। এখন আমার লাভ ও তোমার ক্ষতি দেখে হাসি সম্বরণ করতে পারছি না।”
আবু বকরও হেসে বললেন, “আমি ঠকিনি বন্ধু! এ ক্রীতদাসকে কেনার জন্য আমার সমস্ত সম্পত্তি দিতে হলেও আমি কুন্ঠিত হতাম না। কিন্তু একে আমি আমি ধারণাতীত সস্তা মুল্যে ক্রয় করে নিয়ে চললাম।”
এ দাসটিই ছিলেন বিশ্ব বিশ্রুত বিলাল। ইসলামের প্রথম মুয়াযযিন হযরত বিলাল।

উমার হলেন আল ফারুক
হযরত উমার (রা) ইসলাম গ্রহণ করেই জিজ্ঞাস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, বর্তমানে মুসলমানদের সংখ্যা কত?” মহানবী (সা) উত্তর দিলেন, “তোমাকে নিয়ে চল্লিশ জন।” উমার বললেন, “এটাই যথেষ্ট। আজ আমরা এই চল্লিশ জনই কাবা গৃহে গিয়ে প্রকাশ্যে আল্লাহর ইবাদত করব। ভরসা আল্লাহর। অসত্যের ভয়ে আর সত্য চাপা পড়ে থাকতে দেব না।”
উমার (রা) সবাইকে নিয়ে উলংগ তরবারি হাতে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিতে দিতে কা’বা প্রাঙ্গণে গিয়ে উপস্থিত হলেন। মুসলিম দলের সাথে হযরত উমার (রা)-কে এভাবে কা’বা প্রাঙ্গণে দেখে উপস্থিত কুরাইশগন যারপর নাই বিস্মিত ও মনুক্ষুন্ন হয়ে পড়ল। তাদের মনোভাব দেখে হযরত উমার (রা) পৌরুষকণ্ঠে গর্জন করে বললেন, “আমি তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি, কোন মুসল্মানের কেশাগ্র স্পর্শ করলে উমারের তরবারি আজ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে উত্তোলিত হবে।”
কা’বায় উপস্থিত একজন কুরাইশ সাহস করে বলল, “ হে খাত্তাব পুত্র উমার তুমি কি সত্যই মুসলমান হয়ে গেলে? আরবরা তো কদাচ প্রতিজ্ঞাচ্যুত হয় না। জানতে পারি কি, তুমি কি জিনিস পেয়ে এমন ভাবে প্রতিজ্ঞাচ্যুত হলে?”
হযরত উমার উচ্চকণ্ঠে জবাব দিলেন, “মানুষ যার চেয়ে বেশী পাওয়ার কল্পনা করতে পারে না, আমি আজ তেমন জিনিস পেয়েই প্রতিজ্ঞাচ্যুত হয়েছি। সে জিনিস হল আল কুরআন।”
হযরত উমারের (রা) এরূপ তেজোদৃপ্ত কথা শুনে আর কেউ-ই কোন কথা বলতে সাহস পেল না। বিমর্ষ চিত্তে কুরাইশরা সবাই সেখান থেকে চলে গেল।
অতঃপর মহানবী (সা) সবাইকে নিয়ে কাবা ঘরে নামায আদায় করলেন। সেখানে মুসলমানদের এটাই প্রথম নামায। এর আগে মুসলমানরা অতি গোপনে ধর্ম কাজ করতেন। পোশাক-পরিচ্ছদের পার্থক্য রক্ষা করতে পারতেন না। এজন্য কে মুসলমান, কে পৌত্তলিক তা চিনবার উপায় ছিলনা। এ ঘটনার পর মুসলমানরা পোশাক-পরিচ্ছদ ও ধর্ম কর্মে পৃথক সম্প্রদায়রূপে পরিগণিত হলেন। এ ঐতিহাসিক পরিবর্তন উপলক্ষে মহানবী (সা) হযরত উমারকে ‘আল ফারূক’ উপাধিতে ভূষিত করলেন।

যে মৃত্যু বিজয় আনে
আরবের আগুন ঝরা মধ্যাহ্ন। উর্ধাকাশ থেকে মরু-সূর্য যেন আগুন বৃষ্টি করছে। মরুর লু’ হাওয়া আগুনের দাব-দাহ নিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকটা। এমনি সময় আগুন ঝরা মরুভূমির বুকে নির্যাতন চলছে এক নারীর উপর- সুমাইয়ার উপর। ইসলাম প্রচারের শুরুতেই যাঁরা রাসূলের (সা) আহবানে সাড়া দিয়েছিলেন, সুমাইয়া তাঁদেরই একজন। সুমাইয়ার নারী দেহ ভংগুর, স্পর্শকাতুরে, কিন্তু আত্মা তা অজেয়। বক্ষে তাঁর বিশ্বাস-ঈমানের দুর্জয় শক্তি ও সাহস। সে প্রাণ বহ্নি নির্বাপিত হবার মত নয়।
সুমাইয়ার উপর এ নির্যাতন কেন? কেন তাঁকে এই প্রখর মধ্যাহ্নে সূর্যের বহ্নিতলে ক্রুর নির্যাতন চালানো হচ্ছে?
