মূলপাতা নিবন্ধ আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানীঃ জীবন ও কর্ম

ভূমিকা

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, জ্ঞান-গবেষণার অন্যতম পুরোধা মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানী। জ্ঞান-গবেষণা, অধ্যাপনা, গ্রন্থ রচনা ও বহুমুখী কর্মকান্ডের মাধ্যমে যে সকল মনীষী অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের একজন হলেন তিনি। আশ্ শাওকানী ছিলেন একাধারে চিন্তাবিদ, গবেষক, লেখক, অধ্যাপক, সুসাহিত্যিক, কবি, আইনবিদ ও যোগ্য বিচারক।
তাফসীর, হাদীছ, ফিকহ, ভাষা ও সাহিত্য, কবিতা, ধর্মতত্ত্ব, ‘আকাইদ, ইতিহাস, ফারায়িজশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, অংকশাস্ত্র, অলংকারশাস্ত্র, বিজ্ঞান, পরিবেশবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ের তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ পন্ডিত।
‘‘আল্লামা আশ্ শাওকানী সে যুগের একজন দক্ষ মুজতাহিদ ছিলেন। তিনি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে তুলে ধরেছেন। তিনি মাযহাব ও ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ তথা অন্ধ অনুকরণের আবর্ত থেকে বেরিয়ে মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তা অনুশীলনের পথে পা বাড়ান।
ইজতিহাদ অর্থাৎ চিন্তা-গবেষণা করে মাসয়ালা চয়নে তিনি ছিলেন খুবই পারদর্শী। ইসলামী আইনশাস্ত্রে তাঁর ছিল বিশেষ পান্ডিত্য। বিভিন্ন বিষয়ে আইনী ব্যাখ্যা তথা ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে আশ্ শাওকানী অনন্য যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। বিচার কার্যেও তাঁর দক্ষতা এবং যোগ্যতা ছিল সুবিদিত।
তিনি শিরক, বিদ‘আত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং লিখনীর মাধ্যমে এগুলোর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়েছেন।
আমৃত্যু জ্ঞান সাধক এই মনীষী বহু সংখ্যক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এ মহান মনীষীর বহুমুখী অবদান সত্ত্বেও তাঁর জীবন সম্পর্কে সবিস্তারে তেমন কিছু জানা যায় না। বিভিন্ন গ্রন্থে বিচ্ছিন্নভাবে তাঁর সম্পর্কে যা কিছু আলোচনা হয়েছে, তা খুবই অপ্রতুল। বলা যায় কীর্ত্তিমান এ মহাপুরুষের জীবনী অনেকটাই লোক চক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেছে।
আশ্ শাওকানীর কর্মময় জীবন ও চিন্তাধারাকে সাধারণ্যে পরিচিত করানোর জন্যই মূলত এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। ‘মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানী : জীবন ও কর্ম’’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভে তাঁর জীবনী, কর্ম ও চিন্তাধারার সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করা হয়েছে। আশা করি পাঠকবর্গ এ অভিসন্দর্ভের মাধ্যমে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর জীবনের বিভিন্ন দিক অবগত হয়ে উপকৃত হতে পারবেন।


প্রথম অধ্যায়

প্রথম পরিচ্ছেদ

নাম ও বংশ পরিচয়

নাম : তাঁর নাম মুহাম্মাদ, পিতার নাম ‘আলী, মাতার নাম উম্মুল ফজল বিনতে আবিল হাসান ‘আলী ইবন ইসহাক ইবন ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ আল মালিকী আশ্ শাওকানী এবং দাদার নাম মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল্লাহ ইবনুল হাসান। তাঁর উপনাম ছিল আবু ‘আব্দুল্লাহ এবং উপাধি ছিল শায়খুল ইসলাম।

বংশ পরিচিতি : ‘আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানীর বংশ পরম্পরার পুরো পরিচিতিই পাওয়া যায়। তাঁর বংশ পরম্পরা আদম (আ.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। নিম্নে তাঁর বংশসূত্র উল্লেখ করা হলো :

মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দিল্লাহ ইবনুল হাসান ইবন মুহাম্মাদ ইবন সালাহ্ ইবন ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল ‘আফীফ ইবন মুহাম্মাদ ইবন রাযাক - এভাবে খায়শামা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এরপর তাঁর বংশসূত্র নিম্নরূপ :

খায়শামা ইবন যাববাদ ইবন কাসিম ইবন মারহাবাতুল আকবার ইবন মালিক ইবন রাবি‘আ ইবন আদ্ দু‘আম ইবন ইবরাহীম ইবন ‘আব্দিল্লাহ ইবন রাদ্দী ইবন মালিক।

‘রাওজাতুল আলবাব ফি মা‘রিফাতিল আনসাব’ নামক কিতাবে তাঁর বংশ সূত্র এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে : খায়শামা ইবন যাববাদ ইবন কায়লাম ইবন রাবি‘আ ইবন মারহাবা: ইবন আজদা‘ ইবন সা‘ঈদ ইবন মাস‘উদ ইবন ওয়ায়িল ইবন আল হারিছ আল আসগার ইবন রাবি‘আ ইবন আল হারিছ আল আকবার ইবন রাবি‘আ ইবন মারহাবা আল আকবার ইবন আদ্ দু‘আম ইবন মালিক ইবন রাবি‘আ।

মাশজারুল আশরাফ আল্ গাসসানীতে বলা হয়েছে যে, আদ্ দু‘আম ইবন ইবরাহীম হলেন ইবন ‘আব্দিল্লাহ ইবন ইয়াসীন ইবন হুজাইল ইবন ‘আম্মারা ইবন যাহির ইবন ছামামা ইবন সা‘আদ ইবন ‘আম্মারা ইবন ‘আব্দ ইবন ‘উলইয়ান ইবন আদ্ দু‘আম ইবন রূমান ইবন বুকাইল।

আবু নসর আন নাহলাবী তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন : আদ্ দু‘আম হলেন ইবন ইবরাহীম ইবন ‘আব্দিল্লাহ ইবন ইবরাহীম ইবনুল হুসাইন ইবন ‘আব্দিল্লাহ ইবনুল আযহার ইবন নাশির ইবন হাজল ইবন উমাইরা: ইবন ‘আব্দ ইবন ‘উলইয়ান ইবন আরহাব ইবন আদ্ দু‘আম ইবন মু‘আবিয়া।

এরপর সকলে একমত হয়ে বলেন যে, উলইয়ান হলেন ইবন সা‘আব ইবন রূমান ইবন বুকাইল ইবন খায়রান ইবন নাওফ ইবন তাবা‘ ইবন যায়িদ ইবন ‘উমার ইবন হামদান ইবন মালিক ইবন যায়িদ ইবন আওসালাহ ইবন রাবি‘আ: (কোন কিতাবে রাবি‘আর পরিবর্তে আল্ খিয়ার উল্লেখ রয়েছে)। এরপর সকলে একমত হয়ে বলেন, ইবনুন নায়্যিত ইবন মালিক ইবন যায়িদ ইবন কাহলান ইবন সাবা ইবন ইয়াশজাব ইবন ইয়ারাব ইবন কাহতান ইবন হুদ ইবন ‘আবির ইবন সালিখ ইবন আরফাখশাদ ইবন সাম ইবন নূহ ইবন লামাক ইবন মুতাওশ্শালাহ ইবন আখনুখ ইবন লুদ ইবন মাহলাঈল ইবন কায়নান ইবন আনুশ ইবন শীছ ইবন আদম।

আশ্ শাওকানী : মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী সাধারণ্যে আশ্ শাওকানী নামেই সমধিক পরিচিত। বিশেষত: তাফসীর জগতে তাঁর এ নামই প্রসিদ্ধ। শাওকান নামক স্থানের সাথে সম্পর্কিত করেই তাঁকে আশ্ শাওকানী বলা হয়।

শাওকান : সান‘আ থেকে এক দিনের পথের দূরত্বে অবস্থিত ইয়ামানের একটি অঞ্চলের নাম শাওকান। এটি খাওলানের একটি গোত্র সুহামিয়াদের গ্রাম। কামুসে এটিকে বাহরাইনের একটি অঞ্চল, ইয়ামানের একটি দুর্গ এবং সারাখ্স ও আবি ওয়ার্দের মধ্যবর্তী এক শহর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মারসাদে একে জিমারের পার্শ্বে ইয়ামানের একটি গ্রাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সান‘আ থেকে দুই মারহাল (দুই দিনের পথের) দূরত্বে অবস্থিত

আবু সা‘আদ বলেন, সারাখস এবং আবিওয়ার্দের মধ্যবর্তী খাবিরান নামক স্থানের পার্শ্ববর্তী শহরের নাম শাওকান। এর সাথে ‘আতীক ইবর মুহাম্মাদ ইবন আনবাস আবুল ওয়াফা আশ্ শাওকানী সম্পর্কিত।

কারো কারো মতে শাওকানীর জন্মস্থান শাওকানের অদূরবর্তী এক দীর্ঘ পাহাড়ী অঞ্চলে, যার নাম ‘আল হিজরা:’ বা ‘হিজরাতুশ শাওকান’।

এই শাওকান বা হিজরাতুশ শাওকানে তাঁর বংশধরগণ বাস করতো বলে তাদেরকে শাওকানী বলা হয়।

ইয়ামান, সান‘আ এবং খাওলানের সাথে সম্পর্কিত করে তাকে ইয়ামানী, সান‘আনী এবং খাওলানীও বলা হয়।

জন্ম তারিখ : ১১৭৩ হিজরী, ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ, জিলকাদ মাসের ২৮ তারিখ সোমবার মধ্যহ্নে মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানী জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব ও কৈশোর : মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানী স্বীয় পরিবারে তাঁর পিতার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। পিতা ‘আলী তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ ও আদর যত্নে লালন পালন করেন। পিতার গৃহে তিনি আত্ম মর্যাদা ও রুচিবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠেন। তাঁর পিতা-মাতা উভয়ের পরিবারই ছিল সুশিক্ষিত। পারিবারিক প্রভাবেই তিনি পরবর্তী কালে স্বনাম ধন্য ও প্রতিভাধর একজন পন্ডিত, চিন্তাবিদ ও সুলেখক হিসেবে গড়ে উঠেন।
তাঁর পিতা : আশ্ শাওকানীর পিতা ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ একজন বড় ‘আলিম ও বিচারক ছিলেন। এ প্রসঙ্গে কাজী মুহাম্মাদ ‘আব্দুল হাকীম বলেন, و كان والده من كبار علماء صنعاء و قضاتها ‘‘তাঁর পিতা সান‘আর একজন বড় মাপের বিজ্ঞ ব্যক্তি ও বিচারক ছিলেন।’’ হিজরা বা হিজরাতুশ শাওকানেই তাঁর পিতা জন্ম গ্রহণ করেন ও বড় হন। তিনি প্রথমে কুরআন হিফ্য করেন। এরপর জ্ঞানান্বেষণের জন্য সান‘আয় গমন করেন। সেখানে তিনি একদল বিজ্ঞ পন্ডিতের নিকট জ্ঞান চর্চা করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন সায়্যিদ ‘আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুর রহমান আল কাসানী, সায়্যিদ ‘আল্লামা ‘আলী ইবন হাসান আল কাসানী, সায়্যিদ ‘আল্লামা হাসান ইবন মুহাম্মাদ আল্ আখফাশ, কাজী ‘আল্লামা মুহসিন ইবন আহমাদ আল্ ‘আবিদ প্রমুখ।
তিনি ফিক্হ, উসূলে ফিক্হ, ফারায়িজ, হাদীছ, তাফসীর, নাহু প্রভৃতি শাস্ত্রে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি জ্ঞানার্জনের জন্য পরিবার ও দেশ ছেড়ে দীর্ঘদিন সফরে থাকতেন। শিক্ষা জীবনের শেষের দিকে তিনি সান‘আতে পাঠদান ও ফাতওয়া প্রদান শুরু করেন।
ইমাম মাহদী আল ‘আববাস ইবনুল হুসাইন তাঁকে প্রথমে: সান‘আর খাওলান প্রদেশের বিচারক নিযুক্ত করেন। কিন্তু তিনি এতে আপত্তি করায় পরবর্তীতে তাঁকে সান‘আর বিচারক নিযুক্ত করা হয়। এখানেই তিনি সপরিবারে অবস্থান করেন। বিচার কার্যে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি জ্ঞান অন্বেষণ ও পাঠদান পরিত্যাগ করেননি; বরং তিনি বিভিন্ন মসজিদে ফিক্হ ও ফারায়িজ শিক্ষা দিতেন।
তিনি প্রশংসিত চরিত্র ও মনমানসিকতার অধিকারী, সৎ প্রবৃত্তি, স্বল্পে তুষ্ট, বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণকারী, দ্বীনী বিষয়াদির সংরক্ষক, ‘ইবাদাতে অবিচল, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দরিদ্রদের দানকারী, কথা-বার্তা ও পোশাক-পরিচ্ছদে অনাড়ম্বর এবং সহজ-সরল স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। তিনি উদার হৃদয় ও শান্ত প্রকৃতির লোক ছিলেন। কারো প্রতি তিনি কখনো হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করতেন না এবং রাগান্বিতও হতেন না। তিনি পরিবারের প্রয়োজন পূরণে সদা তৎপর ছিলেন। তিনি দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত ছিলেন। সম্পদ অর্জন ও সঞ্চয় করার প্রতি তাঁর কোন ঝোঁক ছিলনা; বরং শুধু পরিবারের প্রয়োজন পূরণই তাঁর লক্ষ্য ছিল। ৪০ বছর তিনি বিচারকের পদে অধিষ্ঠিত থেকেও বসবাসের জন্য একটি বাড়ির মালিক হতে পারেন নি। অধিকন্তু তিনি পিতার নিকট হতে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের অংশ বিশেষ বিক্রি করে ফেলেন। মৃত্যুকালে তিনি তেমন কোন সম্পদ রেখে যাননি।

তাঁর মাতা : আশ্ শাওকানীর মাতা উম্মুল ফজলের গৃহও ছিল জ্ঞান চর্চার বিশেষত: হাদীছ চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। উম্মুল ফজলের পিতা আবুল হাসান ছিলেন একজন বিজ্ঞ ‘আলিম। তিনি বিদ্যার্জনের জন্য তৎকালীন জ্ঞান চর্চার অন্যতম কেন্দ্র নিশাপুরে গমন করতেন এবং আবুল মুফরিজ আস সাম‘আনীর পাঠ শ্রবণ করতেন। তাঁর উল্লেখিত শিক্ষকের অনুমতিক্রমে তিনি একদল বিজ্ঞ শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ ও তাঁদের নিকট থেকে জ্ঞানার্জনের সুযোগ লাভ করেন, যাদের মধ্যে ছিলেন আবু মুহাম্মাদ ‘আব্দুল হামীদ ইবন ‘আব্দির রহমান আল বাহরী, আবু ‘আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ আশ্ শাওকানী আল মালিকী।
পিতা-মাতার উভয় পরিবার সুশিক্ষিত হওয়ায় মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানী সুশিক্ষার পরিবেশেই লালিত-পালিত ও বড় হন। বিশেষ করে তাঁর পিতা একজন বড় ‘আলিম ও বিচারক হওয়ায় পারিবারিক ঐতিহ্যের আলোকেই তিনি ইসলামের শিক্ষা, জীবন দর্শন, ব্যবস্থাপনা ও রাজনীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ এবং সচেতন হওয়ার সুযোগ পান, যার প্রভাব তাঁর পরবর্তী জীবনে লক্ষ্যণীয়।

 

 

 

 

