মূলপাতা নিবন্ধ ব্যবস্থাপনা : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

১. ভূমিকা (Introduction)
ইসলাম মহান আল্লাহর মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা (The only Complete code of life)। মানব জীবনের এমন কোন দিক বিভাগ নেই যার জন্যে ইসলাম সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা পেশ করেনি। পৃথিবী নামক এ গ্রহে মানুষ এমনি আসেনি। একটি পরিকল্পনার আওতায় আল্লাহ এখানে মানুষ পাঠিয়েছেন। এখানকার জড় জগতের যে পরিবেশ, তা দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় নয়। একটি সমন্বিত আইন (Uniform Order)-এর আওতায় সুশৃংখল ব্যবস্থাপনা মেনেই সবকিছু চলছে। এ একই ব্যবস্থাপনার রজ্জুতে বাঁধা আছে মহাকাশের বিশাল আকৃতির অগণিত গ্রহ-নক্ষত্র। মহাশূন্যের মহা সমুদ্রে এগুলো ভাসছে নিজ নিজ কক্ষপথে কত শত কোটি বছর ধরে কে না জানে। কিন্তু একের পথে আরেকটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। একটার সাথে আরেকটার সংঘর্ষও হচ্ছে না। তাই জড়জগত সুশৃংখল ব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে আছে জ্ঞান বুদ্ধি আর বিবেকের অধিকারী মানুষের কাছে।
জড়জগতের এ একই বিধান শাসন করছে প্রাণীর দেহজগতকে। তাই ছোট বড় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য-ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্নায়ুতন্ত্রী এবং সংখ্যাহীন জীবকোষ একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বিত ব্যবস্থাপনার গ্রন্থিতে থেকে কাজ করে বলেই প্রাণীর দেহ সত্তা বাঁচার সংগ্রামে নিয়োজিত থাকতে পারে। এখানেও একটির সাথে অপরটির, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষের সাথে বড় ছোট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিবর্তে সংযোগ ও সহযোগিতারই এক অনন্য ব্যবস্থাপনার জীবন্ত উদাহরণ দেখা যায়।
জড়জগত আল্লাহর নিরংকুশ কর্তৃত্ব-শৃংখলা এবং শক্তির যে অনাবিল উদাহরণ নিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে আছে, মানুষের আচরণগত জীবনেও আল্লাহ একই ধরনের ব্যবস্থাপনা ও শান্তির পরিবেশ কায়েম করতে চান। তাই মানুষের সামগ্রিক জীবনের জন্য বিধান দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষের জীবনের ক্রিয়া-কর্মে, আচার-আচরণে একমাত্র আল্লাহরই নিরংকুশ কর্তৃত্ব বা ব্যবস্থাপনা চলবে। সমস্ত সুসংগঠিত কার্যাবলীর জন্যই ব্যবস্থাপনা একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। সকলের জন্য মানবাধিকার, ন্যায় ও ইনসাফ নিশ্চিতকরণ এবং পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনে সফলতা লাভে ইসলামী ব্যবস্থাপনা অনুসরণের বিকল্প কিছু নেই। ইসলামে ব্যবস্থাপনা একটি পরিকল্পিত ধারণা। সংগঠনের চাবিকাঠি হলো ভালো ব্যবস্থাপনা।
২. ব্যবস্থাপনার অর্থ (Meaning of Management)
ইংরেজী Management শব্দটি ল্যাটিন Maneggiare শব্দ থেকে উদ্ভূত যার বাংলা হচ্ছে ব্যবস্থাপনা। ব্যবস্থাপনা হলো কোন বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যাবলীকে পরিচালনা করা। ব্যবস্থাপনা এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া যা প্রতিটি সংগঠন/প্রতিষ্ঠানেই পরিব্যাপ্ত। একটি দেশের প্রধান ব্যক্তি থেকে শুরু করে একজন সাধারণ মানুষের জীবন ও কর্মপ্রবাহে ব্যবস্থাপনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
ইংরেজী Management শব্দের বর্ণমালা লম্বভাবে (Vertical) ব্যাখ্যা এবং নিম্নোক্ত ইতিবাচক শব্দ গঠন করে ব্যবস্থাপনার কাঙ্ক্ষিত ভাবধারা সুন্দরভাবে পরিস্ফূট করা যায়-
M- Ministrate সেবা করা-সাহায্য করা, Motivation প্রেষণা, Morality নৈতিকতা, Merit মেধা, Manage নিয়ন্ত্রণ করা। সেবা প্রদান, ব্যবস্থাপনা পরিচালনার মৌল উপাদান হলো নৈতিক শক্তি, দক্ষতা ও মেধা।
A- Ability যোগ্যতা, Acquire অর্জন করা, Abide by পালন করা-মেনে চলা, Attention মনযোগ, Adhere to লেগে থাকা। ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত কর্মর্তাদের ক্ষমতা, কর্তৃত্ব থাকে বিধায় তাদের আইন-বিধি সময়মত সঠিকভাবে প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করার মত যেমন যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, তেমনি কাজে মনোযোগীও হতে হবে।
N- Neutral নিরপেক্ষ, Nursing লালন পালন, Nourish পরিচর্যা, Novelty (নতুনত্ব) নিরপেক্ষভাবে দায়িত্বপালন এবং পরিচর্যার মাধ্যমে সকলের সেবা এবং সকলের জন্য প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ সৃষ্টি করাই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য।
A- Approach নিকটবর্তী হওয়া, Appraisal মূল্যায়ন, Assert অধিকার দাবী করা, Accountability জবাবদিহিতা
G- Good governance, সুশাসন-ভাল ব্যবস্থাপনা, Gear up গতিবেগ বাড়ানো
E- Ethics নীতি, Eagerness আগ্রহ
M- Modify বদলে দেয়া, Maintenance রক্ষণাবেক্ষণ
E- Excellence উত্তমভাবে করা, উৎকর্ষ সাধনে অদম্য, Energetic উদ্যমী
N- Negotiate আলাপ-আলোচনা, Neat সুবিন্যস্ত, Nice চমৎকার, Normalise নিয়মানুগ করা Neutrality নিরপেক্ষতা বজায় রাখা
T- Tact কৌশল, Truthfulness সত্যবাদিতা, Trust বিশ্বাস, Trustworthiness বিশ্বাসযোগ্যতা, Tolorance সহিষ্ণুতা Transparent স্বচ্ছ। বিশ্বাসযোগ্যতা, সহিষ্ণুতা এবং লাগসই বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগ করার ক্ষমতা ব্যবস্থাপনার সুনাম বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব হলে সন্দেহ ও অবিশ্বাস মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
৩. ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা (Definition of Management)
বিভিন্ন লেখক ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। ব্যবস্থাপনার কয়েকটি প্রামাণ্য সংজ্ঞা নিম্নরূপ :
১. লুইস এ.এলেন এর মতে, ব্যবস্থাপক যা করেন তা-ই ব্যবস্থাপনা। (Management is what a manager does.)
২. এল এপলী এর মতে, ব্যভস্থাপনা হলো অন্য লোকদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাজ করিয়ে নেয়া।’ (Management is essentially an act of getting things done through the afforts of other people.)
৩. আধুনিক পাশ্চাত্য ব্যবস্থাপনার জনক হিসেবে পরিচিত হেনরী ফ্যায়ল (Henry Fayol ১৮৪১-১৯২৫) এর মতে, ব্যবস্থাপনা হলো পূর্বানুমান এবং পরিকল্পনা, সংগঠন, নির্দেশনা, সমন্বয় সাধন ও নিয়ন্ত্রণ করা। (To manage is to forecast and plan, to organise, to command, to coordinate and control.)
৪. জর্জ আর টেরীর মতে, ‘ব্যবস্থাপনা হচ্ছে এমন একটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া যা মানুষ ও অন্যান্য সম্পদসমূহ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যসমূহ নির্ধারণ করে, ঐ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা, সংগঠন, প্রবৃত্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যাদি সম্পাদন করে’। (Management is a distinct process consisting of planning, organizing, actuating and controlling, performed to determine and accomplish the objectives by the use of people and resources.)
৫. ড. এম. এ. মাননান ও ড. মো. আতাউর রহমানের মতে, পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মানবীয় ও অমানবীয় সম্পদের ব্যবহার করে পরিকল্পনা, সংগঠন, নির্দেশনা এবং নিয়ন্ত্রণের দ্বারা কার্য সম্পাদনের অবিরাম প্রক্রিয়াকে ব্যবস্থাপনা বলা হয়।
মূলত: ব্যবস্থাপনা একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। এর পূর্ব নির্দ্ধারিত অনেকগুলো বিষয় থাকে। আর এ উদ্দেশ্যসমূহ অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মানবীয় এবং বস্ত্তগত সম্পদসমূহের দ্বারা পরিকল্পনা, সংগঠন, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা কার্য সম্পদন করা হয়।
৪. ইসলামী ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা (Definition of Islamic Mangement)
ব্যবস্থাপনার সাথে ইসলামী শরীয়াতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কুরআনুল কারীমে ব্যবস্থাপনা বুঝায় এমন শব্দের উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ বলেন, الاَّ اَنْ تَكُوْنَ تِجَارَةً حَاضِرَةً تُدِيْرُوْ نَهَا بَيْنَكُمْ এ আয়াতাংশে ব্যবহ্নত তুদীরা-ইদ্যরা শব্দ থেকে ব্যবস্থাপনা শব্দ এসেছে। ইসলামী ব্যবস্থাপনার কতিপয় সজ্ঞা নিম্নরূপ :
ড. মো. গোলাম মহিউদ্দিনের মতে, ইসলামী ব্যবস্থাপনা বলতে পরিকল্পনা, সংগঠন, নেতৃত্ব এবং সংগঠনের কর্মীবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও এর সকল সম্পদ ব্যবহারের এমন একটি প্রক্রিয়াকে বুঝায় যার ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত বিধান এবং মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রদর্শিত নির্দেশনা, সে সাথে জবাবদিহিতার মনোভাব, বিশ্বস্ততা এবং দক্ষতা ব্যবহারের মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত উদ্দেশ্যাবলী অর্জন করা। (Islamic management is the process of planning, organizing, leading and controlling the effects of organizational members and of using all other organizational resources depending upon the guidance of Allah (swt) and His Prophet (saw) with an accountable mentality, integrity and skill to achieve the predetermined objective.)
ড. মো. আতাউর রহমানের মতে, ইসলামী ব্যবস্থাপনা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যা ইসলামী শরী‘আহ প্রদর্শিত নিয়মাবলী এবং মূলনীতির ভিত্তিতে অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া হয়। (Islamic Management is a process of getting things done by others by applying only the rules and principles prescribed by the Islamic Shariah)
ড. সাইয়েদ মুহাম্মদ আতাহার এর মতে, Islamic management is defined as management that follows the rules and regulations of Islam to achieve the halal objectives of organization through group efforts and co-operations of the organisational members.
৫. ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Management)
সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কতকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ :
১. ব্যবস্থাপনা উদ্দেশ্যভিত্তিক।
২. ব্যবস্থাপনা কোন কিছু করতে সাহায্য করে।
৩. ব্যবস্থাপনা অন্যের প্রচেষ্টার দ্বারা, সহায়তায় এবং অন্যের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন করে থাকে।
৪. ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতার জন্য বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা ব্যবহার করা দরকার।
৫. ব্যবস্থাপনা কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ নয় বরং ব্যবস্থাপনা একটি কার্য।
৬. ব্যবস্থাপনা কম্পিউটারের বিকল্প নয় বরং কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার সহায়ক।
৭. ব্যবস্থাপনা দলগত প্রচেষ্টার সাথে জড়িত।
৮. মানুষের জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার বিশেষ।
৯. ব্যবস্থাপনা অস্পর্শনীয়।
১০. যারা ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করে তারা সাধারণত মালিকের মত নয়।
৬. ইসলামী ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Islamic Management)
বিভিন্ন ইসলামী ব্যবস্থাপনা বিশারদ ইসলামী ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্যসমূহ চিহ্নিত করেছেন। ইসলামী ব্যবস্থাপনার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ :
১. কুরআন এবং সুন্নাহ ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা (Quran and sunnah based Management)
২. সততা (Honesty)
৩. হালাল উদ্দেশ্যাবলী (Halal objectives)
৪. হালাল কার্যপ্রণালী, পদ্ধতি, টুলস এবং কৌশল ব্যবহার (Use of halal procedures, methods, tools and techniques).
৫. ইসলামের নিয়মাবলী, বিধি-বিধানের অনুসৃতি (Following rules and regulations of Islam.)
৬. গ্রুপ প্রচেষ্টা ও গ্রুপ সহযোগিতার উপর জোরদান (Emphasis on group efforts and group Coopenation.) ব্যবস্থাপনা একটি দলভুক্ত লোকের পারস্পরিক অথবা একাধিক দলভুক্ত লোকের পারস্পরিক কার্যাবলীর সাথে বিশেষভাবে জড়িত। কারণ কোন লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য বিভিন্ন দল পরস্পর পরস্পরের সহযোগিতা করে এবং ব্যবস্থাপনা এসব কাজকে এমনভাবে সংগঠিত, পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রণ করে যে, সমস্ত কাজ পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়।
৭. মানুষকে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা (Recognising human as the most important and valuable resource)
৮. সর্বোত্তম পন্থায় পরিকল্পনা গ্রহণ (Best way of planning)
৯. দক্ষতার সাথে সংগঠিতকরন (Efficient means of organizing)
১০. সময়মত সুষ্ঠু পরিচালনা (Better direction in time)
১১. সমন্বয় সাধনের সঠিক প্রচেষ্টা (Making coordinated efforts)
১২. সফল নেতৃত্ব (Successful leadership)
১৩. শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক (Good labour-management relations)
১৪. সমাজ কল্যাণমূলক লক্ষ্য নির্ধারণ (Social welfare orientated goal)
১৫. জবাবদিহিতা (Accountability)
ইসলামী ব্যবস্থাপনার অত্যন্ত সুপরিচিত বিষয় হচ্ছে জবাবদিহিতা। প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে নিজ নিজ পরিসর ও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। ইসলামে এ জবাবদিহিতার ৪টি পর্যায় রয়েছে- ১. নিজের বিবেকের কাছে (To self) ২. জনগণের কাছে (to the people) ৩. ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে (to hierarchy) ৪. আল্লাহর কাছে (To Allah) জবাবদিহিতা। ইসলাম সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসে। এই চতুর্বিধ জবাবদিহিতার কারণ হচ্ছে- ইসলামের দৃষ্টিতে কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব, শাসনক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা একটি আমানাত।
এ প্রসংগে একটি মশহুর হাদীস হচ্ছে নিম্নরূপ :
তোমরা জেনে রেখ তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল রক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং যিনি ব্যবস্থাপক এবং মানুষকে পরিচালনা করছেন, তাকে তার অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। পুরুষ বা পরিবার প্রধান তার পরিবারের লোকদের উপর তত্ত্বাবধান ও কর্তৃত্ব করেন সুতরাং তাকে পরিবারের অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। স্ত্রী হচ্ছেন ঘরের গৃহকর্ত্রী এবং সন্তানদের তত্ত্বাবধায়িকা তাকেও জবাবদিহি করতে হবে।
দায়িত্ব থেকে জবাবদিহিতা উদগত হয়। ইসলাম সবাইকে Accountable করতে চায়। এজন্যই মানুষের প্রতি মুহূর্তের কাজ রেকর্ড হচ্ছে। কিরামান কাতিবীন এ রেকর্ড করছেন। কুরআন বলছে, ‘এরা (হচ্ছে) সম্মানিত লেখক। যারা জানে তোমরা যা কিছু করছো।’
১৬. দৃশ্যমানতা, স্বচ্ছতা (Transparency)
স্বচ্ছতা হচ্ছে তথ্যে সকলের অবাধ প্রবেশাধিকার। কোন সিদ্ধান্ত বা কাজের ফলে যারা প্রভাবিত হয় তাদের সে সিদ্ধান্ত বা সম্পর্কিত সকল বিষয় জানা, বুঝা, প্রয়োজনে সংগ্রহে রাখার সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা।
ইসলাম একটা দৃশ্যমান ব্যবস্থাপনা (Transparent management) চায়। তবে সবকিছু বলে দিতে হবে এমনটিও নয়। যা গোপন করার মত নয় তা গোপন করা হবে না। হযরত উমার ফারুক (রা.) মসজিদে নববীতে খোতবা দিচ্ছিলেন সে অবস্থায় তাকে প্রশ্ন করা হয়। তাই ইসলামী ব্যবস্থাপনা মানুষের প্রশ্ন করার অধিকার থাকবে।
১৭. দক্ষতা ও ডেডিকেশন (Efficiency and Dedication)
প্রতিটি কাজ দক্ষতার সাথে করতে হবে। স্বর্ণযুগের মুসলিমরা অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। দক্ষ ও উত্তম মানের ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বা সহযোগী হওয়ার আর কোন বিকল্প নেই।
১৮. মাশাওয়ারা-পরামর্শ ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা (Consultation Management) পরামর্শ করা ও পরামর্শ দান।
ইসলামী ব্যবস্থাপনা Participative- অংশগ্রহণ মূলক। আল্লাহর ঘোষণা-
وَاَمْرُهُمْ شُوْرى بَيْنَهُمْ.