তাঁর অপরাধঃ এক আল্লাহকে প্রভু হিসাবে স্বীকার করেছেন, তাঁর যুগ ধরে পূজ্য লাত ওজ্জা-হোবলদের বিরোধিতা করেছেন, তাঁর জীবন মৃত্যু-সাধনা সব কিছুই নিবেদন করেছেন আল্লাহর নামে। অমানুষিক নির্যাতনেও সুমাইয়া অচল অটল। তাঁর দেহ নির্যাতন নিপীরনে জর্জরিত হোক, তাঁর কোমল দেহ পুড়ে ছাই হয়ে যাক, তবু অসত্যের কাছে, অত্যাচারের কাছে তাঁর অমর আত্মা কখনও নতি স্বীকার করবেনা। এত কষ্ট দিয়েও শত্রুর মন টললো না। ইসলামের শত্রু আবু জাহল সুমাইয়ার অবিচল নিষ্ঠা, অপূর্ব সাহস-সহিষ্ণুতা অ দৃঢ়তা দেখে অস্থির হয়ে তাঁর দিকে বর্শা ছুঁড়ে মারল। বর্শা গিয়ে সুমাইয়ার নিম্নাংগ ভেদ করল। সুমাইয়ার দেহ ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ল। তাঁর মৃত্যুজয়ী আত্মা চলে গেল জান্নাতে। দু’মুঠো মাতির দেহ তাঁর আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেল।
সুমাইয়ার পবিত্র রক্তে আরবের মাটি রঞ্জিত হলো-সেই রক্তে উত্তপ্ত হলো ভবিষ্যতের শত সহস্র শাহাদাত-আত্মত্যাগের বীজ।
সত্যের জন্য উৎসর্গিত প্রাণ যাঁর, ম্রিত্যুতে তাঁর কিসের ভয়, কিসের শংকা। সুমাইয়ার কন্যা হযরত উমামার উপরও চলল অকথ্য নির্যাতন। তপ্তবালুর উপর-পাথরের উপর তাঁকে জোর করে শুইয়ে রাখা হতো। উত্তপ্ত মরুর সূর্য প্রখর কিরণে তাকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতো। মধ্যাহ্নে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো উন্মুক্ত মরুপ্রান্তরে। উষ্ণ লু-হাওয়া তাঁর সর্বাঙ্গ ঝলসে দিত-আত্মা তবু নতি স্বীকার করেনি। অসত্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মশক্তি চালিয়ীছে তা অবিশ্রান্ত দুঃসাহসী সংগ্রাম-দুঃখ জয়। মৃত্যুজয়ী আত্মা সগৌরবে তুলে ধরেছে- দিকে দিকে মেলে দিয়েছে সত্যের জয় পতাকা।

বড় লাভের ব্যবসা করলে, সুহাইব
নবুওয়াতের তখন একদম শিশুকাল। নবুওয়াতের বাতি জ্বলছে। জ্বলছে মক্কার ছোট গণ্ডির মধ্যে। জাহিলিয়াতের অন্ধকার এ আলোক শিখাকে গলাটিপে মারার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় রত। কিন্তু নবুওয়াতের আলোক শিখা যে আলোক শিশুদের তৈরি করেছে, তারা জগত জোড়া সহনশীলতা নিয়ে নীরবে আত্মরক্ষা করে চলেছে। এ ধরনেরই এক আলোক-শিশু হযরত সুহাইব (রা)। অত্যাচারের স্টিম রোলার চলছে তাঁর উপর। চরম সহনশীলতার প্রতীক সুহাইব সব অত্যাচার, সব অত্যাচার সয়ে যাচ্ছেন নীরবে। আল্লাহর এ সৈনিকদের উপর এ অমানুষিক নির্যাতন কেমন করে কত দিন আর সয়ে যাবেন মহানবী (সা)। তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠল। সকলের মত সুহাইবকেও মহানবী (সা) একদিন মক্কা থেকে হিজ্রাত করার নির্দেশ দিলেন। অ্যাইর্দেশের সঙ্গে সঙ্গেই সুহাইব সিদ্ধান্ত নিলেন হিজরাতের। মহানবীর (সা) নির্দেশের কাছে, ইসলামের জন্য ত্যাগ স্বীকারের কাছে স্বদেশের মায়া, স্বীয় সহায় সম্পদের মায়া মুহূর্তে উবে গেল। কাউকে কিছু না বলে একদিন হিজরতের উদ্দ্যেশে বের হলেন সুহাইব। সাথে পরিধানের পোশাকটুকুও আত্মরক্ষার জন্য কিছু অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। সুহাইবের এ যাত্রা ধরা পরে গেল কুরাইশ চরদের চোখে। সংবাদ পেয়ে ছুটে এল একদল কুরাইশ। তারা সুহাইবকে জোর করে ধরে নিয়ে যেতে চায় মক্কায়।সুহাইব মক্কার বাইরে গিয়ে দল পাকাবে, মুসলমানদের দল ভারি করবে কুরাইশরা তা হতে দেবে কেন? কিন্তু একাই রুখে দাঁড়েলেন কুরাইশ দলটির বিরুদ্ধে। বললেন, “তোমরা জান, আমি তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। আমার হাতে একটি তীর থাকা পর্যন্ত তোমরা কেউ আমাকে স্পর্শ করতে পারবেনা। তীর ফুরিয়ে গেলে তরবারি আছে। তররবারি ভেঙ্গে গেলে কিংবা হাতছারা হলে তারপর তোমরা আমাকে যা খুশি করতে পার। এত কিছুর চেয়ে বরং ভালো, তোমরা মক্কায় আমার যা কিছু মাল-সম্পদ আছে সব নিয়ে নাও, আর আমি চলে যাই।” কুরাইশদল অর্থের সন্ধান পেয়ে সুহাইবকে ধরার বিপদপূর্ণ ঝুকি না নেয়াই যুক্তিযুক্ত মনে করল। তারা পথ ধরল মক্কার আর সব বিসর্জন দিয়ে, মাতৃভূমির মায়া কাটিয়ে রিক্ত-নিঃস্ব সুহাইব অনিশ্চিতের পথে পাড়ি জমালেন। এদের সম্পর্কেই আল কুরআন বলছেঃ “এমনও লোক আছে যারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের জীবনতাকে কিনে নেয়, আল্লাহ নিজের বান্দাদের উপর সর্বদাই দয়াশীল।”
মহানবীর (সা) হিজরতের পর মদীনার সন্নিকটবর্তী পল্লীর একটি দিন। নবীর (সা) সাথে সাক্ষাত ঘটল সুহাইবের। নুবী তাঁকে কাছে ডেকে বললেন, “বড় লাভের ব্যবসাই করলে, সুহাইব।”
সুহাইবকে উঁচু মর্যাদা দিতো সকলেই। হযরত উমার (রা) তাঁর মূমুর্ষ অবস্থায় আছিয়ত করেছিলেন তাঁর জানাযায় নামায যান সুহাইবের দ্বারা পড়ান হয়।

এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন
সেদিন গভীর নিশীথে মহানবী (সা) হিজরত করেছেন। তাঁর ঘরে তাঁর বিছানায় শুয়ে আছেন হযরত আলী (রা)। মহানবীর কাছে গচ্ছিত রাখা কিছু জিনিস মালিকদের ফেরত দেবার জন্য মহানবী (সা) হযরত আলীকে (রা) তরবারির খোঁচায় জাগিয়ে বললো, “এই, মুহাম্মদ কোথায়?”