 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
শিক্ষাজীবন
ছোট বেলায় পরিবারেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। বিজ্ঞ পিতার তত্তাবধানেই তিনি পড়া-লেখা শুরু করেন। তাঁর পিতা অত্যন্ত যত্নের সাথে ছেলের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি তাঁকে সকল দিক থেকে মুক্ত করে শুধু পড়ালেখায় মনোনিবেশের ব্যবস্থা করেন। এ ব্যপারে আল্লামা আশ্ শাওকানী নিজেই বর্ণনা করেন, ‘‘আমার পিতা আমার সংগে অত্যন্ত সদাচার ও স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন এবং জ্ঞানার্জন ও তা ঠিক রাখার জন্য এমন সহাযোগিতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন যে, জ্ঞানার্জন ছাড়া আমার আর কোন কাজই ছিলনা’’।
পিতা ছোট বেলায় তাঁর পাঠদানের ব্যবস্থা করেন এবং সে জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। তিনি তাঁর এবং তাঁর ছোট ভাই ইয়াহ্ইয়ার জন্য শিক্ষার পথ প্রশস্ত করার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী ছোট বেলা হতেই পড়ালেখায় গভীর মনোনিবেশ করেন। তিনি পিতার সংস্পর্শে থেকে সে সময়ের বড় বড় আলিমের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাঁদের নিকট হতে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শ্রবণ করেন। ফলে বিদ্যার্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ এতটাই প্রবল হয় যে, তিনি জ্ঞানান্বেষণে একনিষ্ঠভাবে আত্মনিয়োগ করেন এবং কঠিন চেষ্টা সাধনায় লিপ্ত হন।
বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন
বিদ্যার্জনের জন্য গভীর অধ্যবসায়ের ফলে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তিনি তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, উসূলে ফিকহ, সাহিত্য, ইতিহাস, নাহু, সরফ, অলংকার শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, হিসাব বিজ্ঞান, তর্ক শাস্ত্র, ছন্দপ্রকরণ বিদ্যা, বিজ্ঞান, শরীর বিদ্যা, প্রকৃতি বিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, পরিবেশ বিদ্যা প্রভৃতি শাস্ত্রে দক্ষতা লাভ করেন।
আনুষ্ঠানিক পড়ালেখার শুরু থেকেই তিনি ইতিহাস অধ্যয়ন ও সাহিত্য সভায় যোগদানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। দিনের পর দিন তিনি লাইব্রেরীতে অবস্থান করে বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং অনেক আলোচনা সভায়ও অংশ গ্রহণ করেন। এর পর তিনি বিভিন্ন বিদ্বান ব্যক্তির নিকট হতে জ্ঞানার্জন করেন এবং তাঁদের মৌখিক বক্তব্য শ্রবন ও গ্রহণ করতে শুরু করেন। অধ্যয়ন, শ্রবন, শিক্ষা সভায় অংশগ্রহণ প্রভৃতির মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে স্বল্প সময়ে এমন পান্ডিত্য লাভ করেন যে, সেই সময় তিনি জ্ঞানের শীর্ষ আসনে আসীন হতে সক্ষম হন।
এ প্রসঙ্গে আল্লামা আয্ যাহাবী বলেন, ‘‘অধ্যয়ন ও মুখস্থকরণ, শ্রবন ও গ্রহণের মাধ্যমে (জ্ঞানের রাজ্যে ) তিনি এমন নেতৃত্বের আসনে আসীন হন যার উপর নির্ভর করা হত, এমন কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হন যার দিকে (জ্ঞান অর্জনের জন্য) আগমন করা হত, তিনি স্বীয় যুগে একক ও অনন্য হয়ে উঠেন এবং অন্যের জন্য পথ প্রদর্শক হয়ে যান। তিনি এমন বিদ্যাসাগরে পরিণত হন, যার কোন সমকক্ষ ছিলনা, কুরআনের এমন মুফাস্সিরে পরিণত হন যার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলনা, হাদীস শাস্ত্রে এম পারদর্শী হয়ে উঠেন যার সমকক্ষ কেউ ছিলনা এবং এমন মুজতাহিদে পরিণত হন যে এ ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে টিকে থাকার মত কেউ ছিল না।’’
তিনি যায়দিয়া মাযহাবের উপর প্রচুর পড়ালেখা করেন। এ মাযহাবের তিনি এক জন বিজ্ঞ সমঝদার ছিলেন এবং এ মাযহাবের উপর ব্যুৎপত্তি লাভ করেন, লেখেন, ও ফাতওয়া দান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি মাযহাবী তাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণ পরিত্যাগ করে ইজতিহাদে মনোনিবেশ করেন এবং এ বিষয়ে তিনি ‘‘আল কাওলুন মুফীদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত্ তাকলীদ’’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাকলীদ বর্জন করে ইজতিহাদের প্রতি মনোনিবেশ করায় একদল ‘আলিম তাঁর উপর চড়াও হয় এবং তাঁর প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করে। তাঁর ইজতিহাদের কারণে ইয়ামানের সান‘আতে মুকাল্লিদ ও মুজতাহিদ - এ দু’দলের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূচনা হয়।
আশ্ শাওকানীর জ্ঞান এতটাই পরিপক্ক ও তাঁর ধীশক্তি এতটাই প্রখর ছিল যে, অল্প বয়সেই তিনি ইজতিহাদের (চিন্তা-গবেষণার) যোগ্যতা অর্জন করেন। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ আব্দুল হাকীম কাজী বলেন , ‘‘তিনি তাকলীদ প্ররিত্যাগ করে ‘ইলমে ইজতিহাদ বা গবেষণা বিদ্যায় নজর দেন, এমনকি এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করেন। অত:পর ত্রিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পূর্বেই তিনি ইজতিহাদ করা শুরু করেন।’’
বিভিন্ন গ্রন্থ মুখস্থ করণ
আল্লামা আশ্ শাওকানী প্রখর স্মরণ শক্তির অধকারী ছিলেন। দ্রুততম সময়ে তিনি পঠিত বিষয় মুখস্থ করতে পারতেন। ছোট বেলা থেকেই তার স্মৃতি শক্তি ছিল অতুলনীয়। প্রখর ধীশক্তি, ক্ষিপ্র বোধশক্তি, মজবুত ধারন ক্ষমতা এবং অসাধারণ বু&&দ্ধমত্তার ফলে তিনি যতি অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন বিষয়ের অনেক গ্রন্থ মুখস্থ করে ফেলেন। তাঁর মুখস্থকৃত যে সকল গ্রন্থাবলীর সন্ধান পাওয়া যায়, সেগুলোর বর্ণনা নিন্মে প্রদত্ত হলো:
১. কুরআনুল কারীম : ছোট বেলাতেই তিনি তাজবীদসহ কুরআন শিক্ষা করেন এবং তা মুখস্থ করেন। তিনি সান‘আর কিরায়াত বিশেষজ্ঞ শায়খদেরকে কুরআন পাঠ করে শুনান।
২. কিতাবুল আযহার : এটি ইমাম মাহদী রচিত যায়দিয়া মাযহাবের ফিকহ গ্রন্থ।
৩. মুখতাসারুল ফারায়িজ : এটি ‘উসাইফিরি এর লেখা গ্রন্থ।
৪. মিলহাতুল ই‘রাব লিল হারীরী।
৫. আল কাফিয়া। (নাহু শাস্ত্র)
৬. মুখতাসারুল মুনতাহা (উসূলে ফিকহের গ্রন্থ)
৭. আশ্ শাফিয়া (‘ইলমে সরফ)। এ গ্রন্থ চারটির রচয়িতা ‘আল্লাহা ইবনুল হাযিব।
৮. আত্ তাহযীব। এর লেখক ‘আল্লামা তাফতাযানী।
৯. আত্ তালখীস। এটি আল্লামা কাজবীনীর লেখা অলংকার শাস্ত্রের একটি গ্রন্থ।
১০. আল গায়াহ। ইবনুল ইমাম এর লেখক।
১১. মানজুমাহ। আল জাযরীর লিখা ইলমে কিরায়াতের কিতাব।
১২. মানজুমাহ। আল জাযরীর লিখা ছন্দ প্রকরণের গ্রন্থ।
১৩. আদাবুল বাহাছ ওয়াল মুনাযিরা।
১৪. রিসালাতুল ওয়াজা‘। এ গ্রন্থ দুটি ইমাম আজদ কর্তৃক প্রণীত ।
এ সকল কিতাব মুখস্থ করা থেকেই ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর মেধা ও স্মরণ শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি যে প্রখর ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তীক্ষ্ম মেধা ও স্মরণশক্তির বলেই তিনি অল্প সময়ে অনেক বিষয় আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। এক সাথে বহু বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের মূলেও ছিল তাঁর স্মরণশক্তি।
বিভিন্ন শিক্ষকের নিকট অধ্যয়ন
উল্লেখিত গ্রন্থসমূহ মুখস্থ করার পর আল্লামা আশ্ শাওকানী সান‘আর বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিকট বিভিন্ন কিতাব পাঠ করেন। বিষয় ভিত্তিক ব্যুৎপত্তি লাভের জন্য তদানিন্তন যুগের বড় বড় পন্ডিতদের নিকট সংশ্লিষ্ট বিষয় অধ্যয়ন করেন।। কোন্ শিক্ষকের নিকট তিনি কোন্ কোন্ কিতাব অধ্যয়ন করেন বিভিন্ন গ্রন্থে তারও বিবরণ পাওয়া যায়। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো-
১. পিতা ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ ঃ ছোট বেলায় তাঁর প্রথম শিক্ষক ছিলেন পিতা ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ। তাঁর নিকট তিনি শরহুল আযহার ও মুখতাসারুল উসাইফিরি শরাহ শরহুন নাজিরী পাঠ করেন। এতদ্ব্যতীত তাঁর পিতা তাঁকে সহীহ আল বুখারীর পাঠদান করেন।
২. আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ আল হারাযী ঃ এ শিক্ষকের নিকট তিনি ফিকহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এছাড়া শরহে আযহার, শরহে নাজিরী বায়ানু ইবনুল মুজফির প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ করেন। এ শিক্ষকের নিকট তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর শিক্ষা গ্রহণ করেন।
৩. ইসমা‘ঈল ইবনুল হাসান ঃ এ শিক্ষকের নিকট তিনি আরবী সাহিত্য ও নাহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। আল মিলহাহ্ গ্রন্থটি তিনি তাঁকে পাঠ করে শুনান।
৪. ‘আব্দুল্লাহ ইবন ইসমা‘ঈল আল নাহমীঃ এ শিক্ষকের নিকটও তিনি নাহু ও ‘আরবী সাহিত্য পাঠ করেন। কাওয়া‘ঈদুল ই‘রাব ও আযহারী প্রণীত তার শরাহ, সায়িাদ মুফতীর কাফিয়ার শরাহ, কাফিয়ার শরাহ শারহি খুযাইমী, কাজী যাকারিয়ার শারহি ইসাশুজী, আল কাফিল এবং ইবন লুকমান কর্তৃক তার শরাহ, আল আমীর আল হুসাইনের শিফা প্রভৃতি গ্রন্থ তিনি এ শিক্ষককে পাঠ করে শুনান।
৫. আল কাসিম ইবন ইয়াহইয়া আল খাওলানীঃ এ শিক্ষকের নিকটেও তিনি নাহু এবং আরবী পাঠ করেন। তাছাড়া তিনি কাফিয়া, শরহে যুবাইনী, শরহুর রিজা, (কাফিয়ার শরাহ) লুৎফুল্লাহিল গিয়াছ এর শরহি শাফিয়া ও তালখীসুল মিফতাহ, সিরাজী, তাফতাযানী ও ইয়াযদির শরহি তাহযীব, শারহুল গায়াহ, ইবনু দাকীকের ‘উমদাহ্, ইবন হাজারের নুখবাতুল ফিকর ও তার শরাহ্ আর রিসালাতুল আজদিয়া ফি আদাবিল বাহাছ, শরহি তালখীস আল মুখতাসার প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর নিকট পাঠ করেন।
৬. আল হাসান ইবন ইসমা‘ঈল আল মাগরিবীঃ এ শিক্ষকের নিকট তিনি আরবী এবং নাহু ছাড়াও কুতুবের শরহি শামসিয়্যাহ, শরহুল আজদ, তাফসীরুল কাশশাফ ও তার টীকা প্রভৃতি পাঠ করেন এবং মুনজিরীর টীকা সহ সুনানি আবি দাউদ, শরহি নববীর অংশ বিশেষ, খাত্তাবীর মা‘আলীমুস সুনান এর অংশ বিশেষ এবং শরহি ইবন রাসলানের অংশ বিশেষ, আত তানকীছ ফি ‘উলুযিল হাদীছ, শরহি বুলুগুল মারাম প্রতৃতি শ্রবণ করেন।
৭. আব্দুর রাহমান ইবন হাসান আল আকওয়‘াঃ এ শিক্ষকের নিকট তিনি ‘আরবী ও নাহু শাস্ত্র শিক্ষা করেন এবং আল আমীর আল হুসাইনের শিফার প্রথম অংশ শ্রবণ করেন।
৮. ‘আলী ইবন ইবরাহীম ইবন আহমাদঃ এ শিক্ষকের নিকট তিনি সহীহ আল বুখারী পাঠ করেন।
৯. ‘আব্দুল কাদীর ইবন আহমাদঃ এ শিক্ষকের নিকট শাওকানী সহীহ মুসলিম, তিরমিযী ও মুয়াত্তার পূর্ণাংশ এবং নাসাঈ. ইবন মাজাহ, কাজী ইয়াজের শিফা, জামি‘উল উসূল এর একাংশ এবং শারহু জাম‘ইল জাওয়ামি‘ লিল মুহাল্লা ইবন তাইমিয়ার আল মুনতাকী এবং ইবন আবি শরীফের হাশিয়া, নাজরীর শরহুল কালায়িদ ও শরীফের শারহুল মাওয়াফিক আল আজদিয়া আল বাহরুয যুখার, জুইন নাহার ‘আলা শারহিল আযহার, ফাতহুল বারীর একাংশ, যায়নুল ইরাকীর আলফিয়ার অংশ বিশেষ এবং আল জারার এর ছন্দ প্রকরণ গ্রন্থ মানজুমাহ ও তার শারাহ, জাওহারীর সিহাহ ও কামুসের অংশ বিশেষ প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ ও শ্রবণ করেন।
১০. ‘আব্দুর রহমান ইবন কাসিম আল মাদায়ী।
১১. আহমাদ ইবন আমির আল হাদায়ীঃ এ দ’ুজন শিক্ষকের নিকট তিনি শারহুল আযহার পাঠ করেন।
১২. ‘আলী ইবন হাদী আরহাবঃ এ শিক্ষকের নিকট আশ্ শাওকানী শরহুত তালখীস আল মুখতাসারের ভূমিকা, তাফতাযানীর আশ শারহুল মুতুল এবং জালবী ও শরীফের হাশিয়া পাঠ করেন।
১৩. হাদী ইবন হুসাইন আল কারিনীঃ এ শিক্ষকের নিকট তিনি শারহি আল জাযিরিয়া পাঠ করেন।
১৪. ইয়াহইয়া ইবন মুহাম্মাদ আল হুতীঃ শাওকানী এ শিক্ষকের নিকট ফারায়িজ, ওয়াসায়া, ইবনুল হাযিমের মুনাসাখা পদ্ধতি প্রভৃতি শিক্ষা করেণ।
১৫. কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুলহ আল কাবসীঃ তিনি ১১১১ হি. জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি সান‘আর একজন বিশিষ্ট জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। হাদীস শাস্ত্রে তিনি বিশেষ পন্ডিত ছিলেন। আশ্ শাওকানী তাঁর নিকট গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় শ্রবণ করেন এবং তাঁর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন । যদিও তা ছিল অল্প দিনের জন্য। তিনি ১২০১ হি. রবিউল আউয়াল মাসে ইন্তিকাল করেন।
১৬. ‘আল্লামা ‘আব্দুল কাদির ইবন মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন ইবনুন্ নাসির কুকবানী ঃ ১১২৫ হি. তিনি কুকবান নামক স্থানে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত সম্মানী, প্রাজ্ঞ, দ্বীনদার ও উত্তম চরিত্রের ব্যক্তি এবং জনসেবক ছিলেন। দরিদ্র ও বিধবাদের তিনি ভালবাসতেন ও সেবা করতেন। অংক ও ফারায়িজ শাস্ত্রে তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী তাঁর নিকট তাফসীর, হাদীস, ‘আকাইদ, ফারায়িজ প্রভৃতি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ১১৯৮ হি: তিনি ইন্তিকাল করেন।
১৭. সায়্যিদ ইসমা‘ঈল ইবনুল হাসান আশ্ শামীঃ ১১৫৪ হি: তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি একজন বিজ্ঞ পন্ডিত ও সৎ চরিত্রের ব্যক্তি ছিলেন। বিনয়-নম্রতা, সাহসিকতা ও সদাচারের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর নিকট আশ্ শাওকানী বেশ কিছু বিষয় অধ্যয়ন করেন। ১২৩৪ হি. শা‘বান মাসে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
১৮. ‘আল্লামা ইউসুফ ইবন মুহাম্মাদ আয যুবাইদী হানাফীঃ ১১৪০ হি. সালের দিকে অথবা তার কিছু আগে বা পরে তাঁর জন্ম। আশ্ শাওকানী তাঁর নিকট থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কিতাবের পাঠ শ্রবণ করেন। ১২১৩ হি. তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
১৯. ‘আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন আল হুদী আস সান‘আনী ঃ ১১৫০ হি. দিকে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি তাকলীদ বর্জন করেন এবং দলীলের ভিত্তিতে ‘আমলের পক্ষপাতি ছিলেন। ১২১১ হি. তিনি ইন্তিকাল করেন।
২০. ‘আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন সালিহঃ ১১৪৬ হি. তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি সে যুগের একজন বড় সাহিত্যিক ছিলেন। কবিতা ও ইতিহাসে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। আশ্ শাওকানী তাঁর নিকট হতে নাহু ও তাফসীর শিক্ষা করেন। ১২২৪ হি. তিনি মারাযান।
২১. মুহাম্মাদ ইবন হাশিম ইবন ইয়াহ্ইয়া আশ্ শামীঃ ১১৪০ হি. তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। আশ্ শাওকানী তাঁর নিকট হতে নাহু সরফ, অংকশাস্ত্র, তাফসীর, হাদীছ, কবিতা, কাসিদা প্রভৃতি শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১২০৭ হি. তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
২২. মুহাম্মাদ ইবন ইয়াহইয়া আল কাবসীঃ ১১৫৪ হি. জামাদিউল উখরা মাসে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি সান‘আয় আগমন করেন। ১২১৯ হি. রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তিকাল করেন।
২৩. সায়্যিদ নাসির ইবন মুহাম্মাদঃ ১১৫০ হি. জন্ম গ্রহণ করেন। কবিতা ও ছন্দের বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ১২২০ হি. তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
২৪. সায়্যিদ আহমাদ ইবন ইউসুফ যাববারাহঃ ১১৬৬ হি. তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। আশ্ শাওকানী তাঁর নিকট শরহুল ফাকিহী পাঠ করেন। ১২৫২ হি. তিনি ইন্তিকাল করেন।
২৫. সায়্যিদ ‘আব্দুল্লাহ ইবনুল হাসানঃ তিনি ১১৬৫ হি. তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। নাহু, সরফ, মানতিক ও অলংকার শাস্ত্রে তিনি পারদর্শী ছিলেন। ১২১০ হি. জিলকা‘আদ মাসের ৪ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
১৬. সায়্যিদ ‘আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ সান‘আনীঃ ১১৬০ হি. তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ফাতওয়া দান ও জটিল বিষয়ের সমাধানে খুবই পারদর্শী ছিলেন। তিনি ১২৪২ হি. সফর মাসের ২৯ তারিখ শনিবার ইন্তিকাল করেন।
২৭. ‘আল্লামা ‘আলী ইবন সালিহ আল আম্মারী সান‘আনীঃ ১১৫০ বা তার কিছু পূর্বে বা পরে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। সাহিত্য , তাফসীর ও হাদীস শাস্ত্রে তিনি পন্ডিত ছিলেন। তিনি ১২১৩ হি. জামাদিউল উলা মাসের ৭ তারিখ মঙ্গলবার মৃত্যুবরণ করেন।
২৮. ‘আল্লামা ‘আলী ইয়াদুমীঃ ১১৫৮ হি. তিনি সান‘আয় জন্ম গ্রহণ করেন। আলোচনা পর্যালোচনা ও মাসয়ালা -মাসায়িল চয়নে তিনি খুবই দক্ষ ছিলেন। তাঁর সুন্দর সুন্দর পদ্য ও গদ্য লেখা রয়েছে। ১২০৬ হি. তিনি ইন্তিকাল করেন।
২৯. ‘আল্লামা আহমাদ ইবন ইয়াহইয়া (ইমাম মাহদী)ঃ ১১৬০ হি. ইয়ামানের যিমার শহরে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন । সাহিত্য ও জ্ঞানগত আলোচনায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি সান‘আয় গমন করেন এবং ১৩৪৩ হি. সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
৩০. ‘আল্লামা আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ কাতিনঃ ১১৬৩ হি. তার জন্ম । তিনি ইয়ামানের বড় একজন জ্ঞানী ছিলেন। তাঁর নিকট আশ্ শাওকানী নাহু, সরফ, তাফসীর ও হাদীছের শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১২৩৭ হি. তিনি ইন্তিকাল করেন।
৩১. ‘আল্লামা ‘আব্দুল্লাহ ইবন হাসান সান‘আনীঃ তিনি ১১৬৫ হি. সান‘আয় জন্মগ্রহণ করেন ও বড় হন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান ছিলেন। কবিতা লিখায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। ১২১০ হি. জিল কা‘আদ মাসে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
৩২. ‘আল্লামা হুসাইন ইবন ‘আব্দুল্লাহ আল হাবলঃ তিনি ১১৫২ হি. জন্ম গ্রহণ ও ১২৩৫ হি. মৃত্যু বরণ করেন।
৩৩. ‘আব্দুল কাদির ইবন আহমাদ ইবন আব্দুল কাদির ইবন নাসির ঃ ১১৩৫ হি. তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর নিকট আশ্ শাওকানী পূর্ণ সহীহ মুসলিম, শরহে নববী, সহীহ আল বুখারী ও ফাতহুল বারীর অংশ বিশেষ পাঠ করেন। ১২০৭ হি. তিনি ইন্তিকাল করেন।
৩৪. ‘আল্লামা ‘আব্দুল কাদির ইবন আহমাদঃ তিনি ১১৬৪ হি. জন্মগ্রহণ ও ১২১২ হি. মৃত্যু বরণ করেন।
উল্লেখিত শিক্ষকবৃন্দ সে সময়ের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞ পন্ডিত ছিলেন। তাঁদের সাহচর্য লাভ ও তাঁদের নিকট জ্ঞান চর্চ্চা করে আশ্ শাওকানী বিশ্বখ্যাত পন্ডিতে পরিণত হন। একই সময়ে অনেক বিষয়ে বিশেষ পন্ডিত্য আশ্ শাওকানীকে বিশেষ মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছে। এটি তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচায়ক। প্রতিটি বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান ও স্বচ্ছ ধারণাই তাঁকে মুজতাহিদের পথ দেখিয়েছে। ফলে কারো অন্ধ অনুসরণের পরিবর্তে তিনি স্বতন্ত্র চিন্তা শক্তির অধিকারী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
বিদ্যার্জনের জন্য সফর
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী নিজ শহর সান‘আতেই অধ্যয়ন করেন। বিদ্যার্জনের জন্য তিনি অন্য কোন দেশ সফরে যান নি। এর কারণ তার পিতা-মাতা তাঁকে দেশ ছেড়ে ভ্রমণ করার অনুমতি দেন নি। অধিকন্তু তিনি পাঠগ্রহণ ও পাঠদানে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, অন্য কোথাও সফর করার ফুরসত-ই পান নি।
ছাত্র জীবনেই তিনি জ্ঞানী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ফলে বহু শিক্ষার্থী তখন থেকেই তাঁর নিকট বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন। আশ্ শাওকানী তাঁর শিক্ষকদের নিকট শিক্ষা গ্রহণের পাশপাশি শিক্ষাদানের কাজেও আত্ম নিয়োগ করেন। শিক্ষকদের নিকট হতে পাঠ শেষে বের হয়ে তিনি ছাত্রদেরকে পাঠদানের কাজ শুরু করতেন। অনেক সময় শিক্ষকদের নিকট হতে আশ্ শাওকানী বের হওয়ার পূর্বেই তাঁর ছাত্রগণ সমবেত হতেন। মূলত: শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানের কাজে অতি মাত্রায় ব্যস্ত থাকার কারণেই তিনি বাইরে সফর করতে সক্ষম হন নি।


তৃতীয় পরিচ্ছেদ

কর্মজীবন
আমৃত্যু জ্ঞান সাধনার অন্যতম সাধক আল্লামা আশ্ শাওকানীর শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবনকে আলাদা করাই কঠিন। তাঁর কর্মজীবন মূলত শিক্ষা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। তিনি একাধারে লেখক, শিক্ষক এবং মুফতি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সান‘আর বিচারকের দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর ব্যাপারে আল বাদরুত তালি‘ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘‘তিনি অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, ফাতওয়া দান, গ্রন্থ প্রণয়ন প্রভৃতির মাধ্যমে সর্বদা জ্ঞান র্চ্চার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। পিতৃগৃহে বসবাস করে তিনি জ্ঞানী ও সাহিত্যিকদের মজলিসে যোগদান, তাদের সাথে সাক্ষাৎ এবং জ্ঞানের আদান-প্রদানে নিমগ্ন থাকতেন।’’
এ প্রসঙ্গে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর অন্যতম ছাত্র ‘আল্লামা আল মুহসিন ইবনুল হুসাইন আল আনসারী বলেন, ‘‘তিনি সর্বদা ‘ইবাদাত-বন্দেগী, বাহ্যিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের অনুশীলন, বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়ন, দ্বীনি জ্ঞান র্চ্চা ও গ্রন্থ রচনায় রত থাকতেন।’’ তাঁর কর্ম জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে পেশ করা হলে:
শিক্ষকতা
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর কর্মজীবন আবর্তিত হয়েছে শিক্ষাকে কেন্দ্র করেই। তিনি ছাত্র জীবন থেকেই শিক্ষকতার কাজ শুরু করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি শিক্ষকতায় পুরোপুরি আত্ম নিয়োগ করেন এবং অধিকাংশ সময় এ কাজেই ব্যয় করেন। তিনি শিক্ষাদান কাজে এতটাই নিমগ্ন হয়ে পড়েন যে, একদিনেই দশটি বা তার চেয়েও বেশি পাঠদান করতেন। এ প্রসঙ্গে ‘আব্দুল হাকীম কাজী বলেন, ‘‘তিনি অধিকাংশ সময় পাঠদান কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রাখতেন । এমনকি দিনে তাঁর পাঠ দানের সংখ্যা তেরটি পর্যন্ত পৌঁছত।’’ এ প্রসঙ্গে আল্ বাদরুত তালি‘ গ্রন্থে বলা হয়েছে ‘‘ অত:পর তিনি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নিজেকে মুক্ত করে দেন। এবং তাঁর নিকট হতে ছাত্ররা প্রতি দিন বিভিন্ন বিষয়ে দশটির বেশি পাঠ গ্রহণ করেন।
এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, তিনি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কত তৎপর ও আন্তরিক ছিলেন। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল নিরলস। অন্য কোন ব্যস্ততাই তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান
ছাত্র জীবনে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন। শিক্ষকতার জীবনেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মনীষী নির্দিষ্ট কোন একটি বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন না। বরং তিনি একই সাথে বহু বিষয়ের শিক্ষাদান করতেন। তিনি যে সকল বিষয়ে শিক্ষাদান করতেন তার মধ্যে ছিলো :
তাফসীর, উসূলে তাফসীর, হাদীছ, উসূলে হাদীছ, ফিকহ, উসূলে ফিকহ, ‘আরবী সাহিত্য, নাহু, সরফ, বিজ্ঞান, অলংকার শাস,¿ যুক্তিবিদ্যা (মানতিক), তর্কশাস্ত্র, ছন্দ:প্রকরণ বিদ্যা, শরীর বিদ্যা, প্রকৃতি বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, পরিবেশ বিদ্যা প্রভৃতি । তিনি এ শাস্ত্রগুলোর একেকটি বিভিন্ন সময় এবং কোন কোন সময়ে একত্রে অনেকগুলো বিষয় শিক্ষাদান করতেন। তিনি একজন গভীর জ্ঞানের অধিকারী দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁর জ্ঞানের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সুখ্যাতি ও প্রসিদ্ধি লাভ করেন। এ প্রসঙ্গে ‘আব্দুল হাকীম কাজী বলেন , ‘‘সল্প সময়েই তার শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে এবং তাঁর সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।’’
তাঁর খ্যাতিমান ছাত্র বৃন্দ
আশ্ শাওকানী জ্ঞানের জগতে সে যুগের অনন্য ব্যক্তিত্ব ও মুখপাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বহু বিষয়ে তাঁর পরিপক্ক জ্ঞান ছাত্রদেরকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে। তাঁর পান্ডিত্যের গভীরতার সুখ্যাতি এবং শিক্ষক হিসেবে তাঁর সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ায় বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী তাঁর নিকট শিক্ষা লাভের জন্য ভীড় জমায়। বিভিন্ন স্থান থেকে জ্ঞান লাভের জন্য লোকেরা তাঁর নিকট আগমন করত। তিনি তাদেরকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে শিক্ষাদান করতেন। তাঁর এ অকৃপণ জ্ঞান বিতরণের ফলে বহু শিক্ষার্থী পরবর্তী কালে জ্ঞানের জগতে প্রসিদ্ধি লাভ করে ।
‘‘যেমন উসতাদ তেমন শাগরিদ’’ এ প্রবচনের পূর্ণ প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় ইমাম আশ্ শাওকানীর জীবনে। তিনি যেমন উচু মাপের পন্ডিত ছিলেন, তেমনি তাঁর সাহচর্য ও শিক্ষাদানের ফলে ছাত্ররাও বড় বড় পন্ডিতে পরিণত হয় ।
তাঁর নিকট থেকে এত বেশি সংখ্যক ছাত্র শিক্ষা লাভ করে যে, তাদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তাঁর ছাত্রদের অবিকাংশই স্ব- স্ব- ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। তাদের অধিকাংশই ছিল অনুসন্ধিৎসু চিন্তাবিদ, বিচক্ষণ পন্ডিত, গভীর জ্ঞান এবং বিরল মেধা ও মর্যদার অধিকারী ।
নিম্নে তার খ্যাতিমান ছাত্রদের কয়েকজনের বিবরণ পেশ করা হলো :
১। সায়্যিদ ‘আল্লামা ইয়াহইয়া ইবন ইসমা‘ঈল ইবন কাসিমঃ ১১৯০ হিজরীর জামাদিউল উলা মাসে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সান‘আর অন্যান্যদের সাথে তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট আল আজ্দ, ‘শারহুত তাজরীদ, নাইলুল আওতার, শরহি মুন্তাকিউল আখবার, ইত্তিহাফুল আকাবির বি-ইসনাদিদ্ দাফাতির প্রভৃতি গ্রন্থ অধ্যয়ন করে। ১২৬৮ হিজরীর শাওয়াল মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
২। ইয়াহ্ইয়া ইবন ‘আলীঃ ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর ভাই। ১১৯০ হিজরীর ২৮ রজব তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট নাহু, সরফ, মানতিক, ফিক্হ, উসূলে ফিক্হ প্রভৃতির শিক্ষা নেন। ১২৬৭ হিজরীর রমজান মাসে ‘তিনি ইন্তিকাল করেন।
৩। লুতফুল্লাহ ইবন আহমাদ ঃ ১১৮৯ হিজরীর ১৫ শাবান জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট হতে নাহু, সরফ, মানতিক, অলংকার শাস্ত্র, হাদীছ, উসূলে হাদীছ, ফিক্হ প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন। ১২৩২ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
৪। হুসাইন ইবন আহমাদঃ দ্বাদশ শতকের শেষের দিকে জন্মগ্রহণ করেন। নাহু, সরফ, অলংকারশাস্ত্র, তাফসীর, হাদীছ প্রভৃতি বিষয় তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম্র মৃত্যুর সন-তারিখ জানা যায়নি।
৫। হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ ঃ তিনি ১১৮৮ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৩৫ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি নাহু, সরফ, মানতিক, অলংকার শাস্ত্র, উসূল, শারহুর রিজা , শরহি মুন্তাকিউল আখবার প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন।
৬। হুসাইন ইবন আলীঃ ১১৭০ হিজরী বা তার কিছু পরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি নাহু, সরফ, মানতিক, অলংকার শাস্ত্র, উসূল ও শারাহুর রিজা অধ্যয়ন করেন। ১২২৫ হিজরীতে তিনি ইন্তিকাল করেন।
৭। সায়্যিদ ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আলীঃ দ্বাদশ শতকের শেষ অথবা ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে তাঁর জন্ম । তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট আল মুতুল এবং হাদীছ ও তার বিভিন্ন শরাহ অধ্যয়ন করেন। রবিউছ্ছানী, ১২৪২ হিজরীতে তাঁর মৃত্যু হয়।
৮। ‘আল্লামা সালিহ ইবন মুহাম্মাদঃ তার জন্ম সন জানা যায়নি। সম্ভবত দ্বাদশ শতকের শেষের দিকে তাঁর জন্ম। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি হাদীছ ও রিজাল শাস্ত্র, সহীহ আল্ বুখারী, সহীহ্ মুসলিম, আবু দাউদ ও আশ্ শাওকানীর কতিপয় গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। ১২৮৪ হিরজীতে তিনি ইন্তিকাল করেন।
৯। ‘আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন হাসানঃ ১১৭০ হিজরীর পরে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৩৪ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি নাহু, সরফ, মানতিক, অলংকার শাস্ত্র উসূল, হাদীছ এবং ফিক্হ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
১০। ‘আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান সান‘আনীঃ ১১৭০ হিজরীর পরে তার জন্ম। মৃত্যুবরণ করেন ১২১২ হিজরীতে। তিনি আল্লামা আশ্ শাওকানীর নিকট নাহু, সরফ, অলংকার শাস্ত্র ও উসূল অধ্যয়ন করেন।
১১। ‘আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ হারাবীঃ তিনি ১১৯৪ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি হাদীছ তাফসীর, নাহু, সরফ, প্রভৃতি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ১২৪৫ হিজরীতে তিনি ইন্তিকাল করেন।
১২। মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ সান‘আনীঃ ১১৮৬ হিজরীতে তাঁর জন্ম এবং ১২১৩ হিজরীতে মৃত্যু। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি ফারায়িজ, শরহির রিজা, তিরমিযি, আবু দাউদ প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন।
১৩। মুহাম্মাদ ইবন ইসমা‘ঈল আশ্ শামীঃ তিনি ১১৯৪ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১২২৪ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
১৪। মুহসিন ইবন ‘আব্দুল করীমঃ তাঁর জন্ম ও মৃত্যুর সন যথাক্রমে ১১৯১ এবং ১২৬৬ হিজরী। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি শারহুর রিজা, মা‘আনিল লাবীব, কাশ্শাফ প্রভৃতি গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন।
১৫। মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন সা‘আদঃ তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ১১৭৮ হিজরীতে। পুরো ছাত্র জীবন তিনি আশ্ শাওকানীর সাথে কাটান। আন্ নাহরুল মিলহা, আল কাফিল, গায়াতুস সুয়াল প্রভৃতি গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন।
১৬। মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল মুহতাসিবঃ আনুমানিক ১১৭০ হিজরীতে তাঁর জন্ম । তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১২৫৭ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম শিক্ষা লাভ করেন।
১৭। হুসাইন ইবন মুহাম্মাদঃ তাঁর জন্ম ১১৭০ হিজরী এবং মৃত্যু ১২১৯ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি সুনানু আবি দাউদের পাঠ গ্রহণ করেন।
১৮। মুহাম্মাদ ইবন সালিহঃ তিনি ১১৮৮ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যু বরণ করেন ১২৬৩ হিজরীতে।
১৯। মুহাম্মাদ ইবন সালিহ আন নাহমীঃ তাঁর জন্ম ১১৭০ হিজরী এবং মৃত্যু ১২৫১ হিজরীতে।
২০। আলী ইবন ইয়াহইয়াঃ ১১৫৯ হিজরীতে অথবা তার কিছু আগে বা পরে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। মৃত্যুবরণ করেন ১২৩৬ হিজরীতে। তিনি শাওকানীর নিকট তাফসীরে কাশ্শাফ, তাফসীরে ফাতহুল কাদীর, সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন।
২১। সায়্যিদ ইসমা‘ঈল ইবন ইবরাহীমঃ তিনি ১১৬৫ হিজরীতে সান‘আয় জন্ম গ্রহণ করেন। ফিক্হ, হাদীছ, উসূল প্রভৃতি তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট শিক্ষা করেন। ১২৩৭ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
২২। আহমাদ ইবন ইউসুফঃ তিনি ১১৫৫ হিজরীতে সান‘আয় জন্ম গ্রহণ করেন। মুত্যুবরণ করেন ১২৩৭ হিজরীতে। তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট সহীহ আল বুখারী, শরহে মুন্তাকিউল আখবার প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন।
২৩। আহমাদ ইবন লুৎফুল বারীঃ তিনি ১১৯২ হিজরীর রমজান মাসে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুবরণ করেন ১২৮২ হিজরীতে। তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট জুউন্ নাহার, মুহাল্লার শরাহ জাম‘উল জাওয়ামি‘, তাফসীরে ফাতহুল কাদীর ও হাদীছ অধ্যয়ন করেন।
২৪। আহমাদ ইবন ‘আলী আস্ সান‘আনী ঃ তিনি জন্ম গ্রহণ করেন আনুমানিক ১১৯০ হিজরীতে। তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট হতে সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য বিষয়ে পাঠ শ্রবণ করেন। ১২৫৬ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
২৫। সায়্যিদ আহমাদ ইবন ‘আলী সান‘আনীঃ তিনি ১১৫০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১২২৩ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর নিকট তাফসীর, হাদীছ, নাহু, সরফ, মানতিক, উসূল, অলংকার শাস্ত্র প্রভৃতির শিক্ষা নেন।
২৬। আহমাদ ইবন ‘আব্দুল্লাহঃ তিনি ১১৭০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। অবশ্য কারো কারো মতে তাঁর জন্ম সন ১১৭৪ হিজরী। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১২১২ হিজরীর রবিউছ ছানী মাসে। তিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য সান‘আয় গমন করেন এবং মুহাম্মদ ইবন ‘আলী আশ শাওকানীর নিকট শরহুল গায়াহ্ এর পাঠ গ্রহণ করেন।
২৭। আল্লামা আহমাদ ইবন বারিউল্লাহঃ তিনি ১১৫৫ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২১৫ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি শারহি মুন্তাকিউল আখবারে, আদ দুরার প্রভৃতি শিক্ষা করেন।
২৮। ‘আল্লামা হাসান ইবন কাসিমঃ তিনি ১১৭০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১২৭৬ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট হাদীছ ও উসূল শিক্ষা লাভ করেন।
২৯। আল হুসাইন ইবন ইয়াহইয়াঃ তিনি ১১৬০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১২২০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট শিক্ষা লাভ করেন।
৩০। ‘আব্দুল রাহমান ইবন আহমাদঃ ১১৮০ হিজরীতে জন্ম এবং ১২১১ হিজরীতে মৃত্যু।
৩১। ‘আব্দুর রাহমান ইবনুল হাসানঃ তাঁর জন্ম সন অজ্ঞাত। তিনি মৃত্যু বরণ করেন ১২২৪ হিজরীতে। তিনি উসূল, হাদীছ, ফিকহ, ‘আকাইদ, তাফসীর প্রভৃতি শাস্ত্র আশ্ শাওকানীর নিকট শিক্ষা লাভ করেন।
৩২। আল হাসান ইবন আহমাদঃ তাঁর জন্ম ১১৯৪ হিজরীতে এবং মৃত্যু ১২৩৫ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি শরহি মুন্তাকিউল আখবার শিক্ষা করেন।
৩৩। ইসমা‘ঈল ইবন আহমাদঃ তিনি ১১৯৭ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৩৭ হিজরীতে।
৩৪। মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী ইবনুল হাসানঃ ১২২৪ হিজরীতে তিনি ইন্তিকাল করেন। তিনি সান‘আয় আগমন করে আশ্ শাওকানীর নিকট হতে নাহু ও ফিক্হ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
৩৫। আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ বাহলাকীঃ তিনি ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর অন্যতম ছাত্র ছিলেন। তিনি ১১৯১ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১২২৮ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।
৩৬। ‘আব্দুল্লাহ ইবন শরফুদ্দীনঃ ইমাম আশ্ শাওকানীর এ ছাত্র তাঁর নিকট মিশ্কাত ও অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। ১১৭০ হিজরীতে তাঁর জন্ম ।
৩৭। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মুহসিন: তিনি ১১৭০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি উসূল শাস্ত্র, শরহি গায়াতুস সুয়াল, তাফসীর প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন।
৩৮। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদঃ আনুমানিক ১১৯০ হিজরীর কিছু পরে তার জন্ম। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি অলংকার শাস্ত্র, তাফসীর, সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, আবুদাউদ এবং আশ্ শাওকানীর লেখা কতিপয় গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। ১২৪১ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করে।
৩৯। ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব ইবন হুসাইনঃ এ ছাত্র আশ্ শাওকানীর সাথে সার্বক্ষণিক অবস্থান করে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ১২০০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১২৩৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন ।
৪০। ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব ইবন মুহাম্মাদঃ ১১৮৪ হিজরীর জামাদিউল উলা মাসে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। মৃত্যুবরণ করেন ১২৩৫ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি তাফসীর, হাদীছ, ফিক্হ, উসূল প্রভৃতি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
৪১। ‘আলী ইবন আহমাদঃ তিনি ১১৮০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। ১২৩৫ হিজরীর রজব মাসে তিনি ইন্তিকাল করেন। আল কাশ্শাফ, আল মুতুল, শারহি মুন্তাকিউল আখবার ও অন্যান্য গ্রন্থ তিনি আশ্ শাওকানীর নিকট অধ্যয়ন করেন।
৪২। মুহাম্মাদ ইবন ‘ইয্যুদ্দীনঃ তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ১১৮০ হিজরীতে এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৩২ হিজরীতে। তিনি দীর্ঘদিন আশ্ শাওকানীর নিকট অবস্থান করে নাহু, সরফ, মানতিক, বালাগাত , হাদীছ, ফিকহ, উসূল প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন।
৪৩। মুহাম্মাদ ইবন ‘আলীঃ তিনি হিজরী ১১৯৪ সনে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৬৪ হিজরী সনের জমাদিউল উলা মাসে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি আল উম্মাহাতুস সিত্তু, আল আজদ, আল মুতুল, আল কাশ্শাফ প্রভৃতি এবং শাওকানীর প্রণীত অধিকাংশ গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন।
৪৪। মুহাম্মাদ ‘আবিদ ইবন আলীঃ ১১৯০ হিজরীতে তাঁর জন্ম। তিনি ১২৫৭ হিজরীতে মাদীনা মুনাওয়ারাতে মৃত্যুবরণ করেন। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি হিদায়াতুল আবহুরী ও তার শরাহ্ আল মুবাইদী অধ্যয়ন করেন।
৪৫। ‘আল্লামা মুহাম্মাদ আল কারদীঃ তিনি ১১৮৮ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৪৮ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি নাহু সরফ, মানতিক, বালাগাত, তাফসীর, হাদীছ, সায়লুল হারায প্রভৃতি শিক্ষা লাভ করেন।
৪৬। ‘আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদঃ তিনি ১১৭৮ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১২৫১ হিজরীতে। আশ্ শাওকানীর নিকট তিনি নাহু, সরফ, মানতিক, বালাগাত, উসূল, হাদীছ প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন ।
৪৭। ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ আশ্ শাওকানীঃ তিনি ‘আল্লামা শাওকানীর পুত্র। ইয়ামানের শাওকান নামক স্থানে ১১৭৮ হিজরীতে রবিউল আউয়াল মাসের শুক্রবার তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি পিতা আশ্ শাওকানীর নিকট নাহু, সরফ, কুরআন , তাফসীর, হাদীছ, ফিকহ, উসূল, ‘আকাইদ প্রভৃতি শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ছিলেন ইয়ামানের বড় পন্ডিতদের একজন। তিনি ইতিহাস ও ফাতওয়া দানে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি তড়িৎ মুখস্থকরণ শক্তি, মজবুত বোধশক্তি এবং সূক্ষ্ণ সমঝশক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি ১২৫০ হিজরী জামাদিউল উলা মাসে পিতার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন।
৪৮। শায়খ ‘আব্দুল হক ইবন ফাজলুল হিন্দীঃ তিনি ১১৮২ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১২৫৭ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
৪৯। মুহাম্মাদ ইবন নাসির আল হাযেমীঃ তিনি ১১৮৭ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৫৭ হিজরীতে
৫০। হুসাইন ইবন মুহসিনঃ তিনি ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর মূল ছাত্রদের একজন। ইয়ামানের সান‘আতে ১১৮০ হিজরীতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। নাহু, সরফ, মানতিক, ফিকহ, উসূল, হাদীছ, তাফসীর প্রভৃতি শাস্ত্র ও বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। নাইলুল আওতারের ভূমিকায় আশ্ শাওকানীর জীবনী তিনি লিখেন । ১২৫৫ হিজরীতে তিনি ইন্তিকাল করেন।
৫১। মুহাম্মাদ ইবন হাসান ঃ তিনি ১১৮২ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৪৮ হিজরীতে।

‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর অসংখ্য ছাত্রের মধ্য হতে উপরে প্রসিদ্ধ কয়েকজনের বিবরণ পেশ করা হলো। এত বিপুল সংখ্যক ছাত্রকে বহু সংখ্যক বিষয়ে পাঠ দান থেকে অনুধান করা যায় যে, তিনি প্রায় সকল বিষয়ে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। এখান থেকে এও অাঁচ করা যায় যে, তিনি একজন অতিঁউচু মাপের শিক্ষক ছিলেন। তিনি দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে শিক্ষা দান করতেন বলেই সে ময়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ তাঁর নিকট শিক্ষা লাভের জন্য ভীড় করতেন। জ্ঞান বিস্তারে তাঁর অসাধারণ অবদান চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছে এবং তাঁকেও চির স্মরণীয় করে রেখেছে।
জ্ঞান বিস্তারে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মুহাম্মাদ আব্দুল হাকীম কাজী বলেন, ‘‘অধিকাংশ সময় তিনি নিজেকে শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত রাখেন। তাফসীর, উসূলে তাফসীর, হাদীছ, উসূলে হাদীছ, ফিক্হ, উসূলে ফিকহ, ‘আরবী সাহিত্য, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর শিক্ষাদান কার্যক্রম ব্যাপক ব্যাপ্তি লাভ করে এবং চতুর্দিকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।’’
২। ফাতওয়া দান
‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর দ্বীনী খেদমতসমূহের অন্যতম ছিল ফাতওয়া দান। অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি সান‘আবাসীকে বিভিন্ন বিষয়ে ফাতওয়া দান করতেন। ফাতওয়া দানে বিশেষ পারদর্শিতার কারণে অল্প সময়েই তিনি প্রদিদ্ধি লাভ করেন। ফলে সান‘আ ছাড়াও তিহামা এবং অন্যান্য স্থান থেকেও লোকেরা তাঁর নিকট ফাতওয়ার জন্য আগমন করতো। তিনি স্বীয় ইজতিহাদ ও জ্ঞান গবেষণার দ্বারা ফাতওয়া প্রদান করতেন এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতেন। ২০ বছর বয়স থেকেই তিনি ফাতওয়া দান কার্যক্রম শুরু করেন।
ফাতওয়া প্রদানের বিনিময়ে তিনি কোন সম্মানী বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। কেউ কোন বিনিময় প্রদানের জন্য পীড়াপীড়ি করলে তিনি বলতেন, আমি কোন বিনিময় ছাড়াই জ্ঞান আহরণ করেছি। সুতরাং তা আমি বিতরণও করবো সেভাবেই।’’ মৌখিকভাবে প্রশ্ন করা ছাড়াও বহু লোক তাঁর নিকট লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠাতেন। ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী লিখিতভাবে সেগুলোর জবাব দিতেন। তাঁর প্রদত্ত ফাতওয়া ও লিখিত জবাবসমূহের যে সংকলন রয়েছে , তা বড় তিনটি খন্ডে রূপলাভ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘‘আল ফাতহুর রববানী ফি ফাতওয়া আশ্ শাওকানী’’। লেখক ও শিক্ষক হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভের পাশাপাশি তিনি মুফতী হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি ও প্রসিদ্ধি লাভ করেন। এ প্রসঙ্গে এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলামে বলা হয়েছে, ‘‘Muhammad B. Ali b. Muhammad war a writer, teacher and mufti in San`a” ‘‘মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ সান‘আর একজন লেখক, শিক্ষক ও মুফতী ছিলেন।’’
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী ইসলামী আইনে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। ইসলামী আইনের ব্যাখ্যা ও বিভিন্ন বিষয়ে আইনী সমাধানে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। ফলে তিনি আইনজ্ঞ বা মুফতি হিসেবে সবার নিকট অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও আস্থাভাজন ছিলেন।
গ্রন্থ রচনা
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী একজন ঁউচুমাপের লেখক ছিলেন। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর জ্ঞানের ব্যাপক ব্যাপ্তির মত লেখনীও ছিল ব্যাপক বিস্তৃত। সমকালীন প্রায় সকল বিষয়ের উপরই তিনি কলম ধরেছিলেন। তাফসীর, হাদীছ, উসূলে হাদীছ, উসূলে ফিকহ ‘আকাইদ, আহকাম, ফাতওয়া, সাহিত্য, কবিতা, ব্যাকরণ ও অলংকারশাস্ত্র, বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধীদের জবাবদান, মানতিক, ইতিহাস, জীবনীগ্রন্থ, রিকাক, (চমক প্রদ বর্ণনা) পরিচিতিমূলক উপাখ্যান প্রভৃতি বহু বিষয়ে তিনি লিখেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি ছোট-বড় একশতটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘আল্লামা ‘আব্দুর রাহমান আল আহদাল বলেন, ‘‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর প্রণীত গ্রন্থের সংখ্যা ১১৪টি।
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী ব্যাপক ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন গবেষক ও চিন্তাবিদ। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লব্ধ জ্ঞান ও
চিন্তাধারাকে লোকদের নিকট পৌছানোর জন্যই তিনি গ্রন্থ প্রণয়নে মনোনিবেশ করেন। আশ্ শাওকানীর লেখা ‘‘আল্ বাদরুত তালি‘’’ ২য় খন্ডে এবং ‘‘নাইলুল আওতার’’ ও ‘‘ফাতহুল কাদীর’’ এর ভূমিকায় তাঁর লিখিত গ্রন্থের বিবরণ পাওয়া যায় । তাছাড়া জালালউদ্দীন তাঁর এম.ফিল. গবেষণাপত্র ‘‘আল্লামা আশ্ শাওকানী আব কারিয়্যাতুহু ওয়া মানহাজুহু ফি তাফসীরিহি’’ তে আশ্ শাওকানীর প্রণীত গ্রন্থের বিবরণ দিয়েছেন। পর্যালোচনায় দেখা যায় যে এ সকল গ্রন্থের মধ্যে কতগুলো মূল গ্রন্থ, আবার কতগুলো বিভিন্ন বিষয় বা আহকামের বিভিন্ন শাখা- প্রশাখার উপর লিখিত রিসালাহ বা ক্ষুদ্র পুস্তিকা। এ ক্ষুদ্র পুস্তিকা গুলোর কোনটি নির্দিষ্ট বিষয়ের লিখিত ফাতওয়া, কোনটি লিখিত প্রশ্নের লিখিত জবাব, কোনটি নির্দিষ্ট কোন বিষয়ের উপর লেখা, কোনটি বিরোধীদের যুক্তি খন্ডন করে লেখা, আবার কোনটি ভ্রান্ত মতবাদের অসারতা প্রমাণে লেখা।
তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্য হতে কয়েকটির নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ
ফাতহুল কাদীর আল জামিউ বাইনা ফানিয়্যির রিওয়ায়াহ ওয়াদ দিরায়াহ মিন উলুমিত তাফসীর, নাইলুল আওতার শারহিল মুন্তাকিউল আখবার, আল ফাওয়ায়িদুল মাজমু‘আ ফিল আহাদিছিল মাওজু‘আ, ইত্তিহাফুল আকাবির বি ইসনাদিদ দাফাতির, আদ দারারিয়্যুল মাজিয়াহ শারহুদ দুরারুল বাহিয্যাহ, আত্ তা‘আক্কুবাতু ‘আলাল মাওজু‘আত, আদ্ দুরারুল বাহিয়্যাহ ফিল মাসয়িলিল ফিকহিয়্যাহ, আহকামুল ইসতিজ্মার, আল কালামু আলা উজুবিস সালাত আলান নাবিয়্যি ফিস সালাত, আল কাওলূস সাদিক ফি ইমামাতিল ফাসিক, হুকমুত তালাকি ছালাছান, আততালাকুল বিদ‘ঈ, ইরশাদুস সায়িল ইলা দালায়িলিল মাসায়িল, আস সায়লুল জারার ‘আলা হাদায়িকিল আযহার, আদ্ দুরারুন নাজিদ ফি ইখলাছিত তাওহীদ, আল মাবাহিছুদ্ দুর্রিয়্যা ফিল মাসয়ালাতিল হাযারিয়্যাহ, ইরশাদুল ফুহুল ইলা তাহকীকিল হাক্কি ফি ‘উলুমিল উসূল, আল কাওলুল মুফীদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত তাকলীদ, মুনতাহিউল ‘আরব, আল ফাতহুর রববনী ফি ফাতবিয়িশ শাওকানী, ইরশাদুছ ছিকাত ইলা ইত্তিফাকিশ শারাযি‘ঈ আলাত তাওহীদ ওয়াল মিয়াদ ওয়ান নুবুওয়্যাত, তুহফাতুয যাকিরীন বি‘ইদ্দাতিল হিসনুল হাসীন মিন কালামি সায়্যিদিল মুরসালীন, আর রাওজুল ওযাসী‘ ফিদ দালীলি ‘আলা ‘আদামি ইনহিসারি ‘ইলমিল বাদী‘, বাহছু ফির রাদি ‘আলায যামাখশারী ফি ইস্তিহসা্নি বায়তির রাবাহ, নুযহাতুল ইহদাক ফি ‘ইলমিল ইশতিকাক,আল কাওলুল হাসান ফি ফাজায়িলি আহলিল ইয়ামান, আল কাওলুল মাকবুল ফি ফায়জানিল গুয়ুল ওয়াস সুয়ুল, আল বাদরুত তালি‘ বি-মাহাসিনি মিম বা‘দিল কারনিস সাবি‘, আল ই‘লামু বিল মাশায়িখিল আ‘লাম ওয়াত তালামিযাতুল কিরাম, আল বাহছু ফিল আ‘মাল, হাশিয়াতু শিফায়িল ‘আওয়াম, আল মুখতাসারুল বাদী‘ ফিল খালকিল ওয়াসী‘, আল মুখতাসারুল কাফী মিনাল জাওয়াবিশ শাফী, ফাতহুল কাদীর ফিল ফারকি বায়নাল মা‘যিরাতি ওয়াত তা‘যির, বুগিয়াতুল আরীব মিম মুগনীয়িল লাবীব, কিফায়াতুল মুহতায, রাফ‘উল খিসাম ফিল হুকমি বিল ‘ইলমি মিনাল আহকাম, ইজাহুদ দালালাত ‘আলা আহকামিল খিয়ারাত, দাফউল ই‘তিরাজাত ‘আলা ইজাহিদ দালালাত প্রভৃতি।
আল্লামা আশ্ শাওকানীয় লিখিত ছোট-বড় বিশাল সংখ্যক গ্রন্থ থেকেই তাঁর জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করা যায়। তিনি যে বহু মাত্রিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর বহু বিষয়ে লেখার দ্বারাই। গভীর জ্ঞানের অধিকারী ও জ্ঞান-গবেষণার মূর্ত প্রতীক এ মনীষী তাঁর ক্ষুরধার লেখনির সাহায্যে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক স্থায়ী খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, তাঁর লেখা স্বপ্ল সংখ্যক গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে এবং অধিকাংশেরই কোন সন্ধ্যান পাওয়া যায় না।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে তাফসীরে ফাতহুল কাদীর, নাইলুল আওতার শরহি মুন্তাকিউল আখবার, আল বাদরুত তালি‘, ফাতহুর রববানী, আল ই‘লাম বিল মাশায়িখিল আ‘লাম ওয়া তালামিযাতুল কিরাম, আল কাসায়িসুস সালফিয়্যা, আদ দারারিয্যুল মাজিয়াহ, আল কাওলুল মুফীদ ফি হুকমিত তাকলীদ, আত্ তাহফু বি মাযহাবিস সালফ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
নিম্নে নাইলূল আওতার ও ফাতহুল কাদীর গ্রন্থদ্বয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো :
নাইলুল আওতার : এ গ্রন্থটি ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর এক অনন্য সৃষ্টি। গ্রন্থটির পূর্ণ নাম ‘‘নাইলুল আওতার শরহি মুন্তাকিউল আখবার মিন আহাদীছি সায়্যিদিল আখইয়ার’’। ৮ খন্ডে প্রকাশিত এটি এক বিশাল গ্রন্থ। এ গ্রন্থে লেখক হাদীছের আলোকে শারী‘আর বিধানাবলী সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটি বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে বিভক্ত। গ্রন্থটি অত্যন্ত সুবিন্যস্ত ও চমৎকার অনুক্রমিক ধারায় সজ্জিত। এ গ্রন্থের ভাষা সহজ-সরল, সাবলীল ও প্রাঞ্জল। সাহিত্য বিচারে এটি অত্যন্ত উঁচুমানের গ্রন্থ। গ্রন্থটি ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর হাদীছ ও আহকামে শারী‘আর গভীর জ্ঞান, অগাধ পান্ডিত্য ও শারী‘আর আহকাম চয়নে সূক্ষ্মদর্শিতা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ বহন করে।
গ্রন্থটি প্রাচীন হলেও আধুনিক যুগের গ্রন্থের ন্যায় রেফারেন্স বা তথ্যসূত্র সমৃদ্ধ। এটি অধ্যয়নে বিষয় ভিত্তিক প্রায় সকল হাদীছের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। গ্রন্থটিতে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী আলোচনার যে রীতি অবলম্বন করেছেন, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

১. মূল হাদীছ উল্লেখ : এ গ্রন্থে লেখক সর্বপ্রথম মূল হাদীছ (একটি বা একসাথে একাধিক) উদ্ধৃত করেছেন। অত:পর হাদীছটি বা হাদীছগুলো কোন্ গ্রন্থে কিভাবে কোন্ কোন্ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তার বর্ণনা দিয়েছেন। কোন্ গ্রন্থে পরিবর্তিত কোন্ শব্দে বা বাক্যাংশে বর্ণিত হয়েছে, তাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
২. সনদ পর্যালোচনা : হাদীছের সনদ বা সূত্র পরম্পরা পর্যালোচনা করে লেখক বর্ণনাকারীদের অবস্থা নির্ণয় করেছেন। কোন্ রাবী বা বর্ণনাকারী দুর্বল, কোন্ রাবী নির্ভরযোগ্য তা চিহ্ণিত করেছেন এবং দুর্বল বা নির্ভরযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে হাদীছ বিশেষজ্ঞগণের মতামত কি তাও উল্লেখ করেছেন।
৩. শব্দ বিশ্লেষণ : প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ বিশেষ শব্দ ও বাক্যাংশের বিশ্লেষণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি
ক. শব্দস্থিত বিভিন্ন বর্ণের হরকত (স্বরচিহ্ণ) কি হবে তা বর্ণনা করে শব্দের সঠিক উচ্চারণ নির্ণয় করেছেন। সংশ্লিষ্ট শব্দের ব্যাপারে ভাষাবিদদের বিভিন্ন মতামতও তিনি তুলে ধরেছেন।
খ. শব্দটি কোন্ শব্দমূল বা ধাতু হতে নিষ্পন্ন হয়েছে এবং কিভাবে তার রূপান্তর হয়েছে, তা পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন।
গ. ক্ষেত্র বিশেষে শব্দটির ব্যাকরণগত অবস্থান কি, তা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন।
ঘ. শব্দের অর্থ ও উদ্দেশ্য কি তাও বর্ণনা করেছেন। শব্দটি কি কি অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং বর্ণিত ক্ষেত্রে এর প্রযোজ্য অর্থ কি, মর্মার্থ বা উদ্দিষ্ট অর্থ কি প্রভৃতি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। শব্দটির প্রয়োগ, অর্থ বা গৃহীত উদ্দেশ্যের ব্যাপারে ভাষাবিদ ও হাদীছ বিশারদদের যে সকল মতামত রয়েছে, তিনি সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।
ঙ. কোন অর্থটি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সঠিক এবং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য কি, সেটি উল্লেখ করেছেন ও তার স্বপক্ষে কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন প্রায়োগিক প্রমাণ উপস্থাপন করে তা সুদৃঢ় করেছেন। মোট কথা ভাষাতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও শব্দ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি হাদীছ ও তার বিভিন্ন শব্দকে পাঠকদের নিকট সহজবোধ্য করে পেশ করেছেন।
৪. সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্যান্য হাদীছ উপস্থাপন : ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী এ গ্রন্থে মূল হাদীছ উল্লেখের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্যান্য আরো অনেক হাদীছ একত্রিত করেছেন। ফলে পাঠকবর্গ একই সাথে একই বিষয়ের অনেক হাদীছের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করতে পারেন।
৫. হাদীছের হুকুম নির্ণয় : এ গ্রন্থে লেখক হাদীছ থেকে কি কি হুকুম নির্ধারিত হয় তারও বিবরণ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট হুকুমের ব্যাপারে ইমাম ও মুহাদ্দিছগণের বিভিন্ন অভিমত এবং অভিমতসমূহের স্বপক্ষে কি কি দলীল রয়েছে, তারও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। দলীলগুলো পর্যালোচনান্তে কোন্ অভিমতটি সঠিক এবং সঠিক হওয়ার কারণ কি তাও উল্লেখ করেছেন। নাইলুল আওতার মূলত: একটি হাদীছ গ্রন্থ। কিন্তু লেখক এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, শারী‘আর সঠিক আহকাম জানার ক্ষেত্রে এটি একটি নির্ভুল উৎসে পরিণত হয়েছে।
ফাতহুল কাদীর : এর পূর্ণ নাম ‘‘ফাতহুল কাদীর আল্ জামি‘উ বায়না ফানিয়্যিও রিওয়াইয়াতি ওয়াদ্ দিরাইয়াতি মিন ‘ইলমিত্ তাফসীর’’। ১২২৩ হিজরীর রবী‘ঊল উখরা মাসে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী এ তাফসীর লেখা শুরু করেন এবং ১২২৯ হিজরীর রজব মাসে এটি লেখা সম্পন্ন করেন।১৩৪ক ফাতহুল কাদীর তাফসীর শাস্ত্রের এক মৌলিক গ্রন্থ। এটিকে সাধারণ কোন তাফসীর নয়, বরং তাফসীর শাস্ত্রে বুনিয়াদী ও মূলনীতি সম্বলিত গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ প্রসঙ্গে ইমাম আয্ যাহাবী বলেন,
يعةبر هذا الةفسير اصلا من اصول الةفسير و مرجعا مهما من مراجعه لانه جمع بين الةفسير بالدراية و الةفسير بالرواية فاجاد في باب الدراية و ةوسع في باب الرواية
‘‘এ তাফসীরকে তাফসীর শাস্ত্রের অন্যতম মূলনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ, তিনি এ তাফসীরে বুদ্ধিবৃত্তি ও বর্ণনার সমাহার ঘটিয়েছেন। এ গ্রন্থে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং বর্ণনার ক্ষেত্রকে করেছেন সুপ্রশস্ত।১৩৪খ

১৩৪ ক. আয্ যাহাবী, আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন, খ.ু২, পৃ. ২৫০।
১৩৪ খ. প্রাগুক্ত।