অর্থ- তারা পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে। অর্থাৎ যাবতীয় কর্মকান্ড সম্পাদনে পারস্পরিক পরামর্শই হয় তাদের কর্মপন্থা। ‘হে (রাসূল) সকল কাজকের্ম তাদের (সহকর্মীদের) সাথে পরামর্শ করুন, অতপর (সে পরামর্শের ভিত্তিতে) আপনি কোন সংকল্প করলে আল্লাহর উপর নির্ভর করুন।’
সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যবস্থাপনায় এ নীতিটি অনুসৃত হতে হবে। ইসলাম সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশে সকলের সাথে পরামর্শক্রমে যৌথভাবে কোন কিছু করার বা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পরে তাতে কারো দ্বিমত পোষণ করা চলে না।
১৯. ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার (Proper use of power)
২০. ন্যায্য বেতন/মজুরী ও ভাতা নির্ধারণ (Fair wages and benefits)
২১. সর্ববিধ প্রচেষ্টা ও নিষ্ঠা (Utmost efforts and sincerity)
২২. সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ (Maximize utilization of resources).
২৩. সর্বোচ্চ মানের নৈতিকতা, সদাচরণ এবং নীতির অনুসৃতি (Maintaining high morality and ethics).
২৪. প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ সৃষ্টি (Creating Competitive environment).
২৫. ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা (Freedom of thinking and performing within the framework of Islam).
২৬. বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা (Scientific Management) : ইসলামী ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি (Scientific basis) রয়েছে।
২৭. হিকমত বা উত্তম কৌশল (Hikmah) : উত্তম কৌশল ইসলামী ব্যবস্থাপনার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর রহমত ও বারাকাহ তারাই প্রাপ্ত হন যারা উত্তম কৌশল নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করেন। বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করেই কৌশল নির্ধারণ করতে হয়।
২৮. নেককাজে প্রতিযোগিতা সাধারণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত (Competition is a common strategy in good deeds) : ইসলামী ব্যবস্থাপনায় ভাল কাজে প্রতিযোগিতা একটি কমন স্ট্রাটেজি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২৯. চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকালীন কল্যাণ লাভ (Ultimate aim and objective is to have blessings and pleasure of Allah in here and hereafter) : ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ব্যবস্থাপনায় ইহকালীন কর্মকান্ডের জন্য পরকালীন মুক্তি বা শাস্তির এমন দ্ব্যর্থহীন বা দৃঢ় ঘোষণা দেয়া হয়নি। ইসলামে সুকৃতি বা হালাল ব্যবস্থাপনা কর্মকান্ডের জন্য ইহকালীন কল্যাণের সুসংবাদের পাশাপাশি পারলৌকিক জীবনেও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
৭. ইসলামী ব্যবস্থাপনা ও প্রচলিত ব্যবস্থাপনার পার্থক্য (Contrasts of Islamic Management with Conventional Secular Management)
পার্থক্যের ভিত্তি ইসলামী ব্যবস্থাপনা প্রচলিত ব্যবস্থাপনা
১. সংজ্ঞা
(Definiton) ইসলামী ব্যবস্থাপনা বলতে বুঝায় এমন ব্যবস্থাপনাকে যেই ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানের বৈধ উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে ইসলামের নিয়ম পদ্ধতি সমূহ অবলম্বন এবং দলগতভাবে প্রতিষ্ঠানের সকল সহযোগিতা গ্রহণ করা হয়। প্রচলিত ব্যবস্থাপনা বলতে বুঝায় এমন ব্যবস্থাপনাকে যেখানে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য পূরণে দলগতভাবে প্রতিষ্ঠানের সকল সদস্যের সহযোগিতা গ্রহণ করা হয়।
২. প্রকৃতি
(Nature) ইসলামী ব্যবস্থাপনা ধারণ করা হয়েছে ইসলামের নিয়মকানুন এবং নৈতিকতার আলোকে। প্রচলিত ব্যবস্থাপনা ধারণ করা হয়েছে প্রচলিত নিয়মনীতি ও পুঁজিবাদী এবং ধর্মহীনতার দর্শনের আলোকে।
৩. ভিত্তি
(Basis) ইসলামী ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হল আল-কুরআন, আস্-সুন্নাহ এবং ইজতিহাদ। প্রচলিত ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হল মানব রচিত তথ্য এবং ধর্মহীন দর্শন।
৪.লক্ষ্য- উদ্দেশ্যাবলী (objectives) ইসলামী ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালাকে
সন্তুষ্ট করা। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাঁর দাসত্ব এবং পার্থিব সকল কর্মকান্ডের সুষ্ঠু পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করা। প্রচলিত ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চ মুনাফা লাভের মাধ্যমে মালিক পক্ষকে সন্তুষ্ট করা।
৫. শিকড়/মূল এবং সংযোগ
(Root and linkage) ইসলামী ব্যবস্থাপনার মূল এবং আনুসংগিক বিষয়গুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে জবাবদিহীতা তথা পরকালীন জীবনের সাথে। প্রচলিত ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সম্পর্ক ধর্মহীনতা এবং বস্ত্তবাদী জীবনের সাথে।
৬. ইসলামে অনুমোদনের পর্যায় (Recognition
in Islam) ইসলামী ব্যবস্থাপনাকে এর যথার্থতার ভিত্তিতে ইবাদাত হিসাবে অনুমোদন করা হয়। এই জাতীয় কোন অনুমোদন প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় নেই।
৭.দর্শন (Philosophy) ইসলামী ব্যবস্থাপনার দর্শন হলো ইহকলীন পরকালীন জীবনের সমন্বয় সাধন করা। প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় এধরনের কোন সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেই। প্রচলিত আধুনিক ব্যবস্থাপনা পার্থিব কেন্দ্রিক হওয়ায় মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে অবহেলা করা হয়। অহীর জ্ঞান অনুসৃত না হওয়ায় এবং মানব রচিত বিধান অনুসৃত হওয়ায় এমনটি ঘটে।
৮. উপায়-উপকরণ
(Ways and means) ইসলামী ব্যবস্থাপনা শরীয়াতের বিধানের আওতাধীন, তাই লক্ষ্য অর্জনের উপায় উপকরণগুলোও শরীয়াসম্মত হয়েথাকে। আধুনিক ব্যবস্থাপনা মেকিয়াভেলীর নীতিতে বিশ্বাসী। এ ব্যবস্থাপনায় লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কোন পদ্ধতিই বৈধ।
অর্থাৎ Ends justfy the means.
৯. যোগ্যতা
(Qualification) ইসলামী ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত দক্ষতা-ইসলামিক যোগ্যতা অপরিহার্য। প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় কেবল প্রযুক্তিগত যোগ্যতা অপরিহার্য্য।
১০. সিদ্ধান্তগ্রহণ
(Decision making) শরয়ী বৈধতার শর্তে সংখ্যাধিক্যের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় সিদ্ধান্ত
গ্রহণের জন্য সংখ্যাধিক্যের মতামতের প্রয়োজন হয় না, এখানে বৈধ/অবৈধ এর ভিত্তি নেই।
১১. এক নায়কত্বের সুযোগ (Scope of Autocracy) ইসলামী ব্যবস্থাপনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে একনায়কত্বের সুযোগ নেই। প্রচলিতি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে একনায়কত্বের ব্যবহার হতে পারে।
১২.নিয়ন্ত্রণ (Controlling) ইসলামী নৈতিকতা এবং নিয়মনীতির সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। লোকবল সব সময় আশ্বস্ত এবং অধিক বিনয়ী, সুতরাং তারা প্রকৃতিগতভাবে স্বনিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রণ অধিকতর জটিল এবং প্রথাগত, এখানে কোন নৈতিক বা আদর্শগত নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নেই।
১৩.নৈতিকতা Morality ইসলামী ব্যবস্থাপনা ইসলামী নৈতিকতার সাথে একীভূত, সংযুক্ত। প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় নৈতিকতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
৮. ইসলামী ব্যবস্থাপনার মৌলিক উদ্দেশ্যাবলী
১. মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, হাক্কুল ইবাদকে প্রতিষ্ঠা এবং তা আল্লাহর নির্দেশের ভিত্তিতে হওয়া।
২. মানুষের মৌলিক মর্যাদা (basic dignity) কে এক্ষেত্রে সামনে রাখতে হবে। মানুষের basic dignity সমান। তাকওয়া ছাড়া মর্যাদার বেশ-কম নেই।
اِنَّ اَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ اَتْقَكُمْ -
নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি যে সর্বাধিক মুত্তাকী।
৩. আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা (Establishing Justice and Equity)
اِنَّ اللهَ يَامُرْ بِالْعَدْلِ وَالاِحْسَانِ আল্লাহ আদল (ন্যায়পরায়ণতা) ও সদাচরণের আদেশ দিচ্ছেন।
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَّعَدْلاً আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও আদলে (Justice) পরিপূর্ণ।
اِعْدِلُوْ هُوَ اَقْرَبُ لِلتَقْوى সুবিচার কর (be just), সুবিচার তাকওয়ার নিকটবর্তী।
আমি অবশ্যই আমার রাসূলদেরকে কতিপয় সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ (মানুষদের কাছে) প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ (justice) প্রতিষ্ঠা করে।
৯. বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা (Scientific Management)
সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনার কাজকর্ম সম্পাদনের পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা (Scientific Management) বলে। কোন প্রকার আন্দাজ-অনুমান, পুরাতন পদ্ধতি, সেকেলে যন্ত্রপাতি, অদক্ষ কৌশল প্রভৃতি ব্যবহার করে নয় বরং সম্পূর্ণ পরিকল্পিত উপায়ে, নতুন পদ্ধতিতে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারপূর্বক দক্ষ কৌশল প্রয়োগ করে কর্মীদের সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় এমন প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা বলা হয়।
মার্কিন নাগরিক এফ ডব্লিউ টেলরকে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার প্রবক্তা বলা হয়।
বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার নীতিমালা (Principles of Scientific Management)
১. পুরাতন রীতিনীতির পরিবর্তে বিজ্ঞান সম্মত নিয়মের প্রবর্তন (Science, not rule of thumb)
২. বিরোধ সৃষ্টির পরিবর্তে দলীয় কার্যের মধ্যে সৌহার্দ্য আনয়ন (Harmony, not discord)
৩. ব্যক্তির প্রচেষ্টার পরিবর্তে পরস্পরের মধ্যে সহাযোগিতা (Cooperation, not individualism)
৪. নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের পরিবর্তে সর্বাধিক উৎপাদন (Maximum output in place of restricted output)
৫. প্রতিটি ব্যক্তির সার্বিক দক্ষতা ও উন্নয়ন অর্জন (The development of each man to his greatest efficiency and prosperity)
বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য (Objectives of Scientific Management)
১. কারবার প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতার পরিমাণ সর্বাধিক করা।
২. উৎপাদন কার্যে স্বল্প ব্যয় এবং অপচয়-অপব্যয় কমানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক উন্নতি ত্বরান্বিত করা।
৩. প্রতিষ্ঠানে যাতে চিরাচরিত পদ্ধতির পরিবর্তে ভবিষ্যতে সর্বদাই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা এবং আগ্রহ সৃষ্টি হয় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৪. কার্যসম্পাদন দক্ষতা তথা উৎপাদনশীলতার উপর ভিত্তি করে শ্রম বিভাজন করা।
৫. কারবার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক সৃষ্টি করা।
৬. কারবার প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মীর কর্মক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সেই লক্ষ্যে তাদের প্রত্যেকের দক্ষতা ও সম্ভাবনার উন্নয়ন সাধন করা।
প্রচলিত ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে পার্থক্য
(Difference between Conventional and Scientific Management)
প্রচলিত ব্যবস্থাপনা বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা
১. অপরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনা কার্যসম্পদিত হয়।
২. এ পদ্ধতি অদক্ষতা নির্ভর।
৩. প্রচলিত পদ্ধতি অনুসৃত হয়।
৪. কর্মদক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়না।
৫. কর্মীদের মধ্যে হানাহানি সৃষ্টির আশংকা থাকে।
৬. কর্ম বণ্টনের কোন পরিকল্পনা থাকে না।
৭. কর্মী নিয়োগের কোন উন্নত পদ্ধতি নেই।

৮. গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেই।
৯. দক্ষ ও অদক্ষ উভয় শ্রমিককে একই হারে মজুরি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। ১. সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনা কার্যসম্পাদিত হয়।
২. এই পদ্ধতি দক্ষতা নির্ভর।
৩. আধুনিক ও সর্বশেষ উদ্ভাবিত পদ্ধতি অনুসৃত হয়।
৪. কর্মদক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
৫ কর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকে।
৬. শ্রম বিভাজনের চমৎকার নির্দেশনা আছে।
৭.সর্বোৎকৃষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করে কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
৮. উপযুক্ত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়।
৯. দক্ষ ব্যক্তিদের উচ্চহারে এবং অদক্ষদের নিম্নহারে মজুরীর ব্যবস্থা করা হয়।
চিরাচরিত গতানুগতিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা। সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি, মানুষের কল্যাণ সাধন ও সেবা প্রদান বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার প্রধান উদ্দেশ্য। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানিক কল্যাণ লাভ করা সহজ হয়। ইসলামী ব্যবস্থাপনা মূলত : বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা।
১০. ইসলামে ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব (Importance of management in Islam)
ইসলামে ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ নিম্নরূপ :
১. দক্ষতা সুনিশ্চিতকরণ (Ensures efficiency)
২. প্রতিষ্ঠানের/সংগঠনের সফলতা (Institutional Organizational success)
৩. উৎপাদনমুখী মানবীয় প্রচেষ্টা (Productive human effort)
৪. সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার (Optimum utilization of resources)
৫. প্রযুক্তির ব্যবহার (Use of technology)
৬. জীবনযাত্রার মানউন্নয়ন (Improvement of standard of living)
৭. শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক (Good labour-management relations)
৮. বড় ধরনের উৎপাদন (large scale production)
৯. কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি (Employment opportunity)
১০. সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচী (Corporate social responsibility) বাস্তবায়ন
১১. শৃংখলা আনয়ন/প্রতিষ্ঠা (Establishment of discipline)
১২. পরিবেশ সংরক্ষণ (Maintaining environment)
১৩. নৈতিকতার উন্নয়ন (Improving ethics)
১৪. যথাযথ পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকরণ (Ensuring proper planning and control).
১১. ইসলামী ব্যবস্থাপনার মূলনীতি (Principle of islamic management)
কিছু মানুষের প্রচেষ্টার দ্বারা বিশেষ প্রক্রিয়া বা পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে কোন কাজ সম্পাদন করে নেয়াকেই ব্যবস্থাপনা বলা হয়। মানবীয় কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা একটি ছোট কর্মক্ষেত্র থেকে বৃহত্তর পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সংগঠন পর্যন্ত বিস্তৃত। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অণু যেমন আল্লাহ পাকের ব্যবস্থাপনার আওতা থেকে মুক্ত নয় তেমনি মানুষ এবং মানবীয় কোন সংগঠন তাঁর ব্যবস্থাপনা থেকে নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থাপনাকে প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে খলীফা বা প্রতিনিধি করে এ পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে মূলনীতি হিসেবে এটা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে সব কিছুর মালিক আল্লাহ। তাই ব্যবস্থাপনায় আইনগত কর্তৃত্ব থাকবে তাঁরই। মানুষ তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে যাবতীয় দায়িত্বপালন করবে। ইসলামী ব্যবস্থাপনার সর্বজনীন কাঠামোগত মূলনীতি পেশ করে সূরা আন নিসার ৫৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الأَمْرِ مِنكُمْ - فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ-
অর্থ : তোমরা যারা ঈমান এনেছ, আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রাসূলের আর তোমাদের মধ্যেকার কর্তৃত্বশীলদের। অতএব তোমাদের মধ্যে যদি কোন বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তবে তার মীমাংসার জন্য আল্লাহর এবং রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করো- যদি তোমরা আল্লাহ এবং শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখো।
এ আয়াত থেকে ইসলামী ব্যবস্থাপনার ৬টি মূলনীতি স্পষ্ট হয়ে উঠে :
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য শর্তহীন ও নিরংকুশ।
২. কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য শর্তসাপেক্ষ অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের অধীন।
৩. কর্তৃত্বশীলদেরকে আল্লাহর অনুগত হতে হবে।
৪. ব্যবস্থাপক ও পরিচালিতদের মধ্যে মতপার্থক্যের সুযোগ রয়েছে।
৫. সৃষ্ট বিরোধের মীমাংসার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আইনই হবে চূড়ান্ত।
৬. ঊর্ধ্বতন ও অধ:স্তনদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার জন্যে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকতে হবে।
ইসলামে ব্যবস্থাপনার নীতিমালা (Principles of Management in Islam)
আমরা জানি, ইসলাম একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। কাজেই ইসলামে ব্যবস্থাপনার কিছু নীতিমালা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ আল্লাহ তাআলা ইসলামকে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাধ্যমে পূর্ণতা দান করেছেন বলে ঘোষণা করেছেন। এছাড়া রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), তাঁর সাহাবীগণের আমল এবং পরবর্তীকালে শতাধিক বৎসরকাল যাবৎ পৃথিবীর অনেক দেশেই ইসলামী শাসন, ব্যবস্থাপনা কাঠামো, রাজনীতি এবং প্রশাসন ব্যবস্থা বলবৎ ছিল। শুধু তাই নয় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), তাঁর চার খলিফা এবং অন্যান্য অনেক শাসকের আমলে অত্যন্ত দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন ব্যবস্থা বলবৎ ছিল। কাজেই সে সময়কার ব্যবস্থাপনা নীতিমালাও ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নীতিমালা। ইসলামী ব্যবস্থাপনার সেই নীতিগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ :
১. দক্ষতা ও সততা (Efficiency and Honesty) : প্রত্যেক ব্যবস্থাপককে হতে হবে অত্যন্ত দক্ষ, জ্ঞানী, সৎ, সত্যবাদী, আল্লাহভীরু এবং কর্মঠ। হাদীসে আছে ‘‘চৌকস ও দক্ষ কর্মীকে আল্লাহ ভালবাসেন।’’ কুরআনের ঘোষণা হলো- হযরত ইউসুফ (আ.) বলেন, ‘‘দেশের অর্থভান্ডার আমার নিকট সোপর্দ করুন, আমি হেফাজতকারী ও জ্ঞানী।’’ যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি কখনও সমান হতে পারে?