নির্ভীক তরুন হযরত আলী উত্তর দিলেন, “আমি সারারাত ঘুমিয়েছি, আর তোমরা পাহারা দিয়েছো। সুতরাং আমার চেয়ে তোমরাই সেটা ভালো জান।”
হযরত আলীর উত্তর তাদের ক্রোধে ঘৃতাহূতি দিল। তারা তাঁকে শাসিয়ে বলল, “মুহাম্মাদের সন্ধান তারাতারি বল, নতুবা তোর রক্ষা নেই।
হযরত আলীও কঠোর কণ্ঠে বললেন, “আমি কি তোমাদের চাকর যে তোমাদের শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য রেখেছি? কেন তোমরা আমাকে বিরক্ত করছো?” একটু থেমে আলী কয়েকজনের নাম ধরে ডেকে বললেন, “তোমরা আমার সাথে এস। তোমাদের জন্য শুভ সংবাদ আছে।” কথা শেষ করে হযরত আলী পথ ধরলেন।
যাদের নাম উল্লেখ করলেন তিনি, তারাও তাঁর পিছু পিছু চললো। তাদের হাতে উলঙ্গ তরবারি। তাদ্র মনে একটি ক্ষীণ আশা, হয়ত হযরত আলী তাদেরকে মুহাম্মাদ (সা) সন্ধান দিতে নিয়্যে চলেছেন।
হযরত আলী এক গৃহদ্বারে গিয়ে দাঁড়ালেন। পিছনে ফিরে ওদের বললেন, “দাঁড়াও, আমি আসছি।” বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন। পেছনে কয়েকজনের অন্তরে তখন ‘কি হবে না হবে’ অপরিসীম দোলা। তাদের মনে আশঙ্কাও। উলংগ তরবারি হাতে তারা পরিস্থিতি মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত।
এমন সময় হযরত আলী বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাতে কয়েকটা ধন-রত্নের তোড়া। তিনি তাদ্র সামনে উপস্থিত হয়ে ধন-রত্নের তোড়া তাদের সামনে ধরে বললেন, “নাও, তোমরা নাকি বহুদিন পূর্বে তোমাদের ধন-রত্নাদি হযরত মুহাম্মাদের (সা) কাছে গচ্ছিত রেখেছিলে? ভেবেছিলে, গচ্ছিত ধন আর আর পাবেন। আজ তিনি তোমাদের অত্যাচারেই দেশত্যাগী হয়েছেন। কিন্তু তোমাদের গচ্ছিত সম্পদ তোমাদের হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে গেছেন। এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন।”
এই কুরাইশরা যে এত শত্রুতার পরও তাদের ধন-রত্ন ফিরে পাবে, সসে কথা কল্পনাও করেনি। তাই তারা বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলঃ ‘সত্যই কি আল-আমীনের ন্যায় বিশ্বাসী ও সত্যবাদী লোক বিশ্বে আর নেই? তবে কি তিনি সত্য পথেই আছেন? আমরাই ভ্রান্ত পথে আছি? তাঁকে আঘাতের পর আঘাত দিয়ে পেয়েছি নিঃস্বার্থ প্রেমের আহবান-মানুষ হবার উপদেশ। আজ তাঁর প্রাণ নিতে এসেছিলাম, প্রাণ দিতে না পেরে দিয়ে গেলেন গচ্ছিত ধন-রত্ন? আহ! মুহাম্মাদ (সা) যদি আমাদের ধর্মদ্রোহী না হতেন, তাঁর পদানত দাস হয়ে থাকতেও আমাদের কিছু মাত্র আপত্তি ছিলনা।’

প্রয়োজন চুক্তির চেয়ে বড় হলো না।
বদর যুদ্ধের জোর প্রস্তুতি চলছিল তখন মদীনায়। মক্কার দিক থেকে অহরহ খবর এসে পৌচছে, বিপুল সজ্জা আর বিরাট বাহিনী ছুটে আসছে মদীনার দিকে। কিন্তু সে তুলনায় মদীনায় যুদ্ধ প্রস্তুতি কিছুমাত্র নেই। যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম যেমন স্বল্প, তেমনি মুসলিম যোদ্ধা সংখ্যাও নগণ্য। প্রতিটি সাহায্য প্রতিটি সহায়তাকারীকেই তখন সাদরে স্বাগত জানানো হচ্ছে সেখানে। এমন সময়ে হুযায়ফা মরুভূমির দীর্ধ পথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় মহানবীর (রা) দরবারে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি গাতফান গোত্রের আবস খান্দানের লোক। মুসলিম তিনি। কুফরের সাথে ইসলামের শক্তি পরীক্ষার প্রথম মহাসাগরে অংশ নেয়ার আকুল বাসনা নিয়ে তিনি মদীনায় এসেছেন। পথের কত বিপদ মাড়িয়ে, বাধার কত দুর্লঘ্য দেয়াল পেরিয়ে তিনি এসে পৌচেছেন নদীনায়। মদীনায় যুদ্ধ আয়োজন দেখে তাঁর চোখ মন জুড়িয়ে গেল।
শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহে পরম প্রশান্তি নিয়ে হুযাই ফা দরবারে নববীতে গিয়ে বসলেন। কুশল বার্তা দিতে গিয়ে মহানবীকে (সা) তিনি পথের বিপদ আপদ ও অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। তিনি বললেন, “পথিমধ্যে কুরাইশরা আমাকে আটক করে বলে মুহাম্মাদের কাছে যাওয়ার অনুমতি নেই।” আমি বললাম, “মুহাম্মাদের কাছে নয়, মদীনায় যাচ্ছি।” অবশেষে তারা বলল, “ঠিক আছে, তোমাকেজ ছাড়তে পারি। কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে যে, মদীনায় গিয়ে মুহাম্মাদের পক্ষে আমাদের বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধে যোগ দেবে না।”
“আমি তাদের এ শর্তে রাজী হয়েই তাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে মদীনায় এসেছি।”
হযাইফার শেষ কথাটি শুনেই মহানবী (সা) চোখ তুলে তাঁর দিকে চাইলেন। বললেন, “তুমি কথা দিয়েছ তাদের যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেবে না তুমি?”