এ তাফসীরের বৈশিষ্ট্য : তাফসীরটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো বুদ্ধিবৃত্তি ((الدراية ও বর্ণনা (الرواية) কে একত্রিকরণ। ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী এ তাফসীরে একদিকে কুরআনের বিভিন্ন শব্দ ও অর্থ বিশ্লেষণ পূর্বক বুদ্ধিবৃত্তিক যৌক্তিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, অপরদিকে হাদীছ ও বিভিন্ন তাফসীরকারকের বর্ণনাকে একত্রিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আশ্ শাওকানী নিজেই উল্লেখ করেন, ‘‘অধিকাংশ তাফসীরবিদ দু’ভাগে বিভক্ত এবং তাঁরা দু’ধরনের পন্থা অবলস্বন করেছেন। একদল তাঁদের তাফসীরে শুধুমাত্র রিওয়ায়াত (বর্ণনা) উপস্থাপন করেছেন, পক্ষান্তরে অপর দল শুধুমাত্র অর্থ ও ভাষাতত্ত্বের দিকেই দৃষ্টিপাত করেছেন, বর্ণনার দিকে দৃষ্টিপাত করেননি। যতটুকুও করেছেন, সেগুলোর আবার বিশুদ্ধতা-অশুদ্ধতা নির্ণয় করেননি। এ দু’ দলই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সঠিক ও সুবিস্তৃত আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁরা অন্য একটি দিক বর্জন করায় তা পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে উভয় বিষয়কে একত্রিত করা অত্যন্ত জরুরী। এ উদ্দেশ্যেই আমি এ বিষয়ে মনোনিবেশ করেছি এবং এ পদ্ধতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।১৩৪গ
এ তাফসীরে আশ্ শাওকানীর অবলম্বিত পদ্ধতি : ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী তাঁর এ প্রসিদ্ধ তাফসীরে যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন, তা নিম্নে বর্ণিত হলো :
১. শানে নুযূল বর্ণনা : এ তাফসীর গ্রন্থে আশ্ শাওকানী কুরআনের আয়াত উল্লেখের পর প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নাযিলের প্রেক্ষাপট বা শানে নুযূল বর্ণনা করেছেন।
২. অর্থ বর্ণনা ও ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা : আশ্ শাওকানী তাঁর এ তাফসীরে অন্যান্য তাফসীরবিদদের মত অর্থের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি শব্দের বিভিন্ন অর্থ, উদ্দিষ্ট মর্ম. শব্দের মূল ধাতু, ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত, আলংকারিক প্রয়োগ প্রভৃতি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন।
৩. কিরাআত : শব্দের কিরাআত বা পঠনরীতি আলোচনা তাফসীর শাস্ত্রেও এক স্বীকৃত রীতি। ‘‘আল্লামা আশ্ শাওকানী এ বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কিরাআতের বিভিন্ন রূপের বর্ণনা দিয়েছেন।

১৩৪ গ. প্রাগুক্ত।
কোন্ কিরাআত কোন্ কারীর সাথে সম্পর্কিত তা উল্লেখ করেছেন এবং কোন্ কিরাআতটি প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য তাও নির্দেশ করেছেন। তিনি বিভিন্ন শব্দস্থিত বর্ণের হরকত বা স্বরচিহ্ণের বর্ণনা দিয়ে সঠিক কিরাআত বা উচ্চারণ কী তা নির্ধারণ করেছেন।
৪. হাদীছ ও অন্যান্য বর্ণনার উদ্ধৃতি: পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আশ্ শাওকানী বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পাশাপাশি রিওয়ায়াত বা বর্ণিত প্রমাণাদিও উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রথমত: রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিত হাদীছের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। অত:পর সাহাবায়ে কিরামের, তৎপর তাবি‘ঈগণের, তারপর তাবি‘ তাবি‘ঈগনের এবং সর্বশেষ পরবর্তী নির্ভরযোগ্য ইমামগণের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। তিনি হাদীছের সনদ বিশ্লেষণ কওে সেগুলোর শুদ্ধতা-অশুদ্ধতাও নির্ণয় করেছেন। তবে এতদসত্ত্বেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীছ এমনকি কতিপয় জাল হাদীছও তাঁর তাফসীওে স্থান পেয়েছে। অবশ্য এর ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। এ তাফসীরের ভূমিকায় তিনি বলেছেন,
و قد اذكر الحديث معزوا الي راويه من غير حال الاسناد لاني اجدهع في الاصول التي نقلت عنها كذلك
‘‘অবশ্য আমি কিছু হাদীছ সনদের অবস্থা পর্যালোচনা ছাড়াই শুধু বর্ণনাকারীর সাথে সম্পর্কিত করে বর্ণনা করেছি। কারণ যে মূল তাফসীর থেকে তা আমি বর্ণনা করেছি, সেখানে সেগুলোকে এভাবেই পেয়েছি।’’১৩৪ঘ
৫. ফিকহী মাসয়ালা আলোচনাঃ আহকাম সংক্রান্ত আয়াতসমূহের তাফসীর করতে গিয়ে তিনি সেগুলোর মাসায়ালা মাসায়িল এর বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেছেন। আয়াত থেকে হুকুম বর্ণনা করার পর সে বিষয়ে ইমামগণের মতভেদ উল্লেখ করেছেন এবং তাঁদের মতের স্বপক্ষে কী কী দলীল রয়েছে সেগুলোও উল্লেখ করেছেন।
অতঃপর তিনি নিজস্ব মতের ভিত্তিতে যেটিকে সঠিক মনে করেছেন সেটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেহেতু তিনি মুজতাহিদ ছিলেন সেহেতু নিজেই চিন্তা-গবেষণা করে হুকুম চয়ন ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোন একটিকে প্রাধান্য দিতে সক্ষম ছিলেন।
১৩৪ ঘ. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ১৩০-১৩১।
৬. দ্বন্দ্ব নিরসনঃ যে সকল ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী তাফসীর বা ব্যাখ্যা রয়েছে, সে সকল ক্ষেত্রে আশ্ শাওকানী যৌক্তিকভাবে তার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি যথাসম্ভব বৈপরিত্য দূর করে সঠিক দিকটি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
৭. ভ্রান্ত মত ও ব্যাখ্যার জবাব দানঃ যে সকল ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের অধিকারীরা কুরআনের অপব্যাখ্যা করে তাদের ভ্রান্ত চিন্তার পক্ষে কুরআনকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন - বিশেষ করে মুতাযিলা সম্প্রদায় - সেগুলো তিনি উল্লেখ করেছেন এবং সঠিক ব্যাখ্যা ও যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে সেগুলোর ভ্রান্তি তুলে ধরে জবাব দিয়েছেন ও সঠিক মত কোনটি তা প্রমাণ করেছেন।
মোট কথা এটি এমন এক তাফসীর গ্রন্থ যেখানে প্রায় সকল বিষয়ের সমাহার ঘটেছে। ফলে এটি অনন্য ও চমৎকার একটি তাফসীরের রূপ লাভ করেছে।
বিচারকের দায়িত্ব পালন
জ্ঞানের প্রতি অতি মাত্রায় আসক্তির কারণে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী দুনিয়ার প্রতি ছিলেন নিরাসক্ত। ফলে তিনি রাষ্ট্রীয় কার্য, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব বা দুনিয়াদার ব্যক্তিবর্গের সংসর্গে আসার সুযোগ পাননি। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি রাষ্ট্রীয় কর্ম কান্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে বাধ্য হন।
পূর্ববর্তী বিচারকের মৃত্যুর পর ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীকে সান‘আর বিচারকের পদে সমাসীন করা হয় । তাঁর বয়স যখন ৩০ এবং ৪০ এর মাঝামাঝি তখন তিনি বিচারক পদে নিয়োজিত হন। বিচারক নিযুক্তির পর হতে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এ পদে কর্মরত ছিলেন। জ্ঞান চর্চার প্রতি আশ্ শাওকানীর এতটাই uঁঝাক ছিল যে, বিচারকের মত ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন সত্বেও তিনি জ্ঞান চর্চা পরিহার করেন নি।
ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণ
অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, গবেষণা, গ্রন্থ রচনা, বিচার কার্য পরিচালনা প্রভৃতি নানাবিধ ব্যস্ততা সত্বেও ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী দাওয়াতী দায়িত্বের কথা বিস্মৃত হননি। বরং তিনি এর মাঝেও দ্বীনের দা‘ওয়াত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর দা‘ওয়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল লিখনী । কিন্তু এর পাশ পাশি তিনি মৌখিক দাওয়াতের মাধ্যমেও দ্বীনের সম্প্রসারণ কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। তিনি জ্ঞান বিস্তারের সাথে সালে দ্বীনী দা‘ওয়াত বিস্তারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এতদ্ব্যতীত যে বিশাল সংখ্যক ছাত্র তাঁর নিকট অধ্যয়ন করতেন, তাঁদেরকে তিনি শিক্ষাদানের পাশাপাশি দা‘ওয়াত সম্প্রসারণের কাজেও নিয়োজিত করেন। এ প্রসঙ্গে জালাল উদ্দীন বলেন, ‘‘তিনি তাঁর ছাত্রদেরকে দ্বীনের সম্প্রসারণ ও কুরআনের দা‘ওআত প্রদানের জন্য বিভিন্ন দিকে প্রেরণ করে দ্বীনের এক মহান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।’’ এভাবে মৌখিক, লিখিত ও শিষ্যদের মাধ্যমে দ্বীন ও কুরআনের দা‘ওআত সম্প্রসারণের যে পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন তা নি:সন্দেহে অনুকরণীয়।
‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর কর্মজীবনের বিস্তারিত বিবরণ খুব একটা পাওয়া যায় না। উপরে যা আলোকপাত করা হলো, তা থেকে অনুমান করা যায় যে, তিনি অত্যন্ত কর্তব্যনিষ্ঠ ও কর্মঠ ব্যক্তি ছিলেন। আজীবন জ্ঞানের সাধক এ মহান ব্যক্তির কর্ম জীবনও জ্ঞান চর্চা কেন্দ্রিকই ছিল। সংসার ও কর্ম জীবনের শত ব্যস্ততাও তাঁকে জ্ঞানানুশীলনের কেন্দ্র বিন্দু থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি ।
মৃত্যু
দ্বীনের মহান খাদেম জ্ঞান সাধক, কর্মবীর ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী কর্ম- ব্যস্ততার মাঝে জীবন পথের শেষ প্রান্তে উপনীত হন। বিচারকের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তিনি জীবন সায়া˝˝ এসে পেঁŠছেন। এসময় তিনি আল্লাহর ‘ইবাদাতে মশগুল থাকতেন এবং তাঁর নিকট উত্তমভাবে জীবনাবসান ও উভয় জগতের কল্যাণের জন্য বেশি বেশি প্রার্থনা করতে থাকেন। অবশেষে সান‘আর বিচারক থাকা অবস্থাতেই ১২৫০ হিজরী, ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ, জামাদিউল উখরা মাসের ২৭ তারিখ বুধবার রাতে সান‘আ শহরে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর মৃত্যুর সংবাদে হাজার হাজার লোক সমবেত হয় এবং কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। অগণিত লোক তাঁর জানাযায় শরীক হন। জানাযা শেষে তাঁকে ইয়ামানের সান‘আ নগরীর খুজাইমা কবরস্থানে দাফন করা হয়।

