মূলপাতা নিবন্ধ বিদ‘আতের পরিচয় ও পরিণাম

সূচীপত্র

বিদ‘আতের পরিচয়
বিদ‘আত শব্দের আভিধানিক অর্থ
বিদ‘আতের পারিভাষিক সংগা
বিদ‘আত চেনার সহজ উপায়
বিদ‘আতের ধরণ
এক: শিরকী বিদ‘আত
দুই: হারাম বিদ‘আত
তিন: মাকরুহ বিদ‘আত
শরী‘য়াতের দৃষ্টিতে বিদ‘আত প্রত্যাখ্যাত
বিদ‘আতের প্রকরণ
বিদ‘আতকে ভাল ও মন্দে বিভক্ত করণের ভয়াবহ পরিণাম
দ্বন্দ্বের অপনোদন
এক: তারাবীহের নামায
দুই: বিদ‘আতের প্রকরণ ও হযরত ‘উমার (রা:)
বিদ‘আত হলো সুন্নাতের বিপরীত
বিদ‘আত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনুগত্যের পরিপন্থি
সারকথা
বিদ‘আতের ভয়াবহ পরিণাম
এক: মহান আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ
দুই: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর অপবাদ আরোপ
তিন: সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদার উপর চরম আঘাত
চার: ইসলামের উপর অসম্পূর্ণতার অপবাদ আরোপ
পাঁচ: ইহুদী ও খৃস্টানদের অনুকরণ
ছয়: ধর্মীয় ব্যাপারে ব্যক্তিপূজার দ্বার উম্মোচন
সাত: দীনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রবঞ্চনা
আট: পিতৃপুরুষের অন্ধ অনুকরণের জাহিলী স্বভাবের পুনরাবৃত্তি
নয়. সুন্নাতের অপমৃত্যু ঘটানো
পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে প্রচলিত একটি গুরুতর বিদ‘আত
মিলাদ মাহফিলের এই বিদ‘আতটি শিরকের দ্বার উম্মোচন করে
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ভালবাসার গুরুত্ব
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ভালবাসার সঠিক পন্থা
উপসংহার

 

 

الحمد لله رب العالمين. والصلاة والسلام على رسوله الأمين، الذي بلغ الرسالة وأدى الأمانة و نصح الأمة و جاهد في الله حق جهاده وتركنا على المحجة البيضاء، ليلها كنهارها لا يزيغ عنها إلا هالك. صلوات الله وسلامه عليه وعلى آله وصحبه، ومن اتبع هداه إلى يوم الدين، وبعد:
ভূমিকা:
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবন পর্যন্ত ব্যাপ্ত। এ জীবন ব্যবস্থা একদিকে যেমন পরিপূর্ণ, অপরদিকে সুস্পষ্ট। এতে কোন গোঁজামিল বা অস্পষ্টতা নেই। এর প্রতিটি বিধান বাস্তবে অনুশীলনযোগ্য। হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মাধ্যমে এ জীবন বিধানকে বাস্তবে রূপায়ন করে দেখানো হয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত এ জীবন বিধানের বাস্তব রূপই হচ্ছে সুন্নাত। আর এর বাইরে পরবর্তীকালে যেসব নব নব পন্থা চালু হয়েছে, সেসবই বিদ‘আত।
তবে পরবর্তীতে এ বিদ‘আতকে ভাল এবং মন্দে বিভক্ত করে অনেকে এগুলোকে শরী‘য়াতের অন্তর্ভুক্ত করার হীন প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। যা একদিকে যেমন এই বিধানের পরিপূর্ণতা ও সর্বজনীনতায় সংশয়ের ডানা বিস্তার করেছে, অপরদিকে তেমনি বিধান দাতা মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর একত্ববাদে কলংক লেপণের ব্যর্থ অপপ্রয়াস বলে প্রতিয়মান হচ্ছে। তাই এ প্রবন্ধে আমি বিদ‘আতের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন, এর প্রকরণের শুদ্ধাশুদ্ধি বিশ্লেষণ এবং এর সুদূর প্রসারী পরিণাম নিয়ে আলোচনার প্রয়াস চালিয়েছি।
বিদ‘আতের পরিচয়
‘বিদআত’ (بدعة) একটি আরবী শব্দ। শব্দটি আরবী হলেও সারা দুনিয়ার মুসলিমদের কাছে এটি একটি অতীব পরিচিত পরিভাষা। অর্থ ও প্রয়োগগত দিক থেকে এটি সুন্নাতের বিপরীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হলো ‘নতুন সৃষ্টি; যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত ছিলনা।’ ইংরেজীতে যার অনুবাদ করা হয়- newness/novelty অর্থাৎ নতুনত্ব/ অভিনবত্ব; unprecedented বা নজির বিহীন; innovation/ innovated practice তথা নতুন কোন প্রথা প্রবর্তন করা বা চর্চা করা। এ অর্থেই মহান রাববুল ‘আলামীন আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম হলো বাদী’ (بديع) । যার অর্থ creator বা স্রষ্টা; innovator (one who introduces something new) বা কোন নতুন প্রথার প্রবর্তক। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে আল্লাহর নিজের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে:(بديع السموات والأرض) অর্থাৎ ‘আসমান ও যমীনের নূতন সৃষ্টিকারী (যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত ছিলনা)।’ অন্য আয়াতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছে:
( قل ما كنت بدعا من الرسل وما أدري ما يفعل بي ولا بكم إن أتبع إلا ما يوحى إلي ماأنا إلا نذير مبين)
‘‘আপনি বলুন, আমি এমন কোন রাসূল নই যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। আমি জানিনা আমার ও তোমাদের সাথে কি ব্যবহার করা হবে। আমি কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী করা হয়। আমি তো শুধু স্পষ্ট সতর্ককারী।’’
এ আয়াতে উল্লেখিত بدع শব্দটি (যা বিদ‘আতের মূল) কোরআনুল কারীমে মাত্র একবার এসেছে। তবে এই ধাতু থেকে উদ্ভূত আরেকটি শব্দও কোরআনুল মাজীদে এসেছে। যেমন- ورهبانية ابتدعوها ما كتبناها عليهم))
‘‘আর বৈরাগ্যবাদ সে তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে। আমি এটি তাদের উপর আরোপ করিনি।’’
বিদ‘আত শব্দের আভিধানিক অর্থ
বিদ‘আতের আভিধানিক অর্থ হলো- (هي كل ما أحدث على غير مثال سابق)
‘প্রত্যেক ঐ নতুন বস্ত্ত যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই।’ আর তাই এটি সুন্নাতের বিপরীত। কেননা সুন্নাতের পূর্ব দৃষ্টান্ত আছে। সুন্নাত হলো রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুসৃত পন্থা। ইমাম রাগিব (মৃ. ৫০২হি./ ১১০৮খৃ.) ‘বিদ‘আত’ শব্দের অর্থ লিখেছেন: إنشاء صنعة بلا اعتداء واقتداء
‘‘কোনরূপ পূর্ব নমুনা না দেখে এবং অন্য কিছুর অনুকরণ অনুসরণ না করেই কোন কার্য নতুনভাবে সৃষ্টি করা।’’
ইমাম নববী (৬৭৬হি./ ১২৭৭খৃ.) ‘বিদ‘আত’ শব্দের অর্থ লিখেছেন:
(البدعة كل شيئ عمل على غير مثال سابق)
‘‘পূর্ব দৃষ্টান্ত ছাড়া যত কাজ করা হয় তা-ই বিদ‘আত’’।’
বিদ‘আতের পারিভাষিক সংগা
বিদ‘আতের পরিচয় এবং এর শাব্দিক বিশ্লেষণে আমরা দেখেছি যে, পূর্ব দৃষ্টান্ত ছাড়া যে কোন নতুন বিষয়কেই বলা হয় বিদ‘আত। কিন্তু যারা এই বিদ‘আত চর্চা ও লালন করেন, তাঁরা যেহেতু ‘ইবাদাত মনে করেই এটি পালন করে থাকেন তাই সেদিক থেকে এর একটি সুনির্দিষ্ট পারিভাষিক পরিচয় রয়েছে। আর তা হলো-
মহান আল্লাহ ‘ইবাদাতের যে অবকাঠামো, আকৃতি-প্রকৃতি ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তা যথার্থভাবে সম্পাদনের নিমিত্তে তাঁর রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে পদ্ধতি-প্রণালী, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও বিধি-বিধান শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁর নিরিখে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে যে পন্থায় ‘ইবাদাত করেছেন এবং যেভাবে করতে তাঁর উম্মাতকে আদেশ করেছেন- এর বাইরে ‘ইবাদাতের যত পন্থা পরবর্তীতে চালু হয়েছে তা-ই বিদ‘আত। তাছাড়া আল্লাহর নির্ধারিত ‘ইবাদাতের মধ্যে কোনপ্রকার হ্রাস-বৃদ্ধি সাধন কিংবা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করাও বিদ‘আত।
অন্য কথায়, বিদ‘আত হলো শরী‘য়াতে যার কোন ভিত্তি নেই এমন কিছু দীনের মধ্যে উদ্ভাবন করা। ইমাম ইবন তাইমিয়া (৭২৮হি./ ১৩২৮খৃ.) বিদ‘আতের সংগায় লিখেছেন:
(إن البدعة في الدين هي ما لم يشرعه الله ورسوله وهو ما لم يأمر به أمر إيجاب ولا استحباب)
‘‘দীনের মধ্যে বিদ‘আত হচ্ছে এমন জিনিস যার বিধান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেননি, যে ব্যাপারে অবশ্যই করতে হবে বা করাটা উত্তম (মুস্তাহাব) এমন কোন আদেশ বা বিধান নেই।’’
ইমাম ইবন রজব আল-হান্বলী (মৃ. ৭৯৫হি./ ১৩৯৩খৃ.) বিদ‘আতের সংগায় লিখেন:
( والمراد بالبدعة ما أحدث مما لا أصل له في الشريعة يدل عليه)
‘বিদ‘আত বলতে এমন জিনিসকে বুঝায় যা প্রমাণের জন্য শরী‘য়াতে কোন ভিত্তি নেই।’
মাওলানা ‘আব্দুর রহীম বিদ‘আত প্রসঙ্গে লিখেছেন:‘কোরআন ও সুন্নাহ বহির্ভূত কোন কাজ, বিষয়, ব্যাপার, নিয়ম-প্রথা ও পদ্ধতিকে ধর্মের নামে নেক আমল ও সওয়াবের কাজ বলে চালিয়ে দেয়াই হলো বিদ‘আত- যে সম্পর্কে কোরআন ও সুন্নাহ থেকে কোন সনদ পেশ করা যাবে না এবং যার কোন নজীর পাওয়া যাবেনা খুলাফায়ে রাশিদীনের আমলে।’
ইমাম শাতিবী (মৃ. ৭৯০হি./ ১৩৮৮খৃ.) বিদ‘আতের সংগায় বলেন:
(البدعة عبارة عن طريقة في الدين مختصرة تضاهي الشريعة يقصد بالسلوك عليها المبالغة في التعبد لله سبحانه)
‘‘যে সকল কাজ শরী‘য়াতের পরিপমীহ এবং যা সম্পাদনে আল্লাহর ‘ইবাদাতে অতিরঞ্জন করা উদ্দেশ্য হয়, এমন কর্মপন্থা চালু করার নামই হলো বিদ‘আত।’’
বিদ‘আত চেনার সহজ উপায়
বিদ‘আতের যারা প্রবর্তন করে, তারা সুন্নাতের নাম দিয়েই তার প্রবর্তন করে। আর পরবর্তীতে যারা এর অনুকরণ করে তারাও সুন্নাত মনে করেই তা পালন করে, বিদ‘আত মনে করে নয়। তাই বিদ‘আত প্রবণ ব্যক্তির কাছে সুন্নাত ও বিদ‘আতে কোন তফাৎ থাকে না। এমতাবস্থায় তাকে কেমন করে বুঝানো যাবে যে, কোন্টি সুন্নাত আর কোন্টি বিদ‘আত? অর্থাৎ সুন্নাত থেকে বিদ‘আতকে পৃথক করার কি কোন সহজ উপায় আছে? উত্তরে আমরা বলব যে, হ্যাঁ সুন্নাত থেকে বিদ‘আতকে পৃথক করার সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। আর তা হলো শরী‘য়াতের দলীলের শরণাপন্ন হওয়া। কিন্তু এ কাজ তো সহজ নয়। প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ের দলীল খুঁজে বের করা তো সহজ কথা নয়। এটা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা শরী‘য়াতের দলীলের ব্যাপারে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। এমতাবস্থায় সহজতর কোন পন্থা থাকলে যে কেউ সুন্নাত নামে পরিচিত এতসব কাজ থেকে বিদ‘আত গুলোকে আলাদা করে ফেলতে পারত।
যে কোন বিষয়ে শরী‘য়াতের দলীল খোঁজা যদিও সহজ ব্যাপার নয়, তথাপি কঠিন হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে বসে থাকলেও চলবে না। বরং প্রত্যেক মুসলিমেরই শরী‘য়াতের দলীল সংক্রান্ত নূন্যতম জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা থাকা চাই। তবে প্রকাশ্য বিদ‘আত গুলোকে চিহ্নিত করার জন্য শরী‘য়াতের দলীল ছাড়াও আল্লাহ প্রদত্ত বিবেক বুদ্ধি খাটালে অতি সহজেই তা চিনে ফেলা সম্ভব। যেমন-
সুন্নাত থেকে বিদ‘আতকে পৃথক করার একটি অতি সহজ উপায় হলো, সুন্নাতের কোন রকমারি রূপ নেই। এটি সর্বদা সর্বত্র একই রকম। পক্ষান্তরে বিদ‘আত একেক স্থানে একেক রকম। এমনকি একই বিদ‘আত এক এলাকায় একভাবে পালিত হয়, আবার আরেক এলাকায় অন্য ভাবে পালিত হয়। সুতরাং স্টাইল (ংঃুষব) বা ধরণের ভিন্নতার দ্বারা সুন্নাত থেকে বিদ‘আতকে আলাদা করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কোন কোন আমল ও একাধিক পন্থায় পালিত হয়, কিন্তু তা বিদ‘আত নয়। কেননা তা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকেই সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে প্রমাণিত। এবং সম্ভবত তা উম্মাতের জন্য সহজ করার লক্ষ্যেই এরূপভাবে চালু করা হয়েছে। এবং অন্ততপক্ষে তার ভিত্তি তো বর্তমান। কিন্তু বিদ‘আতের বেলায় রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহয় এর কোন ভিত্তি তো নেইই, উপরন্তু বিদ‘আতীরা একেক জন তা একেক ভাবে পালন করে থাকে।
বিদ‘আতের ধরণ
বর্তমান দুনিয়ায় যত রকমারি বিদ‘আত চালু আছে তা সবই একই পর্যায়ের নয়। ইসলামী শরী‘য়াতের দৃষ্টিতে জঘণ্যতার মানদন্ডে এগুলো বিভিন্ন পর্যায়ের। কোনটা শিরকের দিকে ধাবিত করে, কোনটা হারামের পথ বাতলায়, আবার কোনটা হালাল কাজকেই শরী‘য়াতের নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে নিজস্ব নিয়মে করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ দিক থেকে মানব সমাজে প্রচলিত এসব বিদ‘আতকে আমরা প্রধানত: তিনটি ধরণে বিভক্ত করতে পারি। আর তা হলো:
এক: শিরকী বিদ‘আত: কিছু কিছু বিদ‘আত এমন আছে যা আল্লাহর সাথে তাঁর কোন সৃষ্টিকে শরীক করার শামিল। এসব বিদ‘আতে যা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত এবং কেবল তাঁরই সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত, তাও বান্দার সাথে মিলিয়ে ফেলা হয়। যথা - অনুপস্থিত কোন ব্যক্তির কাছে কিংবা মৃত ব্যক্তির কাছে দো‘আ করা, তাঁর নিকট কোন কিছু চাওয়া। যেমন- কোন কোন বিদ‘আতী এভাবে বলে যে, হে ‘আব্দুল কাদের জিলানী! আমাকে সাহায্য কর, আমাকে উদ্ধার কর, আমাকে সন্তান দাও ...... ইত্যাদি। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউই তো এসব কিছু দেয়ার ক্ষমতা রাখেনা। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা হলো:
( والذين تدعون من دونه لا يستطيعون نصركم ولا أنفسهم ينصرون)
‘তোমরা তাঁকে (আল্লাহকে) ছাড়া অন্য যাদের ডাকো তারা (তোমাদের) সাহায্য তো করতেই পারেনা, নিজেদের সাহায্যও করতে পারেনা।’ মহান আল্লাহ আরো বলেন:
( قل أتعبدون من دون الله ما لا يملك لكم ضرا ولا نفعا والله هو السميع العليم)
‘‘(হ নবী! আপনি মানুষদেরকে) বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন কারো ‘ইবাদাত করবে, যে তোমাদের কোন ক্ষতি বা কল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে না? অথচ আল্লাহই হলেন সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাত।’’
