মূলপাতা বই ঈমানের দাবী

কৈফিয়ত
আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য যিনি সুলেখক আব্বাস আলী খান রচিত ‘ঈমানেরদাবী’ গ্রন্থটি প্রকাশ করার তাওফিক দিয়েছেন। আব্বাস আলী খান ছিলেন একাধারে ইসলামী চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সুলেখক ও অনুবাদক। তাঁর লেখালেখি, পাণ্ডিত্য, ভাষা জ্ঞান সম্পর্কে ভালোভাবে পরিচিত হই ১৯৯৪ সালে। তখন প্রতি মাসে একবার সাংগঠনিক কাজে তার বাসায় যাওয়ার সুযোগ হতো। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে ছাত্র সংবাদের লেখা আনার জন্য বহুবার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়েছিল। তখন তিনি ‘মুসলমানদের অতীত ও বর্তমান’ শিরোনামে ছাত্র সংবাদে ধারাবাহিক লিখতেন।
কথা প্রসঙ্গে সাহস করে একদিন বললাম স্যার একটি প্রকাশনা সংস্থা করেছি আপনার লেখা একটি বই দিন। বললেন পরে দেখা করিও। কথা মতো কিছুদিন পর আবার দেখা করলাম। তখন তিনি ‘ঈমানের দাবী’ বইটি দিবেন বলে জানালেন। সে সাথে বললেন এ বইটি এক সময় প্রকাশিত হয়েছিল-এর সংস্করণ করে তোমাকে দিব। সে মতে তিনি সংস্কারে হাতও দিয়েছিলেন কিন্তু শত ব্যস্ততার কারণে সংস্করণ সম্পন্ন করতে পারেননি। ফলে সামান্য কিছু সংস্করণ সম্পন্ন করেই বইটি আমাকে দিয়ে দিলেন। বললেন, আল্লাহ তাওফিক দিলে পরে বইটির কলেবর বৃদ্ধি করা যাবে।
এবার বই প্রকাশের পালা। কম্পোজ, গ্রুফ ও প্রচ্ছদ সহ আনুসঙ্গিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে ফেললাম। কিন্তু হঠাৎ আমি দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হওয়ায় বইটি আর প্রকাশ করা হলোনা। ইতিমধ্যে আমি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছি এমনি মুহুর্তে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খান সাহেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি উপস্থিত হয়ে বিলম্বের কারণ জানালাম এবং পাণ্ডুলিপি ফেরত দিতে চাইলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছুদিন সময় দিলে বইটি প্রকাশ করতে পারবে? না পারলে এটি আধুনিক প্রকাশনী বা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী দিয়ে দিবো। বললাম, হ্যাঁ, কয়েক মাস সময় দিলে প্রকাশ করতে পারবো ইনশা আল্লাহ। তখন তিনি বললেন তোমাকে যখন বইটি দিয়েছি ফেরত নিবোনা। তুমি যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রকাশ করো। কারণ আমার শরীর স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছেনা বই প্রকাশ হয়েছে দেখে যেতে চাই। কিন্তু না আমার দুর্ভাগ্য বইটি যথাসময়ে এবারও প্রকাশ করতে পারলামনা। অবশেষে ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর আব্বাস আলীখান এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী ত্যাগ করে মহান আল্লাহর ডাকে পাড়ি জমান মহাজীবনের পথে। যা হোক ব্যক্তিগত নানা সমস্য ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে বইটি প্রকাশ করতে পেরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। সেই সাথে অনিচ্ছাকৃত বিলম্বের জন্য দুঃখিত।
ঈমানের দাবী এ বইটিতে লেখক কুরআন ও হাদীসের আলোকে সুনিপুণভাবে ঈমানিয়াতের বিশ্লেষণ, ঈমানদারের পরিচয়, ঈমানের দাবী, মুমিনের গুণাবলী, ঈমান ও কুফরের পার্থক্য, ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা, মুমিনদের জন্য সুসংবাদ সহ ঈমানের প্রভৃতি বিষয় অত্যন্ত সাবলীল ভাবে আলোচনা করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি ঈমান বিষয়ক একটি মৌলিক গ্রন্থ। আশা করি বইটি পাঠে একজন মানুষ সত্যিকার ঈমানদার হওয়ার নির্দেশনা পাবেন এবং ঈমানের দাবী সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে ঈমানের দাবী অনুযায়ী সামগ্রিক জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন। আমীন।