হুযাইফা স্বীকার করলেন। মহানবী (সা) তখন তাঁকে বললেন, “তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি পালন কর। গৃহে ফিরে যাও। সাহায্য ও বিজয় আল্লাহর হাতে। আমরা তাঁর কাছেই তা চাইব।”
হুযাইফার চোখে নেমে এল আঁধার। আশা ভংগের দুঃখ, জিহাদে যোগ দিতে না পারার বেদনায় মুষড়ে পড়লেন তিনি। কিন্তু উপায় নেই। মহানবীর (সা) কাছে প্রতিশ্রুতি ভংগের প্রশ্রয় পাবার নেই কোন সামন্য উপায়। হুযাইফার চোখের সামনেই মদীনা থেকে যুদ্ধযাত্র হলো বদরের দিকে। আর মহানবীর (সা) নির্দেশ শিরে নিয়ে হুযাইফা পা বাড়ালেন বাড়ীর পথে।

মৃত্যু যেখানে মধুর
৬২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২রা হিজরী সনের কথা। ইস্লামী রাষ্ট্র তখন সবেমাত্র শিশু। একজন আরব শেখ নবীর (সা) কাছে এক দূত পাঠিয়ে বললেন, “আমার দলের লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে উৎসুক, কিন্তু এখানে উপযুক্ত কোন ধর্ম প্রচারক নেই। আপনি যদি কয়েকজন জ্ঞানী ব্যক্তিকে এই উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন তবে আমরা বিশেষ বাধিত হবো।”আল্লাহর রাসূল (সা) কয়েকজন ধর্ম প্রচারক পাঠিয়ে দিলেন। তাঁরা আরব শেখের অঞ্চলসীমায় পৌছামাত্র সেখানের কয়েকজন গোত্রপতি দলবল নিয়ে তাঁদের ঘিরে ফেললো এবং হয় আত্মসমর্থণ নয় তো মৃত্যু এ দুটোর মধ্যে যে কোন একটা বেছে নিতে বললো। খন্ড যুদ্ধ হল। একে একে অনেকেই শহীদ হলেন। বন্দী হলেন খুবাইব (রা)। তাঁকে তুলে দেয়া হলো মক্কার কুরাইশের হাতে। নৃশংসতম উপায়ে তাঁকে হত্যা করা হবে ঠিক হলো। নির্দিষ্ট দিনে খুবাইবকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হলো। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য তিনি শেষ অনুরোধ জানালেন। অনুমতি পেয়ে তিনি একটু তাড়াতাড়ি নামায শেষ করলেন। তারপর উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, “জীবনের শেষ নামায একটু দীর্ঘতর করতেই মৃত্যু পথযাত্রীর ইচ্ছা হয়। কিন্তু আমি তা অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ করলাম, পাছে তোমরা মনে কর আমি ভীত হয়ে কালহরণ করছি।” বধ্যমঞ্চে পাঠাবার পূর্বে তাঁকে শেষবারের জন্য বলা হলো, “এখনও সময় আছে ইসলাম ত্যাগ করে আবার এক নব জীবন লাভ কর।” ধীর শান্ত ও দৃঢ় স্বরে খুবাইব বললেন, “অসত্যের পথে বেঁচে থাকার চাইতে মুসলমান হয়ে মৃত্যু বরণ করা শতগুণে শ্রেয়। ইসলামে আত্মসমর্পিত জীবনই আমার কাআছে সর্বাধিক মুল্যবান।” উঁচু বধ্যমঞ্চে পদক্ষেপে খুবাইব উঠে গেলেন। চার দিক থেকে নির্মম ভাবে বর্শা ও তীর বর্ষিত হতে লাগলো। নির্ভীক খুবাইব নির্বিকার চিত্তে হাসিমুখে রক্তদান করলেন, শহীদ হলেন। দেহ পড়ে রইলো-মৃত্যঞ্জয়ী অমর আত্মার যাত্রা শুরু হলো-লোক হতে আনন্দলোক।
সত্যাশ্রয়ী মানুষ যাঁরা জীবন মৃত্যু তাঁদের পায়ে ভৃত্য। তাই তাঁরাই বহন করেন সত্যের আলো, সত্যের পতাকা। প্রেরণার আগুন হয়ে ছরিয়ে পড়েন প্রাণে প্রাণে, সৃষ্টি করেন নব নব প্রাণলোক।

পতাকাবাহী মুসআব