দুই: হারাম বিদ‘আত: কতক বিদ‘আত আছে এমন যাতে আল্লাহর সাথে সরাসরি শরীক করা হয় না, কিন্তু তাতে শরী‘য়াতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এমন পন্থার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়, অথবা আল্লাহর সন্তুষ্টি আশা করা হয়। যেমন- কোন মৃত ব্যক্তির ওসীলা করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। কবরের দিকে ফিরে সালাত আদায় করা এবং দো‘আ করা। সেখানে মানত করা, গম্বুজ নির্মাণ করা, পুষ্পমাল্য অর্পণ করা ....ইত্যাদি।
আমরা আল্লাহর বান্দাহ বা দাস এবং তিনি আমাদের মনিব। দাস হিসেবে মনিবের কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা বলা আমাদের অধিকার। যদি কেউ মনে করে যে, এই মহা মনিবের কাছে সরাসরি চাওয়া যায়না, তাহলে সে মহান আল্লাহর মহানুভবতার উপর কলংক লেপন করতে চাইল। কেননা তিনি দুনিয়ার কোন রাজা বাদশাহর মত মধ্যস্থতাকারীর মুখাপেক্ষী নন, বরং তিনি এসব কিছুর উর্ধ্বে। বান্দার চাওয়া ছাড়াও তিনি তার মনের আকুতি পর্যন্ত জানেন। তাঁর জ্ঞান সর্বদা সর্বত্র ব্যাপৃত। তিনি বান্দার (ধমনীর) চাইতেও তার বেশি নিকটে। এ প্রসংগে আল-কোরআনে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে:
(ولقد خلقنا الإنسان ونعلم ما توسوس به نفسه ونحن أقرب إليه من حبل الوريد)
‘‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, তাও আমি অবগত। এবং আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও তার অধিক নিকটবর্তী।’’
অতএব তাঁর কাছে চাওয়ার জন্য কোন প্রকার ওসীলা কিংবা মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। এ ব্যাপারে তিনি নবীকে স্পষ্ট জানিয়েও দিয়েছেন-
وإذا سألك عبادي عني فإني قريب
‘‘আমার বান্দারা যখন আপনার নিকট আমার কথা জিজ্ঞেস করে, (আমি জানিয়ে দিচ্ছি যে) আমি অত্যন্ত নিকটে।’’ এ প্রসংগে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন:
(أيها الناس! اربعوا على أنفسكم إنكم ليس تدعون أصم ولا غائبا إنكم تدعون سميعا قريبا وهو معكم)
‘‘হে লোক সকল, তোমাদের নিজেদের প্রতি সদয় হও। (আল্লাহকে অনেক দূরে ভেবে তাঁকে ডাকার সময় জোরে জোরে চিৎকার করো না)। তোমরা এমন কাউকে ডাকছ না যিনি বধির কিংবা অনুপস্থিত। নিশ্চয়ই তোমরা এমন এক সত্তাকে ডাকছ, যিনি অত্যন্ত নিকটে ও সর্বশ্রোতা এবং তিনি তোমাদের সাথেই আছেন।’’
অনুরূপভাবে সৃষ্টজীবের জন্য (চাই সে জীবিত হোক কিংবা মৃত) কোন কিছু মান্নত করা, তার কাছ থেকে কোন কল্যাণ আশা করা, তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা ইত্যাদি ইসলামী শরী‘য়াতে সম্পুর্ণ ভিত্তিহীন এবং সুস্পষ্ট হারাম। এক হাদীসে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
لا تصلوا إلى القبور ولا تجلسوا عليها
‘‘তোমরা কবরের দিকে সালাত আদায় করোনা, আর না তার উপর উপবেশন করবে।’’
আরেক হাদীসে তিনি সাবধান বাণী উচ্চারণ করে এভাবে বলছেন:
لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد
‘‘ইহুদী ও নাসারাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। কারণ তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়েছিল।’’
তিন: মাকরুহ বিদ‘আত: আবার কতক বিদ‘আত আছে যার মূল কাজগুলো কোন না কোন দলীল দ্বারা প্রমাণিত, কিন্তু তার জন্য নিজে নিজে এমন সব পন্থা তৈরি করে নেয়া হয়েছে, যার কোন শর‘য়ী ভিত্তি নেই। যেমন- রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি দরূদ পড়ার নামে মিলাদ মাহফিল করা, জুমু‘আর নামায আদায়ের পর যোহর নামায (আখেরী যোহর) আদায় করা, আযানের পূর্বে ও পরে জোরে জোরে সালাত ও সালাম (দরূদ) পাঠ করা ...... ইত্যাদি।
শরী‘য়াতের দৃষ্টিতে বিদ‘আত প্রত্যাখ্যাত
‘ইবাদাতের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মনিবের আদেশ পালন ও তাঁর সন্তুষ্টি। কিন্তু মনিবের আদেশের ব্যতিক্রম করলে তিনি সন্তুষ্ট না হওয়াই স্বাভাবিক। মনিবের নির্ধারিত পন্থার বাইরে অন্য কোন পন্থা বেছে নেয়ার অর্থই হচ্ছে মনিবকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে খুশী করতে চাওয়া। অথচ যাঁর জন্য ‘ইবাদাত নিবেদিত হয়, কেবল তিনিই এই ‘ইবাদাতের পন্থা নির্ধারণের নিরংকুশ অধিকারী। এজন্যেই আল্লাহর অনুমোদনহীন, মানবীয় প্রবৃত্তি উদ্ভূত কাল্পনিক কোন প্রথা প্রবর্তন করে তার প্রতি ‘ইবাদাতের মাহাত্ম আরোপকে ইসলামের দৃষ্টিতে বিদ‘আত নামে আখ্যায়িত করা হয়।
তাছাড়া এটি যেহেতু মহান আল্লাহর নিরংকুশ অধিকারে অনধিকার চর্চার শামিল, তাই এটি শিরকতুল্য অপরাধ। এ কারণেই মহানবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় উম্মাতকে বিদ‘আতের ব্যাপারে অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:
من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد
‘‘যে ব্যক্তি আমাদের দীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।’’
(من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد)
‘‘কেউ যদি এমন কাজ করে যা আমাদের এই দীনে নেই তাহলে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।’’
(كل محدثة بدعة ، وكل بدعة ضلالة)
‘‘(দীনের ব্যাপারে) নতুন সৃষ্ট যে কোন প্রথাই বিদ‘আত। আর সব বিদ‘আতই গুমরাহী।’’
(فعليكم بسنةي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين عضوا عليها بالنواجذ وإياكم و محدثاة الأمور، فإن كل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة)
‘‘তোমরা আমার ও খুলাফায়ে রাশিদীনের আদর্শকে গ্রহণ কর এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে তা কামড়িয়ে ধর। আর সাবধান! নতুন উদ্ভাবিত সকল বিষয়ে সতর্ক থাক। কেননা নতুন উদ্ভাবিত সকল বিষয়ই বিদ‘আত। আর সকল বিদ‘আতই গুমরাহী ও পথভ্রষ্টতা।’’
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমু‘আর দিন খুতবায় বলতেন:
(أما بعد، فإن أصدق الحديث كةاب الله وخيرالهدي هدي محمد وشرالأمور محدثاةها وكل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة)
‘‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম কথা হলো আল্লাহর কিতাব আর সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হিদায়াত। সর্বনিকৃষ্ট বিষয় হলো মনগড়া নব প্রবর্তিত বিষয়। আর প্রত্যেক নব প্রবর্তিত বিষয়ই বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আতই গুমরাহী বা ভ্রষ্টতা।’’
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদ‘আতের অনিষ্ট বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বিদ‘আতকে প্রশ্রয় দিতেও নিষেধ করেছেন। যারা বিদ‘আতকে প্রশ্রয় দেয় তাদেরকে তিনি বদ দো‘আ করে বলেছেন: (لعن الله من آوى محدثا)
‘যে ব্যক্তি নতুন উদভাবিত কাজ (বিদ‘আত) কে আশ্রয় দেয় আল্লাহ তাকে অভিশাপ দিন।’
এ প্রসংগে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
(فليحذر الذين يخالفون عن أمره أن تصيبهم فتنة أو يصيبهم عذاب أليم)
‘‘যারা তাঁর (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) হুকুমের বিরোধিতা করে তাদের ভয় করা উচিত যে, তাদের উপর কোন ফিতনা বা কোন মর্মন্তুদ শাস্তি আসতে পারে।’’
তিনি আরো ইরশাদ করেছেন: وما آتاكم الرسول فخذوه وما نهاكم عنه فانتهوا
‘‘রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক।’’
উপরের আলোচনা ও দলীল প্রমাণের নিরিখে একথা প্রমাণিত হলো যে, যে কাজের পক্ষে শরী‘য়াতে কোন দলীল নেই তাই বিদ‘আত। আর সকল বিদ‘আতই গুমরাহী ও পথভ্রষ্টতা। তাই ইসলামী শরী‘য়াতে এ ধরণের যে কোন কাজ প্রত্যাখ্যাত ও পরিত্যাজ্য।

বিদ‘আতের প্রকরণ
আজকাল আমাদের সমাজে অনেককেই হরহামেশা এরূপ কথা বলতে শুনা যায় যে, ‘আপনারা যেভাবে বিদ‘আত বিদ‘আত করছেন তাতে তো কোন কাজই আর বিদ‘আতের বাইরে নয়।......... সব বিদ‘আতই তো আর খারাপ নয় । অনেক বিদ‘আত আছে যা দীনেরই স্বার্থে বা সুন্নাতেরই অনুকূলে পালিত হয়। বরং রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতকে জিইয়ে রাখা বা চালু রাখার লক্ষ্যেই সেগুলো করা হয়।’ অর্থাৎ যেন তারা বলতে চান যে; যে কোন মূল্যে যে কোন পন্থায় আল্লাহর দীন তথা রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতকে টিকিয়ে রাখার গুরু দায়িত্ব যেন তাঁদের উপর অর্পিত হয়েছে। আর আল্লাহর দীন যেন এতই ঠুনকো যে নব নব এই সব পন্থার উদ্ভাবন ছাড়া একে টিকিয়ে রাখাই দুষ্কর।
তারা আরো বলেন যে; ‘কিছু কিছু বিদ‘আত আছে যেগুলো ভাল এবং কল্যাণকর। আর কিছু কিছু আছে যা মন্দ ও অকল্যাণকর। ভাল গুলোকে আমরা বিদ‘আতে হাসানা বা উত্তম বিদ‘আত বলতে পারি। আর মন্দ গুলোকে বলতে পারি বিদ‘আতে সাইয়্যিয়াহ বা অনুত্তম বিদ‘আত।’ শুধু তাই নয়; বিদ‘আতের এরূপ প্রকরণের স্বপক্ষে তারা দ্বিতীয় খালীফা আমীরূল মু’মিনীন হযরত ‘উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) একটি উক্তিকে দলীল হিসেবে পেশ করেন। বুখারী শরীফে বর্ণিত এ হাদীসটির মূল বর্ণনাকারী হলেন ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আবদুল কারী। তিনি বলেন:
(خرجت مع عمر بن الخطابুرضي الله عنه- في رمضان إلى المسجد فإذا الناس أوزاع متفرقون: يصلى الرجل لنفسه ويصلي الرجل فيصلي بصلاته الرهط فقال عمر: إني أرى لو جمعت هؤلاء على قارئ واحد لكان أمثل .ثم عزم فجمعهم على أبي ابن كعب . ثم خرجت معه ليلة أخرى والناس يصلون بصلاة قارئهم ، فقال عمر: نعمت البدعة هذه)
‘‘আমি হযরত ‘উমার (রা) এর সাথে রামাদান মাসে মসজিদে গেলাম। সেখানে দেখলাম লোকেরা বিচ্ছিন্ন ভাবে নিজের নিজের (তারাবীহ) নামায পড়ছে। আবার কোথাও একজন নামাজ পড়ছে আর তার সাথে পড়ছে আরো কিছু লোক। তখন হযরত ‘উমার (রা) বললেন: আমি মনে করছি; এ সব নামাযীকে একজন ভাল ক্বারীর পেছনে একত্রে নামায পড়তে দিলে খুবই ভাল হয়। পরে তিনি তাই করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং হযরত উবাই বিন কা‘য়াবের (রা) ইমামতিতে জামা‘য়াতে নামায পড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। অত:পর আরেক রাতে ‘উমার ফারুকের সাথে আমিও বের হলাম। তখন দেখলাম লোকেরা একজন ইমামের পেছনে জামা‘য়াতবদ্ধ হয়ে তারাবীহের নামায পড়ছেন। এ দেখে হযরত ‘উমার (রা) বললেন: ‘কতইনা ভাল বিদ‘আত এটি’।’’
এ হাদীসে উল্লেখিত হযরত ‘উমারের (রা) সর্বশেষ উক্তিটিই তাঁদের মতে বিদ‘আতকে দু’ভাগে ভাগ করার মূল ভিত্তি। কেননা হযরত ‘উমার (রা) বলেছেন: نعمت البدعة هذه অর্থাৎ ‘কতইনা উত্তম বিদ‘আত এটি’। হযরত ‘উমার (রা) যেহেতু এটিকে বিদ‘আত আখ্যা দিয়ে আবার উত্তম বলে অভিহিত করেছেন; কাজেই কতক বিদ‘আত এমন আছে যা উত্তম আবার কতক বিদ‘আত উত্তম নয় বা যা অবশ্যই খারাপ। সম্ভবত: এখান থেকেই মুসলিম সমাজের এক শ্রেণীর লোকের মাঝে এরূপ ধারণার প্রচলন ঘটেছে যে; বিদ‘আত দু’ প্রকার। একটি হলো-بدعة حسنة বা ‘ভাল বিদ‘আত’ আর অপরটি হলো-بدعة سيئة বা ‘মন্দ বিদ‘আত’।
বিদ‘আতকে ভাল ও মন্দে বিভক্ত করণের ভয়াবহ পরিণাম
রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতের প্রতি পর্যাপ্ত দরদ ভরা মন নিয়ে যখন কোন সাধারণ মুসলিম বিদ‘আতের এই প্রকরণের কথা শুনতে পায় তখন সংগত কারণেই তার মন আবেগে ভরে উঠে এবং সুন্নাতের নামে ভাল কিছু হতে দেখলে অতি সহজেই তা কবুল করে নেয় এই ভেবে যে এটি তো মন্দ কিছু নয়। অবশ্য ব্যাপারটি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে তখন যখন এই বিদ‘আতটি কালক্রমে চলতে থাকে এবং পরবর্তী জেনারেশন ভাবতে শুরু করে যে এটি আমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় একটি সুন্নাত। আমাদের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে অমুক অমুক বিশেষ ব্যক্তি এই সুন্নাতেরই পাবন্দ ছিলেন। ফলে যে কাজটির যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি ভাল বিদ‘আত নামে তা এখন অতি সহজেই সুন্নাত নামে পালন হতে থাকল, যেমনটি আমরা আরো অনেক বিদ‘আতের ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ করে থাকি। যেমন; মিলাদ শরীফের নামে যে বিশেষ পন্থা আজ আমাদের দেশের কোন কোন এলাকায় ব্যাপক হারে চালু হয়ে আছে তা হয়ত প্রথমে কোন একজন বিশেষ ‘আবিদ (عابد)আবেগাপ্লুত হয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে পালন করেছিলেন, পরে তাঁর ভক্ত অনুরক্তরা এই পন্থাকে নিজেদের জন্য অনুকরণীয় ভেবে পালন করতে থাকলেন। অথচ তারা বেমালুম ভুলে গেলেন যে কোন ‘ইবাদাতের বেলায় পন্থা নির্ধারণের অধিকার কেবল শরী‘য়াতের, ব্যক্তির নিজের নয়। এ প্রসংগে কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা হলো-
(وعلى الله قصد السبيل ومنها جائر ولو شاء لهداكم أجمعين)
‘‘তোমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করা আল্লাহরই দায়িত্ব। এবং পথগুলোর মধ্যে কিছু বক্র পথও রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারেন।’’
আল-কোরআনের অন্যত্র মহান আল্লাহ মুশরিকদের বিদ‘আত সমূহকে অস্বীকার করে তাদের প্রতি ভৎর্সনার স্বরে বলছেন-
(أم لهم شركاء شرعوا لهم من الدين ما لم يأذن به الله)
‘‘তাদের কি এমন কোন শরীক দেবতা আছে, যারা তাদের জন্য দীনের ঐসব বিধান প্রণয়ন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?’’