২. দেশপ্রেমিক (Patriot) : প্রত্যেক ব্যবস্থাপক এবং সকল কর্মকর্তাকে দেশপ্রেমিক হতে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠান ও দেশের স্বার্থবিরোধী পণ্য উৎপাদন, বিক্রয়, চুক্তি সম্পাদন বা এগুলো থেকে বিরত থাকা সবই ঘটতে পারে। একটি আরবী প্রবাদে আছে ‘‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।’’ সকল ব্যবস্থাপক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। দেশপ্রেমে ঘাটতি থাকলে অনৈতিক কর্মকান্ড, দেশবিরোধী, জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ হয়ে যেতে পারে যা ব্যবস্থাপনার জন্য ক্ষতিকর।
৩. উপযুক্ত পদে সঠিক ব্যক্তি নিয়োগ (Right man in the right place) : প্রত্যেক যোগ্য ব্যক্তিকে (তিনি যে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ) উপযুক্ত পদে নিয়োগ করতে হবে এবং তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ইমামতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন, যাঁর কণ্ঠস্বর সুমিষ্ট তাঁকে আযান দিতে নিয়োগ করেছেন, যিনি খুব সাহসী, বীর যোদ্ধা ও কৌশলী তাকে সেনাপতি নিয়োগ করা হয়েছে। এগুলো সবই উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত পদ দান নীতির উদাহরণ।
৪. নিয়মানুবর্তিতা (Discipline) : ব্যবস্থাপনাকে কড়াকড়িভাবে নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায, রমাদান মাসে নির্দিষ্ট সময়ে রোযা রাখা, জিলহজ্ব মাসে হজ্ব ইত্যাদি বিধান ইসলামে নিয়মানুবর্তিতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যখনই কোন বিশৃংখলা পরিদৃষ্ট হতো তখনই হযরত জিবরাঈল (আ) কে পাঠিয়ে আল্লাহ তাঁর রাসূলের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীদের তা শিখিয়ে দিতেন। কাজেই ইসলামী ব্যবস্থাপনা অফিসে নিয়মিত উপস্থিতি, অবস্থান, পরিত্যাগ, অর্পিত দায়িত্ব যথারীতি পালন প্রভৃতি ব্যাপারে অত্যন্ত নিয়মানুবর্তি।
৫. শ্রম বিভাজন (Divison of Labour) / কর্ম বিভাজন (Division of work) : শ্রম বিভাজন ইসলামী ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি। পারদর্শী ব্যক্তিদের মধ্যে উপযুক্ত পরিমাণ কাজের ভার চাপানো যাবে। সামর্থ্যের অতিরিক্ত কার্যভার কাউকেই দেয়া যাবে না। কুরআনের সূরা আল বাকারায় বলা হয়েছে ‘‘কারো উপর সাধ্যাতীত বোঝা (সামর্থ্যের অতিরিক্ত কিছু) চাপানো ঠিক নয়। হায়সামী থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, ‘‘নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না এবং অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না।’’
৬. আদেশ ও নির্দেশনার ঐক্য (Unity of command and unity of direction) : প্রতিটি কর্মকর্তাকে অবশ্যই তাঁর ঊর্ধ্বতন নির্বাহীর আদেশ ও নিষেধ পালন করে চলতে হবে। কালামে পাকে মানুষকে বহুবার সীমালংঘন না করার জন্য বলা হয়েছে এবং নবীর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অবাধ্য না হবার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাদীসে বলেন, ‘‘কুরআন এবং হাদীসের নির্দেশনা অনুসারে কোন কাফ্রী ক্রীতদাসও যদি তোমাদের নির্দেশ দেয় তথাপি তোমরা তার অবাধ্য হয়ো না।’’
৭. কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ (Centralization and Decentralization) : ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ ইসলামী ব্যবস্থাপনার আরেকটি অন্যতম প্রধান নীতি। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর প্রাদেশিক গভর্ণরদের কাছে পর্যাপ্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধান স্থানীয়ভাবে করার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করতেন। এমনকি, সংগৃহীত যাকাতের অর্থ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকাতেই খরচের ব্যবস্থা করা হতো। তবে জনস্বার্থ বিরোধী কোন সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিধান ছিল।
৮. প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের অগ্রাধিকার (Preference of Organization Interest) : ইসলামী ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে অবশ্যই ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পেলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ বিপন্ন হতে পারে। সূরা আল বাকারা এবং সূরা আল কাসাস-এ মালিক ও ব্যবস্থাপনার স্বার্থকে বড় করে দেখার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কারণ ইসলাম মনে করে যে মালিক ও প্রতিষ্ঠান যদি রক্ষা না পায় তাহলে কর্মচারিগণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কালামে পাকে বিশ্বাস ভঙ্গ ও অর্পিত কাজ ঠিকভাবে না করা এবং জিনিস বিনষ্ট করাকে খেয়ানতের সমতুল্য অপরাধ বলা হয়েছে।
৯. মজুরি (Remuneration/pay and benefits) : ইসলামে শ্রমিক-কর্মীদের মজুরি সম্পর্কে যত সুন্দর বিধান আছে আজ পর্যন্ত কোন অর্থনীতি এতো সুন্দর ব্যবস্থা নির্দেশ করতে সক্ষম হয়নি। সূরা বনি ইসরাঈল, সূরা আল হাশর, সূরা আন্ নাহল, সূরা আল হাদীদ প্রভৃতি সূরায় এবং সহীহ আল বুখারী, জামে আত্ তিরমিযী, সুনান ইবনে মাজাহ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে ব্যবস্থাপনা ও মালিক পক্ষের সাথে মজুরি চুক্তি/স্কেল নির্ধারণ, ন্যায্য মজুরি, অন্যান্য সুবিধা, অবসর ভাতা, সঞ্চয় তহবিল প্রভৃতি বিষয়ে অসংখ্য নির্দেশাবলী রয়েছে। যথারীতি বেতন ও মজুরি না দিলে মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাশরের দিন শ্রমিকের পক্ষ হয়ে আল্লাহর দরবারে মালিকের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করবেন বলে ঘোষণা করেছেন।
১০. হিজরত ও পদোন্নতি (Hijrat & Promotion) : শ্রমিক-কর্মীদের চাকরিতে নিয়োগের পরে দীর্ঘদিন তাদের একই পদে থাকতে বাধ্য করা যাবে না। আবার জোর-জবরদস্তি করে চাকরি করতেও বাধ্য করা যাবে না। কোন কর্মী হিজরত করে অন্য দেশে উচ্চ বেতনে চাকরি নিয়ে যেতে চাইলে তাকে সে সুযোগ দিতে হবে। অনেক সময় বেকারত্বের তাড়নায় দিশেহারা কর্মী বাধ্য হয়ে বন্ড দিয়ে
চাকরি নেয় এবং নির্দিষ্ট সময় ভাল বেতন বা সুযোগ পেলেও যেতে পারে না। একে যুল্মের সাথে তুলনা করা চলে।
১১. সবার জন্য ন্যায়বিচার (Justice for all) : ইসলামী ব্যবস্থাপনার আরেকটি প্রধান মূলনীতি হলো- সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণে প্রেরণ, অন্যান্য সুবিধা বণ্টন প্রভৃতি ব্যাপারে কর্মীতে কর্মীতে কোনরূপ বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না। সূরা আন্ নিসাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ তাকিদ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘‘তোমরা যখন লোকদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করবে তখন অবশ্যই ন্যায়বিচার করবে।’’ সূরা আল মায়িদায় বলা হয়েছে, ‘‘বিশেষ শ্রেণীর লোকদের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে কোন রকম অবিচার করতে উদ্বুদ্ধ না করে।’’ সূরা আন্ নিসায় আরো বলা হয়েছে, ‘‘ন্যায়বিচার করতে হবে যদি তা পিতামাতা ও নিকট আত্মীয়ের বিরুদ্ধেও যায়। পক্ষদ্বয় ধনী বা গরীব যাই হোক না কেন, তাদের উভয়ের চাইতে আল্লাহ তা‘আলার অধিকার অনেক বেশি, অতএব আপনি কখনো ন্যায় বিচার করতে নিজের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করবেন না।।’’
১২. ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা (United efforts) : ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার উপর ইসলামী ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। দলবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং সংঘবদ্ধ হয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোকে ইসলাম বাধ্যতামূলক করেছে। সূরা আলে ইমরানে এবং সূরা আন্ নিসাতে এ ব্যাপারে বিধান রাখা হয়েছে। ইসলামী ব্যবস্থাপনা বিশ্বাস করে যে, ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাবৃন্দ যদি পরস্পর বিচ্ছিন্ন থেকে কার্য সম্পাদন করে তবে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জন খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই যে কোন অবস্থায় সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকতে বলা হয়েছে এবং পরস্পর বিছিন্ন না হতে বলা হয়েছে।
১৩. শ্রমের মর্যাদা (Dignity of Labour) : ইসলামী ব্যবস্থাপনা কোন কাজকেই হেয় মনে করে না। সকল কাজই ইসলামের দৃষ্টিতে মূল্যবান যদি তা অবৈধ না হয়। শ্রমিককে আল্লাহ খুব ভালবাসেন। হাদীসে বলা হয়েছে, ‘‘শ্রমিক আল্লাহর বন্ধু।’’ যে শ্রমিককে আল্লাহ বন্ধু বলেছেন তার শ্রম কখনও অমর্যাদাকর হতে পারে না। ইসলামে তাই ব্যবস্থাপনার সকল স্তরের কাজকেই মর্যাদাকর বলা হয়েছে। হাদীসে শ্রমের মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়ে আরো বলা হয়েছে, ‘‘কর্মীর সবচেয়ে মঙ্গলজনক উপার্জন হলো তার নিয়োগকর্তার জন্য শ্রদ্ধা ও যত্ন নিয়ে কাজ করা।’’
১৪. ক্ষমা প্রদর্শন (Forgiveness) : ইসলামের আরেকটি মহান শিক্ষা হলো, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনিচ্ছাকৃত অপরাধ ক্ষমা করে দিতে হবে। শ্রমিক-কর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়ার জন্য নিয়োগকর্তার প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে জিজ্ঞেস করেন, ‘হুজুর খাদেম কর্মচারীদের অপরাধ কতবার ক্ষমা করবো? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চুপ করে রইলেন। ঐ সাহাবী পুনরায় তাই জিজ্ঞেস করলেন। তখন মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলেন, কর্মচারীদের প্রতিদিন সত্তর (৭০) বার হলেও ক্ষমা করে দিও। কারণ সে যে তোমার ভাই। অন্য আরেকটি হাদীসে আছে, শ্রমিক-কর্মীদের অপরাধ অসংখ্যবার ক্ষমা করা মহত্ত্বের লক্ষণ। হাদীসে আছে- ‘‘অসদাচরণকারী নিয়োগকর্তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’’ রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুধু বলেই দায়িত্ব শেষ করেননি, তিনি বাস্তবায়ন করেও দেখিয়ে গেছেন। তাঁর অধীনে একজন কর্মী সুদীর্ঘ ১০ বছর চাকরি করলেও কোনদিন তিনি তাকে ভৎর্সনা পর্যন্ত করেননি।
১৫. জবাবদিহিতা (Accountability) : ইসলামী ব্যবস্থাপনায় সকল স্তরের কর্মীদের মধ্যে জবাবদিহিতার আদর্শ সৃষ্টি হতে হবে। তার উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা সঠিকভাবে পালনের ব্যাপারে তাকে যে কৈফিয়ত দিতে হবে, এ অনুভূতি থেকেই জাবাবদিহিতার বিষয়টি এসে যায়। জবাবদিহিতার চাপ না থাকলে কর্মীদের মধ্যে শৈথিল্য চলে আসতে পারে। কাজেই ইসলাম আত্ম ও আনুষ্ঠানিক জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করেছে। সূরা বনি ইসরাঈলে বলা হয়েছে যে, তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করবে। প্রতিশ্রুতি (ওয়াদা) সম্পর্কে তোমাদের যে জবাবদিহি করতে হবে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সূরা যিলযালে জবাবদিহিতা সম্পর্কে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, অতএব যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ কোন ভাল কাজ করবে (সেদিন) তাও সে দেখতে পাবে। (ঠিক তেমিন) কোন মানুষ যদি অণু পরিমাণ খারাপ কাজও করে তাও সে (সেদিন তার চোখের সামনে) দেখতে পাবে। ইসলামী ব্যবস্থাপনা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুটি শর্ত আরোপ করেছে : ১. কার্য স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ২. সর্বপ্রকার সুবিধার ব্যবস্থা। কাজেই জবাবদিহিতা দাবি করার অধিকারও ইসলাম সংরক্ষণ করে।
১৬. আন্তরিকতা (Sincerity) : আন্তরিকতা ইসলামী ব্যবস্থাপনার এক অনন্য মূলনীতি।
১৭. কর্মের স্বাধীনতা (Freedom of work) : ইসলামী ব্যবস্থাপনায় কর্মের স্বাধীনতা স্বীকৃত। এজন্যই ইসলামী ব্যবস্থাপনায় কর্মীরা স্বতোৎসারিত হয়ে ব্যক্তিক উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত হয়।
১৮. অংশগ্রহণ (Participation) : অংশগ্রহণের চেতনা ইসলামে সুস্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ হলেই ইসলামী ব্যবস্থাপনা সাফল্য লাভ করে।
১৯. দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা (Taking responsibility) : প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং টার্গেট অর্জনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলাতে হয়, এজন্য দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা ইসলামী ব্যবস্থাপনার অন্যতম মূলনীতি।
২০. মিতব্যয়িতা (Economy) : মিতব্যয়িতার সাথে কর্মসম্পাদন ইসলামী ব্যবস্থাপনার অন্যতম যৌক্তিক নীতি। ইসলাম ইসরাফ ও তাবজীর পরিহার করতে বলেছে। ইসরাফ (Overuse) হলো অপচয়, অপরিমিত ব্যয়, বাহুল্য ব্যয়, অমিতব্যয়, বিনা প্রয়োজনে কোন কিছু ব্যয় করা, নষ্ট করা (Wastage)। ইসরাফ (Israf) হলো হালাল খাতে এমন ব্যয় যা প্রয়োজনাতিরিক্ত। বৈধ কাজেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করা। আল কুরআন ইসরাফ ও বিলাসবহুল ভোগকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছে। আল্লাহ বলেন, খাও, পান কর, ইসরাফ করো না, কারণ তিনি (আল্লাহ) ইসরাফকারীদের পছন্দ করেন না। আর তাবজীর (Tabzir) (Misuse) মানে অপব্যয়, হালাল সম্পদ হারাম কাজে ব্যয় করা, অশ্লীল কাজে ব্যয় করা, ইসলামের ক্ষতিসাধনে ব্যয় করা। অপব্যয় করা ইসলামে হারাম। ইসরাফের তুলনায় তাবজীরের ক্ষতি ব্যাপক। এজন্যই তাবজীরকারীদের শয়তানের ভাই চলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তাবজীরকারীরা হচ্ছে শয়তানের ভাই; আর শয়তান হচ্ছে তার মালিকের বড়োই অকৃতজ্ঞ।
২১. তাওয়াক্কুল (Tawakkul) : তাওয়াক্কুল ইসলামী ব্যবস্থাপনার অন্যতম মূলনীতি। আল-কুরআনে আল্লাহতে বিশ্বাসী মুমিনকে বলা হয়েছে, তোমরা যদি মুমিন হও তবে আল্লাহর উপর ভরসা কর। আয়াতচি হচ্ছে : ‘অতপর তোমরা আল্লাহ তা‘আলারকে ভয় করো, মুমিনদের তো আল্লাহ তা‘আলার ওপরই ভরসা করা উচিত। তাওয়াক্কুল মানে কর্মবিমুখতা নয়, নিষ্ক্রিয়তা নয়। তাওয়াক্কুল হতে হবে পক্ষীকুলের মত। ওরা ঘরে বসে থাকে না, আল্লাহর উপরই পরিপূর্ণ ভরসা রাখে। সকল উপায় উপকরণ ব্যবহার করে সেগুলোর সাফল্যের ব্যপারটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াই হচ্ছে প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
