মূলপাতা বই আমার বাংলাদেশ

আমার বাংলাদেশ
অধ্যাপক গোলাম আযম

আধুনিক প্রকাশনী
ঢাকা- চট্টগ্রাম- খুলনা
প্রকাশনায়
আধুনিক প্রকাশনী
২৫, শিরিশ দাস লেন
বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০
ফোন- ২৫১৭৩১
আঃ প্রঃ ২১১
প্রথম সংস্করণ
সফর ১৪১৬
শ্রাবণ ১৪০২
জুলাই ১৯৯৫

বিনিময়ঃ ৮০ টাকা

মুদ্রণে
আধুনিক প্রেস
২৫, শিরিশ দাস লেন
বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০
AMAR BANGLADESH BY Prof. Ghulam Azam. Published by Adhunik Prokashani, 25 ShirishDas Lane, Banglabazar, Dhaka-1100
Sponsored by Bangladesh Islamic Institute
25 ShirishDas Lane, Banglabazar, Dhaka-1100
Price: Taka 80.00 Only

 

 


ভূমিকা
বাংলাদেশ কোটি কোটি লোকের। তবু আমি বলছি ‘আমার বাংলাদেশ’। ছোট আধো আধো উচ্চারণে বলে, ‘আমাল আব্বু’ ‘আমাল আম্মু’। তাঁর বড় ভাই বোনেরা ওকে এ বলে ক্ষেপায় ‘না আমার আব্বু’। সে রাগ করে কেঁদে আরো জোরে বলে ‘আমা-ল আব্বু’। কে এই শিশুকে শেখালো ‘আমাল আব্বু’ বলতে ? ভালোবাসা এক আজব অনুভূতি যা মানুষের মুখের ভাষায় ফুটে ওঠে।
নামাযের রুকু ও সিজদায় সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম ও সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা বলা স্বয়ং আল্লাহর রাসুল ( সাঃ ) শিক্ষা দিয়েছেন। রাব্বীয়া মানে আমার রব। আল্লাহ কি শুধু কি আমার একার রব ? তবু কেন বলি আমার রব ? এটাও ঐ ভালোবাসারই কারবার।
তাই কোটি কোটি মানুষের বাংলাদেশকে আমি বলি ‘আমার বাংলাদেশ’ বলতে বাধ্য হলাম। এ আমার জন্মভূমি। এর আলো বাতাস ও রোদ- বৃষ্টি, চন্দ্র-সূর্য ও তাঁরার মেলা, নীল আসমান ও সবুজ জমিন, গাছ-পালা ও নদী- নালা, ফল- মূল ও শস্যফসল, মাঠ- ঘাট ও বাজার-হাট, ধুলা- বালি ও ঘাস-বিচালী, পশু- পাখি ও কীট- পতঙ্গ, গ্রীষ্ম-বর্ষা ও শীত- বসন্ত, ইত্যাদির সাথে আমার আজন্ম ঘনিস্ট পরিচয়। ৭ বছর একটানা বাধ্যতামূলক প্রবাস জীবনে ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার মতো দেশে গেলাম কোথাও প্রকৃতিকে এমন আপন মনে হয়নি। সব দেশেই ঘনিষ্ঠ মানুষ পেয়েছি। কিন্তু পরিচিত আবহাওয়া পেলাম না। পানির মাছ শুকনায় যেমন অবস্থায় পরে আমার দশাও তেমনি মনে হতো।
আমার মতো আরো যাদের নাগরিকত্ব হরণ করা হয়েছিলো তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিলেন। বন্ধু বান্ধবদের পরামর্শ সত্ত্বেও আমি তা করতে মনকে রাযী করাতে পারলাম না। আমার জন্মভূমিতে আর ফিরে যেতে পারবোনা এমন নৈরাশ্য সৃষ্টি হলে হয়তো তাই করতাম। আমার লন্ডন থাকাকালে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ভুট্টো আমার পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে অশালীন আচরন করার কথা জানতে পেরে সৌদি আরবের সব চাইতে প্রভাবশালী আলেম শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আযীয বিন বায অত্যন্ত স্নেহের সাথে প্রস্তাব দিলেন, ‘তোমাকে সৌদি নাগরিক বানিয়ে দেই’। বাংলাদেশের মায়া ত্যাগ করতে পারলাম না বলে এ প্রস্তাবও কবুল করা গেলো না।
আমার ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে বিদেশে থাকা কালে শুধু আমার দেশ সম্পর্কেই চিন্তা-ভাবনা করেছি। ৭১ সালের ২২শে নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠকে যোগদান করার জন্য লাহোর গেলাম। ৩রা ডিসেম্বর করাচী থেকে বিমানে ঢাকা রওয়ানা দিলাম। সেদিনই ভারতের সাথে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ায় আমার বিমান বাংলাদেশের কাছে এসেও ফিরে যেতে বাধ্য হলো। এভাবে আমি বিদেশে রয়ে গেলাম। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আটকা পরে রইলাম। ১৬ই ডিসেম্বরের পর দেশের সাথে যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। লন্ডন হয়ে চিঠি পত্র আদান প্রদান হওয়া ছাড়া যোগাযোগের আর কোন পথই পেলাম না। লন্ডন যেতে চাইছিলাম। মিঃ ভুট্টো যেতে দিলেন না। ৭২ এর নভেম্বরে হজ্জ উপলক্ষে কোনরকমে বের হলাম এবং হজ্জের পর ৭৩ সালের এপ্রিলে লন্ডন পৌঁছলাম।
হজ্জের সময় বাংলাদেশ থেকে আগত হাজীদের কাছে দেশের হাল অবস্থা জেনে খুবই পেরেশানী বোধ করলাম। তাঁদের মধ্যে যারা পরিচিত তাঁদের সাথে কিছু মত বিনিময়ও হল। আমি না চিনলেও আমাকে সবাই নামে চেনার কারনে অনেকেই অসহায়ের মতো জিজ্ঞেস করলেন, “হুযুর দেশের উপায় কি হবে ? আর মুসলমানদের ঈমান-আকীদাহ কিভাবে রক্ষা করা যাবে ? ভারতের খপ্পর থেকে কেমন করে বাঁচা যাবে ? ”
বাঙ্গালী মুসলমানদের এই সময়ে কি পরামর্শ দেয়া যায় সে বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা- ভাবনা করতে বাধ্য হলাম। দোয়া কবুল হওয়ার খাস জায়গাগুলোতে মহান মনীবের দুয়ারে ধরনা দিতে থাকলাম। মদীনা শরীফের মসজিদে নববীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাযার শরীফ ও মসজিদের মিম্বরের মাঝখানের জায়গাটি দোয়া কবুলের বিশেষ স্থান, যার নাম রাওয়াতুল জান্নাহ। এ জায়গাটিকে রাসুলুল্লাহ ( সাঃ ) বেহেস্তের বাগানগুলোর একটি বাগান বলে ঘোষণা করেছেন। সেখানে তিনদিন একটানা ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় করে দোয়া করতে থাকলাম যেন আল্লাহ পাক বাঙ্গালী মুসলমানদের জন্য সময়োপযোগী বক্তব্য পেশ করার তৌফিক দান করেন।
হজ্জের পরে লন্ডন ফেরত গিয়ে “বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে ?” শিরোনামে একটি পুস্তিকা রচনা করলাম। সেখানে বাংলা ছাপাখানা না থাকায় বাংলা টাইপ করে এর ফটোকপি দ্বারা পুস্তিকাটি প্রকাশ করা হলো। ১৯৭৩ সালের আগস্ট মাসে পুস্তিকাটি ছাপা হওয়ার পর লন্ডনে প্রবাসী বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে বিতরন করা হল। পরবর্তী হজ্জের সময় সৌদি আরবে আগত বাঙ্গালী হাজীদের মধ্যে বইটি বিলি করা হয় এবং তাঁদের মাধ্যমে বাংলাদেশে তা পৌঁছে।
৭৩ এর এপ্রিলে লন্ডন পৌছার পর বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করা সহজ হয়ে গেলো। কিন্তু তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ আলোচনা করার উপায় হিসেবে হজ্জের উপলক্ষটিকেই বাছাই করতে হলো। ৭৭ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর হজ্জের সময় আমি বাংলাদেশী নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হবার উদ্দেশ্যে লন্ডন থেকে সৌদি আরবে হাযীর হতাম। তাঁদের কাছ থেকে দেশের বিস্তারিত অবস্থা, ইসলামী আন্দোলনের গতি- প্রকৃতি ও অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত হয়ে যথাসাধ্য পরামর্শ দিতাম। এর ফলে সশরীরে বিদেশে থাকলেও মন-মগজ ও চিন্তা- চেতনায় আমার জন্মভূমিই স্থায়ী আসন দখল করে রইলো।
৭৫ এর আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ৭৬ এর জানুয়ারীতে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করলেন যে যাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল তারা তা বহাল করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। আমি দু’বার লেখা সত্ত্বেও সরকার তা নামঞ্জুর করলেন। অবশেষে ৭৮ এর জুলাই মাসে ভিসা নিয়েই আসতে বাধ্য হলাম। কয়েক মাস পর সরকার আমাকে দেশ থেকে বের হয়ে যাবার আদেশ দেন। আমি সে আদেশ অমান্য করেই দেশে রয়ে গেলাম। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে দেশ থেকে বের করবার কোন আইনগত পথ না থাকায় সরকার চুপ করে থাকতে বাধ্য হলেন।
৭৮ এ দেশে আসার পর পরই সর্বপ্রথম ‘বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন’ নামে বইটি লিখি। পরবর্তী সংস্করণে বইটি ‘ইসলামী ঐক্য ইসলামী আন্দোলন’ নামে প্রকাশিত হবার পর এ নামেই বহু সংস্করন বের হয়েছে। দেশের ইসলামী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে একটি ব্যাপক ভিত্তিক ইসলামী আন্দোলন গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য ছিল। এ বইটিতে প্রমান করা হয়েছে যে, মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, ওয়াজ এবং তাবলীগের মাধ্যমে ইসলামের দ্বীনের যথেষ্ট খেদমত হচ্ছে। কিন্তু শুধু খেদমতে দ্বীনের দ্বারাই ইসলামের বিজয় হতে পারেনা। তাই ইকামতে দ্বীনের জন্য এর উপযোগী কর্মসূচী এবং পরিকল্পনা প্রয়োজন ও জামায়াতে ইসলামী সে মহান লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।
১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে দৈনিক সংগ্রামে উপ-সম্পাদকীয় কলামে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমার বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ১৫ টি প্রবন্ধ নিয়ে ‘আমার দেশ বাংলাদেশ’ নামে এবং রাজনৈতিক বিষয়ে ১১ টি প্রবন্ধের সংকলন হিসেবে ‘বাংলাদেশের রাজনীতি’ নামে বেশ কয়েকটি সংস্করন প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রথম রোকন সম্মেলনে “বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামী” শিরোনামে আমার বক্তৃতায় বাংলাদেশ সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভংগি কী এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জামায়াত কেমন সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী সে বিষয়ে জামায়াতের সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা করা হয়।
১৯৮৮ সালে “বাংলাদেশে আদর্শের লড়াই” নামে বিশেষ করে শ্রমিক সমাজের চিন্তাধারাকে ইসলামী দৃষ্টিতে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে একটি বই লেখা হয়। শ্রমিকরাজ কায়েমের দোহাই দিয়ে কমিউনিস্ট এবং সমাজতন্ত্রীরা মেহনতী মানুষকে তাঁদের খপ্পরে নেয়ার জন্য যে ধাপ্পাবাজী সুলভ প্রচারাভিযান পরিচালনা করে তাঁর মুখোশ খুলে দিয়ে শ্রমিকদেরকে সুস্থ বা বাস্তব চিন্তা করার যোগ্য বানানোই এ বইটির উদ্দেশ্য।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে “পলাশী থেকে বাংলাদেশ” নামে প্রকাশিত আমার পুস্তিকাটিতে ১৯৭১ সালে জামায়াতের রাজনৈতিক ভুমিকার বিশ্লেষণ পেশ করা হয়। আলোচ্য বিষয়ের প্রসংগক্রমে পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমি, পাকিস্তান আমলের কুশাসন, পূর্ব পাকিস্তানের আসল সমস্যা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
“জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা” নামক পুস্তকে ১৯৪১ সালে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র বহাল হওয়া পর্যন্ত জামায়াতের রাজনৈতিক ভূমিকা আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনৈতিক ভূমিকা এ দেশের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কিত সকল লেখা থেকে বিষয়ভিত্তিক বাছাই করে বিভিন্ন প্রবন্ধ সংকলিত আকারে একটি গ্রন্থে সন্নিবেশিত করার প্রয়োজন অনেক দিন থেকেই বোধ করছিলাম। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমার গোটা চিন্তা-ভাবনা একত্র সংকলিত অবস্থায় পেশ করার উদ্দেশ্যেই “আমার বাংলাদেশ” শিরোনামে এ গ্রন্থটি সাজানো হলো।
এ সংকলনে পরিবেশিত প্রতিটি প্রবন্ধের শেষে যে বইতে ইতিপূর্বে এটা প্রকাশিত হয়েছে তা উল্লেখ করা হলো। কোন কোন প্রবন্ধ পাকিস্তান আমলে দৈনিক ইত্তেহাদে প্রকাশিত হয়। কোন কোনটি উপরোক্ত কোন বইতেই ছাপা হয় নি। মোটকথা বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কিত আমার প্রায় যাবতীয় রচনাই এ গ্রন্থটিতে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
বিভিন্ন বিষয়ে পুনরাবৃত্তি থাকলেও আশা করি পাঠক পাঠিকাদের বিরক্তির কারন ঘটবে না। কারন বিষয় এক হলেও ভাষা ও পরিবেশনা সম্পূর্ণ এক নয়। তবুও পুনরাবৃত্তি না থাকলেই ভালো হতো বলে স্বীকার করি। কিন্তু এর প্রতিকার করা এখন অসাধ্য। এটা করতে গেলে নতুন করা লিখতে হয় যা আমার পক্ষে অসম্ভব। এর জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
মোট ৯১ টি প্রবন্ধকে ১৯ টি শিরোনামে বিভিন্ন পরিচ্ছদে ( চ্যাপ্টারে ) বিভক্ত করে প্রতি পরিচ্ছদের অধীনে প্রবন্ধগুলোকে সাজানো হয়েছে। বিষয় সূচিতে সেভাবেই এক একটি পরিচ্ছদের নামে প্রবন্ধগুলোর তালিকা পেশ করা হয়েছে যাতে পাঠক পাঠিকাগণ সহজেই তাঁদের ইচ্ছা মতো বিষয় তালাশ করে নিতে পারেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অবকাশ যাপনের সুযোগ না পেলে হয়তো এ সংকলন পরিবেশন করার সময় বের করা সম্ভব হতো না। আশা করি রাজনীতি সচেতন পাঠক পাঠিকা এ বইটিতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা প্রতিফলন অনুভব করবেন। যে উদ্দেশ্যে সংকলনটি প্রনয়ন করা হল তা আল্লাহ পাক সফল করুন। আমীন।


গোলাম আযম
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার
জানুয়ারী, ১৯৯৩।

 

 

 

 

 

সূচীপত্র

• (এক) পাকিস্তান- পূর্ব বাংলাদেশ------------------------------------------১৩
১। বাঙ্গালী মুসলমানদের ইতিহাস---------------------------------------------- ১৩
২। উপমহাদেশে ইংরেজ রাজত্ব------------------------------------------------ ১৪
৩। ইংরেজ আমলে মুসলিম নির্যাতন-------------------------------------------- ১৪
৪। ব্রিটিশ- ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন----------------------------------------- ১৫
৫। পাকিস্তান আন্দোলন ও ইসলাম--------------------------------------------- ১৭
৬। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আন্দোলন-------------------------------------------- ১৭
• (দুই) পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ
৭। বাংলাদেশের মুসলমানদের পার্থিব উন্নয়নের মূলে------------------------------- ২১
৮। পাকিস্তান আমলের কুশাসন------------------------------------------------- ২২
৯। আইয়ুব খানের যুগ--------------------------------------------------------- ২৩
১০। মুসলিম জাতীয়তা পরিত্যাগের পরিণাম--------------------------------------- ২৪
১১। ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন---------------------------------------------- ২৫
১২। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও বাঙ্গালী মুসলমান------------------------------------ ২৬
• ( তিন ) ৭০ এর নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি------------------------------------ ২৮
১৩। নির্বাচনের পরে------------------------------------------------------------- ২৮
১৪। ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি---------------------------------------------------- ২৮
১৫। টিক্কা খানের অভিযান---------------------------------------------------------২৯
১৬। আত্মঘাতী লড়াইয়ের পরিণাম------------------------------------------------- ৩০
• (চার) স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলন-------------------------------------------৩২
১৭। স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের পটভূমি----------------------------------------- ৩২
১৮। সরকারের ভ্রান্ত নীতি ( রাষ্ট্রভাষা, গণতন্ত্র, অর্থনীতি ) -------------------------- ৩৩
১৯। ভুট্টো ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্র------------------------------------------------------ ৩৪
• (পাঁচ) স্বাধীনতা আন্দোলনে কার কি ভূমিকা-------------------------------- ৩৬
২০। স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলন------------------------------------------------- ৩৬
২১। বামপন্থীদের ভূমিকা--------------------------------------------------------- ৩৬
২২। ভারতের ভূমিকা------------------------------------------------------------ ৩৭
২৩। ভারত বিরোধীদের পেরেশানী--------------------------------------------------৩৭
২৪। ইসলামপন্থীদের সংকট------------------------------------------------------ ৩৮
২৫। ভারত বিরোধী ও ইসলামপন্থীদের ভূমিকা------------------------------------- ৩৯
২৬। জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা-------------------------------------- ৩৯
২৭। ৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা-------------------------------------------------- ৪০
• (ছয়) রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দেশপ্রেম----------------------------------- ৪৩
২৮। জন্মভুমিরূপ আল্লাহর মহাদানের শুকরিয়াই হলো দেশপ্রেম--------------------- ৪৩
২৯। যারা বাংলাদেশ আন্দোলনে সক্রিয় হয়নি তারা কি স্বাধীনতা বিরোধী ছিল ? ---------৪৭
৩০। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও স্বাধীনতা বিরোধী হওয়া এক কথা নয় ( শেরে বাংলা ও সোহ্রাওয়ারদী ) ------------------------------------------------------------------৪৮
• (সাত) স্বাধীন বাংলাদেশে ৭২ সালের সমস্যা ও সমাধান---------------------- ৫২
৩১। বর্তমান সমস্যার কারন-------------------------------------------------------৫২
৩২। সমাধানের উপায় ----------------------------------------------------------- ৫৩
৩৩। বাঙ্গালী মুসলমানদের করনীয়------------------------------------------------ ৫৩
৩৪। মুক্তির একই পথ----------------------------------------------------------- ৫৫
৩৫। জনগনের দাবী---------------------------------------------------------------৫৬
• (আট) পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা কি ছিল ?------------------------------------ ৫৭
৩৬। জামায়াতের দৃষ্টিতে সমস্যা কি ছিল ?----------------------------------------- ৫৭
৩৭। বঙ্গভংগ আন্দোলন ----------------------------------------------------------৫৮
৩৮। বঙ্গভংগ বাতিল আন্দোলন----------------------------------------------------৫৮
৩৯। পূর্ব বাংলার উন্নয়ন---------------------------------------------------------- ৫৯
৪০। কেন সার্বিক উন্নয়ন হলো না -------------------------------------------------৬০
৪১। নিঃস্বার্থ নেতৃত্বের অভাব-------------------------------------------------------৬১
• (নয়) বাংলাদেশ ও বাংলাভাষা---------------------------------------------- ৬৩
৪২। আমার দেশ বাংলাদেশ------------------------------------------------------- ৬৩
৪৩। আমার ভাষা বাংলাভাষা------------------------------------------------------ ৬৯
৪৪। আমার হল ফযলুল হক মুসলিম হল-------------------------------------------৭৩
• (দশ) বাংলাদেশের জাতীয়তা--------------------------------------------- ৭৭
৪৫। বাংলাদেশের জাতীয়তা------------------------------------------------------- ৭৭
৪৬। বাঙ্গালী মুসলমান বনাম বাঙ্গালী জাতি------------------------------------------৭৮
৪৭। বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক---------------------------------------------- ৮১
৪৮। এপার বাংলা ওপার বাংলা--------------------------------------------------- ৮৩
৪৯। বাংলাদেশের পটভূমি ও মুসলিম জাতীয়তাবোধ----------------------------------৮৪
• (এগার) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ---------------------------------------------৮৬
৫০। বাংলাদেশের স্বাধীনতা--------------------------------------------------------৮৬
৫১। বাংলাদেশের প্রতিবেশী-------------------------------------------------------৯০
৫২। বাংলাদেশের সম্ভাব্য আক্রমণকারী-------------------------------------------- ৯২
৫৩। বাংলাদেশের আযাদী রক্ষা--------------------------------------------------- ৯৪
৫৪। এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার রক্ষক কারা------------------------------------- ৯৭
৫৫। ইসলামপন্থীদের একাত্তর পরবর্তী ভুমিকা-------------------------------------- ৯৯
• ১২ বাংলাদেশের আসল সমস্যা
৫৬। বাংলাদেশের মৌলিক সমস্যা-------------------------------------------------১০১
৫৭। বাংলাদেশ কি সত্যিই দরিদ্র------------------------------------------------- ১০৭
৫৮। বাংলাদেশের আসল অভাব--------------------------------------------------১০৮
• ১৩। বাংলাদেশ ও ইসলাম
৫৯। ইসলাম প্রিয় বাংলাদেশ-----------------------------------------------------১১২
৬০। বাংলাদেশ ইসলামী শক্তির মযবুত ভিত্তি--------------------------------------১১৩
• ১৪। বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামী
৬১। বাংলাদেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক----------------------------------------- ১১৪
৬২। বাংলাদেশের জনগনের সাথে আমাদের সম্পর্ক--------------------------------১১৫
৬৩। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ক -------------------------------------- ১১৭
• ১৫। বাংলাদেশের রাজনীতি
৬৪। রাজনীতির সংজ্ঞা -------------------------------------------------------- ১২০
৬৫। বাংলাদেশের গনতান্ত্রিক ঐতিহ্য --------------------------------------------১২২
৬৬। সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির নীতিমালা -------------------------------- ১২৫
৬৭। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ---------------------------------------------১২৬
• ১৬। গণতন্ত্র বনাম বিপ্লব
৬৮। বিপ্লব বনাম গণতন্ত্র ----------------------------------------------------১৩১
৬৯। সামরিক বিপ্লব ------------------------------------------------------- ১৩৬
৭০। সশস্ত্র বাহিনী ও রাজনীতি ----------------------------------------------১৩৯
৭১। সশস্ত্র বাহিনী ও জনগন -------------------------------------------------১৪১
৭২। গণতন্ত্রের দুর্গতি কেন --------------------------------------------------১৪৬
• ১৬। আদর্শিক রাজনীতি
৭৩। ডুগডুগি বনাম আদর্শের রাজনীতি ---------------------------------------- ১৫৫
৭৪। রাজনীতি ও নৈতিকতা ---------------------------------------------------১৬০
৭৫। সুস্থ রাজনীতির ভিত্তি ----------------------------------------------------১৬৩
৭৬। রাজনীতি ও সমাজসেবা ------------------------------------------------- ১৬৭
৭৭। চরিত্রবান লোকদের শাসন ----------------------------------------------- ১৬৯
• ১৮। গণতন্ত্র ও ইসলাম
৭৮। বিশ্বনবীর জীবনে রাজনীতি ------------------------------------------------১৭১
৭৯। গণতন্ত্র ও ইসলাম --------------------------------------------------------১৮০
• ১৯। বাংলাদেশের উপযোগী সরকার পদ্ধতি
৮০। সরকার পদ্ধতি -----------------------------------------------------------১৮৩
৮১। গনতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি -------------------------------------------------১৮৪
৮২। দু’পদ্ধতির পার্থক্য --------------------------------------------------------১৮৫
৮৩। গনতান্ত্রিক বিশ্বের সরকার পদ্ধতি ------------------------------------------ ১৮৫
৮৪। সরকার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক -------------------------------------------------১৮৬
৮৫। গনতান্ত্রিক সরকার -------------------------------------------------------- ১৮৭
৮৬। পার্লামেন্টারী সিস্টেমের রাষ্ট্রপ্রধান ------------------------------------------- ১৮৯
৮৭। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পদ্ধতি -------------------------------------------------- ১৯০
৮৮। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ------------------------------------------------------ ১৯২
৮৯। জনগনের প্রেসিডেন্ট ------------------------------------------------------- ১৯২
৯০। বাংলাদেশের পলিটিকাল সিস্টেম ------------------------------------------- ১৯৪
৯১। ৫ দফা প্রস্তাব ------------------------------------------------------------- ১৯৬