দ্বন্দ্বের অপনোদন
বিদ‘আতের প্রকরণ নিয়ে উপরোক্ত আলোচনা থেকে যেসব ধারণার সৃষিট হতে পারে তা হলো- ১. তারাবীহের নামায ইসলামের প্রথম বিদ‘আত এবং জামা‘য়াতের সাথে তারাবীহ পড়া বিদ‘আত। ২. হযরত ‘উমারই (রা) ইসলামে প্রথম বিদ‘আতের প্রচলন করেন। এবং তিনিই প্রথম বিদ‘আতকে দু’ভাগে ভাগ করেন ...ইত্যাদি। সুতরাং দলীল প্রমাণ ও যুক্তি তর্কের মাধ্যমে এসব ধারণার অপনোদন করে বিষয়টির সঠিক সমাধান পেশ করার চেষ্টা করা উচিত।
এক: তারাবীহর নামায
বিদ‘আতের পরিচয়ে দেখা গেছে যে বিদ‘আত হলো এমন নতুন উদ্ভাবিত কথা বা কাজ যার কোন দৃষ্টান্তই পূর্ববর্তী সমাজ তথা ইসলামের সোনালী যুগে (শরী‘য়াত প্রবর্তন কালে) পাওয়া যায় না। এবং শরী‘য়াতের পরিভাষায় যা সুন্নাতের সম্পূর্ণ বিপরীত। সে হিসেবে তারাবীহর নামাযের বিষয়টিকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে; এটি ইসলামের সোনালী যুগ তথা রাসূলের যুগেই বিদ্যমান ছিল এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই তা আমলও করেছেন। শুধু তাই নয়; রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ নামায জামা‘য়াতের সাথেও আদায় করেছেন। সুতরাং তা নতুন উদ্ভাবিত কাজও যেমন নয়; আবার সুন্নাতের বিপরীতও নয়। কেননা জামা‘য়াতের সাথে এ নামায আদায়ের ব্যাপারটিও রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সময়ই হয়েছে। এ প্রসংগে বুখারী ও মুসলিমের সহীহ হাদিস প্রণিধানযোগ্য; যা হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
(إن النبي - صلى الله عليه وسلمু صلى في المسجد فصلى بصلاته ناس ثم صلى الثانية فكثر الناس ثم اجتمعوا من الليلة الثالثة أوالرابعة فلم يخرج إليهم رسول الله ু صلى الله عليه وسلم ু فلما أصبح قال: رأيت الذي صنعتم فلم يمنعني من الخروج إليكم إلا أني خشيت أن تفترض عليكم وذلك في رمضان)
‘‘নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদে নিজের (তারাবীহ) নামায পড়ছিলেন। বহু লোক তাঁর সঙ্গে নামায পড়ল। দ্বিতীয় রাত্রিতেও অনুরূপ হল। এমনকি এ নামাযে খুব বেশি সংখ্যক লোক শরীক হতে থাকল। অত:পর তৃতীয় বা চতুর্থ রাত্রে যখন লোকেরা পূর্বের ন্যায় একত্রিত হল, তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের কাছে গেলেন না। পরের সকালে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন: তোমরা যা করেছ তা আমি লক্ষ্য করেছি। আমি তোমাদের সাথে নামাযের জন্য আসিনি শুধু একটি কারণে। তা হলো; আমার ভয় হচ্ছে যে; এভাবে জামা‘য়াতবদ্ধ হয়ে (তারাবীহ) নামায পড়লে হয়ত তা তোমাদের উপর ফারযই করে দেয়া হবে। হযরত ‘আয়িশা বলেন: এ ঘটনা ছিল রামাদান মাসের।’’
এ হাদীস থেকে অত্যন্ত স্পষ্টরূপে প্রতিয়মান হয় যে জামা‘য়াতের সাথে তারাবীহ নামায পড়াবার কাজ নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই প্রথম করেন। পর পর তিন রাত লোকেরা তাঁর পেছনে জামা‘য়াতে শামিল হলেও তিনি তাদেরকে নিষেধ করেননি। বরং তিনি ভাবলেন যে যেহেতু তখনও শরী‘য়াতের নতুন নতুন বিধান প্রবর্তিত হচ্ছে, এমতাবস্থায় তাঁর (নবীর) নিজের নেতৃত্বে যদি একটি সুন্নাত ‘ইবাদাতকেও নিয়মিত আদায় করা হয় তাহলে না জানি মহান আল্লাহ তা তাঁর উম্মাতের জন্য ফারয বানিয়ে দেন। এ আশংকা থেকেই মূলত: তিনি পরবর্তীতে এ সুন্নাত নামাযের ইমামতি করা থেকে বিরত হন। এবং সাহাবীগণ নিজেরা নিজেরা যে নামায পড়েছিলেন তাতে তিনি বাধা দেননি। উপরোক্ত হাদীস থেকে এটাও প্রতিয়মান হয় যে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুপস্থিতিতেও সাহাবীগণ এ নামায জামা‘য়াতের সাথেই আদায় করছিলেন। কেননা পরের সকালে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে লক্ষ্য করে এভাবে বলেছিলেন যে তোমরা যা করেছ (অর্থাৎ জামা‘য়াতের সাথে তারাবীহর নামায পড়েছ); তা আমি দেখেছি। কিন্তু যে কারণে আমি তোমাদের সাথে শামিল হওয়া থেকে বিরত থেকেছি; তা হলো- আমার ভয় হচ্ছিল যে; আমিও তোমাদের সাথে এভাবে শামিল হতে থাকলে হয়ত এটি তোমাদের উপর ফারয করে দেয়া হবে। হযরত ‘আয়িশা সিদ্দীকার (রা) একটি উক্তি থেকেও একথা স্পষ্ট বুঝা যায়। তিনি বলেছেন:
(كان رسول الله ুصلى الله عليه وسلم- ليدع العمل وهو يحب أن يعمل به خشية أن يعمل به الناس فيفرض)
‘‘রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন কোন কাজ করতে ভালবাসতেন; তথাপি তিনি তা করা থেকে বিরত থাকতেন শুধু এই ভয়ে যে, তাঁর সাথে লোকেরা তা নিয়মিত করতে থাকলে হয়ত তা ফারয হয়ে যেতে পারে।’’
অতএব তারাবীহর নামায বিদ‘আত তো নয়ই; বরং এটি একটি পাক্কা সুন্নাত। আর জামা‘য়াতের সাথে এ নামায আদায় করাও কোন নতুন বিষয় নয়।
দুই: বিদ‘আতের প্রকরণ ও হযরত ‘উমার (রা:)
প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, কে তাহলে প্রথম বিদ‘আতের প্রচলন করেন এবং কেই বা একে দুই ভাগে ভাগ করেন? উপরে বর্ণিত বুখারীর হাদীস থেকে কেউ হয়ত এর জন্য হযরত ‘উমার (রা) কেই দায়ী মনে করতে চাইবেন। কিন্তু তারাবীহর নামাযকে যেহেতু বিদ‘আত হিসেবে চিহ্নিত করা গেলনা ; অথবা জামা‘য়াতের সাথে তারাবীহ আদায়ও যেহেতু রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সময়ই হয়েছে; অতএব হযরত ‘উমারকে (রা) প্রথম বিদ‘আতের প্রচলনকারী বলারও আর কোন অবকাশ থাকলো না। অবশ্য তার পরও একটা প্রশ্ন থেকে যায় যে; হযরত ‘উমার (রা) কেন তাহলে এভাবে বললেন যে; نعمت البدعة هذه (কতইনা সুন্দর বিদ‘আত এটি)! অর্থাৎ কেন তিনি এটিকে বিদ‘আত বললেন ? কোন্ হিসেবে এটি বিদ‘আত হতে পারে? আবার এটিকে উত্তম হিসেবেই বা আখ্যায়িত করলেন কেন? অথচ হযরত ‘উমার (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) হাদীসের কথা জানতেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক কয়েকদিন এ নামায জামা‘য়াতের সাথে আদায়ের ব্যাপারেও তিনি অবগত ছিলেন। এমনকি যে কারণে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তারাবীহর জামা‘য়াত ছেড়ে দিয়েছিলেন তাও হযরত ‘উমারের (রা) অজানা ছিলোনা।
তাছাড়া ফারয বিহীন অপরাপর (নফল) নামায (যেমন- তাহাজ্জুদ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে হযরত ইবন ‘আববাস (রা) এবং আনাস (রা) কে সাথে নিয়ে যে জামা‘য়াতের সাথে আদায় করেছেন তাও তিনি জানতেন। আর জামা‘য়াতে নামায আদায়ের ২৭ (সাতাশ) গুণ সওয়াবের ব্যাপারেও হযরত ‘উমার ভালভাবেই অবগত ছিলেন। কাজেই তারাবীহর ব্যাপারে তাঁর এই উক্তির তাৎপর্য হলো এই যে রামাদান মাস হলো সর্বাপেক্ষা মহিমান্বিত মাস। এ মাসে প্রতিটি আমলের নেকী বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়া হয়। আর এ মাসের একটি বিশেষ ‘ইবাদাত হলো তারাবীহ যা অন্য মাসের বেলায় প্রযোজ্য নয়। জামা‘য়াতের সাথে এটি আদায় করতে পারলে হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী অনেক বেশি প্রতিদান পাওয়া যাবে। সম্ভবত উম্মাতকে এ বিরাট প্রতিদানের ভাগী করার জন্যই রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই এ নামাযের জামা‘য়াতের প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু উম্মাতের জন্য অন্য আরেকটি কল্যাণ বিবেচনা করতে গিয়ে তিনি নিজে জামা‘য়াতে শামিল হওয়া থেকে বিরত হলেন। এভাবে চলতে থাকল রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাত পর্যন্ত। তারাবীহের ব্যাপারে আর কোন কেন্দ্রীয় জামা‘য়াত চালু থাকল না। এরপর আসল প্রথম খলীফা হযরত আবূ বাকর (রা) এর খিলাফাত কাল। আল্লাহর নবীর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, সেই সঙ্গে আবার মিথ্যা নবূয়াতের দাবীদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, যাকাত অস্বীকারকারীদেরকে শায়েস্তাকরণ, কোরআন সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ এবং সর্বোপরি বিজয়াভিযান গুলো পরিচালনা ইত্যাদির ভেতর দিয়ে অতি দ্রুত তাঁর খিলাফাতকাল অতিবাহিত হয়ে যায়। যদ্দরুন জামা‘য়াতের সাথে তারাবীহর নামায নতুন করে চালু করা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। এরপর হযরত ‘উমারের (রা) শাসনকালে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। এবং রামাদানের কোন এক রজনীতে খালীফা নিজে মুসলিমদেরকে এভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে নামায আদায় করতে দেখে তাদেরকে এক জামা‘য়াতের অধীন করার উদ্যোগ নেন। এবং যে কারণে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা করা থেকে বিরত ছিলেন সে কারণও আর তখন অবশিষ্ট ছিলোনা বিধায় তিনি নির্দ্বিধায় এ উদ্যোগকে বাস্তবায়ন করেন। এভাবে তিনি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি বিলুপ্তপ্রায় সুনাণতকে নতুন করে চালু করেন।
যেহেতু মাঝখানে দীর্ঘদিন যাবত এ কেন্দ্রীয় জামা‘য়াত বন্ধ ছিল এবং হযরত ‘উমারের (রা) উদ্যোগে উবাই বিন কা‘বের (রা) নেতৃত্বে আবার তা নতুন ভাবে চালু হয়েছে, তাই শাব্দিক অর্থেই তিনি একে বিদ‘আত বলেছেন। অন্যথায় এটি তো আর সুন্নাতের বিপরীত নয়। বরং এটি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সময় থেকেই ধারাবাহিকভাবে চলে আসা একটি সুন্নাত। এমনকি যে মুহূর্তে হযরত ‘উমার (রা) এই নতুন কেন্দ্রীয় জামা‘য়াতের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন; ঠিক তখনও এই নামায কেউ কেউ জামা‘য়াতের সাথেই আদায় করছিলেন। যা হযরত ‘আব্দুর রহমান ইবন ‘আব্দুল কারীর বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়। অতএব বিদ‘আতকে ভাল এবং মন্দ এ দু’ ভাগে ভাগ করার জন্য হযরত ‘উমার (রা) একথা বলেননি এবং বিদ‘আতের প্রবর্তকও তিনি নন।
বিদ‘আত হলো সুন্নাতের বিপরীত
বিদ‘আত কাজগুলোকে মানুষ যদিও সুন্নাত মনে করেই আমল করে থাকে, কিন্তু আসলে তা সুন্নাত নয় বরং সুন্নাতের বিপরীত। যেমনিভাবে শিরক তাওহীদের বিপরীত। বিদ‘আত পালন করেও আল্লাহর নৈকট্য এবং সওয়াব আশা করা হয়, যেমনি আশা করা হয় সুন্নাতের অনুসরণের মাধ্যমে। বিদ‘আত প্রবণ ব্যক্তিও মনে করেন যে, তিনি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতই মেনে চলছেন। অথচ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে কাজ যে পন্থায় করেছেন তিনি কিন্তু ঘুর্ণাক্ষরেও সে কাজ সে পন্থায় করছেন না। যেমন- ঈদে মীলাদুন্নবীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নামে যা যা করা হয় তা এই মনে করেই করা হয় যে, এটি করা সুন্নাত। এর মাধ্যমে সওয়াব অর্জিত হবে এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যাবে। অথচ এই বিশেষ পন্থার কোন ‘ইবাদাত কি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো করেছেন?! কিংবা তিনি কি এরূপ করতে কাউকে আদেশ করেছেন? অথবা কেউ কি তাঁর জীবদ্দশায় এরূপ করলে তিনি চুপ ছিলেন? সর্বোপরি রাসূলের একান্ত অনূসারী, তাঁর আদর্শের যথার্থ বাস্তবায়নকারী সাহাবায়ে কিরাম কি তাঁর ওফাতের পর কখনো এরূপ করেছেন ? নি:সন্দেহে তাঁরা কেউ তা করেননি। তাহলে তা যেমনি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের সুন্নাত নয়, তেমনি তাঁর সাহাবীদের সুন্নাতও নয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
(عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين عضوا عليها بالنواجذ)
‘‘তোমাদের উচিত আমার সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা এবং আমার সুপথপ্রাপ্ত ন্যায়বান খালীফাদের সুন্নাতকেও। তোমরা তা দৃঢ়ভাবে কামড়ে ধর।’’
সুতরাং মীলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং এ জাতীয় আরো অনেক নতুন নতুন বিষয় (যেমন, শবে কদর ও শবে বরাতের বিশেষ নামায ও তাসবীহ, কোন বুযর্গ ব্যক্তির দেয়া নিজস্ব অযীফা, মাযারের উদ্দেশ্যে বিশেষ মান্নত ইত্যাদি) কে আমরা যদি নিছক ভাল কাজ হওয়ায় সুন্নাত হিসেবে স্বীকৃতি দেই, তাহলে দীনের ভেতর প্রতিদিনই এরূপ নতুন নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে থাকবে। ফলশ্রুতিতে পরিপূর্ণ জীবন বিধান আল-ইসলামের উপর অপরিপূর্ণতার কালিমা লেপন করার উদ্দেশ্যই সাধিত হবে।
এ প্রসঙ্গে ‘আল্লামা শাওকানীর (মৃ. ১২৫৫ হি./ ১৮৩৪ খৃ.) কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি লিখেছেন:
( البدعة أصلها ما أحدث على غير مثال سابق، وةطلق في الشرع على مقابلة السنة فةكون مذمومة)