প্রকাশক
মুহাম্মদ লোকমান হোসাইন

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

ঈমানের অর্থ ও মর্ম
ঈমানের দাবী এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে আমাদেরকে প্রথমে জানতে হবে ঈমান বলতে কি বুঝায়।
ঈমান অর্থ কোন কিছুকে নির্ভুল ও সত্য মনে করে তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করা। পরিভাষা হিসেবে ঈমান শব্দটির অর্থ হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনে হক্ ইসলামকে সত্য ও চিরন্তন বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করা। তার সাথে বিশ্বাস করা আখিরাত, রিসালাত, আল্লাহর সকল ফেরেশতা ও তাঁর নাযিল করা সকল আসমানী কিতাব।
আল্লাহকে বিশ্বাস করা বা আল্লাহর উপরে ঈমান আনার অর্থ তাঁকে তাঁর যাবতীয় গুণাবলী সহ বিশ্বাস করা। অর্থাৎ তিনিই সমুদয় সৃষ্টির একমাত্র স্রষ্টা, প্রভু, বিশ্ব জাহানের সর্বশক্তিমান মালিক ও পরিচালক, মানুষের একমাত্র ইলাহ, বাদশাহ, প্রতিপালক, শাসক ও আইন দাতা। সকল প্রকার স্তবস্তুতি, বন্দেগী, দাসত্ব-আনুগত্য একমাত্র তাঁরই জন্যে। তিনি আদি, অনন্ত এক ও একক। তিনি সর্বজ্ঞ। এমনি অসংখ্য গুণে তিনি গুণান্বিত। এসব গুণেরও তিনি একমাত্র অধিকারী। এসব গুণে তাঁর নেই কোন শরীক, কোন প্রতিদ্বন্দ্বী।
আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টের, প্রভু ও দাসের, বাদশাহ ও প্রজার শাসক ও শাসিতের। মানুষকে প্রতি মুহুর্তে আল্লাহর আনুগত্য করতে হবে, তাঁরই শাসন মেনে চলতে হবে, তাঁরই কাছে ভক্তি-শ্রদ্ধায়, কৃতজ্ঞতায় মস্তক অবনত করতে হবে। তাঁরই গুণকীর্তন করতে হবে। তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্যে নিজের জীবন, ধন-সম্পদ উৎসর্গ করতে হবে।
আরেকদিক দিয়ে চিন্তা করলে এ কথা স্বীকার করতে হয় যে, ঈমান প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে প্রভু ও দাসের মধ্যে এবং বাদশাহ ও প্রজার মধ্যে একটা মজবুত চুক্তি। অর্থাৎ বান্দাহ আল্লাহর সাথে এ চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে এই বলেঃ হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রভু বা মনিব এবং আমি তোমার বান্দাহ বা দাস, তুমি আমার বাদশাহ এবং আমি তোমার প্রজা। অতএব, আমি তোমার দাস হিসেবে এবং তোমার প্রজা হিসেবে তোমার সব আদেশ এবং সব আইন মেনে চলব সর্বদা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে। চুক্তির অংশকুটু মেনে নিলে তা পরিপূর্ণ হবে না। তার সাথে এ কথাও বলতে হবে, হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া আর কারো হুকুম, শাসন এবং আর কারো আইন মেনে চলবোনা। অর্থাৎ আল্লাহ বিরোধী সকল শক্তি ও সত্তার আধিপত্য ও আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে একমাত্র তোমারই প্রভুত্ব, কর্তৃত্ব, আনুগত্য ও আইন মনে প্রাণে মেনে নেব। এ শর্তে তোমার সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছি।
আল্লাহ বলেন-

(আরবী পিডিএফ ১২ পৃষ্ঠায়************)
অর্থাৎ যে তাগুতকে তথা খোদাদ্রোহী শক্তি ও তার হুকুম-শাসন ও আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করলো এবং তারপর আল্লাহর উপর ঈমান আনলো। এর সহজ-সরল অর্থ, ঈমানের পূর্বশর্ত হলো গায়রুল্লাহকে তথা আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল শক্তি ও সত্তাকে প্রত্যাখ্যান। এ কথাগুলো ছোট্ট একটি বাক্যে বলা হয়েছেঃ তা হলো- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”।
ঈমানের উপর ঘন্টার পর ঘন্টা যতই আলোচনা করিনা কেন, কিন্তু জীবনের কোন কোন ক্ষেত্রে যদি আল্লাহর হুকুম-শাসন মেনে চলি এবং বহুক্ষেত্রে খোদা বিমুখ ও খোদাদ্রোহী শক্তির হুকুম-শাসন মেনে চলি, তাহলে তা হবে প্রকৃত ঈমানের পরিপন্থী এবং ঈমানের প্রতি প্রকাশ্য বিদ্রূপ। আল্লাহকে স্রষ্টা, রিজিকদাতা ও পালনকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করা, সাথে সাথে তাঁকে আইনদাতা হিসেবে মানতে হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কিভাবে চললে তার ইহজীবন ও পর জীবন সুখী ও সুন্দর হবে তার জন্য আল্লাহ নির্ভুল আইন দিয়েছেন। এ নির্ভুল আইন প্রণেতা এত মাত্র তিনি, তাঁর আইন পরিহার করে, মানুষের মনগড়া আইন মেনে চলে আল্লাহর সাথে মানুষকে তাঁর অংশীদার গণ্য করা হয় যাকে শিরক বলা হয় যা ঈমানের বিপরীত।
মসজিদে নিয়মিত নামায পড়া এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষের আইন বিনা দ্বিধায় ও সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া ঈমানের পরিপন্থী কাজ।
তাঁর আইন, শাসন মানতে হলে তা যেমন ভালো করে জানা দরকার, তেমনি জানা দরকার তাঁর পূর্ণ পরিচয়। আরও জানা দরকার কিভাবে তাঁর বন্দেগী ও স্তবস্তুত করা যায়, কি কাজ করলে তিনি সন্তুষ্ট হবেন এবং কি করলে হবেন অসন্তুষ্ট। এসব জানাবার জন্যে মানবজাতির সূচনা থেকেই আল্লাহ ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তা হলো এই যে, তিনি যুগে যুগে সকল দেশে সকল জাতির মধ্যে এক একজন করে নবী রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁকে আল্লাহ এসব বিষয়ে সরাসরি সকল জ্ঞান দান করেন, তাঁকে সকল ভুলের ঊর্ধ্বে রাখেন এবং প্রতিমুহুর্তে তাঁকে পথপ্রদর্শন করেন। এসব নবী-রসূলকে ও সত্য বলে বিশ্বাস করতে হবে। অর্থাৎ তাঁদের উপরেও পূর্ণ ঈমান আনতে হবে। এই হলো রিসালাতের উপর ঈমান।
দুনিয়ার মানবজাতির কাছে লক্ষাধিক নবী-রসূল পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)। আল্লাহর দ্বীনে হক ‘ইসলাম’ তাঁর মাধ্যমে পরিপূর্ণ রূপে গ্রহণ করেছে। তাঁকে বিশ্বাস করতে হবে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল হিসেবে।
এমনিভাবে ঈমান অর্থ মৃত্যুর পর এক দ্বিতীয় জীবনের উপরও বিশ্বাস স্থাপন করা। এ দুনিয়ার জীবনই একমাত্র জীবন নয়। মৃত্যুর সাথে সাথে জীবনের শেষ তা নয়। বরঞ্চ তারপরও জীবন চলতে থাকবে।