মুসআব। ধনীর দুলাল মুসআব। প্রাচুর্যের মধ্যে যাঁর জীবন গড়ে উঠেছে সেই মুসআব সত্যের পথ দুঃখের পথ গ্রহণ করের ফকির হলেন। সহায় নেই, সম্বল নেই, আত্মীয়স্বজন তাঁর প্রতি বিরূপ। একমাত্র সম্বল-একমাত্র পাথেয় তাঁর আল্লাহর প্রেম, সত্যের বাণী। তাঁকে বন্দী করে রাখা হলো। বেপরোয়া নির্যাতন চালানো হলো তাঁর দেহ ও মনের উপর। বন্দীর শৃংখল ভেঙ্গে একদিন তিনি চলে গেলেন সুদূর আবিসিনিয়ায় অন্যান্য মুস্লিম মুহাজিরদের সাথে। বহুদিন পর তিনি এলেন মদিনায়। তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল অশেষ দারিদ্র, দুঃখ- কষ্ট, কিন্তু অদম্য তাঁর প্রাণশক্তি। পড়নে ভালো কাপড় নেই, শতছিন্ন এক্তি পোষাক কোন মতে তাঁর দেহের আব্রু রক্ষা করছে। এমনি ভাবে একদিন একটিমাত্র বস্ত্রে কোনরূপে দেহ ঢাকতে ঢাকতে তিনি পথ চলছেন? হযরত মুহাম্মাদ (সা) তাঁর এই দুর্দশা নীরবে চেয়ে দেখছিলেন, তাঁর মনে পড়ে গেল মুসআবের কথা ঐশ্বর্যপূর্ণ বিলাসী জীবনের কথা। কত সুখে, আরাম-আয়েশের মধ্যে তাঁর জীবন কেটেছে। আর আজ? রাসূল (সা) চোখে অশ্রু দেখা দিল।
উহুদের যুদ্ধক্ষেত্র। একদিকে মুষ্টিমেয় বিশ্বাসী মুসলমান, আন্যদিকে মক্কার কুরাইশগণ। তুমুল যুদ্ধ চলছে। মুসলমানদের পতাকাবাহী মুসআব। মুসলমানদের এক সংকটময় মুহূর্ত দেখা দিয়েছে-বিশ্বাসের চরম পরীক্ষা। নির্ভীক মুসআব ইসলামের পতাকা হস্তে যুদ্ধের প্রচণ্ডতা অগ্রাহ্য করে দাঁরিয়ে আছেন। একজন শত্রুর আঘাতে তাঁর দক্ষিন হস্ত কেটে পড়ে গেল। বাম হাত দিয়ে তিনি পতাকা ধরে রাখলেন। সে হাতও কাটা গেল। দু’হাতের অবশিষ্টাংশ দিয়ে মুসআব প্রাণপণে ইসলামের পতাকা বুকে ধরে রাখলেন। এ পতাকা নমিত হতে পারে না, যতক্ষণ প্রাণ আছে, ততক্ষণ তা অসম্ভব। অশান্ত মরুব্যাতায় তখন গর্বভরে নিশান উড়ছে। এ নিশান অবহেলিত হতে পারে না। শত ঝড় ঝঞ্চা বয়ে যাক, মৃত্যুর অশ্রান্ত গর্জন শুনা যাক, তবু সত্যের পতাকা নমিত লাঞ্চিত হতে পারে না। কখনও না, প্রাণ গেলেও না। অকস্মাৎ একটি তীর এসে মুসআবের বক্ষ ভাদ করে গেল। শহীদী রক্তে মরুর বক্ষ রঞ্জিত করে তিনি হলেন মৃত্যুঞ্জয়ী, আত্মা তাঁর লাভ করলো অমরত্নের অনির্বচনীয় আস্বাদ।

উহুদ প্রান্তরের প্রথম শহীদ
উহুদ যুদ্ধ সমাগত। মদীনার এক পর্ণ কুতিরে যুদ্ধসাজে সেজেছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম। হাসি যেন তাঁর মুখ থেকে উপচে পড়ছে। যুদ্ধে বেরোবার আগে তিনি পুত্র জাবিরকে ডেকে বললেন, “পুত্র! আমার অন্তর বলছে, এ যুদ্ধে আমিই সর্বপ্রথম শাহাদাত বরণ করব।” কথা বলার সময় তাঁর মুখে যে হাসি, তা দেখে মনে হবে যেন তিনি ঈদের আনন্দে সামিল হতে যাচ্ছেন।
উহুদ যুদ্ধের কঠিন সময়। ভীষ্ণ যুদ্ধ চলছে। হযরত আব্দুল্লাহর কথাই সত্য হলো। তিনি উসামা ইবনে আওয়ার ইবন উবাই এর হাতে শাহাদাত বরন করলেন। তাঁর রক্তাক্ত দেহ লুতিয়ে পড়ল উহুদের ময়দানে। হযরত আব্দুল্লাহ আগেই ভীষণ ভাবে ক্ষত বিক্ষত হয়েছিলেন। তারপর প্রাণহীন তাঁর দেহ যখন লুটিয়ে পড়ল মাটিতে তখনও তাঁর উপর চললো নিপীড়ন। বিকৃত করা হলো তাঁর দেহ। মুখে তাঁর তখনও কিন্তু সেই বেহেস্তী হাসি। আঘাতে আঘাতে বিকৃত তাঁর দেহের দিকে চেয়েই চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল হযরত আব্দুল্লাহর মেয়ে ফাতিমা। মহানবী (সা) সেদিকে চেয়ে তাকে সান্তনার সূরে বললেন, “জানাজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফিরিশতারা তাকে ছায়া দান করছে।”