‘‘বিদ‘আত মূলত: এমন নতুন উদ্ভাবিত বিষয় পূর্ববর্তী সমাজে যার কোন দৃষ্টান্তই পাওয়া যায় না। আর শরী‘য়াতের পরিভাষায় এটি হলো সুন্নাতের বিপরীত। অতএব তা অবশ্যই নিন্দনীয়।’’
অর্থাৎ- যাই সুন্নাতের বিপরীত তা-ই বিদ‘আত। কাজেই এর মধ্যে কোন প্রশংসনীয় বা ভাল দিক থাকতে পারে না। বরং এর সব কিছুই নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য। সুতরাং একে দু’ভাগে ভাগ করে এক ভাগকে ভাল আর আরেক ভাগকে মন্দ বলার কোনই যৌক্তিকতা নেই।
পক্ষান্তরে শরী‘য়াতে যার কোন না কোন ভিত্তি বা দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে, তা কোনক্রমেই সুন্নাতের বিপরীত হতে পারে না। আর যা সুন্নাতের বিপরীত নয় তা বিদ‘আতও নয়।
আর হযরত ‘উমারের (রা) উপরোক্ত উক্তির ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা শাওকানী লিখেছেন:
(نعم الأمر البديع الذي ثبت عن رسول اللهু صلى الله عليه وسلمু وترك في زمان أبي بكر لاشتغال الناس فيما حصل بعد وفاة الرسول ু صلى الله عليه وسلم - )
‘‘হযরত ‘উমারের (রা) উক্তির তাৎপর্য হলো এই যে; জামা‘য়াতের সাথে তারাবীহ পড়া অতি চমৎকার একটি নতুন উদ্ভাবিত ব্যবস্থা, যা রাসূলে করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পর মানুষেরা নানাভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তা আবূ বাকরের (রা) খিলাফাতকালে পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল।’’
আরেকজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ‘আল্লামা মোল্লা ‘আলী আল-কারী ‘উমার ফারুকের (রা) এ উক্তির ব্যাখ্যায় লিখেছেন:
( وإنما سماها بدعة باعةبار صورةها فإن هذا الاجةماع محدث بعده عليه الصلاة والسلام وأما باعةبار الحقيقة فليسة بدعة)
‘‘‘উমার (রা) তারাবীহর জামা‘য়াতকে বিদ‘আত বলেছেন তার বাহ্যিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে। কেননা নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পর এটি আবার নতুন করে চালু হল। নতুবা প্রকৃতপক্ষে জামা‘য়াতের সাথে এ নামায পড়া মোটেও বিদ‘আত নয়।’’
সুতরাং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একনিষ্ঠ সহচর হযরত ‘উমারের (রা) একটি উক্তিকে পুঁজি করে কিংবা বিশ্বময় স্বীকৃত ও সর্বসম্মত আনুষ্ঠানিক ‘ইবাদাত তারাবীহর জামা‘য়াতকে কেন্দ্র করে নিজেদের ইচ্ছেমত যে কোন বিষয়কে সুন্নাত রূপে চালু করার হীন প্রচেষ্টা কোন মতেই সমর্থনযোগ্য নয়। আর এ লক্ষ্যে বিদ‘আতকে দু’ভাগে ভাগ করার অপচেষ্টাও আরেক বিদ‘আত; যা প্রকারান্তরে ইসলামের অভ্যন্তরে মুসলিমদের অজান্তেই অসংখ্য মারাত্নক বিদ‘আতের জন্ম দেবে।
বিদ‘আত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনুগত্যের পরিপন্থি
বিদ‘আত চর্চা করার আরেক অর্থ হলো রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনুগত্যের গন্ডি থেকে বেরিয়ে পড়া। কেননা রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনুগত্য করাকে ইসলামী শরী‘য়াতে সুন্নাত নামে অভিহিত করা হয়। আর বিদ‘আত যেহেতু সুন্নাতের বিপরীত, তাই বিদ‘আতের অনুসরণের অর্থই হলো সুন্নাতের বৈপরিত্য অবলম্বন করা। এ কারণেই মহান রাববুল ‘আলামীন তাঁর হাবীবকে শরী‘য়াতের সুস্পষ্ট বিধান বলে দিয়ে কেবল ঐ বিধানেরই আনুগত্য করতে আদেশ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:
(ثم جعلناك على شريعة من الأمر فاتبعها ولا تتبع أهواء الذين لا يعلمون)
‘‘অত:পর আমি আপনাকে শরী‘য়াতের এক বিশেষ পন্থার উপর রেখেছি। অতএব আপনি এর অনুসরণ করুন এবং যারা জানে না তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করবেন না।’’
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও তাই একদিকে যেমন আমাদেরকে তাঁর সুন্নাতের অনুকরণের তাকীদ করেছেন, অপরদিকে বিদ‘আতকে পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ‘উসমান ইবন হাযির আযাদী বলেন: একবার আমি হযরত ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আববাসের (রা) সমীপে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম যে, ‘আপনি আমাকে একটি উপদেশ দান করুন। তদুত্তরে তিনি বলেন:
(عليك بتقوى الله والاستقامة ، واتبع ولا تبتدع )
‘‘তোমার উচিত তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করা, এবং এর উপর অটল অবিচল থাকা। (যার পন্থা হলো এই যে) আমার আদর্শের অনুসরণ কর, কিন্তু কিছুতেই বিদ‘আতের অনুকরণ করোনা।’’
রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণ তাই সুন্নাতের অনুকরণের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। কোন প্রকার যুক্তি-তর্ক কিংবা বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে কখনোই তারা সুন্নাতের সামান্যতম ব্যত্যয় ঘটানোর কথা ঘুর্ণাক্ষরেও মনে আনতেন না। ইবন ‘আববাসের নিম্নোক্ত হাদীসটি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহর ব্যাপারে তাঁদের এরূপ অনমনীয় মনোভাবেরই সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।

(عن ابن عباس أنه سئل: ما بال المسافر يصلي ركعتين إذا انفرد، وأربعا إذا ائتم بمقيم؟ فقال: تلك السنة. وفي لفظ أنه قال له موسى بن سلمة: إنا إذا كنا معكم صلينا أربعا، وإذا رجعنا صلينا ركعتين . فقال: تلك سنة أبي القاسم ু صلى الله عليه وسلم-)
‘‘হযরত ইবন ‘আববাস (রা) থেকে বর্ণিত, মুসাফিরের নামায সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে, সে যখন একা নামায পড়ে তখন দুই রাকা‘আত পড়ে, আর যখন মুকিমের পেছনে ইক্তেদা করে তখন কেন চার রাকা‘আত পড়ে? তখন তিনি বললেন, এটিই হলো সুন্নাত (রাসূলের অনুসৃত পন্থা)। অন্য এক বর্ণণায় এভাবে এসেছে যে, মূসা বিন সালামাহ তাঁকে জিজ্ঞেস করলো যে, আমরা যখন আপনার সাথে থাকি তখন চার রাকা‘আত নামায পড়ি, আর যখন নিজেদের মাঝে চলে যাই, তখন দুই রাকা‘আত পড়ি কেন? তখন তিনি বললেন: এটিই হলো আবুল কাসিমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাত।’
হযরত ‘আলী ইবন আবি তালিবের (রা) নিম্নোক্ত উক্তিটিও অনুরূপ প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেছিলেন: ( لو كان الدين بالرأي لكان أسفل الخفين أولى بالمسح من أعلاه)
‘‘দীনের বিধান যদি বুদ্ধিবৃত্তি তথা যুক্তিতর্কের মাধ্যমেই নির্ণিত হত, তাহলে মোজার উপরের অংশ মসেহ করার চেয়ে নিচের অংশ মসেহ করাই অধিকতর বিশুদ্ধ হত।’’
সারকথা: কোন বিদ‘আত দেখলেই আমরা একে ভাল বিদ‘আত কিংবা মন্দ বিদ‘আত বলে আখ্যায়িত করতে পারি কি? অথবা আমরা যেখানে যা নতুন দেখতে পাই তা-ই কি বিদ‘আত? অর্থাৎ কালের আবর্তে নতুন নতুন যা কিছু আবিষ্কৃত হচ্ছে; বিজ্ঞানের উন্নতিতে মানুষের জীবনযাত্রার যে পরিবর্তন প্রতিনিয়ত ঘটেই চলছে; তাও কি বিদ‘আত? এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তরের জন্য আমাদেরকে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। যেমন- (ক) আমরা যাকে বিদ‘আত বলছি; তা দ্বারা সওয়াব অর্জনের লক্ষ্য থাকে। যদি তাতে সওয়াব অর্জনের লক্ষ্য না থাকে তাহলে তাকে বিদ‘আত বলার প্রয়োজন পড়ে না। (খ) তাকে ‘ইবাদাত তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় মনে করা হয়। কেননা যদি আল্লাহর নৈকট্যই উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে তাহলে তাকেও বিদ‘আত বলার প্রয়োজন নেই। (গ) এবং তাকে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাত মনে করেই আমল করা হয়। যদি তা না হত তাহলে তাকেও বিদ‘আত বলার কোন প্রয়োজন পড়ত না। অর্থাৎ আমরা যে বিদ‘আতের অনিষ্টের কথা বলছি তা হলো শরী‘য়াতের দৃষ্টিতে বিদ‘আত, নিছক শাব্দিক অর্থে বিদ‘আত নয়। আর এ কথাটিকেই ইমাম শাতিবী (রহ:) এভাবে বলেছেন যে-
( ولا معنى للبدعة إلا أن يكون الفعل في اعتقاد المبتدع شرعا)
‘‘বিদ‘আতের অনুসারীর দৃষ্টিতে কাজটি শরী‘য়াতের কোন নির্দেশ হলেই (অথচ বাস্তবে তা ঘুর্ণাক্ষরেও শরী‘য়াতের নির্দেশ নয়) তাকে বিদ‘আত বলে আখ্যায়িত করা হবে।’’
সওয়াবের নিয়তে ‘ইবাদাত মনে করে সুন্নাত পালনের অভিপ্রায়ে আমরা যা করি, তা যদি প্রকৃত প্রস্তাবে সুন্নাত না হয়ে থাকে, তবে তা-ই হলো বিদ‘আত। অতএব শাব্দিক অর্থে বিদ‘আত মানে নতুন উদ্ভাবিত বিষয় হলেও পারিভাষিক অর্থে সব নতুন জিনিসকেই বিদ‘আত বলা হয়না। আর তাই অধুনা যুগের উন্নত রাস্তা ঘাট, পরিকল্পিত আবাসন, দ্রুততর যানবাহন, স্বাস্থ্যসম্মত পয়:প্রণালী, সুরম্য প্রাসাদ, শৈল্পিক স্থাপত্য এবং এগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় আসবাব পত্র ও সরঞ্জামাদি বিদ‘আতের আওতায় পড়ে না। যদিও তা অনেক মৌলিক ‘ইবাদাতের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- সেকালে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে উটের পিঠে চড়ে হজ্জে গেলেন। আর আজকাল আমরা যাই অত্যাধুনিক বিমানে চড়ে। স্বল্প সংখ্যক সাহাবীর মাঝে তখন নামাযের সময় ইমাম এবং মুকাবিবরদের ধ্বনিই যথেষ্ট ছিল; অথবা অন্য কোন ব্যবস্থাও তখন ছিলনা। কিন্তু আজকাল আমরা মাইক্রোফোনের সাহায্যে সরাসরি ইমামের কন্ঠস্বর লক্ষ জনতার মাঝে ছড়িয়ে দেই।
তবে একথা অনস্বীকার্য যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেমনিভাবে হজ্জের মূল কাজ তথা তাওয়াফ, সাঈ, ‘আরাফাত ময়দানে অবস্থান ইত্যাদি উটের পিঠে চড়ে করেননি, কিংবা নামাযের মূল কাজ তথা তিলাওয়াত, রুকু‘, সিজদা ইত্যাদি মুকাবিবরকে দিয়ে করাননি, আমরাও তেমনি হেলিকপ্টার দিয়ে তাওয়াফ বা সাঈ করিনা এবং ক্যাসেট বাজিয়ে নামাজের তিলাওয়াতও শুনিনা। কেননা এগুলো মূল ‘ইবাদাত; এদের আদায় প্রক্রিয়া শরী‘য়াত প্রণেতা নিজেই প্রবর্তন করে গেছেন। কোন মানুষ ইচ্ছামত তাতে পরিবর্তন আনতে পারেনা। কিন্তু মূল ‘ইবাদাতের বাইরে যেসব সহায়ক উপকরণ রয়েছে; তা অবস্থাভেদে পরিবর্তনীয় এবং তা নেকী অর্জনের মাধ্যমও নয়। ফলে তা বিদ‘আতের আওতাভুক্তও নয়। তাই এসব উপকরণকে শাব্দিক অর্থে বিদ‘আত বা নতুন সৃষ্টি বলা গেলেও শরী‘য়াতের পরিভাষায় এগুলো বিদ‘আত নয়। কেননা এগুলো সুন্নাতের বিপরীতও নয়, আবার আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট কোন ‘ইবাদাত বা ধর্মীয় প্রথাও নয়।
অতএব মূল ‘ইবাদাতে ইচ্ছামত পরিবর্তন পরিবর্ধন যেমন নিষিদ্ধ, সহায়ক উপকরণাদিকেও তেমনি ‘ইবাদাতের অংশ মনে করাও অবৈধ। আবার মূল ‘ইবাদাতকে যেমন ভাল ও মন্দে বিভক্ত করা যাবে না, সহায়ক উপকরণাদিকেও তেমনি ভাল ও মন্দে বিভক্ত করে এর ভালটিকে ‘ইবাদাতের মধ্যে গণ্য করা চলবে না।
বিদ‘আতের ভয়াবহ পরিণাম
বিদ‘আত নিছক কোন ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। বরং এর রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব। ‘ইবাদাতের আকৃতিতে সম্পাদিত হয় বিধায় এটি অতি সহজেই ধর্মপ্রাণ লোকদের দৃষ্টি কাড়ে। এবং তারাও এর আদলে নিজেদের ধর্মীয় জীবনকে ঢেলে সাজাতে তৎপর হয়ে উঠে। এভাবে তা সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করে ক্রমান্বয়ে শাখা প্রশাখা বিস্তার করতে থাকে। পরিশেষে তা এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। নিম্নে আমি বিদ‘আতের কতক ভয়াবহ পরিণামের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরছি।
এক: আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ:
বিদ‘আতের প্রবক্তারা তাদের বিদ‘আত চর্চার মাধ্যমে প্রকারান্তরে মহান আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ করতে চান যে, তিনি তাঁর বিধান তাঁর বান্দাদের উপর পরিপূর্ণ না করেই নবীকে উঠিয়ে নিয়েছেন। যদ্দরুন নতুন নতুন ‘ইবাদাত-বন্দেগী ও আনুগত্যের ধারা-উপধারা কালক্রমে প্রবর্তিত হয়েই চলেছে। আর এ যেন এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, আজ এটি- কাল আরেকটি এভাবে অব্যাহতভাবে চলতেই থাকবে। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহর পরিষ্কার ঘোষণা হলো:
(اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعمتي ورضيت لكم الإسلام دينا)
‘‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নি‘য়ামাতকে পূর্ণতা দান করলাম এবং তোমাদের জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকেই মনোনীত করলাম।’’