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
পাকিস্তান পূর্ব- বাংলাদেশ
বাঙ্গালী মুসলমানদের ইতিহাস
ভারতের বহু স্থানেই মুসলিম শাসনের ফলে নতুন মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু বাংলা ও আসামের যে ভূখণ্ডটি ২৫-২৬ বছর আগে স্বেচ্ছায় পাকিস্তানের অংশ হিসেবে যোগদান করেছিলো সেখানে এতো বেশী মুসলমান কি করে হল সে ইতিহাস অনেকেরই জানা নেই। দিল্লীতে শত শত বছর মুসলিম শাসকদের রাজধানী থাকা সত্ত্বেও চারপাশে বহুদূর পর্যন্ত মুসলমানদের সংখ্যা সব সময়ই কম ছিল। কিন্তু বাংলার মাটিতে মুসলিম শাসন চালু হবার বহু পূর্ব থেকেই বিপুল সংখ্যক স্থানীয় জনতা মুসলমান হয়। ইসলাম প্রচারক আরব বনিকদের প্রচেষ্টায় চাটিগা দিয়ে এই এলাকায় ইসলামের আলো পৌঁছে। স্থানীয় অধিবাসীরা ব্যবসায়ে লেনদেনের সাথে সাথে তাঁদের নিকট মানবিক অধিকার ও মর্যাদার সন্ধান পেয়ে মুসলিম হওয়া শুরু করেছিলো। এমন উর্বর জমির খোঁজ পেয়ে ইসলামের লো নিয়ে আরো অনেক নিঃস্বার্থ মুবাল্লিগ এদেশে আগমন করেন। এভাবে নদীমাতৃক বাংলায় ক্রমে ক্রমে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলেই বখতিয়ার খলজী মাত্র ১৭ জন আগ্রগামী অশ্বারোহী সেনা নিয়ে গৌড় আক্রমন করলে গৌড়ের রাজা ভীতু লক্ষ্মণ সেন বিনা যুদ্ধে পলায়ন করে এবং বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। বাংলার সাথে সাথে আসামের দিকেও যখন মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে লাগলো তখন বর্তমান সিলেট অঞ্চলের রাজা গৌরগোবিন্দের মুসলিম- বিরোধী চক্রান্তকে খতম করার জন্য হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী ( র ) ৩৬০ জন মুজাহিদ নিয়ে এদেশে আগমন করেন।
সুতরাং ইতিহাস থেকে একথাই প্রতীয়মান হয় যে, শাসকের ধর্ম হিসেবে এলাকার মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেনি। বরং ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েই মানুষের মতো ইজ্জত নিয়ে বাঁচার তাগিদেই তারা মুসলমান হয় একারনেই এ অঞ্চলের সাধারন মানুষ এতো বেশী ইসলাম প্রিয়। ধর্মের নামে শাসকদের অধর্মের ফলে বর্তমানে যুব শক্তির একাংশে যে ধর্ম বিরোধী তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা সাময়িক এবং তাঁর বিপরীত প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

উপমহাদেশে ইংরেজ রাজত্ব
১৭৫৭ সালে স্বাধীন বাংলার নবাব সিরাজুদ্দৌলার সেনাপতি মীর জাফর ইংরেজের সহযোগিতায় নিজে নবাব হওয়ার যে কুমতলব করেছিলো তাঁরই ফলে এদেশে ইংরেজ রাজত্বের সূচনা হয়। যে ব্যক্তি নিজের ক্ষমতার জন্য আপন দেশ এবং জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো, তাকে সংগত কারনেই ইংরেজরাও বিশ্বাস করতে পারেনি। এভাবেই মীর জাফরের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ইংরেজ রাজত্ব কায়েম করা হল।
১৮৫৭ সালে দিল্লীর শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ইংরেজ রাজত্ব গোটা ভারত উপমহাদেশে মযবুত করা হল। এভাবে উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করতে একশো বছর লেগে গেলো। এভাবেই ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীনতার যে বীজ বপন করা হয়েছিলো, তা একশো বছরে বিরাট মহীরুহে পরিনত হল।
১৮৩১ সালে পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশের সীমানায় বালাকোটের যুদ্ধে সাইয়েদ আহমাদ ব্রেলভী ( র ) ও শাহ ইসমাইল ( র ) এঁর নেতৃত্বে পরিচালিত ভারতের প্রথম সত্যিকার ইসলামী আন্দোলনের ফলেই ১৮৫৭ সালে ইংরেজ বাহিনীতে নিযুক্ত মুসলিম সিপাহীরা বিদ্রোহ করার প্রেরনা লাভ করেছিলো।
এঁর পরের ইতিহাস মুসলিম জাতিকে চিরতরে গোলাম বানানোর জন্য ইংরেজদের জঘন্য ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। এ উপমহাদেশে প্রায় ৬০০ বছর মুসলিম শাসন চলেছে। তাঁদের হাত থেকে পূর্ণ ক্ষমতা কেড়ে নিতে ইংরেজদের ১০ বছর লেগেছে। তাই দিল্লী দখলের পর এদেশে ইংরেজ রাজত্ব স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে ইংরেজরা মুসলমানদেরকে সকল ময়দান থেকে উৎখাত করে অমুসলিম জাতিগুলোকে শিক্ষা, সরকারী চাকুরী, ব্যবসা- বাণিজ্য ও জমিদারিতে এগিয়ে দিলো। ফলে ৫০ বছরের মধ্যে এদেশের মুসলিম শাসক জাতি, দাস জাতিতে পরিনত হয়ে গেলো। ইংরেজ লেখক উইলিয়াম হান্টারের “দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস” বইটি একথার বিশ্বস্ত সাক্ষী।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

ইংরেজ আমলে মুসলিম নির্যাতন
মীর জাফরের স্বার্থপরতা ও ষড়যন্ত্রের পরিনামে ইংরেজ বেনিয়ারা শাসক হয়েই সর্বক্ষেত্রে অমুসলিমদের সুযোগ- সুবিধা প্রদান ও মুসলমানদের সব ব্যাপারে চরমভাবে বঞ্চিত করার নীতি গ্রহন করেছিলো। দীর্ঘকাল শাসকের মর্যাদায় আসীন থাকার পর মুসলমানেরা যে কিছুতেই গোলামী মেনে নেবে না, একথা ইংরেজরা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল। তাই মুসলমানদেরকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা ছাড়া ইংরেজ রাজত্ব যে স্থায়ী হওয়া সম্ভব ছিল না এ বাস্তবতা অনুধাবন করেই তারা মুসলিম নিপীড়ন শুরু করে।
ইংরেজ রাজত্ব শুরু হবার পঞ্চাশ বছর পরে লিখিত “দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস” গ্রন্থে উইলিয়াম হান্টার বাঙ্গালী মুসলমানদের যে দুরাবস্থার চিত্র অংকন করেন তা থেকেই তৎকালীন মুসলমানদের সামগ্রিক অবস্থার অনুধাবন করা যায়। তিনি লিখতে বাধ্য হয়েছেন যে, “পঞ্চাশ বছর আগে কোন দরিদ্র ও অশিক্ষিত বাঙ্গালী মুসলমান খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল, আর এখন কোন শিক্ষিত ও ধনী মুসলমান তালাশ করে পাওয়ায় অসম্ভব।” ইংরেজ ও অমুসলিমদের যোগসাজসে ইংরেজদের সরকারী কর্মচারী হিসেবে হিন্দুরা জেঁকে বসলো। রাষ্ট্রভাষা ইংরেজীকে তারা মনিবের ভাষা হিসেবে গ্রহন করে সর্বক্ষেত্রে উন্নতি করলো। চরম বিদ্বেষ নিয়ে ইংরেজরা মুসলমানদেরকে ব্যবসা- বাণিজ্য, শিল্পকলা ও জমিজমা থেকে বঞ্চিত করে হিন্দুদেরকে মহাজন ও জমিদারে পরিনত করলো। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামক কালাকানুনের মারফতে বাঙ্গালী মুসলমানকে হিন্দুর অর্থনৈতিক গোলামে পরিনত করা হল।
ইংরেজ শাসনের ফলে গোটা ভারতেই মুসলমানদের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে মুসলমানদের মতো এতো দীর্ঘকাল এমন ব্যাপক নির্যাতন ভারতের কোন এলাকার লোকই ভোগ করেনি। কারন ইংরেজ শাসন বাংলার মাটি থেকেই শুরু হয় এবং দিল্লী পর্যন্ত দখল করে বসতে বসতে তাঁদের ১০০ বছর লেগে যায়। তাই বাঙ্গালী মুসলমানরা পৌনে দুইশ বছর ইংরেজ ও হিন্দুদের যৌথ গোলামী করতে বাধ্য হয়। এ গোলামীর প্রতিবাদ যে হয়নি এমন নয়, মুসলমানরা কোন দিনই ইংরেজ শাসন মনে প্রানে গ্রহন করেন নি। আর এ প্রতিবাদের ফলেই ইংরেজরা মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে পংগু করে রাখার চেষ্টা করতে থাকে।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )


ব্রিটিশ ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন
শিক্ষায়- দীক্ষায়, ধন- দৌলতে, প্রভাব- প্রতিপত্তিতে মুসলিম জাতিগুলো অগ্রসর হবার পর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের পরিচালনায় ও অমুসলিম নেতৃত্বে যখন দেশকে ইংরেজের গোলামী থেকে স্বাধীন করার আন্দোলন শুরু হল তখন অর্ধমৃত অবস্থায়ও মুসলিম জাতি তাতে সাড়া দিলো। ইংরেজ বিদ্বেষ তাঁদের মজ্জাগত ছিল। কারন তাঁদের হাত থেকেই ইংরেজরা ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল।
কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই মুসলিম নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারলেন যে, এ স্বাধীনতা দ্বারা ইংরেজের অধীনতা থেকে মুক্তি পেলেও মুসলমানদেরকে অমুসলিমদের অধীনেই থাকতে হবে।
গোটা ভারতে তখন ৪০ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ১০ কোটি মুসলমান ছিল। তাই গনতান্ত্রিক সরকার কায়েম হলেও সংখ্যালঘু মুসলমানরা চিরদিনই অমুসিমদেরই অধীনে থাকতে বাধ্য হতো।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে যখন ব্রিটিশ সরকার কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন সভা কায়েম করে জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে স্বায়ত্ত শাসনের নামে আংশিক ক্ষমতা তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করলো, তখন মুসলমানরা পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা আদায় করে কিছুটা আত্মরক্ষার বন্দোবস্ত করলো। মুসলিম জনগনের প্রতিনিধি যাতে শুধু মুসলিমদের ভোটে নির্বাচিত হতে পারে, সে ব্যবস্থার নামই পৃথক নির্বাচন। যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থায় মুসলিম এবং অমুসলিমদের মিলিত ভোটে নির্বাচিত হলে কংগ্রেসের অমুসলিম নেতাদের মর্জি হিসেবে কিছু সংখ্যক মুসলিম আইন সভায় নির্বাচিত হলেও জাতি হিসেবে মুসলিমদের কোন পৃথক সত্ত্বা থাকবে না আশংকা করেই মুসলমানরা পৃথক নির্বাচন দাবী করেছিলো।
১৯৩৫ সালের ঐ আইন অনুযায়ী ১৯৩৬ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ভারতের ৭ টি প্রদেশে কংগ্রেসের রাজত্ব কায়েম হয়। পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে অবিভক্ত বাংলা সহ ৪ টি প্রদেশে মুসলিম জনসংখা বেশী থাকায় আনুপাতিক হারে এ ৪ টি আইন সভায় মুসলিম সদস্য সংখ্যা অমুসলিমদের চেয়ে বেশী হয়।
মিঃ জিন্নাহ মুসলিম জাতির নেতৃত্ব গ্রহন করার পরে মুসলমানরা তাকে কায়েদে আযম ( শ্রেষ্ঠ নেতা ) হিসেবে বরন করে নেয়। তাঁরই নেতৃত্বে এবং মুসলিম লীগের উদ্যোগে ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে ঐতিহাসিক মহা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শেরে বাংলা ফযলুল হকই ঐ সম্মেলনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম সংখাগুরু প্রদেশগুলো নিয়ে ভারত থেকে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রপুঞ্জ গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন, যা সর্বসম্মতভাবেই গৃহীত হয়। ঐ প্রস্তাবটিই ইতিহাসে পাকিস্তান প্রস্তাব নামে বিখ্যাত হয়ে আছে।
১৯৪৫ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় আইন সভা ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক আইন সভা সমূহের যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে মুসলিম লীগ ঐ পকিস্তান প্রস্তাবকেই নির্বাচনী ইস্যু বানায়। সারা ভারতে মুসলিমগন একটি পৃথক জাতিসত্তার মর্যাদা সহকারে ঐ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা না থাকলে এ বিজয় কিছুতেই সম্ভব হতো না। এ বিজয়ের ফলে বাধ্য হয়ে ইংরেজ সরকার পাকিস্তান দাবী মেনে নেয় এবং ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম হয়।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

পাকিস্তান আন্দোলন ও ইসলাম
“পাকিস্তানের অর্থ কি—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। এ শ্লোগানই মুসলমানদেরকে এ আন্দোলনে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এমনকি ভারতের যে ৭ টি প্রদেশ ভারতের সাথে থাকবে বলে জানাই ছিল, সেখানেও মুসলমানরা ইসলামের আকর্ষণে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবীকে নিরংকুশভাবে সমর্থন করেছে। এর পরিনামে লক্ষ লক্ষ মুসলমান শহীদ হয়েছে এবং জন্মভূমি ও সহায়- সম্পদ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। ভারতে বসবাসকারী মুসলমানরা এখনো তাঁদের ঐ অন্যায়ের কঠোর শাস্তি ভোগ করে চলেছে।
কিন্তু অতঃপর দুঃখের বিষয় যে, “পাকিস্তান আন্দোলন” ইসলামের নামে চলা সত্ত্বেও তা “ইসলামী আন্দোলন” হিসেবে গড়ে উঠেনি। পাকিস্তান কায়েম হবার স্বাধীন মুসলিম দেশটিতে ইসলামী আইন, ইসলামী শিক্ষা, ইসলামী অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা চালু করার কোন পরিকল্পনাই আন্দোলনের নেতারা করেননি। এর ফলে যা হবার তাই হয়েছে। যারা ইসলামকে জানেননা বা যারা নিজের জীবনে ইসলামকে মেনে চলেন না, তারা সমাজ রাষ্ট্রে কী করে ইসলাম কায়েম করবেন ? ইসলামের ব্যাপারে এ ধোঁকাবাজি করার ফলে নেতারা অল্প দিনের মধ্যেই তাঁদের জনপ্রিয়তা হারালেন। সেনাপতি আইয়ুব খান সে সুযোগে ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখল করলেন।
(পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

 

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আন্দোলন
অবিভক্ত ভারতে ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে ভারতের ১০ কোটি মুসলমান একটি আলাদা জাতি হিসেবে পাকিস্তান দাবীকে নির্বাচনী ইস্যু বানায়। ঐ দাবীতে প্রমানিত হয় যে, মুসলিম জাতি অখন্ড ভারত রাষ্ট্রে বিশ্বাসী নয়। অবিভক্ত বাংলার মুসলিম আসনগুলোর শতকরা ৯৭ টিতে পাকিস্তানবাদীরাই বিজয়ী হয়। বর্তমান পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের কোথাও এমন বিপুল সংখায় বিজয় সম্ভব হয়নি। সুতরাং এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙ্গালী মুসলমানদের অবদানই সবচাইতে বেশী। এর যুক্তিসংগত কারণও রয়েছে।
ইংরেজ শাসন সর্বপ্রথম বাংলায়ই কায়েম হয়। দিল্লী দখন পর্যন্ত ইংরেজদের আরো একশো বছর লেগে যায়। সে হিসেবে এদেশের মানুষ সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ইংরেজদের গোলামী করতে বাধ্য হয়। ইংরেজরা মুসলমানদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেবার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের রাজত্ব স্থায়ী এবং মজবুত করার উদ্দেশ্যে এদেশের অধিবাসীদের মধ্যে অমুসলমানদের মধ্য থেকে সহায়ক শক্তি তালাশ করতে থাকে। রাজ্যহারা ও ক্ষমতাহীন মুসলমানদের পক্ষে ইংরেজদের দাসত্ব মেনে নেয়া যেমন সম্ভব ছিল না, ইংরেজদের পক্ষেও মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করা সম্ভব হচ্ছিলো না। বিশেষ করে সব জায়গায়ই মুসলমানরা সাধ্যমত প্রতিরোধ গড়ে তোলায় তারা একশ্রেণীর হিন্দুদের সহযোগিতাই একমাত্র নির্ভরযোগ্য মনে করলো। মাত্র ৫০ বছরের মধ্যেই দেখা গেলো যে, সরকারী চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমিদারী ইত্যাদি ক্ষেত্রে যেভাবে পূর্বে মুসলমানরাই প্রাধান্য বিস্তার করেছিলো সেখানে হিন্দুরা একচেটিয়া ভাবে একচ্ছত্র কর্তৃত্বের আসন পেয়ে গেলো। এ কারনেই বাঙ্গালী মুসলমানরা প্রায় দেড়শ বছর ইংরেজদের রাজনৈতিক গোলামী, হিন্দুদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোলামী সহ্য করেছে। এ ডাবল দাসত্ব মুসলমানদের মধ্যে এমন তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে যে, বাঙ্গালী মুসলমানদের মনে দ্বিজাতি তত্ত্বের বানী অতি সহজেই জনপ্রিয় হয়ে যায়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় মুসলমানদের প্রাধান্যে আলাদা রাষ্ট্র কায়েম না হলে ইংরেজদের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েও হিন্দুদের অধীনতা থেকে রক্ষা পাওয়া যে কিছুতেই সম্ভবপর হবেনা সে কথা বুঝতে বাঙ্গালী মুসলমানদের কোন বেগ পেতে হয়নি।
এ কারনেই বাঙ্গালী মুসলমানদের দীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁদেরকে পাকিস্তান দাবীর যৌক্তিকতা উপলব্ধি করতে বাধ্য করেছে। পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের মুসলমানদের এতো বেশী তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়নি।
পাকিস্তান আন্দোলন ১৯৪০ সালে সুস্পষ্ট কর্মসূচী নিয়ে শুরু হয় এবং মাত্র সাত বছরের মধ্যে বিজয় লাভ করে। ঐ আন্দোলনের সময় যাদের বয়স ১৫/২০ বছরের নীচে ছিল না। তাঁদের এ বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা থাকার কথা।
১৯৪০ সালে যাদের বয়স অন্তত ১৫ বছর ছিল তারা একথার সাক্ষী যে, অফিস- আদালতে, স্কুল- কলেজে, জমিদারী- কাচারিতে মুসলমানদের সাথে হিন্দুরা কীরূপ আচরন করতো।
আমাদের এলাকায় ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানা ) কৃষ্ণ নগর জমিদার বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে কোন মুসলমানের ছাতা মাথায় ও জুতা পায়ে দিয়ে চলার অনুমতি ছিলনা। বরকন্দাজ লাঠিয়ালরা এ নিয়ম অমান্যকারী মুসলমানদেরকে গ্রেফতার করে জমিদার বাড়ির নায়েবের নিকট বিচারের জন্য পেশ করতো।
কুমিল্লা জেলার চান্দিনা থানা কেন্দ্রে ১৯৩৬ সালে আমার বাবা চাকুরী উপলক্ষে বদলী হয়ে যান। তখন চান্দিনা হাইস্কুলে একজন ব্রাহ্মণ হেড মাস্টার ছিলেন এবং আরবীর শিক্ষক ছাড়া মাত্র একজন মুসলমান শিক্ষক ছিলেন। ছাত্র সংখ্যা অনুপাতে স্কুল কমিটিতে মুসলমান ছাত্রদের অভিভাবকদের দু’জন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। কমিটির বৈঠকের সময় সবার জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা থাকলেও মুসলমান সদস্য দুজনকে গোল টুলেই বসতে বাধ্য হতে হতো। পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হবার পর সুস্পষ্ট দাবীর ফলে মুসলমানদের ভাগ্যে চেয়ার জুটে।
এখনো এমন অনেক লোক বেচে আছে যারা এককালে নিজেদের এলাকায় জমিদারদের দাপটের দরুন গরু কোরবানী দিতে পারেনি। জমিদারদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত পূজা-পার্বণে মুসলমানদেরকেও খাজনার সাথে বাধ্য হয়ে পূজার চাঁদা দিতে হতো। খাজনা ও ঋণের দায়ে মুসলমান কৃষকের বেশীর ভাগ লোকের জমি জমা ও ভিটেমাটি নিলামের মাধ্যমে জমিদার ও টাকা লগ্নীকারী সাহাদের ঘরে চলে যেতো। ১৯৩৭ সালে শেরে বাংলা ফযলুল হক ও খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিত্বের সময় প্রজাতন্ত্র আইনের ফলে এ জাতীয় চরম জুলুম থেকে মুসলমানরা রেহাই পায়।
এসব কথা ঐতিহাসিক সত্য। উচ্চ বর্ণের ঐ হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন বাংলাদেশে নেই। যারা আছে তারা তাঁদের পূর্বপুরুষদের কৃতকর্মের জন্য অবশ্যই দায়ী নয়। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের বিদ্বেষ পোষণ করার সংগত কোন কারন নেই। তারা এদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দেশীয় ভাই। কিন্তু হিন্দুদের সাথে মিলে অখন্ড ভারতে একই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে কেন মুসলমানরা রাজী হতে পারেনি, সে কথা বুঝতে হলে ঐ ইতিহাসের আলোচনা না করে কোন উপায় নেই।
আজকের মুসলমানদের যুবকদের মধ্যে যারা হিন্দু মুসলিম মিলিত জাতীয়তার সমর্থন করছে তারা ঐ ইতিহাস জানেনা। না জানার জন্য তারা অবশ্যই দায়ী নয়। পাকিস্তান হবার পর এদেশের মুসলমানদের পরবর্তী বংশধরদেরকে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই জানানো উচিৎ ছিল যে, কী কারনে ভারত বিভক্ত হল, কিভাবে বাংলাভাষী অঞ্চলটি পর্যন্ত দু’ভাগ হয়ে গেলো এবং শত শত বছর এক দেশে বাস করেও হিন্দু-মুসলমান-শিখ মিলে কেন এক জাতির সৃষ্টি হতে পারল না।
যারা পাকিস্তানের উপর ২৫ বছর নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্ব করেছেন তারা যদি দ্বিজাতি তত্ত্বের মর্ম বুঝতেন এবং সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করতেন তাহলে যাদের ভোটে ভারত বিভক্ত হয়েছিলো তাঁদের সন্তানদের মধ্যে চিন্তার বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতো না।
( আমার দেশ বাংলাদেশ )

পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের মুসলমানদের পার্থিব উন্নতির মূলে
ইংরেজ আমলে বাংলাদেশের মুসলমান গোটা ভারতের মধ্যে সবচেয়ে অনুন্নত ছিল। ১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয় তখন সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙ্গালী মুসলমান ছিলনা বললেই চলে। অফিসার তো দূরের কথা জওয়ানের সংখাও ছিল অতি নগণ্য। পুলিশ কর্মকর্তা কিছু থাকলেও ১৯৪৭ সালে হিন্দু পুলিশ অফিসার ও সিপাহীরা ভারতে চলে যাবার পর এদেশের থানা পাহারা দেবার মতো পুলিশেরও অভাব দেখা দিলো। সিভিল সার্ভিসে একজন মাত্র আই, সি, এস মানের বাঙ্গালী মুসলমান ছিলেন। তিনি প্রমোশনের মাধ্যমে এ পদ পেয়েছিলেন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান শিক্ষকদের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল।
যদি ভারত বিভক্ত না হতো তাহলে আজকাল যারা সরকারী অফিসে বড় বড় পদ দখল করে বসে আছেন তাঁদের অনেকেই কেরানী থেকে প্রোমোশন পেয়ে বড় জোর সেকশন অফিসার পর্যন্ত উন্নতি করতে পারতেন। আজ যারা জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ার তাঁদের কয়জন অফিসার হরে পারতেন --- তারাই হিসেব করে দেখতে পারেন।
আজ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত থেকে মুসলিম জাতীয়তার নাম শুনলেই নাক সিটকান এবং কংগ্রেসিদের ভাষায় সাম্প্রদায়িক বলে গালি দেন তাঁদের কয়জন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী করার সুযোগ পেতেন তা বিবেচনা করার যোগ্যতাটুকু তারা রাখেন বলেই আশা করি।
ব্যবসা- বাণিজ্য, শিল্প- কারখানা ও আমদানী- রপ্তানির ময়দানে আজ যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা এ ময়দানে পাত্তা পাওয়ার কোন আশাও কি তারা করতে পারতেন ?
জীবনের সব ক্ষেত্রেই এই একই অবস্থা হতো যদি পাকিস্তান সৃষ্টি না হতো। সুতরাং নিজেদের স্বার্থেই একথা স্বীকার করা ছাড়া কোন উপায় নেই যে, মুসলিম জাতীয়তাই বাঙ্গালী মুসলমানদের বর্তমান পার্থিব উন্নতির মূলে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশ হবার সাথে সাথে মাড়োয়ারি ও পশ্চিম বঙ্গের দাদারা যে রকম তৎপরতা শুরু করেছিলেন, মুসলিম জাতীয়তাবোধই শেষ পর্যন্ত তাঁদেরকে নিরাশ করেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পরে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা আবার জাগ্রত না হলে বর্তমান বৈষয়িক অবস্থাটুকুও টিকে থাকতো না। সুতরাং মুসলিম জাতীয়তাবোধ বাংলাদেশের মুসলমানদের পার্থিব স্বার্থেরও সংরক্ষক।
মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত না হলে ঢাকা কখনো রাজধানীর মর্যাদা পেত না। অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কোলকাতার অধীনে ঢাকা এককালে একটি জেলা শহর মাত্র ছিল। পাকিস্তান হবার পর ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হওয়ায় এর উন্নয়ন শুরু হয়। বাংলাদেশ হবার পরে এর আরও উন্নতি হয়েছে এবং এ উন্নতি অব্যাহত থাকাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশে যে হারে শিল্প এবং বড় বড় কলকারখানা গড়ে উঠেছে তাও ভারত বিভাগের ফলেই সম্ভব হয়েছে। অবিভক্ত ভারতের অধীনে এদেশে শিল্প- বাণিজ্যে উন্নতি হলেও তাতে মুসলমানদের সামান্য প্রাধান্য লাভেরও সম্ভাবনা থাকতো না।
আজ মুসলমানদের নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্বে এদেশের সর্বক্ষেত্রে যে উন্নতি হয়েছে তা মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে ভারত বিভাগেরই প্রত্যক্ষ ফসল।
( আমার দেশ বাংলাদেশ )

পাকিস্তান আমলের কুশাসন
ইসলামের নাম নিয়ে মুসলমানদের ঈমানকে উজ্জীবিত করে পাকিস্তান হাসিল করা সত্ত্বেও এর শাসকগণ ইসলামের প্রতি আন্তরিকতার কোন পরিচয়ই দিতে পারেননি। ইসলামের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও যদি তারা অন্তত গণতন্ত্রকে চালু হতে দিতো তাহলে পাকিস্তানের এ দুর্গতি হতো না। একই সাথে পাক-ভারত স্বাধীন হল এবং একই গনতান্ত্রিক ভিত্তিতে পয়লা সরকার গঠিত হল। অথচ ভারতে দু’বছরের মধ্যেই শাসনতন্ত্র রচিত হয়ে গেলো এবং কয়েকটি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হলো। আর পাকিস্তানে ২৫ বছরেও কোন স্থায়ী শাসনতন্ত্র হতে পারলো না। জনগনের নির্বাচিত সরকারও গঠিত হল না।
সামরিক এবং বেসামরিক যেসব চক্রান্তকারী গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই জঘন্য ষড়যন্ত্র করেছে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের মধ্যে দিন দিন এ ধারনা সৃষ্টি হতে লাগলো যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বাঙ্গালী মুসলমানরা দেশ শাসন থেকে বঞ্চিত। যদি গনতান্ত্রিক শাসন চালু করা হতো তাহলে অর্থনৈতিক অবিচার এবং বৈষম্য নিয়ে আইন সভায় বিতর্ক হতো। পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জনগনের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি সুযোগ হতো না। জনগনের সরকার কায়েম হলে বৈষম্য এবং শোষণ দূর করা সহজ হতো। বাঙ্গালী মুসলমান তাঁর অধিকার আইনের মাধ্যমে হাসিল করতে পারতো।
গণতন্ত্রের ঐ দুশমনরা পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী বলে কি সেখানকার জনগন তাঁদেরকে সমর্থন করেছিলো। জনগন সেখানেও গণতন্ত্রের জন্যে সংগ্রাম করেছে। সুতরাং একথা সবাই স্বীকার করতে বাধ্য যে, পাকিস্তানের অগনতান্ত্রিক শাসক চক্রই জনগনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশকে ক্রমে ক্রমে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

আইয়ুব খানের যুগ
আইয়ুব খান জাঁদরেল শাসক ছিলেন। মুসলিম লীগের নামেই তিনি রাজত্ব করেছেন। অথচ তিনি তাঁর শাসনকালে মৌলিক গণতন্ত্রের নামে একনায়কত্তই চালিয়ে গেছেন। গনতন্ত্রকামী সব দলের সাথে মিলে জামায়াতে ইসলামীও আইয়ুব আমলের দশ বছর একনায়কত্তের বিরুদ্ধে আগা গোড়াই সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাস থেকে জামায়াতের এই বলিষ্ঠ ভূমিকা মুছে ফেলার সাধ্য কারো নেই।
আইয়ুব খান জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী ক্ষেপা ছিলেন। কারন জামায়াত গনতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাবার সাথে সাথে আইয়ুব খানের ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের বিরোধিতা করতো। তাই ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন প্রত্যাহারের পর গনতান্ত্রিক আন্দোলন চলাকালে ১৯৬৪ সালের জানুয়ারী মাসে একমাত্র জামায়াতে ইসলামীকেই বেআইনি ঘোষণা করা হয় এবং ৬০ জন জামায়াত নেতাকে জেলে আটক করা হয়। ৯ মাস পর সুপ্রীম কোর্ট রায় দেন যে জামায়াতকে বেআইনি ঘোষণা করাটাই বেআইনি হয়েছে।
সরকারী অবহেলার ফলে ইসলামী চেতনা ও মুসলিম জাতীয়তাবোধ তো আইয়ুব আমলের পূর্ব থেকেই লোপ পাচ্ছিলো। আইয়ুবের আমলে ভাষা এবং এলাকা ভিত্তিক জাতীয়তা শূন্যস্থান পুরনে এগিয়ে এলো। পশ্চিমাঞ্চলে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের ভাষার পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভৌগলিক দিক দিয়ে একসাথে থাকায় এবং ভারতের সাথে কয়েক দফায় যুদ্ধ হওয়ায় সেখানে মুসলিম ঐক্যবোধ কোনরকমে বেচে রইলো।
কিন্তু পূর্বাঞ্চলের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। ভৌগলিক দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থা কীসের ভিত্তিতে এখানকার মানুষ পশ্চিমের সাথে একাত্মতা বোধ করবে ? ইসলামই একমাত্র সেতুবন্ধন হতে পারতো। কিন্তু সরকারী এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামকে কোন স্থানই দেয়া হল না। যে মুসলিম জাতীয়তার চেতনা গোটা উপমহাদেশের মুসলিমদেরকে ১৯৪৬ সালে ঐক্যবদ্ধ করেছিলো সে চেতনা বাঁচিয়ে রাখারও কোন প্রচেষ্টা দেখা গেলো না। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েম হবার মাত্র ১০/১৫ বছর পর স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একথা জানারও সুযোগ রইলো না যে ভারত বর্ষ দু’ভাগ কেন হল ? পশ্চিম বাংলা এবং পূর্ব বাংলার ভাষা এক হওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলা দু’ভাগ হল ? বাংলাভাষী অমুসলিমের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী মুসলমানদেরকে কেন বেশী আপন মনে করতে হবে ? ফলে ঈমান ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বিনষ্ট হয়ে এলাকা এবং ভাষা ভিত্তিক ঐক্যবোধ জন্ম নিলো এবং বাংলাভাষী অঞ্চলে স্বাতন্ত্র্য বোধের বিকাশ অবধারিত হয়ে উঠলো।
রাজনৈতিক ময়দানে যে আদর্শিক শুন্যতা সৃষ্টি হল সেখানে সমাজতন্ত্র এগিয়ে আসার সুযোগ পেলো। রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে ইসলামের প্রভাব যাতে ব্যাপকভাবে না পরে সেজন্য ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ ময়দান দখল করতে এগিয়ে এলো। এভাবে এলাকা ভিত্তিক ভাষা ও জাতীয়তাবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতাবোধ ও সমাজতন্ত্র রাজনৈতিক অংগনে মুসলিম জাতীয়তার স্থান দখল করতে লাগলো। ( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )
মুসলিম জাতীয়তা পরিত্যাগের পরিণাম
মুসলিম জাতীয়তাবোধ চল্লিশের দশকে অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী দশ কোটি মুসলমানকে এক বলিষ্ঠ জাতিতে পরিনত করেছিলো। এরই সুফল হিসেবে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টি হল। কিন্তু ঐ জাতীয়তাবোধকে লালন না করার ফলে যে শুন্যতা সৃষ্টি হল তা ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবোধ এসে পূরণ করলো।
যেসব রাজনৈতিক দল এবং নেতৃবৃন্দ মুসলিম জাতীয়তার চিন্তাধারা পরিত্যাগ করে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাকেই রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে গ্রহন করলেন তারা স্বাভাবিকভাবেই নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিক রাজনীতি করার অযোগ্য হয়ে পড়লেন। কারন পাঠান জাতীয়তার পতাকাবাহী বাংলাভাষীদের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সিন্ধী জাতীয়তাবাদী নেতা পাঠানদের নিকট নেতা হিসেবে গণ্য হতে পারেনা। তেমনি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের রাজনৈতিক আদর্শ বলে গণ্য হওয়া অসম্ভব।
সুতরাং স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিবর্তনেই আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ হয়ে যাবার পর তাঁদের রাজনীতি পাকিস্তান ভিত্তিক না হয়ে শুধু পূর্ব পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেলো। গোটা পাকিস্তানকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে চিন্তা করার পরিবর্তে তাঁদের সকল পরিকল্পনা শুধুমাত্র বর্তমান “বাংলাদেশ” এলাকাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠলো।
কিন্তু যারা রাজনীতি করেন তারা অবশ্যই ক্ষমতায় যেতে চান। ক্ষমতাসীন না হয়ে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচীই বাস্তবায়ন করা যায় না। সুতরাং যারা শুধু পূর্ব পাকিস্তান ভিত্তিক রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁদের ক্ষমতায় যেতে হলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিছিন্ন হওয়া ছাড়া আর কোন পথ ছিল না।
ওদিকে মিঃ ভুট্টও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে একই দেশে দুই মেজরিটি দলের অদ্ভুত দাবী তুললেন। দেশ ভাগ না হলে ভুট্টরও ক্ষমতাসীন হবার কোন উপায় ছিল না। ভুট্ট ক্ষমতায় যাবার জন্য জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে যে ষড়যন্ত্র করলেন, তাতে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়া ত্বরান্বিত হয়ে গেলো।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )


ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন
১৯৬৯ সালের শেষ দিকে প্রচন্ড গন-আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান ক্ষমতা ত্যাগ করে সেনাপতি ইয়াহিয়া খানকে সামরিক আইন জারির সুযোগ করে দিলেন। আইয়ুবের একনায়কত্তের বিরুদ্ধে দশ বছর ধরে যে গনতান্ত্রিক আন্দোলন চলেছিল এর ফলে বিনা নির্বাচনে আর দেশ শাসন করা সম্ভব ছিল না। তাই ইয়াহিয়া খান সাধারন নির্বাচন ঘোষণা করলেন। সমগ্র অবিভক্ত পাকিস্তানে এটাই প্রথম এবং শেষ সাধারন নির্বাচন।
যে টু-নেশন থিওরি ও পৃথক নির্বাচনের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়েছিলো এবং যে মুসলিম ঐক্যবোধের ভিত্তিতে পশ্চিমের চারটি প্রদেশের সাথে পূর্ব বাংলাকে মিলিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হয়েছিলো, সে জাতীয় চেতনা ও ঐক্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখার কোন সরকারী প্রচেষ্টা না থাকায় পাকিস্তান কায়েমের ২৩ বছর পর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল তাঁর ফলাফল দেখে বুঝা গেলো যে, রাজনৈতিক দিক দিয়ে পাকিস্তান ৩ ভাগ হয়ে গেলো।
বাংলাদেশে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, সিন্ধু ও পাঞ্জাবে মিঃ ভুট্টর নেতৃত্বে পিপলস পার্টি এবং বাকী দুটো প্রদেশে অন্য দুটি দলের নিরঙ্কুশ বিজয় একথা প্রমান করলো যে, পাকিস্তানের ঐক্যের ভিত্তি আর বেচে নেই। যে ভিত্তিতে নির্বাচনের ফলে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিলো, সে ভিত্তি না থাকায় নির্বাচনের মাধ্যমেই পাকিস্তানের ভিত্তি ভেঙ্গে গেলো।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )
১৯৭০ এর নির্বাচন এবং বাঙ্গালী মুসলমান
দীর্ঘ ২৩ বছর পর ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে গোটা পাকিস্তানে প্রথম সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যুক্ত নির্বাচনের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে হিন্দু ও মুসলমানের অংশগ্রহন সত্ত্বেও হিন্দুরা এক বিশেষ উদ্দেশ্যে যে দলটিকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছে, বাঙ্গালী মুসলমান ভোটাররা সে দলটিকেই বিপুল সংখায় ভোট দিলেও তাঁদের উদ্দেশ্য ভিন্ন ছিল। বাঙ্গালী মুসলমানদের অধিকাংশের মনে এ ধারনা সৃষ্টি হয়েছিলো যে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় একজন বাংগালীকে প্রতিষ্ঠিত না করতে পারলে এবং কেন্দ্রীয় আইন সভায় সেই নেতার পক্ষে অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন না থাকলে তাঁদের ন্যায্য অধিকার আদায় করা সম্ভব হবে না।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে বিভিন্ন কারনে বাঙ্গালী মুসলমান নেতৃবৃন্দের মাঝে জনগন একমাত্র শেখ মুজিবকেই প্রাধান্য দেয়। শেখ সাহেবের নেতৃত্বে আস্থা স্থাপনের ফলে তাঁর দলকে একচেটিয়াভাবে জয়যুক্ত করা ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা হস্তগত করা সম্ভব ছিল না। কারন শেখ সাহেবের দলের পশ্চিম পাকিস্তানে কোন আসন লাভের আশা ছিল না। কিন্তু জনসংখার ভিত্তিতে আইনসভায় পূর্ব পাকিস্তানেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হবার কথা। তাই পূর্ব পাকিস্তানের সব আসনে শেখ সাহেবের সমর্থক প্রার্থীকে ভোট না দিলে ঐ উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারেনা। একমাত্র একারনেই বাঙ্গালী মুসলমান ভোটারদের অধিকাংশই শেখ সাহেবকে ভোট দেয়া প্রয়োজন মনে করে।
যে কোন নিরপেক্ষ ব্যক্তিও একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে বাঙ্গালী মুসলমান জনগন পাকিস্তান থেকে আলাদা হবার উদ্দেশ্যে শেখ সাহেবকে ভোট দেয়নি। নির্বাচন অভিযানের প্রতিটি জনসভায় তিনি জনগণকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না এবং যারা তাঁর সম্পর্কে এ অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা জঘন্য মিথ্যাচার করছে। শেখ সাহেবকে জয়যুক্ত করার জন্য যারা বিরামহীন চেষ্টা করছে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী লোক থাকলেও মুসলিম জনগন এ উদ্দেশ্যে তাকে ভোট দেয়নি—একথা নিতান্তই সত্য।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

৭০ এর নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি
নির্বাচনের পর
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইন সভায় আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিনত হওয়ায় শেখ মুজিবকে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলে মন্তব্য করা সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকলেন। ওদিকে ভুট্ট “এধার হাম, ওধার তুম” বলে এক দেশে দুটো মেজরিটি পার্টির অদ্ভুত শ্লোগান তুললেন। বুঝা গেলো যে, ভুট্ট পশ্চিম পাকিস্তানের বাদশাহ হতে চান। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান আলাদা না হলে সে সুযোগ তাঁর হয়না। তাই ইয়াহিয়া খানের সাথে যোগসাজশ করে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাঁধা সৃষ্টি করতে লাগলেন।
সেসময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বার বার জোর দাবী জানানো হল যে, “ব্যালটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংখাগুরু দলের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া হোক।” কারন জামায়াতে ইসলামী আশংকা করেছিলো যে, ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব হলে রাজনৈতিক সংকটের সাথে সাথে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। সে সময়কার দৈনিক পত্রিকাগুলো জামায়াতের এই দাবীর ঐতিহাসিক সাক্ষী।
নির্বাচনের পর ১৯৭১ সালের জানুয়ারীতে লাহোরে মাওলানা মওদুদীর সভাপতিত্বে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মাজলিশে শূরায় সিদ্ধান্ত হয় যে, যদি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যেতে থাকে, তাহলে জামায়াত এর বিরোধিতা করবে না। এ বিষয়ে এখানকার প্রাদেশিক জামায়াতকে যে কোন সিদ্ধান্ত নেবার জন্য পূর্ণ ইখতিয়ার দেয়া হল। এরপর এ সম্পর্কে যাবতীয় সিদ্ধান্ত পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতই নিতে থাকে।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )


ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি
জেনারেল ইয়াহিয়া গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হিসাবে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন বলে দাবী করা সত্ত্বেও নির্বাচনের পর তিনি মোটেই আন্তরিকতার পরিচয় দিতে পারেন নি। নির্বাচন সঠিকভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে গৌরবের সাথে ঘোষণা করা সত্ত্বেও নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে দেশকে তিনি চলতে দিলেন না। অযৌক্তিক কারনে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানে বিলম্ব করতে থাকলেন।
৬ দফার দোহাই দিয়ে শেখ সাহেব নির্বাচনে জয়লাভ করেন। একথা জানা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্ট সাহেব ৬- দফার বিরুদ্ধে আন্দোলন চালালেন। ইয়াহিয়া খানের সাথে ভুট্ট সাহেবের বার বার সাক্ষাৎ ও ভুট্ট সাহেবের ক্ষমতায় অংশগ্রহনের দাবী থেকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হল যে, শেখ সাহেবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার উদ্দেশ্যেই ইয়াহিয়া- ভুট্টোর মধ্যে ষড়যন্ত্র চলছে।
সমস্ত রাজনৈতিক দলের দাবীতে অবশেষে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় ৩রা মার্চ ১৯৭১- এ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকলেন। একমাত্র ভুট্টো সাহেবই এই অধিবেশন মুলতবি করার দাবী জানালেন এবং মুলতবী না হলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোন সদস্যকে যেতে না দেবার হুমকী দিলেন। ইয়াহিয়া খান ভুট্টো সাহেবের দাবী মেনে নিয়ে শেখ সাহেবের মতামত ছাড়াই যখন অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য মুলতবী করলেন তখন পূর্ব পাকিস্তানের জনগন বিক্ষোভে ফেটে পড়লো। ক্ষমতা হস্তান্তর না করার সন্দেহ তাঁদের মনে আরও ঘনীভূত হল। এ সুযোগে শেখ মুজিব বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। জনগনের বিক্ষোভকে দমনে অক্ষম হয়ে অবশেষে ইয়াহিয়া খান শেখ সাহেবের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এলেন। ৫ দিন পর্যন্ত আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে দু’পক্ষ দেশবাসীকে বার বার আশ্বস্ত করা সত্ত্বেও হঠাৎ শেষ মুহূর্তে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় ইয়াহিয়া খান সামরিক শক্তি দিয়ে বিদ্রোহ দমনের ব্যবস্থা করলেন। কায়েদে আযম শক্তি প্রয়োগ করে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানকে একত্রিত করেননি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বার বার শক্তি প্রয়োগ করে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। জনগণ বিশেষ করে বাঙ্গালী মুসলমানরা ইচ্ছা করে বিচ্ছিন্ন হয়নি।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