২২. বিশ্বাসযোগ্য অনুমান (Predictabitity) : বিশ্বাসযোগ্য অনুমান ইসলামী ব্যবস্থাপনার অন্যতম মূলনীতি। প্রতিষ্ঠানের কর্মী, সেবাগ্রহীতা ও অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের কাছে প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচী, নীতিমালা, কর্মপদ্ধতি, আদর্শ প্রভৃতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এসব ব্যক্তিবর্গের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ধারণা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।
১২. ইসলামী ব্যবস্থাপনার কার্যাবলী (Functions of Islamic Management)
বিভিন্ন খ্যাতনামা ব্যবস্থাপনা বিশারদ ব্যবস্থাপনার কার্যকে বিভিন্নভাগে ভাগ করেছেন। তবে সব লেখকই প্রধানত: ব্যবস্থাপনার চার ধরনের কার্যের কথা উল্লেখ করেছেন। সুতরাং ব্যবস্থাপনার কার্যকে ৪টি শ্রেণীতে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়। এগুলোকে ব্যবস্থাপনার মূলকার্য বলা যেতে পারে। কাজগুলো হলো : পরিকল্পনা, সংগঠন, নির্দেশনা এবং নিয়ন্ত্রণ। কেউ কেউ কর্মীসংস্থান (Staffing), মূল্যায়ন (Evaluation), প্রেষণা (Motivating) এবং যোগাযোগ (Communicating) কে আলাদাভাবে কার্য হিসেবে দেখিয়েছেন। ব্যবস্থাপনা জ্ঞান সংগঠিত করার জন্য ব্যবস্থাপকদের কার্যগুলো সহযোগী কাঠামো হিসেবে কাজ করে। সমস্ত নতুন ধারণা সমূহ, গবেষণালব্ধ জ্ঞান অথবা কৌশলগুলো ব্যবস্থাপনায় কার্যসমূহের সকল শ্রেণীকরণে সহজেই ফেলা যেতে পারে।
ইসলামী ব্যবস্থাপনার কার্যাবলীকে নিম্নোক্ত হুইলে দেখানো যেতে পারে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


১২.১ পরিকল্পন বা পরিকল্পনা প্রণয়ন (Planning)
পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক কাজ। পরিকল্পনা ছাড়া ব্যবস্থাপনার কথা ভাবাও যায় না। পরিকল্পনা বলতে ভবিষ্যতে কি করা হবে এর একটি প্রক্রিয়াকে বুঝায়। উল্লেখ্য যে, পরিকল্পনা (Plan) হলো পরিকল্পনের (Planning) ফল। পরিকল্পনা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়া আর কিছুই নয়। পরিকল্পনা হলো, ভবিষ্যতে কি হবে কিভাবে করা হবে এবং তা কে করবেন সে সম্পর্কে আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়া। ড্যান স্টেইনহফ (Dansteinhoff) এর মতে, পরিকল্পনা হলো লক্ষ্য প্রতিষ্ঠা এবং তা অর্জনের জন্য পদ্ধতি নির্ধারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্ত্ততি নেয়া। (Planning is preparing for the future of the firm by establishing objectives and the method of achieving them). পরিকল্পনা পুরো সংগঠনের জন্য আলোকবর্তিকা স্বরূপ। সমন্বিত (Consistent) এবং উদ্দেশ্যমূলক পরিকল্পনার দ্বারাই কেবল উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব। পরিকল্পনা দ্বারা একটি সংস্থা/সংগঠনের কার্যপ্রবাহ সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায় এবং সকল কর্মী সে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্ত কার্য সম্পাদন করতে পারে। যে কোন কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে ঐ কর্মসূচীর পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ার উপর।
পরিকল্পনার গুরুত্ব : সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া কোন কাজেই সফলতা আসেনা। কি ব্যক্তি জীবনে, কি সমাজে, কি ব্যবসায়ে, কি রাষ্ট্রীয় কাজে সর্ব ক্ষেত্রেই পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম, পরিকল্পনার গুরুত্বসমূহ নিম্নরূপ :
০ পরিকল্পনা দিক নির্দেশনা দেয়।
০ পরিকল্পনা মিতব্যয়িতা অর্জনে সহায়তা করে।
০ পরিকল্পনা পরিবর্তিত অবস্থার মুকাবিলা করে।
০ পরিকল্পনা মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
পরিকল্পনার বিভিন্ন স্তর : পরিকল্পনার প্রণয়নে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। যেমন-
১. ভিশন (Vision) : স্বপ্ন (ambiton), কেন প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছে, কি করতে চায়।
২. মিশন (Mission) : প্রতিটি সংগঠিত দলভিত্তিক কাজের একটি মিশন থাকে। ভিশনে পৌঁছার জন্য বর্তমানে যা করণীয় তাই মিশন।
৩. উদ্দেশ্য (objectives) : উদ্দেশ্য হলো কোন কাজের চূড়ান্তরূপ। একটি সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য থাকে এবং সে উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য প্রতিটি বিভাগেরই আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য থাকে।
৪. কৌশল (Strategy) : কৌশল হলো, লক্ষ্য অর্জনের উপায়। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিশেষ বিশেষ অবস্থা বিবেচনা করে কখন কোন কৌশল প্রয়োগ করতে হবে তা নির্ধারণ করতে হয়। এটি হচ্ছে Sense of priorities-লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে কি কি করতে হবে।
৫. নীতি (Principle) বা পলিসি (Policy) : নীতি বা পলিসি হল একটি সাধারণ বিবরণ যা কোন কিছু করার বা না করার নির্দেশনা দেয়। পলিসি লিখিত অথবা অলিখিত উভয়ই হতে পারে। তবে লিখিত হওয়াই ভাল। নীতির বৈশিষ্ট্য হলো স্থান, কাল, পাত্র ভেদে এরূপ নির্দেশিকার সফল প্রয়োগে ফল প্রাপ্তির নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকে।
৬. বিধি (Rules) : বিধিও এক ধরনের পরিকল্পনা। এটা হচ্ছে কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে কোন বিশেষ ও নির্দিষ্ট কার্যক্রম নেয়া হবে তা নির্ধারণ করা।
৭. কার্যপ্রণালী (Work System) : কার্যপ্রণালীও পরিকল্পনা। কারণ এটি ভবিষ্যতে কাজ সম্পাদনের জন্য উত্তম প্রণালী ঠিক করে দেয়।
৮. বাজেট (budget) : পরিকল্পনা যখন সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয় তখন তা হয়ে যায় বাজেট।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পরিকল্পনা
আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী। তিনি সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্ব চরাচর সৃষ্টি করেছেন এবং পরিকল্পনা মাফিক ধ্বংস করবেন। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, মানবজাতি পরিকল্পনা বিষয়ক ধারণা মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকেই পেয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আছে : সমগ্র আসমান ও জমিন আল্লাহ তাআলা ছয়দিনে ছয় পর্যায়ে সৃষ্টি করেছেন এবং আসমানসমূহকে স্তরে স্তরে সজ্জিত করেছেন। তিনি সৌরজগতকে যথাস্থানে স্থাপন করেছেন, দুনিয়ার ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্থানে স্থানে নদী-নালা, সাগর, পাহাড়-পর্বত ও বনভূমি স্থাপন করেছেন। আল্লাহ তা‘আলাই রাত, দিন, সূর্য ও চাঁদকে পয়দা করেছেন, (এদের) প্রত্যেকেই (মহাকালের) কক্ষপথে সাঁতার কেটে যাচ্ছে। এসব কিছুই সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফসল। পরিকল্পনা মাফিক আসমান ও জমিনের নীলনক্সা তৈরি করে এগুলোকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। সমগ্র সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সহজেই বুঝায় যায় যে, প্রতিটি বস্ত্তই পরিকল্পনা মুতাবিক তৈরি, যার ফলে প্রকৃতির কোথাও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অবকাশ নেই।
বিশ্ব চরাচরের সব কিছুই পূর্ব পরিকল্পিত। কি উদ্দেশ্যে পৃথিবীসহ সৌরজগত সৃষ্টি করা হয়েছে, কখন পৃথিবী বা সৌরজগতের জন্য কি ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন এবং সে পরিবর্তন কিভাবে কিরূপ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে, কখন বিশ্ব ধ্বংস হবে, শেষ বিচারের পর কোথায় কার বাসস্থান হবে ইত্যাদি বিষয় আল্লাহ তায়ালা পরিকল্পনা মাফিক নির্ধারিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ পরিকল্পনা প্রণয়নে পূর্ণ জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্বেও তিনি সবকিছু একসাথে সৃষ্টি করেননি- ধাপে ধাপে তিনি এগিয়েছেন এবং এগুচ্ছেন। তিনি স্থায়ী পরিকল্পনার পাশাপাশি নমনীয় (flexible) পরিকল্পনাও প্রণয়ন করেন। নমনীয় পরিকল্পনার বিষয়গুলো ওহী ও ইলহামের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
কুরআনে হযরত ইউসুফ (আ) এর ভাষায়
‘(ইউসুফ) বললো, (এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও সে সম্পর্কে তোমাদের করণীয় হচ্ছে), তোমরা ক্রমাগত সাত বছর উত্তম চাষাবাদ করবে। (এ সময় প্রচুর ফসল হবে) অতপর ফসল তোলার সময় আসলে তোমরা যে পরিমাণ ফসল তুলেত চাও তার মধ্য থেকে সামান্য অংশ তোমরা খাবারের জন্য রাখবে, তা বাদ দিয়ে বাকী অংশ শীষ সমেত রেখে দেবে। (এতে করে ফসল নষ্ট হবে না)। এরপর আসবে সাতটি কঠিন (খরার) বছর যা এর আগের কয় বছরের গোটা সময়ই খেয়ে যাবে।। কিন্তু অল্প পরিমাণ ব্যতীত যা তোমরা তুলে রাখবে। এরপর আসবে একটি বছর, যখন মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে। কি চমৎকার পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা ইউসূফ (আ) এর মুখে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন।
১২.২ সংগঠন (Organising)
সংগঠন হল একটা সংস্থার পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য ব্যবস্থাপনার সে অংশ যা মানুষের জন্য একা উদ্দেশ্যমূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত।
সংগঠন একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো, যা ঐ সংগঠনে কর্মরত প্রতিটি ব্যক্তির ভূমিকা, দায়িত্ব ও কর্তব্যের নির্দেশনা দান করে। ডেন স্টেইনহফের মতে, পরিকল্পনা ও লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তে জনবল ও বস্ত্তগত সম্পদ সন্নিবেশিত করে কর্ম ও কর্তৃত্বের একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো প্রণয়ন করাই হলো সংগঠন। (Organizing is designing a formal structure of tasks and authority in which people and material resources are arranged to carry out plans and objectives.) সংগঠন হলো একটি বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্মিলিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ সম্পর্ক সৃষ্টি, ব্যক্তিবর্গের কার্যাবলীকে সনাক্ত করার পর এগুলোর শ্রেণীবদ্ধকরণ বা বিভাগীকরণ (Departmentation), প্রত্যেকের জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য বণ্টন (Delegation of Authority), কর্তৃত্ব কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ, তত্ত্বাবধান পরিসর (Span of supervision) নির্ধারণ এবং লক্ষ্যার্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের সমন্বয় সাধন।
সংগঠন প্রক্রিয়ায় মূলত: চারটি পদক্ষেপ জড়িত :
১. প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য ও তৎসংশ্লিষ্ট পলিসি ও পরিকল্পনার সাথে সংগতি রেখে যে সব কাজ সম্পাদন করতে হবে সেগুলো চিহ্নিত করে শ্রেণীবিন্যাসকরণ।
২. প্রাতিষ্ঠানিক যে সব সম্পদ রয়েছে এবং যে সব পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাবলী পরিচালনা করতে হবে, তা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন কার্যাবলীর বিভাগীকরণ।
৩. প্রয়োজন মুতাবিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে কর্তৃত্ব অর্পণ এবং
৪. অর্পিত কর্তৃত্বের সমন্বয় সাধন।
১২.৩ নির্দেশনা (Direction)
নির্দেশনা বা পরিচালনা ব্যবস্থাপনার তৃতীয় প্রধান কাজ। অন্যকথায় নির্দেশনা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। নির্দেশনা বা পরিচালনা ছাড়া সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব নয়। নির্দেশ শুধু ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি অধীনস্থদের দিতে পারেন। একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বস্তরে, সর্বক্ষেত্রে সঠিক নির্দেশনা প্রয়োজন। নির্দেশনার ধরন, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সঠিকভাবে জেনেই নির্দেশনা দান করতে হয়। অন্যথায় নির্দেশনা ফলপ্রসূ হয় না। নির্দেশনা মানব সম্পর্কিত কাজ, নির্দেশনার প্রবাহ নিম্নমুখী, নির্দেশনা সর্বস্তরে পরিলক্ষিত, এর পরিধি ব্যাপক। নির্দেশনা মৌখিক অথবা লিখিত, সাধারণ অথবা নির্দিষ্ট, আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক যে কোন ধরনের হতে পারে। নির্দেশ সংগঠনের বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন, পারস্পরিক সম্পর্ক, দায়দায়িত্ব ইত্যাদির ইঙ্গিত করে। নির্দেশনা বলতে তদারকীও বুঝানো হয়ে থাকে। আদর্শ নির্দেশনার গুণগত বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ :
১. নির্দেশ সব সময়ই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাজ : নির্দেশ সব সময়ই উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তরে
নেমে আসে।
২. নির্দিষ্টতা ও স্পষ্টতা : নির্দেশ সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
৩. নির্দেশ পূর্ণাঙ্গ অথবা সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন : পূর্ণাঙ্গতা নির্দেশনার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
৪. নির্দেশ লিখিত হওয়া উচিত : নির্দেশ লিখিত হওয়াই ভাল। লিখিত নির্দেশের পক্ষেই যুক্তি বেশি।
৫. যৌক্তিকতা : নির্দেশ অবশ্যই যুক্তিসংগত হতে হবে।
৬. সঠিক সময়ে সঠিক নির্দেশ : নির্দেশ সময় বিবেচনা করে দিতে হবে।
৭. সংক্ষিপ্ততা : নির্দেশ সংক্ষিপ্ত হলে ভাল হয়।
৮. অগ্রগতি লক্ষ্য রাখা : নির্দেশ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।
ইসলামে পরিচালনার ব্যবস্থা (Direction in Islam)
ইসলামে ব্যবস্থাপনার তৃতীয় কার্য পরিচালনার ব্যাপারে কিছু বিধি-বিধান ও ইংগিত প্রদান করা হয়েছে। এ সমস্ত বিধি-বিধান মেনে চলা হলে পরিচালনা কার্য বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে এবং প্রতিটি নির্দেশ সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেবে। ইসলামে পরিচালনা কার্যের প্রধান দিকগুলো সম্পর্কে নিচে আলাকপাত করা হলো :
১. গণতান্ত্রিক পরিবেশ (Democratic Environment) : সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নির্দেশ প্রদান করতে হবে।
২. প্রাঞ্জল ভাষা (Simple Language) : নির্দেশ দানের ভাষা হতে হবে অত্যন্ত প্রাঞ্জল, সহজ, বোধগম্য, উন্নত এবং সত্যিকার অর্থে কল্যাণাকাঙ্খী। কুরআন-হাদীসে মানুষ ও মুসলিমদের প্রতি যে সর্বজনীন এবং বিশেষ নির্দেশ এসেছে তা অতি চমৎকার ভাষায় সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকরণের অথচ সবার কাছে হৃদয়গ্রাহী।