আল্লাহর পক্ষ থেকে এরূপ সুস্পষ্ট ঘোষণার পর একথা মনে করার আর কোন সুযোগই অবশিষ্ট থাকলনা যে, নতুন কোন বিষয় যোগ করে এ দীনকে পরিপূর্ণ করতে হবে। এজন্যেই বিদায় হজ্জের সময় যখন এ আয়াত নাযিল হয়েছিল তখন ইসলামের প্রকৃত ধারক ও বাহক তথা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবীগণ একথা অনুমান করে নিয়েছিলেন যে, যেহেতু ইসলামী শরী‘য়াত পূর্ণতা লাভ করেছে সুতরাং রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওফাতের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর বাস্তবেও তা-ই হয়েছিল। কেননা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর তিন মাস পরই মৃত্যুবরণ করেন।
দুই: নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর অপবাদ আরোপ:
বিদ‘আতের সমর্থন ও চর্চার মাধ্যমে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপরও অপবাদ আরোপ করা হয় যে, তিনি তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব সুসম্পন্ন করে যাননি। বরং উম্মাতের ভেতর থেকে একদল ‘আবিদ ব্যক্তির উপর অবশিষ্ট দায়িত্ব রেখে গেছেন। অথচ এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘য়াতের সুস্পষ্ট আকীদা যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উপর অর্পিত ‘আল-বালাগুল মুবীন’ বা স্পষ্ট বার্তাকে পৌঁছাবার এবং কথায় ও কাজে শরী‘য়াতকে বাস্তবায়িত করার পরই মৃত্যুবরণ করেন। তাই তো তিনি বিদায় হজ্জের ভাষণে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করতে পেরেছিলেন:
( تركت فيكم شيئين لن تضلوا ما إن تمسكتم بهما : كتاب الله و سنة نبيه)
‘‘আমি তোমাদের মাঝে দুটো জিনিষ রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এ দুটোকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, পথভ্রষ্ট হবেনা। আর সে দুটো জিনিষ হলো- আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাত।’’
এ প্রসঙ্গে ইমাম মালিক (মৃ. ১৭৯হি./ ৭৯৫খৃ.) এর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন:
( من ابتدع في الإسلام بدعة يراها حسنة فقد زعم أن محمداু صلى الله عليه وسلم- خان الرسالة، فإن الله سبحانه و تعالى يقول اليوم أكملت لكم دينكم، فما لم يكن يومئذ دينا، فلا يكون اليوم دينا)
‘‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোন বিদ‘আতের সৃষ্টি করল এবং সে তাকে খুবই ভাল মনে করল, সে প্রকারান্তরে ঘোষণা করল যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রিসালাতের দায়িত্ব পালনে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন (না‘উযুবিল্লাহ)। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তো বলেছেন: আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। অতএব, রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সময় যা দীনভুক্ত ছিল না, আজ তা দীনভুক্ত হতে পারে না।’’
তিন: সাহাবীগণের মর্যাদার উপর চরম আঘাত:
বিদ‘আতের মাধ্যমে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবীগণের মর্যাদার উপর চরম আঘাত হানা হয়। কেননা এসব বিদ‘আতের স্বীকৃতি পাওয়ার অর্থই হলো যে, সাহাবীগণ ইসলামের অনুশীলন এবং রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। কারণ নব আবিষ্কৃত এসব ‘ইবাদাত নামের বিদ‘আতগুলো তাঁরা পালন করেননি। অথচ কোরআন এবং সুন্নাহয় তাঁদেরকে এ উম্মাতের মাঝে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এবং তাঁদের প্রতি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিরও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
( والسابقون الأولون من المهاجرين والأنصار والذين اتبعوهم بإحسان رضي الله عنهم ورضوا عنه وأعد لهم جنات تجري تحتها الأنهار خالدين فيها أبدا ذلك الفوز العظيم)
‘‘সেসব মুহাজির ও আনসার, যারা সর্বপ্রথম ঈমানের দাওয়াত কবুল করেছিল এবং যারা নিতান্ত সততার সাথে তাদের অনুসরণ করেছিল তাদের উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট রয়েছেন এবং তারাও আল্লাহ তা’আলার উপর সন্তুষ্ট। আল্লাহ তাদের জন্য এমন জান্নাত সমূহ তৈরী করে রেখেছেন যার নিম্নদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। এই জান্নাতে তারা চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। বস্ত্তত: এটি এক বিরাট সাফল্য।’’
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে তাঁর সাহাবীদের ব্যাপারে বলেছেন:
(عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين عضوا عليها بالنواجذ)
‘‘তোমাদের উচিত আমার সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা এবং আমার সুপথপ্রাপ্ত ন্যায়বান খালীফাদের সুন্নাতকেও। তোমরা তা দৃঢ়ভাবে কামড়ে ধর।’’
তিনি আরো বলেছেন: (خير القرون قرني ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم)
‘‘সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, অত:পর তার পরের যুগ, অত:পর তার পরের যুগ।’’
সুতরাং আমাদের নিজেদের বানানো এসব নতুন নতুন ‘ইবাদাতের দোহাই দিয়ে আমরা কি সেই শ্রেষ্ঠ উম্মাতের মর্যাদার দাবীদার হতে পারি? শ্রেষ্ঠ উম্মাতের দাবীদার হতে হলে আমাদেরকেও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে যেই পথ অনুসরণ করেছিলেন রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণ। রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যথার্থ রূপে অনুকরণের ক্ষেত্রে তাঁরাই হলেন আমাদের জন্য একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ। যাঁরা নিজেদের চিন্তা প্রসূত কোন মতকে কখনোই প্রাধান্য দিতেন না, বরং কোরআন সুন্নাহর কোন নির্দেশ লাভ করলে তা তাঁরা ‘ইবাদাত গণ্য করে একনিষ্ঠতার সাথে পালন করতেন।
হযরত ‘আবিস বিন রাবি‘আহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি হযরত ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) কে দেখেছি যে, তিনি হাজরে আসওয়াদ (কাল পাথর) কে চুম্বন করেছেন এবং বলেছেন: ‘আমি জানি তুমি একটি পাথর মাত্র; তুমি কোন উপকার করতে পারনা এবং অপকারও নয়। যদি আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম তাহলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যথার্থ অনুকরণের এর চেয়ে উত্তম উদাহরণ আর কি হতে পারে? রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণ সকলেই তাঁকে অনুকরণের ক্ষেত্রে এরূপ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। এক্ষেত্রে তাঁরা কোন প্রকার বাড়াবাড়ি কিংবা মনগড়া পদ্ধতির অনুসরণ করতেন না।
চার: ইসলামের উপর অসম্পূর্ণতার অপবাদ আরোপ:
বিদ‘আতের ফলে একইভাবে ইসলামের উপরও অসম্পূর্ণতার অপবাদ আরোপ করা হয়। কেননা ইসলাম যদি সম্পূর্ণই হতো তাহলে তার মধ্যে নতুন নতুন এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারত না। অর্থাৎ ভাবখানা এমন যে, এসব বিদ‘আতের অনুসারীরা যেন অনুগ্রহ পূর্বক তাঁদের নব নব পন্থা উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইসলামের অপূর্ণাঙ্গতা দূর করে চলেছেন। অথচ তাঁদের দৃষ্টিতে যা অপূর্ণাঙ্গ, মহান আল্লাহ তাকেই তাঁর মনোনীত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন: (إن الدين عند الله الإسلام)
‘‘নি:সন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দীন (জীবন ব্যবস্থা) হলো একমাত্র আল-ইসলাম।’’ আল্লাহ আরো বলেছেন:
(ومن يبتغ غيرالإسلام دينا فلن يقبل منه وهو في الآخرة من الخاسرين)
‘‘যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন বিধান অবলম্বন করতে চায়, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।’’
মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে ইসলামই হলো মানুষের জন্য একমাত্র নির্ভুল ও বিশুদ্ধ জীবনযাপন পদ্ধতি। আর ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমাদের উচিত কেবল তাঁরই বিধানের উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং নিজেদের আবিষ্কার করা মত ও পথকে তাঁর বিধানের সাথে মিলিয়ে না ফেলা।
পাঁচ: ইহুদী ও খৃস্টানদের অনুকরণ:
ইহুদী খৃস্টানদের সাথে বিদ‘আতের অনুসারী মুসলিমদের এক দারুণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ইহুদী ও খৃস্টানরা তাদের ধর্মে নিজেদের ইচ্ছামত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেছে। সেখানে মহান আল্লাহর আসল উক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কেননা তারা তাদের চাহিদা মাফিক যোগ বিয়োগ করেছে, বাড়িয়েছে এবং কমিয়েছে। কিন্তু তারা দাবী করে যে, তারাই সত্যপন্থী এবং জান্নাতে যাবার একমাত্র অধিকারী। আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:
(وقالوا لن يدخل الجنة إلا من كان هودا أو نصارى تلك أمانيهم قل هاتوا برهانكم إن كنتم صادقين)
‘‘ওরা বলে, ইহুদী অথবা খৃস্টান ব্যতীত কেউ জান্নাতে যাবে না। এটা ওদের মনের বাসনা। বলে দিন, তোমরা সত্যবাদী হলে, প্রমাণ উপস্থিত কর।’’
বিদ‘আতের অনুসারীরাও তদ্রুপ নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং ধর্মীয় আবেগ অনূভুতির অন্ধ মোহে সুন্নাতের বেশে বিভিন্ন বিদ‘আতের প্রচলন করে থাকে। এবং নিছক ‘কাজটি তো আর মন্দ নয়’- এই যুক্তিতে বড্ড বাড়াবাড়ি ও মারাত্নক গোঁড়ামীতে মত্ত হয়। আর অধিক আনুগত্যের পথে চলছে ভেবে মনে মনে আত্মম্ভরিতায় মেতে উঠে। এবং যারা এসব বিদ‘আতের অনুসারী নয়, তাদেরকে কথায় কথায় গালমন্দ করতে দ্বিধাবোধ করেনা। তারা নিজেদেরকে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাঁটি অনুসারী বলে দাবী করে এবং অন্যদেরকে গুমরাহ ভেবে কাফির বলে আখ্যায়িত করতেও কুন্ঠিত হয়না।
ছয়: ধর্মীয় ব্যাপারে ব্যক্তিপূজার দ্বার উম্মোচন:
বিদ‘আত যেহেতু সুন্নাতের বিপরীত, তাই এর ধরণ-প্রক্রিয়া স্থান, কাল ও পরিবেশ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় কোন পন্থা নির্ধারিত থাকেনা। ফলে এক এক এলাকায় এক এক জন ধর্মগুরু এক্ষেত্রে প্রক্রিয়া নির্ধারণ পূর্বক নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। ফলে অশিক্ষিত কিংবা কম শিক্ষিত সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা সংশ্লিষ্ট এলাকার ঐ ধর্মগুরুর পদাংক অনুসরণ করতে থাকে। এবং একমাত্র ঐ পন্থারই অনুকরণ বাধ্যতামূলক মনে করে। আর কাউকে অন্য কোন পন্থা অনুকরণ করতে দেখলে সে কখনো কখনো মারমুখী পর্যন্ত হয়ে উঠে। কেননা তার দৃষ্টিতে কেবল ঐ ধর্মগুরুর পন্থাই নির্ভুল এবং এটি অনুকরণ করা অবশ্য কর্তব্য। আর এভাবেই বিদ‘আত ধর্মীয় ক্ষেত্রে ব্যক্তিপূজার পথ খুলে দেয়।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হওয়া সত্তেও তিনি তাঁকে নিয়েও কোন প্রকার অতিরঞ্জন এবং বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন:
(لا تطروني كما أطرت النصارىابن مريم فإنما أنا عبد، فقولوا: عبد الله ورسوله)
‘‘তোমরা আমার এমন অতি প্রশংসা করোনা যেমন খৃস্টানগণ ঈসা ইবন মারইয়ামের (আ) অতি প্রশংসায় লিপ্ত হয়েছিল। আমি একজন বান্দাহ, তাই আমাকে আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল বলে উল্লেখ করো।’’
এ হাদীসে উল্লেখিত ‘এতরা’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে প্রশংসার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করা। যেমনটি নাসারারা ঈসা ইবন মারইয়ামের (আ) ক্ষেত্রে করেছে। এবং এভাবে তারা শিরকে লিপ্ত হয়েছে। তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ব্যাপারে আমাদেরকে এরূপ বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি নিজে যখন কোন পেরেশানীতে পড়তেন, তখন বলতেন: (يا حي يا قيوم برحمتك أستغيث)
‘হে চিরঞ্জীব! হে চিরস্থায়ী, তোমার দয়ার ওসীলায় সাহায্য চাচ্ছি’।
অন্যত্র তিনি বলেছেন: (إذا سألت فاسأل الله وإذا استعنت فاستعن بالله)
‘‘যখন কোন কিছু চাও একমাত্র আল্লাহর নিকটেই চাও, আর যখন বিপদে সাহায্য চাও, তখনও একমাত্র তাঁর নিকটেই সাহায্য চাও’’।
তিনি আরো বলেছেন: ‘‘সাবধান! দীনে অতিরঞ্জন করোনা। তোমাদের আগে যারা ছিল তারা দীনে অতিরঞ্জনের ফলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।’’
হযরত হুসাইন ইবন ‘আলী (রা) বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
(لا ترفعوني فوق حقي فإن الله تعالى اتخذني عبدا قبل أن يتخذني رسولا)