টিক্কা খানের অভিযান
২৫ শে মার্চ দিবাগত রাতে জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ঢাকা শহরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং ব্যাপক হত্যা ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে চরম সন্ত্রাস সৃষ্টি করে অসহযোগ আন্দোলনকে দমন করার প্রচেষ্টা করলো। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হল। কয়েক রাতের সামরিক অপারেশনে ঢাকা শহর স্তব্ধ হয়ে গেলো এবং রাজধানী তাঁদের পুনর্দখলে এলো।
ঢাকার বাইরের সব জেলায়ই এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো। নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ নিজ নিজ জেলা এবং মহকুমা শহরে অসহযোগ আন্দোলন জারী রাখলেন। ঢাকার বাইরে সেনাবাহিনী ও পুলিশেও বিদ্রোহ দেখা দিলো। যেসব শহরে অবাঙ্গালী ( বিহারী নামে ) উল্লেখযোগ্য সংখায় ছিল সেখানে বিহারীদেরকে হত্যা করে ঢাকার প্রতিশোধ নেয়া হল। এর প্রতিক্রিয়ায় সেনাবাহিনী ঐ সব এলাকায় গিয়ে বাঙ্গালী হত্যা করলো এবং সরকারী ক্ষমতা বহাল করলো।
এভাবে দু’দিকের আক্রমনে নিরপরাধ সাধারন মানুষ নিহত ও অত্যাচারিত হতে থাকলো। এক মাসের মধ্যে মোটামুটি দেশে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠিত হল বটে কিন্তু দেশটিকে নিশ্চিতভাবে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়া হল।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )
আত্মঘাতী লড়াইয়ের পরিণাম
অদৃষ্টের কি কঠোর পরিহাস। কতক লোকের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের ফলে ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই হয়ে গেলো ও চির দুশমন ভারত এক ভাইয়ের বন্ধু সেজে উভয়েরই সর্বনাশ করার সুযোগ পেলো। দু’ভাইয়ের সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়ার সুযোগে উভয়ের দুশমন এক পক্ষের বন্ধু সেজে গোটা সম্পত্তিই আত্মসাৎ করার নজীর বিরল নয়। পাকিস্তানের ব্যাপারে ভারত ঠিক সে ভূমিকাই গ্রহন করার মহাসুযোগ পেয়েছে। দুশমন তাঁর কাজ ঠিকই করেছে। পাকিস্তানকে ধ্বংস করার এ মহা সুযোগ ভারত কেন ছেড়ে দেবে ? দোষ দুশমনের নয়। দুশমনকে সে সুযোগ দেয়াটাই প্রকৃত অন্যায়। আমাদের নির্বাচিত সব নেতাই এজন্যে কম বেশী দায়ী। এ আত্মঘাতী লড়াই চলাকালে সত্যিকারের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের প্রান কেঁদেছে। কি মারাত্মক পরিস্থিতি তখন। সেনাবাহিনী দেশের অখন্ডতা রক্ষার জন্য আপন দেশবাসীকেই মারলো। আর বাঙ্গালী মুসলমানদের দুর্দশার অন্ত থাকলো না। এক দল মুসলমান ভারতের গোলামীর ভয়ে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করলো। আর এক দল পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য ভারতের মতো দুশমনের সাহায্য গ্রহন করতে নিজেদেরকে বাধ্য মনে করলো। হিন্দুদের তো এতে কোন মানসিক অসুবিধা ছিল না। কিন্তু দুপক্ষেই বাঙ্গালী মুসলমান দেশ প্রেমের তাগিদে যেসব কাজ করলো তাঁর পরিণাম কতো করুন।
একদল ভারতের দেয়া বোমা দিয়ে নিজেদের দেশেরই পুল উড়ায়, আর এক দল পুল রক্ষার জন্য প্রান হারায়। দুপক্ষেই দেশপ্রেম। কুশাসন এবং রাজনৈতিক বিভ্রান্তি এভাবেই দেশের জন্য আত্মত্যাগীদেরকে এমন আত্মঘাতী লড়াইয়ে লিপ্ত করে থাকে। একদলকে ভারতের দালাল, আর অন্য দলকে পাকিস্তানের দালাল বলে গালি দিলেই কি এদের দেশপ্রেম মিথ্যা হয়ে যাবে ?
এর পরিনামে কতো দেশপ্রেমিক উভয় পক্ষে খতম হয়ে গেলো। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে গত ২৫ বছরে যা কিছু অর্জিত হয়েছিলো তা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হল। অরাজকতার সুযোগে সমাজবিরোধী ও উচ্ছৃঙ্খলদের হাতে কতো নিরপরাধ মানুষ জান মাল হারাল। যে শোষণ থেকে বাঁচার জন্য এতকিছু করা হল তাঁর চেয়ে কতো বেশী শোষণ তথাকথিত বন্ধু রাষ্ট্র জঘন্য ও ব্যাপকভাবে চালাচ্ছে। সমস্ত সামরিক জিনিস পত্র তারা নিয়ে গেলো। দেশে আজ খাবার নেই, কাপড় নেই, ঔষধ নেই, নিরাপত্তা নেই--- আছে শুধু হাহাকার। জনগন কি এই অবস্থার আশায় গত নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলো। বিজয়ী দলকি দেশকে এ অবস্থায় দেখতে চেয়েছিলেন ? নিশ্চয়ই নয়। কেউই ধ্বংসের নিয়তে কাজ করেনি। কিন্তু যে নিয়তেই করা হউক ভুলের ভুলের পরিণাম ভোগ করতেই হয়। ভুলের ক্ষতি অনিবার্য। ব্যক্তিগত ভুলের ফল এতো বড় ব্যাপক হয়না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শাসকরা এবং রাজনৈতিক নেতারা করে থাকেন তাঁর পরিনাম যে কতো বেদনাদায়ক ও মারাত্মক হয় বাংলার মুসলমান তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণের ফলে বাংলাদেশ আপাতত জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে এসেছে বটে – কিন্তু এ কলংক কি বাঙ্গালী মুসলমানদের সামগ্রিক জীবনে কালিমা লাগায়নি ? ইতিহাস তো একথা বলবে না যে, এক লাখ মুসলিম সশস্ত্র বাহিনী হিন্দুস্তানের সেনাপতির নিকট আত্মসমর্পণ করেছে। এ কালিমা সারা দুনিয়ার মুসলমানদের আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে। ১৯৬৫ সালে পাক- ভারত যুদ্ধে যে গৌরব অর্জন করা হয়েছিলো তা যেমন বাঙ্গালী মুসলমানদের জন্যও সম্মানজনক ছিল তেমনি এ অপমানও তাঁদেরকে স্পর্শ করেছে।
এমনিভাবে এ আত্মঘাতী লড়াই সাধারনভাবে সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের জন্য যে কতো মারাত্মক পরিনতি বয়ে এনেছে তা কদ্দিন ভোগ করতে হবে তা ভবিষ্যতই বলতে পারে।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

 

 

 

 

স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলন
স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের পটভূমি
স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্বে যারা ছিলেন, তারা সবাই পাকিস্তান আন্দোলনে বিশেষ অবদান রেখেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান, সাইয়েদ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজ উদ্দিনের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ আন্দোলন পরিচালিত হয়। ছাত্র জীবনে আমি তাঁদের সমসাময়িক ছিলাম। পাকিস্তান আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা কতো বলিষ্ঠ ছিল আমি তাঁর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। মুসলিম জাতীয়তার পতাকাবাহী হিসেবেই তারা ভারতীয় কংগ্রেসের ভৌগলিক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। গান্ধী এবং নেহেরুর নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ভিত্তিতে অখন্ড ভারতের একটি মাত্র রাষ্ট্র কায়েমের কংগ্রেসি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পাকিস্তান কায়েমের আন্দোলনে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
তারা ছিলেন তখন তরুন ছাত্রনেতা। তারা মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সহ্রাওয়ারদীর ভক্ত ও অনুরক্ত হিসেবে পাকিস্তান আন্দলেন সক্রিয় ছিলেন। গোটা বংগদেশ পাকিস্তানের অন্তুরভুক্ত না হওয়ায় এবং কংগ্রেসের দাবী মেনে নিয়ে ব্রিটিশ শাসকরা পশ্চিম বঙ্গকে পূর্ব বঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতে শামিল করার ফলে পূর্ব বংগে হোসেন শহীদ সহ্রাওয়ারদীর নেতৃত্ব কায়েম হতে পারেনি।
অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগে দুইটি গ্রুপ ছিল। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারদী ও জনাব আবুল হাশিম এবং অন্য গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মাওলানা আকরাম খান, খাজা নাজিমুদ্দিন ও জনাব নুরুল আমীন। বঙ্গদেশ বিভক্ত না হলে হয়তো জনাব হোসেন শহীদ সহ্রাওয়ারদী পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতেন। পশ্চিম বঙ্গ আলাদা হবার ফলে পূর্ব বংগে খাজা নাজিমুদ্দিন গ্রুপের হাতেই ক্ষমতা আসে।
শেখ মুজিব এবং জনাব তাজউদ্দীন সহ্রাওয়ারদী গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীন নাজিমুদ্দিন গ্রুপের প্রতি বিরূপ ছিলেন। সহ্রাওয়ারদী সাহেব কোলকাতায়ই রয়ে গেলেন বলে তারা নেতৃত্বহীন অবস্থায় পরে গেলেন। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এসে এ গ্রুপের নেতৃত্বের অভাব পূরণ করেন এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে মুসলিম লীগের বিকল্প দল গঠন করেন। এভাবে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ দ্বারাই সরকার বিরোধী দল গঠিত হয়। ( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )
সরকারের ভ্রান্ত নীতি
পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও কর্মী বাহিনী সরকারী এবং বিরোধী দলে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম লীগ সরকার যদি ইসলামী আদর্শের প্রতি নিষ্ঠার পরিচয় দিতেন, মুসলিম জাতীওতাকে শুধু শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার না করতেন, গনতান্ত্রিক নীতি মেনে চলতেন এবং অর্থনৈতিক ময়দানে ইনসাফের পরিচয় দিতেন তাহলে জাতিকে যে ধরনের সংকটের মোকাবেলা করতে হয়েছে তা সৃষ্টি হতো না। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার সকল ক্ষেত্রেই ভ্রান্ত নীতি অবলম্বন করে দেশকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেন।
রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে
পাকিস্তানের মোট জনসংখার অধিকাংশ পূর্ব বঙ্গের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে অস্বীকার করা এবং বাংলা ভাষাভাষীদের উপরে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার ভ্রান্ত নীতিই সর্বপ্রথম বিভেদের বীজ বপন করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষীরা বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষার দাবী তুলেনি। তারা উর্দু এবং বাংলা উভয় ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার দাবী জানিয়েছিল।
এই দাবী জানাবার আগেই জনসংখ্যার বিচারে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা সরকারের দায়িত্ব ছিল। অথচ দাবী জানানোর পর এটাকে ‘প্রাদেশীকতা’ বলে গালি দিয়ে সরকার সংগত কারনেই বাংলাভাষা ভাষীদের আস্থা হারালেন। ভাষার দাবীটিকে সরকার এমন রাষ্ট্র বিরোধী মনে করলেন যে, গুলী করে ভাষা আন্দোলনকে দাবিয়ে দিতে চাইলেন। এ ভ্রান্ত সিদ্ধান্তই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার জন্ম দেয়।
গণতন্ত্রের প্রশ্নে
গনতান্ত্রিক পন্থায় পাকিস্তান কায়েম হওয়া সত্ত্বেও সরকার অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে টিকে থাকার ষড়যন্ত্র করলেন। শাসনতন্ত্র রচনায় গড়িমসি করে নির্বাচন বিলম্বিত করতে থাকলেন। ১৯৫৪ সালে পূর্বাঞ্চলে প্রাদেশিক নির্বাচনে সরকারী মুসলিম লীগ দলের ভরাডুবির পর কেন্দ্রে ষড়যন্ত্র আরও গভীর হয়। পরিনামে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হয়।
আইয়ুব খান গণতন্ত্র হত্যা করার এক অভিনব পন্থা আবিস্কার করলেন। মৌলিক গণতন্ত্রের নামে জনগণকে সরকার গঠনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হল। কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত থাকায় এবং আসল ক্ষমতা আইয়ুব খানের হাতে কেন্দ্রীভুত থাকায় পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ফলে, আইয়ুব বিরোধী গনতান্ত্রিক আন্দোলন আরও জোরদার হয় এবং এর পরিনামে আইয়ুব খানের পতন ঘটে। আইয়ুব খানের দশ বছরের শাসনকালে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব দ্রুত বেড়ে যায়।
অর্থনৈতিক ময়দানে
শাসন- ক্ষমতায় জনগনের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এবং ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারী ভুমিকার দরুন শিল্প এবং বাণিজ্য নীতি প্রনয়নে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সুবিচার হওয়া স্বাভাবিক ছিল না। মন্ত্রী সভায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে গনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে সুবিধাবাদীদেরই নেয়া হত। এর ফলে অর্থনৈতিক ময়দানে পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হতেন। এভাবে গনতান্ত্রিক সরকারের অভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অর্থনৈতিক দিক থেকেও আস্থা হারাতে থাকে।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

ভুট্টো- ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্র
উপরোক্ত কারনসমূহ স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের পটভূমি রচনা করলেও ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের গড়িমসি এবং অবশেষে দমনমূলক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণই এ আন্দোলনের জন্ম দেয়। নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমি বার বার সংবাদ পত্রে বিবৃতি দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার আহবান জানিয়েছি। জেনারেল ইয়াহিয়া ভুট্টোর দাবী মেনে নিয়ে ১ লা মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য পার্লামেন্ট অধিবেশন মুলতবী করায় চরম রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়।
১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকায় ইয়াহিয়া- মুজিব সংলাপে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ নেতা সাইয়েদ নজরুল ইসলাম আমার মহল্লায় তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করতেন। ছাত্র জীবনে বন্ধু হিসেবে তাঁর সাথে যে ঘনিষ্ঠতা ছিল এর সুযোগে তাঁর কাছ থেকে সংলাপের যেটুকু রিপোর্ট পেতাম, তাতে আমার এ ধারনাই হয়েছে যে, সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার জন্য ভুট্টোই প্রধানত দায়ী এবং ইয়াহিয়া খান দ্বিতীয় নম্বর দোষী।
নির্বাচনের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে আওয়ামী লীগের হাতেই কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব অর্পিত হত। সে অবস্থায় পরিস্থিতির চিত্র ভিন্নরূপ হতো। আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত থাকায় রাজনৈতিক সমস্যা অবশ্যই দেখা দিতো। কিন্তু ৭১- এ যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হল তা থেকে অবশ্যই রক্ষা পাওয়া যেতো। শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্টের মাধ্যমেই হয়তো এক সময় দেশ বিভক্ত হবার প্রয়োজন হয়ে পড়তো। ঐ অবস্থায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন পড়তো না।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

 

 

 

 

 

 


স্বাধীনতা আন্দোলনে কার কী ভূমিকা
স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলন
আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ভারতে আশ্রয় নিলেন। অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজতান্ত্রিক দলের অধিকাংশ নেতাই তাই করলেন। পাক সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে এবং অন্যান্য স্থানে হিন্দু বসতীর উপরও আক্রমন করায় তাঁরাও দলে দলে ভারতে পাড়ি জমালেন। পাক সেনাবাহিনীর ভ্রান্ত নীতির ফলে দেশের গোটা হিন্দু সম্প্রদায় পাকিস্তান বিরোধী হয়ে গেলো। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং অধিকাংশ সমাজতন্ত্রী দল পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার জন্যে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হল।
মেহেরপুর জেলার মফস্বলে ( যে স্থানের বর্তমান নাম মুজিবনগর ) আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার কায়েম করার পর স্বাধীনতা আন্দোলন যে রূপ পরিগ্রহ করলো, তা কোন বিদেশী সরকারের সাহায্য ছাড়া চলা সম্ভব ছিল না। তাই কোলকাতা থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত হয়।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )
বামপন্থীদের ভূমিকা
রুশপন্থী হউক আর চীন পন্থী হউক কমিউনিস্ট এবং তথাকথিত বামপন্থীরা কোন দিনই গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। গনতান্ত্রিক পন্থায় কমিউনিজম কোন দেশেই কায়েম হয়নি এবং কোন কমিউনিস্ট দেশেই গণতন্ত্র নেই। তাই জনগণকে ধোঁকা দেবার জন্য গণতন্ত্রের এ দুশমনেরা সমাজতন্ত্রের শ্লোগানই দেয়। কমিউনিজমের নাম নিতে সাহস পায়না। বিশেষ করে মুসলমানদের নিকট কমিউনিস্টরা কখনোই গ্রহনযোগ্য নয়।
আযাদী আন্দোলনের সময় এরা ভারত বিভাগের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিল এবং পাকিস্তানের পক্ষে ক্ষতিকর প্রতিটি ব্যাপারে এরা উৎসাহের সাথে কাজ করেছে। ইয়াহিয়া- মুজিব আলোচনা ব্যর্থ করার জন্য এরা উঠেপড়ে লাগে। এরা ভয় পাচ্ছিলো যদি জনগনের সরকার কায়েম হয় তাহলে এদের কোন সুযোগ থাকবে না। এরা নির্বাচনে কোন পাত্তাই পায়না। এদের দুটি দল তো নির্বাচন থেকে পালিয়েই যায়। মস্কোপন্থী ন্যাপ দু’একটি আসন ছাড়া সর্বত্র জামানত পর্যন্ত হারিয়েছে এবং ৮-৯ টি দলের মধ্যে এরা সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছে। নির্বাচনে যারা জয়লাভ করলো তারা যখন রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য চেষ্টা করছিলো তখন গণতন্ত্রের এ দুশমনেরা তা ব্যর্থ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করলো এর পরিণাম আজ যখন বাংলার মানুষ কঠিন বিপর্যয়ের সম্মুখীন তখন এরাই ঘলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। অথচ এদের নিকট দেশের কোন সমস্যারই সমাধান নেই। বিদেশী কোন রাষ্ট্রের লেজুড় বানিয়ে দেশকে একনায়কত্তের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা ছাড়া এদের আর কোন পথই বা জানা আছে ? রুশপন্থী এবং চীনপন্থী পরিচয় কি বিদেশী হবার প্রমান নয় ?
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

ভারতের ভূমিকা
পাকিস্তানের চির দুশমন ভারতের সম্প্রসারনবাদী কংগ্রেস সরকার এই মহাসুযোগ গ্রহন করলো। প্রবাসী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত করা হল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের গেরিলা ট্রেনিং দেয়া, তাঁদেরকে অস্ত্র এবং গ্রেনেড দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানো, রেডিওযোগে প্রবাসী সরকারের বক্তব্য বাংলাদেশের ভেতরে প্রচার করা ইত্যাদি সবই ভারত সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ ও সহযোগিতায় চলতে থাকলো। রুশ সরকারও এ বিষয়ে ভারতের সাথে এক সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং বহু দেশ সফর করে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন যোগানোর চেষ্টা করেন। নিঃসন্দেহে এ সবই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিনত করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ভারত সরকার তাঁর স্বার্থেই এ কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছে বলে সবাই স্বীকার করতে বাধ্য।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

ভারত বিরোধীদের পেরেশানী
পাকিস্তান আন্দোলনের সময় থেকে যারা ভারতীয় কংগ্রেসের আচরন লক্ষ্য করে এসেছে, পাকিস্তান কায়েম হবার পর ভারতের নেহেরু সরকার হায়দ্রাবাদ এবং কাশ্মীর নিয়ে যে হিংস্র খেলা দেখিয়েছেন, মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমিকে পঙ্গু করার জন্য যতরকম প্রচেষ্টা ভারতের পক্ষ থেকে হয়েছে, পূর্ব বাংলার সীমান্ত নিয়ে ভারত বার বার যে ধোঁকাবাজি করেছে, সর্বোপরি ফারাক্কা বাধ দিয়ে গংগার পানি আটকে রেখে উত্তরবঙ্গকে মরুভূমি বানাবার যে ব্যবস্থা করেছে, তাতে এদেশের কোন সচেতন মুসলিমের পক্ষে ভারত সরকারকে এদেশের বন্ধু মনে করা কিছুতেই সম্ভব ছিল না।
যেসব রাজনৈতিক দল এবং নেতা ভারতের আধিপত্যবাদী মনোভাবের দরুন আতংকগ্রস্থ ছিল, তারা মহাসংকটে পরে গেলো। তারা সংগত কারনেই আশংকা করলো যে, বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সাহায্য করে ভারত একদিকে মুসলমানদের উপর “ভারত মাতাকে” বিভক্ত করার প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে, কোলকাতার এককালের অর্থনৈতিক পশ্চাৎভূমি বাংলাদেশ অঞ্চলকে পুনরায় হাতের মুঠোয় আনার মহাসুযোগ গ্রহন করেছে। এ অবস্থায় ভারতের নেতৃত্বে ও সাহায্যে বাংলাদেশ কায়েম হলে ভারতের আধিপত্য থেকে আত্মরক্ষার কোন উপায়ই হয়তো থাকবে না। বাংলাদেশের চারিদিকে ভারতের যে অবস্থান তাতে এ আশংকাই স্বাভাবিক ছিল।
বিশেষ করে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর যে হিংস্র আচরন অব্যাহতভাবে চলছিলো, তাতে প্রত্যেক সচেতন মুসলিমের অন্তরেই পেরেশানী সৃষ্টি হলো। ভারতের সম্প্রসারনবাদী মনোভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কারো পক্ষে আতংকগ্রস্ত না হয়ে উপায় ছিল না।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