৩. প্রতিপালনকারীর সামর্থ্য (Capacity of doer) : ইসলামে প্রতিপালনকারীর সামর্থ্য বুঝে নির্দেশ প্রদানের তাকিদ প্রদান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ কালামে পাকে বার বার উল্লেখ করেছেন যে, তিনি কারো উপর কোন যুল্ম করতে চান না। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। কোন কাজের নির্দেশ দেয়ার পরে যদি ঘটনাক্রমে তা পালন করা কর্মীর জন্য কষ্টসাধ্য হয়, তাহলে অবশ্যই তাকে সহায়তা করতে হবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
৪. পূর্ণ আস্থা (Complete faith) : ইসলাম আল্লাহর দেয়া বিধান প্রতিপালনের নির্দেশ প্রতিটি মানুষকেই দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই তা করতে বলা হয়েছে। মানুষের মধ্যে প্রত্যয় সৃষ্টির জন্য নানাভাবে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। জান্নাতের চমৎকার বর্ণনা দিয়ে এবং জাহান্নামের কঠোর শাস্তির ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমেও মানুষের মধ্যে তাঁর লক্ষ্যের প্রতি
প্রত্যয় সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। আধুনিক ব্যবস্থাপনা ইসলামের এ কৌশল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
৫. অবশ্য পালনীয় (Compulsory Practices) : আধুনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা দানের পদ্ধতিসমূহের মধ্যে একটি হলো আদর্শরীতি অনুসরণ (Standard practices)। ইসলামে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের জন্য মানুষকে কতকগুলো কার্য অবশ্য পালনীয় করা হয়েছে। নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম করার হুকুম সাধারণতভাবে নেই। যেমন- নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি। এ সমস্ত বিধান ও নির্দেশ পালনে সুস্থ কোন মানুষ অস্বীকার করলে তাকে কঠোর শাস্তির ভীতি প্রদর্শন
করা হয়েছে।
৬. ব্যাখ্যাকরণ পদ্ধতি (Explaining why) : ব্যাখ্যাকরণ পদ্ধতি নামে নির্দেশ দানের যে একটি পদ্ধতি আধুনিক ব্যবস্থাপনা দিয়েছে, তাও ইসলাম থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন এবং হাদীসে মানুষকে তার ইহ ও পরকালীন কল্যাণের জন্যই কতকগুলো নির্দেশ পালনের আহবান জানানো হয়েছে। এমন কোন কাজই মানুষকে করতে বলা হয়নি যার কোন উপযোগিতা নেই। বিনা কারণে আল্লাহর দেয়া জীবন ও সময় ব্যয় করলে এর জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে বলে ইসলাম ঘোষণা দিয়েছে।
৭. সর্বজনীন ভাষা (Acceptable language) : নির্দেশ দানের সময় ভাষা হতে হবে অত্যন্ত সুখশ্রাব্য। কোন কটু বা অশ্রাব্য ভাষায় নির্দেশ প্রদান করা যাবে না। মধুর ভাষায় নির্দেশদাতার প্রতি কর্মীগণ বিতশ্রদ্ধ হয় কম-এমনকি নির্দেশ যদি অপছন্দ হয় তবুও মারমুখো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না। পক্ষান্তরে, ভাল কাজের নির্দেশও যদি কর্কশ ভাষায় দেয়া হয়, তাহলে কর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে এবং তারা ব্যবস্থাপনার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারে।
১২.৪ ব্যবস্থাপনার X (এক্স) এবং Y (ওয়াই) তত্ব
বিবেচ্য বিষয় তত্ব ‘X’ তত্ব ‘Y’
মানুষ সম্পর্কে ধারণা মানুষ অলস, কাজের প্রতি অনীহ, উচ্চাকাংখা নেই, দায়িত্বহীন, ফাঁকিবাজ, উদ্যমী নয়, কর্মবিমুখ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক। মানুষ কর্মে উৎসাহী, সৃজনশীল, আত্মসম্মানবোধ রয়েছে, দায়িত্ব সচেতন, আত্মবিকাশ উন্মুখ, আত্মনির্দেশনা, আত্মশৃংখলা বোধসম্পন্ন, কাজে আন্তরিক, কর্মপরায়ণ, কাজই যেন জীবন, শিখতে আগ্রহী।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কাজ আদায় করা। সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতাকে ব্যবহার করা, ভালভাবে মটিভেট করে কাজ আদায়, দায়িত্বপালনে আগ্রহ সৃষ্টি।
পদ্ধতি জোর খাটান, ভয় দেখান, চাপ প্রয়োগ, প্রলোভন প্রদান, খবরদারী করা, নির্দেশ দান, নিয়ন্ত্রণে রেখে কাজ করানো, শাস্তি প্রদান। কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান, প্রোৎসাহন ও পুরস্কার, ভুল সংশোধনের সুযোগ প্রদান, উৎসাহ প্রদান, আত্মবিকাশে সহায়তাদান, দায়িত্ব বণ্টন।
১২.৫ ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব (Leadership in Management)
নেতৃত্ব শব্দটির অর্থ ব্যাপক। Leadership শব্দটি এসেছে Lead থেকে- যার অর্থ পথ দেখানো (To guide), চালিত করা (To conduct), আদেশ করা (To direct) ইত্যাদি। যিনি নেতৃত্ব দেন তাকে বলা হয় নেতা (Leader)। যে কোন সংগঠনের / প্রতিষ্ঠানের নেতা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত লোকজনের সামগ্রিক দলটিকে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করেন। নেতা সকলকে তাঁর কাজ দ্বারা প্রভাবিত করেন। তাই নেতৃত্বকে একটি কলা (Art) বলা যেতে পারে। আর সংগঠনের কার্য সম্পাদন এবং দলীয় লক্ষ্যসমূহের জন্য লোকদেরকে প্রভাবান্বিত করাই হল নেতৃত্বদান। বস্ত্তত; এটা ব্যবস্থাপনার আন্তব্যক্তিক দিক নিয়ে কাজ করে। এটা বোধগম্য যে, নেতৃত্বদান প্রেষণা, নেতৃত্বের ধরণ, অ্যাপ্রোচ এবং যোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত করে। কুরআন বলছে :
وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضًا سُخْرِيًّا
এবং আমরা একজনকে অপরের উপরে মর্যাদায় উন্নত করি যাতে নেতৃত্ব দানের মাধ্যমে একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে।
ইসলামে নেতৃত্বের আসন অনেক উপরে। সামষ্টিক জীবনে নেতৃত্বের ভূমিকা বেশি।
নেতৃত্ব সমীকরণ L = f (L-f-s) L = Leadership
f = function
L = leader
f = follower
S = Situation
সমীকরণটির অর্থ দাঁড়ায় নেতৃত্ব হচ্ছে নেতা, অনুসারী এবং অবস্থাভেদে নেতার কাজ।
নেতৃত্বের দক্ষতা- (Ledership Skill)
১. কারিগরী দক্ষতা (Technical skills)
২. মানবীয় সম্পর্ক দক্ষতা (Human Relations Skills)
৩. ধারণাগত দক্ষতা (Conceptual Skills)
নেতৃত্বের রীতি (Styles of leadership)
বিভিন্ন মনীষী নেতৃত্বের বিভিন্ন রীতির কথা বলেছেন। এফ.ই.ফিডলার এর মতে নেতৃত্ব দুই রীতির। যেমন- ১. কার্যমুখী নেতৃত্ব (Task orientated leadership)
২. কর্মচারী ও আন্ত:ব্যক্তিক সম্পর্কমুখী নেতৃত্ব (Interpersonal relationship)
ব্যবস্থাপনা বিশারদ লিকার্ট চার ধরনের নেতৃত্ব সম্বন্ধে বলেছেন। যেমন-
১. শোষণমূলক স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব, ২. কল্যাণকামী স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব,
৩. পরামর্শমূলক নেতৃত্ব, ৪. অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব,
অধিকাংশ মনীষী নেতৃত্বের তিনটি মৌলিক রীতির উপর জোর দিয়েছেন। যেমন-
১. নেতৃত্বের প্রেষণা ভিত্তিক ধরন (Motivational style of leadership orientated leader)
২. নেতৃত্বের ক্ষমতা ভিত্তিক ধরন (Power style of leadership)
৩. নেতৃত্বের পূর্বাভিমুখী ধরন (Orientation style of leadership)
নেতৃত্বের ধরন / রীতি

প্রেষণাগত ক্ষমতা পূর্বাভিমুখী

ইতিবাচক নেতিবাচক স্বৈরতান্ত্রিক অংশগ্রহণমূলক লাগামবিহীন সহানুভূতিশীল কার্যকেন্দ্রিক
ইসলামে নেতৃত্ব সবিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আল্লাহভীরুতা, গণতান্ত্রিক সমঝোতা, প্রত্যাশী না হওয়া, বৈষম্যহীনতা, জবাবদিহিতা, কথা-কাজে সামঞ্জস্যতা, পক্ষহীনতা এবং দুর্বলের উপর অন্যায়-না করা ইসলামী নেতৃত্ব রীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
নেতৃত্ব সম্পর্কিত তত্বসমূহ (Theory of leadership)
১. নেতৃত্বের গুণভিত্তিক তত্ব (The trait theory of leadership)
২. পরিস্থিতিভিত্তিক তত্ব (Situational Leadership theory)
৩. আচরণভিত্তিক তত্ব (Behavioural theory of leadership)
৪. নেতৃত্বের উদ্দেশ্যমুখী তত্ব (Path-goal theory of leadership)
নেতৃত্বের অত্যাবশ্যকীয় গুণাবলী
হযরত আলী (রা.) আল ফারাবী ইমাম গাযযালী জাতিসংঘ পল এইচ এপলবি
১. আল্লাহভীরুতা
২. ন্যায়পরায়ণতা
৩. সৎ ও সৎকর্মের প্রতি আস্থাশীলতা
৪. ক্ষমাশীলতা
৫. সুবিচার ও ইনসাফকারী
৬. জনগণের অভিযোগ শ্রবণকারী
৭. জনগণের আস্থাভাজন
৮. আত্মনিয়ন্ত্রণকারী
৯. ইবাদতকারী ও আল্লাহর সাহায্যপ্রার্থী ১. বুদ্ধিমত্তা
২. উত্তম স্মৃতি শক্তি
৩. বাগ্মিতা
৪. দৃঢ়তা
৫. ন্যায়বিচার প্রীতি
৬. উচ্ছল, প্রাণবন্ত ও সপ্রতিভ ভাবভঙ্গি
৭. সত্যবাদিতা
৮. মিথ্যা বর্জন
৯. সম্পদের প্রতি আসক্তি থাকা চাই ১. বুদ্ধিমত্তা
২. স্মৃতিশক্তি
৩. বাগ্মিতা
৪. দৃঢ়তা
৫. ন্যায় ও ইনসাফের প্রতি অনুরাগী-ন্যায়বিচারক
৬. প্রাণবন্তু ব্যক্তিত্ব
৭. সত্যবাদিতা
৮. ধৈর্য
৯. বিনয় ও নম্রতা
১০. হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা পরিহার করা
১১. সংকীর্ণতা পরিহার করা
১২. একরোখা স্বভাব পরিহার করা
১৩. শত্রুতা পরিহার করা ১. সৎ ও নিঃস্বার্থপর
২. মেধাবী
৩. কর্মঠ ও সুদক্ষ
৪. বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ
৫. নিরপেক্ষতা
৬. কর্তব্যপরায়ণতা ১. চারিত্রিক দৃঢ়তা
২. স্বীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যবোধ
৩. দায়িত্বগ্রহণের আগ্রহ ও জবাবদিহিতার মনোভাব
৪. উত্তম শ্রোতা ও সমস্যার সমাধানকারী
৫. সংবেদনশীলতা
৬. সাংগঠনিক শক্তির উপর আস্থাশীলতা
৭. হুকুমকারী প্রভুরূপী নন বরং সুপারিশকারী
৮. উত্তম সহযোগী
৯. অন্যের মতামতগ্রহণ
১২.৬ প্রেষণা (Motivation)
ব্যবস্থাপনায় প্রেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রেষণা ছাড়া মানুষ কাজ করতে চায় না। প্রেষণা হলো মানুষকে কোন কাজে উদ্বুদ্ধকরণ। এটি এমন একটি শক্তি যা কোন ব্যক্তিকে বিশেষ কোন কাজের দিকে টেনে নিয়ে যায়। প্রেষণার তারতম্যের জন্য সংগঠনে কোন কর্মী কাজে মনোযোগী, শৃংখলাপরায়ণ এবং উদ্যোগী আবার কোন কর্মী কাজে অমনোযোগী, বিশৃংখল, নিরুদ্যম হয়। প্রেষণার মূল হলো মানুষের প্রয়োজন বা অভাব। মানুষের অভাব বা প্রয়োজনবোধ অনেক ধরনের হতে পারে। অভাব পূরণের জন্য মানুষের যে ব্যগ্রতা তাই হলো প্রেষণা। অর্থাৎ মানুষের আচরণকে যা প্রভাবিত করে তাকেই প্রেষণা বলা যেতে পারে।
প্রেষণার ইসলামী মডেল (Islamic Model of Motivation)
সার্বজনীন ও কল্যাণকর জীবন বিধান হিসেবে ইসলাম প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য যে সব ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে তা এক বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আজও কোন বিশেষজ্ঞ দিতে পারেননি।
পার্থিব জীবনে চলার পথে মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলা যে অফুরন্ত সম্পদ জল, স্থল, অন্তরীক্ষে মওজুদ করে রেখেছেন তা নিয়ে সে প্রেষণা লাভ করতে পারে। আবার কাউকে পার্থিব সম্পদ কম দেয়ার পরেও সে আখিরাতের অজস্র পুরস্কার পাওয়ার আশায় একাগ্রচিত্তে ইসলামী বিধান অনুসরণ এবং অর্পিত দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পারে। সেদিক হতে প্রেষণা প্রদান সংক্রান্ত আল্লাহর বিধান জাগতিক বিধান হতে ভিন্নতর। শিল্প ও কারবারের ব্যবস্থাপকগণ তাদের অধ:স্তন কর্মচারীদের জন্য আর্থিক,
অ-আর্থিক অনেক কিছু প্রদানে প্রলোভন দেখিয়েও অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য উৎসাহিত রাখতে পারেন। অথচ আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত সীমিত নিয়ামত ভোগ করে দীনদার কর্মীগণ অতি বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করে থাকে। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই নিহিত। কি সেই শাশ্বত ইসলামের মডেলের আলোচ্য বিষয়? এর উপাদানগুলোই বা কি? এটি কি শুধু ব্যবস্থাপকদেরই প্রেষণা দান করতে পারে নাকি সকল স্তরের কর্মীদেরই প্রেষণাদাতা? এটি কি সীমিত সময়ের জন্য নাকি স্থান-কাল-পাত্র-ভেদে সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য? এইসব প্রশ্নের জবাব নিম্নের প্রদত্ত মডেল হতে জানা যাবে। মডেলটি হযরত ইমাম গাযযালী (রহ.) এবং হযরত ইমাম শাতিবী (রহ.) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে উদ্ভাবন করেছেন বলে জানা যায়। এটিকে মৌলিক চাহিদা বৃক্ষ মডেল (Basic Needs tree model) নামেও অভিহিত করা যায়। যার আরবী নাম আশ্ শাজারাতুল হাজাতিয়াতিল আসাসিয়াহ।’
এই মডেলে মানবীয় প্রয়োজনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে। মানুষ তার মৌলিক চাহিদাকে অবলম্বন করে বিভিন্ন কার্যে নিজেকে নিয়োজিত করে। এই চাহিদার তীব্রতার উপর উক্ত চাহিদা পূরণের প্রেষণার প্রকৃতি নির্ভর করে। নিম্নে উল্লিখিত মডেলের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো :

ছক
চাহিদা বৃক্ষ (আশ্ শাজারাতুল হাজাতিয়াহ) : এই মডেলে মানুষের মৌলিক চাহিদাকে একটি বৃক্ষরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ একজন মানুষকে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে অসংখ্য অভাবের মুকাবিলা করতে হয় এবং তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়। অন্যথায় মানব জীবন বিশৃংখলাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এজন্য মৌলিক চাহিদা বৃক্ষকে ভারসাম্যমূলকভাবে সজ্জিত করা হয়েছে। আরবীতে একে আশ্ শাজারাতুল হাজাতিয়াতিল আসাসিয়াহ (মৌলিক চাহিদা বৃক্ষ) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মানুষের মৌলিক চাহিদাকে প্রধানত: তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- জরুরিয়াত (অবশ্য প্রয়োজনীয়), হাজিয়াত (আরামদায়ক) এবং তাহসিনিয়াত (সৌন্দর্যবর্ধক)। নিম্নে এগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করা হলো : (চলবে)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


ব্যবস্থাপনা : ইসলামী দৃষ্টিকোণ
মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম
[শেষাংশ]
১. জরুরিয়াত (Zaruriat-Basic Needs/Necessities) : মৌলিক চাহিদা তাকে বলে যার অভাবে মানুষ বাঁচে না বা অত্যন্ত কষ্টে বাঁচতে হয়। একান্ত আবশ্যকীয়, যা একান্তই অপরিহার্য, যা না হলে মানুষের চলেই না, বস্ত্ত জগতের সামগ্রিক অগ্রগতিতে যা একান্তই অপরিহার্য। একে আবার নিম্নে উল্লিখিত ৬টি উপ-বিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে :
ক. নাফসানিয়াত বা দৈহিক বা জৈবিক চাহিদা (Nafs-Life itself/Protection of life Physiological needs) : সাধারণত: দশ প্রকারের অভাবকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। যেমন- ত্বয়ামুন (খাদ্য), লিবাসুন (বস্ত্র), মাকানুন (বাসস্থান), মুআলিজ (চিকিৎসা), মুহিতুন (পরিবেশ), ইয়ানকালুন (পরিবহন) এবং ইসতিরাহাতুন (বিশ্রাম) অবসর, বিশুদ্ধ পানীয়, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়া এবং শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ইত্যাদি যা মানুষের জীবন ধারণের সাথে সম্পৃক্ত। এই সব অভাব পূরণ করা যে কোন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নির্বাহ করার জন্য অত্যন্ত জরুরী।