কিয়ামত ও হাশর
সমস্ত সৃষ্টি যেমন আল্লাহর, তেমনি তাঁরই নির্দেশেই একদিন এই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং তন্মধ্যস্থ যাবতীয় সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপর আল্লাহ তায়ালা এক জগত সৃষ্টি করবেন। তারপর আবার আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত্যুবরণকারী প্রতিটি মানুষ পুনর্জীবন লাভ করবে এবং আল্লাহর দরবারে তাদেরকে একত্র করা হবে। একে বলে কিয়ামত। এখানে প্রতিটি মানুষকে দুনিয়ার জীবনের হিসাব-নিকাশ নেয়া হবে। মানুষকে যে দায়িত্ব সহকারে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল, তা তারা ঠিকঠিক পালন করেছে কিনা, আল্লাহর নির্দেশিত পথে জীবন যাপন করেছে, না ভ্রান্ত পথে চলেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব নেয়া হবে। একে বলে হাশর।

আখিরাত
এ হিসাব-নিকাশের পর যারা ভালো ও সৎ বলে প্রমাণিত হবে, তাদেরকে দেয়া হবে এক অফুরন্ত সুখের স্থান, যেখানে তারা বসবাস করতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যাকে বলা হয় জান্নাত বা বেহেশত।
পক্ষান্তরে যারা অসৎ, পাপী ও খোদাদ্রোহী বলে প্রমাণিত হবে, তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম। যা এক অতীব দুঃখ-কষ্টের স্থান। এখন থেকে মানুষের জীবন হবে এক চিরন্তন জীবন যার শেষ নেই, অন্ত নেই। একে বলা হয় আখিরাত।

ফিরিশতা
আল্লাহর অসংখ্য ফিরিশতা আছেন। তাঁরা সকলেই আল্লাহর আজ্ঞাবহ দাস। বরঞ্চ আদেশ পালন করাই তাঁদের প্রকৃতি ও স্বভাব। তাঁরা সর্বদা আল্লাহর স্তবস্তুতিতে মগ্ন আছেন। আবার তাঁদের অনেকের উপরে এই বিশ্ব প্রকৃতি পরিচালনার ভার ন্যস্ত আছে। আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী তাঁরা এ পরিচালনা করে থাকেন। এদের উপরও পূর্ণঈমান আনতে হবে।

আসমানী কিতাব
তারপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর নির্দেশনামা সম্বলিত আসমানী কিতাব পাঠিয়েছেন তাঁর নবী-রসূলগণের কাছে। এ গুলোর উপরেও পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ‘ আল-কুরআন’ যা নাযিল করা হয়েছিল সর্বশেষ নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স)-এর উপরে।
ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন শুধু মনে মনে করলেই তা যথেষ্ট হবেনা, মৌখিক স্বীকৃতি ও ঘোষণা প্রয়োজন। একটি পবিত্র কালেমা উচ্চারণের মাধ্যমে ঈমানের ঘোষণা ও স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়।
এ কালেমাটিতে (বাক্য) কুরআনে ‘কালেমা তাইয়্যেবা’ বলা হয়েছে। তা হলো, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ”।
এর সংক্ষিপ্ত অর্থ হলো, এ কথা ঘোষণা করা যে, আল্লাহ ব্যতীত এমন আর কেউ নেই, যে ইলাহ হতে পারে। যার কাছে মাথা নত করা যেতে পারে। যার আনুগত্য, বন্দেগী, দাসত্ব করা যেতে পারে। যার আইন-শাসন মানা যেতে পারে। যাকে স্রষ্টা, প্রভু ও প্রতিপালক মনে করা যেতে পারে। এ হলো কালেমাটির প্রথমাংশের অর্থ ও মর্ম।
দ্বিতীয়াংশে বলা হচ্ছে– মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রসূল। অর্থাৎ গোটা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তিনি আল্লাহর প্রেরিত রসূল। আল্লাহর আনুগত্য, বন্দেগী, দাসত্ব ও তাঁর আইন-শাসন মেনে চলার ব্যাপারে তিনিই পন্থা বলে দেবেন। এ পথের প্রদর্শক তিনি। মানব জীবনের যাত্রা পথের নেতৃত্ব দিবেন তিনি। এ ব্যাপারে তিনি আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করবেন। স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ, ভালো-মন্দ তিনিই শিক্ষা দিবেন। তাঁর শিখানো নীতি ও দর্শনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে মানবের তাহযিব-তামাদ্দুন সভ্যতা-ভব্যতা, শিল্পকলা, রুচি ও মননশীলতা। মোট কথা তিনি বিশ্ব মানবতার একচ্ছত্র নেতা।
উপরে যা কিছু বলা হলো, তা হলো ঈমান ও ঈমানের মূলমন্ত্র কালেমায়ে তাইয়্যেবার সংক্ষিপ্ত মর্ম।