ইসলামপন্থীদের সংকট
যারা মুসলিম জাতীওতায় বিশ্বাসী ছিল এবং যারা চেয়েছিল যে, দেশে আল্লাহর আইন ও রাসুলের প্রদর্শিত সমাজব্যবস্থা চালু হোক, তারা আরও বড় সংকটের সম্মুখীন হল। তারা তো স্বাভাবিক কারনেই ভারতের ব্রাহ্মন্যবাদী চক্রান্তের বিরোধী ছিল। তদুপরি স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনকারীদের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রী চেহারা তাঁদেরকে চরমভাবে আতংকিত করে তুললো। তারা মনে করলো যে, ইসলামের নামে পাকিস্তান কায়েম হওয়া সত্ত্বেও যখন ইসলাম বিজয়ী হতে পারলো না, তখন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও সমাজতন্ত্রীরা যদি ভারতের সাহায্যে কোন রাষ্ট্র কায়েম করতে পারে, তাহলে সেখানে ইসলামের বিজয় কী করে সম্ভব হবে?
ভারতে মুসলমানদের যে দুর্দশা হচ্ছে, তাতে ভারতের সাহায্যে বাংলাদেশ কায়েম হলে এখানেও কোন দুরবস্থা নেমে আসে, সে আশংকাও তাঁদের মনে কম ছিল না।
স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ যদি শুধু রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রশ্ন তুলতেন, ধরমনিরপেক্ষতবাদ ও সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা যদি তারা না হতেন এবং ভারতের প্রত্যক্ষ সাহায্য ছাড়া যদি আন্দোলন পরিচালনা করতে সক্ষম হতেন, তাহলে ইসলামপন্থীদের পক্ষে ঐ আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা খুবই স্বাভাবিক ও সহজ হতো।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )
ভারত বিরোধী এবং ইসলামপন্থীদের ভূমিকা
ভারত বিরোধী এবং ইসলামপন্থীরা উভয় সংকতে পড়ে গেলো। যদিও তারা ইয়াহিয়া সরকারের সন্ত্রাসবাদী দমননীতিকে দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর মনে করতেন, তবু এর প্রকাশ্য বিরোধিতা করার কোন সাধ্য তাঁদের ছিল না। বিরোধিতা করতে হলে তাঁদের নেতৃস্থানীয়দেরকেও অন্যদের মতো ভারতে চলে যেতে হতো--- যা তাঁদের পক্ষে চিন্তা করাও অসম্ভব ছিল।
তারা একদিকে দেখতে পেলো যে, মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা আক্রমন করে ইয়াহিয়া সরকারকে বিব্রত করার জন্য কোন গ্রামে রাতে আশ্রয় নিয়ে কোন পুল বা থানায় বোমা ফেলেছে, আর সকালে পাকবাহিনী গিয়ে ঐ গ্রামটিই জ্বালিয়ে দিয়েছে। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা কোন বাড়িতে উঠলে পরদিন ঐ বাড়িতেই সেনাবাহিনীর হামলা হয়ে যায়। এভাবে জনগন এক চরম অসহায় অবস্থায় পড়ে গেলো।
ভারতবিরোধী এবং ইসলামপন্থীরা শান্তি কমিটি কায়েম করে সামরিক সরকার ও অসহায় জনগনের মধ্যে যোগসূত্র কায়েম করার চেষ্টা করলেন, যাতে জনগণকে রক্ষা করা যায় এবং সামরিক সরকারকে যুলুম করা থেকে যথাসাধ্য ফিরিয়ে রাখা যায়। শান্তি কমিটির পক্ষ থেকে সামরিক শাসকদেরকে তাঁদের ভ্রান্ত নীতি অন্যায় বাড়াবাড়ি থেকে ফিরাবার যথেষ্ট চেষ্টা করা হয়েছে।
একথা ঠিক যে, শান্তি কমিটিতে যারা ছিলেন, তাঁদের সবার চারিত্রিক মান এক ছিল না। তাঁদের মধ্যে এমন লোকও ছিল, যারা সুযোগ মতো অন্যায়ভাবে বিভিন্ন স্বার্থ আদায় করেছে।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা
ইসলামের নামে পাকিস্তান কায়েম হলেও পাকিস্তানের কোন সরকারই ইসলামের ভিত্তিতে দেশকে গড়ে তুলবার চেষ্টা করেনি। জামায়াতে ইসলামী যেহেতু ইসলামকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে একটি বিজ্ঞান সম্মত কর্মসূচী অনুযায়ী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল, সেহেতু কোন সরকারই জামায়াতকে সুনজরে দেখেনি।
তদুপরি ইসলামের নীতি অনুযায়ী গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু করার জন্য জামায়াতে ইসলামী প্রতিটি গনতান্ত্রিক আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে এসেছে। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের সামরিক আইন তুলে নেবার পর আইয়ুবের তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে সর্বদলীয় গনতান্ত্রিক আন্দোলন চলেছিল, তাতে জামায়াত কোন দলের পেছনে ছিল না।
এভাবেই জামায়াতে ইসলামী আইন এবং গনতান্ত্রিক পদ্ধতির শাসনের জন্য নিষ্ঠার সাথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলো। ১৯৬২ সাল থেকে ৬৯ সাল পর্যন্ত আইয়ুব আমলের ৮ বছরের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া আর কোন দলকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়নি। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারীতে জামায়াতকে বেআইনি ঘোষণা করে ৯ মাস পর্যন্ত ৬০ জন নেতাকে বিনা বিচারে জেলে বন্দী করে রাখা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রীম কোর্টের রায়ের ফলে সরকারের ঐ বেআইনি ঘোষণাটি বাতিল হয়ে যায়।
জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস ইসলামী আদর্শ এবং গনতান্ত্রিক পদ্ধতির পক্ষে একনিষ্ঠ ও বলিষ্ঠ সংগ্রামেরই গৌরবময় ইতিহাস। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির ময়দানে যে ভূমিকা পালন করছে, তা সবার সামনেই আছে। জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা পাকিস্তান আমলে যেমন স্বীকৃত ছিল, তেমনি বর্তমানেও সর্বমহলে প্রশংসিত।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )


৭১- এ জামায়াতের ভূমিকা
জামায়াতে ইসলামীর অতীত এবং বর্তমান ভূমিকা থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, আদর্শ নীতির প্রশ্নে জামায়াত আপোষহীন। দুনিয়ার কোন স্বার্থে জামায়াত কখনো আদর্শ বা নীতি সামান্যও বিসর্জন দেয়নি। এটুকু মূলকথা যারা উপলব্ধি করে, তাঁদের পক্ষে ৭১- এ জামায়াতের ভূমিকা বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।
প্রথমতঃ আদর্শগত কারনেই জামায়াতের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষমতবাদ ও সমাজতন্ত্রের ধারক এবং বাহকদের সহযোগী হওয়া সম্ভব ছিল না। যারা ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে সচেতনভাবে বিশ্বাস করে, তারা এই দুইটি মতবাদকে তাঁদের ঈমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী মনে করতে বাধ্য। অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেস দলের আদর্শ ছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। জামায়াতে ইসলামী তখন থেকেই এ মতবাদের অসারতা বলিষ্ঠভাবে যুক্তি দিয়ে প্রমান করেছে। আর সমাজতন্ত্রের ভিত্তিই হল ধর্মনিরপেক্ষতা।
দ্বিতীয়তঃ পাকিস্তান সরকারের প্রতি ভারত সরকারের অতীত আচরন থেকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীকে এদেশের এবং মুসলিম জনগনের বন্ধু মনে করাও কঠিন ছিল। ভারতের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে সংগত কারনেই তাঁদের যে আধিপত্য সৃষ্টি হবে এর পরিণাম মঙ্গলজনক হতে পারে না বলেই জামায়াতের প্রবল আশংকা ছিল।
তৃতীয়তঃ জামায়াত একথা বিশ্বাস করতো যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশী হওয়ার কারনে গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হলে গোটা পাকিস্তানে এ অঞ্চলের প্রাধান্য সৃষ্টি হওয়া সম্ভব হবে। তাই জনগনের হাতে ক্ষমতা বহাল করার আন্দোলনের মাধ্যমেই জামায়াত এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার অর্জন করতে চেয়েছিল।
চতুর্থতঃ জামায়াত বিশ্বাস করতো যে, প্রতিবেশী সম্প্রসারনবাদী দেশটির বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচতে হলে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্রভুক্ত থাকাই সুবিধাজনক। আলাদা হয়ে গেলে ভারত সরকারের আধিপত্য রোধ করা পূর্বাঞ্চলের একার পক্ষে বেশী কঠিন হবে। মুসলিম বিশ্ব থেকে ভৌগলিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ভারত দ্বারা বেষ্টিত অবস্থায় এ অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রশ্নটি জামায়াতের নিকট উদ্বেগের বিষয় ছিল।
পঞ্চমতঃ পাকিস্তান সরকারের ভ্রান্ত অর্থনৈতিক পলিসির কারনে এ অঞ্চলে স্থানীয় পূঁজির বিকাশ আশানুরূপ হতে পারেনি। এ অবস্থায় এদেশটি ভারতের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক খপ্পরে পড়লে আমরা অধিকতর শোষণ এবং বঞ্চনার শিকারে পরিনত হবো বলে জামায়াত আশংকা পোষণ করতো।
জামায়াত একথা মনে করতো যে, বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে ভারতের সাথে সমমর্যাদায় লেনদেন সম্ভব হবে না। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যেসব জিনিস এখানে আমদানী করা হতো, আলাদা হবার পর সেসব ভারত থেকে নিতে হবে। কিন্তু এর বদলে ভারত আমাদের জিনিস সমপরিমানে নিতে পারবে না কারন রফতানির ক্ষেত্রে ভারত আমাদের প্রতিযোগী দেশ হওয়ায় আমরা যা রফতানি করতে পারি ভারতের তাঁর প্রয়োজন নেই। ফলে আমরা অসম বাণিজ্যের সমস্যায় পড়বো এবং এদেশ কার্যত ভারতের বাজারে পরিনত হবে।
ষষ্ঠতঃ জামায়াত পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ কায়েমের মাধ্যমেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সকল বৈষম্যের অবসান করতে চেয়েছিল। জামায়াতের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর আইন এবং সৎ লোকের শাসন কায়েম হলে বে- ইনসাফী, যুলুম এবং বৈষম্যের অবসান ঘটবে এবং অসহায় বঞ্চিত মানুষের সত্যিকার মুক্তি ঘটবে।
এসব কারনে জামায়াতে ইসলামী তখন আলাদা হবার পক্ষে ছিল না। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর থেকে এদেশে যারাই জামায়াতের সাথে জড়িত ছিল, তাঁর বাস্তব সত্য হিসেবে বাংলাদেশকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই মেনে নিয়েছে। আজ পর্যন্ত জামায়াতের লোকেরা এমন কোন আন্দোলন বা প্রচেষ্টার সাথে শরীক হয়নি যা বাংলাদেশের আনুগত্যের সামান্যতম বিরোধী বলেও বিবেচিত হতে পারে। বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তারা বাস্তব কারনেই যোগ্য ভূমিকা পালন করছে। তারা কোন প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় পাবে না। তাই এদেশকে বাঁচাবার জন্য জীবন দেয়া ছাড়া তাঁদের কোন বিকল্প পথ নেই।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

 


রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দেশপ্রেম
জন্মভুমিরূপ আল্লাহর মহাদানের শুকরিয়াই হলো দেশপ্রেম
জন্মভূমি সত্যিই প্রিয়। মায়ের সাথে এর তুলনা চলে। তাই জন্মভুমিকে মাতৃভূমিও বলা হয়।
কিন্তু দুই কারনে আমি মাতৃভূমি বলি না। এক কারন হলো—এ উপমহাদেশে মাতৃভূমিকে দেবী মনে করে পূজা করা হয়। দ্বিতীয় কারন--- জন্মভূমি কেবলমাত্র মাতৃভূমিই নয়, পিতৃভূমিও বটে। তাই জন্মভূমি বলাই বেশী সঠিক। তা ছাড়া কারো মায়ের জন্ম অন্য কোন দেশে হলে তাঁর নিজের জন্মের দেশটাকে মায়ের দেশ বলা সঠিক হয় না। মাতৃভাষা কথাটি অবশ্যই সঠিক। কারন শিশু পহেলা মায়ের কাছ থেকেই কথা শেখে এবং মায়ের সাথে বেশী সময় থাকার ফলে মায়ের মুখের ভাষা ও উচ্চারণই শেখে। এ ব্যাপারে পিতার অবদান কম বলেই পিতৃভাষা কখনো বলা হয়না। জন্মভুমিকে মায়ের সাথে তুলনা করার কারন কয়েকটিঃ
১। মায়ের প্রতি ভালোবাসা যেমন সহজাত তেমনি জন্মভুমির প্রতি ভালোবাসাও মানুষের প্রকৃতিগত। শৈশব থেকেই শিশু যেমন মাকেই সবচেয়ে বেশী কাছে পায় এবং মায়ের স্নেহ- মমতায় বড় হতে থাকে, তেমনি জন্মভুমির আলো –বাতাস, গাছ-পালা, পশু- পাখী, খাল-বিল-পুকুর, মাছ-তরকারী, মাঠের ফসল ইত্যাদির সাথে যে ঘনিষ্ঠ পরিচয়, তাতে জন্মভূমির সাথে দেহ মনের এক স্বাভাবিক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিদেশে যারা যায়নি তারা এটা অনুভব করে না। মা মারা গেলে যেমনি তাঁর অভাবটা বুঝে আসে, তেমনি কিছুদিন বিদেশে থাকলে দেশের প্রতি ভালোবাসার সুতোর টান পড়ে।
বিলাতে ৭৩ সাল থেকে ৬ বছর থাকাকালে মনে হতো, সে দেশের আকাশ- বাতাস, চন্দ্র- সূর্য, গাছ- পালা সবই অপরিচিত। শীতকালে গরম ঘরে বসে কাঁচের জানালা দিয়ে বরফ পড়া দেখতে এতো চমৎকার লাগতো যে, অনেক্ষন চেয়ে থাকতে বাধ্য হতাম। সে দেশে শীতের মওসুমেই বৃষ্টি বেশী হয়। টিপটিপ বৃষ্টি না হয় বরফ পড়া চলতেই থাকে। আমার জন্মভূমির সকালের সুন্দর সূর্য সে দেশে কোথাও নেই। আমার দেশে শীতকালেও চিরসবুজ গাছ-পালার অভাব হয়না। সে দেশে গাছ ভর্তি পার্কে শীতকালে প্রথম যেয়ে আমার মনে হল যে গাছগুলো শুধু মরাই নয়, পুড়ে কালো হয়ে গেছে। এসব গাছে আবার পাতা গজাতে পারে বিশ্বাস করাই কঠিন।
২। ছোট বয়স থেকে যে ধরনের খাবার খেয়ে অভ্যাস হয়, সে খাবারের আকর্ষণ যে এতো তীব্র তা দীর্ঘ দিন বিদেশে না থাকলে টের পাওয়া যায়না। মাতৃভাষার মতই মায়ের হাতের খাবার মানুষের সত্তার অংশে পরিনত হয়। মাঝে মাঝে যারা অল্প দিনের জন্য বিদেশে যায়, তাঁদের নিকট ভিন্নধরনের খাবার বৈচিত্র্যের স্বাদ দান করে--- একথা ঠিক। কিন্তু দীর্ঘদিন জন্মভূমির অভ্যস্ত খাবার না পেলে যে কেমন খারাপ লাগে এর কোন অভিজ্ঞতা যাদের হয়নি তারা এ সমস্যাটি বুঝবে না। পুষ্টিকর, মজাদার এবং দামী খাবার পেলে আবার দেশের খাবারের কথা মনে পড়বে কেন – এমন প্রশ্ন অনভিজ্ঞ লোকই করতে পারে।
আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা হল, বহু রকমের মজাদার খাবারের টেবিলে খাওয়ার সময় চিংড়ী এবং পুই শাকের চচ্চড়ি, কেসকী মাছের ভুনা, কৈ মাছ- পালং শাকের চচ্চড়ি, টাকি মাছ এবং কচি লাউয়ের সালুন, ভাজা পুঁটি মাছ ইত্যাদির কথা মনে উঠলে ওসব ভালো খাবারও মজা করে খেতে পারতাম না। খাবার পর মনে হতো যে খাবার কর্তব্য পালন করলাম বটে, তৃপ্তি পেলাম না।
৩। মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাদটাও যে কতো তৃপ্তিদায়ক সে অভিজ্ঞতাও দেশে থাকাকালে টের পাইনি। বিলাতে বাংলায় কথা বলা লোকের অভাব ছিল না। আমেরিকায় এক ইসলামী সম্মেলন উপলক্ষে ৭৩ সালের আগস্টে যেতে হল। “মুসলিম স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশন ( M.S.A ) নর্থ আমেরিকা”- এর উদ্যোগে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন দিনের সম্মেলনের পর নিউইয়র্ক থেকে লস এঞ্জেলস পর্যন্ত এম, এস, এ--- এর যতো শাখা আছে সেখানে আমাকে এক সপ্তাহ সফর করাল। কোন দিন দুই জায়গায় কোন দিন তিন যায়গায় বক্তৃতা করতে হল। এ ৭ দিনের মধ্যে বাংলায় কথা বলার কোন সুযোগ পেলাম না। লন্ডন ফিরে এসে আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে চাপলাম। কামরার এক কোনায় বসলাম। দূরে আরেক কোনায় এক লোককে এদেশী মনে হল। কাছে যেয়ে বসলাম। ভদ্রলোক বই পড়ছিলেন। লক্ষ্য করে দেখলাম বাংলা বই। নিশ্চিত হলাম যে বাংলায় কথা বলা যাবে। বার বার তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলাম—যাতে কথা বলার সুযোগ পাই। দশ দিনের ভুখা। আমি যে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি তা টের পেয়ে মুখ তুলে চাইলেন আমার দিকে। আলাপ শুরু করলাম। তিনি কোন স্টেশনে নামবেন, আমি কোথা থেকে এলাম, কার বাড়ি কোথায়, লন্ডনে কে কোন যায়গায় থাকি ইত্যাদি আলাপ চললো। মনে হল ফাঁপা পেট যেন হালকা হচ্ছে। ভদ্রলোকের বাড়ি কোলকাতা এবং তিনি হিন্দু। খুব আন্তরিকতার সাথে বাংলাদেশ নিয়েও কিছু কোথা হল।
বাংলাদেশের আবহাওয়া, খাবার জিনিস এবং মাতৃভাষা নিয়ে এসব ঘটনা একথার প্রমান হিসেবেই পেশ করলাম যে, জন্মভূমির ভালোবাসা সত্যিই সহজাত। এ ভালোবাসা রচনার জন্য কোন কৃত্রিম কর্মসূচী রচনার দরকার হয় না। অবচেতনভাবেই এ ভালোবাসা জন্মে।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, রাজনৈতিক ভাষায় যাকে “দেশপ্রেম” বলে তাও কি সহজাত ব্যাপার ? আমার হিসেবে দেশপ্রেমও নিঃসন্দেহে সহজাত। আমার জন্মভুমিতেই রাজনীতি চর্চা করা আমার জন্য স্বাভাবিক। অন্য দেশে আমার রাজনীতি করার সুযোগ কোথায় ? বিলাতে বাংলাদেশীরা যেটুকু রাজনীতি করে তা তাঁদের জন্মভূমিকে কেন্দ্র করেই। তাই এদেশের প্রধান সব কয়টি দলের শাখাই সেখানে রয়েছে।
মানুষ প্রধানত নৈতিক জীব। কিন্তু মানুষ রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবও। আমার রাজনীতি চর্চা নিয়ে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে লন্ডনে আমার আলোচনা হয়। আমার রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনাকালে তিনি সেখানে ইংরেজীর অধ্যাপক ছিলেন। ডক্টরেট করতে এসে এখানে সেটেল্ড করে গেছেন। নিজের বাড়িতেই থাকেন। এটা ১৯৭৬ সালের কথা। সাড়ে চার বছর পরিবার থেকে বিছিন্ন জীবন যাপন করার পর ৭৬ –এর মে মাসে আমার স্ত্রী, ছোট ছেলে দুটোকে নিয়ে লন্ডনে পৌঁছেছে। বড় চার ছেলে আমার ছোট ভাইয়ের কাছে ম্যানচেস্টারে আশ্রয় নিয়েছে।
ঐ বন্ধুটি আমাকে পরামর্শ দিলেন যে, স্ত্রী- পুত্র সবাই যখন চলে আসতে পেরেছে, তখন এখানে স্থায়ীভাবে বাস করার পরিকল্পনাই করুন। ওরা আপনার নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে। আপনি সহজেই ‘এসাইলাম’ পেয়ে যাবেন। আমি বলাম, আমি তো আমার জন্মভুমি থেকে হিজরত করে আসিনি। দেশে পৌঁছুতে পারলাম না বলে সুযোগের অপেক্ষায় বাধ্য হয়ে বিদেশে পড়ে আছি। তিনি বললেন, যারা বাংলাদেশ বানালো তাঁদের মধ্যে আমার জানা বেশ কিছু লোক দেশের অরাজকতা, আশান্তি এবং নিরাপত্তাহীনতার জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। আপনি উল্টা চিন্তা কেন করছেন, বুঝলাম না।
আমি বললাম, এরই নাম দেশপ্রেম। আমার আল্লাহ আমাকে যে দেশে পয়দা করলেন আমি সে দেশের মায়া ত্যাগ করতে পারি না। আমাকে ঐ দেশে পয়দা করে আল্লাহ ভুল করেছেন বলে আমি মনে করি না। আমি আর কোন দেশকে জন্মভূমির চেয়ে বেশে ভালবাসবো কিভাবে ?
তিনি বললেন, আমি দেশপ্রেমের কথা বলছি না। আপনার এবং আপনার পরবারের কল্যাণের চিন্তা করেই এ পরামর্শ আমি আপনাকে দিয়েছি। আমি বললাম, আমি তো কল্যাণ মনে করতে পারছি না। আমার ছেলেরা ব্রিটিশ পাসপোর্ট পেয়ে গেলেও এদেশকে জন্মভূমি বানাতে পারবে না। আমি তাঁদেরকে জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাই না। আমার পক্ষে যদি দেশে যাবার সুযোগ না হয়, তবু ছেলেদেরকে তাঁদের জন্মভূমিতেই পাঠাতে চাই।
বিলাতেও স্থানীয় এবং অস্থানীয় বিতর্কে কিছু কিছু সংঘর্ষও হচ্ছে। ইংরেজ জাতীওতাবাদীরা এদেশের লোক বলে আমার ছেলেদেরকে স্বীকার করবে না। শুধু পাসপোর্ট সে মর্যাদা দিতে সক্ষম নয়। জন্মভূমি আল্লাহর দান। এ মহাদানের শুকরিয়াই হল দেশপ্রেম।
৭ বছর বাধ্য হয়ে বিদেশে থাকার পর ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসের ১১ তারিখ আমার প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরে আসার পর যে কেমন আনন্দ লেগেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। গ্রহহীন লোক বাড়ি পেলে যেমন খুশী হয়, তাঁর চাইতেও বেশী আনন্দিত হয়েছি। হারানো মহামূল্যবান সম্পদ ফিরে পাবার আনন্দ যে কেমন, তা শুধু তাঁর পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব--- যার জীবনে বাস্তবে এমনটা ঘটে। মনে হয়েছে যে, আমি যেন আমার প্রকৃতিকে ফিরে পেলাম। মাছ শুকনায় পড়ে আবার পানিতে ফিরে গেলে সম্ভবত এমনি প্রশান্তি বোধ করে।
বিদেশে আটকা পড়ে থাকা কালে প্রতি বছরই হজ্জের মৌসুমে মক্কা শরীফে যাওয়ার সৌভাগ্য হতো। বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীলগণের সাথে ঘনিস্ট যোগাযোগ এবং বাংলাদেশী জনগনের সাথে ভাবের আদান- প্রদানের জন্য এটাই একমাত্র পথ ছিল।
দোয়া কবুল হওয়ার স্থানসমূহে বিশেষ করে আরাফাতের ময়দানে দয়াময়ের দরবারে কাতরভাবে দোয়া করার সময়ে আমি ধরনা দিয়ে বলতাম “হে আমার খালিক এবং মালিক তুমি আমার জন্য যে দেশটিকে জন্মভূমি হিসেবে বাছাই করেছো, সে দেশে পৌঁছার পথে যতো বাঁধা আছে টা মেহেরবানী করে দূর করে দাও।” আমার এ দোয়া যে কবুল হয়েছে তা দেশে ফিরে আসার পড়ে বুঝতে পারলাম।
বিদেশে থাকা কালে বহু ইসলামী বিশ্ব সম্মেলনে মেহমান হবার সুযোগ হওয়ায় বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সাথে ঘনিস্ট যোগাযোগের বিরল সৌভাগ্য হল। আমার দেশে চলে আসার পর গত এক বছরে বহু ইসলামী সম্মেলনে দাওয়াত পেয়েও বাংলাদেশী পাসপোর্টের অভাবে যেতে অক্ষম বলে জানাতে বাধ্য হয়েছি। আমার নাগরিকত্ব নিয়ে যে অহেতুক সমস্যা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে, সে কথা জানার পর কয়েকটি সম্মেলনে বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আমার কাছে দাবী জানিয়েছে। এ সযোগে ইসলামী আন্দোলনের কয়েকজন নেতা ঐ সব সম্মেলনে মেহমান হিসেবে গিয়েছেন।
বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে কোন কারনে আসলে আমার সাথে দেখা করে পহেলাই প্রশ্ন করেন যে, আপনাকে আমাদের দেশে আর দেখতে পাইনা কেন ? জবাবে বলি, “বিদেশে থাকাকালে গিয়েছি। কিন্তু এখন সুযোগ পাচ্ছি না। ৭ বছর আমাকে দেশে আসতে দেয়নি। এখন আর যেতে দেয় না।” নাগরিকত্বের সমস্যার কথা জেনে এবং আমার ঐ জবাব শুনে তারা খুব হাসেন। আমি তাঁদেরকে বলি যে, দোয়া করুন, যাতে বাইরে যাবার বাঁধা দূর হয়ে যায়। তারা জানতে চান যে, আমার বিদেশে যাবার আগ্রহ আছে কি- না ? আমি হেসে বলি, “আল্লাহ পাক আমার জন্মভূমিতে তাঁর দ্বীনের কাজ করার যে সযোগ দিয়েছেন, এতেই আমি তুষ্ট। বিদেশে যাবার সুযোগ পাচ্ছি না বলে আমার সামান্যতমও আফসোস নেই। তাছাড়া বিদেশে থাকা কালে দেশে আসবার ব্যবস্থা করবার জন্যই দোয়া করেছি। মাঝে মাঝে আবার বিদেশে যাবার সুযোগ দেবার জন্য দোয়া করতে ভুলে গিয়েছিলাম।” এসব কথা শুনে সবাই বেশ কৌতুক বোধ করেন।
( দৈনিক সংগ্রাম, মার্চ- ১৯৯৩ )