দ্বিতীয় অধ্যায়

‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর চিন্তাধারা
প্রথম পরিচ্ছেদ
ইজতিহাদ ও তাকলীদের ক্ষেত্রে আশ্ শাওকানীর চিন্তাধারা
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী একজন গবেষক ও চিন্তাবিদ ছিলেন। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে চিন্তা-গবেষণা করে তিনি নিজেই কোন সিন্ধান্তে উপনীত হওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন ছিলেন। ইজতিহাদ বা গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি খুবই পারদর্শী ছিলেন। এর মূলে ছিল তাঁর সকল বিষয়ে গভীর পান্ডিত্য এবং প্রখর চিন্তাশক্তি। তিনি ‘ইলমে তাওহীদ, ‘ইলমে কালাম, তাফসীর, হাদীছ, ফিক্হ, উসূলে ফিকহ, উসূলে দ্বীন, যুক্তি শাস্ত্র, বিজ্ঞান, ‘আরবী ভাষা ও সাহিত্য, ব্যাকরণ ও অলংকারশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে ‘আল্লামা আয্ যাহাবী বলেন, ‘‘এভাবে তিনি অধ্যয়ন, মুখস্থকরণ, শ্রবণ ও (শিক্ষা মজলিসে) অংশ গ্রহণের মাধ্যমে এমন নেতৃস্থানীয় পন্ডিতে পরিণত হন, যার উপর নির্ভর করা হতো, জ্ঞানের এমন কেন্দ্রবিন্দু হন যার দিকে সবাই ধাবিত হতো। তিনি সে যুগের অনন্য, অসাধারণ ও অন্যের জন্য আদর্শ স্থানীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। তিনি এমন বিদ্যাসাগরে পরিণত হন, যার কোন সমকক্ষ ছিল না। কুরআনের এমন মুফাসসির ছিলেন যাঁর কোন জুড়ি ছিলনা, এমন হাদীছবেত্তা ছিলেন, যাঁর ধারে কাছেও কেউ ছিলনা এবং এমন মুজতাহিদ (গবেষক) ছিলেন যে, এক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে টিকে থাকার মত কেউ ছিলনা।’’
এ প্রসঙ্গে ‘আব্দুল হাকীম কাজী বলেন, ‘‘তিনি অত্যন্ত প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন শাস্ত্র ও বিষয়ে সমধিক অবগত ছিলেন। ইমাম মলিক, আবু হানিফা, আহমাদ ইবন হাম্বল, শাফি‘ঈ, ইবন তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম প্রমুখ মুজাদ্দিদ ও সাধুসজ্জনের জ্ঞানের পূর্ণ আয়ত্বকারী ছিলেন।’’ তাঁর মেধা, স্মরণশক্তি, বোধশক্তি, অনুধাবন শক্তি প্রভৃতি ছিল খুবই তীক্ষন। এ প্রসঙ্গে জালাল উদ্দীন স্বীয় গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন, ‘‘মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানী প্রবল মেধাশক্তি, তড়িৎ বোধশক্তি, শক্তিশালী অনুধাবন ক্ষমতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও অসাধারণ স্মরণ শক্তির অধিকারী ছিলেন।’’
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করার পূর্বেই বিভিন্ন বিষয়ে ফাতওয়া দান ও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দান করতেন। এ প্রসঙ্গে আল বাদরুত তালি‘ গ্রন্থে বলা হয়েছে। ‘‘শিক্ষকের নিকট অধ্যয়নের সময়েই তিনি সান‘আবাসী ও অন্যান্য যারা তাঁর নিকট ফাতওয়ার জন্য আসত তাদেরকে ফাতওয়া দান করতেন। এমন কি তাঁর শিক্ষকগণের জীবিতাবস্থায় তিহামা অঞ্চল থেকে তাঁর নিকট ফাতওয়া চাওয়া হতো। সাধারণ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি নির্বিশেষে সকলেই তাঁর নিকট ফাতওয়া চাইতো। তিনি ২০ বছর বয়স থেকেই ফাতওয়া দান করতে থাকেন।’’
এর ফলে কুরআন সুন্নাহর আলোকে চিন্তা-গবেষণা পূর্বক বিভিন্ন বিষয়ে ফায়সালা দান ও মাসয়ালা-মাসায়িল চয়নের দক্ষতা তাঁর মধ্যে সৃষ্টি হয়। এ পর্যায়ে তিনি ‘‘‘ইলমে ইজতিহাদ’’ তথা গবেষণা শাস্ত্রে বিশেষ মনোযোগ প্রদান করেন এবং পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন। এ ব্যাপারে ‘আব্দুল হাকীম কাজী বলেন, ‘‘বিশ বছর বয়স হতেই তাঁর নিকট ফাতওয়া চাওয়া হতো এবং তিনি চিন্তা-গবেষণা করে ফাতওয়া দান করতেন।... তিনি তাকলীদ (অন্ধ অনুকরণ) বর্জন করে ‘ইলমে ইজতিহাদে (গবেষণা শাস্ত্রে ) মনোনিবেশ করেন এবং তা পূর্ণভাবে আয়ত্ব করেন। অত:পর তিনি ত্রিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পূর্বেই ইজতিহাদ শুরু করেন।’’
জ্ঞান গবেষণায় ঐকান্তিকতার ফলে কালক্রমে তিনি ‘মুজতাহিদে মুতলাক’ বা মুক্ত চিন্তার অধিকারী পূর্ণ গবেষকে পরিণত হন।
মাযহাবের ব্যাপারে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর চিন্তাধারা
প্রথম দিকে তিনি যায়দিয়া মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। এ মাযহাবের বিষয়ে তিনি ব্যাপক অধ্যয়ন করেন। এর আলোকে তিনি গ্রন্থ রচনা করেন এবং ফাতওয়া দান করেন। এমনকি এ মাযহাবের তিনি একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অত:পর তিনি হাদীছ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং এ বিষয়ে সে যুগের অনন্য পন্ডিতে পরিণত হন। ফলে তিনি ফিকহ ভিত্তিক মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ (তাকলীদ) বর্জন করে ইজতিহাদ বা গবেষণাকর্মে আত্মনিয়োগ করনে। ইজতিহাদের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের পর তিনি এ বিষয়ে তথ্য বহুল গ্রন্থ রচনা করেন। এ ব্যাপারে তাঁর লেখা দুটি বই খুবই উল্লেখযোগ্য। একটি হলো ‘‘আল কাওলুল মুফীদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত তাকলীদ’’ এবং অন্যটি হলো ‘‘আস্ সায়লুল জারার আল মুদাফফিক আলা হাদায়িকিল আযহার’’। এ গ্রন্থদ্বয়ে তিনি ইজতিহাদের যৌক্তিকতা ও তাকলীদের অসারতার বিশ্লেষণ করেন। বিশেষ করে শেষোক্ত গ্রন্থে তিনি মাসয়ালা সমূহের প্রকৃত রূপ তুলে ধরেন এবং যা দলীল দ্বারা প্রমাণিত তার শুদ্ধতা এবং যার পক্ষে কোন দলীল নেই তার অসারতার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
আল্লামা আশ্ শাওকানী তাকলীদকে বর্জন করেই ক্ষান্ত হননি। বরং তিনি তাকলীদকে হারাম মনে করতেন এবং তাকলীদ বর্জন করে দলীল প্রমাণের দিকে দৃষ্টি দানের জন্য আহলে রায় ও অন্যান্যদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন।
তাকলীদ বর্জন, তাকে হারাম ঘোষণা এবং এ বিষয়ে গ্রন্থ রচনার ফলে
তদানিন্তন ‘আলিম সমাজের একটি দল তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন এবং তাঁর প্রতি নিন্দা ও বিদ্বেষের তীর নিক্ষেপ করতে থাকেন। এর ফলে সান‘আ শহরে মুকাল্লিদ ও মুজতাহিদ সমর্থক দু’দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।’’
এ আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী নির্দিষ্ট কোন মাযহাব বা ইমামের তাকলীদে (অন্ধ অনুকরণ) বিশ্বাসী ছিলেন না । বরং তিনি ছিলেন মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী একজন সুদক্ষ মুজতাহিদ। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যেটিকে সঠিক মনে করতেন, সেটিরই তিনি অনুসরণ করতেন। সেটা কোন মাযহাব বা ইমামের পক্ষে না বিপক্ষে তার কোন তোয়াক্কা করতেন না।
তাকলীদের ব্যাপারে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর চিন্তাধারা
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘আললামা আশ শাওকানী তাকলীদের (অন্ধ অনুকরণের) ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা ইমামের তাকলীদকে হারাম মনে করতেন। তিনি ফিক্হ ভিত্তিক মাযহাবের ইমামগণের তাকলীদকে আল্লাহ তা’আলার কিতাব পরিত্যাগ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহকে উপেক্ষার শামিল বলে মনে করতেন। তাকলীদকে কেন্দ্র করেই যেহেতু তাঁর এবং সে সময়ের অন্যান্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সূচনা হয়েছিল এ কারণে তাকলীদ সম্পর্কে আলোকপাত করা এবং এ ব্যাপারে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর অবস্থান কী ছিল তা আলোচনা করা প্রয়োজন।
‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর কালে তাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণ মারাত্মক রূপ ধারণ করেছিল। লোকেরা নির্দিষ্ট ইমাম ও মাযহাবের অনুসরণে অন্ধ হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে সে সময়ে যায়দিয়া সম্প্রদায় তাদের ইমামের তাকলীদের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত ছিল। তারা ইজতিহাদকে অপ্রয়োজনীয় গণ্য করে এর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীও প্রথম দিকে যায়দিয়া মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে তিনি মাযহাবের তাকলীদ পরিত্যাগ করে ইজতিহাদে মননিবেশ করেন। নিম্নে তাকলীদ এবং এ ব্যাপারে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর চিন্তাধারা কি ছিল তা তুলে ধরা হলো :
তাক.লীদের অর্থ
তাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণ ইজতিহাদ বা মুক্ত চিন্তাধারার বিপরীত। কোন বিষয়ে সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য নিজস্ব চিন্তার মাধ্যমে অনুসন্ধান ব্যতীত শুধুমাত্র অন্যের অনুকরণের নাম তাকলীদ। তাক.লীদের অর্থ করতে গিয়ে প্রসিদ্ধ ‘আরবী অভিধান আল্ মুনজিদ এ বলা হয়েছে , قلده فى كذا- اى تبعه من غير تأمل و لا نظر
‘‘এ বিষয়ে তার তাকলীদ করল এর অর্থ কোন প্রকার চিন্তা-ভাবনা না করেই তার অনুসরণ করল।’’
এ অভিধানে تقليد (তাকলীদ) এর অর্থে আরো বলা হয়েছে,
هو ما انتقل الى الانسان من ابائه و معلميه و مجتمعه من العقائد و العادات و العلوم و الاعمال
‘‘পূর্বপুরুষ, শিক্ষকমন্ডলী ও সামাজিক প্রচলন প্রভৃতি হতে ‘আকীদা-বিশ্বাস, অভ্যাস, জ্ঞান ও ‘আমল কোন মানুষের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে তাকলীদ বলে।’’
তাক.লীদের সংজ্ঞায় সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ এ বলা হয়েছে, ‘‘তাকলীদের তৃতীয় অর্থ ধর্মীয় ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মতামতের অনুসরণ; অন্যের কথা ও কাজের নির্ভুল হওয়া সম্পর্কে কোন যুক্তি-প্রমাণের সন্ধান না করিয়াই ঐগুলিকে নির্ভুল বিশ্বাস করত: প্রামাণ্য বলিয়া স্বীকার করা।’’
আবু ‘আব্দুল্লাহ ইবন খাওয়ায আল্ বাস.রী এর সংজ্ঞায় বলেন,
الةقليد معناه فى الشرع الرجوع الى قول لاحجة لقائله عليه، و ذالك ممنوع منه فى الشريعة ‘‘শারী‘আতের পরিভাষায় তাকলীদের অর্থ হলো এমন কথার দিকে প্রত্যাবর্তন করা, যে কথার অনুকূলে বক্তার কোন দলীল নেই। এটা শারী‘আতে নিষিদ্ধ।’’
তাক.লীদের প্রাদুর্ভাব
হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ এবং তার ভিত্তিতে বিশেষ কোন মাযহাব সৃষ্টি হয়নি। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) দ্বীনের জ্ঞান ও আহকাম সরাসরি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট থেকে প্রাপ্ত হতেন। এ সৌভাগ্য শুধু সাহাবায়ে কিরামেরই ছিল। তাবি‘ঈগণ সাহাবীগণের মাধ্যমে হুবহু সে জ্ঞান ও আহকাম লাভ করেন, যা রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট হতে সাহাবীগণ লাভ করেছিলেন। তাবে‘ তাবি‘ঈগণও তাবি‘ঈগণের মাধ্যমে সে নির্ভেজাল জ্ঞান লাভে ধন্য হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, ‘‘কোনো মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট হতে জ্ঞান লাভের সৌভাগ্যশালী ছিলেন শুধু সাহাবীগণ।...এরপর তাবি‘ঈগণ সাহাবীগণের সঠিক পথের উপর পরিচালিত হন এবং সরল-সঠিক পথের অনুসরণ করতে সক্ষম হন। অত:পর তাবে‘ তাবি‘ঈগণও সে সঠিক পথই অনুসরণ করেন।’’
এরপর চতুর্থ যুগের লোকেরাও তাদের পদাংক অনুসরণ করেন এবং দ্বীনের বিষয়কে তাদের আলোকবর্তিকা থেকেই গ্রহণ করেন। তাঁরা দ্বীনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন এবং কখনই রায়, বুদ্ধিবৃত্তি, তাকলীদ বা কিয়াসকে দ্বীনের উপর অগ্রাধিকার দিতেন না। তাঁরা নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির অন্ধ অনুকরণ করতেন না। বরং সত্য-সঠিক বিষয় যেখানে পেতেন সেখান থেকেই গ্রহণ করতেন।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, ‘‘তাঁদের অনুসরণের যাঁরা প্রথম সারির ছিলেন, তাঁরা তাঁদের পদাংক অনুসরণ করে চলতেন এবং তাঁদের পদ্ধতিকে গ্রহণ করতেন। তাঁরা ব্যক্তি বিশেষের অন্ধ অনুকরণের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত ছিলেন এবং সর্বদা দলীল-প্রমাণের সাথেই অবস্থান করতেন। তাঁরা হকে.র সঙ্গেই চলতেন, তা যে দিকেই যাক এবং শুদ্ধ-সঠিক বিষয় যেখানে পেতেন তার সঙ্গেই অবস্থান করতেন।’’
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ দেহলবী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘এ যুগের সাধারণ লোকদের অবস্থা ছিল এই যে, তারা যে সকল সামাজিক মাসয়ালায় কোন মতভেদ ছিলনা সেগুলোতে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আনুগত্য করত। তারা পিতা-মাতা এবং শিক্ষকের নিকট হতে ওজু, গোসল, নামায, রোযা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় মাসয়ালা শিক্ষা করত। তাদের সামনে নতুন কোন কিছু আসলে বা ঘটলে কোন নির্দিষ্ট মাযহাব বা ইমাম নয়, বরং যে ‘আলিম বা মুফতীকে পেতেন, তাঁর নিকট থেকেই তা জেনে নিত। পক্ষান্তরে বিশেষ ব্যক্তি বা ‘আলিমদের অবস্থা ছিল এই যে, তাঁরা ছিলেন আহলি হাদীছ। তাঁদের একদল হাদীছ চর্চায় মশগুল থাকতেন। তাঁদের নিকট নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীছ এবং সাহাবায়ে কিরামের আছার বিদ্যমান থাকায় কোন মাসয়ালায় তাঁদের অন্য কোন কিছুর প্রয়োজনই হতো না।’’
হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে মুজতাহিদ (গবেষক) এর ব্যাপারে অস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি হতে থাকে এবং পরবর্তীতে ইজতিহাদের অগ্রগতি রহিত হতে থাকে। ফলশ্রুতিতে শিক্ষিত জনসাধারণ পূর্ববর্তী বিশেষজ্ঞদের তাকলীদ করতে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে মুসলিমদের মধ্যে এ ধারণা জন্মলাভ করে যে, তারা পূর্বপুরুষের শাস্ত্রানুশাসন মানতে বাধ্য। এমন কি এ ধারণা এমন পর্যায়ে উপণীত হয় যে, তারা মনে করে ফিক.&হ শাস্ত্রে পূর্ববর্তীদের প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজস্ব কোন মত প্রকাশের অধিকার কারো নেই। অর্থাৎ পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। নতুন করে আর কেউ ইজতিহাদ করতে পারবেনা। এ মতের সমর্থনে যুক্তি দেয়া হয় যে, শুধু পূর্ববর্তী ফক.ীহ্গণই ফিক্হ শাস্ত্রের মূলনীতি নির্ধারণ ও নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করার মত উপযুক্ত পান্ডিত্য ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন।
এরপর লোকেরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং মাযহাবের গোঁড়ামি ও অন্ধ অনুকরণের নিকট নিজকে সোপর্দ করে। এ প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়্যিম বলেন,
ثم خلف من بعدهم خلوف فرقوا دينهم، و كانوا شيعا، كل حزب بما لديهم فرحون، و تقطعوا امرهم بينهم زبرا، جعلوا التعصب للمذاهب ديانتهم التى يدينون و اخرون منهم قنعوا بمحض التقليد و قالوا : ( انا وجدنا اباءنا على امة و انا على اثارهم مقتدون)
‘‘অত:পর তাদের পরবর্তী লোকেরা দ্বীনকে বিভক্ত করে ফেলে এবং নিজেরা দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রত্যেক দল তাদের নিকট যা রয়েছে তা নিয়েই খুশী থাকে এবং তাদের বিষয়গুলো টুকরো টুকরো করে ফেলে ও তারা তাদের দ্বীনকে মাযহাবের গোঁড়ামিতে পরিণত করে। পক্ষান্তরে অন্যদল শুধু তাকলীদের অনুগত হয়ে পড়ে এবং বলে, ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে একটি পথের উপর পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাংকের অনুসারী।’ (আয্ যুখরূফ : ২৩) আর যে সঠিক পথের অনুসরণ করা উচিৎ ছিল, এ দু’টি দল-ই তা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।’’
এ সময় তাকলীদের উপর লোকেরা জেঁকে বসে এবং এ কারণেই মাযহাবের সৃষ্টি হয়। এ ব্যাপারে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী বলেন,
ان الناس كانوا قبل المائة الرابعة غير مجتمعين على التقليد الخالص لمذهب واحد بعينه
‘‘হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পূর্বে লোকেরা কোন একটি নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুকূলে নিরংকুশ তাকলীদের উপর ঐক্যবদ্ধ ছিলনা।’’ এ ব্যাপারে ইবনুল কাইয়্যিম-এর বক্তব্য হলো,
انما حدثت هذه البدعة فى القرن الرابع المذموم على لسان رسول الله صلى الله عليه و سلم ‘‘এ বিদ‘আত (তাকলীদ) সূচিত হয় (হিজরী) চতুর্থ শতাব্দীতে, যে যুগ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভাষায় নিন্দিত।’’
কিন্তু হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকেই ব্যক্তি বিশেষের অন্ধ অনুকরণ এবং নির্দিষ্ট মায.হাবের অনুসরণের মাত্রা বেড়ে যায় ও ধীরে ধীরে তা একেবারে জেঁকে বসে। শাস্ত্রে অভিজ্ঞ পরবর্তী ‘আলিম ও সাধারণ লোকেরা তাকলীদকে জরুরী মনে করতে থাকে। ফলে একেকটি জনগোষ্ঠী পূর্ববর্তী কোন একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির তাকলীদ করতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে এটি এমনভাবে জেঁকে বসে যে, যে জনগোষ্ঠী যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির তাকলীদ করতে থাকে তিনি ‘ইমাম’ এবং যারা তাকলীদ করেন তারা মুকাল্লিদে পরিণত হন। কালক্রমে উক্ত ইমামের নামের সাথে সম্পর্কিত করে বিভিন্ন মাযহাবের সৃষ্টি হয়। যেমন ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর নামে হানাফী মাযহাব, ইমাম শাফি‘ঈ (রহ.) এর নামে শাফি‘ঈ মাযহাব, ইমাম মালিক (রহ.) এর নামে মালিকী মাযহাব, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.) এর নামে হাম্বলী মাযহাব ইত্যাদি।
ইজতিহাদ বা জ্ঞান-গবেষণার ক্ষেত্রে এ স্থবিরতা সৃজনশীল জ্ঞান সাধনার পথকেও অনেকটাই রুদ্ধ করে দেয়। এতে অনুসন্ধানী চিন্তাশক্তি জ্ঞানের নতুন নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারের পরিবর্তে অনুকরণের ঘূর্ণাবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে। কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে যে ইজতিহাদ যুগ জিজ্ঞাসার জবাব দান ও যুগোপযোগী সমাধান পেশ করে ইসলামকে গতিশীল এক কালজয়ী আদর্শে পরিণত করেছে, ‘ইজতিহাদের দরজা বন্ধ’ এবং ‘নির্বিচার তাকলীদ’ এর চলৎশক্তিকে অনেকটা শ্লথ করে দেয়। ফলে আধুনিক যুগের এক শ্রেণীর শিক্ষিত লোকের নিকট ইসলাম একটি সেকেলে মতবাদ বলে পরিগণিত হয়েছে।
অবশ্য এ অবস্থার মাঝেও একদল বিশেষজ্ঞের পক্ষ হতে দাবী করা হয় যে, তারা যেন দলীল প্রমাণযোগে নিজ নিজ মুজতাহিদের ‘ইজতিহাদ’ নির্ভুল হওয়া সম্পর্কে অবহিত থাকেন। পরবর্তীকালে আল্ জুয়াইনী ও ‘আল্লামা সুয়ূত.ী অবাধ ইজতিহাদ করার অধিকার দাবী করেন। ইমাম আল গাযালী (রহ.) শিয়া সম্প্রদায়ের ইমামদের তাকলীদের বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করেন।
দাউদ ইবন ‘আলী, ইবন হাযম ও অন্যান্য জাহিরী বিশেষজ্ঞগণ তাকলীদের নিন্দা করেন এবং পরবর্তী বিজ্ঞ ব্যক্তিদের জন্য ইজতিহাদকে অবশ্য কর্তব্য বলে নির্দেশ দেন।
হিজরী ৮ম শতাব্দীতে ইবন তাইমিয়া এবং তদীয় ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম প্রচলিত গতানুগতিক তাকলীদের নিন্দা করেন। তাঁরা তাকলীদ বা গতানুগতিক অন্ধ অনুকরণের বিরোধিতা করেন এবং ইজতিহাদের প্রয়োগ আরম্ভ করেন।
তাকলীদ বর্জন করে ইজতিহাদের প্রয়োগ আরম্ভকারীদের ধারাবাহিকতায় ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী ছিলেন অন্যতম। তিনি তাকলীদের অসারতা প্রমাণে কলমও ধরেন শক্ত হাতে। তাঁর বিভিন্ন লেখায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। নিম্নে তাকলীদের ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তাধারার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো :
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী তাকলীদের হুকুমের ব্যাপারে ‘ইরশাদুল ফুহুল ইলা তাহকীকিল হাক্কি মিন ‘ইলমিল উসূল’ নামক গ্রন্থে বলেন, ‘‘শারী‘আতের শাখা-প্রশাখার মাসয়ালার ক্ষেত্রে তাকলীদ বৈধ কিনা এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। একদল বিশেষজ্ঞের মতে সাধারণভাবে তা জায়িয নয়। কারাফী (রহ.) বলেন, ইমাম মালিক এবং জমহুর ‘উলামার মতে ইজতিহাদ আবশ্যক এবং তাকলীদ বাতিল। ইবন হাযম তাকলীদ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা‘ রয়েছে বলে দাবী করেছেন। তিনি মালিক (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মানুষ, আমার ভুল শুদ্ধ উভয়ই হতে পারে। সুতরাং আমার অভিমতের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ করে দেখ। কিতাব ও সুন্নাহর অনুকূল হলে গ্রহণ কর, অন্যথায় বর্জন কর। ইবন হাযম বলেন, ইমাম মালিকের মত শাফি‘ঈ, আহমাদ এবং আবু হানিফাও তাকলীদকে নিষিদ্ধ করেছেন। মাযানী শাফি‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি সর্বদাই নিজের এবং অন্যের তাকলীদ করতে নিষেধ করতেন। জামহুর এর মতে তাকলীদ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা‘ সংঘটিত না হলেও তা নিষিদ্ধ হওয়া জোরদার হয় ঐ বর্ণনার দ্বারা, যেখানে মৃত ব্যক্তির তাকলীদ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা‘ হয়েছে বলে বর্ণিত হয়েছে। অনুরূপভাবে মুজতাহিদ যদি কোন বিষয়ে কোন দলীলের সন্ধান না পান, তাহলে সে ক্ষেত্রে স্বীয় রায় বা চিন্তা প্রসূত অভিমতের আলোকে ‘আমল করা তাঁর জন্য বৈধ। কিন্তু অন্যের জন্য সে মতানুযায়ী ‘আমল করা বৈধ নয় এ ব্যাপারে ইজমা‘ রয়েছে। বর্ণিত এ দু’টি ইজমা‘র দ্বারাই তাকলীদ একেবারেই নিষিদ্ধ হওয়া প্রমাণিত হয়।
তৃতীয় একটি মত হলো, সাধারণ লোকের জন্য তাকলীদ আবশ্যক, কিন্তু মুজতাহিদদের জন্য নিষিদ্ধ। চার ইমামের অনুসারীদের অনেকেই এ মতের প্রবক্তা। কিন্তু এ কথা সুবিদিত যে, মতভেদের ক্ষেত্রে শুধু মুজতাহিদের কথা গ্রহণযোগ্য। আর অনুসারীরা যেহেতু মুকাল্লিদ, সেহেতু মতভেদের ক্ষেত্রে তাদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষত: যখন চার ইমাম তাঁদের এবং অন্যদের তাকলীদ করতে তাঁদেরকে নিষেধ করেছেন। আশ্চর্য ও আফসোসের বিষয় হলো তারা তাদের এ সকল ইমামের কথাকে শুধু মুজতাহিদদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, মুকাল্লিদদের জন্য নয়, বলে অর্থ নিয়েছে।
এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরবর্তিতে যারা উসূলে ফিক্হের গ্রন্থ রচনা করেছেন, তারা এ কথাকে অধিকাংশের কথা বলে চালিয়ে দিয়ে তাকলীদকে অস্বীকার না করার ইজমা‘ হিসেবে তাদের পক্ষে দলীল নির্ধারণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে যদি তারা উত্তম যুগ, অত:পর তৎপরবর্তী যুগ এবং তারপর তৎপরবর্তী যুগ বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের এ দাবী বাতিল। কারণ, তাদের সময় কোন তাকলীদের অস্তিত্ব ছিলনা, তারা তাকলীদ কী তা জানতেন না এবং তাকলীদের কথা শুনেনওনি। বরং তারা শুধু কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে ‘আলিম ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করতেন এবং তিনি কুরআন-সুন্নাহর দলীল যা জানতেন তার আলোকে ফাতওয়া দিতেন। এটা কোন তাকলীদ ছিলনা, বরং এটা ছিল কোন বিষয়ে আল্লাহর হুকুম কী এবং শারী‘আতের দলীল কী তা জানতে চাওয়া। কারণ তাকলীদ হলো রিওয়ায়াতের ভিত্তিতে ‘আমল না করে কোন ব্যক্তির রায় বা ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে ‘আমল করার নাম ।
فاسألوا اهل الذكر ‘তোমরা জ্ঞানবান ব্যক্তিদের নিকট জিজ্ঞেস কর’ এ আয়াত দ্বারা তাকলীদ বৈধ হওয়ার পক্ষে যে দলীল দেয়া হয়, তা সঠিক নয়। কারণ এখানে জিজ্ঞেস করা বলতে বুঝানো হয়েছে কোন বিষয়ে আল্লাহর হুকুম কী সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাকে। অধিকন্তু এ আয়াতটি ‘আম (সাধারণ) নয়, যেমন তারা মনে করে। বরং এটি নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। আর তা হলো নবীগণ যে পুরুষ লোকই হন, সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা। আয়াতের পূর্বাপর লক্ষ্য করলে সেটিই প্রতীয়মান হয়। যেখানে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
و ما ارسلنا قبلك الا رجالا نوحي اليهم فاسألوا اهل الذكر ان كنتم لا تعلمون بالاينات و الزبر
‘‘তোমার পূর্বে আমি পুরুষ ব্যতীত অন্য কাউকে প্রেরণ করিনি যার নিকট আমি ওহী পাঠিয়েছি। যদি তোমাদের জানা না থাকে তাহলে জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে জিজ্ঞেস কর।’’
পক্ষান্তরে এর দ্বারা যদি চার ইমামের ইজমা‘র কথা বুঝানো হয়, তাহলে এটি জানা কথা যে, তাঁরা তাকলীদ নিষেধের কথা বলেছেন এবং তাঁদের যুগে কেউ এটা (তাকলীদ নিষেধ হওয়াকে) অস্বীকার করত না। আর যদি তাঁদের পরে ইজমা‘ হয়েছে বলে বুঝানো হয়, তাহলে এ কথা সুস্পষ্ট যে, তখন থেকে আজ পর্যন্ত তাকলীদের অস্বীকারকারী বিদ্যমান রয়েছে। অপর পক্ষে যদি ইজমা‘র দ্বারা চার ইমামের মুকাল্লিদদের ইজমা‘ বুঝানো হয়, তাহলে এ কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোন ব্যাপারে মুকাল্লিদদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়।
মোট কথা যারা তাকলীদকে বৈধ মনে করে, তারা এর পক্ষে সঙ্গত কোন দলীল উপস্থাপন করতে কখনই সক্ষম হয়নি, যা যুক্তির ধোপে টিকে। আর আমাদেরকে আল্লাহর শারী‘আতকে কোন ব্যক্তির বা ব্যক্তিবর্গের রায়ের দিকে প্রত্যর্পণ করার নির্দেশ দেয়া হয়নি,& বরং আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আল্লাহর বাণী অনুযায়ী, فان تنازعتم في شئ فردوه الي الله والرسول ‘‘যদি তোমরা কোন বিষয়ে মতভেদে লিপ্ত হও, তাহলে তা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যর্পণ কর।’’
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবীগণকে কোথাও প্রেরণ করলে নির্দেশ দিতেন আল্লাহর কিতাবের দ্বারা ফায়সালা করতে। সেখানে না পাওয়া গেলে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহর দ্বারা, সেখানেও না পাওয়া গেলে তার চিন্তা ও অভিমত অনুযায়ী যেটি তার নিকট স্পষ্ট হবে সে অনুযায়ী। যেমন মা‘আয (রা.) এর হাদীছে রয়েছে।১ তাকলীদৈর অসুসারীরা আরো একটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন, তাহলো যারা শারী‘আতের দলীল বুঝতে অপারগ তাদের তো তাকলীদ ছাড়া উপায় নেই। এটিকে তারা তাকলীদের দলীল হিসেবে পেশ করেন। কিন্তু বিষয়টি সঠিক নয়। কারণ ইজতিহাদ ও তাকলীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী একটি বিষয় রয়েছে। তাহলো, অজ্ঞ লোকদের সামনে কোন বিষয় আসলে শারী‘আতের হুকুম জানার জন্য তারা ‘আলিমকে জিজ্ঞেস করবে, সে ব্যক্তির অবৈধ রায় বা শুধুমাত্র ইজতিহাদকে জানার জন্য নয়। সাহাবী এবং তাবি‘ঈদের মধ্যে যারা শারী‘আতের দলীল জানতে অপারগ ছিলেন, তাঁদের ‘আমল এমনটিই ছিল। অধিকন্তু আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় কিতাবে অনেক আয়াতে মুকাল্লিদদের নিন্দা করেছেন।
যেমন انا وجدنا اباءنا علي امة ‘‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষকে একটি নীতির উপর পেয়েছি।’’
اتخذوا احبارهم و رهبانهم اربابا من دون الله ‘‘তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পন্ডিত-পুরোহিতদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।’’
انا اطعنا سادتنا و كبراءنا فاضلونا السبيلا ‘‘আমরা তো আনুগত্য করেছি আমাদের নেতা ও বড়দের, তারাই তো আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।’’
এখানে ‘আল্লামা যারাকশী মুযানী থেকে যে চমৎকার ঘটনা বিবৃত করেছেন, তা উল্লেখ করা হলো:
যে ব্যক্তি তাকলীদের হুকুম দেয়, তাকে বলা হবে, এ ব্যাপারে কি তোমার নিকট কোন দলীল আছে? যদি সে বলে, হ্যাঁ, তাহলে তো তাকলীদ বাতিল হয়ে গেল। কারণ দলীল দ্বারাই বিষয়টি আবশ্যক করা হয়েছে, তাকলীদ দ্বারা নয়। যদি সে বলে, কোন জ্ঞান ছাড়াই এ হুকুম দিয়েছি, তাহলে তাকে বলা হবে, কোন দলীল ছাড়াই কেন রক্তপাত করছো, স্ত্রী অঙ্গকে হালাল করছ এবং সম্পদকে বৈধ করছ, যা আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন? যদি সে বলে যে, আমি জানি যে আমি ঠিক কাজই করছি, যদিও আমি তার দলীল অবগত নই। কারণ আমার শিক্ষক একজন বড় পন্ডিত ব্যক্তি। তাহলে তাকে বলা হবে, তোমার শিক্ষকের শিক্ষকের তাকলীদ করা তো অধিকতর উত্তম। কারণ, তিনিও হয়তো কোন দলীল দ্বারাই কথা বলেছেন, যা তোমার শিক্ষকের নিকট গোপন ছিল। সে যদি বলে হ্যাঁ, ঠিকই, তাহলে সে তার শিক্ষকের তাকলীদ বর্জন করে শিক্ষকের শিক্ষকের তাকলীদ করবে এবং এভাবে চলতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তা সাহাবীগণের ‘আলিমের নিকট পর্যন্ত পৌঁছবে। তিনি যদি এটি করতে অস্বীকৃত হন, তাহলে তার কথা পন্ড হয়ে যাবে। এবং তাকে বলা হবে, কিভাবে অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম জ্ঞানের অধিকারীর তাকলীদ জায়িয হবে অথচ তার অপেক্ষা বড় ও বেশি জ্ঞানীর তাকলীদ অবৈধ হবে? এভাবে সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছার পর তাকে বলা হবে, এ হলেন সেই সাহাবী, যিনি তাঁর জ্ঞান গ্রহণ করেছেন সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের প্রতি প্রেরিত রাসূল যিনি কথা ও কাজে ছিলেন নির্ভুল ও নিষ্পাপ। সুতরাং তাঁর তাকলীদ করা সাহাবীর তাকলীদ করার চেয়ে উত্তম।
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী স্বীয় তাফসীর ফাতহুল কাদীরে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতকে তাকলীদ হারাম হওয়ার দলীল হিসেবে পেশ করেছেন। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো:
(ক) এ ক্ষেত্রে তিনি সূরা আল আরাফের ২৮ নং আয়াতের উল্লেখ করেন, যেখানে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
و اذا فعلوا فاحشة قالوا وجدنا عليها اباءنا و الله امرنا بها قل ان الله لا يأمر بالفحشاء أتقولون علي الله ما لا تعلمون
‘‘যখন তারা কোন অশ্লীল কার্যে লিপ্ত হতো তখন বলতো, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এর উপর পেয়েছি এবং আল্লাহই আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি বলুন, আল্লাহ কখনো কোন অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহর উপর এমন কথা আরোপ করতে চাও, যা তোমরা জান না?’’ এ আয়াতকে তাকলীদের বিরুদ্ধে দলীল হিসেবে পেশ করে তিনি বলেন, ‘‘যে সকল মুকাল্লিদ (অন্ধ অনুসরণকারী) সত্য বিরোধী মাযহাবের ক্ষেত্রে পূর্ব পুরুষদের অনুসরণ করে, এ আয়াতে তাদের জন্য বড় ধরনের ধমক ও কঠোর উপদেশ রয়েছে। কেননা এটা মূলত কুফরের অনুসারীদের অনুসরণ, সত্যের অনুসারীদের নয়। কারণ তারা বলেন,
انا وجدنا اباءنا علي امة و انا علي اثارهم مقتدون ‘‘আমরা তো আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে একটি নীতির উপর পেয়েছি আর আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করছি।’’ (আয্ যুখরূফ : ২৩) তারা আরো বলে, ‘‘আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে এর উপর পেয়েছি এবং আল্লাহ আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন।’’ (আল আ‘রাফ :২৮) যদি মুকাল্লিদ ব্যক্তি এ প্রতারণার শিকার না হতো যে, সে পূর্বপুরুষকে যে মাযহাবের উপর পেয়েছে, তার বিশ্বাস মতে সেটি আল্লাহর নির্দেশ এবং সত্য সঠিক তাহলে সে এর উপর স্থায়ী থাকতো না। আর এটাই সে স্বভাব যার কারণে ইহুদীরা ইহুদীবাদে ও খৃস্টানগণ খৃস্টবাদের উপর এবং বিদ‘আত পন্থীগণ বিদ‘আতের উপর টিকে থাকে। এ বিভ্রান্তির উপর তাদের টিকে থাকার কারণ তাদের পূর্বপুরুষকে ইহুদীবাদ, খৃস্টবাদ ও বিদ‘আতের উপর পাওয়া এবং তাদের ব্যাপারে ভাল ধারণা পোষণ ও তা আল্লাহ নির্দেশিত সঠিক পথ বলে ধারণা ব্যতীত আর কিছুই নয়। তারা মূলত নিজের ব্যাপারে কোন চিন্তা করে না। সত্যকে সঠিকভাবে অনুসন্ধান করে না এবং আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আলোচনা-পর্যালোচনা করে না । বস্ত্তত: এটাই হলো অবৈধ তাকলীদ এবং নির্ভেজাল ক্রটি। ... তারা ভালর সঙ্গে মন্দকে, শুদ্ধর সঙ্গে অশুদ্ধকে এবং ভ্রান্ত রায়ের (অভিমত) সঙ্গে বিশুদ্ধ বর্ণনাকে মিশ্রিত করে ফেলেছে । অথচ আল্লাহ এ উম্মাতের জন্য একজন মাত্র রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁরই অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাঁর বিরোধিতা নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, و ما اتاكم الرسول فخذوه و ما نهاكم عنه فانتهوا ‘‘রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক।’’ (আল হাশর : ৮) যদি মাযহাবের ইমামগণের অভিমত ও তাঁদের অনুসরণ করা বান্দার জন্য দলীল বলে গণ্য হতো, তাহলে এ উম্মাতের জন্য যত অভিমতের অধিকারী রয়েছে, তত সংখ্যক রাসূলের আবশ্যক হতো। আল্লাহর বিতাব, রাসূলের সুন্নাহ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাললাম হতে এতদোভয়ের গ্রহণকারী বিদ্যমান থাকতে এবং তাদের বোধশক্তি ও বুদ্ধি বৃত্তির অধিকারী হওয়া সত্বেও মুকাল্লিদগণের বিভিন্ন ব্যক্তির রায় বা অভিমত গ্রহণ করা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক গাফলতি ও সত্য হতে বড় ধরনের বিচ্যুতি।
(খ) সূরা আততাওবার ৩১ নং সায়াত
اتخذوا احبارهم و رحبانهم أربابا من دون الله و المسيح ابن مريم و ما أمروا إلا ليعبدوا إلها واحدا لا اله إلا هو سبحانه عما يشركون
‘‘তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পন্ডিত ও পুরোহিতদেরকে এবং মারইয়াম তনয় ‘ঈসাকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে শুধু এক ইলাহর ‘ইবাদাত করার জন্য। তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তারা যা কিছু শরীক করে তা থেকে তিনি পবিত্র।’’ এ আয়াত থেকে দলীল গ্রহণ করে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী বলেন, ‘‘এ আয়াতে বিবেকবান লোকদেরকে আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাকলীদ ও কুরআন-সুন্নাহর উপর পূর্ববর্তীদের কথাকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে কঠোরভাবে ধমকানো হয়েছে। কেননা নস তথা কুরআন-সুন্নাহয় যা এসেছে, এবং আল্লাহ প্রদত্ত দলীল-প্রমাণাদির দ্বারা যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার বিপরীতে মাযহাবের কারো কথার বা এ উম্মাতের কোন ‘আলিমের তরীকাকে অনুসরণ করা ইহুদী ও নাসারাদের আল্লাহকে বাদ দিয়ে পন্ডিত-পুরোহিতদেরকে রব হিসেবে গ্রহণের শামিল। কারণ এটা প্রমাণিত যে, ইহুদী-নাসারা তাদের পন্ডিত-পুরোহিতদের ‘ইবাদাত করতো না বরং তাদের আনুগত্য করতো এবং তাদের হালাল করা বস্ত্তকে হালাল ও হারাম করা বস্ত্তকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করতো। আর এ উম্মাতের মুকাল্লিদরাও এ কাজই করে থাকে। এ কাজ মূলত: ইহুদী-নাসারাদের কাজের পরিপূর্ণ সাদৃশ্যের নামান্তর।’’
(গ) সূরা আল আম্বিয়ার ৫২, ৫৩ ও ৫৪ নং আয়াত
اذ قال لابيه و قومه ما هذه التماثل التي انتم لها عاكفون- قالوا وجدنا أباءنا لها عابدون- قال لقد كنتم انتم و أباءكم في ضلال مبين
‘‘যখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পিতা ও স্বীয় সম্প্রদায়কে বললেন, এ মূর্তিগুলো কী যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছ? তারা বলল, আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে এ গুলোর পূজা করতে দেখেছি। তিনি বললেন, তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা প্রকাশ্য গোমরাহীতে লিপ্ত।’’
এ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী বলেন,. ‘‘এখানে আমরা মুকাল্লিদদের নিন্দাবাদ লক্ষ্য করি। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) মূর্তিপূজার কারণ জিজ্ঞেস করায় মুশরিকরা যেমন উত্তর দিয়েছিল যে, আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে এ গুলোর ইবাদাত করতে দেখেছি, অনুরূপভাবে ইসলামী মিল্লাতের মধ্য হতে যারা মুকাল্লিদ তারাও এ ধরনের উত্তরই দিয়ে থাকে। কেননা কুরআন-সুন্নাহর বিজ্ঞ ব্যক্তি যখন দলীল বিরোধী কোনো রায় (অভিমত) এর দ্বারা ‘আমলকে অস্বীকার করে, তখন তারা বলে, ‘এটা তো আমাদের ইমাম বলেছেন, যার অনুকরণ করতে ও যার রায় গ্রহণ করতে আমরা আমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেখে আসছি’। তাদের এ ধরনের ভক্তির জবাব, যা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এখানে দিয়েছেন, নি:সন্দেহে তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষগণ সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে লিপ্ত।’’ অর্থাৎ এমন প্রকাশ্য ক্ষতিতে লিপ্ত, যা কারো নিকট অস্পষ্ট নয় এবং কোন বিবেকবান ব্যক্তির নিকট তা সংশয়যুক্ত নয়। কারণ ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায় এমন মূর্তির পূজা করত যা কারো কোন ক্ষতি বা উপকার করতে এবং শ্রবণ বা দর্শন কতে সক্ষম ছিলনা। এর চেয়ে বড় ভ্রান্তি ও ক্ষতি আর কিছুই হতে পারে না। আর মুসলিমদের মধ্যে যারা মুকাল্লিদ, তারা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহর পরিবর্তে এমন কোন গ্রন্থকে গ্রহণ করে, যেখানে কোন ‘আলিমের ইজতিহাদ সংকলন করা হয়।’’
তাকলীদের ব্যাপারে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী যে চিন্তাধারা পোষণ করতেন, তা সঠিক এবং জামহুর ইমামগণের চিন্তাধারার অনুকূল। চার ইমামসহ অন্যান্য
চিন্তাবিদদের মতামতও অনুরূপ।
তাকলীদের ব্যাপারে ইমামগণের অভিমত
চার ইমামসহ অন্যান্য সকল ইমাম তাকলীদ করতে নিষেধ করেছেন। তাঁরা কুরআন-সুন্নাহর দলীলের বর্তমানে তাঁদের কথার অনুসরণ করার অনুমতি দেননি। তাকলীদের ব্যাপারে বিভিন্ন ইমামের মতামত নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো :

১. ইমাম আবু হ.vনিফা (রহ.) এর অভিমত : তাকলীদ নয়, বরং হাদীছের উপর ‘আমল করার প্রতিই তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেন,
اذا صح الحديث فهو مذهبى
‘‘কোন হাদীছ সহীহ্ বলে প্রমাণিত হলে সেটিই আমার মাযহাব’’
روى عن ابى حنيفة انه كان يقول لا ينبغى لمن لم يعرف دليلى ان يفتى بكلامى وكان اذا افتى يقول هذا رأى النعمان بن ثابت يعنى نفسه وهواحسن ما قدرنا عليه فمن جاء باحسن منه فهواولى بالصواب
‘‘ইমাম আবু হ.vনীফা (রহ.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি আমার দলীল সম্পর্কে অবহিত নয়, তার জন্য আমার কথার দ্বারা ফাত্ওয়া দেয়া উচিৎ নয়। তিনি যখন ফাত্ওয়া দিতেন, তখন বলে দিতেন, এটা নু‘মান ইবন ছাবিতের (নিজেকে বুঝাতেন) অভিমত। আমাদের যে সামর্থ রয়েছে, সে অনুযায়ী এটা উত্তম। যদি কেউ এর চেয়ে উত্তম কিছু নিয়ে আসে তাহলে সঠিক হওয়ার জন্য সেটিই ভাল।’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা কোথা থেকে বলেছি, তা না জেনে আমাদের কথার দ্বারা কোন কিছু বলা কারো জন্য জায়িয নয়।’’

২. ইমাম শাফি‘ঈ (রহ.)-এর অভিমত,
مثل الذى يطلب العلم بلا حجة كمثل حاطب ليل يحمل حزمة حطب، و فيه افعى تلدغه و لا يدرى
‘‘যে ব্যক্তি যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া জ্ঞান অন্বেষণ করে, তার উদাহরণ হলো রাত্রিবেলা লাকড়ী সংগ্রহকারী ব্যক্তির ন্যায়। সে লাকড়ীর বোঝা বহন করে যাতে সর্প রয়েছে এবং যা তার অজান্তেই তাকে ছোবল মারে।’’
মুযানী তাঁর মুখতাসারে বলেন, نهى الشافعى عن تقليده و تقليد غيره
‘‘শাফি‘ঈ (রহ.) তাঁর এবং অন্য কারো তাকলীদ করতে নিষেধ করেছেন।’’ তিনি আরো বলেন,
اذا صح الحديث فهو مذهبى ‘‘হাদীছ যদি বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটিই আমার মাযহাব।’’
لو رأيت كلامى يخالف الحديث فاعملوا بالحديث و اضربوا بكلامى الحائط
‘‘যদি তোমরা আমার কথাকে হাদীছের বিরোধী দেখতে পাও, তাহলে হাদীছের ওপর ‘আমল কর এবং আমার কথাকে দেওয়ালে ছুঁড়ে মার।’’ তিনি আরো বলেন,
اجمع المسلمون على ان من استبانت له سنة من رسول الله صلى الله عليه و سلم لم يحل له ان يدعها لقول احد ‘‘মুসলিমগণ এ বিষয়ে একমত (اجماع) হয়েছে যে, যার নিকট রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীছ সুস্পষ্ট হয়েছে, তার জন্য অন্য কারো কথায় তা বর্জন করা জায়িয নয়।’’
তিনি আরো বলেন, مهما قلت من قول او اصلت من اصل فبلغ عن رسول الله صلى الله عليه و سلم خلاف ما قلت فالقول ما قاله صلى الله عليه و سلم
‘‘যখনই আমি কোন কথা বলি বা কোন মূলনীতি নির্ধারণ করি, তা যদি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কথার বিপরীত হয়, তাহলে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কথাই গ্রহণযোগ্য হবে।’’
৩. ইমাম মালিক (রহ)-এর অভিমত :
ما من احد الا و هو مأخوذ من كلامه و مردود عليه الا رسول الله صلى الله عليه وسلم
‘‘রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত অন্য সকলের কথা গ্রহণযোগ্য এবং প্রত্যাখ্যানযোগ্য উভয়ই হতে পারে। (কিন্তু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সকল কথাই গ্রহণযোগ্য)
৪. ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ)-এর অভিমত : ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেন, আমি ইমাম আহমাদকে বললাম, মালিকের চেয়ে তো আওযা‘ঈ অধিকতর অনুসরণযোগ্য। উত্তরে তিনি বললেন,
لا تقلد دينك احدا من هؤلاء، ما جاء عن النبى صلى الله عليه و سلم و اصحابه فخذ به ثم التابعى بعد الرجل فيه مخير
‘‘তুমি তোমার দ্বীনকে এঁদের কারো তাকলীদে পরিণত করোনা। বরং যা কিছু নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবীগণের পক্ষ হতে আসে তা গ্রহণ কর। অত:পর তাবিঈদের কথা। এর পর সে বিষয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে (গ্রহণ করা না করার)।’’ তিনি আরো বলেন,
لا ةقلدنى ولا ةقلدن مالكا و لا اوزاعى و لا النخعى و لا غيرهم و خذ الاحكام من حيث اخذوا من الكةاب و السنة
‘‘তুমি আমার, মালিকের, আওযা‘ঈর, নাখ‘ঈ বা অন্য কারো তাকলীদ করোনা। বরং তারা যে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আহকামসমূহ গ্রহণ করেছে তুমিও সেখান থেকেই গ্রহণ কর।’’
৫. ইমাম আবু ইউসুফ (রহ), ইমাম যুফার (রহ)-এর অভিমত,
لا يحل لاحد ان يفتى بقولنا ما لم يعلم من اين قلنا
‘‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোথা থেকে বলেছি তা না জানবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কথা দ্বারা ফাত্ওয়া দেয়া কারো জন্য বৈধ নয়।’’
৬. ইবন হাযম (রহ)-এর অভিমত, التقليد حرام لا يحل لاحد ان يأخذ قول احد غير رسول الله صلى الله عليه وسلم بلا برهان
‘‘তাকলীদ সম্পূর্ণ হারাম। কারো জন্য এটা জায়িয নয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত অন্য কারো কথা বিনা প্রমাণে গ্রহণ করবে।’’
৭. ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ)-এর অভিমত
‘‘অন্ধ অনুসরণকারী এক অনির্ভরযোগ্য ভিত্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। আর তাতে বিবেক-বুদ্ধিকে সম্পূর্ণ অকেজো করে রাখা হয়। বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তা-বিবেচনা শক্তি মানুষের জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত একটি মহৎ গুণ। তাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণের নীতি গ্রহণ করা হলে এ মহৎ গুণের যাবতীয় কল্যাণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা হয়। যার হাতে আলোর মশাল রয়েছে সে যদি তা নিভিয়ে অন্ধকারে পথ চলতে শুরু করে, তবে তার এ হাস্যকর আচরণ কোনক্রমেই যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত হতে পারে না।’’
প্রশংসনীয় তাকলীদ
অতিভক্তি, অন্ধভক্তি ও গোঁড়ামির বশবর্তী হয়ে নসকে বর্জন করে যে তাকলীদ করা হয়, তা শারী‘আতের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ। উপরে তার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে। কিন্তু সকল তাকলীদই নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তা প্রয়োজন হয়ে পড়ে এবং কোন কোন তাকলীদ প্রশংসাযোগ্য হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে ‘আল্লামা হাফিয ইবনুল কাইয়্যিম যে অভিমত প্রদান করেছেন, তা এখানে উল্লেখ করা হলো :
‘আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিমের মতে চিন্তা-গবেষণা ও যথাসাধ্য চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণে ব্রতী হওয়াই একজন ‘আলিম বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির কর্তব্য। কিন্তু যথাসাধ্য প্রচেষ্টার পরও যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়টি তার নিকট অস্পষ্ট থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে আন্দাজ-অনুমান করে কোন ফায়সালা প্রদান বা ‘আমল করা ঠিক নয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে তার চেয়ে অধিকতর জ্ঞানী ব্যক্তির তাকলীদ বা অনুকরণ করাই যুক্তিযুক্ত। এ ধরনের তাকলীদ নিন্দনীয় বা নিষিদ্ধ নয়; বরং প্রশংসনীয় ও পুণ্যের। এ প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়্যিম বলেন,
وأما تقليد من بذل جهده فى اتياع ما انزل الله، وخفى عليه بعضه، فقلده فيه من هو اعلم منه، فهذا محمود غير مذموم، مأجور غير مأزور
‘‘আল্লাহর নাযিল করা বিধানের অনুসরণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানোর পরও যদি কিছু বিষয় তার নিকট অস্পষ্ট থাকে, অত:পর সেক্ষেত্রে যদি তার অপেক্ষা অধিকতর কোন জ্ঞানী ব্যক্তির তাকলীদ করে, তাহলে এ ধরনের তাকলীদ নিন্দনীয় নয়, বরং প্রশংসনীয়, পাপের নয়, বরং পুণ্যের।’’
তবে এ ধরনের ক্ষেত্রে যার তাকলীদ করা হবে, সে ব্যক্তিকে অবশ্যই তার চেয়ে বিজ্ঞ হতে হবে। তার সমকক্ষ বা তার চেয়ে কম বিজ্ঞ হলে, সে ধরনের ব্যক্তির তাকলীদ করা জায়িয হবে না। এক্ষেত্রে ইবনুল ক.ায়্যিম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন,
يجوز للعالم تقليد من هو أعلم منه، ولا يجوز له تقليد من هو مثله
‘‘কোন ‘আলিম বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির জন্য তদপেক্ষা অধিক জ্ঞানী বা ‘আলিম ব্যক্তির তাকলীদ করা বৈধ। তবে তার সমকক্ষ কোন ব্যক্তির তাকলীদ করা বৈধ নয়।’’
আবশ্যকীয় তাকলীদ
ইবনুল কাইয়্যিমের মতে তাকলীদ কখনো কখনো আবশ্যক হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে তিনি উবাই এর উক্তি উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, ما استبان لك فاعمل به، و ما اشتبه عليك فكله الى عالمه
‘‘যা তোমার নিকট সুস্পষ্ট হয়ে যায় তার ওপর ‘আমল কর, আর যা তোমার উপর সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করে, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যিনি বিজ্ঞ, তার উপর নির্ভর কর।’’
এ উক্তি উদ্ধৃত করার পর ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, ‘‘এটিই সঠিক। আর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত সকলের উপরই এমনটি হওয়া আবশ্যক। কেননা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত অন্য সকলের নিকটই এমন কিছু বিষয় আসে, যা সন্দেহ সৃষ্টি করে। আর যে বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তা তার চেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট সোপর্দ করা আবশ্যক। যদি উক্ত বিজ্ঞ ব্যক্তির বক্তব্যে বিষয়টি তার নিকট সুস্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সেও উক্ত বিষয়ে তাঁর সমান জ্ঞানী হয়ে যাবে, অন্যথায় তার উপরই নির্ভর করবে। কারণ যে বিষয়ে জ্ঞান নেই সে বিষয়ে তাকে দায়ী করা হবেনা।’’
ইবনুল কাইয়্যিম আরো বলেন, ‘‘আমাদের রবের কিতাব, আমাদের নবীর সুন্নাহ্ ও তাঁর সাহাবীগণের উক্তির আলোকেই এটা আমাদের জন্য আবশ্যক। যেহেতু আল্লাহ সুবহানাহু প্রত্যেক বিজ্ঞ ব্যক্তির উপর অধিকতর বিজ্ঞ ব্যক্তি সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং কোনো সঠিক বিষয় যদি কারো কাছে অস্পষ্ট থাকে, আর সে যদি তা তার চেয়ে অধিক বিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট সোপর্দ করে, তাহলে সে সঠিক কাজ করলো। কারণ এতে কুরআন, সুন্নাহ্ ও সাহাবায়ে কিরামের উক্তিকে উপেক্ষা করা হয়না, উক্ত ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে এর মানদন্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়না, তার কথার কারণে নস.কে বর্জন করা হয়না এবং তার সকল ফাত্ওয়া গ্রহণ করা ও তিনি যার বিরোধিতা করেছেন তার সকল কিছুকে প্রত্যাখ্যান করা হয়না।’’
ইবনুল কাইয়্যিমের মতে একান্ত প্রয়োজনবশত: অগত্যা তাকলীদের আশ্রয় নেয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। যেখানে কুরআন-সুন্নাহর কোন দলীল পাওয়া যায়না, সেখানে বাধ্য হয়েই অধিকতর বিজ্ঞ ব্যক্তির তাকলীদ করতে হয়। তাঁর মতে পূর্বকালের ইমামগণ খুব কম ক্ষেত্রে কখনো কখনো যে তাকলীদ করেছেন, তা কেবলমাত্র এ ধরনের ক্ষেত্রেই করেছেণ। তিনি বলেন, ‘‘কিছু কিছু মাসয়ালার ক্ষেত্রে ইমামদের তাকলীদের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা এজন্য যে, সে সকল ক্ষেত্রে তাঁরা আল্লাহ্ বা তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে সুস্পষ্ট কোন দলীল পাননি। সে সকল ক্ষেত্রে তাঁদের চেয়ে অধিকতর বিজ্ঞ ব্যক্তির উক্তি ব্যতীত কোন কিছু না পাওয়ায় তারা তাঁদের তাকলীদ করেছেন। এটা হলো জ্ঞানী ব্যক্তির কাজ এবং এটা আবশ্যক।’’
ইবনুল কাইয়্যিমের মতে, চরম সংকটকালে অগত্যা মৃত জন্তুর গোশ্ত খাওয়া যেমন বৈধ, তেমনি একান্ত প্রয়োজনের সময় তাকলীদ ব্যতীত গত্যন্তর না থাকলে সেক্ষেত্রেও তাকলীদ করা বৈধ। যে ক্ষেত্রে এমন জরুরী প্রয়োজন নেই সে ক্ষেত্রে তাকলীদ বৈধ নয়। তিনি বলেন, ‘‘তাকলীদ একান্ত প্রয়োজনবশত:ই কেবল বৈধ হয়। যে ব্যক্তি কুরআন, সুন্নাহ্, সাহাবীগণের উক্তি এবং দলীল-প্রমাণাদির দ্বারা সত্য উদঘাটনের সামর্থ থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে বাদ দিয়ে তাকলীদের দিকে ধাবিত হয়, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে জবেহ.&কৃত পবিত্র গোশ্তের সামর্থ থাকা সত্ত্বেও মৃত জন্তুর গোশ্ত ভক্ষণের দিকে ধাবিত হয়। কেননা মূলনীতি হলো এই যে, একান্ত জরুরত ব্যতীত অন্য কোন অবস্থায় কারো কথা বিনা দলীল-প্রমাণে গ্রহণ করা যাবে না।’’
কিন্তু জরুরী অবস্থাকে পুঁজি করে কোনভাবেই স্বাভাবিক অবস্থায় কারো তাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণের কোন সুযোগ নেই এবং তা বৈধও নয়।
আশ্ শাওকানীর মতে সকল প্রকার তাকলীদ-ই অবৈধ
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী সকল প্রকার তাকলীদকেই অবৈধ গণ্য করতেন। তিনি সাধারণ এবং অজ্ঞ লোকদের জন্যও কোন ‘আলিমের তাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণ বৈধ গণ্য করতেন না। তাঁর মতে অজ্ঞ ও সাধারণ লোকেরা শুধুমাত্র কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে ‘আলিম ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করতেন এবং তিনি কুরআন-সুন্নাহর দলীল যা জানতেন, তার আলোকে ফাতওয়া দিতেন। এটা কোন তাকলীদ ছিলনা, বরং এটা ছিল কোন বিষয়ে আল্লাহর হুকুম কী এবং শরী‘আতের দলীল কী তা জানতে চাওয়া। কারণ তাকলীদ হলো রিওয়ায়াতের ভিত্তিতে ‘আমল না করে কোন ব্যক্তির রায় বা ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে ‘আমল করার নাম ।
فاسألوا اهل الذكر ‘তোমরা জ্ঞানবান ব্যক্তিদের নিকট জিজ্ঞেস কর’ এ আয়াত দ্বারা সাধারণ ও অজ্ঞ লোকদের তাকলীদ বৈধ হওয়ার পক্ষে যে দলীল দেয়া হয়, শাওকানীর মতে তা সঠিক নয়। কারণ এখানে জিজ্ঞেস করা বলতে বুঝানো হয়েছে কোন বিষয়ে আল্লাহর হুকুম কী সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাকে, এর দ্বারা কারো তাকলীদ করাকে বুঝানো হয়নি।
তাওয়াসসুল বা সৃষ্টির শরণাপন্ন হওয়া
বিপদাপদে সৃষ্টির শরণাপন্ন হওয়া অর্থাৎ বিপদের সময় নবী, ওয়ালী বা অন্য কোন সাধু-সজ্জন ব্যক্তি অথবা ফেরেশতাদেরকে ডাকা বা তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর নিকট বৈধ নয়। তিনি এটি শিরক ও গর্হিত কাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সূরা ইউনুস এর ৪৯ নং আয়াত:
قل لا املك لنفسي ضرا و لا نفعا الا ما شاء الله ‘‘বলে দিন(হে নবী), আমি আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত নিজের কল্যাণ বা অকল্যাণের কোন অধিকারী নই।’’ এর ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী বলেন, ‘‘আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ বিপদাপদ দূরীভূত করার ক্ষমতার অধিকারী না হওয়া সত্বেও যারা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ডাকা ও বিপদের সময় তাঁর নিকট ফরিয়াদ করাকে বৈধ মনে করে, তাদের জন্য এ আয়াতে উপদেশ ও কঠোর ধমক রয়েছে। অনুরূপভাবে এখানে তাদের জন্যও ধমক রয়েছে, যারা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এমন কিছু প্রার্থনা করে, যা দেওয়ার ক্ষমতা রাসূলের নেই, বরং শুধু আল্লাহরই রয়েছে । কেননা এটা শুধু সকল জাহানের রব আল্লাহর জন্যই মানানসই, যিনি নবীগণকে, সাধু-সজ্জন ব্যক্তিবর্গ ও সকল সৃষ্টকে সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে উপজীবিকা সরবরাহ করেন এবং জীবন ও মৃত্যু দান করেন।
সকল বিষয়ের উপর সর্ব শক্তিমান, স্রষ্টা, রিযকদাতা, দানকারী ও বারণকারী মহাপ্রভুর নিকট প্রার্থনা না করে, যারা প্রয়াজন পূরনে অক্ষম ও অপারগ, সে সকল নবী, ফেরেশতা ও সৎ কর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের নিকট প্রার্থনা কিভাবে বৈধ হতে পারে? তোমার উপদেশ গ্রহণের জন্য এ আয়াতই যথেষ্ট। কারণ মানব জাতির নেতা, সর্বশেষ রাসূলকে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন তাঁর বান্দাদেরকে বলে দেন, ‘আমি আমার নিজের ভাল-মন্দেরও মালিক নই, তাহলে তিনি কি করে অন্যের ভাল-মন্দের মালিক হতে পারেন ? তিনি ব্যতীত অন্যান্য ব্যক্তি, যাদের মর্যাদা ও স্থান তাঁর মত নয় তারা কি করে এর মালিক হতে পারে? সে সম্প্রদায়ের জন্য বিস্ময় যারা মাটির নীচে অবস্থিত মৃত ব্যক্তির কবরের নিকট গিয়ে প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা করে, অথচ তারা প্রয়োজন পূরণের মালিক নয়; বরং এর মালিক হলেন একমাত্র আল্লাহ। তারা যে এর মাধ্যমে শিরকে লিপ্ত রয়েছে, সে ব্যাপারে কেন তারা সচেতন হয় না ? কেন তারা সতর্ক হয় না যে তারা যা করছে, তা لا اله الا الله (আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই ) এ কথার বিপরীত এবং قل هو الله احد (বলুন, আল্লাহ হলেন এক ও একক ) আয়াতের দাবীর পরিপন্থী?
এর চেয়েও অধিক আশ্চর্যের হলো সে সকল ‘আলিমের বিষয়, যারা এগুলো সংঘটিত হতে দেখেও তাদেরকে বাধা দেয়না, পুরাতন জাহিলিয়াতের বা তার চেয়েও কঠিন জাহিলিয়াতের দিকে ফিরে যেতে দেখেও তাদেরকে বারণ করে না। এটি পুরাতন জাহিলিয়াতের চেয়েও জঘন্যতর এ কারণে যে, তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, রিযকদাতা, জীবন দানকারী, মৃত্যুদানকারী এবং অনিষ্ট ও কল্যাণের অধিকারী বলে স্বীকার করত। তারা মূর্তিগুলোকে আল্লাহর নিকট তাদের জন্য সুপারিশকারী ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম নির্ধারণ করত। কিন্তু এরা তাদেরকে (কবরবাসীকে) ভাল-মন্দের ক্ষমতার অধিকারী মনে করে কখনো তাদেরকে স্বতন্ত্রভাবে ডাকে, আবার কখনো বা আল্লাহর সঙ্গে তাদেরকে ডাকে (শরীক করে)।
নবী, ওয়ালী, সালফে সালেহীন প্রমুখের প্রতি অতিভক্তি বহু লোককে বিভ্রান্ত করেছে । তাদেরকে ওয়াসীলা করে বহু শিরক ও বিদ‘আতের প্রচলন হয়েছে। মূর্তি পূজার সূচনাও হয়েছে এ ভ্রান্ত চিন্তা ও ভক্তি থেকেই । বর্তমান যুগের কবর পূজা, মাজার পূজা এবং এগুলোকে কেন্দ্র করে যত শিরক ও বিদ‘আত সমাজে প্রচলিত হয়েছে তার উৎসও এটিই। ‘আল্লামা আশা্ শাওকানী এর ভিত্তিমূলে আঘাত করেছেন। তিনি এ সকল ভ্রান্ত কর্মকান্ড থেকে উম্মাহকে সতর্ক করেছেন এবং উম্মাহর নেতৃসহানীয় ব্যক্তি ‘আলিমগণকে সতর্ক করার জন্য আহবান জানিয়েছেন ।
মুতাশাবিহ (দ্ব্যর্থ বোধক) আয়াতের ক্ষেত্রে আশ্ শাওকানীর নীতি
কুরআন কারীমের যে সকল আয়াত দ্ব্যর্থ বোধক, অস্পষ্ট বা সাদৃশ্যপূর্ণ সে গুলোকে মুতাশাবিহ বলা হয় ।
‘‘তাঁর সিংহাসন সমস্ত আকাশ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে।’’ এর ব্যাখ্যায় আশ্ শাওকানী বলেন, কুরসীর বাহ্যিক অর্থ হলো এমন অবয়ব যার গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে প্রমাণাদি এসেছে যার বর্ণনা শীঘ্রই আসবে। অথচ একদল মু’তাযিলা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। বস্ত্তত: তারা সুস্পষ্ট ভুল ও জঘণ্য ভ্রান্তিতে লিপ্ত। পূর্ববর্তীদের কেউ কেউ কুরসী বলতে জ্ঞানকে বুঝিয়েছেন। ইবন জারীর এ মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন কুরসী হলো শক্তি যার দ্বারা আল্লাহ তা‘য়ালা আসমানসমূহ ও যমীনকে করায়ত্ব করে রেখেছেন। অনেকেই কুরসীর অর্থ করেছেন আরশ। আবার কেউ কেউ বলেন এটি হলো রাজত্ব। তবে সঠিক কথা হলো প্রথমটি। কারণ শুধু মাত্র কল্পনা ও ভ্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে এর প্রকৃত অর্থ থেকে অন্য দিকে পরিবর্তিত করার কোন সুযোগ নেই।’’
অনুরূপ ভাবে সূরা আল আ’রাফের ৫৪ নং আয়াতে
ان ربكم الله الذى خلق السموات والا رض فى ستة ايام ثم استوى على العرش
‘‘নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রভু আল্লাহ হলেন তিনি, যিনি আকাশসমূহ ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন।’’ এর ব্যাখ্যায় ‘আলিমগণ ১৪টি মতে বিভক্ত হয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে মানানসই ও সঠিক অর্থ সেটিই যেটি ‘সালফে সালিহীন’ করেছেন। আর তা হলো, আল্লাহ ‘আরশে সমাসীন হয়েছেন, তবে কিভাবে তা অজ্ঞাত, বরং তিনি সমাসীন হয়েছেন সেভাবে, যা তাঁর জন্য উপযোগী ও মানানসই এবং যা তাঁর জন্য বেমানান, তা থেকে মুক্ত ও পবিত্র অবস্থায়।’’
শহীদগণ জীবিত এবং তাদের প্রভুর নিকট হতে জীবিকা প্রাপ্ত হয়। এ ব্যাপারে সূরা আলে ইমরানের ১৬৯ নং আয়াত- ولا تحسبن الذين قتلوا فى سبل الله امواتا بل احياء عند ربهم يرزقون
‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত মনে করো না। বরং তারা জীবিতাবস্থায় তাদের প্রভুর নিকট উপজীবিকা প্রাপ্ত।’ এর তাফসীর করতে দিয়ে আশ্ শাওকানী বলেন, জামহুর (মুফাসসিরীন) এর মতে তাঁরা প্রকৃত ও বাস্তবিক পক্ষেই জীবিত (তবে কোথায় কিভাবে জীবিত রয়েছে) সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাদের কেউ বলেন, কবরে তাঁদের নিকট তাঁদের রূহকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ফলে তাঁরা জান্নাতের নি’আমত উপভোগ করতে পারেন। মুজাহিদ বলেন, তাঁরা জান্নাতের ফল ভোগ করেন। অর্থাৎ জান্নাতের ঘ্রাণ পান। তবে তাঁরা তার ভেতরে নন। জমহুর ব্যতীত অন্যদের মতে তাঁদের জীবন হলো রূপক অর্থে অর্থাৎ তারা আল্লাহর হুকুমে জান্নাতের নি‘আমতের অধিকারী। তবে এ ক্ষেত্রে সঠিক মত হলো প্রথমটি। কারণ এখানে রূপক অর্থের দিকে প্রত্যাবর্তনের কোন সুযোগ নেই। কেননা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের রূহ সবুজ পাখির উদরে থেকে জান্নাতের উপাজীবিকা ভক্ষণ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকে ।
ফিকহ এর ক্ষেত্রে আশ্ শাওকানীর নীতি
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী একজন মুজতাহিদ ছিলেন। তিনি নির্দিষ্ট কোন ইমাম বা মাযহাবের তাকলীদকে সমর্থন করতেন না। ফিকহী মাসয়ালার ক্ষেত্রে তাঁর মূলনীতি ছিল কুরআন সুন্নাহর দলীলের আলোকে যাচাই বাছাই করা। দলীল প্রমাণের দ্বারা যেটি সঠিক বলে প্রমাণিত হতো সেটিকেই গ্রহণ করতেন। সেটি কোন্ মাযহাবের বা ইমামের পক্ষে বা বিপক্ষে তা তিনি দেখতেন না। তাঁর মতে মাসয়ালা চয়ন করতে হবে দলীলের ভিত্তিতে। দলীল প্রমাণ ব্যতীত অন্ধ অনুকরণের ভিত্তিতে মাসয়ালা চয়নকে তিনি অগ্রহণযোগ্য মনে করতেন। এব্যাপারে তিনি আস্সায়লুল জারার আল মুদাফফিক আল হাদাইকিল আযহার নামক একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন।
এ গ্রন্থে তিনি মাসয়ালা মাসায়িল চয়নের মূলনীতি সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর মূল বক্তব্য হলো মাসয়ালা অবশ্যই দলীল দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। যা দলীল সমর্থিত নয় তা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি নিন্দিত তাকলীদকে পরিহার করে দলীলের দিকে মনোনিবেশ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি হানাফী, শাফিঈ বা অন্য কোন মাযহাবের ফিকহী কোন মাসয়ালা পেলে তাকে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা‘ দ্বারা পরখ করে যেটিকে সঠিক পেতেন, সেটিকেই গ্রহণ করতেন। ফিকহের ক্ষেত্রে এটিই ছিল তার অবলমিবত নীতি।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর সাহিত্য ও কাব্য প্রতিভা
‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর সাহিত্য ও কাব্য প্রতিভাও ছিল উল্লেখযোগ্য। আনুষ্ঠানিক পড়ালেখার শুরুতেই তিনি ইতিহাস অধ্যয়ন ও সাহিত্য সভায় যোগদানে মশগুল হয়ে পড়েন। তিনি নাহু, সরফ, অলংকার শাস্ত্র, ছন্দ প্রকরণ বিদ্যা প্রভৃতি গভীর অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করেন। সে সময়ের ভাষাবিদ পন্ডিতদেয় নিকট হতে ভাষা, সাহিত্য, ব্যাকরণ, অলংকার শাস্ত্র, ছন্দ প্রকরণ বিদ্যা প্রভৃতি শিক্ষা করে সাহিত্য ও কাব্য ক্ষেত্রে তিনি ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ফলে তিনি বিশুদ্ধ ভাষা ও অলংকারপূর্ণ সাহিত্য কীর্তির অধিকারী হন। তিনি আলংকারিক, শৈল্পিক, সাবলীল ও ছন্দময় গদ্য রচনায় যেমন পারদর্শী ছিলেন, তেমনি কাব্য রচনায়ও ছিলেন সুদক্ষ। তিনি অনায়াসেই সল্পতম সময়ের মধ্যে বড় বড় কবিতা রচনা করতে পারতেন। আশ্ শাওকানীর কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে তাঁর অন্যতম শিক্ষক ‘আলী ইবন ইবরাহীম (১১৩৯ ০- ১২০৭ হি.) বলেন,
‘‘তিনি কবিতা ও কাসীদা রচনায় খুবই পারদর্শী ছিলেন। আর তিনি কবিতার আলোকে কথাও বলতে পারতেন। অতি দ্রুততার সাথে তাঁর কাসীদা ও ছন্দ কবিতা রচনায় লোকেরা মুগ্ধ হয়ে যেতেন এবং তাঁর প্রসংশায় পঞ্চমুখ হতেন। আলংকারিক বিচারে তাঁর কবিতা ছিল অতুলনীয়।
তাঁর রচিত বিভিন্ন কবিতার অংশ বিশেষ নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো :
اذ ا كان هذا الدمع يجرى صبابه ـ على غير ليلى فهو دمع مضيع
وكيف ترى لبلى بعين تري بها ـ سواها وما طهرتها با لمدامع
ويلتذ منها بالحديث وقد جرى ـ حديث سواها خروت المسامع ١.
الا ان وادى الجزع اضحى ترابه ـ من المس كا فورا واعواده زبدا
وما ذ لك الا ان هذا عشية ـ تمشت وجرت فى جوانبه بردا ٢.
انا راض بما قضى ـ واقف نحت حكمه
مسا ئل ان افوز بالخير ـ ومن حسن ختمه ٣.
العفو يرجى من بنى ادم - فكيف لا يرجى من الرب
فانه أرأف يى منهم ـ حسبى به حسي به حسبي ٤.