ঈমানের দাবী
এখন আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো ঈমানের দাবী। তার অর্থ–ঈমান আনার পর ঈমান আনয়নকারীর মধ্যে কী পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়। অবশ্যি ঈমান আনার পর তার মধ্যে কোন দৈহিক পরিবর্তন সম্ভবও নয় এবং বাঞ্ছনীয়ও নয়। ঈমান আনার পূর্বে যেমন মানুষটির দুটি হাত, দুটি চোখ, দুটি কান, একটি নাক ও একটি মাথা ছিল; ঈমান আনার পর তার কোন কম বেশী হবেনা। তার বর্ণেরও কোন পরিবর্তন হবেনা। কিন্তু পরিবর্তণ অবশ্যই হতে হবে তার মানসিকতার, মতবাদ ও চিন্তা ধারার; তার স্বভাব-প্রকৃতির, চরিত্রের, আচার-আচরণের, রুচি ও মননশীলতার।
ঈমান মানুষটির মধ্যে নিয়ে আসে একটি মানসিক বিপ্লব। যার মন-মস্তিষ্ক ছিল জাহেলিয়াত ও অন্ধ-কুসংস্কারে তমসাচ্ছন্ন, ঈমান আনার পর তার মন-মস্তিষ্ক ইসলামের জ্যোতিতে হবে উদ্ভাসিত। ঈমান আনার আগে যে করতো বহু খোদার বন্দেগী, তার মস্তক ঈমান আনার পর কখনো অবনত হবেনা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে। বাতিল ও খোদাদ্রোহী তাগুতের আনুগত্য পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্যের জন্য সে বিসর্জন দেবে নিজের পরিপূর্ণ সত্তাকে। লম্পট, ব্যাভিচারী, মিথ্যাবাদী, পরিস্বাপহারী ও দুষ্কৃতকারী ঈমান আনার পর হয়ে পড়বে সৎ, সত্যবাদী, পূণ্য-পুত চরিত্রের অধিকারী, দাতা, দয়ালু ও পরোপকারী।

নামায-রোযা প্রভৃতি ঈমানের সর্বপ্রথম দাবী
ইমান আনার সাথে সাথেই একজন মু’মিনের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে কতকগুলো কাজ সমাধা করা। এগুলো তার ঈমানের বহিঃপ্রকাশ, ঈমানের সাক্ষ্য। তা হলো, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও তা জামায়াতের সঙ্গে আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা, মালদার হলে যাকাত আদায় করা এবং হজ্ব আদায় করা। কিন্তু এসব করার পরও যদি তার মত মানসিকতায় পরিবর্তন না হয়, পরিবর্তন যদি না হয় তার স্বভাব-চরিত্রের; তাহলে বুঝতে হবে তার নামায, রোযা, যাকাত, হজ্ব প্রভৃতি চরিত্র গঠনমূলক কাজগুলো তার সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়নি এবং তা কবুল হয়নি আল্লাহর দরবারে। এতে করে ঈমানের চাহিদাও তার মোটেই পূরণ করা হয়নি।
অনেকে মনে করে থাকেন, উপরে বর্ণিত কাজ যেমন নামায, রোযা, যাকাত, হজ্ব পালন করলেই তাকে পূর্ণ মূ’মিন বলা হবে। এইতো যথেষ্ট। আর কি চাই?
সকলের জন্য নামায-রোযা এবং মালদারের জন্য যাকাত-হজ্ব ফরয করা হয়েছে। এগুলো ব্যতীত কারো মু’মিন হওয়ার তো ধারণাই করা যেতে পারেনা। ইসলাম রূপ প্রাসাদের ভিত্তিস্তম্ভ বলা হয়েছে এগুলোকে। ভিত্তি ব্যতীত প্রাসাদের কল্পনাই তো করা অবান্তর। কিন্তু তাই বলে বিত্তিই কি প্রাসাদ হতে পারে? ভিত্তির উপরে আরও বহু কিছু গড়ে তুললে তখনই তাকে বলা হবে প্রাসাদ। সেজন্য একজন মু’মিনের কাজ শুধু প্রাসাদের ভিত্তি তৈরী করেই নিশ্চিন্তে বসে থাকা নয়। অর্থাৎ নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত প্রভৃতি সমাধা করলেই তার কাজ শেষ হয়ে যায়না। তার ঈমান তাকে আরও বহুকিছু করার দাবী করে। ঈমান যা যা করতে দাবী করে একেবারে সাধ্যের অতীত না হলে, তা যদি করা না হয়, তাহলে বলতে হবে তার পরিপূর্ণ মু’মিন হওয়ার বেশ ত্রুটি রয়ে গেছে।
এখন ঈমানের দাবী কি কি যা পালন করলে একজনকে পরিপূর্ণ মু’মিন বলা যেতে পারে? নামায, রোযা, হজ্ব-যাকাত প্রভৃতি ও ঈমানের দাবী সন্দেহ নেই। কিন্তু এতটুকুতেই তার দাবী শেষ হয়ে যাচ্ছেনা। তাই আমাদের সম্মুখে অগ্রসর হতে হবে।