‘‘তোমরা আমাকে আমার প্রাপ্য অধিকারের চেয়ে উপরে স্থান দিওনা, কেননা মহান আল্লাহ আমাকে তাঁর রাসূল হিসেবে মনোনীত করার আগে বান্দাহ হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।’’
আর এই যদি হয় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিজের অবস্থা, তাহলে দুনিয়ার অন্য কোন ব্যক্তির (তিনি যত বড় বুজুর্গই হোন না কেন) অন্ধ আনুগত্য করার তো প্রশ্নই আসে না।
সাত: দীনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রবঞ্চণা:
এটি মানুষের একটি সাধারণ প্রবণতা যে, তারা কোন কাজে অধিক সংখ্যক লোককে নিয়োজিত দেখলে কম সংখ্যকের তুলনায় তাদেরকেই অধিকতর সঠিক বলে মনে করে। অথচ দীনি কাজের বেলায় হক বা নাহক, ন্যায় বা অন্যায় এবং সঠিক কিংবা বেঠিক কেবল সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে জানা যায় না, বরং শরী‘য়াতের যথাযথ দলীল প্রমাণের ভিত্তিতেই তা নির্ণিত হয়। সুতরাং নিরানববই জনের বিপরীতে এক জনও যদি সঠিক শরী‘য়াতের পন্থার উপর থেকে থাকে, তাহলে তাই হক এবং ন্যায়। পক্ষান্তরে মাত্র একজন ছাড়া নিরানববই জনও যদি কোন ভুল পন্থার উপর অবিচল থাকে, তাহলেও তা নাহক এবং অন্যায়।
বিদ‘আতের বেলায় সাধারণ মুসলিমদের অনেককেই এরূপ সংখ্যাধিক্যের প্রবঞ্চণায় পড়তে হয়। কেননা যে এলাকায় যে বিদ‘আতটি কালক্রমে চলে আসছে, সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই জেনে হোক কিংবা না জেনে সেই বিদ‘আতের অনুকরণ করে চলেছে। এমতাবস্থায় কোরআন ও সুন্নাহর কোন সঠিক অনুসারী তাদেরকে এ ব্যাপারে বারণ করলেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কথা যুক্তি হিসেবে পেশ করে। অথচ এ বিষয়ে আল-কোরআনের স্পষ্ট বক্তব্য হলো:
(وإن تطع أكثر من في الأرض يضلوك عن سبيل الله)
‘‘যদি আপনি এই পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের অনুসরণ করেন, তাহলে তারা আপনাকে আল্লাহ তা’আলার পথ থেকে বিভ্রান্ত করে দেবে।’’
অতএব কোন কিছু সঠিক হওয়ার জন্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনোই দলীল হতে পারেনা। বরং কোরআন ও সুন্নাহ তথা ইসলামী শরী‘য়াত যাকে সঠিক বলে সাব্যস্ত করে তা-ই কেবল সঠিক এবং গ্রাহ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। অন্যথায় তা হবে বেঠিক এবং অগ্রাহ্য।

আট: পিতৃপুরুষের অন্ধ অনুকরণের জাহিলী স্বভাবের পুনরাবৃত্তি:
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মক্কার কাফিরদেরকে দেবদেবীর উপাসনা ছেড়ে এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে ডাকতেন, তখন তারা বাপ-দাদার অজুহাত পেশ করে বলতো যে আমাদের পূর্বপুরুষরা কি এতই মূর্খ ছিলেন, তারা কি কিছুই বুঝতেন না? আল-কোরআন তাদের এই চরিত্রকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছে। ইরশাদ হয়েছে:
(وإذا قيل لهم اتبعوا ما أنزل الله قالوا بل نتبع ما ألفينا عليه آباءنا، أولو كان آباؤهم لا يعقلون شيئا ولا يهتدون. ومثل الذين كفروا كمثل الذي ينعق بما لا يسمع إلا دعاء ونداء ، صم بكم عمي فهم لا يعقلون)
‘‘আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, সে হুকুমেরই আনুগত্য কর যা আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে: কখনো না, আমরা তো সে বিষয়েরই অনুসরণ করব যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি। যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই জানত না, আর সরল সঠিক পথেও ছিলনা। বস্ত্তত: এসব কাফিরদের উদাহরণ এমন, যেমন কেউ এমন জীবকে আহবান করছে যা কিছুই শোনে না, হাঁক-ডাক আর চিৎকার ছাড়া। এরা বধির, মূক এবং অন্ধ। সুতরাং এরা কিছুই বুঝে না।’’
আল-কোরআনের অন্যত্র মহান আল্লাহ তাদের এহেন অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:
(إنهم ألفوا آباءهم ضالين فهم على آثارهم يهرعون)
‘‘তারা তাদের পূর্বপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী। অত:পর তারা তাদের পদাংক অনুসরণে তৎপর ছিল।’’
অনুরূপভাবে বিদ‘আতের অনুসারীরাও নিজেদের কৃতকর্মের বৈধতা প্রমাণের জন্য বংশানুক্রমিকভাবে চলে আসা পূর্ব পুরুষদের দোহাই দিয়ে থাকে। কোরআন ও সুন্নাহর দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেই তারা বলে উঠে যে, আমাদের পূর্ব পুরুষদের অমুক বুজুর্গ, অমুক ‘আলিম, অমুক ‘আবিদ ... ইত্যাদি, তারা কি কোরআন এবং হাদীস কম জানতেন? না তাদের পরহেযগারী কম ছিল!
আসলে শয়তানের প্রবঞ্চণায় পড়েই তারা এভাবে বাপ-দাদার দোহাই দিত। একথাও আল-কোরআন আমাদের জন্য চিত্রিত করে রেখেছে তার বক্ষপটে। ইরশাদ হয়েছে:
( وإذا قيل لهم اتبعوا ما أنزل الله قالوا بل نتبع ما وجدنا عليه آباءنا أولو كان الشيطان يدعوهم إلى عذاب السعير)
‘‘তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ কর। তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে দাওয়াত দেয়, তবুও কি?’’
নয়: বিদ‘আত সুন্নাতের অপমৃত্যু ঘটায়:
সুন্নাতের যথার্থ চর্চা থাকলে বিদ‘আত প্রকাশ পেতে পারে না। পক্ষান্তরে বিদ‘আত চর্চার ফলে সুন্নাতের অপমৃত্যু ঘটে। যেমন: বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চলে বিশেষভাবে প্রচলিত একটি বিদ‘আতের কথাই বলি। যেখানে প্রতিদিন ফজর এবং আসরের নামাযের পর ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে সমস্বরে জোরেসোরে দরুদ পাঠ করা হয়। এমনকি এভাবে উচ্চস্বরে দরুদ পড়ার কারণে ‘মাসবূক’ তথা পেছনে আসা মুসল্লীদেরকে অবশিষ্ট নামায আদায় করতে প্রতি নিয়তই যথেষ্ট অসুবিধার শিকার হতে হয়। অথচ এই দুটো নামাযের পর যেহেতু কোন সুন্নাত নামায নেই, তাই রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিশেষ আমল ছিল এই যে, তিনি মুসল্লীদের দিকে ফিরে বসতেন এবং ফরয নামাযের পর যেসব নিয়মিত তাসবীহ রয়েছে সেগুলো আদায় করার পর বিগত রাত ও দিনে তাদের কারো কোন সমস্যা ছিল কিনা তা শুনতেন। আর আগত দিন ও রাতের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নসীহত এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। এর ফলে ইমাম তথা নেতার সাথে তাঁর অনুগামীদের সুসম্পর্ক আরো নিবিড় হত এবং মুসল্লী সাধারণের পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কও বৃদ্ধি পেত। যদ্দরুন একে অপরের সুবিধা অসুবিধা অতি সহজেই জানার এবং পরস্পর শেয়ার করার সুযোগ লাভ করত। বস্তুত মসজিদই ছিল তখন সকল সামাজিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। পক্ষান্তরে বিদ‘আতে ছেয়ে যাওয়া আজকের এ সমাজের চিত্র হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজকাল সমাজপতি এবং কর্মক্ষম ব্যক্তিদের খুব কমই মসজিদে দেখা যায়। মাঝে মধ্যে যাঁরা আসেন তাঁরাও কেবল কয়েকবার সেজদাবনত হওয়ার পরই অতি দ্রুত ঘরে ফিরে যান।
পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে প্রচলিত একটি গুরুতর বিদ‘আত:
রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি দরূদ পাঠের স্বত:সিদ্ধ সুন্নাতটির দোহাই দিয়ে একটি মারাত্মক বিদ‘আতের প্রচলন পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে ঘটেছে, তা হলো ‘মিলাদ মাহফিল’। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের জন্য যে শরী‘য়াত নিয়ে এসেছেন, তার মধ্যে এ অনুষ্ঠানের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়না। তিনি নিজে কখনো এ কাজ করেননি এবং এর আদেশও দেননি। এমনকি তাঁর সাহাবীগণ যাঁরা তাঁদের নিজেদের জীবনের চেয়েও রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অধিক ভালবাসতেন তাঁরাও তাঁর মৃত্যুর পর কখনো এ জাতীয় অনুষ্ঠান উদযাপন করেননি। অতএব এটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত এবং দীনের সাথে এ অনুষ্ঠান পালনের কোন সম্পর্ক নেই। উপরন্তু যে বিদ‘আত থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষেধ ও সতর্ক করেছেন, এটি সেগুলোরই অন্তর্ভুক্ত।
এক্ষেত্রে আরো বিস্ময়কর ও মারাত্মক ব্যাপার হলো এই যে, এই মিলাদ মাহফিলে দরুদরত অবস্থায় রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসব তথাকথিত ভক্ত অনুরক্তরা মাঝখানে হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে যায়।
তারা হঠাৎ করে দাঁড়ায় এই ভেবে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর রুহ মুবারক সে মজলিসে হাজির হয়। এখন আমার প্রশ্ন হলো-
1) রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রূহ মুবারক যে আসে তার কি কোন শর‘য়ী দলীল আছে ?
2) যদি থাকে তাহলে তা কখন আসে ? মাহফিলের শুরুতে, না মাঝে, না শেষে?
3) যদি শুরুতে বা শেষে আসে তাহলে তখন কেন তারা দাঁড়ায় না ?
4) আর যদি মাঝে আসে (যেমনটি তাদের আমল থেকে মনে হয়) তাহলে তারা কি তা টের পেয়ে অমনি দাঁড়িয়ে যায়? আবার রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রস্থান টের পেয়ে কি তারা বসে যায়?
5) যদি তা না হয় তাহলে মাহফিলের পুরো সময়টিই তো বিভিন্ন ভাবে এবং বিভিন্ন ভাষায় রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরুদই ছিল। তথাপি এর কিছু অংশে দাঁঁড়ানো হলো না, মাঝখানে দাঁড়ানো হলো এবং পরে আবার দাঁড়ানো হলো না কেন?
6) আর যদি নিছক সম্মান প্রদর্শনের জন্য একটু দাঁড়ানো হয়ে থাকে, অথচ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসেছেন বলেও কেউ দেখেনি, কিংবা এর সমর্থনে কোন দলীলও নেই, তাহলে কি এটি কারো স্মরণে কোন মজলিসের সকলে মিলে এক মিনিট নিরবতা পালনের শামিল?
7) যদি তাও না হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে খুঁজে দেখতে হবে যে, এরূপ সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জীবদ্দশায় কি নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। নাকি অন্য কোন বিশেষ আকীদা বিশ্বাসের কারণে এটি করা হয়।
উপরন্তু, মিলাদে কিয়ামের প্রচলনকারী এবং এই বিদ‘আতের অনুসারীদের জ্ঞাতার্থে নিম্নোক্ত হাদীসগুলো পেশ করতে চাই।
(عن أوس بن أوسু رضي الله عنه- قال: قال رسول الله ু صلى الله عليه وسلم-: من أفضل أيامكم يوم الجمعة فيه خلق آدم، وفيه قبض، وفيه النفخة، وفيه الصعقة، فأكثروا علي من الصلاة فيه، فإن صلاتكم معروضة علي . قالوا: يا رسول الله ، وكيف تعرض عليك صلاتنا وقد أرمت (أي بليت) ؟ فقال: إن الله عز وجل حرم على الأرض أن تأكل أجساد الأنبياء).
‘‘হযরত আউস বিন আউস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: ‘‘তোমাদের দিনসমূহের মাঝে সর্বোত্তম হলো জুমু‘আর দিন। এ দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ দিনেই মৃত্যু দেয়া হয়েছে। এ দিনে সিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে এবং এ দিনেই মহাপ্রলয় ঘটবে। তাই তোমরা এ দিনে আমার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পড়বে, কেননা তোমাদের দরুদ আমার নিকট পৌঁছানো হয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল, আপনি যখন মাটির সংগে মিশে যাবেন, তখন কেমন করে আমাদের দরুদ আপনার কাছে পৌঁছানো হবে ? তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: মহান আল্লাহ নবীদের দেহ ভক্ষণ করা মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।’’
(عن أبي هريرة ু رضي الله عنهু قال: قال رسول الله ু صلى الله عليه وسلم-: لا تجعلوا قبري عيدا، وصلوا علي ، فإن صلاتكم تبلغني حيث كنتم)
‘‘আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: আমার কবরকে উৎসব স্থলে পরিণত করোনা, আমার প্রতি দরুদ প্রেরণ কর। তোমরা যেখানেই হও না কেন, তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছে।’’
وعنه ুرضي الله عنه- أن رسول الله ুصلى الله عليه وسلم- قال: ما من أحد يسلم علي إلا رد الله علي روحي حتى أرد عليه السلام)
‘‘আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: যখনই কেউ আমার প্রতি সালাম প্রেরণ করে, আল্লাহ আমার নিকট আমার রূহকে ফিরিয়ে দেন এবং আমি তার সালামের জবাব দেই।’’
অতএব এ ব্যাপারে আমাদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের আদর্শকে। কেননা তাঁরাই রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সরাসরি উঠাবসা করেছেন এবং তাঁর আদেশ নিষেধের পুংখানুপুংখ অনুসরণ করে চলেছেন। তাঁরা কি তাঁর সম্মানে দাঁড়াতেন? অথবা দাঁড়ালে তিনি কি খুশী হতেন?