যারা বাংলাদেশ আন্দোলনে শরীক হয়নি তারা কি স্বাধীনতা বিরোধী ছিল ?
১৯৭০- এর নির্বাচনের দীর্ঘ অভিযানে শেখ মুজিব প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী জনসভায় জনগণকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, “আমরা ইসলাম বিরোধী নই।” এবং “আমরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে চাইনা।” জনগন তাকে ভোট দিয়েছিলেন তাঁদের অধিকার আদায়ের জন্য। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কোন ম্যান্ডেট তিনি নেননি। নির্বাচনের পরও এ জাতীয় সুস্পষ্ট কোন ঘোষণা তিনি দেননি।
তাই ১৯৭১- এ বাংলাদেশ আন্দোলনে যারা শরীক হয়নি, তারা দেশের স্বাধীনতা বিরোধী ছিল না। ভারতের অধীন হবার ভয় এবং ধরমনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের খপ্পরে পড়ার আশংকাই তাঁদেরকে ঐ আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করেছিলো। তারা তখনো অখন্ড পাকিস্তানের নাগরিকই ছিল। তারা রাষ্ট্র বিরোধী কোন কাজে লিপ্ত ছিল না বা কোণ বিদেশী রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করেনি। নিজ দেশের কল্যাণ চিন্তাই তাঁদেরকে এ ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছিল। ১৬ ই ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা এ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই কাজ করেছে। তাই আইনগতভাবে তাঁদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
নৈতিক বিচারে ব্যক্তিগতভাবে যারা নরহত্যা, লুটতরাজ, ধর্ষণ এবং অন্যান্য অন্যায় করেছে, তারা অবশ্যই নরপশু। যাদের চরিত্র এ জাতের, তারা আজও ঐসব করে বেড়াচ্ছে। পাক সেনাবাহিনীর যারা এ জাতীয় কুকর্মে লিপ্ত হয়েছিলো তাঁরাও ঐ নরপশুদেরই অন্তর্ভুক্ত। যাদের কোন ধর্মবোধ, নৈতিক চেতনা এবং চরিত্র বলে নেই, তারা এক পৃথক শ্রেনী। পাঞ্জাবী হোক আর বাঙ্গালী হোক, এ জাতীয় লোকের আচরন একই হয়।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

রাজনৈতিক মতপার্থক্য আর স্বাধীনতা বিরোধী হওয়া এক কথা নয়
অবিভক্ত ভারত থেকে ইংরেজ বিতাড়নের আন্দোলনে কংগ্রেসের সাথে মুসলিম লীগের মতবিরোধকে কতক নেতা স্বাধীনতার বিরোধী বলে প্রচার করতো। কংগ্রেস হিন্দু- মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবী করতো এবং গোটা ভারতকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু মুসলিম লীগ জানতো যে, কংগ্রেসের স্বাধীনতা আন্দোলনের ফলে ইংরেজদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও মুসলমানদেরকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধীনেই থাকতে হবে। তাই ঐ স্বাধীনতা দ্বারা মুসলমানদের মুক্তি আসবে না। তাই মুসলিম লীগ পৃথকভাবে স্বাধীনতা আন্দোলন চালানো এবং ভারত বিভাগ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পাকিস্তান দাবী করলো। ফলে মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলন একই সংগে ইংরেজ এবং কংগ্রেসের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলো।
কংগ্রেস নেতারা তারস্বরে মুসলিম লীগ নেতাদেরকেই ইংরেজের দালাল ও দেশের স্বাধীনতার দুশমন বলে গালি দিতে লাগলো। কংগ্রেসের পরিকল্পিত স্বাধীনতাকে স্বীকার না করায় মুসলিম লীগকে স্বাধীনতার বিরোধী বলাটা রাজনৈতিক গালী হতে পারে, কিন্তু বাস্তব সত্য হতে পারে না।
ঠিক তেমনি যে পরিস্থিতিতে ভারতের আশ্রয়ে বাংলাদেশ আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিলো, সে পরিবেশে যারা ঐ আন্দোলনকে সত্যিকার স্বাধীনতা আন্দোলন বলে বিশ্বাস করতে পারেনি। তাঁদেরকে স্বাধীনতার দুশমন বলে গালি দেয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যতই প্রয়োজনীয় মনে করা হোক, বাস্তব সত্যের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
বিশেষ করে স্বাধীনতার নামে প্রদত্ত শ্লোগানগুলোর ধরন দেখে ইসলামপন্থীরা ধারনা করতে বাধ্য হয় যে, যারা স্বাধীন বাংলাদেশ বানাতে চায়, তারা এদেশে ইসলামকে টিকতে দেবে না, এমনকি মুসলিম জাতীয়তাবোধ নিয়েও বাঁচতে দেবে না। সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ( মুসলিম জাতীয়তার বিকল্প ) এমন তুফান প্রবাহিত হল যে, মুসলিম চেতনাবোধসম্মন্ন সবাই আতংকিত হতে বাধ্য হল। এমতাবস্থায় যারা ঐ স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারলো না, তাঁদেরকে দেশের দুশমন মনে করা একমাত্র রাজনৈতিক হিংসারই পরিচায়ক। ঐ স্বাধীনতা আন্দোলনের ফলে ভারতের অধীন হবার আশংকা যারা করেছিলো, তাঁদেরকে দেশপ্রেমিক মনে না করা অত্যন্ত অযৌক্তিক।
এ বিষয়ে প্রখ্যাত সাহিত্তিক, চিন্তাবিদ এবং সাংবাদিক মরহুম আবুল মানসুর আহমাদ দৈনিক ইত্তেফাক ও অন্যান্য পত্র- পত্রিকায় বলিষ্ঠ যুক্তিপূর্ণ এতো কিছু লিখে গেছেন যে, যা অন্য কেউ লিখলে হয়তো রাষ্ট্রদ্রোহী বলে শাস্তি পেতে হতো। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারনে পরাজিত পক্ষকে বিজয়ী পক্ষ দেশদ্রোহী হিসেবে চিত্রিত করার চিরাচরিত প্রথা সাময়িকভাবে গুরুত্ব পেলেও স্থায়ীভাবে এধরনের অপবাদ টিকে থাকতে পারে না।
আজ একথা কে অস্বীকার করতে পারে যে, স্বাধীনতা আন্দোলনের দাবীদার কিছু নেতা এবং দলকে দেশের জনগন বর্তমানে ভারতের দালাল বলে সন্দেহ করলেও বাংলাদেশ আন্দোলনে যারা অংশগ্রহন করেনি, সে সব দল এবং নেতাদের সম্পর্কে বর্তমানে এমন সন্দেহ কেউ প্রকাশ করে না যে, এরা অন্য কোন দেশের সহায়তায় এদেশের স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দিতে চায়।
তারা গোটা পাকিস্তানকে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে রক্ষা করা উচিৎ বলে মনে করেছিলো। তাঁদের সে ইচ্ছা পূরণ হয় নি। বাংলাদেশ পৃথক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিনত হয়ে যাবার পর তারা নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে যায় নি। যদি বর্তমান পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে ভৌগলিক দিক দিয়ে ঘনিষ্ঠ হতো, তাহলেও না হয় সন্দেহ করার সম্ভাবনা ছিল যে, তারা হয়তো আবার বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার ষড়যন্ত্র করতে পারে। তাহলে তাঁদের ব্যাপারে আর কোন প্রকার সন্দেহের কারন থাকতে পারে ? বাংলাদেশকে স্বাধীন রাখা এবং এ দেশকে রক্ষা করার লড়াই করার গরজ তাঁদেরই বেশী থাকার কথা। বাংলাদেশের নিরাপত্তার আশংকা একমাত্র ভারতের পক্ষ থেকেই হতে পারে। তাই যারা ভারতকে অকৃত্রিম বন্ধু মনে করে, তারাই হয়তো বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। কিন্তু যারা ভারতের প্রতি অবিশ্বাসের দরুন ৭১ সালে বাংলাদেশকে ভারতের সহায়তায় পৃথক রাষ্ট্র বানাবার পক্ষে ছিল না, তারাই ভারতের বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন দেবে। সুতরাং বাংলাদেশের স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী হওয়ার মানসিক, আদর্শিক এবং ঈমানী প্রেরনা তাঁদেরই, যারা এদেশকে একটি মুসলিম প্রধান দেশ এবং ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়।
পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালীদের সাথে ভাষার ভিত্তিতে যারা বাঙ্গালী জাতিত্বের ঐক্যে বিশ্বাসী, তাঁদের দ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা টিকে থাকার আশা কতোটুকু করা যায় জানি না। কিন্তু একমাত্র মুসলিম জাতীয়তাবোধই যে বাংলাদেশের পৃথক সত্ত্বাকে রক্ষা করতে পারে এ বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। সুতরাং মুসলিম জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিতদের হাতেই বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্ত্বা সবচেয়ে বেশী নিরাপদ।
শেরে বাংলার উদাহরণ
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবই পাকিস্তান আন্দোলনে মূল ভিত্তি ছিল। শেরে বাংলা এ, কে ফযলুল হক সে ঐতিহাসিক দলিলের প্রস্তাবক ছিলেন। অথচ মুসলিম লীগ নেতৃত্বের সাথে এক ব্যাপারে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগ বিরোধী শিবিরের সাথে হাত মেলান এবং পাকিস্তান ইস্যুতে ১৯৪৬ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করেন। পাকিস্তান হয়ে যাবার পর তিনি কোলকাতায় নিজের বাড়িতে সসম্মানে থাকতে পারতেন। তিনি ইচ্ছা করলে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মতো ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হতে পারতেন। কিন্তু যখন পাকিস্তান হয়েই গেলো, তখন তাঁর মতো নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক কিছুতেই নিজের জন্মভূমিতে না এসে পারেননি। পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত থাকা সত্ত্বেও এদেশের জনগন শেরে বাংলাকে পাকিস্তানের বিরোধী মনে করেনি। তাই ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তাঁরই নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগের উপরে এতো বড় বিরাট বিজয় অর্জন করে। অবশ্য রাজনৈতিক প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকার তাকে “রাষ্ট্রদ্রোহী” বলে গালি দিয়ে তাঁর প্রাদেশিক সরকার ভেঙ্গে দেয়। আবার কেন্দ্রীয় সরকারই তাকে গোটা পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বানায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরও নিযুক্ত করে। এভাবেই তাঁর মতো দেশপ্রেমিককেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রদ্রোহী বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।
শহীদ সহ্রাওয়ারদীর উদাহরণ
জনাব সহ্রাওয়ারদী পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম বড় নেতা ছিলেন। কিন্তু শেষ দিকে যখন পূর্ব বঙ্গ এবং পশ্চিম বঙ্গ বিভক্ত হয়, তখন গোটা বঙ্গদেশ এবং আসামকে মিলিয়ে “গ্রেটার বেঙ্গল” গঠন করার উদ্দেশ্যে তিনি শরত বসুর সাথে মিলিত চেষ্টা করেন। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হলে পূর্ব বঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতো না। তিনি পশ্চিম বঙ্গের লোক। পশ্চিম বঙ্গের বিপুল সংখ্যক মুসলমানের স্বার্থ রক্ষা এবং কোলকাতা মহানগরীকে এককভাবে হিন্দুদের হাতে তুলে না দিয়ে বাংলা ও আসামের মুসলমানদের প্রাধান্য রক্ষাই হয়তো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু পড়ে যখন তিনি পূর্ব বঙ্গে আসেন, তখন তাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে পাকিস্তানের দুশমন বলে ঘোষণা করা হয় এবং চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোলকাতা ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। অবশ্য তিনিই পরে পাকিস্তানের উযিরে আযম হবারও সুযোগ লাভ করেন। বলিষ্ঠ ও যোগ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করার প্রয়োজনে দুর্বল নেতারা এ ধরনের রাজনৈতিক গালির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের গালি দ্বারা কোন দেশপ্রেমিক জননেতার জনপ্রিয়তা খতম করা সম্ভব হয় নি।
তাই ৭১ এর ভুমিকাকে কেন্দ্র করে যেসব নেতা এবং দলকে “স্বাধীনতার দুশমন” ও “বাংলাদেশের শত্রু” বলে গালি দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে যতই বিষোদ্গার করা হোক, তাঁদের দেশপ্রেম, আন্তরিকতা এবং জনপ্রিয়তা ম্লান করা সম্ভব হবে না।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

 

 

 


স্বাধীন বাংলাদেশে ৭২ সালের সমস্যা ও সমাধান
বর্তমান সমস্যার কারন
অদ্ভুত জনপ্রিয়তা, একদলীয় একচ্ছত্র ক্ষমতা এবং বিশ্বের নিরঙ্কুশ সমর্থন ও আমেরিকা, রাশিয়া, ভারতের ব্যাপক সাহায্য পাওয়া সত্ত্বেও শেখ মুজিব দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা এবং কোনরকমে খেয়ে পরে বেচে থাকার ব্যবস্থা করতেও ব্যর্থ হলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা হিসেবে নতুন দেশ গড়ার সমস্যা অনেক--- এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু দিন দিন আবস্থা কেন উন্নতির দিকে যাচ্ছে না ? দেশের সম্পদ ব্যাপকভাবে বিদেশে চলে যাচ্ছে। চাউল, কাপড়, মাছ, খাবার তৈল, কেরোসিন, ঔষধ ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম কেবল বেড়েই চলল। অরাজকতা এবং উচ্ছৃঙ্খলতায় দেশে নিরাপত্তা বোধ খতম হয়ে গেলো।
আমাদের বাপ-মা-ভাই-বোন ও বিবি-বাচ্চা- ছোট-বড় সবাই এর ভুক্তভোগী। সরকার ও জনগন সবাই চান যে অবস্থার উন্নতি হোক। কিন্তু শুধু চাইলেই কি তা হয়ে যাবে ? আর এসব সমস্যা নিয়ে যারা হৈ চৈ করে তাঁদেরকে দালাল বলে গালি দিলেই কি এর সমাধান হবে?
সত্যিই যদি আমরা এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি চাই তাহলে বর্তমান অবস্থার মূল কারন তালাশ করতে হবে। রোগের কারন না জানলে সুচিকিৎসা অসম্ভব। যারা এখন দেশ শাসন করছেন তাঁদের মধ্যে ভাল-মন্দ সব ধরনের লোকই হয়তো আছে। কিন্তু আগে থেকে তাঁদের আন্দোলনে কর্মীদেরকে শৃঙ্খলা শিক্ষা দেবার পরিবর্তে উচ্ছৃঙ্খলতা, বেয়াদবী, অশালিনতা এমনকি গুন্ডামী করতে পর্যন্ত উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে দেশে বিক্ষোভ সৃষ্টি করা যেতে পারে, শান্তিপ্রিয় নাগরিকদেরকে ভীতসন্ত্রস্ত করা যেতে পারে, জোর করে ক্ষমতা দখলও সম্ভব, নির্বাচনকে প্রহসনে পরিনত করাও সহজ—কিন্তু এ ধরনের শিক্ষার মাধ্যমে তৈরি লোকদের দ্বারা দেশ শাসন এবং জনসেবা করা করা কিছুতেই সম্ভব নয়।
যে কর্মী বাহিনীকে একসময় বিরোধী দলের সভায় লাঠি ও ইটপাটকেল দিয়ে আক্রমনের প্রেরনা যোগানো হয়েছে আজ তাঁদের হাতে অস্ত্র রয়েছে। সুতরাং সে হারেই অরাজকতা বাড়ছে। এক পক্ষ এ পথে গেলে অপর পক্ষও বাধ্য হয়েই সে পথে যাবে। তাছাড়া “বন্দুকের নল থেকে বিপ্লব” এর নীতিতে যারা বিশ্বাসী এবং “জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো” যাদের কর্মসূচী তারা এধরনের পরিবেশেই এগিয়ে আসার সুযোগ পায়। তাই বর্তমান অরাজক পরিবেশের পরিবর্তন সহজে হবে না।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

সমাধানের উপায়
যদি জনগন শান্তি চায় তাহলে বেসরকারীভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে। আইন ও শৃঙ্খলার দায়িত্বশীলগণ একমাত্র শান্তি রক্ষার জন্য অস্ত্র ব্যবহার করবেন। সরকারী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের সবাইকে অস্ত্রের ভাষায় রাজনীতি করা বন্ধ করতে হবে। এমন রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে যাদের নেতৃবৃন্দ ভদ্র এবং শালীন ভাষায় সমালোচনা করতে সক্ষম। গালিগালাজের পরিবর্তে যারা যুক্তির অস্ত্রে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করবে। এমন কর্মী দল গঠন করতে হবে যারা গুন্ডামীকে ঘৃণা করে, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, শৃঙ্খলাকে ভালোবাসে এবং আইনের শাসন কায়েম করার জন্য বদ্ধপরিকর। বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলো যদি এসব নীতি পালন করতে রাজী না হয় তাহলে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদেরকে দেশ ও জনগনের কল্যাণের খাতিরে শত বিপদের ঝুকি মাথায় নিয়ে হলেও এ ধরনের দল গঠন করতেই হবে। আর না হলে মারামারি কাটাকাটি করে ধ্বংস হতে হবে।
এ পথে দেশকে ধাবিত করতে নিশ্চয়ই সময় লাগবে। যারা এ নীতিতে চলবেন তাঁদের বহু বিপদের মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু জনগন শেষ পর্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে তাঁদের সাথেই মিলবে। জনগন কখনো অরাজক পরিবেশ ভালোবাসে না। দুনিয়ার কোন দেশই উচ্ছৃঙ্খলতার মাধ্যমে উন্নতি করেনি। তাই শৃঙ্খলা বা ধ্বংস জনগন এই দুটি পথের একটি অবশ্যই বেছে নেবে।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