রসূলই মু’মিনদের সর্বোত্তম আদর্শ
এর জন্য সর্বপ্রথম কুরআনে হাকীমের দিকে দৃষ্টিনিবন্ধ করতে হবে। কুরআনের পাতায় পাতায় মু’মিনের কর্তব্যের কথা সুস্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে।
তারপর এ কুরআনকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন আল্লাহর শেষ নবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (স) তাঁর জীবনের বাস্তব কর্ম পন্থা দিয়ে। তাই নবীর গোটা জীবন কুরআন পাকেরই পূর্ণ আলেখ্য। তারপর আসে সাহাবায়ে কিরামের জীবন চরিত্র।
অতএব, ঈমানের দাবী পুরোপুরি পালন করতে হলে একদিকে যেমন কুরআন থেকে এ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে হবে। অপরদিকে, নবী করিম (সা) ও সাহাবায়ে কিরামের জীবন চরিত্রের পরিপূর্ণ অনুসরণ করতে হবে।
পূর্ণ মু’মিন হওয়ার জন্য নবী জীবনের অনুকরণ একেবারে অপরিহার্য। তাই আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন-

(আরবী পিডিএফ ১৮ পৃষ্ঠায়*****************************)
-প্রকৃত পক্ষে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে আল্লাহর রসূলের মধ্যে। এ আদর্শ প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহকে পাবার এবং আখিরাতের নাজাত লাভ করার আশা পোষণ করে। (আহযাবঃ২১)
এ আয়াতটি আহযাব যুদ্ধের পর পর নাযিল হয়েছে। উহুদ থেকে শুরু করে আহযাব যুদ্ধ পর্যন্ত গোটা পরিস্থিতিকে সামনে রেখে রসূল (স)-এর আচার-আচরণ, চরিত্র ও কর্মপদ্ধতিকে এখানে সর্বোত্তম নমুনা হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো ঐসব লোকদের শিক্ষা দেয়া, যারা আহযাব যুদ্ধের সময় পার্থিব স্বার্থের দ্বারা পরিচালিত হয়ে অপরের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াবার চেষ্টা করেছিল। তাদেরকে বলা হচ্ছে, তোমরা তো ঈমান, ইসলাম এবং রসূলের আনুগত্যের কথা ফলাও করে বলে থাক। কিন্তু তোমাদের একথা ভালো করে জেনে রাখা দরকার যে, যে রসূলের অনুরাসীদের মধ্যে তোমরা শামিল হয়েছো বলছো সে রসূলের আচরণ কি ছিল? যদি কোন দলের নেতা আরামপ্রিয়তার পরিচয় দেয়, ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় এবং বিপদের সময় পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, তাহলে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে দুর্বলতা দেখা দেয়াটাই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। কিন্তু রসূলে পাকের (স) অবস্থা এই ছিল যে, তিনি অপরকে যেমন বিপদের ঝুঁকি নিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, নিজেও সেই ঝুঁকি নিয়েছেন। এবং তার জন্য তিনি ছিলেন সকলের পুরো ভাগে। এমন কোন দুঃখ-কষ্ট, অত্যাচার-নির্যাতন ছিলনা, যা অপরে ভোগ করেছে আর তিনি তা করেন নি। খন্দকের খোদাই কাজে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করেছেন। অবরোধ কালে তিনি সবসময় যুদ্ধের সম্মুখভাগে অবস্থান করতেন এবং একমুহূর্তের জন্যও দুশমনের মুকাবিলা থেকে পশ্চাদপদ হননি। বনি কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতার পর মুসলমানদের পরিবার পরিজন যেভাবে বিপন্ন হয়েছিল তার পরিবার পরিজনও অনুরূপভাবে বিপন্ন হয়েছিল। রসূল (স) মুসলিমদের একচ্ছত্র নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পরিবার বর্গের নিরাপত্তার কোনই বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়নি। যেমন উদ্দেশ্যের জন্য নবী অপরের কাছে অসীম ত্যাগ ও কুরবানী দাবী করছিলেন, তিনি সর্বদাই প্রস্তুত ছিলেন স্বয়ং সে কুরবানী দেয়ার জন্য এবং দিয়েছেনও। অতএব, যারাই তাঁর আনুগত্যের দাবীদার, তাদের উচিত নবীর প্রতিটি আচার-আচরণ সর্বোত্তম আদর্শ ও নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে তার পূর্ণ অনুকরণ করা।
তৎকালীন অবস্থা ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এই হলো আয়াতের মর্ম ও ব্যাখ্যা। কিন্তু এই মর্ম কোন বিশেষ অবস্থা ও কালের মধ্যেই সীমিত থাকার কথা নয়। যেহেতু কুরআন সর্বকালের মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক, তাই এ আয়াতের দ্বারা রসূলের জীবনকে কিয়ামত পর্যন্ত সকল যুগের সকল মানুষের জন্য আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। মুসলমান প্রতিটি ব্যাপারে রসূলের জীবনকে নিজের জীবনের জন্য নমুনা হিসেবে গ্রহণ করবে এবং তারই ছাঁচে ঢেলে তৈরী করবে আপন চরিত্র।
এর থেকে জানা গেল, একজন মু’মিনের জীবনের লক্ষ্য হলো, তার জীবনের প্রতিক্ষেত্রে, প্রতি পদক্ষেপে, রসূল পাকের (স) চরিত্র, আচার-আচরণ ও কর্মপদ্ধতির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ ও অনুকরণ করা।
এটাই তার ঈমানের সর্ববৃহৎ দাবী। কুরআন অন্যত্র বলেঃ