পাহাড়ঘেরা উহুদের এক প্রান্তে আরও একজন শহীদের সাথে তাঁকে দাফন করা হলো। ছ’মাস পর তাঁর পুত্র জাবির তাঁকে সে কবর থেকে তুলে আর এক কবরে দাফন করে দিলেন। সে সময়ও তাঁর দেহ ছিল আবিকৃত। মনে হয়েছিল যেন তাঁকে আজই দাফন করা হয়েছে।
উহুদ যুদ্ধের বেশ কিছু দিন পরের এক ঘটনা। এক দিন হযরত আব্দুল্লাহর পুত্র হযরত জাবিরকে কাছে পেয়ে মহানবী (সা) উহুদ যুদ্ধের প্রথম শহীদ তাঁর পিতা সম্পর্কে একটি শুভ সংবাদ দিলেন। বললেন, “আল্লাহ পর্দা ছাড়া কারো সাথে কথা বলেন না। কিন্তু তোমার পিতার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন।, ‘যা চাও তাই দেওয়া হবে।’ তোমার পিতা উত্তরে বললেন, ‘আমার আশা, আর একবার আমি দুনিয়াতে গিয়ে শহীদ হয়ে আসি।’ আল্লাহ জবাব দিলেন, ‘যে দুনিয়া থেকে একবার আসে, আর ফিরে যেতে পারে না।’অতঃপর তোমার পিতা তাঁর সম্পর্কে ওহী চেয়েছিলেন। সে ওহী আমার কাছে এসেছেঃ যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলোনা, বরং তারা জীবিত।”

আবদুল্লাহ ও সা’দের আভিলাষ
উহুদের যুদ্ধ ক্ষেত্র। যুদ্ধের আগের দিন সন্ধ্যা। হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ গিয়ে সা’দ ইবন রাবীকে বলল, “চল আমরা একত্রে দোয়া করি। আমি দোয়া করব, তুমী ‘আমীন’ বলবে। আবার তুমি দয়া করবে, আমি ‘’আমীন বলবো।”
প্রথমেই প্রার্থনা করলেন হযরত সা’দ। তিনি দু’টি হাত উর্ধে তুলে বললেন, “হে আল্লাহ, আগামী কালের যুদ্ধে এক ভীষণ যোদ্ধা আমাকে জুটিয়ে দিন তাকে যেন যুদ্ধে পরাজিত করে আমী গাজী হতে পারি আর পরিত্যাক্ত মাল-সম্ভার আমি লাভ করি।” সা’দের এ প্রার্থনায় আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ ‘আমীন’ বললেন। তারপর জাহাশের পালা। জাহাশ দু’টি হাত তুলে মহা প্রভুর দরবারে সানুনয় প্রার্থনা জানালেন, “হে আল্লাহ, আগামী কাল যুদ্ধে আমাকে অতি বড় এক শত্রুর মুখোমুখি করুন। আমি যেন সর্বশক্তি দিয়ে তার মুকাবিলা করি এবং অবশেষে যেন শাহাদাতের অমৃত স্বাদ লাভ করতে পারি। শত্রুরা যেন আমার নাক-কান কেটে নেয়। পরে কিয়ামতের দিন আমি যখন আপনার সমীপে উপস্থিত হবো, তখন আপনি জিজ্ঞেস করবেন, ‘আবদুল্লাহ, তোমার নাক-কান কেন কাটা গেছে? তখন আমি উত্তর দেবো, ‘হে আল্লাহ, আপনার এবং আপনার রাসূলের রাস্তায় কাটা গেছে।’ তখন আপনি বলবেন, “হ্যাঁ, সত্যিই আমার রাস্তায় কাটা গেছে।” আবদুল্লাহ প্রার্থনা শেষে সা’দ ‘আমীন’ বললেন।
পরের দিন উহুদের ঘোরতর যুদ্ধে তাঁদের প্রার্থনা অনুসারেই ঘটনা ঘটল। সা’দ গাজী হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এলেন। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ তাঁর প্রার্থনা মুতাবিক শহীদ হলেন। সন্ধ্যার সময় যখন শহীদের লাশগুলোর সন্ধান করা হলো, তখন দেখা গেল, যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রভূমিতে আবদুল্লাহ শহীদ হয়ে পড়ে আছে। তাঁর নাক-কান কাটা। তাঁর হাতে তখনও তরবারি ধরা। কিন্তু শহীদের সে তরবারির অর্ধাংশ ভাঙা।