বাঙ্গালী মুসলমানদের করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাঙ্গালী মুসলমানদের জন্য তিনটি করণীয় রয়েছে। যেমন—
১। ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এমনকি সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও স্বাভাবিকভাবে ভারতের যে প্রাধান্য সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রায় চারিদিক থেকে ভারতের মতো একটা রাষ্ট্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত হবার ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তাকে ভাগ্যের দান বলে মেনে নিয়ে ভারতের একটি উপরাষ্ট্র হিসেবে বেঁচে থাকা।
কিন্তু ঐতিহাসিক কারনে এবং আযাদী পাগল মনস্তত্ত্বের দরুন বাঙ্গালী মুসলমান এ অবস্থাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা। নিজেদের পূর্ণ অধিকার হাসিলের জন্য যারা মুসলমান ভাইদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তারা ভারতীয় প্রাধান্যকে মেনে নিতে পারেনা।
২। রাশিয়া বা চীনের সহায়তায় ভারত থেকে মুক্ত একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
এ পথ বিভিন্ন কারনে বাঙ্গালী মুসলমানদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য তো নয়ই বরং এপথে এ অঞ্চলে আর একটি ভিয়েতনামই সৃষ্টি হবে মাত্র। ভারত কেরালা এবং পশ্চিম বংগে যেমন কমিউনিস্ট শাসন বরদাশত করেনি এখানেও তা করবে না। এটা ভারতের অস্তিত্বের পক্ষেও বিপদজনক বলে তারা মনে করবে। সুতরাং এপথ চির অশান্তির পথ এবং বৃহৎ শক্তিসমূহের আখড়ায় পরিনত হবার পথ। রাশিয়া বা চীন যদি ভারতের মর্জির বিরুদ্ধে এগিয়ে আসে তাহলে আমেরিকাও ভারতকে সাহায্য করবে। সুতরাং বাঙ্গালী মুসলমানদের এ এলাকাকে অবিরাম যুদ্ধের ময়দানে পরিনত হতে দেয়া আত্মহত্যারই শামিল।
৩। বাঙ্গালী মুসলমানদের জন্য একমাত্র পথ হল ভারতের প্রভাব মুক্ত অকমিউনিস্ট সরকার গঠন করে সত্যিকার আযাদ রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করা। পাকিস্তানের অংশ হিসেবে যেটুকু আযাদী ছিল তাঁর চেয়েও বেশী রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে না পারলে এতোসব খুইয়ে কি লাভ হল ? দেশের মানুষের জন্য ভাত- কাপরের ব্যবস্থা করতে না পারলে আযাদীর কি মূল্য রইলো ? বাঙ্গালী মুসলমান যদি নিজস্ব মুসলিম সাংস্কৃতিক ও কৃষ্টি হারিয়ে হিন্দুদের সাথে এক হয়ে যায় তাহলে ভারতের গোলামী আরও স্থায়ী হবে।
কিন্তু এসব কিভাবে সম্ভব ? আজ এটাই বাঙ্গালী মুসলাম্নদের মনে সবচেয়ে বড় এবং কঠিন প্রশ্ন। যারা দেশের ভিতর বর্তমান অরাজক ও সমস্যা জর্জরিত পরিবেশে জীবন কাটাচ্ছে তাঁদের আজ দিশেহারা অবস্থা। আমরা যারা বিদেশে আছি – ভিতরের আগুন বাইরে এসে আমাদেরকেও অস্থির করে তুলছে। প্রিয় জন্মভূমিকে কিভাবে স্থিতিশীল করা যায়, দেশবাসী কিভাবে নিরাপত্তাবোধ নিয়ে বাঁচতে পারে এবং জনগন কিভাবে স্থায়ী শান্তি ভোগ করতে পারে এ চিন্তা প্রতিটি দেশপ্রেমিককে --- দেশের ভেতরে ও বাইরে অস্থির করে তুলেছে। দেশ ও দেশবাসীর জন্য যাদের প্রান কাঁদে, অনাগত ভবিষ্যতে দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির যারা স্বপ্ন দেখে এবং সত্যিকারের আযাদীর জন্য যাদের পিপাসা রয়েছে তাঁদের জন্য কি কোন পথই নেই ? ভারতের গোলামীর হাত থেকে মুক্তির কি কোন উপায়ই নেই ?
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

মুক্তির একই পথ
মানুষের সত্যিকারের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ নির্ভর করে মানসিক মুক্তি চেতনার উপর। মন যদি গোলাম না হয় তাহলে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য সকল প্রকার গোলামী থেকে মুক্তি সম্ভব। বাঙ্গালী মুসলমানকে আজ মনের গভীরে নেমে খুঁজতে হবেঃ মুক্তির উৎস কোথায় ?
শুধু বাঙ্গালী হওয়ার মনোভাব নিয়ে আমরা কোনক্রমেই হিন্দুর প্রভাব থেকে মুক্তি পাব না। আর হিন্দু থেকে পৃথক সত্ত্বা হিসেবে চিন্তা করা ছাড়া ভারতের গোলামী থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। বাঙ্গালী মুসলমান হিসেবে আমাদের পৃথক সত্ত্বাকে জাগ্রত না করে আমরা মুক্তির পথে পা-ই দিতে পারবো না।
ভারত আমাদের মনে এ চিন্তা ঢুকানোর চেষ্টা করছে যে, পাকিস্তান হওয়াটাই ভুল হয়েছে। কারন এ চিন্তা না ঢুকালে গোলামীর জিঞ্জির মজবুত হতে পারে না এবং “হিন্দু মুসলমান এক জাতি” একথা মুসলমানরা স্বীকার না করলে ভারতের প্রভাব স্থায়ীও হতে পারে না।
কিন্তু বাঙ্গালী মুসলমানরা একথা ভালো করে জানে যে পাকিস্তান না হলে অবিভক্ত বাংলা ভারতের একটা প্রদেশ হতো মাত্র। আজ বাঙ্গালী মুসলমান প্রধান একটি পৃথক দেশ কায়েম হবার কি কোন সুযোগ হতো যদি পাকিস্তান না হতো ? সুতরাং দূর প্রাচ্যের এলাকায় সাত কোটি মুসলমানের একটি নিজস্ব দেশ গঠনে পাকিস্তানের জন্ম অপরিহার্য ছিল। অবশ্য এখনো সে নিজস্ব দেশটি দেশটি হাসিল হয়নি—হওয়ার পথে এক ধাপ অগ্রসর হয়েছে মাত্র।
একথা আমাদের ভুললে চলবে না যে, হিন্দু ও মুসলমান যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও পৃথক দুটি জাতি তা পাক- ভারতের ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য। পৌত্তলিক এবং তৌহিদবাদী কোন দিন এক হতে পারে না। উপমহাদেশে ১২ শো বছরের বেশী হল হিন্দু- মুসলমান এক সাথে বসবাস করছে। জাতি হিসেবে উভয়ই এতো আত্তসচেতন যে, কোন দিন এরা এক হতে পারেনি। ব্যক্তি হিসেবে কোন হিন্দু মুসলমান হয়ে গেলেও বা কোন মুসলমান হিন্দু মেয়ে বিয়ে করলেও বা হিন্দু কৃষ্টি গ্রহন করলেও জাতি হিসেবে দুটি পৃথক সত্ত্বা অত্যন্ত স্পষ্ট।
ভারতীয় সভ্যতার নামে “শকহুন দল---- পাঠান- মোঘলকে” এক দেহে লীন করার মতো যতো মিষ্টি বুলিই আওড়ানো হোক, বাদশাহ আকবরের মতো দীনে ইলাহী কায়েম করে এই দুই জাতিকে এক করার যতো চেষ্টা করাই হোক --- এ দুটো জাতির মানসিক চেতনা ও কৃষ্টির মধ্যে এতো মৌলিক তফাত রয়েছে যে, তাঁদেরকে এক জাতি বানাবার কোন উপায়ই নেই।
মুসলিম জাতীয়তাবোধ যেমন একদিন ইংরেজ এবং কংগ্রেসের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভারত বিভাগ করতে সক্ষম হয়েছিলো আজও আবার ঐ চেতনাবোধই সত্যিকারের আযাদীর পথে এগিয়ে নেবে। যারা এটাকে সাম্প্রদায়িকতা বলে তারা মানসিকভাবে ভারতের গোলাম। এটা সাম্প্রদায়িকতা নয় সচেতন জাতীয়তা। ভারতের বিরুদ্ধে এটা যুদ্ধ ঘোষণা নয়—ভারতের মানসিক গোলামী থেকে মুক্ত হয়ে সত্যিকারের স্বাধীনতারই এটা উদাত্ত আহবান। স্বাধীন হয়ে বাঁচতে হলে এ ডাকে সাড়া দিতেই হবে।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

জনগনের দাবী
বর্তমান দুরবস্থায় জনগন কিছুতেই উদাসীন থাকতে পারে না। বর্তমান অবস্তাহকে পরিবর্তনের চেষ্টা না করে ঘরে বসে থাকা এক মারাত্মক নৈতিক অন্যায়। তাই আশাহত দেশবাসীর উচিত তাঁদের ন্যায্য দাবী আদায় করার জন্য সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা। শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবী জানাতে হবেঃ
• ১। আমরা সত্যিকার স্বাধীনতা চাই। আযাদীর সুফল আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে হবে। প্রতিটি বাঙ্গালী মুসলিম পরিবারকে খেয়ে পরে ইজ্জতের সাথে বাঁচতে দিতে হবে। ক্ষমতার বলে, অস্ত্রের বলে শাসক সেজে রাতারাতি বড়লোক হবার নীতি বর্জন করতে হবে।
• ২। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুন্ডামী, অস্ত্র প্রয়োগ ও গায়ের জোরে সরকারী ক্ষমতা দখলের চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। শান্তিপূর্ণ গনতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আইনের শাসন চালু করতে হবে।
• ৩। রাজনৈতিক মতবিরোধ গণতন্ত্রের পরিচায়ক। তাই গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিরোধী দলকে দালাল দেয়ার ঘৃণ্য অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। গালাগালির রাজনীতি দেশকে ধ্বংস করতে পারে, গড়তে পারেনা।
• ৪। ভারতের গোলামী থেকে মুক্তির সংগ্রাম চলবেই চলবে।
• ৫। ভারতের প্রভাব মুক্ত গনতান্ত্রিক সরকারই আমাদের একমাত্র কাম্য। অন্য কোন সরকার জনগনের কল্যাণ করতে পারে না।
( বাঙ্গালী মুসলমান কোন পথে )

 

 

 

 

 

 

 


পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা কী ছিল ?
জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিতে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা কী ছিল ?
যেকোন সমস্যারই একাধিক বিশ্লেষণ হতে পারে। এবং সমাধানের ব্যাপারেও আন্তরিকতার সাথেই মতপার্থক্য থাকতে পারে। জামায়াতে ইসলামী তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যাকে যেভাবে বিশ্লেষণ করেছে, তা যদি কেউ নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করে, তাহলে একথা উপলব্ধি করা সহজ হবে যে, জামায়াত কেন বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা করার প্রয়োজন মনে করেনি। এ বিষয়ে জামায়াতের সাথে কেউ একমত হোক বা না হোক, জামায়াতের দৃষ্টি ভঙ্গিকে ভালোভাবে বুঝতে পারবে।
জামায়াত কখনোই সুবিধাবাদের রাজনীতি করে না এবং কোন প্রকারের ক্ষমতা দখলের রাজনীতিও জামায়াত করে না। ইসলামী জীবন বিধান বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যেই জামায়াত কাজ করে যাচ্ছে।
জামায়াত স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে না বলে দেশকে ইসলামী আদর্শে গড়ে তুলবার যোগ্য নেতৃত্ব ও কর্মী বাহিনী তৈরি না করে ক্ষমতা গ্রহনে মোটেই আগ্রহী নয়। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জামায়াতের বিরুদ্ধে একাত্তরের ভূমিকা সম্পর্কে যতো অপপ্রচারই চালানো হোক না কেন, তাতে কারো কোন উপকারে আসবে না। যারা ধীরচিত্তে জামায়াতের ভূমিকা বুঝতে চান, তাঁদের জন্যই এদেশের সমস্যা সম্পর্কে নিম্নরূপ বিশ্লেষণ পেশ করা হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান কায়েম হয়, তখন বর্তমান বাংলাদেশ এলাকা সবচেয়ে অনুন্নত ছিল। যেমনঃ
• ১। সশস্ত্র বাহিনীতে এ অঞ্চলের লোক ছিল না বললেই চলে।
• ২। পুলিশ বাহিনীতেও খুবই কম লোক ছিল বললেই চলে। তাই ভারত থেকে যেসব মুসলমান পুলিশ অপশন দিয়ে এসেছিলো, তারাই প্রথম দিকে থানাগুলো সামলিয়েছে।
• ৩। উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা মাত্র গুটি কয়েক ছিলেন।
• ৪। দুই তিনটা কাপড়ের কারখানা ছাড়া শিল্পের কিছুই ছিল না। এ এলাকার পাটেই কোলকাতার পাটকল চলতো। এখানে পাটের কারখানা ছিল না।
• ৫। বিদেশের সাথে বাণিজ্য করবার যোগ্য একটা সামুদ্রিক বন্দরও এখানে ছিল না।
• ৬। কোন মেডিকেল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না।
• ৭। ঢাকা শহর একটা জেলা শহর ছিল মাত্র। প্রাদেশিক রাজধানীর অফিস এবং কর্মচারীদের জন্য বাঁশের কলোনি তৈরি করতে হয়েছে। আর ইডেন মহিলা কলেজ বিল্ডিংকেই সেক্রেটারিয়েট ( সচিবালয় ) বানাতে হয়েছে।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন
এ দুরবস্থার প্রধান কারন এটাই ছিল যে, পূর্ব বাংলাকে ব্রিটিশ আমলে কোলকাতার পশ্চাদভূমি ( হিন্টারল্যান্ড ) বানিয়ে রাখা হয়েছিলো। এখানকার চাউল, মাছ, মুরগী, ডিম, দুধ, পাট এবং যাবতীয় কাঁচামাল কোলকাতার প্রয়োজন পূরণ করতো। আর কোলকাতার কারখানায় উৎপন্ন দ্রব্য এখানকার বাজারে বিক্রি করতো। তদুপরি শিক্ষা, চাকুরী, ব্যবসা ইত্যাদি অমুসলিমদেরই কুক্ষিগত ছিল।
ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা ও আসামের মুসলমানরা নিজেদের এলাকার এবং এর অধিবাসীদের উন্নয়নের প্রয়োজনে ঢাকাকে রাজধানী করে একটি আলাদা প্রদেশ করার আন্দোলন চালায়, যাতে কোলকাতার শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে এ এলাকাটি উন্নতি করতে পারে। এ দাবীর যৌক্তিকতা স্বীকার করে ইংরেজ সরকার ১৯০৫ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বঙ্গ ও আসাম এলাকা নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করে। ১৯০৬ সালে এ নতুন প্রাদেশিক রাজধানীতে নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্ম হয়। এ সম্মেলনে গোটা ভারত বর্ষের বড় বড় মুসলিম নেতা যোগদান করায় ঢাকার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )

বঙ্গভঙ্গ বাতিল আন্দোলন
এ নতুন প্রদেশে মুসলমানদের প্রাধান্য প্রভাব ও উন্নতির যে বিরাট সম্ভাবনা দেখা দিলো, তাতে কোলকাতার কায়েমী স্বার্থে তীব্র আঘাত লাগলো। অমুসলিম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী ও অন্যান্য পেশাজীবীগণ “বাংলা মায়ের দ্বিখণ্ডিত” হওয়ার বিরুদ্ধে চরম মায়া কান্না জুড়ে দিলেন। অখণ্ড মায়ের দরদে তারা গোটা ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি করলেন।
এ আন্দোলনে ব্যারিস্টার আব্দুর রাসুলদের মতো কিছু সংখ্যক মুসলিম নামধারী বুদ্ধিজীবিও শরীক হয়ে অখণ্ড বাংলার দোহাই দিয়ে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ময়দানে নেমে পড়েন। এ আন্দোলনের পরিনামে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়ে পূর্ব বাংলা আবার কোলকাতার লেজুড়ে পরিনত হয়। যদি বঙ্গভঙ্গ রহিত না হতো, তাহলে ১৯৪৭ সালে ঢাকাকে একটি উন্নত প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে এবং চট্টগ্রামকে পোর্ট হিসেবে রেডি পাওয়া যেতো। তাছাড়া শিক্ষা ও চাকুরীতে মুসলমানরা এগিয়ে যাবার সুযোগ এবং এ এলাকায় শিল্প এবং বাণিজ্য গড়ে উঠতো।
মজার ব্যাপার এই যে, ১৯৪৭ সালে গোটা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে বলিষ্ঠ যুক্তি থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসের প্রবল দাবীতে ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে বিভক্ত করে পশ্চিম বঙ্গকে ভারতের হাতে তুলে দিলো। যে অমুসলিম নেতৃবৃন্দ ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রহিত করিয়ে ছিলেন, তারাই ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গ করিয়ে ছাড়লেন। স্বার্থ বড় বালাই।
( পলাশী থেকে বাংলাদেশ )
পূর্ব বাংলার উন্নয়ন
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবার পরেই পূর্ব বাংলার সার্বিক উন্নয়ন শুরু হয়। কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিস, পুলিশ সার্ভিস ইত্যাদিতে মুসলমান অফিসার নিয়োগ শুরু হলো। অগনিত পদে মুসলিম যুবকরা ব্যাপকভাবে চাকুরী পেতে থাকলো। এমনকি সশস্ত্র বাহিনীতেও বেশ সংখ্যায় লোক ভর্তি হবার সুযোগ এলো।
অপরদিকে ব্যবসা বাণিজ্যের ময়দানে অমুসলিমদের স্থানে মুসলিমদের অগ্রযাত্রা শুরু হল। ভারত করে হিজরত করে আসা লোকেরাই অমুসলিম ব্যবসায়ীদের সাথে বিনিময়ের ভিত্তিতে দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করলো। শিল্প কারখানার পুঁজি এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে মুহাজিররাই এ এলাকার উন্নয়নে লেগে গেলো। যদি পাকিস্তান না হতো এবং আমরা যদি অখণ্ড ভারতের অধীনেই থাকতাম, তাহলে আজ স্বাধীন বাংলাদেশ নামে কোন রাষ্ট্রের জন্ম হতো না। এ অবস্থায় এ এলাকার মুসলমানদের কী দশা হতো তা কি আমরা ভেবে দেখি ? আজ যারা জেনারেল, তাঁদের কয়জন নন-কমিশন অফিসারের উপর কোন স্থান দখল করার সুযোগ পেতেন ? সেক্রেটারির মর্যাদা নিয়ে আজ যারা সচিবালয়ে কর্তৃত্ব করছেন, তাঁদের কতজন সেকশন অফিসারের উপরে উঠতে পারতেন ? আজ যারা পুলিশের বড় কর্তা, তারা দারোগার বেশী হতে পারতেন কি ?

 

 


মুসলিম নামের অধিকারঃী হয়েও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা বড় বড় মর্যাদার আসন অলংকৃত করছেন, তাদের কি এ সুযোগ ঘটতো? ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারদের যে বাহিনী এখন বিদেশে পর্যন্ত বিরাট সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে শতকরা কতজন মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং- এ পড়ার সৌভাগ্য লাভ করতেন?
বাংলাদেশে এখন যেসব শিল্প-কারখানা রয়েছে পাকিস্তান না হলে তা কি সম্ভব হতো? আজ যারা বড় বড় ব্যবসায়ী হয়েছেন, তারা মাড়োয়ারীদের দাপটে কি মাথা তুলতে পারতেন?
আজ বাংলাদেশ বিশ্বে দি¦তীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তান হয়েছিল বলেই এটুকু পজিশন স¤ভব হয়েছে। তা না হলে আমরা ভারতের একটা প্রদেশের অংশ হয়েই থাকতে বাধ্য হতাম। একটা পৃথক প্রদেশের মর্যাদাও পেতাম না। [পলাশী থেকে বাংলাদেশ]
কেন সার্বিক উন্নয়ন হলো না?
এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, পূর্ব বংগের সার্বিক উন্নয়ন না হওয়ার জন্য পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারই প্রধানত দায়ী। ইংরেজ চলে যাবার পর প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে যারা কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার পরিচলনা করলেন তাদের মধ্যে পূর্ব বংগের কোন বড় কর্মকর্তা ছিল না। আর পাকিস্তান আন্দোলনের যেসব নেতা কেন্দ্রীয় সরকাররের নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের মধ্যে পূর্ব বংগের যারা প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, তার এত অনভিজ্ঞ ও দূর্বল ছিলেন যে, পূর্ব বংগের উন্নয়নের ব্যাপারে প্রথম থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের যতটা করণীয় ছিল তার সামান্য কিছুই আদায় করা সম্ভব হয়েছে।
বৃশি আমলে পূর্ব বংগ চরমভাবে অবহেলিত থাকার দরুন এ অঞ্চল শিল্প-বাণিজ্য, সেচ প্রকল্প, বন্দর সুবিধা, কৃষি উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, পেশাগত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক অনুন্নত ছিল। ঐ অবস্থায় পূর্ব বংগের উন্নয়নের প্রতি শুরু থেকেই বিশেষ মনোযোগ দেয়া কর্তব্য ছিল। এ কর্তব্য পালন করা হলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি এখানকার জনগণের এমন আস্থা সৃষ্টি হতো, যা পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতিকে দৃঢ় করতে সক্ষম হতো।
পূর্ব বংগের সার্বিক উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলার জন্য শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের উপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে আমাদের নিজেদের অযোগ্যতা ও দুর্বলতা ঢেকে রাখার যারা চেষ্টা করে আমরা তাদের সাথে একমত নই।
যারা নিজেদের পশ্চাদগামিতার জন্য শুধু অপরকে দোষী সাব্যস্ত করেই আপন দায়-দায়িত্ব শেষ করে, তারা নিজেদের দোষ ও ভুল দেখতে পায় না। তাদের পক্ষে সত্যিকার উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব হয় না। পাকিস্তান হবার পর এলাকার জনগণের অবস্থার সার্বিক উন্নয়ন না হওয়া এবং যে টুকু উন্নয়ন হয়েছে, তা দ্রুত না হওয়ার জন্য পাকিস্তানীদের উপর দোষ চাপাবার প্রবণতা এত প্রবল ছিল যে, সব ব্যাপারেই শুধ ুপশ্চিমের শোষণের দোহাই দেয়া হতো।
নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের যোগ্যতা না থাকলে এক মায়ের পেটের ভাই-এর কাছেও ঠকতে হয়। যে ভাই ঠকায়, সে নিশ্চয়ই দোষী। কিন্তু সে তার স্বার্থ যেমন বুঝে নিচ্ছে, অপর ভাইও যদি নিজের অধিকার আদায় করার যোগ্য হয়, তাহলে আর ঠকতে হত না।
আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল নিঃস্বার্থ, জনদরদী, সৎ ও যোগ্য নেতৃতে¦র অভাব। পূর্ব পাকিস্থানের উপর যত অবিচার হয়েছে এ জন্য প্রধানত দায়ী এখানকার ঐসব নেতা, যারা কেন্দ্রীয় সরাকারে শরীক থেকেও বলিষ্ঠ ভুমিকা পালন করেন নি। বিশেষ করে আইয়ুব আমলে যারা মন্ত্রিত্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থ পেয়ে গনতন্ত্রের বদরে একনায়কত্বকে সমর্থন করেছিল, তারা এদেশের জনগণকে রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সাথে সাথে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পংগু করে রাখার জন্যও বিশেষভাবে দায়ী।
নওয়াব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের জন্য যারা শুধু লর্ড ক্লাইভকে গালি দেয়, তাদের সাথে একমত হওয়া যায় না। ক্লইভ তার জাতীয় স্বার্থের পক্ষে যোগ্য ভুমিকা পালন করেছে। মীর জাফরের স্বার্থপরতা ও বিশ্বাসঘাতকতার দরুনই যে আমরা পরাধীন হয়েছিলাম, তা থেকে শিক্ষা আজও আমরা নিচ্ছি না। পশ্চিম পাকিস্তানের ”ক্লাইভদের” চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ”মীর জাফররাই” যে আমাদের অবনতির জন্য দায়ী, সে কথা উপলদ্ধি না করার ফলে আজও আমাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হচ্ছে না।
নিঃস্বার্থ নেতৃত্বের অভাব
সত্যিকার আদর্শবান, নিঃস্বার্থ জনদরদী, চরিত্রবান ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব দূর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অবস্থার উন্নতি হতে পারে না। আমাদের দেশে কোন পলিটিকেল সিস্টেম গড়ে ওঠার লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। এখানে রাজনীতি করা মানে যেকোন উপায়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা। দলীয় নেতৃত্বের আসন দখল করাই রাজনৈতিক দল গছনের একমাত্র লক্ষ। ঐ আসন বেদখন হয়ে গেলে দল ভেংগে হলেও নেতা হবার রীতি এদেশে প্রচলিত হয়ে গেছে।
আসন দখল করাই রাজনৈতিক দল গছনের একমাত্র লক্ষ্য। ঐ আসন বেদখল হয়ে গেলে দল ভেংগে হলেও নেতা হবার রীতি এদেশে প্রচলিত হয়ে গেছে।
গনতন্ত্রর শ্লোগান আমাদের দেশে একনায়করাই বেশী জোরে দিয়ে থাকে। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক রীতি ও পদ্ধতির যথেষ্ট অভাব রয়েছে। একনায়কত্ব ও গণতন্ত্রের বাহ্যিক চেহারায় যেন পার্থক্য স্পষ্ট নয়।
এ ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশ আছে বলেই সেনাপতিরাও ক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক দল গঠন করার ডাক দিলে গণতন্ত্রের বহু তথাকথিত ধ্বজাধারী একনায় কেই গণতন্ত্রের নায়ক হিসেবে মেয়ে নেয।
জনঃস্বার্থ নেতৃত্ব থাকলে জনগণের সব অধিকারই অর্জন করা সম্ভব হতো। আর ঐ জিনিসের অভাব থাকায় বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্রে পরিনত হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দুর্দশা বেড়েই চলেছে। নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনঃ
০১। নিষ্ঠার সাথে গণতন্ত্রের আদর্শ মেনে চলার অভ্যাস।
০২। সরকারী ও বিরোধী সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সত্যি কার গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রচলন।
০৩। দেশ শাসনের উদ্দেশ্যে একটি গণতšিক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলবার ব্যবস্থা।
০৪। আবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা বিধান।
০৫। যারা বিনা নির্বাচনে ক্ষমতা দখল করে তাদেরকে গনতন্ত্রের দুশমন মনে করা এবং তাদের নেতৃত্ব মানতে অস্বীকার করা। [পলাশী থেকে বাংলাদেশ]