(আরবী পিডিএফ ২০ পৃষ্ঠায়*****************************)
আল্লাহর রসূল তোমাদেরকে যা কিছু দেন, তা গ্রহণ কর এবং যতকিছু থেকে দূরে থাকতে বলেন, তার থেকে নিজকে দূরে রাখ এবং ভয় কর আল্লাহকে। অবশ্যই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। (হাশরঃ৭)
‘যা কিছু দেন’ কথার অর্থ হলো যে বিধান এবং জীবন সমস্যার যে সমাধান দেন। এসব বিধান এবং সমাধান একজন মু’মিনের জন্য প্রতি মুহূর্তেই গ্রহণীয় এবং অবশ্য পালনীয়।
পক্ষান্তরে, যেসব বিষয় থেকে রসূল মু’মিনদেরকে বিরত থাকতে বলেন, তার থেকে বিরত থাকা অথবা কোনক্রমেই তা গ্রহণ না করাও ঈমানের দাবী। এ বিষয়ে নবী পাকের (স) এরশাদ হচ্ছে-

(আরবী পিডিএফ ২০ পৃষ্ঠায়*****************************)
যখন আমি তোমাদেরকে কোন বিষয়ে আদেশ করি তখন তোমরা সাধ্যানুযায়ী তা পালন করবে। আর যেসব বিষয় থেকে তোমাদেরকে বিরত থাকতে বলি, সেসব থেকে দূরে থাকবে। (বুখারী ও মুসলিম)।
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হযরত আবু হুরাইরা (রা)।
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি তাঁর এক বক্তৃতায় বলেন, “অমুক অমুক ফ্যাশনকারিণী মেয়েদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাৎ”।
একথা শুনার পর জনৈক মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন, “এমন কথা আপনি পেলেন কোথায়? কুরআনের কোথাও আমার এ ধরনের কিছু নজরে পড়েনি”।
ইবনে মাসউদ (রা) বললেন, “তুমি যদি কুরআন পড়তে তাহলে নিশ্চয়ই তার মধ্যে এ কথা পেয়ে যেতে। তুমি কি এ আয়াত পড়নি?

(আরবী পিডিএফ ২১ পৃষ্ঠায়*****************************)
মহিলাটি বললেন, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পড়েছি”।
ইবনে মাসউদ (রা) বললেন, “নবী (স) এরূপ কাজ করতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন যে, এ ধরনের ফ্যাশনকারিণীদের উপরে আল্লাহ অভিসম্পাৎ করেছেন”। -[আজকাল তথাকথিত মুসলিম নারীগণ নিত্যনতুন অত্যাধুনিক ফ্যাশনের প্রতিই আকৃষ্ট হচ্ছে না; বরঞ্চ তাদের অর্ধউলঙ্গ পোষাক শালীনতা ও লজ্জাশীলতার সকল সীমানা লঙ্ঘন করেছে। ঘরের বাইরে যখন তারা বের হয় তখন তাদের সাজ পোষাকের ফ্যাশন, যৌন আকর্ষণকারী অর্ধ নগ্ন দেহ, নিজকে পুরুষের কাছে আকর্ষণীয় বানাবার প্রতিযোগিতা সমাজে ব্যাপকহারে যৌন উচ্ছৃঙ্খলার ইন্ধন যোগাচ্ছে। এরপরেও তারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে।
পরিতাপের বিষয়, এমনও কিছু লোক দেখা যায়, যার কপালে সেজদার চিহ্ন, মুখে দাড়ি ও মাথায় টুপি এবং মুসল্লি পরহেজগার বলে যে পরিচিত; সে যখন বাড়ির বাইরে বেরোয়, তখন তার সঙ্গে তথাকথিত আধুনিক বেপর্দা যুবতী বেপর্দা মেয়ে দেখতে পাওয়া যায়। ঈমানের দাবী পূরণ না করে এমন পরহেযগারীর কানাকড়িও মূল্য আছে কী?]