পিতা, পুত্র, স্বামীহারা এক মহিলা
উহুদের যুদ্ধে রাসূলের (সা) বহু প্রিয় সাথী নিহত হলেন। সত্যের জন্য অকুন্ঠিত চিত্তে তাঁরা প্রাণ দিয়েছেন। সত্যের আহবান তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছে আম্লান বদনে সকল দুঃখ কষ্ট সহ্য করে প্রাণের শিখা অনির্বাণ জ্বালিয়ে রাখতে। মৃত্যু তাঁদের অমর লোকের সঙ্গীত শুনায়। এ সঙ্গীতে সত্যের পরম আনন্দ তাঁরা লাভ করে। শত বিপদ আপদ শত মৃত্যু পার হয়ে তাঁরা লাভ করেন জীবনের পূর্ণতা। উহুদের যুদ্ধ নবীন মুসলিমদের এই সুযোগ দান করেছিল, মৃত্যুকে বরণ করে আমৃতকে তাঁরা লাভ করেছিলেন। সে এক চরম পরীক্ষার দিন। সংবাদ রটে গেল, এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে সেদিন তাঁর প্রিয় আনুচরগণ মানব প্রাচীর তুলে রক্ষা করেছিলেন।
রাসূলের (সা) মিথ্যা মৃতু সংবাদে একজন আনসার মহিলা ছুটে চললো মাঠের দিকে। এক জন লোককে দেখে সে জিজ্ঞেস করলো, “রাসূল কি অবস্থায় আছেন?”
লোকটি জানে রাসূল নিরাপদে আছেন, তাই প্রশ্নের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে বলল “তোমার পিতা শহীদ হয়েছেন।” মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে উঠলো তাঁর মুখ। নিজেকে সংযত করে মহিলাটি জিজ্ঞাসা করল, “রাসূল কেমন আছেন, তিনি কি জীবিত?”
“তোমার ভাইও নিহত হয়েছে।”
মহিলা আবার সেই একই প্রশ্ন ব্যাকুল কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল। তখন সে আবার বলল, “তোমার স্বামীও শীদ হয়েছেন।”
সকল শক্তি একত্র করে মহিলা তিক্ত স্বরে বলল, “আমার কোন পরমাত্মীয় মারা ফেছে তা আমি জিজ্ঞাস করছিনে, আমাকে শুধু বল আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ কেমন আছেন?” লোকটি উত্তর দিলেন,“তিনি নিরাপদেই আছেন।” মুহূর্তে মহিলাটির বিবর্ণ মুখে আনন্দের আভাস দেখা দিল। উল্লাসিত হয়ে সে বললো, “আত্মীয় বন্ধুদের প্রাণ তবে ব্যর্থ হয়নি।”
ব্যর্থ হয় না। কোন দিনই ব্যর্থ হয় না। একটি প্রাণের একটি পবিত্র জীবনের আত্মাহুতি সত্যের আলোক শিখা, সত্যের উদাত্তবাণীকে আরও তীব্রতর আরও জ্যোতির্ময় করে তোলে।
মৃত্যু ভয় যাদের নেই, সাহস ও অটল বিশ্বাস যাদের বুকে, তাদের জয় সুনিশ্চিত। ইসলামের প্রাথমিক যুগে একদল বিশ্বাসী ও নির্ভীক মুসলমান সকল বাধা-বিপত্তি ও মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ করেছিল বলেই ইসলামের প্রতিষ্ঠা সুদৃঢ় হয়েছে। আশার বাণী, শান্তির বাণী প্রচারিত হয়েছে। আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের বক্ষদেশ পর্যন্ত এর প্রতিষ্ঠার বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে শহীদী রক্তের পুণ্য স্রোতধারার উপর। ইসলাম একটি অজেয় শক্তি। অন্যায়, অন্ধকার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ।


পিডিএফ লোড হতে একটু সময় লাগতে পারে। নতুন উইন্ডোতে খুলতে এখানে ক্লিক করুন।




দুঃখিত, এই বইটির কোন অডিও যুক্ত করা হয়নি