খ. মাল/সম্পদ (Mal-property-wealth-Resources) : ন্যূনতম পরিমাণ সম্পদ থাকা এবং সংরক্ষণ করা প্রতিটি মানুষের জীবনের জন্য অতি প্রয়োজন। সম্পদ নাফসানিয়াতের অভাব পূরণে সহায়তা করে। তাই এই সম্পদ অর্জনের জন্য মানুষ প্রেষণা অনুভব করে থাকে। ইসলামে হালাল বা বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালানোকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
গ. আকল/শিক্ষা (Aql-Intellect/Reason, Education) : শিক্ষা, বুদ্ধিমত্তা। শিক্ষা বা জ্ঞানার্জনের চাহিদা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। এজন্য শিক্ষার্জনের জন্য মানুষ প্রিয়জনদের ছেড়ে দূর-দূরান্তে গমন করে থাকে। জ্ঞানার্জনের জন্য মানুষ গবেষণা কার্যে সারাজীবন অতিবাহিত করে এবং দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়িয়ে থাকে। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে ফরয করা হয়েছে-কি পুরুষ কি নারী সবার জন্য।
ঘ. হুররিয়াত/স্বাধীনতা (Hurriat-Freedom) : স্বাধীনতা ছাড়া মানুষকে পরাধীনতার গ্লানি অনুভব করতে হয়। স্বাধীনভাবে চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজ করা প্রভৃতির জন্য মানুষ প্রাণপণ সংগ্রাম করে থাকে। স্বাধীনভাবে বাঁচার প্রেষণা হতেই এর উৎপত্তি। স্বাধীনতার জন্য মানুষ যুদ্ধ করছে, চাকরি পরিত্যাগ করছে, জেলে কষ্ট ভোগ করছে, এমনকি এই অপরাধে নির্বাসনে যাচ্ছে। ইসলামে স্বাধীনতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করা হয়। আল্লাহ পাক মানুষকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তাকে সর্বদা স্বাধীনই দেখতে চান। ধর্মীয় ও জাতীয় স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করাকে ইসলাম সর্বাপেক্ষা মর্যাদা দিয়ে থাকে।
ঙ. নসল/পারিবার গঠন (Nasl-Family formation-Protection of posterity) : পরিবার গঠনের ক্ষমতা, বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, বংশধারা সংরক্ষণ করা, বন্ধুত্ব অর্জন, আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন, পারিবারিক সমৃদ্ধি ও শান্তি অর্জন ইত্যাদির চাহিদা এই শ্রেণীর মধ্যে পড়ে। পারিবারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে খুব কম। তাই ইসলাম বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে অত্যাবশ্যক করেছে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে কঠোর শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার যে সুতীব্র আকাঙ্খা (প্রেষণা) প্রতিটি সামর্থবান মানুষ অনুভব করে তা দ্বারাই পৃথিবীতে সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
চ. আকিদা/দীন/বিশ্বাস (Protection of Faith, Deen, Idology, Beliefs/values) : ঈমান/দীন, আদর্শ। আকিদা বা বিশ্বাস বা মূল্যবোধ জরুরিয়াতের সর্বশেষ ও সর্বাপেক্ষা মৌলিক বিষয়। এই বিশ্বাস সৃষ্টির জন্য একজন মানুষ সারা পৃথিবীতে ইসলামের মহান বাণী পৌঁছানের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। আবার বিশ্বাসী মানুষগুলো তাদের ঈমান বা বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এতই তীব্র প্রেষণা অনুভব করেন যে, কোন চক্রান্তই তাদেরকে সেই বিশ্বাস থেকে টলাতে পারে না। এমনকি প্রাণ গেলেও আল্লাহর সার্বভৌমত্বে কাউকেও আঘাত হানতে না দিতে তারা বদ্ধপরিকর। তাই ইসলামে ঈমান/আকিদা বা বিশ্বাসের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করা হয়। কুরআন এবং হাদীসে আল্লাহ এবং তাঁর বিধানাবলীর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস আনয়ন ও সংরক্ষণ করার জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
২. হাজিয়াত (Hajiat-Requirement-Comforts) : প্রয়োজনীয়তা যা মানুষের জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করে এবং কষ্ট ও নষ্ট থেকে রক্ষা করে। হাজিয়াত বা স্বাচ্ছন্দ্যের প্রত্যাশা মানুষের দ্বিতীয় প্রধান প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে। অত্যাবশ্যকীয় অভাব পূরণের পরেই মানুষ একটু সুখের প্রত্যাশা করে। শান্তিতে, নিরাপদে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার অভাব পূরণ হওয়া ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব, সুস্থ-অসুস্থ নির্বিশেষে সকল মানুষেরই কাম্য। এজন্য যার যা আছে তা অপেক্ষা কিছুটা হলেও আরামপ্রদ বা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন পছন্দ করে। অত্যাবশ্যকীয় চাহিদা পূরণের পূর্বে কেউই বিলাসবহুল জীবনের জন্য উৎসাহী হয় না। ইসলামে হাজিয়াতের ব্যাপারে জোর তাকিদ দেয়া হয়েছে। পরিবারের সকল সদস্যদের সুখে-শান্তিতে রাখার জন্য যেমন পরিবার প্রধানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তেমনি কারবার প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মীর সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা বিধান করা উচ্চ ব্যবস্থাপনা বা মালিক পক্ষের উপর অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে। অনুরূপভাবে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সাধ্যমত স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধানের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। ইসলাম কখনও শান্তি, স্থিতি এবং স্বচ্ছন্দ্য জীবনযাত্রা প্রণালীকে নিরুৎসাহিত করেনি বরং নানাভাবে উৎসাহিত করেছে। উপরন্তু আরামদায়ক কোন জিনিস ভোগ হতে আত্মাকে নিবৃত্ত রাখলে এই অপরাধের জন্য কঠোর জবাবদিহির ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।
৩. তাহসিনিয়াত (Tahsiniat-Beautification) : সৌন্দর্যবর্ধক প্রয়োজন যা মানব জীবনকে সুন্দর, পরিপাটি ও কল্যাণময় করে। তাহসিনিয়াত বা সৌন্দর্যের জন্য চাহিদা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এটি চাহিদা বৃক্ষের সর্বশেষ শাখা। সৌন্দর্য সকল সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষই ভালবাসে। আর সেই কারণেই সে সৌন্দর্যের জন্য উচ্চ প্রেষণাসহ কাজ করে। শিল্প-কারখানায় প্রতিটি কর্মী তার উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নয়ন, উন্নত পদ্ধতিতে ফাইল-পত্র সংরক্ষণ, কল-কারখানা ও যন্ত্রপাতি পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সর্বোপরি পরিধেয় বস্ত্র সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার যে ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা সৌন্দর্যবর্ধক প্রক্রিয়ার মধ্যেই পড়ে। কারখানায় উল্লিখিত অবস্থা নিশ্চিত করার জন্য কর্মীর মধ্যে যে উদ্দীপনা আবশ্যক তা উচ্চ প্রেষণা সম্বলিত কর্মীর মাঝেই পাওয়া যায়।
ইসলাম মানবীয় সৌন্দর্যের চাহিদাকে অবজ্ঞা তো করেই না বরং উৎসাহিত করে। ইসলাম সুন্দর জীবন ব্যবস্থা, আল্লাহ তাআলা নিজে সুন্দর এবং আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-ও পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সুন্দর মানুষ ছিলেন বলে ইসলামে সৌন্দর্যের মর্যাদা সর্বদাই ঊর্ধ্বে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কারো চুল এলোমেলো দেখলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং তাকে শয়তানী আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসলাম তিনটি কারণে উপযুক্ত বস্ত্র পরিধানের নির্দেশ দিয়েছে :
ক. আব্রু আচ্ছাদান
খ. আবহাওয়াগত দুর্বিষহতা থেকে আত্মরক্ষা এবং
গ. সৌন্দর্য বর্ধন।
সৌন্দর্য বর্ধক পোশাক পরিধান করলে, অফিস, কারখানা, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকলে মন প্রফুল্ল থাকে এবং কার্যে প্রেষণা লাভ করা যায়।
উপরে ইসলামের প্রেষণা মডেলের মৌলিক চাহিদা বৃক্ষটির আলোচনা হতে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এত ব্যাপক এবং ভারসাম্যমূলক প্রেষণা মডেল এটিই প্রথম। এ মডেলের কার্যকারিতা একাধারে ব্যক্তি, পারিবারিক ও সমাজ জীবনে যেমনি, শিল্প কল-কারখানা, অফিস-আদালত তথা রাষ্ট্রীয় জীবনেও তদ্রূপ প্রযোজ্য।
ইসলামী মডেলের মূল্যায়ন (Evaluation of Islamic Model)
ইসলামী প্রেষণা মডেল নি:সন্দেহে একটি ভারসাম্যমূলক প্রেষণা মডেল। প্রেষণা সংক্রান্ত এই পর্যন্ত যতগুলো মডেল মানুষের গোচরে এসেছে ইসলামী মডেলের মত এত ব্যাপক ব্যাখ্যা কোন মডেলে নেই। সেদিক হতে এটিকে চিরন্তন প্রেষণা মডেল (Universal motivation model) বলা যেতে পারে। ইসলাম একটি শাশ্বত ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হেতু এর প্রেষণা মডেল সর্বজনগ্রাহ্য হবে এটাই স্বাভাবিক।
এ মডেলে অন্যান্য পশ্চিমা লেখকদের প্রদত্ত মডেল অপেক্ষা কতকগুলো নতুন প্রেষণা উপাদান সংযুক্ত হয়েছে। পশ্চিমা লেখকদের প্রদত্ত কোন মডেলেরই বয়স ৫০ বছরের অধিক নয়। অথচ ইসলামী প্রেষণা মডেলটি আজ হতে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে প্রদত্ত। যদি ইসলামী মডেলে প্রেষণার উপাদানে কোন ঘাটতি পরিলক্ষিত হতো তা হলেও কথা ছিল। তা হয়নি বরং একবিংশ শতাব্দীতে এসেও পশ্চিমা মডেলে প্রেষণার প্রধান প্রধান দিকগুলোও সন্নিবেশ করা সম্ভব হয়নি। সেদিক থেকে ইসলামী মডেল অনেক উন্নত ও সার্বজনীন।
পশ্চিমা প্রেষণা মডেলে কতকগুলো উপাদান সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত রয়েছে। যেমন- বিশ্বাস (আকিদা), সৌন্দর্য (তাহসিনিয়াত), পরিবেশ (মুহিতুন) প্রভৃতি। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা যদি জানতে পার আগামীকাল রোজ-কিয়ামাত হবে তথাপি আজ একটি বৃক্ষ রোপণ করো। পরিবেশ রক্ষা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ইঙ্গিত এত গুরুত্ব দিয়ে আজও কেউ বলতে পারেননি। অথচ আজ মানুষ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য এবং পরিবেশ দূষণের ছোবল হতে বাঁচার জন্য ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের বাঁচানোর জন্য দারুণ উদ্বেগের সাথে আকুল আবেদন জানাচ্ছে।
ইসলামী মডেলে উল্লিখিত আরেকটি বিষয় পরিবার কাঠামো গঠন (নসল) সম্পর্কে না বলে পারা যায় না। ইসলামী মডেলে এই বিষয়টির উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পারিবারিক বন্ধন না থাকলে মানবিক মূল্যবোধ, চারিত্রিক দৃঢ়তা, অন্যের প্রতি সহানুভূতি, সামাজিক সম্প্রীতি কিছুই থাকে না। ফলে সমাজ ব্যবস্থায় সার্বিক অবক্ষয় নেমে আসে। পশ্চিমা বিশ্ব যার বাস্তব শিকার। তাই ইসলামী মডেলে বর্ণিত পারিবারিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ এবং শক্তিশালী রাখার ব্যবস্থা করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোতে সম্প্রতি আবার চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে।
উপসংহারে বলা যায় যে, ইসলামী প্রেষণা মডেল অতুলনীয়, সর্বজনীন ও ভারসাম্যমূলক
একটি মডেল।
১২.৭ নিয়ন্ত্রণ (Controlling)
ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিয়ন্ত্রণ। নিয়ন্ত্রণ হলো কর্ম সম্পাদনের পরিমাপ এবং ফলাফলের মূল্যায়ন। সঠিক অর্থে নিয়ন্ত্রণ বলতে ঐসব কাজকে বুঝায় যার দ্বারা আদর্শ নির্ধারণ, কাজের ফলাফল নির্ণয় এবং পরিমাপ করা যায়, কাজের ফল মূল্যায়ন করা যায় এবং কাজের ফলকে পরিকল্পনা মাফিক সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনবোধে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিতকরণের জন্যে নিয়ন্ত্রণ হল অধন্তনদের কার্যাবলীর পরিক্ষাকরণ। তাই লক্ষ্য এবং পরিকল্পনার বিপরীতে নিয়ন্ত্রণ কার্যফল পরিগণনা করা, কোথায় ধ্বনাত্মক বিচ্যুতি বিদ্যমান তা দেখানো এবং বিচ্যুতি সংশোধনের জন্যে কার্য স্থিরীকরণ, পরিকল্পনা অর্জন নিশ্চিত করণে সাহায্য করে থাকে। সফল নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়ন্ত্রণমানকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ধারণ করতে হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রণ (Controlling in Islam)
ইসলামী ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ধার্য করা হয় এবং তা অর্জনের জন্য যে সমস্ত কার্যাবলী নির্ধারণ করা হয় সেগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ ও তদারক করে দেখার উপর ইসলামী ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে থাকে। কারণ ইসলামী ব্যবস্থাপনা বিশ্বাস করে যে জনশক্তিকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়োজিত করার পরে তাদের প্রচেষ্টায় কিছু বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হতে পারে, তাদের মধ্যে নানা প্রলোভন কাজ করতে পারে এবং বিভিন্ন অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে কর্মীগণ ব্যবস্থাপনার আশু হস্তক্ষেপ বা পরামর্শ বা সহায়তা কামনা করে। নিয়মিত নিয়ন্ত্রণ কার্যের মাধ্যমে এসব অসুবিধা বিদূরিত হয়ে কার্য সম্পাদনের পথের সকল বাধা অপসৃত হয় এবং কার্যের স্বাভাবিক গতি ফিরে আসে।
ইসলামী ব্যবস্থাপনায় আনুষ্ঠানিক (Formal) এবং অনানুষ্ঠানিক (Informal) উভয় প্রকার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাই দেখা যায়। ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের বৈধ উপায়গুলোর সবই, ইসলামী ব্যবস্থাপনায় স্বীকার করা যেতে পারে। পক্ষান্তরে অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ উপায়সমূহের মধ্যে সালাত (নামায) সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকর। সকল সময় আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ফলপ্রসূ হয় না। ফলে অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয়ে থাকে। নামায এরূপই একটি অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। অফিস চলাকালীন সময়ে যতবার উচ্চ থেকে নিম্ন পর্যন্ত সকল ব্যবস্থাপক নামাযে হাজির হন ততবারই তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে যোগাযোগের সুযোগ হয়। এ সময় আল্লাহর আনুগত্যের কাছে সবাই এতই অসহায়ত্ব নিয়ে হাজির হয় যে, অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে অধ:স্তনদের সমস্যা শ্রবণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এভাবে সকল সাধারণ সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধান নিশ্চিত হয়। এছাড়া নিম্নে নিয়ন্ত্রণের আরো কয়েকটি দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা হচ্ছে :
১. নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত হতে হবে। নিয়মিত ও সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কর্মীদের সঠিকভাবে উৎপাদন ও সেবা কর্মে নিয়োজিত থাকতে সহায়তা করে। মানুষের ভাল-মন্দ কার্যের হিসাব রাখার জন্য তত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছেন, তারা হচ্ছেন কিরামান কাতেবীন সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ।
২. নিয়ন্ত্রণ অত্যধিক কড়া বা অতি শিথিল কোনটিই হওয়া উচিত নয়। মধ্যম পন্থায় নিয়ন্ত্রণ কার্য সমাধা করা উচিত। অধ:স্তনদের কার্যের হিসাব অতি ঘন ঘন এবং কড়াকড়িভাবে নিলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। আবার নাম মাত্র খবরা-খবর নিলে তাদের মধ্যে দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে শৈথিল্য দেখা দিতে পারে। কুরআন এবং হাদীস মধ্যম পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
৩. নিয়ন্ত্রণ কার্যের সাথে যে বিচ্যুতির প্রসঙ্গটি জড়িত তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে থাকতে হবে। কর্মীদের ইচ্ছাকৃত অবহেলার জন্য প্রতিষ্ঠানের কাজের কোন ক্ষতি হলে সে জন্য কর্মীর শাস্তির প্রশ্ন আসতে পারে। এক্ষেত্রে ইনসাফের ভিত্তিতেই এবং অন্যের জন্য ইতিবাচক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তবে আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে গিয়ে কোন ক্ষতি হলে তার সব দায় প্রতিষ্ঠানই বহন করবে।
৪. ইসলাম আত্ম-নিয়ন্ত্রণের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করে। আত্ম-নিয়ন্ত্রণ আল্লাহ ভীতি নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়। কুরআন এবং হাদীসে নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আমানতদারী, দায়িত্বশীলতা প্রভৃতি গুণাবলী কর্মীদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
৫. সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য ইসলামী ব্যবস্থাপনায় কর্মীদের সম্ভাব্য সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বলেছে। স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখে নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ি আরোপ করায় এ ব্যবস্থাপনা বিশ্বাস করে না। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সব রকম নিয়ামত দিয়েছেন বলে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব গ্রহণের ওয়াদা করেছেন।
৬. সার্বিক ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ সর্বোচ্চ শীর্ষ ব্যবস্থাপক করবেন। এতে সকল স্তরের কর্মীদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি হয়। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই সকল বিচার কার্য সমাধা করতেন এবং সকল অভিযোগ শ্রবণ করতেন। নিম্ন পর্যায়ের ব্যবস্থাপকদের মধ্যে যদি কোন শৈথিল্য বা অদক্ষতা থাকে তাহলে এ ধরনের শীর্ষ-নিয়ন্ত্রণের দ্বারা তা দূরীভূত হয়। সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপকও চূড়ান্ত হিসাব গ্রহণের জন্য প্রস্ত্তত থাকেন। নবীর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পরে খলীফাবৃন্দও তাঁরই আদর্শ অনুসরণ করতেন। হযরত উমার ফারুক (রা.) বলতেন ‘‘ফোরাতের তীরে যদি কোন কুকুরও অভুক্ত অবস্থায় মারা যায় এজন্যও আমাকেই দায়ী থাকতে হবে।’’ বিচার দিনের ভীতি থেকে তিনি অর্ধেক জাহানের শাসক হয়েও সরেজমিনে নাগরিকদের দু:খ-দুর্দশা দেখতে বের হতেন।
৭. ইসলামী ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণের বেলায় যে বিষয়ে হিসাব গ্রহণ করা হবে বা যে কার্য তদারক করা হবে সে সম্পর্কে কর্মীকে পূর্বাহ্নেই জ্ঞাত করাতে হবে। অন্যথায় নিয়ন্ত্রণ কার্য ফলপ্রসূ হয় না। আল্লাহর বিধান থেকেই এ ধারণা ব্যবস্থাপনায় গ্রহণ করা যায়। মানুষকে কোথায়, কোন ব্যাপারে কি প্রশ্ন করা হবে তা পূর্বাহ্নেই প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে। মানুষকে এসব প্রশ্নের জবাব প্রস্ত্তত করে নেবার উপযুক্ত সময়ও দেয়া হয়েছে। যাকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি তার কোন হিসাব দিতে হবে না। যেমন-শিশু, পাগল ইত্যাদি।
সুতরাং দেখা যায় যে, ইসলামী ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত মানের এবং যুক্তিসংগত। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ লাভ করার যোগ্য ব্যক্তিদেরই কেবল এই কার্যের আওতায় নিয়ে আসা হয়। যাদের কার্য সম্পাদনের ক্ষমতা পূর্ণভাবে ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করা যায় না, যাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দেয়া যায় না, তাদের উপর নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায় না। আরোপ করলে ব্যক্তির উপর যুল্ম হতে পারে। ইসলামী ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ পরবর্তী সময়ের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করে।
১৩. মানসিক চাপ, টেনশন ব্যবস্থাপনা (Stress, Tension Management)
মানসিক চাপ (stress) শব্দটি ল্যাটিন শব্দ (Strainger to draw light) থেকে এসেছে। যার বাংলা প্রতিশব্দ ক্লেশ বা দুর্দশা (distress) এবং ইংরেজী strain শব্দটির অর্থ জোর করা বা খুব চেষ্টা করা।
চাপ হচ্ছে একটি অস্থিরময় বা অস্বস্তিকর অবস্থা। এই অবস্থা তখনই সৃষ্টি হয় যখন ব্যক্তি তার চাহিদাগুলো যথাযথভাবে পূরণ করতে পারে না বা পূরণে ব্যর্থ হয়। চাপ হচ্ছে এক প্রকার শক্তি। এটা এমন এক বেদনাদায়ক ও অসহনীয় অবস্থা, যা ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবন ধারাকে ব্যাহত করে। সামাজিক পরিস্থিতি- সম্পর্ক বা ঘটনাবলী যখন মানুষের মনে কোনো দ্বন্দ্ব হতাশা বা অনাকাঙ্খিত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে তখনই ‘চাপের’ সৃষ্টি হয়। ‘চাপ’ কোন শারীরিক বা মানসিক উৎস হতে সৃষ্টি হয়, যার প্রকাশ ঘটে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণের মাধ্যমে। মানসিক চাপ বলতে কোনা কারণে ব্যক্তির স্নায়ুতন্ত্রে এমন অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত চাপ বুঝায় যা ব্যক্তিকে উত্তেজিত, অস্থির, বিচলিত বা অবসাদগ্রস্ত করে। তাছাড়া মানসিক চাপ বলতে এমন এক মানসিক অবস্থা বুঝায় যা ব্যক্তির ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি সৃষ্টি ও ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে। আধুনিক ব্যস্ত, চঞ্চল ও কোলাহলপূর্ণ জনজীবনে অস্থিরতা, মানসিক চাপ, টেনশন ও উত্তেজনার নানাবিধ কারণ আছে।
কারণ সমূহ নিম্নরূপ :
১. দুশ্চিন্তা (Anxiety)
২. ভাবের দোদুল্যমানতা (Mood swings)
৩. অবসাদ (Depression)
৪. ক্রোধ প্রবণতা (Irritabality)
৫. নিশি আতংক (Night terror)
৬. স্নায়ুবিক দুর্বলতা (Nervous weakness)
৭. বিরক্তিবোধ করা (Worrying)
৮. সংশয় (Confusion)
৯. স্মৃতিভ্রম (Forgetfulness)
১০. ক্ষীণ মনোযোগ (Poor concentration)
১১. বিষণ্ণতা (frustration)
১২. একাকীত্বভাব (Loneliness)
মানসিক চাপ মানসিক যন্ত্রণাসহ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। মানসিক চাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও জীবনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
মানসিক চাপের উৎস
ব্যর্থতা (Frustration)
দ্বন্দ্ব (Conflict)
ব্যক্তিজীবনে মানসিক চাপের উৎসসমূহ
সামাজিক বৈষম্য
প্রাকৃতিক কারণ
দরিদ্রতা
শারীরিক ত্রুটি
অপ্রত্যাশিত ঘটনা
মানসিক চাপ প্রশমনের উপায় (How to manage stress)
রিলাক্স
ইবাদাত
ব্যায়াম
কুরআন অধ্যয়ন
মেডিটেশন
প্রশান্তি
মানসিক চাপ উত্তরণে স্বাস্থ্যের ভূমিকা
স্বাস্থ্যকে আমরা শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য হিসেবে ভাগ করতে পারি। কঠোর পরিশ্রম ও বুদ্ধিভিত্তিক কাজ করার জন্য যেমন ভাল স্বাস্থ্য ও সুস্থতা আবশ্যক, তেমনি ব্যক্তি, পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভুত সমস্যা মুকাবিলা করার জন্যও উত্তম স্বাস্থ্য তথা সুস্থ শরীর আবশ্যক।
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে চিন্তাভাবনার ভারসাম্য বুঝায়। চিন্তা-চেতনা ও আচরণে অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হলে মানসিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। সাধারণত নিম্নোক্ত অবস্থার উপর মানিসক স্বাস্থ্য বহুলাংশে নির্ভর করে-
১। ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র ও মুল্যবোধ,
২। পেশাগত ও পারিবারিক অঙ্গীকার,
৩। সততা ও নিষ্ঠার সহিত দায়িত্ব পালন ও পরিশ্রম করে হালাল রোজগারের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ,
৪। জীবন ও সমাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি,
৫। ব্যক্তির অহংবোধ তথা জীবন ধারণ বৈশিষ্ট্য,
৬। জীবন দর্শন,
৭। পরকালীন জবাবদিহিতায় বিশ্বাস।
১৪. সময় ব্যবস্থাপনা (Time Management)
বস্ত্তবাদীরা বলে ‘টাইম ইজ মানি’। তাই তারা সময়কে টাকা উপার্জনের সুযোগ হিসেবে দেখে। ইসলাম বলে সময় হলো জীবনকাল মানে হায়াত। জীবন নিয়ে ভাবে না অনেকেই। জীবনের কখন সূচনা, কোথায় গন্তব্য তাও জানে না বহু লোক। মানুষ জীবন যাপন করে কিন্তু জীবনের আদ্য প্রান্ত জানার চেষ্টা করে না। জীবনে মানুষ অনেক কিছু পেতে চায়, ভোগ করতে চায়, বিলাস চায়, জীবনে মানুষ নিরাপত্তা-অধিকার-সুখ-শান্তি-সৌন্দর্য-সাফল্য চায়।
কিন্তু মানুষ যা যা চায় সেগুলোর সঠিক পরিচয়ই অনেকের জানা নেই। সেগুলো পাওয়ার পথ সম্পর্কে বিভ্রান্ত অনেকেই। মানুষ যা যা পেতে চায় সেগুলো সাময়িক পেতে চায়, নাকি স্থায়ীভাবে পেতে চায়, সে বিষয়ে মানুষের সিদ্ধান্ত নেই।
মানব দেহের দুটি অংশ। একটি দেহ, অপরটি আত্মা। মানব দেহকে জীবন্ত রাখে রূহ (Spirit) বা জীবন (Life)।
একজন মানুষকে জীবন্ত দেখা গেলেও তার জীবন বা রূহ দেখা যায় না। মূলত: রূহ দেখা যাবার জিনিস নয়। রূহ সম্পর্কে মানুষকে সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।
তোমাকে তারা রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছে। তুমি বলো, রূহ আমার প্রভুর একটি নির্দেশ আর তোমাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে সামান্যই।
এই রূহ আত্মা বা জীবন হলো আল্লাহর নির্দেশ। এটা একটা বিমূর্ত বিষয়। প্রত্যেকের রূহ আল্লাহর এক একটা নির্দেশ। রূহ মূর্ত হয় বা প্রকাশ পায় মানুষের দেহের মধ্যে। রূহ বা জীবন বিহীন দেহ মৃত।
মানুষের রূহের মৃত্যু হয় না। মানুষের রূহ (Spirit/Life) অমর। পৃথিবীর জীবনে মানুষের যে মৃত্যু হয়, সে মৃত্যু হয় দেহের, রূহের নয়। মূলত রূহের হয় ইন্তিকাল, আর দেহের হয় মৃত্যু। ইন্তিকাল মানে স্থানান্তর (Transfer) অর্থাৎ দেহ থেকে রূহ বা জীবন স্থানান্তরিত হয়ে যায়। দেহ থেকে রূহ স্থানান্তর হয়ে গেলেই দেহ হয়ে পড়ে মৃত।
কুরআন অধ্যয়ন করলে জানা যায়, মানুষের জীবন বা রূহের কয়েকটি ইন্তিকাল হয়। এর সর্বশেষ ইন্তিকাল হয় জান্নাতে বা জাহান্নামে। জান্নাত ও জাহান্নামই মানুষের সর্বশেষ গন্তব্যস্থল (Ultimate destination)
কুরআন মাজীদ বা হাদীস পড়লে জানা যায় যে মানব জীবনের (রূহের) সৃষ্টি থেকে নিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছা পর্যন্ত মোট ছয়টি অধ্যায় রয়েছে। একটি অধ্যায় থেকে আরেকটি অধ্যায়ে রূহ স্থানন্তরিত হয়। এগুলো হলো :
১. আলমে আরওয়াহ : রূহের জগত,
২. আরহামে উম্মুহাত : মাতৃগর্ভ
৩. হায়াতুদ দুনিয়া : পৃথিবীর জীবন-জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পৃথিবীর জীবন।
৪. আলমে বারযাখ : অন্তরাল জগৎ
৫. ইয়াওমুল কিয়ামাত/ কিয়ামাতকাল/ হাশর
দুনিয়ার জীবনটি মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সময়ের সমষ্টিমাত্র। সময় ও জীবন একাকার। নির্ধারিত সময়ে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় অনিবার্য। বিদায় সময় সচেতনতা অপরিহার্য। সময় সচেতনতা ও সাফল্য অনেকটাই সমানুপাতিক।
দুনিয়ার জন্য নির্ধারিত সময়কে পরকালের সাথে তুলনা করে কুরআনে কোথাও কয়েকটি ঘণ্টা একটি সকাল বা একটি বিকাল ইত্যাদি শব্দ দ্বারা দুনিয়ার জীবনের সময় গুরুত্ব অনুধাবন করে সিরিয়াস হওয়ার জন্য তাকিদ দিয়েছে।
সমাজে যারা উঁচু পর্যায়ে অবস্থান করেন তাঁরা সময় সংকটে ভোগেন। নেতৃবৃন্দের গণসংযোগ, নির্বাহীদের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে সময়ের ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা সৃষ্টি হয়। ইসলাম এ ব্যাপারে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্বের মডেল। ওয়ারাফানা লাকা জিকরাক ‘আমিই তোমার স্মরণকে সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছি’ হিসেবে মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে দিয়ে তাঁর সময়কে পরিকল্পিত ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে বলেছে, ফাইযা ফারাগতা ফানসাব ‘অতপর যখনি তুমি অবসর পাবে তখনি তুমি (ইবাদাতের) পরিশ্রমে লেগে যাও।’। অর্থাৎ একটি অংশ শেষ করেই আরেকটি কাজ শুরু করে দিন। পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া এমনটি কখনই সম্ভব নয়। অবসর সময় বুঝাতে কুরআনে ফারাগ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু যাদের পূর্ব পরিকল্পনা থাকে না তারা সময়কে ভবিষ্যতে কাজে লাগাতে পারে না। ফলে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হয়ে উঠে না। এদের ব্যাপারেই মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন আল্লাহর দেয়া দুটি নেয়ামত ব্যবহারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকা খেয়েছে। একটি হলো তার সুস্থতা অপরটি তার অবসর সময়।
জীবনের সময় নির্ধারিত বলেই প্রয়োজন হলো সময়ের যথার্থ ব্যবহার, সময়ের বাজেটিং। কোন কাজের জন্য কতটুকু সময় প্রয়োজন। কখন শুরু করে, কখন শেষ করতে হবে, কোন কাজটি অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য ইত্যাদি বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়াও প্রয়োজন কাজের মূল্যায়ন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ। নষ্ট সময়ের জন্য আফসোস করে সময় আরও ব্যয় করার চাইতে সামনে যেন আর সময় নষ্ট না হয় তার সিদ্ধান্তই জরুরী।