মহিলাটি বললেন, “হ্যাঁ, এবার বুঝতে পেরেছি”।
(বোখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, মুসনাদে ইবনে আবি হাতেম)।
যা হোক কুরআনে হাকীম ও নবীর হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত হলো যে, নীতিগতভাবে নবী মুহাম্মদের (স) জীবন পদ্ধতি হলো মু’মিনদের অনুকরণীয়।

ঈমানের অগ্নি পরীক্ষা
এখন আমরা নবীর তেইশ বছর ব্যাপী নবী জীবনের পর্যালোচনা করে দেখি যে, এই তেইশ বছরের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর প্রিয় পাত্র বানাবার জন্য কি কি প্রেরণা দান করেছেন। অত্যকথায় ঈমানের অপরিহার্য দাবীগুলো কি ছিল।
আল্লাহর এরশাদ হচ্ছে-

(আরবী পিডিএফ ২২ পৃষ্ঠায়*****************************)
মানুষ কি একথা মনে করে আছে যে, আমরা ঈমান এনেছি–এতটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং ঈমান এনেছে কি তা তা পরীক্ষা করে দেখা হবেনা? (আনকাবুতঃ২)
একজন মু’মিনের কাছে ঈমানের দাবী কি ছিল, তা নবী (স) ও সাহাবায়ে কিরামের মক্কী জীবনের সূচনা থেকেই আল্লাহ সুস্পষ্টরূপে বলে দিয়েছেন।
যে অবস্থার প্রেক্ষিতে উপরের আয়াত নাযিল হয়েছিল তা হলো এই যে, মক্কার যে ব্যক্তিই ইসলাম গ্রহণ করতো, তার উপরে সব রকমের বিপদের পাহাড় ভেঙে পড়তো। দরিদ্র অথবা ক্রীতদাস হলে অমানুষিক জুলুম নিষ্পেষণের শিকার হতো। দোকানদার ব্যবসায়ী হলে তার ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়া হতো এবং সে এক রকম আর্থিক সংকটের সম্মুখীণ হতো। সম্ভ্রান্ত পরিবারের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে তার ও অব্যাহতি ছিলনা। নির্যাতন নিষ্পেষণে তারও জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হতো। মুশরিক-কাফিরদের অত্যাচার-উৎপীড়নে মক্কায় এমন এক সন্ত্রাস ও বিভীষিকার সৃষ্টি হয়েছিল যে, কতিপয় মুসলমানকে ঈমান বাঁচাবার তাগিদে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে হয়েছিল।
অনেকে আবার নবীর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও ঈমান আনতে ভয় করতো। অনেকে ঈমান আনার পর অত্যাচার-ঊৎপীড়নের চাপে কাফিরদের কাছে নতি স্বীকার করতো। যদিও এহেন ভয়াবহ অবস্থায় সাহাবায়ে কিরামের মজবুত ঈমান তাঁদেরকে আপন সংকল্পে অবিচল রেখেছিল। তথাপি স্বাভাবিক মানবিক দুর্বলতার কারণে অনেকের মনে এক ভয়াবহ সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়েছিল। তার বহিঃপ্রকাশ হয় একটি ঘটনার দ্বারা।
হযতর খাব্বাব বিন আরাত (রা) বলেন, “যে সময়ে আমরা মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়েছিলাম, সে সময়ে একদিন দেখলাম নবী (স) কা’বা ঘরের দেওয়ালের ছায়ায় বসে আছেন। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাদের জন্য দোয়া করছেননা?”
“আমার কথায় নবীর মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ ধারণ করলো। বললেন, “তোমাদের পূর্বে যারা আল্লাহর দ্বীনের উপর ঈমান এনেছিল তাদেরকে অধিকতর নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাদেরকে কাউকে জীবন্ত করাত দিয়ে চিরে দু’খণ্ড করা হয়েছে। কারো শরীরের জোড়ায় জোড়ায় তীক্ষ্ণ লৌহ বিদ্ধ করা হতো যাতে করে তারা ঈমান পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্য অবশ্যই সফলতা লাভ করব। তখন অবস্থা এমন হবে যে, এক ব্যক্তি সানয়া থেকে হাজরামাওত পর্যন্ত নির্ভয়ে ভ্রমণ করবে এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া তার ভয় করার আর কেউ থাকবেনা”।
এ হাদীসটি লিপিবদ্ধ করেছেন বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ এবং নাসায়ী।
এ সন্ত্রাস ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতিকে অসীম ধৈর্য সহকারে নীরবে মেনে নেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের হৃদয়ে এ সত্য প্রতিফলিত করেছেন যে, দুনিয়া এবং আখিরাতের সাফল্যের যে ওয়াদা তিনি করেছেন, শুধু শুধু ঈমানের মৌখিক দাবী করেই তা লাভ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তার জন্য অগ্নি পরীক্ষার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেই ঈমানের দাবীর সত্যতা প্রমাণ করতে হবে।
বেহেশত এত সহজে লাভ করার বস্তু নয় এবং দুনিয়াতেও আল্লাহর খাস নেয়ামত সমূহ এমন সহজলভ্য নয় যে, ঈমান আনার ঘোষণা করা মাত্রই তা লাভ করা যাবে। লাভ করা জন্য শর্ত হচ্ছে অগ্নি পরীক্ষা।
ঈমান আনার সাথে সাথেই বহু কিছু গ্রহণ ও বর্জন করতে হয়। গ্রহণ ও বর্জনের সর্ব প্রথমে সংঘাত-সংঘর্ষ হবে প্রবৃত্তির সাথে। একজন মু’মিনকে প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জয়ী হতে হবে।
ঈমান আনার পর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুঃখ-কষ্ট এবং জান ও মালের ক্ষতি বরদাশত করতে হবে। ভয়-ভীতি, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও লোভ-লালসার দ্বারা পরীক্ষা করা হবে। প্রতিটি প্রিয় বস্তু, ভালোবাসার পাত্র আল্রাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করতে হবে। এতসব করার পরই ঈমানের সত্যতা প্রমান করা সম্ভব হবে।
বলা বাহুল্য নবী (স) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) ঈমানের দাওয়াত দেয়া ও গ্রহণ করার পর মুহুর্ত থেকেই এসব অগ্নি পরীক্ষার ভেরত দিয়েই কালাতিপাত করেছেন।
তাহলে একথা দিবালোকের মতো পরিস্কার হয়ে গেল যে, ঈমান আনার পর ঈমানের সত্যতা প্রমান করাই হলো সর্বপ্রথম দাবী এবং এ সত্যতার প্রমাণ দিতে হবে অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে।
নবী ও সাহাবায়ে কিরামের মক্কী ও মদনী জীবনে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ঈমানের মজবুতির জন্য তথা ঈমানকে বাস্তব জীবনে রূপায়িত করার জন্য যেসব এরশাদ করেছেন, দৃষ্টান্ত স্বরূপ তার কিছু উল্লেখ করা যাক।