‘আল্লামা আশ্ শাওকানী মাঝে মধ্যে কবিতার মাধ্যমে তাঁর শিক্ষক ও অন্যান্যদের নিকট পত্র বিনিময় করতেন। তাঁর নিকট কেউ কবিতার মাধ্যমে পত্র দিলে তিনি কবিতার মাধ্যমেই তার জবাব দিতেন। তাঁর অন্যতম ছাত্র লুৎফুল্লাহ ইবন আহমাদ তাঁর নিকট কাসীদা লিখে পাঠালে তিনি তার উত্তরে নিম্নোক্ত কাসীদাটি লিখে পাঠান।
اتي منك يا فخر الاوان و زينة الزمان ু نظام دونه الجوهر الفرد
كما الدر لا بل كالدراري بل غدا - كبدر السماء لا بل هو الشمس اذ تبدو
و ما ذا عسي من لم يكن رب نصفه ু يقول و هل في مثل ذا يحسن الجحد
و خر شمس الافق و هي منيرة ু اذا ضعفت عن نورها الا عين الرمد
و ما ذا علي البحر الخضم لدي الوري ু اذا بال في احدي جوانيه الفرد
و ما عيب بيضاء الترائب في الدني - اذا عافها ذو عفة ما له جهد
و من قال هذا الشهد مر فقل له - مرارة فيك المرء مر بها الشهد
و ان فاله هذا السيف ليس بقاطع - فقل حده ما بيننا الفصل و الحد
مناقب لطف اللهجلت فمن غدا - يرددها جهلا بها بطل الرد
فتي قد ورتي في مدرج العز و ارتدي - بثوب الهدي و انقاد طوعا له المجد
و سيوًدده كل باب من العلي - بزعم اعاديه هو السوًدد و العد

আশ্ শাওকানী তার শিক্ষক ‘আল্লামা আল কাসিম ইবন ইয়াহ্ইয়া আল খাওলানীর নিকট কয়েকটি কিতাব পাঠ করতে চেয়ে যে কাব্য পত্র লিখেছিলেন, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

عز دين الاله حافظ علم الال ু ال النبي خير البرية
و جمع العلوم فرعا و اصلا - و لسانا لديه غير خفية
انة فخر الزمان زينة اهله - جمال العلا و كريم السجية
و لك النثر و النظام الذي قد - صفته من كواكب درية
كل من يدعي صفاتك في العلم - فامنيه له اشعبيه
قد طلبةم مني انجار وعد - ان هذا لدي عكس القصية
فحقيق ان اكون انا الطالب - منك الافادة الاكملية
بل جدير لمن ةصدر مثلي - و هو في رنبة القصور الدنية
ان يقوم العزيز خير مقر - بمعان بفكره لوذيعه
زادك الله في المعاني صعودا - بكرة في مسرة و عشيه

‘আল্লামা আশ্ শাওকানী দু’টি কাব্য গ্রন্থও রচনা করেছেন। তার একটির নাম হলো ‘বুগিয়াতুল আরীব মিম মা‘আনিল লাবীব’ এবং অন্যটির নাম হলো ‘কিফায়াতুল মুহতাজ’।
এ গ্রন্থ দু’টিতে তিনি তাঁর নিজের লেখা কবিতা এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর নিকট যাঁরা কবিতা লিখে পাঠিয়েছেন, সেগুলোকে একত্রিত করেছেন।
এ আলোচনা থেকে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর কাব্য প্রতিভা এবং সাহিত্য জগতে তাঁর সরব পদচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।
‘আল্লামা আশ্ শাওকানীর ‘আকীদা
‘আকীদা-বিশ্বাস একটি গুরুতপূর্ণব বিষয়। কোন ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও কর্মকান্ড তাঁর ‘আকীদা বিশ্বাসের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। মূলত: ‘আকিদার প্রতিফলনই কর্মকান্ডে প্রতিফলিত হয়। ‘আকীদা-বিশ্বাসের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতার উপর ‘আমল গৃহীত হওয়া না হওয়া নির্ভরশীল। প্রকৃত পক্ষে ‘আকীদা-বিশ্বাসেরই অপর নাম হলো ঈমান। কারণ সন্দেহ-সংশয় মুক্ত অকাট্য বিশ্বাসের নামই ‘আকীদা। ঈমানও এরই সমার্থক। ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী একজন স্বচ্ছ ও সঠিক চিন্তার অধিকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কুরআন-সুন্নাহর সঠিক নির্দেশনা গ্রহণ ও বিশুদ্ধ চিন্তার অধিকারী হওয়ায় তাঁর ‘আকীদাও ছিল নির্ভুল।
তিনি ছিলেন আহলে সুন্নাহ ওয়ালা জামা‘আতের সালফে সালেহীন এর ‘আকীদা-বিশ্বাসের ধারক ও বাহক। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর ‘আকীদা বিশ্বাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘‘আশ্ শাওকানীর ‘আকীদা ছিল সালফে সালেহীনের ‘আকীদার অনুরূপ। বিশেষত: আল্লাহ তা‘আলার সিফাত, (গুণাবলী) কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন ছাড়াই হুবহু (শাব্দিক অর্থে) সেভাবেই গ্রহণ করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি ‘আত্ তাহফু বি-মাযহাবিস সালফ’ নামক একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন।’’
সুতরাং প্রথম দিকে তিনি যায়দিয়া মাযহাবের অনুসরণ করলেও তাঁর ‘আকীদা-বিশ্বাসে ছিল আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ‘আকীদা বিশ্বাস। নির্ভুল চিন্তা ও সঠিক ‘আকীদা-বিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন বলেই তিনি যায়দিয়া মাযহাব পরিত্যাগ করেন।
যায়দিয়া মাযহাব ও আশ্ শাওকানী
প্রথম দিকে তিনি যায়দিয়া মাযহাবের অনুসরণ করলেও তাঁর ‘আকীদা-বিশ্বাসে ছিল আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ‘আকীদা বিশ্বাস। নির্ভুল চিন্তা ও সঠিক ‘আকীদা-বিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন বলেই তিনি যায়দিয়া মাযহাব পরিত্যাগ করেন। যায়দিয়া মাযহাব পরিত্যাগ করা স্বত্ত্বেও অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে যায়দিয়া মাযহাবের অনুসারী হওয়ার অভিযোগ আরোপ করেন। এর করণ তিনি যায়দিয়াদের প্রসিদ্ধ ‘আলিম ও রাজনৈতিক নেতা আহমাদ ইবন ইয়াহ্ইয়া আল মাহদীর গ্রন্থ ‘‘আল আযহার’’ এর শরাহ (ব্যাখ্যা) লেখেন এবং তার নাম দেন ‘‘আস্ সায়লুল জারার আল্ মুদাফ্ফিক ‘আলা হাদাইকিল আযহার’’। কিন্তু এ অভিযোগ একবারেই ভিত্তিহীন। কেননা এ শরাহ লিখতে গিয়ে তিনি সর্বদাই সুন্নাহর সাথে যুক্ত থেকেছেন এবং যায়দিয়াদের বিদ‘আত থেকে সুস্পষ্টভাবে দূরে অবস্থান করেছেন। এ গ্রন্থের যেখানেই তিনি সুন্নাহর বিরোধিতা ও বিদ‘আতের অনুসরণ লক্ষ্য করেছেন, সেখানেই তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহর সঠিক নির্দেশিকা তুলে ধরেছেন।
এ প্রসঙ্গে ‘আব্দুল হাকীম কাজীর একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ‘‘একদা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকের সাথে এক বৈঠকে ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, আশ্ শাওকানী তো যায়দী ছিলেন। আমি বললাম, তিনি যে যায়দী ছিলেন তার প্রমাণ কি? তিনি বললেন, যায়দিয়াদের কিতার আল আযহার এর শরাহ্ লেখাই এর প্রকৃষ্টতম প্রমাণ; কারণ আল আযহার হলো যায়দিয়াদের গ্রন্থ। আমি বললাম, এ গ্রন্থই তাঁর সুন্নী ও সালফী হওয়ার প্রমাণ। বস্ত্তত: যায়দিয়াদেও মধ্যে বেড়ে উঠা ব্যতীত যায়দী হওয়ার আর কোন পরিচয় তার মধ্যে পাওয়া যায়না। আপনি যদি আল আযহার গ্রন্থের ফিকহী মাসয়ালাসমূহ অনুসন্ধান করে দেখেন, তাহলে সেখানে যায়দিয়াদের চিন্তাধারা এবং আশ্ শাওকানীর শরাহ্র মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা থেকেই আমার কথার সত্যতা পেয়ে যাবেন। উদাহরণস্বরূপ আল আযহার গ্রন্থের নিম্নলিখিত মাসয়ালাটি দেখা যেতে পারে। আল আযহার গ্রন্থের লেখক জানাযার অধ্যায়ে ফি মকরূহাতিল কুবুর পরিচ্ছেদে বলেন, ‘‘মর্যাদাবান ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো কবর উঁচু করা মাকরূহ্। অর্থাৎ কবর উঁচু করা মাকরূহ। তবে যদি কোন ব্যক্তি মর্যাদাশালী ও নেতৃস্থানীয় হয়, তাহলে তার কবর উঁচু করা মাকরূহ্ নয়; বরং জায়িয। সাধারণভাবে শী‘আ মাযহাবের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে এটি প্রচলিত হয়েছে।’’এর ব্যাখ্যায় আশ্ শাওকানী বলেন, ‘‘এটা মূলত: সংশ্লিষ্ট লোকদের এক ধরনের প্রতারণা। বিশেষত: শাসক ও অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে যারা তাদের কবরসমূহকে উঁচু করে এবং তার উপর গম্বুজ নির্মাণ করে। এটা বিশুদ্ধ ও প্রমাণিত দলীল দ্বারা হারাম। এটি সহীহ্ (বুখারী) ও অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে বহু সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় ‘ইলমে ইয়াকীন (নিশ্চিত জ্ঞান) কে আবশ্যক করে।’’ এমনকি তিনি বলেন, হায়! আমি বুঝতে পারিনা যে, বিশিষ্টজনদের কবর উঁচু করার কি কারণ থাকতে পারে? কেননা, অন্যদের চেয়ে তাদের কবরের ক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসরণ করা এবং শারী‘আত লোকদের জন্য যা হারাম করেছে, তা বর্জন করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।’’২০২ক
এ গ্রন্থে আশ্ শাওকানী যেখানেই যায়দিয়াদের ভ্রান্ত ‘আকীদা, ভুল মাসয়ালা ও বিদ‘আতের সন্ধান পেয়েছেন, সেখানে তার প্রতিবাদ করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যা সঠিক তা উপস্থাপন করেছেন।
সুতরাং এ গ্রন্থের শরাহ্ লেখা তার যায়দিয়া হওয়ার প্রমাণ নয়; বরং এর বিপরীত তাঁর সুন্নী ও সালফী হওয়ারই প্রমাণ।

মু‘তাযিলা ‘আকীদা ও আশ্ শাওকানী
মু‘তাযিলা সম্প্রদায়ের সঙ্গে যায়দিয়া সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য ও সংযোগ সুস্পষ্ট। যায়দিয়াদের ইমাম যায়িদ ইবন ‘ধালীর উক্তি বহু ক্ষেত্রে মু‘তাযিলাদের সঙ্গে মিলে গিয়েছে।২০২খ মু‘তাযিলা সম্প্রদায়ের চিন্তাধারা ও যায়দিয়াদের চিন্তাধারার মধ্যকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন। ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী যায়দিয়াদের মধ্যে বেড়ে উঠা স্বত্ত্বেও মু‘তাযিলাদের চিন্তার দ্বারা সামান্যতমও প্রভাবিত হননি। বরং তিনি ছিলেন এর কট্টর সমালোচক ও প্রতিরোধকারী। আশ্ শাওকানী যে মু‘তাযিলা চিন্তাধারার বিরোধী ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় নিম্নলিখিত আয়াতের তাফসীরে।و نودوا ان تلكم الجنة اورثتموها بما كنتم تعملون ‘‘তাদেরকে ডেকে বলা হবে, এটিই সে জান্নাত তোমাদেরকে যার উত্তরাধিকারী করা হয়েছে কর্মের বিনিময়ে।’’ (আল্ আ‘রাফ : ৪৩) মু‘তাযিলা চিন্তাধারার অনুসারী ‘আল্লামা যামাখশারী তাফসীরে কাশ্শাফে এর ব্যাখ্যা করে বলেন, بما كنتم تعلمون এর অর্থ হলো, ‘তোমাদের ‘আমলের কারণে, কোন প্রকার অনুগ্রহে নয়, যেমন বাতিল পন্থীরা বলে থাকে’। এরপর আশ্ শাওকানী বলেন, ‘‘আমি বলি, ওহে মিসকীন, এ কথা (আল্লাহর অনুগ্রহে জান্নাত লাভের কথা) বলেছেন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে তাঁর থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত রয়েছে,
سددوا و قاربوا و اعملوا إته لن يدخل احد الجنة بعمله قالوا و لا انت يا رسول الله قال و لا انا إلا ان يتغمدني الله برحمته
২০২ ক. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ১৫ (আস্ সায়লুল জারার, খ. ১, পৃ. ৩৬৭-৩৬৮ এ উদ্ধৃতিতে)
২০২ খ. প্রাগুক্ত।
‘‘তোমরা সঠিক পথে চল, পরস্পরে মিলে-মিশে থাক এবং ‘আমল কর; কেননা শুধু ‘আমলের দ্বারা কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা। সাহাবীগণ বললে, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনিও নন? তিনি বললেন, আমিও নই। তবে আল্লাহ আমাকে স্বীয় অনুগ্রহ দ্বারা আচ্ছাদিত করে রেখেছেন।’’ যদি ‘আমলের জন্য ‘আমলকারীর উপর আল্লাহর অনুগ্রহ না থাকত, তাহলে আদৌ কোন ‘আমলই হতো না। তাছাড়া কুরআন কারীমে রয়েছে, ذلك الفضل من الله ‘‘এটা আল্লাহর পক্ষ হতে অনুগ্রহ’’। (আন্ নিসা : ৭০) কুরআনে আরো রয়েছে,فسيدخلهم في رحمته منه و فضل ‘শীঘ্রই তিনি তাদেরকে রহমত ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন।’’ (আন্ নিসা : ১৭৫) ২০২গ
সূরা আল বাকারার ৫৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়ও আশ্ শাওকানী মু‘তাযিলা মতবাদের বিরোধিতা করেছেন।
و اذا قلتم يا موسي لن نوًمن لك حتي نري الله جهرة فاخذتكم الصاعقة و انتم تنظرون
‘‘আর যখন তোমরা বললে, হে মুসা, আমরা কখখনো তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আল্লাহকে আমরা প্রকাশ্যভাবে দেখতে পাব। ফলে বিদ্যুৎ তোমাদেরকে পাকড়াও করল, আর তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।’’ এর ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী বলেন, ‘‘তাদেরকে বিদ্যুৎ দ্বারা পাকড়াও করে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল এ কারণে যে, তারা এমন বিষয়ের আবদার করেছিল, যে বিষয়ের অনুমোদন আল্লাহ দেননি। আর তা হলো দুনিয়াতে আল্লাহকে দেখা। মু‘তাযিলা এবং তাদের অনুসারীরা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় স্থানেই আল্লাহকে দেখার বিষয়টি অস্বীকার করে। পক্ষান্তরে তাদের বিরোধী একদল মনে করে দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় স্থানেই আল্লাহকে দেখা সম্ভব। অথচ সহীহ্ হাদীছসমূহে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, বান্দাগণ তাদের প্রভুকে আখিরাতে দেখতে পাবে। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত। সুতরাং এর বিপরীতে মু‘তাযিলাদের বিবেকপ্রসূত কথাবার্তা ও নীতিমালা গ্রহণের কোন সুযোগ নেই। এটি মূলত: তাদের একটি হটকারী দাবী এবং এমন নীতি যার দ্বারা কেবলমাত্র অজ্ঞ লোকেরাই প্রতারিত হতে পারে।’’২০২ঘ
এ আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি মু‘তাযিলা ‘আকীদার বিরোধী ছিলেন।

২০২ গ. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭।
২০২ ঘ. ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ২০১।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