এছাড়া সময়কে ঘিরে রয়েছে শয়তানের চক্রান্ত। শয়তান চায় মানুষ বেহুদা সময় কাটাক, অলস সময় কাটাক। নিজের জরুরী কাজ সম্পর্কে ভুলে থাকুক। আড্ডাবাজি, ধান্ধাবাজি ইত্যাদিতে মানুষকে লাগিয়ে দিয়ে শয়তান মানুষের সময়কে নষ্ট করতে তৎপর থাকে। কর্মপরিকল্পনার কথা শয়তান ভুলিয়ে দিতে পারে। ফলে জীবনে আসে শেষ সময়ের তাড়াহুড়া যা হলো শয়তানের প্রডাক্ট। সচেতন মানুষ তাই এপয়েন্টমেন্ট ডায়রী সংরক্ষণ করেন। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ভিত্তিতে পরিকল্পনা করে কাজের সময় বণ্টন করেন। এমনকি দৈনিক কাজের জন্য আগাম সময় বণ্টন করে ক্রমান্বয়ে সম্পাদন করে থাকেন। ফলে তারা অনেক সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন।
সময় নষ্ট করা থেকে বাঁচতে হলে কথাবার্তা সংরক্ষণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে চুপ থাকল সে বেঁচে গেল। এই হাদীসটি আমল করে শুধু অপ্রয়োজনীয় কথা পরিহার করে অনেক সময় বাঁচিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ সমাধা করা যায়। টিভি, মোবাইল মানুষের বহু সময় নষ্ট করছে। দৈনিক এক ঘণ্টা সময় বাঁচিয়ে বছরে ৩৬৫ ঘণ্টা বাড়তি সময়ে একটি বিরাট কাজ সম্পাদন করা যেতে পারে। এ সময়ে কুরআন অধ্যয়ন করা যেতে পারে, কুরআনের কয়েকটি সূরা মুখস্থ করা যেতে পারে, একটি আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা যেতে পারে। যেমন মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাহাবী হযরত যায়িদ বিন সাবিত (রা.) এক দিনে একটি আন্তর্জাতিক ভাষা শিখে নিয়েছিলেন। একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রী বা কোন ডিগ্রী নেয়ার জন্য এ সময়টুকুয় পড়াশুনা যথেষ্ট কাজ দিতে পারে।
সময়ের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে ইসলাম জোর তাকিদ দিয়েছে। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হলেন জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মানুষ যিনি সময়ের মূল্য দানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ পেশ করেছেন। তাঁর ৬৩ বছরের জীবন কালের কর্মপরিধির বিস্তার এবং সকল ক্ষেত্রে সাফল্যের উদাহরণ এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি যথার্থই বলেছেন, এমন কোন একটি সকাল আসেনা যখন একজন ফেরেশতা ঘোষণা করেন না যে, হে বনী আদম, আমি একটি নতুন দিন এবং আমি তোমার কাজের সাক্ষী। সুতরাং আমার সর্বোত্তম ব্যবহার করো। শেষ বিচারের দিনের আগে আমি আর কখনো ফিরে
আসব না।’
সময় স্রোতের মতই বয়ে যায়। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা সময়ের কসম খেয়ে বলেছেন সময়ের বিচারে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। কেউ কেউ তো সময় নষ্টকারীকে তুলনা করেছেন সেই বরফ বিক্রেতার সাথে যার বরফ বিক্রয়ের আগে গলে পানি হয়ে যাচ্ছে। আর মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিটির পরিচয় তুলে ধরে বলেছেন যার দুইটি দিন একই রকম যায় নি:সন্দেহে সেই ক্ষতিগ্রস্ত। তাই গতকালের অবস্থার চাইতে আজকের অবস্থা অধিক ভাল করার জন্য প্রয়োজন হল সিদ্ধান্তের আর সময়ের বাজেট অনুযায়ী প্রচেষ্টার।
দুনিয়ার সময় নির্ধারিত। কখন তা শেষ হবে তা কারোরই জানা নেই। মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্ত্রী বানাইয়েছে। বাউল কবি অবশেষে মিস্ত্রীর সন্ধান না পেলেও দেহ ঘড়ির ডিজিটাল প্রমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত সময় এলেই সব শেষ। সেজন্য প্রয়োজন অনেক অর্জন ও বর্জন যা পরকালের পাথেয় হতে পারে। যেন সেখানে পৌঁছে কেউ না বলে যে আমি অল্প কালই ছিলাম। আর আফসোস করে বলবে, হায় আমি যদি হায়াত (সময়) কে কাজে লাগানোর ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতাম।
মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষকে যত নিয়ামাত দিয়েছেন সময় তার অন্যতম। এ সময়ই উন্নতি অবনতির সোপান। এখানে যাদের হার হয়েছে তারা আর শির উঁচিয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
উপসংহার (Conclusion)
ইসলামী ব্যবস্থাপনা বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী ব্যবস্থাপনা একটি স্বতন্ত্র ও দ্রুত সম্প্রসারণ মান পাঠ্য শৃঙ্খলা। আজ সারা বিশ্বে মুসলিমরা আবার জেগে উঠেছে। পাশ্চাত্যের দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে রয়েছে কুফুরী, দ্বন্দ্বসংশয় যা আমাদের কোমলমনা ছাত্র-ছাত্রীদের মনে চিন্তার নৈরাজ্য সৃষ্টি করে তা আমরা আর হুবহু গ্রহণ করতে পারিনা। আমরা যেমন মুসলিমের জাতির পিতা হযরত ইববরাহীম খলিলুল্লাহর নাম মুছতে প্রস্ত্তত নই- তেমন ব্যবস্থাপনার পিতা হিসাবে ফেয়লের নাম বারংবার আওড়াতে হই বিরক্ত। কেননা সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্মই হয়েছে ইসলামের কোলে। ইসলামের সুদীর্ঘ প্রশাসনিক ইতিহাসে সুস্পষ্ট রয়েছে ইসলামী ব্যবস্থাপনার দিক-নির্দেশনা। আধুনিক কালের ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করলে ইসলামী শিক্ষার সামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রায়োগিক দৃষ্টান্তের মিল খুঁজে পাওয়া যায় ব্যাপকভাবে। উদাহরণস্বরূপ ফেয়লের ব্যবস্থাপনার ১৪ নীতিতে রয়েছে ইসলামী শিক্ষার সুস্পষ্ট ছাপ। উপরন্তু ইসলামী ব্যবস্থাপনায় রয়েছে বিশেষ অতিরিক্ত কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ নীতি যথা- সততা ও দক্ষতা, দেশপ্রেম, সঠিক স্থানে সঠিক লোক নিয়োগ, শ্রমের মর্যাদা, ব্যয় সাশ্রয়, জবাবদিহিতা ও তাওয়াক্কুল যা ব্যবস্থাপনা ধারণায় সর্বজনীনতা আনয়ন করে। ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ ফাংশন পরিকল্পন হতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিটিই ইসলাম সমর্থিত এবং এই সকল ফাংশন ইসলামী শিক্ষার আওতাবহির্ভূত নয় বরং এ সকল ফাংশনের সমর্থনে অসংখ্য কুরআন-হাদীসের দলিল পেশ করা যায়। ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে প্রভাবশালী ফাংশন নেতৃত্ব। আর এই নেতৃত্বের বাস্তবানুগ ফর্মুলা দিয়েছে ইসলাম। নেতৃত্বকে ফলপ্রসু করার জন্য প্রয়োজন দৃষ্টান্ত স্থাপন। ইসলামের নেতৃত্ব কৌশলে Examplary বা উদাহরণ সৃষ্টির আবশ্যকতা রয়েছে সর্বপ্রথম। ঐতিহাসিকরা বলে থাকেন ইসলামের এই দৃষ্টান্তমূলক আদর্শের কারণে এই দীনের দাবি মানুষের হৃদয়ে আজও আসন গেড়ে বসে আছে এবং কিয়ামাত পর্যন্ত থাকবে। আধুনিক ব্যবস্থাপনার চিন্তাবিদগণ পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর তাকিদ দিয়ে থাকেন। অথচ এই মাশআরাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথা কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে ঘোষণা দিয়েছেন এবং রাসূলের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনে তার বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত রয়েছে ভুরি ভুরি। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যুদ্ধ ব্যবস্থাপনায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ও অনুসরণীয় কৌশল যা আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক কারবার ব্যবস্থাপনার জটিল সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রয়োগের দাবি রাখে। তাঁর প্রতিটি যুদ্ধে ছিল অপেক্ষাকৃত স্বল্প মানবসম্পদ ও রসদ সামগ্রী কিন্তু অনুপম অনুপ্রেরণামূলক কৌশলের কারণে বিজয় তাঁর পদচুম্বন করে। স্বল্প লোকবলের সুদৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো ও টিম স্পিরিট-ভ্রাতৃত্ব সকল যুগের ব্যবস্থাপনার জন্য অনুপম আদর্শ। 

[প্রবন্ধটি ১৯ মার্চ, ২০১১ তারিখে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসাবে পঠিত হয়।]

 

ফুটনোটঃ

. নি:সন্দেহে (মানুষের) জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহর কাছে ইসলামই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা। (সূরা ৩ : আলে ইমরান-১৯)।
. আমি (আমার) গ্রন্থে বর্ণনা বিশ্লেষণে কোন কিছুই বাকী রাখিনি। (সূরা ৬ : আল আনআম-৩৮)।
. ড. এম এ মান্নান ও ড. মো. আতাউর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচিতি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত, ঢাকা-১৯৯৬, পৃ-৫।
. ড. আনোয়ার হোসেন ও মো. জাকির হোসেন, ব্যবস্থাপনা নীতি, স্কুল অব বিজনেস, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত, জানুয়ারী-১৯৯৬, পৃ.-৩।
. Louis A. Allen, Management and Organization (Tokyo : McGraw-Hill, 1958) p-4।
. উদ্ভুত ব্যবস্থাপনার ধারণা ও মূলনীতি (প্রবন্ধ), প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল,বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইউস্টিটিউট প্রকাশিত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বোর্ড বাজার, গাজীপুর, ১০ জুন ২০০৪, পৃ-৩৩।
. হেনরী ফ্যায়ল ছিলেন ফ্রান্সের শিল্পপতি। সাধারণ ব্যবস্থাপনা নীতির ওপর তাঁর দৃঢ় পর্যবেক্ষণ ফরাসী ভাষায় ‘শিল্প ও সাধারণ পরিচালনা (Administration, industrial & generale) নামে বই আকারে ১৯৯৬ সালে প্রথম জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়।
. Henri Fayol, General and Industrial Management, Sir Isaac Pitman and sons, London, 1949. উদ্বৃত ড. শহীদ উদ্দিন আহমদ, ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, নভেম্বর ১৯১৭, পৃ. ২৭-২৮।
. G.R Terry, Principles of Management, Richard d. Irwin Inc, Homewood, Illinois, 1975 পৃ. ৪।
. ড. এম এ মাননান ও ড. মো. আতাউর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচিতি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ.৬।
. সূরা-২ : আল বাকারা-২৮২।
. ড. মো. গোলাম মহিউদ্দীন, ইসলামিক ম্যানেজমেন্ট, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, দ্বিতীয় সংস্করণ, মে ২০০৯, পৃ. ২।
. ড. মো. আতাউর রহমান, ইসলামিক ম্যানেজম্যান্ট এন্ড বিজনেস (ট্রেনিং প্রবন্ধ) পৃ. ১|
. ড. সাইয়েদ মুহাম্মদ আতাহার, ইসলামিক ম্যানেজমেন্ট এন্ড বিজনেস, নকশা পাবলিকেশন্স, চকবাজার, চট্টগ্রাম, মে ২০০৭, পৃ. ৭।
. ড. শহীদ উদ্দিন আহমেদ, ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, নভেম্বর ১৯৯৭, পৃ. ২৯।
. হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বর্ণিত হাদীস। সহীহ আল বুখারী-১/২০৪, জুম’আ অধ্যায়।
. সূরা ৮২ আল ইনফিতার : ১১-১২।
. সূরা ৪২ আশ্ শূরা : ৩৮।
. সূরা-৩ : আলে ইমরান-১৫৯।
. সূরা ৪৯ আল হজুরাত : ১৩।
. সূরা ১৬ আন নাহল : ৯০।
. সূরা ৬ আল আনআম : ১১৫।
. সূরা ৫ আল মায়িদাহ : ৮।
. সূরা ৫৭ আল হাদীদ : ২৫।
. মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি, খালিফা। খলিফা হিসেবে মানুষ হলো পৃথিবীর শাসক, ব্যবস্থাপক, পরিচালক। তবে তা ব্যবস্থাপনা কর্তৃত্ব মৌলিক নয় বরং আল্লাহ হতে অর্পিত। মানুষ এ অর্পিত ক্ষমতাকে আল্লার পক্ষ থেকেই ব্যবহার করে বলেতাকে খলিফা বলা হয়েছে। অন্য কথায় মানুষ প্রকৃত মালিক আল্লাহর প্রতিনিধি বা ট্রাস্টি। আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে নিজের খলিফা বানিয়ে একদিকে যেমন অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, অন্যদিকে তেমনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশ অনুসারে পার্থিব ব্যবস্থাপনার বিরাট দায়িত্বও মানুষের উপর অর্পিত হয়েছে।
. সূরা ৪ আন নিসা : ৫৯।
. কুরআন বলছে : আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পরিপূর্ণ করে দিলাম।, আর তোমাদের ওপর আমার (প্রতিশ্রুত) নিয়ামাতও আমি পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের জন্য জীবন বিধান হিসাবে আমি ইসলামকেই মনোনীত করলাম। সূরা ৫ : আল মায়িদা-৩
. সহীহ মুসলিম।
. সূরা ১০ : ইউসুফ-৫৫।
. বাংলাদেশে এটিকে হাদীস বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এদেশে এটি একটি অতিপ্রচলিত সুন্দর বাক্য। আসলে এটি হাদীস নয়। -ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি: প্রচলিত মিথ্যা হাদীস ও ভিত্তিহীন কথা, আস্সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ঝিনাইদাহ, মে ২০০৬, পৃ. ৩৫৪।
. সূরা ২ আল বাকারা : ২৩৩।
. সহীহ মুসলিম, ইয়াহইয়া, বিন হুসাইন থেকে বর্ণিত।
. সূরা ৪ আন নিসা : ১৩৫।
. সূরা ৫ আল মায়েদা : ৮।
. সূরা ৪ আন নিসা : ১৩৫।
. জামে আত্ তিরমিযী; উদ্ধৃত : ফরীদ উদ্দীন মাসউদ, ইসলামে শ্রমিকের অধিকার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জানুয়ারী-১৯৮৪, পৃ. ৮১-৮২।
. আবু দাউদ শরীফ।
. হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) দীর্ঘদশ বছর পর্যন্ত মহানবীর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খিদমাত করেছে এবং ছায়ার মত তাঁর পাশে রয়েছেন। কিন্তু এই দীর্ঘকালের মধ্যে তিনি তাঁর নিকট কোন কৈফিয়ত তলব করেননি এবং কাজের দরুন তাঁকে কখনো ভৎর্সনাও করেননি। উদ্ধৃত : দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, সম্পাদনা পরিষদ সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল-২০০১, পৃ. ৪৯৭।
. সূরা ১৭ বনী ইসরাইল : ৩৪।
. সূরা ৯৯ যিলযাল : ৭-৮।
. ড. এম এ মাননান ও ড. মো. আতাউর রহমান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭।
. সূরা ৭ আল আরাফ : ৩১।
. সূরা ১৭ বনী ইসরাইল : ২৭।
. সূরা ৫ আল মায়েদা : ১১।
. আল মুখতারু মিন কুনুযিস সুন্নাতিন নাবিয়্যাতি, পৃ. ১২।
. উদ্বৃত ড. এম.এ. মাননান ও ড. মো. আতাউর রহমান, পূর্বোক্ত, পৃ. ২০।
. সূরা-১১ : আল আম্বিয়া-৩৩।
. সূরা-১২ : ইউসুফ-৪৭-৪৯।
. ড. এম এ মাননান ও ড. মো. আতাউর রহমান, পূর্বোক্ত, পৃ. ২১।
. সূরা ২ আল বাকারা : ২৮৬।
. সূরা ৪৩ আয্ যুখরুফ : ৩২।
. হযরত আলী (রা.), একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক চিঠি, মনজুর আহসান অনূদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮৩।
. আল ফারাবী, কিতাব আল সিয়াসাহ আল মাদানিয়াহ, পৃ. ৩৯।
. আল গাযযালী, আল মুসতাসফা (১৯৩৭) পৃ. ১৩৯।
. A Hand Book of Public Administration, জাতিসংঘের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত (১৯৬১)
. পল.এইচ.এপলবি, Public Administration for a Welfare State এ টি এম শামসুদ্দীন অনূদিত, ঢাকা, NILG, ১৯৬৪, পৃ. ৫১।
. আল-গায্যালী, আল মুসতাসফা (১৯৩৭) প্রথম খন্ড, পৃ. ১৩৯-১৪০।
. ইমাম শাতিবী, Al-Muwafaqat fiusul al shariah, vol-2, p. 177.
. ৮২ সূরা আল ইনফিতর : ১০-১২।
. ৯৯ সূরা যিলযাল : ৭-৮।
. উদ্বৃত আবদুন নূর, লোক প্রশাসন, সংগঠন, প্রক্রিয়া ও অনুচিন্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট, ঢাকা, সেপ্টেম্বর, ২০০৬, পৃ. ৮৩।
. ১৭ সূরা বনী ইসরাইল : ৮৫।
. সূরা ৯৪ আল ইনশিরাহ : ৪।
. সূরা ৯৪ আল ইনশিরাহ : ৭।
. ১০৩ সূরা আল আসর : ১-২।
. সূরা আল বালাদ, ৮৯ : ২৪।