বাংলাদেশ ও বাংলাভাষা
আমার দেশ বাংলাদেশ
প্রত্যক মানুষই তার একখানা নিজস্ব বাড়ী কামনা করে। ছোট একটি কুঁড়ে ঘরও গৃহহীনের নিকট কামনার বস্তুু। আপন দেশও মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন। পৃথিবীর কোন একটি ভূখন্ডকে আমার দেশ হিসেবে গণ্য করার সৌভাগ্য যাদের হয়নি তারাই এর অভাব সত্যিকারভাবে অনুভব করতে পারে। তাই তারা জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত তাদের বংশধররা পর্যন্ত অন্য দেশে পয়দা হলেও পিতামাতার জন্মভূমিকে আপন দেশ মনে করে। ফিলিস্তিনে যেসব মুসলিম অধিবাসী কয়েক দশক পূর্বে জন্মভুমি ত্যাগ ক তে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে, তাদের, তাদের সন্তানেরা অন্যান্য দেশে পয়দা হয়ে সেখানেই লেখা-পড়া বা কাজ-কর্ম শিখে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোন রকম প্রতিষ্ঠাই তাদের আপন দেশের অভাব দূর করতে পরছে না। তাই ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সের যুবকদের যারা কোনদিন ফিলিস্তিন দেখেওনি, তারা পযন্ত ফিলিস্তিনের জন্য অকা তরে জীবন দিচ্ছে। আমার দেশ এমনই এক আকষর্ণীয় বিষয়।
ঘটনাচক্রে ১৯৭১ সালে ২২ শে নভেম্বর ১৯৭৮ সালের ১০ই জুলাই পযর্ন্ত যায় সাত বছর বাধ্য হয়ে বিদেশে ছিলাম। যেখানেই রয়েছি সম্মানের সাথেই ছিলাম। কিন্তু আমার দেশের মায়া কোন দিন বিদেশে মনকে সুস্থির থাকতে দেয়নি। সাড়ে চার বছর পর পরিবার পরিজন দেশ থেকে যেয়ে আমার সাথে মিলিত হবার পর দেশের জন্য অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল।
আমি লন্ডনে ছিলাম দুর সম্পর্কের এক ভাতিজার বাসায়। তার স্ত্রী আমাকে পিতার মতো সেবা যতœ করেছে। তাদের ছেলেমেয়েরা আমাকেই আপন দাদা মনে করত। আমার পরিবার ওখানে যাবার পর ওরা দাদী পেয়ে আরও খুশী। কিন্তু আমার ছেলেদের লেখা-পড়া নিয়ে মহাচিন্তায় পড়লাম। বাংলাদেশী আমার পরনো বন্ধুদের যাঁরা ওখানে বাড়ী কিনে স্থায়ী বাসিন্দা, এমন কি বৃটিশ নাগরিকত্ব পেয়ে গেছেন তাঁরা আমার অস্থিরতা দেখে বিস্মিত হলেন। তাঁরা ছেলেদের লেখা-পড়া সে দেশেই শেষ করার পরামর্শ দিলেন। সে দেশের লেখা-পড়ার এত সুবিধা থাকা সত্বেও আমার অস্থিরতা কমল না। বিলাতের বড় বড় শহরগুলোতে বালাদেশীদের সংখ্যা এত বেশী যে, বিয়ে-শাদী ও সামাজিকতার সব কাজকর্মেই নিজ দেশের পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব। তবুও ছেলেদের সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হলাম। কারন সে দেশে দীর্ঘকাল থাকলেই ওরা ইংরেজ হতে পারবে না। অথচ বাংলাদেশী হয়েও গড়ে উঠবে না। যে ছেলে নবম শ্রেনীর ছাত্র সে এক বছরেই ইংরেজীতে সেখানে অনেক উন্নতি করা সত্বেও অন্ততঃ প্রবেশিকা পর্যন্ত দেশে না পড়লে মাতৃভাষ শেখা হবে না বলে আশংকা ছিল। তাকে দেশে ফেরত পাফিয়ৈ নিশ্চিত হলাম। সবার ছোট ছেলেটির মাত্র সোয়া দু’বছর বিদেশে পড়ার পর দেশে এসে বাংলার মাধ্যমে পড়তে গিয়ে ভাষা সমস্যা দেখা দিল। বিশেষ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দু,বছর পর্যন্ত ইংরেজীতে অনুবাদ করে বহু বাংলা শব্দ বুঝাতে হয়েছে।
বিলাতে বাংলাদেশীদের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে কথ বলতে গিয়ে ভাষা সমস্যা প্রথমেই প্রকট হয়। বয়স্ক যারা তারা বাংলা ভাষায় না বললে সবাই বুঝতে পারে না। কিন্তু বাংলা বললে যুবক ও কিশোরদের পক্ষ থেকে ইংরেজীতে বলার জোর দাবী উঠে। কারন ঘরে আঞ্চলিক বাংলায় কথা বলতে পারলেও কোন আলোচনা বাংলায় হলে ওদের বুঝতে খুব কষ্ট হয়। ৬ বছর বিলাত থাকাকালে যখনই বাংলাদেশী কিশোর ও যুবকদের ৬ বছর বিলাত থাকাকালে যখনই বাংলাদেশী কিশোর ও যুবকদের সাথে মিশবার সুযেগ হয়েছে তখনই তাদেরকে কয়েকটি পরামর্শ দেয়া কর্তব্য মনে করেছি।
১। তোমরা বাংলাভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে শিখবার চেষ্টা করবে। নইলে দেশে যেয়ে গনগগণের সাথে আপন হতে পারবে না। এবং তাদের ভালবাসাও পাবে না। দেশের সেবা ও জনগণের খিদমত করার সুযোগ এবং তৃপ্তি পেতে হরে দেশবাসীর ভাষা ভালবাবে আয়ত্ত করতে হবে।
২। বিদেশে যত সুযোগ-সুবিধাই পাও, সে দেশকে আপন দেশ হিসেবে পাবে না। বৃটিশ পাসপোর্ট পেরেই ইংরেজরা তোমাদেরকে আপন দেশী মনে করবে না। সে দেশের আইনগত নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও মনের দিক থেকে নিজেকে বিদেশীই বাবতে হবে।
৩। যত ভল বেতনেই বিদেশে চাকুরী কর, কোন দিন নিজের দেশকে সেবা করার মত মানসিক তৃপ্তি পবে না। নিজের দেশে যতটুকু কাজই কর, মনে গবীর তৃপ্তি বোধ হবে যে দেশের জন্য সমান্য সেবা হলেও করতে পারছি। ভাড়া বাড়ী উন্নয়নের জন্য কোন ভাড়াটেই টাকা ব্যয় করে না এবং সে বাড়ীতে যত সুবিধাই থাকুক আপন বাড়ী বলে মনে হয় না। নিজের কুঁড়ে ঘরে থাকলেও তার চাইতে বেশী সুখ অনুভূত হয় এবং সেটাকে উন্নত বাড়ীতে পরিণত করে সন্তানদের জন্য রেখে যাবার আকাঙ্খা স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টি হয়।
আমার ছেলেরা যাতে বাংলাভাষার চর্চা করে তার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিলাম। কখনও তাদের কাছে ইংরেজীতে চিঠি লিখি না। তাদের কে বাংলায় টিঠি দিতে বাধ্য করি।
জন্মভুমি স্রষ্টার দানঃ মাতৃভাষা ও জন্মভূমি মানুষ নিজের চেষ্টায় অর্জন করে না। মহান স্রষ্টার সিন্ধান্ত অনুযায়ী এ দু’টো বিষয় অর্জিত হয়। তাই এ দু’টো আকর্ষণ জন্মগত ও মজ্জাগত। আমি নিজের নিজের ইচ্ছায় বাংলাদেশে জন্মলাভ করিনি। আমার খালিক ও মালিক আল্লাহ পাক নিজে পছন্দ করে যে দেশে আমাকে পয়দা করেছেন সে দেশই ”আমার দেশ” হবার যোগ্য এবং যে মায়ের গর্ভে আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর ভাষাই আমার প্রিয়তম ভাষা। বাল্যকাল থেকে যে ভাষায় মানুষ চিন্তা করে স্বপ্ন দেখে ও ভাব প্রকাশ করে সে ভাষা এবং জীবনের প্রথম পনর বছর যে ভৌগলিক পরিবেশে কাটে সে এলাবার মায়া কোন মানুষ সহজে ত্যাগ করতে পারে না।
আমার বাধ্যতামূলক নির্বাসন জীবনে বারবার মনকে প্রবোধ দেবার জন্য চিন্তা করেছি যে, জন্মের পর যেটুকু জমিতে আমাকে শোয়ান হয়েছে সেটুকু জায়গায়ই শুধু আমার জন্মভুমি হয়। যখন হামাগুড়ি দিতে শিখেছি তখন আমার জন্মভুমির আয়তন বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হল। দাঁড়াবার বয়সে আরও প্রশস্ত হল। কর্ম জীবনে আমার জন্মন্থান যে রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত তার সমগ্র এলাকাই জন্মভুমিতে পরিণত হল। এটাকে আরও প্রশস্ত মনে করে গোটা এশিয়া কেন, পৃথিবীর সবটাকেই তো আমার দেশ মনে করা যায়। ক্ষুদ্র এলাকা নিয়ে যে বাংলাদেশ সেখানে যাবার এত আকুল আগ্রহ কেন- সেখানের মায়া ভুলতে পারা যায় না কেন? যে দেশে অশান্তি, বিশৃংখলা নিরাপত্তার অভাব, অস্বভাবিক দ্রব্যমূল্য, রোজগারের অভাব ইত্যাদির দরুন সেখানকার মানুষ বিদেশে পাড়ি পমাবার জন্য পাগল সে দেশের হাতছানি আমাকে উল্টো পাগল করল কেন? এসব প্রবোধবাক্য ও দার্শনিক প্রশ্নের যুক্তিভিত্তিক কোন জওয়াবের প্রযোজন নেই। এর সরল জওয়াব আমার মন থেকে যা পেয়েছি তার সামনে অন্য যুক্তি অচল। মায়ের নিকট সন্তান এবঙ সন্তানের নিকট মায়ের মূল্য তাদের চেহারার সৌন্দর্য, গায়ের রং বা অন্যান্য গুণের দ্বারা বিচার্য নয়। কদর্য সন্তানও স্নেহময়ী মায়ের নিকট আদরের দুলালই, আর কদর্য মাও মাতৃভক্ত সন্তানের নিকট স্নেহময়ী মা বলেই পরিচিত।
এরপরও প্রশ্ন থেকে যায় যে, কতটুকু ভৌগলিক এলাকা জন্মভুমি বলে গন্য হবে? ১৯২২ সালে যথস আমি ঢাকা শহরে পয়দা হই তখন বৃটিশ-ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের অস্তর্গত ছিলাম। ১৯৭১ সালে সালে বাংলাদেশ একটি পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিনত হবার পর স্বভাবিক ভাবেই আমার জন্মভুমি আকারে ক্ষুদ্র হয়েছে এবং প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তানের যে এলাকাটি এখন বাংলাদেশ নামে বিশের মানচিত্রে স্থান লাভ করেছে সেটুকুই এখন আমার প্রিয় দেশ বা ”আমার দেশ”।
জন্মভূমিকে ভালবাসাঃ জন্মভুমির ভালবাসা মানুষের সহজাত। যারা কখনও বিদেশে দীর্ঘদিন কাটায়নি তারা এ ভালবাসার গভীরতা সহজে অনুভব করতে পারেনা। চাকুরী, উচ্চশিক্ষা বা ব্যবসা উপলক্ষে ইচ্ছকৃতভাবে যাঁরা বিদেশে বসবাস করেন তাঁদের সব্ াআমার সাথে একমত হবেন যে, বিদেশে যাবার আগে জন্মভূমি এ প্রিয় বলে মনে হয়নি। কিন্তু যারা বাধ্য হয়ে বিদেশে অবস্থান করে এবঙ কোন কারনে দেশে আসতে অক্ষম হয় তাদের এ অনুভুতি আরও গভীর হয়। তারা দৈহিক দিক দিয়ে বিদেশে পড়ে থাকলেও তাদের মনটা দেশেই পড়ে থাকে। দেশের মানুষ দেশের গাছ-পালা, দেশের আবহাওয়া, দেশের ফলমূল, দেশের পশু-পাখী, দেশের মাটি যেমন আপন মনে হয় বিদেশের এসব জিনিস তেমন মনে হতে পারে না। যথই মনোমুগ্ধকর মনে হোক সামগীকবাবে জন্মভুমিই যে প্রিয়তম একথাথার সাক্ষী আমি নিজে।
বিদেশের যাবার আঘে জীবনে ৪৯টি বছর যে আবহাওয়ায় কেটেছে, যে ধরনের খাদ্য খেয়ে দেহ গঠিত হয়েছে, যে রকমের শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় দেহ-মন আবর্তিত হয়েছে কোন দেশেই সামাগ্রীকভাবে তা পাইনি। লন্ডনের গ্রীষ্মকাল কোন কোন বছর এ দেশের বসন্তকালের মতো মিষ্টি মনে হলেও যেখানকার শীতকালটা মহাবিপদই মনে হয়েছে। ক্রমাগত ৫/৭ দনি প্রচন্ড শীতের মধ্যে যখন সূর্যের সাথে একটু সাক্ষাৎ হয় না, তখন ঢাকার প্রিয়তম সূর্যের কথা মনে না হয়ে পারেনি। গরমের দিনে রিয়াদ বা কুয়েতে যখন ১২৫ ডিগ্রি গরমে এয়াকন্ডিশনড কামরা থেকে বের হওয়া দুষ্কর মনে হয়েছে, তখন বাংলাদেশের গরমের মিষ্টতা মনে আসাই স্বভাবিক। শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত বাংলাদেশের যে আবহাওয়ায় আমি অভ্যস্ত হয়েছি তার ঘর্মাাক্ত গ্রীষ্ম বিরামহীন বর্ষা ও কুয়াশাচ্ছন্ন শীত সাময়িকবাবে যতই বিরক্তিকর মনে হোক না কেন সামগ্রীকবাবে জন্মভূমির আবহাওয়াই সর্বোত্তম।
খাদ্যের ব্যাপারটা আরও বেশী অনুভূতপ্রবণ। মানুষ যে ধরনের খাবারে অভ্যস্ত হয় সে খাবার ব্যতিত একটানা অন্য ধরনের খাবারে তৃপ্তি পায় না। জন্শভূমির মাছ-ভাত ও শাকসবজিকে কিছুতেই ভূলতে পারা গেল না। যত উন্নতমানের খাবারই বিভিন্ন দেশে খেলাম বাংলাদেশের চিংডি মাছ ও প্ুঁইশাক, কইমাছ ও পালং শাকের চচ্চরি জাতীয় খাবারের স্মৃতি বার বার মনে এসেছে। অনভ্যস্ত খাবারে শরীরের প্রয়োজন পূরন অবশ্যই হয়েছে। খাওয়ার দায়িত্বও পালন হয়েছে কিন্তু সত্যিকার তৃপ্তিলাভের জন্য বিলাতেও বাংলাদেশের পাবদা, ইলিশ ও অন্যান্য মাছ এবং শুটকি যোগাড় করে খেয়েছি। বহু বাংলাদেশী সে দেশে থাকার বাংলাদেশীদের দোকানে দেশী তরিতরকারী পর্যন্ত পাওয়া যায়।
জন্মভুমির মানষের ভালবাসাও বিদেশে বেশী অনুভুত হয়। বিলাতে পথে - ঘাটে, বাসে-ট্রেনে বা টিউবে (আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেন) দেশী অপরিচিত লোকের সাক্ষাৎ পেলেও অত্যন্ত আপন মনে করে আলাপ-পরিচয় করতে আগ্রহ বোধ হয়েছে। দেশের মানুষ সম্পর্কে কোন সুখরব শুনলে মনে গভীর তৃপ্তিবোধ হয়েছে। আবার কোন দুঃসংবাদ পেলে প্রানে তীব্র বেদনা অনুভুত হয়েছে।
এভাবেই “আমার দেশের” সাথে নাড়ীর গভীর সম্পর্ক বিদেশে না থাকলে এমনভাবে অনুভব করতে পারতাম না। যারা কোন কারনে বিদেশে থাকে তারা সেখানে আপন দেশে থাকার মানসিক তৃপ্তি কিছুতেই পেতে পারে না। আপন বাড়ী ও আপন দেশ সত্যিই প্রিয়তম। তাই বাংলাদেশই আমার দেশ, এর উন্নতিই আমার উন্নতি, এর দুর্নামই আমার দুর্নাম। আমার দেশের কল্যাণের প্রচেষ্টা চালান তাই আমার ঈমানী কর্তব্য।
জন্মভূমির প্রতি মহব্বত এতটা গভীর যে, নবীদের জীবনেও এর স্বাভাবিকতা লক্ষ্যনীয়। দুনিয়ার প্রতি নবীদের সামান্যতম আর্কণও নেই। আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশ পালন করার প্রয়োজনে নিজের সন্তানকে আপন হাতে যবেহ করা বা শিশু পুত্রসহ প্রিয়তমা স্ত্রীকে নির্জন মরুভুমিতে ফেলে আসা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব নয়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) দুনিয়াতে মুসাফিরের মতো জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। দুনিয়ার মহব্বতকে সমস্ত পাপের মূল বলে তিনি ঘোষণা করেছেন। দুনিয়াতে আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালন করা ছাড়া তিনি দুনিয়ার জীবনের প্রতি কোন মায়া পোষণ করতেন না। অতচ মক্কা থেকে হিযরত করে মদীনা যাবার সময় মক্কা শহর থেকে বের হবার পর পেছন ফিরে মক্কাকে সম্বোধন করে বললেন ‘হে মক্কা! দুনিয়ার শহরগুলোর মধ্যে তুমিই আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয় এবং আল্লাহর সবগুলো শহরের মধ্যে তোমাকেই আমি সবচাইতে বেশী মহব্বত করি। ইসলামের দুশমনরা যদি তোমাকে ত্যাগ করে যেতাম না। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত যদিও নবী ছিলেন তবুও তিনি মানুষ ছিলেন। তাই মানুষ হিসেবে বিবি-বাচ্চার প্রতি মহব্বত যেমন তাঁর মধ্যে সাবভাবিক ছিল, জন্মভুমির প্রতি ভালবাসাও তেমনি সহজাত ছিল। এ ঘটনা জানার পর জন্মভূমির প্রতি ভালবাসরা মধ্যেও ধর্মীয় প্রেরণা অনুভব করছি।
জন্মভূমির প্রতি এ ভালবাসা সত্ত্বেও তিনি ইসলামের স্বার্থে হিযরত করে মদীনায় চলে গেলেন। এ থেকে মানবজাতি এ শিক্ষাই পেল যে, দ্বীন-ইসলামকে জন্মভূমি থিকেও বেশী ভালবাসতে হবে। নিজের জন্মভূমিতে ইসলামকে বিজয়ী করার যদি অসম্ভব হয়ে পড়ে তাহলে যেখানে সম্ভব মনে হয় সেখানে হিযরত করে চলে হলেও দ্বীনকে কায়েম করতে চেষ্টা করা মুসলিম জীবনের প্রধান দায়িত্ব। [আমার দেশ বাংলাদেশ]


পিডিএফ লোড হতে একটু সময় লাগতে পারে। নতুন উইন্ডোতে খুলতে এখানে ক্লিক করুন।




দুঃখিত, এই বইটির কোন অডিও যুক্ত করা হয়নি