প্রকৃতপক্ষে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে কখনো তা পছন্দ করতেন না। তিনি চাইতেন না যে, তাঁর সম্মানের জন্য লোকেরা উঠে দাঁড়াক। এ প্রসংগে হযরত আবূ উমামা (রা) বর্ণণা করেন যে-
(خرج علينا رسول اللهু صلى الله عليه وسلم- وهو يتوكأ على عصا فقمنا إليه، فقال: لا تقوموا كما تقوم الأعاجم يعظم بعضه بعضا)
‘‘নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লাঠির উপর ভর দিয়ে আমাদের সামনে আসলেন। তখন আমরা তাঁর সম্মানের জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: অমুসলিম লোকেরা যেমন পরস্পরের সম্মানের জন্য দাঁড়ায়, তোমরা তেমন করে দাঁড়াবে না।’’
একবার হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) এমন একটি ঘরে প্রবেশ করলেন, যেখানে হযরত ইবন ‘আমির ও ইবন যুবাইর উপস্থিত ছিলেন। মু‘য়াবিয়ার আগমনে ইবন ‘আমির দাঁড়ালেন, কিন্তু ইবন যুবাইর বসে থাকলেন। তখন হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) তাকে (ইবন ‘আমির) বললেন:
( اجلس فإني سمعت رسول الله ুصلى الله عليه وسلم- يقول: من سره أن يمثل له العباد قياما، فليتبوأ بيتا في النار)
‘‘তুমি বসো, কেননা আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার সম্মানার্থে লোকেরা দাঁড়াক এটা চায় এবং এতে খুশী হয়, সে যেন জাহান্নামে নিজের ঘর বানিয়ে নেয়।’’
কোন একজন সম্মানিত ব্যাক্তির আগমনে তো এমনিতেই দাঁড়ানো হয়ে থাকে এবং সম্মান প্রদর্শনের জন্য এরূপ দাঁড়িয়ে যাওয়ার যে স্বভাবসুলভ প্রচলন মানব মাত্রেই আছে, এর ব্যাপারে ইসলাম কখনোই বাধ সাজতে যাবেনা। কিন্তু কথা হলো- এভাবে দাঁড়ানোর শর‘য়ী রীতি চালু করতে হলে অবশ্যই শরী‘য়াতের দলীল থাকতে হবে। অন্যথায় তা বিদ‘আত ছাড়া আর কিছুই নয়।
মিলাদ মাহফিলের এই বিদ‘আতটি শিরকের দ্বার উম্মোচন করে:
বিদ‘আতের আরেকটি মারাত্নক কুফল হচ্ছে এই যে, এটি কোন কোন ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে শিরকের রাস্তা খুলে দেয়। যেমন পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে প্রচলিত বিদ‘আত ‘মীলাদ মাহফিল’ এর কথা যদি ভাবি তাহলে দেখতে পাব যে, এর মাধ্যমে রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করার অপপ্রয়াস চালানো হয়।
এই বিদ‘আতটিও প্রচলিত অন্যান্য বিদ‘আতের মতই কোন একটি সুন্নাতের ছদ্মাবরণে তার যাত্রা শুরু করে কালক্রমে একেক এলাকায় একেক প্রক্রিয়ায় চালু হয়ে রয়েছে। যে সুন্নাতটির দোহাই দিয়ে এ বিদ‘আতটির যাত্রা শুরু হয়েছে তা হলো, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করার সুন্নাত। আমরা সকলেই একথা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করি যে, রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর দরুদ ও সালাম পাঠ একটি অতি উত্তম আমল এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়। এ ব্যাপারে কোরআনুল কারীমে আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
(إن الله وملائكته يصلون على النبي ياأيها الذين آمنوا صلواعليه وسلموا تسليما)
‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও নবীর জন্য রহমত প্রার্থনা করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর জন্য রহমতের দো‘আ কর এবং তার প্রতি সালাম প্রেরণ কর।’’
‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: (من صلى علي صلاة صلى الله تعالى عليه بها عشرا) ‘‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠায়, আল্লাহ তা’আলা এর প্রতিদানে তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।’’
অতএব এই দরুদ পাঠ একটি সার্বক্ষনিক সুন্নাত। কখনো কোথাও রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথা উল্লেখ হলেই তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর প্রতি দরূদ পড়তে হয়। সালাতের সময়, জুমু‘আর দিনে ও রাতে এবং অন্য যে কোন সময় তাঁর উপর দরুদ পাঠের মাধ্যমে তাঁর প্রতি আমাদের অকুন্ঠ ভালবাসা প্রমাণিত হয়। এমনকি তাশাহ্হুদের সময় দরুদ পড়াকে কেউ কেউ (ইমাম শাফি‘য়ী) ফরযও বলেছেন। আবার এক হাদীসে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাম শুনেও দরুদ না পড়লে সে ব্যক্তিকে তিরস্কার করা হয়েছে। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
(رغم أنف رجل ذكرت عنده ولم يصل علي)
‘‘সে ব্যক্তি নিকৃষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত যার সামনে আমার উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ সে আমার প্রতি দরুদ পাঠায়নি।’’
হযরত ‘আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
(البخيل من ذكرت عنده فلم يصل علي)
‘‘সে ব্যক্তি বখীল (কৃপণ), যার নিকট আমার উল্লেখ করা হয়, অথচ সে আমার প্রতি দরুদ পড়েনা।’’
সুতরাং এই সুন্নাতের বিরোধিতা আমরা কস্মিণকালেও করছি না, বরং আমরা সকলেই এই সুন্নাতের বাস্তব অনুসারী। মিলাদের ভেতর ‘কিয়াম’ তথা দাঁড়ানো বিষয়ক উপরোক্ত নাতিদীর্ঘ আলোচনা থেকে যে বিষয়টি বের হয়ে এসেছে, তা হলো- মিলাদ মাহফিলের প্রবক্তারা বলুক কিংবা না বলুক তারা মনে করে যে, মিলাদের মজলিসে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাজির হন। অথচ তারা ভাল করেই জানে যে, এরূপ মাহফিল একই সময় অনেক জায়গায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাহলে অর্থ দাঁড়ায় এই যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবগুলো মাহফিলেরই অবস্থা অবলোকন করেন, তাদের খবরাখবর জানেন এবং একই সাথে সকলের মাঝে উপস্থিত হন।
পক্ষান্তরে কোরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ দলীলের ভিত্তিতে গোটা মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, একই সাথে সবকিছু দেখা, সব খবর রাখা এবং সর্বত্র বিরাজ করা কেবল আল্লাহ পাকেরই গুণ। এ গুণে তাঁর সাথে কোন বান্দাহ অংশীদার হতে পারে না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জীবদ্দশায় আল্লাহ পাক তাঁকে যতটুকু অদৃশ্যের বিষয় জানাতেন, তিনি কেবল ততটুকুই জানতেন। কিছু কিছু অদৃশ্য বিষয়ের খবর দিতে পারায় উম্মাত যেন একথা না ভাবে যে, তিনিও গায়েব জানেন, সে লক্ষ্যে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ দিয়েই আল্লাহ বার বার উচ্চারণ করিয়েছেন- তিনি যেন বলে দেন যে, তিনি গায়েব জানেন না। ইরশাদ হয়েছে:
( قل لا أقول لكم عندي خزائن الله ولا أعلم الغيب ولا أقول لكم إني ملك إن أتبع إلا ما يوحى إلي قل هل يستوي الأعمى والبصير أفلا تتفكرون)
‘‘আপনি বলুন: আমি তোমাদেরকে বলিনা যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগত নই। আমি এমনও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু ঐ ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে। আপনি বলে দিন: অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? তোমরা কি চিন্তা কর না?’’
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:
( قل لا أملك لنفسي نفعا ولا ضرا إلا ما شاء الله ولو كنت أعلم الغيب لاستكثرت من الخير وما مسني السوء إن أنا إلا نذير وبشير لقوم يؤمنون)
‘‘বলুন হে নবী! আমি আমার নিজের জন্যে কোন কল্যাণের উপর কর্তৃত্বশালী নই, না কোন ক্ষতির উপর। তবে শুধু তা-ই যা আল্লাহ চান। আমি যদি গায়েব জানতাম, তাহলে নিশ্চয়ই আমি অনেক বেশি কল্যাণ লাভ করে নিতাম এবং আমাকে কোন দু:খ বা কষ্টই স্পর্শ করতে পারত না। আমি তো শুধু ভয় প্রদর্শনকারী, শুধু সুসংবাদদাতা ঈমানদার লোকদের জন্য।’’
আবার শুধু রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ দিয়ে বলিয়েও তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং নিজের পক্ষ থেকে সাধারণ ঘোষণাও করে দিয়েছেন যে, অদৃশ্যের সকল চাবিকাঠি কেবল তাঁরই হাতে। তিনি বলেন:
(وعنده مفاتح الغيب لا يعلمها إلا هو ويعلم ما في البر والبحر وما تسقط من ورقة إلا يعلمها ولا حبة في ظلمات الأرض ولا رطب ولا يابس إلا في كتاب مبين)
‘‘তাঁর কাছেই অদৃশ্য জগতের চাবি রয়েছে। এগুলো তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। স্থলে ও জলে যা আছে, তিনিই জানেন। কোন পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন। কোন শস্যকণা মৃত্তিকার অন্ধকার অংশে পতিত হয় না এবং কোন আদ্র ও শুষ্ক দ্রব্য পতিত হয় না, কিন্তু তা সব প্রকাশ্য গ্রন্থে রয়েছে।’’
উপরন্তু মৃত্যুর পর নবী-রাসূলগণেরও কোন বাহ্যিক প্রভাব দুনিয়াতে আছে বলে কোন দলীল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁরা তাঁদের কবরে জীবিত, সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু অন্য সব মৃতদের মত তাঁরাও শুধু কিয়ামাতের দিনই কবর থেকে বের হবেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: ‘কিয়ামাতের দিন আমার কবরই সর্বপ্রথম খন্ডন হবে। আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং আমারই সুপারিশ সবার আগে গৃহীত হবে।’ এ ব্যাপারে মুসলিম ‘আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীতেও একথাই ধ্বনিত হয়েছে। তিনি ইরশাদ করেছেন:
(ثم إنكم بعد ذلك لميتون ثم إنكم يوم القيامة تبعثون)
‘‘এরপর তোমাদের অবশ্যই মরতে হবে, অত:পর তোমাদেরকে অবশ্যই কিয়ামাতের দিবসে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।’’
অতএব মিলাদের কিয়ামের মাধ্যমে তাদের যে অন্তর্নিহিত আকীদা বিশ্বাস, তা অত্যন্ত ভয়ানক বিদ‘আত ও কুসংস্কার যা কুফরীর দিকে ধাবিত করে। তাই এ বিষয়ে যথার্থ অবহিত হওয়া ও এহেন মারাত্নক বিদ‘আতের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা তাওহীদপন্থী প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ভালবাসার গুরুত্ব:
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সর্বাধিক ভালবাসা একজন মু’মিনের কাছে তার ঈমানেরই দাবী। কোন ব্যক্তির ঈমানদার হওয়ার দাবী তখনই সত্য বলে প্রমাণিত হবে যখন সে দুনিয়ার অন্য সকলের চেয়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে অধিক ভালবাসবে। এ বিষয়ে হযরত আনাস (রা) বর্ণিত হাদীসটি প্রণিধান যোগ্য। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
(لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده و ولده والناس أجمعين)
‘‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি এবং অন্য সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’’
শুধু তাই নয়, একজন মু’মিনের কাছে তার ঈমানের দাবী হলো- কেবল অন্য সব মানুষের চেয়ে নয় বরং তার নিজের চেয়েও রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অধিক ভালবাসা। একবার হযরত ‘উমারের (রা) হাত ধরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ‘উমার বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে (আমার নিজেকে ছাড়া) দুনিয়ার সকলের চেয়ে অধিক ভালবাসি। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: আল্লাহর কসম! হে ‘উমার, তুমি এখনো মু’মিন হতে পারনি। বিনীত কন্ঠে হযরত ‘উমার শুধালেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে তাহলে কি করতে হবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানালেন: তোমাকে তোমার নিজের চেয়েও আমাকে অধিক ভালবাসতে হবে। হযরত ‘উমার (রা:) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, এখন থেকে আপনি আমার কাছে আমার নিজের চেয়েও বেশি প্রিয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন বললেন: (الآن يا عمر) ‘হে ‘উমার! এতক্ষণে তুমি মু’মিন হলে’। হযরত ‘উমারের (রা) এ ঘটনায় আরো স্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাধিক ভাল না বেসে কেউ ঈমানের দাবীদার হলে তার দাবী মিথ্যা।
আর রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালবাসার সর্বোত্তম নমূনা হলো, তাঁর আনীত আদর্শের পুংখানুপুংখ অনুসরণ করা। জীবনের সকল ক্ষেত্রে একমাত্র তাঁর প্রদর্শিত বিধানকেই অনুকরণীয় বলে মনে করা। মহান আল্লাহও চান যে, একজন মু’মিন এভাবেই তাঁর রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালবাসুক। এজন্যেই তিনি তাঁর নিজের ভালবাসা ও সন্তুষ্টিকে নবীর ভালবাসার উপর নির্ভরশীল বলে ঘোষণা করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে:
(قل إن كنتم تحبون الله فاتبعوني يحببكم الله ويغفر لكم ذنوبكم والله غفور رحيم)
‘‘হে নবী! আপনি জানিয়ে দিন যে, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাসার দাবীদার হয়ে থাক, তবে আমার অনুকরণ কর। তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসবেন। এবং তোমাদের গুনাহরাজি ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, দয়ালু।’’
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ আরো ঘোষণা করছেন:
(فلا وربك لا يؤمنون حتى يحكموك فيما شجر بينهم ثم لا يجدوا في أنفسهم حرجا مما قضيت ويسلموا تسليما)
‘‘আপনার রবের কসম! ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মু’মিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের ভিতরকার ব্যাপারাদি নিরসনে আপনাকে বিচার ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেবে। অত:পর আপনার ফায়সালার ব্যাপারে মনের মধ্যে কোন প্রকার ইতস্তত: বোধ করবে না এবং তা সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।’’
অতএব রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ভালবাসতে হবে সর্বাধিক। এমনকি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি সর্বাধিক ভালবাসা না থাকলে মু’মিনই হওয়ার দাবী করা যাবেনা। তাহলে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি এরূপ ভালবাসা প্রকাশের সঠিক পন্থা কি?