মু’মিনের জন্যে আল্লাহর ভালোবাসা হবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে
মনে রাখতে হবে যে, কালেমায়ে তাইয়্যেবার মাধ্যমে ঈমানের ঘোষণা ছিল প্রকৃতপক্ষে বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। সেজন্যে হক ও বাতিলের সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য। একদিকে আল্লাহ অবিশ্বাসী খোদাদ্রোহী ও আল্লাহবিমুখ ইসলামের দুশমন শক্তি অপরদিকে মুষ্টিমেয় হক পুরস্ত ঈমানদারদের ইসলামী শক্তি। ইসলামী আদর্শের প্রতিষ্ঠা ও ইসলাম বিজয়ী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ উভয় শক্তির মধ্যে সর্বদা চলেছে প্রচণ্ড সংঘর্ষ ও যুদ্ধ বিগ্রহ। একটি ছিল আল্লাহর প্রিয় দল (হিযবুল্লাহ) এবং অপরটি ছিল শয়তানের দল (হিযবুশ শায়তান) –বাতিল দর্শন ও মতবাদের দল। এমতাবস্থায় বাতিলের মুকাবিলায় মুসলমানদের ঈমানের দাবী ছিল আল্লাহর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সম্বন্ধ গভীর নিবিড় করা। প্রেম ভালোবাসা, ভক্তি-শ্রদ্ধা, আনুগত্য, ভয়-ভীতি একান্তভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া।
এ ব্যাপারে আল্লাহর এরশাদ হচ্ছে

(আরবী পিডিএফ ২৫ পৃষ্ঠায়*****************************)
কিছুলোক এমনও আছে যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্যদের তাঁর শরীক ও প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে নেন এবং তাদের প্রতি এতটা প্রেমানুরাগী হয় যতটা হওয়া উচিত ছিল আল্লাহর প্রতি। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে সবকিছু অধিক ভালোবাসে। -(বাকারাহঃ১৬৫)
অর্থাৎ ঈমানের দাবী হচ্ছে এই যে, একজন মু’মিনের জন্য আল্লাহর ভালোবাসা অন্যান্য সকল ভালোবাসার উপরে প্রাধান্য লাভ করবে। কোন কিছুর ভালোবাসাই মু’মিনের মনে এমন স্থান লাভ করতে পারবেনা যা আল্লাহর ভালোবাসার জন্য নির্ধারিত এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের কেবল সেই ভালোবাসা পোষণ করা যায়।–[আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্যদের প্রতি প্রেমানুরাগী তো কাফির মুশরিকরাই হতে পারে। কিন্তু মুসলিম নামে পরিচিত কিছু লোকের মধ্যেও এ ধরনের মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়। এদের অনেকে নামায-রোযা, কালেমা যিকর প্রভৃতিও করে এবং আল্লাহ ও রসূলের প্রতি গভীর প্রেমানুরাগের মহড়াও করে। কিন্তু এদের সম্পর্ক ফাসিক-ফাজিল-কাফির মুশরিকদের সাথে। তাদেরকে তুষ্ট রাখার জন্য তারা সর্বদা ব্যস্ত থাকে। তাদেরকে তুষ্ট করলে যেহেতু তাদের পার্থিব স্বার্থ হাসিল করা যায়, সেজন্য আল্লাহর অসন্তুষ্টির পরোয়া না করেও তারা এসব গায়রুল্লাহকে (আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যকে) সন্তুষ্ট রাখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের আনুগত্য করতে গিয়ে আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হয়। আল্লাহর আইন কানুনকে পদদলিত করে যারা নিজেদের রচিত আইন-কানুন সমাজে চালু করে, তাদের সাথে এদের দহরম-মহরম রাখতে হয়। নতুবা তারা তাদের হালুয়া রুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে]


পিডিএফ লোড হতে একটু সময় লাগতে পারে। নতুন উইন্ডোতে খুলতে এখানে ক্লিক করুন।




দুঃখিত, এই বইটির কোন অডিও যুক্ত করা হয়নি