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ভালবাসার সঠিক পন্থা:
ঈমানের দাবী অনুযায়ী রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সর্বাপেক্ষা অধিক ভালবাসতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে এর সঠিক পন্থা জেনে নিতে হবে। আর এ পন্থা বলে দেয়ার অধিক হকদার তিনি নিজেই। এবং এক্ষেত্রে একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারেন কেবল তাঁর সাহাবীগণই। যাঁরা বাস্তবিক পক্ষেই তাঁকে নিজেদের জীবনের চেয়ে অধিক ভাল বেসেছেন। যাঁরা তাঁদের জান ও মাল রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পন্থায় বিলিয়ে দিয়ে তাঁর আনীত আদর্শকে সমুন্নত করেছেন। নিজেদের জানের চেয়ে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জান, নিজেদের মতের চেয়ে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মতকে প্রাধান্য দিয়ে যারা আল্লাহর পক্ষ থেকে সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন।
ওহুদ যুদ্ধে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশিষ্ট সাহাবী ‘আমর ইবন আল-জামুহ (রা) এর স্ত্রী ‘হিন্দ’ (রা) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দেখার জন্য অধির হয়ে উঠেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার পথে লোকেরা তাকে জানাল যে, তোমার স্বামী, তোমার ছেলে ও তোমার ভাই শহীদ হয়েছেন। তিনি সকলের মৃত্যুর কথা শুনেই ‘ইন্না লিল্লাহ’ পড়ে ধৈর্য ধারণ করলেন। প্রতিবারই জিজ্ঞেস করলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর খবর কি? যখন জানলেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেঁচে আছেন তখনই তিনি সান্তনা পেলেন। রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালবাসার এর চেয়ে প্রকৃষ্ট প্রমাণ আর কি হতে পারে ?
ভালবাসার স্থান অন্তরের কুটিরে। এটি মনের অভ্যন্তরের লুকায়িত বিষয়। শুধু বাহ্যিক অঙ্গ-ভঙ্গি দেখে প্রকৃত ভালবাসা বুঝার উপায় নেই। তাই রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি অন্তরে প্রোথিত ভালবাসার বহি:প্রকাশ ঘটাতে হবে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শের অনুকরণের মাধ্যমে। তাঁকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে। তাঁর প্রতি বেশি বেশি দরুদ ও সালাম প্রেরণের মাধ্যমে। আর এ সব কিছুর সঠিক পন্থা জেনে নিতে হবে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহীহ হাদীস থেকে। কেননা অন্যান্য ‘ইবাদাতের মত এটিও একটি মৌলিক ‘ইবাদাত। তাই নিজের ইচ্ছামত এই ভালবাসার বহি:প্রকাশ ঘটালে তা হবে হয় পক্ষপাতদুষ্ট, নয় অতিরঞ্জিত।
উপসংহার:
ইসলামী জীবন বিধান একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান। এ বিধানে মানব জীবনের সমস্ত দিক ও বিভাগের মৌলিক সমাধান নিহিত। সৃষ্টির শুরু থেকে পৃথিবীতে যত ধর্মমতের আবির্ভাব ঘটেছে, এ সবগুলোর যাবতীয় কল্যাণকর দিকগুলো এ বিধানে রয়েছে। এটি পালন করা স্থান, কাল ও অবস্থা ভেদে সকলের জন্য সহজতর করে দেয়া হয়েছে। এ জীবনাদর্শে আদেশ-নিষেধ, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, পাপ-পুণ্য, ভাল-মন্দ ও দোষ-গুণ ইত্যাদির মাঝে সঠিক ভারসাম্য বিধান করা আছে। এখানে যেমনিভাবে চোরের হাত কাটার বিধান রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাষ্ট্র কর্তৃক সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিধান। তাই তো এ বিধানে পেটের দায়ে চুরি করলে হাত কাটা হয় না। এখানে সৎ কাজের আদেশ দান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি আদেশ নিষেধের বাণী সম্বলিত পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলোতেও বিশেষ সামঞ্জস্য রক্ষা করা হয়েছে।
ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিটি ধারা-উপধারা তার বিন্দু-বিসর্গ সমেত সুবিন্যস্তরূপে সংরক্ষিত। আর তাও আবার কেবল লিখিতভাবে সংরক্ষিত নয়, বরং একদল নিবেদিত প্রাণ আল্লাহর বান্দাহ সরাসরি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশনা অনুযায়ী তা নিজেদের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর করেন এবং রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপস্থিতিতেই মহান আল্লাহ এ বিধানের পরিপূর্ণতা ও পরিসমাপ্তির ঘোষণা দেন। আর এজন্যই ইসলাম বিদ‘আত নামক মারাত্মক ব্যাধিটিকে কঠোর হস্তে দমন করতে চায়। বিদ‘আত যতই ক্ষুদ্র পরিসরে হোক, তাকে তৎক্ষনাত ক্ষুদ্র থাকা অবস্থায়ই উৎপাটিত করে ফেলা উচিত। নইলে তা অতি দ্রুত ডাল-পালা মেলে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ড যে ঘটাবে না- তা কে বলতে পারে? এ প্রসংগে প্রখ্যাত ইসলামী পন্ডিত (মদীনার ইমাম নামে যিনি খ্যাত) ইমাম মালিকের (রহ) সুদৃঢ় অবস্থানের একটা নমুনা উল্লেখ করেই এ আলোচনার যবনিকা টানতে চাই।
‘‘এক ব্যাক্তি ইমাম মালিককে বলল: হে আবু ‘আব্দুল্লাহ! আমি ইহরাম করতে চাচ্ছি। তো কোত্থেকে করব ? ইমাম মালিক বললেন: যুল হুলাইফা থেকে। কেননা এটাই হলো মদীনাবাসীদের ইহরামের মীকাত। এখান থেকেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইহরাম বেঁধেছিলেন। লোকটি বলল: আমি মসজিদে নববী থেকে ইহরাম করতে চাই। মালিক বললেন: তুমি তা করো না। লোকটি আবার বললো: আমি রাসূলের কবরের পার্শ্বে বসে ইহরাম করতে চাই। মালিক বললেন: না, তা করবে না। আমি তোমার উপর ফিতনার আশংকা করছি। লোকটি বলল: এতে ফিতনার কি আছে? আমি তো শুধু কয়েক মাইল দূরত্বই বৃদ্ধি করলাম। (অর্থাৎ মক্কার পথে অবস্থিত যুল হুলাইফায় ইহরাম না করে মদীনা অর্থাৎ মসজিদে নববীতে অবস্থিত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরের নিকটে বসে করতে চাচ্ছি)? তখন ইমাম মালিক বললেন: এর চেয়ে বড় ফিতনা আর কি হতে পারে যে, তুমি নিজেকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর চেয়ে অধিক পরহেযগার ভাবছ? (আর তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ইহরামের স্থানকে বাদ দিয়ে অন্যত্র ইহরাম করতে চাচ্ছ।) আল্লাহ তা‘আলার এ বাণী কি তুমি শুননি:
(فليحذر الذين يخالفون عن أمره أن تصيبهم فتنة أو يصيبهم عذاب أليم)
‘‘অতএব যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করে বসবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে (আল-কোরআন, ২৪: ৬৩)।’’
মহান আল্লাহর কাছে আমরা বিদ‘আতের ভয়াবহ বিষবাস্প থেকে আশ্রয় চাই। নিজের অজান্তে যেটুকু বিদ‘আতে আমরা জড়িয়ে যাই, তার জন্য আমরা ক্ষমা চাই। কেবল তিনিই পারেন দীনি ফিতনার এই সয়লাভ থেকে আমাদেরকে হিফাযত করতে এবং তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনীত বিধানের উপর আমাদেরকে অটল ও অবিচল রাখতে।
وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وأصحابه ومن اتبع هداه إلى يوم الدين. وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.


[গবেষণাপত্রটি ২২ অকটোবর, ২০০৯ তারিখে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক আয়োজিত স্টাডি সেশনে উপস্থাপিত হয়।]

 

 

রেফারেন্সঃ

১. HANS WEHR, A Dictionary of Modern Written Arabic, (London: May 1980, 3rd printing), p. 46
. ড. মুহাম্মদ ‘আলী আল-খূলী, মু‘জামুল আলফায আল-ইসলামিয়্যাহ (আরবী-ইংরেজী-আরবী), (জর্দান: মুদ্রণ-৩), পৃ. ১৬
৩. Munir Baalabaki, AL-MAWRID DICTIONARY (Arabic-English), (Lebanon: Beirut, 1999, 4th Edition), p. 228
. সূরা আল-বাকারা, ২:১১৭, সূরা আল-আন‘আম, ৬:১০১
. সূরা আল-আহকাফ, ৪৬:৯
. সূরা আল- হাদীদ, ৫৭:২৭
. আল-মুনজিদ ফিল্-লুগাতি ওয়াল আ‘লাম, (লেবানন: বৈরূত, দার আল-মাশরিক, ১৯৮৬ ইং), পৃ. ২৯
. মুহাম্মাদ ‘আব্দুর রহীম, সুন্নাত ও বিদ‘আত, (ঢাকা:খায়রুন প্রকাশনী, ১৯৯৬) পৃ. ৬
. মুহাম্মাদ ‘আব্দুর রহীম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭
. আহমাদ ইবন তাইমিয়া, শাইখুল ইসলাম, মাজমু‘উল ফাতাওয়া, (রিয়াদ: দারু ‘আলামিল কুতুব, ১৯৯১),খ.৪, পৃ- ১০৭-১০৮
১১. আল-হান্বলী, ‘আব্দুর রহমান ইবন রজব, জামি‘উল ‘উলুম ওয়াল হিকাম, (বৈরুত: আল-মাকতাবাহ আল-আসরিয়্যাহ), মুদ্রণ- ৩, পৃ-২৮৯
. মুহাম্মাদ ‘আব্দুর রহীম, প্রাগুক্ত, পৃ- ২৬৭
. শাতিবী, আবূ ইসহাক ইবরাহীম, আল ই’তিসাম, (বৈরুত:দার আল-মা’রিফা), খ. ১, পৃ- ১৯
. সূরা আল-আ’রাফ, ৭:১৯৭
. সূরা আল-মায়িদা, ৫:৭৬
. সূরা কাফ, ৫০:১৬
. সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬
. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৭০৪
. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৯৭২
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ১৩৩০, ১৩৯০ ও মুসলিম, হাদীস নং- ৫২৯
. মুহাম্মদ বিন জামীল যাইনূ , আরকানুল ইসলাম ওয়াল ঈমান ও আল-আকীদাহ আল-ইসলামিয়াহ, (ঢাকা: রিভাইভ্যাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি- কুয়েত, বাংলাদেশ অফিস, ডিসেম্বর ২০০৩), পৃ- ১৭
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ২৬৯৭ ও মুসলিম, হাদীস নং- ১৭১৮
. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৭১৮
. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৮৬৭
. আবূ দাউদ, হাদীস নং- ৪৬০৭
. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৮৬৭
. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৯৭৮
. সূরা আন্-নূর, ২৪:৬৩
. সূরা আল-হাশর, ৫৯:৭
. মুহাম্মদ ‘আব্দুর রহীম, প্রাগুক্ত, পৃ- ৫২
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ২০১০
. সূরা আন্-নাহল, ১৬:৯
. সূরা আশ্ -শূরা, ৪২:২১
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ২০১২ ও মুসলিম, হাদীস নং- ৭৬১
. শাতিবী, প্রাগুক্ত, পৃ-১৫৪
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ৭২৮
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ৩৮০, ৮৬০ এবং মুসলিম, হাদীস নং- ৬৫৮, ৬৬০
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ৬৪৫ ও মুসলিম, হাদীস নং- ৬৫০
. প্রাগুক্ত, বুখারী
. রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জন্মোৎসব পালনের বিশেষ প্রথা।
. আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং- ৪৬০৭
. আশ্-শাওকানী, মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী, নাইলুল আওতার, (দামেস্ক: দারুল ফিকর, ১৯৮০) খ. ৩, পৃ-৬৩
৪৩. মুহাম্মদ ‘আব্দুর রহীম, প্রাগুক্ত, পৃ- ৫৩
. আশ্-শাওকানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৩
. মোল্লা ‘আলী আল- ক্বারী, আল-মিরকাতুল মাফাতীহ, (মিশর: আল-মাকতাবাতুল মাইমানিয়্যাহ, ১৩০৯ হি.) খ. ৩, পৃ- ১৮৬
. সূরা আল-জাছিয়া, ৪৫:১৮
. আদ্-দারিমী, আবূ মুহাম্মাদ ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্দুর রহমান, সুনানুদ্-দারিমী, (বৈরূত: দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ১৪০৭ হি.) খ. ১, পৃ. ৬৫
. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং- ১৮৬২
. আবূ দাউদ, হাদীস নং- ১৬২
. শাতিবী, প্রাগুক্ত।
. সূরা আল-মায়িদা, ৫:৩
. আল-হাকিম, আবূ ‘আবদিল্লাহ মুহাম্মদ ইবন ‘আবদিল্লাহ, আল-মুসতাদরাক ‘আলা আস্-সাহীহাইন, (বৈরূত: দার আল-কুতুব আল-‘ইলমিয়্যাহ, ১৪১১ হি.) খ. ১, পৃ. ১৭২
. শাতিবী, প্রাগুক্ত, পৃ-৪৯
. সূরা আত্-তাওবা, ৯:১০০
. আদ্-দারিমী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৫৭
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং-১৯০,১৯১ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৫৩৫।
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ১৫২০ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১২৭০
. সূরা আলে ‘ইমরান, ৩:১৯
. সূরা আলে ‘ইমরান, ৩:৮৫
. সূরা আল-বাকারা, ২:১১১
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ৩৪৪৫
. ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আর বলেছেন যে, এটি হাসান হাদীস।
. ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আর বলেছেন যে, এটি হাসান এবং সহীহ হাদীস।
. ‘আব্দুল ‘আযীয ইবন ‘আব্দুল্লাহ ইবন বায, উজুবু লুযুমিস্-সুন্নাহ ওয়াল হাযারি মিনাল বিদ‘আহ, পৃ. ২৪।
. আত্ তাবারানী, আল-মু‘জাম আল-কাবীর, হাদীস নং- ২৮৮৯
. সূরা আল-আন‘‘আম, ৬:১১৬
. সূরা আল-বাকারা, ২:১৭০-১৭১
. সূরা আস্-সাফফাত, ৩৭:৬৯-৭০
. সূরা লুকমান, ৩১:২১
. আবূ দাউদ, হাদীস নং-১০৪৭।
. প্রাগুক্ত, হাদীস নং-২০৪২।
. প্রাগুক্ত, হাদীস নং-২০৪১।
. আবূ দাউদ, হাদীস নং- ৫২৩০
. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং- ১৬৮৯১
. সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬
. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩৮৪
. ইবন রূশদ আল-কুরতুবী, বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ, (বৈরূত: দারুল কুতুব, ১০ম সংস্করণ, ১৯৮৮), খ. ১, পৃ- ১৩০
. ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আর বলেছেন যে, এটি হাসান হাদীস। হাদীস নং- ৩৫৩৯।
. ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আর বলেছেন যে, এটি হাসান এবং সহীহ হাদীস। হাদীস নং- ৩৫৪০।
. সূরা আল-আন‘আম, ৬:৫০
. সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১৮৮
. সূরা আল-আন‘আম, ৬:৫৯
. ‘আব্দুল ‘আযীয ইবন ‘আব্দুল্লাহ ইবন বায, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।
. সূরা আল-মু’মিনূন, ২৩:১৬
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ১৫ ও মুসলিম, হাদীস নং- ৭০
. সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং- ৩৪৯১
. সূরা আলি ‘ইমরান ৩:৩১
. সূরা আন্-নিসা ৪:৬৫
. আল-আলবানী, মুহাম্মদ নাসির উদ্দীন, হাজ্জাতুন্-নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কামা রাওয়াহা ‘আনহু জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, (বৈরূত: আল-মাকতাব আল-ইসলামী, ১৩৯৯হি.) পৃ. ১১০