‘আল্লামা আশ্ শাওকানী মুজাদ্দিদ ছিলেন কিনা
‘আল্লামা আশ্ শাওকানী একজন উঁচু মাপের মুজতাহিদ (গবেষক) ছিলেন। ইজতিহাদ তথা গবেষণা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাকলীদকে বর্জন করে ইজতিহাদের পন্থা অবলম্বন করায় সমসাময়িক মুকাল্লিদ সমর্থকদের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব-সংঘাতও হয়। কিন্তু তিনি মুজাদ্দিদ ছিলেন কিনা, সে বিষয়টি সুস্পষ্ট নয়। অন্যতম ইসলামী চিন্তাবিদ রশীদ রিজা তাঁকে হিজরী দ্বাদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ প্রসঙ্গে এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলামে বলা হয়েছে, Rashid Rida regarded him as the mudjaddid ‘‘Regenerator”of the 12th century A.H
শায়ক মুহাম্মাদ ‘আব্দুহু তাঁর খ্যাতনামা তাফসীরুল কুরআনিল হাকীম, যা তাফসীরে আল মানার নামে প্রসিদ্ধ, তাতেও আশ্ শাওকানীকে দ্বাদশ শতকের মুজাদ্দিদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাফসীরে আল মানারে বলা হয়েছে,
امام الجليل المجدد مجتهد اليمن في القرن الثاني عشر محمد ابن علي الشوكاني
‘‘দ্বাদশ শতকের বিশিষ্ট ইমাম, মুজাদ্দিদ, ইয়ামানের মুজতাহিদ মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ্ শাওকানী’’। এ ছাড়া অন্য কেউ তাকে মুজাদ্দিদ বলে আখ্যায়িত করেছেন কিনা, তা জানা যায়নি।
প্রকৃতপক্ষে তিনি মুজাদ্দিদ ছিলেন কিনা, তা পর্যালোচনা সাপেক্ষ। আমরা নিম্নে সে বিষয়ে আলোকপাত করব, ইনশাআল্লাহ।
এজন্য প্রথমে আমরা মুজাদ্দিদের পরিচয়, প্রয়োজনীয়তা, মুজাদ্দিদের যোগ্যতা ও কর্মসূচী প্রভৃতির একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করব; অত:পর তার আলোকে যাচাই করে দেখব যে, তিনি প্রকৃত অর্থে মুজাদ্দিদ ছিলেন কিনা।
মুজাদ্দিদের প্রয়োজনীয়তা, পরিচয় ও কার্যাবলী
মানব জাতির জন্য আল্লাহ তা‘আলার চিরন্তন নির্দেশিকা
মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা‘আলা নিখিল বিশ্বের যাবতীয় বস্ত্তরাজির সৃষ্টিকর্তা। তিনি শুধু সৃষ্টিই করেন নি, সাথে সাথে সেগুলোর জন্য নিয়ম-বিধানও ঠিক করে দিয়েছেন। কুরআন কারীমে তিনি ইরশাদ করেন,
ربنا الذى اعطى كل شئ خلقه ثم هدى ‘‘আমাদের রব হলেন তিনি, যিনি প্রতিটি বস্ত্তকে আকৃতি দিয়েছেন অত:পর তার চলার পথও প্রদর্শন করেছেন। (ত.াহা : ৫০)
সৃষ্টি জগতে মানুষ এবং জ্বিন ব্যতীত আর সবকিছুই প্রকৃতিগতভাবেই আল্লাহর নিয়ম-বিধান মেনে চলতে বাধ্য। কিন্তু মানুষের জন্য তিনি শর‘ঈ বিধান প্রদান করেছেন এবং তা মানা বা না মানার স্বাধীনতাও দিয়েছেন। আল্লাহ প্রদত্ত এ স্বাধীনতার কারণে একদল তাঁর আইন-বিধান গ্রহণ করে সে আলোকে জীবন যাপন করছে এবং অন্যদল তাঁকে অমান্য করে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে। এর ফলে সত্য-সঠিক পথের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার ভ্রান্ত পথেরও সৃষ্টি হয়েছে। এ সকল ভ্রান্ত পথ হতে সঠিক পথ নির্ণয় করা বান্দাহ্র জন্য কঠিন হতে পারে বিধায় আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং সত্য-সঠিক পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব নিয়েছেন।
তিনি ইরশাদ করেন, و على الله قصد السبيل و منها جائر ‘‘পথসমূহের মধ্যে যেহেতু বক্র পথও রয়েছে, সেহেতু সঠিক পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব আল্লাহর উপরই রয়েছে।’’ (আন্ নাহল : ৯)
আল্লাহ তা‘আলা বান্দাহ্দেরকে তাঁর পছন্দনীয় পথ প্রদর্শনের যে দায়িত্ব নিয়েছেন, তার কারণেই তিনি যুগে যুগে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। একজন নবীর শিক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়ে যখন কোন জাতি গুমরাহীতে লিপ্ত হয়েছে, তখনই তিনি তাদেরকে সঠিক পথে আনয়নের জন্য আরেকজন নবী বা রাসূল প্রেরণ করেছেন। এভাবেই তিনি প্রত্যেক জাতিকে হিদায়াতের জন্য অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে,
و ان من امة الا خلا فيها نذير‘‘এমন কোন জাতি নেই, যাদের নিকট কোন সতর্ককারী আগমন করেন নি।’’ (ফাতির : ২৪)
নবুওয়াতের সর্বশেষ সংযোজন হলেন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁর পর কিয়ামাত পর্যন্ত আর কোন নবী-রাসূল আগমন করবেন না। কারণ তাঁর উপর অবতীর্ণ কুরআনকে সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলাই গ্রহণ করেছেন। ফলে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনীত শারী‘আত কিয়ামাত পর্যন্ত চালু থাকবে এবং মানুষের জন্য আর কোন নতুন শারী‘আতের প্রয়োজন হবে না।
কিন্তু পূর্ববর্তী উম্মাহ্দের মত নবীর শিক্ষাকে ভুলে গিয়ে সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণ গুমরাহীতে নিমজ্জিত না হলেও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতি, কুসংস্কার এবং শিরক-বিদ‘আতে লিপ্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ইসলামের সাথে জাহিলিয়াতের মিশ্রণ ঘটে গেলে খাঁটি ইসলামের উদভাসন ঘটানোর প্রয়োজন দেখা দেয়।
মুজাদ্দিদ বা সংস্কারকের প্রয়োজন
এ কাজ করার প্রয়োজনে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাহ্দের মধ্য হতে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদেরকে প্রেরণ করেন, যাঁরা দ্বীনকে জাহিলিয়াতের মিশ্রণ থেকে পৃথক করে তার আসল প্রকৃতির উপর দাঁড় করিয়ে দেন। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হ.াদীছে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন,
ان الله يبعث لهذه الامة على رأس كل مأ ة سنة من يجدد لها دينها
‘‘নিশ্চই আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মাতের জন্য প্রতি শতকের শিরোভাগে এমন লোক প্রেরণ করবেন, যিনি তাঁর জন্য তাঁর দ্বীনকে সবল ও সতেজ করবেন।’’
মুজাদ্দিদ বা সংস্কারকের পরিচয়
মুজাদ্দিদ বা সংস্কারকের পরিচয় দিতে গিয়ে সায়্যিদ আবুল আ‘লা মওদূদী বলেন, ‘‘মুজাদ্দিদ হন স্বচ্ছ চিন্তার অধিকারী। সত্য উপলব্ধি করার মত গভীর দৃষ্টি তাঁর সহজাত। সব রকমের বক্রতা দোষমুক্ত সরল বুদ্ধিবৃত্তিতে তাঁর মনোজগত পরিপূর্ণ। প্রান্তিকতার বিপদমুক্ত হয়ে মধ্য পন্থা অবলম্বনের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করার বিশেষ যোগ্যতা তাঁর বৈশিষ্ট্য। নিজের পরিবেশ এবং শতাব্দীর পুঞ্জিভূত ও প্রতিষ্ঠিত বিদ্বেষমুক্ত হয়ে চিন্তা করার শক্তি, যুগের বিকৃত গতিধারার সংগে যুদ্ধ করার ক্ষমতা ও সাহস, নেতৃত্বের জন্মগত যোগ্যতা এবং ইজতিহাদ ও পুনর্গঠনের অস্বাভাবিক ক্ষমতা মুজাদ্দিদের স্বকীয় বস্তু। এ ছাড়া ইসলাম সম্পর্কে তিনি হন দ্বিধামুক্ত পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। দৃষ্টিভঙ্গি ও বুদ্ধি-জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি হন পূর্ণ মুসলিম। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর খুঁটিনাটি ব্যাপারে ইসলাম ও জাহিলিয়াতের মধ্যে পার্থক্য করা এবং অনুসন্ধান চালিয়ে দীর্ঘকালের জটিল আবর্ত থেকে সত্যকে উঠিয়ে নেয়া মুজাদ্দিদের কাজ। এ সব বিশেষ গুণের অধিকারী না হয়ে কেউ মুজাদ্দিদ হতে পারে না।’’
সংস্কারকের কাজ
জাহিলিয়াতের পংকিলতা থেকে ইসলামকে নির্মল ও নির্ভেজাল করাই সংস্কারকের কাজ। ইসলামের মধ্যে যেখানে যতটুকু জাহিলিয়াতের সংমিশ্রণ বা অনুপ্রবেশ ঘটে, তা থেকে মুক্ত করে ইসলামকে তার সত্যিকার আকৃতিতে পুনর্বার প্রতিস্থাপিত করার প্রচেষ্টা চালানোই সংস্কারকের দায়িত্ব। কোন অভিনব কাজ করার নাম সংস্কার নয়।
সংস্কারক মূলত: নিম্নলিখিত কাজগুলো করে থাকেন :
১. নিজের পরিবেশের নির্ভুল চিত্রাংকন। অর্থাৎ পরিস্থিতি ভালভাবে পর্যালোচনা করে জাহিলিয়াত কোথায় কতটুকু কিভাবে অনুপ্রবেশ করেছে, তার শিকড় কোথায় এবং কতদূর বিস্তৃত, ইসলামের অবস্থা বর্তমানে কোন পর্যায়ে এ সব বিষয় সঠিকভাবে বুঝে নেয়া।
২. সংস্কারের পরিকল্পনা প্রণয়ন। অর্থাৎ কোথায় আঘাত করলে জাহিলিয়াত নির্মূল হয়ে ইসলাম পুনর্বার সমাজে কর্তৃত্ব করার সুযোগ পাবে তা নির্ধারণ করা।
৩. নিজের সামর্থ পরিমাপ করা। অর্থাৎ তিনি কতটুকু শক্তির অধিকারী এবং কোন পথে সংস্কার করার শক্তি তাঁর রয়েছে, এর নির্ভুল আন্দাজ করা।
৪. চিন্তার রাজ্যে বিপ্লব সৃষ্টির চেষ্টা করা। মানুষের ‘আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলামের ছাঁচে গড়ে তোলা এবং শিক্ষা ও অনুশীলন ব্যবস্থার সংস্কার সাধন, ইসলামী শিক্ষাকে পুনর্জীবিত করা এবং সামগ্রিকভাবে ইসলামী মানসিকতাকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে চিন্তার পরিবর্তন সাধন করা।
৫. সক্রিয় সংস্কার প্রচেষ্টা। অর্থাৎ জাহিলী রসম-রেওয়াজসমূহ খতম করে দেয়া, নৈতিক চরিত্র ও বৃত্তিসমূহকে পরিচ্ছন্ন করা, মানুষের মধ্যে পুনর্বার শারী‘আতের আনুগত্যের প্রবল প্রেরণা সৃষ্টি করা এবং পূর্ণ ইসলামী নেতৃত্বদানের মত লোক তৈরী করা।
৬. দ্বীনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করার চেষ্টা করা। অর্থাৎ কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে গবেষণা করে ইসলামকে যুগোপযোগী করে উপস্থাপন করা, যাতে শারী‘আতের উদ্দেশ্যসমূহ পূর্ণ হয় এবং তমদ্দুনের নির্ভুল উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইসলাম দুনিয়াকে নেতৃত্ব দান করতে সক্ষম হয়।
৭. প্রতিরক্ষামূলক প্রচেষ্টা। অর্থাৎ ইসলামকে নির্মূল করতে উদ্যত রাজনৈতিক শক্তির মুকাবিলা করা এবং তার শক্তি নির্মূল করে ইসলামের বিকাশের পথ প্রশস্ত করা।
৮. ইসলামী ব্যবস্থার পুনর্জীবন। অর্থাৎ জাহিলিয়াতের হাত থেকে কর্তৃত্বের চাবিকাঠি ছিনিয়ে নিয়ে সরকারকে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বর্ণিত খিলাফাতের উপর পুন:প্রতিষ্ঠিত করা।
৯. বিশ্বজনীন বিপ্লব সৃষ্টি। অর্থাৎ কোন একটি নির্দিষ্ট দেশে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্ব জনীন শক্তিশালী আন্দোলন সৃষ্টি করা, যাতে ইসলামের সংস্কারমূলক বিপ্লবী দা‘ওয়াত সাধারণ্যে বিস্তার লাভ করে এবং ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সমগ্র দুনিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
উল্লেখিত কার্যাবলীর মধ্যে প্রথম তিনটি সকল সংস্কারকের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু অবশিষ্টগুলোর সবক’টি একজন সংস্কারকের মধ্যে থাকা জরুরী নয়। বরং তন্মধ্য হতে একটি, দু’টি বা ততোধিক বিভাগে উল্লেখযোগ্য কাজ করলে তাঁকেও মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক গণ্য করা যেতে পারে। তবে উল্লেখিত সকল কাজ যিনি আঞ্জাম দেন তিনিই হলেন পূর্ণাঙ্গ মুজাদ্দিদ।
উপরোল্লিখিত মানদন্ডে বিচার করলে বলা যায় যে, ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী একজন বড় মাপের গবেষক ছিলেন বটে, কিন্তু তাজদীদ বা পুনর্জাগরণের জন্য সার্বিক সংস্কারমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন নি। তিনি দ্বীনের নির্ভুল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। একজন বড় মাপের লেখক, শিক্ষক ও
চিন্তাবিদ ছিলেন। তাঁর বিশাল সংখ্যক ছাত্রের মাধ্যমে তিনি দ্বীনের দাও‘য়াত সম্প্রসারণের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেছেন তেমনটি লক্ষ্য করা যায় না।
তিনি তাফসীর, হাদীছ, ফিকহসহ প্রায় সকল বিষয়ে গবেষণা করে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে মুজতাহিদ ও ইমামের মর্যাদা লাভ করতে পেরেছিলেন বটে, কিন্তু সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি,রাজনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিপ্লব ও সংস্কার সাধনের মত সর্বাত্মক কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন নি।
তাঁর সংস্কারমূলক কার্যাবলীর মধ্যে তাকলীদ বর্জন করে ইজতিহাদের দিকে আহবান, কবর পূজা, মাজার পূজা প্রভৃতি শিরক, বিদ‘আতের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য প্রদান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এগুলোর মূলোৎপাটনের জন্য তিনি কার্যকর কোন বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ ও সক্রিয় কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন নি।
অধিকন্তু তাঁর এ সকল প্রচেষ্টা শুধুমাত্র ইয়ামানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি সর্বজনীন এবং বিশ্বব্যাপী কোন সুসংগঠিত আন্দোলন পরিচালনা করতে সক্ষম হন নি।
এ সকল দিক বিবেচনায় ‘আল্লামা আশ্ শাওকানীকে একজন বড় মাপের মুজতাহিদের পাশাপাশি একজন মুসলিহ্ বা সংশোধনকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়, কিন্তু মুজাদ্দিদ বা সাধারণ ও সর্বব্যাপক সংস্কারক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।
উপসংহার
হিজরী দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর জ্ঞানাকাশে ‘আল্লামা আশ্ শাওকানী ছিলেন একটি উজ্জল নক্ষত্র। তাঁর গোটা জীবন তিনি জ্ঞান চর্চায় অতিবাহিত করেছেন। চিন্তার বিভ্রান্তি ও অনুকরণপ্রিয়তার বেড়াজাল ছিন্ন করে তিনি পরিশুদ্ধ ও মুক্ত চিন্তার জগতে বিচরণ করেছেন।
তাঁর লব্ধ জ্ঞান যেমন সমসাময়িককালে জ্ঞানপিপাসুদের তৃষ্ণা নিবারণ করেছে, অনুরূপভাবে তাঁর লিখিত গ্রন্থাবলীও অদ্যাবধি মুসলিম উম্মাহর সঠিক জ্ঞানের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তাঁর সকল লেখা কুরআন-সুন্নাহর দলীল দ্বারা সমর্থিত বিধায় ইসলামী
চিন্তাবিদদের জন্য তা খুবই সহায়ক ও উপকারী।
এ মহান ব্যক্তির কর্মময় জীবনকথা ও চিন্তাধারা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করুক, এ প্রত্যাশায়ই করছি।
--০--
প্রবন্ধটি এপ্রিল ১, ২০১০ তারিখে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক অনুষ্ঠিত স্টাডি শেসনে মূল প্রবন্ধ হিসাবে পঠিত।

 

 

রেফারেন্সঃ

. ‘আলী ইবন মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দিল্লাহ ইবনুল হুসাইন ১১৩০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ফিক্হ ও ফারায়িজ শাস্ত্রের একজন বিজ্ঞ পন্ডিত ছিলেন। ছাত্র জীবনের শেষের দিকে তিনি সান‘আতে ফাতওয়া দান শুরু করেন। ইমাম মাহদী আল ‘আববাস তাকে খাওলানের বিচারক নিযুক্ত করেন। ১২১১ হিজরীর জিলকা‘আদ মাসের ১৪ তারিখ রবিবার ‘ইশার আযানের পর তিনি ইন্তিকাল করেন। তাঁর দুই পৃুত্র ছিল। তাঁরা হলেন মুহাম্মাদ (১১৭৩ - ১২৫০ হি.) এবং ইয়াহইয়া (১১৯০-১২৬৭ হি.) মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী আশ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর আল জামি‘ বাইনা ফানিয়িদ্ দিরায়া: ওয়ার রিয়ায়া: মিন ‘ইলমিত তাফসীর (কায়রো: দারুল হাদীছ, তা.বি.) খ. ২, পৃ. ২২; আশ শাওকানী, আল্ বাদরুত্ তালি‘ বিমুহাসিনি মিম বা‘দি কারনিস সাবি‘ (বৈরূত : দারুল মা‘রিফা, তা.বি) খ. ১, পৃ. ৪৭৯-৪৮০; জালাল উদ্দীন, ‘আল্লামা শাওকানী ‘আবকারিয়্যাতুহু ওয়া মানহাজাহু ফি তাফসীরিহি (এম.ফিল গবেষণাপত্র, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, ২০০২ খৃ.) পৃ. ৭।
. The Encyclopaedia of Islam (New edition, Leiden, 1997) vol. 9, p. 378; আশ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর প্রাগুক্ত ; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭।
. শাওকানী, নাইলুল আওতার শরহি মুন্তাকিউল আখবার (বৈরূত : দারুল ফিক্র , ২য় সংস্করণ, ১৪০৩ হি. ১৮৮৩ খ্রি.) খ. ১, ভূমিকা , পৃ.ي ; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত। এতদ্ব্যতীত তার আরো অনেকগুলো উপাধি রয়েছে। সেগুলো হলো : আল ‘আল্লামাতুর রববানী, আল কাতরুল ইয়ামানী, ইমামুল আয়িম্মা, মুফতিউল উম্মাহ, বাহরুল ‘উলুম, শামসুল ফুহুম, সানাদুল মুজতাহিদীন, ফারিসুল মা‘আনী ওয়াল আলফাজ, ফরীদুল ‘আসর, নাদিরাতুদ দাহর, কুদওয়াতুল আনাম, ‘আল্লামাতুয যামান, তারজুমানুল হাদীছ ওয়াল কুরআন, ‘ইলমুয যহাদ, আওহাদুল ‘আববাদ, কামি‘উল মুবতাদি‘ঈন, আখিরুল মুজতাহিদীন, রা’সূল মুয়াহহিদীন, তাবি‘উল মুত্তাবি‘ঈন, সাহিবুত্ তাসানীফুল লাতি লাম ইউসবাক্ ইলা মিছলিহা, কাজিউল কুজাত, শায়খুর রিয়য়াহ্ ওয়াস সিমা‘আহ। শাওকানী, নাইলুল আওতার, প্রাগুক্ত, পৃ. ي-ك; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮।
. আশ শাওকানী, আল্ বাদরুত্ তালি‘, খ. ১, পৃ. ৪৭৮; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত।
. আশ শাওকানী, প্রাগুক্ত; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত।


. শাওকানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৮-৪৭৯; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত।
. শাওকানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮০।
. শাওকানী, প্রাগুক্ত; শাওকানী, নাইলুল আওতার, খ. ১, ভূমিকা , পৃ. ﻙ ; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত; শিহাবুদ্দীন আবু ‘আব্দিল্লাহ ইয়াকুত ইবন ‘আব্দিল্লাহ, মু‘জামুল বুলদান (বৈরুত : দারু সাদির, তা.বি) খ. ৩, পৃ ৩৭৩।
. ইয়াকুত, প্রাগুক্ত; আবু সা‘আদ ‘আব্দুল করীম ইবন মুহাম্মাদ ইবন মানসুর আত্ তামীমী আস্ সান‘আনী, আল আনসাব (বৈরুত : দারুল জানান ১ সং, ১৪০৮ হি. ১৯৮৮ খ্রি.) খ. ৩, পৃ. ৪৭০
. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, প্রাগুক্ত, শাওকানী, নাইলুল আওতার, প্রাগুক্ত, জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত; ড. মুহাম্মাদ হুসাইন আয যাহাবী, আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাস্সিরুন (কায়রো : দারুল হাদীছ, ২০০৫ খ্রি.) খ. ২, পৃ. ২৪৯। বাহরাইনের একটি স্থানের নামও শওকান। তবে ইয়ামানে যে শওকান অবস্থিত সেটিই ‘আল্লামা শাওকানীর জন্মস্থান। (আবু সা‘আদ, প্রাগুক্ত)
. জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত; শাওকানী নাইলুল আওতার, প্রাগুক্ত।
. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, প্রাগুক্ত; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯।
. শাওকানী, প্রাগুক্ত; The Encyclopaedia of Islam (New edition, Leiden, 1997) vol. 9, p. 378; যাহাবী, প্রাগুক্ত। শাওকানীর জন্ম সনের ব্যাপারে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। নাইলুল আওতারের ভূমিকায় এবং জালাল উদ্দীনের গবেষণা পত্রে তাঁর জন্ম সন ১১৭২ হি. উল্লেখ করা হয়েছে। (শাওকানী, নাইলুল আওতার খ. ১, ভূমিকা, পৃ. ك; জালাল উদ্দীন, আল্লামা শাওকানী ‘আবকারিয়্যাতুহু ওয়া মানহাজুহু ফিত্ তাফসীর, পৃ. ১২) আবজাদুল ‘উলুম নামক গ্রন্থে তাঁর জন্ম সন ১১৭৭ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত) ‘আল্লামা শাওকানী ফাতহুল কাদীরের ভূমিকায় এবং ‘আল্লামা যাহাবী আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাস্সিরুন গ্রন্থে ১১৭৩ হিজরীকেই তাঁর জন্ম সন বলে উল্লেখ করেছেন। এ মতটিই সঠিক। কারণ ‘আল্লামা শাওকানী আল বাদরুত তালি‘ নামক গ্রন্থে তাঁর পিতার লেখার উদ্ধৃতিতে তাঁর জন্ম সন ১১৭৩ হিজরী বলেই উল্লেখ করেছেন। (জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত) জন্ম সনের ব্যাপারে মতভেদ থাকলেও ২৮ জিলকা‘আদ সোমবারের ব্যাপারে কোন মতভেদ পরিলক্ষিত হয়না।
. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, শাওকানী, নাইলুল আওতার খ. ১, ভূমিকা, পৃ. ل; যাহাবী, আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাস্সিরুন, খ. ২, পৃ. ২৪৯।
. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ২২।
. শাওকানী, আল বাদরুত্ তালি‘, খ. ১, পৃ. ৪৮২-৪৮৩।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮৩।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮৩-৪৮৪।
. প্রাগুক্ত, পৃ.৪৮০। আলাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১।
. শাওকানী, আল বাদরুত্ তালি‘, খ. ১, পৃ. ৪৮৪।
. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর , খ. ১, পৃ. ২২।
. শাওকানী, নাইলুল আওতার খ. ১, পৃ. (ل) ; যাহাবী আত তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুল খ. ১, পৃ. ২৪৯।
. জালাল উদ্দিন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮। (আল বাদরুত তালিল‘, খ. ২, পৃ ২১৯ এর উদ্ধৃতিতে)
. শাওকানী, নাইলুল আওতার, প্রাগুক্ত; জালাল উদ্দিন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬-১৭।
. যাহাবী আয আত তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুল খ. ১, পৃ. ২৪৯।
. যায়দিয়া শিয়াদের একটি উপদল। তাদের ইমাম হলেন যায়িদ ইবন ‘আলী। যায়দিয়া সম্প্রদায়ের সংগে আহলি সুন্নাত ওয়ান জামা‘আতের তেমন বড় ধরনের মত পার্থক্য নেই। যে সকল ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে, তা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।
য়ায়দিয়ারা মনে করেন ‘আলী (রা) সকল সাহাবীর চেয়ে উত্তম এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পর খিলাফাতের অধিকতর যোগ্য । তারা বলেন, ফাতেমী বংশের যে কোন ব্যক্তি যদি ‘আলিম, দুনিয়া বিমুখ, সাহসী ও বদান্যতার অধিকারী হয়, তাহলে এমন ব্যক্তি ইমামতের (খিলাফাতের) জন্য বের হলে তার ইমামত শুদ্ধ হবে এবং তাঁর আনুগত্য করা ওয়াজিব হবে, চাই সে হাসানের বংশধর হোক অথবা হোসেনর বংশধর । তবে এতদসত্ত্বেও তাঁরা আবু বাকর এবং উমার (রা) এর খিলাফতকে অমান্য করেন না এবং তাঁদেরকে কাফিরও আখ্যা দেন না। বরং তাদের খিলাফাতকে তারা বৈধ মনে করেন। কারণ তাঁদের মতে উত্তম ব্যক্তির বর্তমানে অপেক্ষাকৃত কম উত্তম ব্যক্তির ইমামত বৈধ। তারা ইমামদের নিষ্পাপ হওয়ার প্রবক্তা নন। তবে তাঁরা ইমামদের জন্য ইজতিহাদের যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার শর্তারোপ করেন । যায়দিয়ারা আহলি বায়তের বর্ণিত হাদীস ব্যতীত অন্যান্য সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীসকে নির্ভরযোগ্য মনে করে না।
যায়দিয়া সম্প্রদায় মুতাযিলাদের চিন্তা ও ‘আকীদার দ্বারা বেশ প্রভাবিত । এর কারণ তাদের ইমাম যায়িদ ইবন ‘আলী মুতাযিলা সম্প্রদায়ের ইমাম ও য়াসিল ইবন ‘আতার ছাত্র ছিলেন। (যাহাবী, আত তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন, খ. ২, পৃ. ২৪৫।
. প্রাগুক্ত।
. শাকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১. পৃ. ২২।
. শাওকানী, নাইলুল আওতার, খ.১ ভূমিকা, পৃ....শাওকানী ফতহুল কাদীর খ.১পৃ২২ জালালউদ্দিন, প্রাগুক্ত.পৃ ১৫-১৬
. শাওকানী, আল বাদরুত্ তালি‘, খ. ১, পৃ. ৪৮৪; শাওকানী, নাইলুল আওতার, প্রাগুক্ত পৃ . م শাওকানী ফাতহুল কাদীর প্রাগুক্ত ; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭।
. শাওকানী, নাইমুল আওতার, প্রাগুক্ত, শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, প্রাগুক্ত; নাইমুল আওতার, প্রাগুক্ত, পৃ.. س, ن, م ; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭-১৮।
. শাওকানী, প্রাগুক্ত; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত।
. শাওকানী, প্রাগুক্ত।
. শাওকানী, নাইমুল আওতার, প্রাগুক্ত, পৃ. س; ফাতহুল কাদীর, প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, প্রাগুক্ত; নাইমুল আওতার, প্রাগুক্ত, পৃ. ع, س, ن
. শাওকানী, নাইমুল আওতার, প্রাগুক্ত, পৃ. م
. প্রাগুক্ত, পৃ. ن
. প্রাগুক্ত, পৃ. س
. প্রাগুক্ত, পৃ. ع
. জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪-৩৫।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭-৩৮।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯-৪০।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০-৪১।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১।
. শাওকানী, আল্ বাদরুত্ তালি‘, খ. ২, পৃ. ২১৮।
. প্রাগুক্ত।
. এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলাম, খ. ৯, পৃ: ৩৭৮
. জালাল উদ্দীন, প্রাত্তক পৃ. ২০; শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ২৩
. শাওকানী আল বাদরত তালি‘ খ. ২, পৃ. ২২৪
. জালাল উদ্দীন প্রাগুক্ত, পৃ, ১৯।
. শাওকানী , ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ২৩
. শাওকানী আল বাদরুত তালি‘ খ. ১, পৃ. ২১৯।
. শাওকানী, ফাতহুল কাদ্দীর, খ. ১, পৃ . ২৩; আল বাদরুত তালি‘, খ . ২ . পৃ . ২১৯ ; জালাল উদ্দীন প্রাগুক্ত , পৃ. ১৯- ২০ ।
. শাওকানী , ফাতহুল কাদীর প্রাগুক্ত ।

. জালাল উদ্দীন, ‘আল্লামা শাওকানী ‘আবকারিয়্যাতুহু ওয়া মানহাজুহু ফি তাফসীরিহি, পৃ. ৪২।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩-৪৪।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫-৪৬।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬-৪৭।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭-৪৮।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০-৫১।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২-৫৩।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩-৫৪।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪-৫৫।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৫।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৫-৫৬।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬-৫৭।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৭।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮।
. প্রাগুক্ত।
. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ২৩।
. আশ্ শাওকানী, প্রাগুক্ত; শাওকানী, আল্ বাদরুত তালি‘ খ. ২, পৃ. ২১৯।
. আশ্ শাওকানী, আল্ বাদরুত্ তালি‘, প্রাগুক্ত।
. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, প্রাগুক্ত; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০।
. The Encyclopaedia of Islam, vol. 9, p.378
. প্রাগুক্ত; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৯।

. আশ্ শাওকানী, আল্ বাদরুত তালি‘, খ. ২, পৃ. ২২৪
. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ২৩।
. শাওকানী, আল্ বাদরুত তালি‘, খ. ২, পৃ. ২২৪; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০-২১।
. জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।
. জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২।
. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ . ২৩, দি এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলাম , খ. ৯, পৃ. ৩৭৪; জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ . ২৮ -২৯ । দি এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলামে তার জন্ম সন ১৮৩৯ খৃ. এবং জালাল উদ্দীন স্বীয় গ্রন্থে তাঁর মৃত্যুসন ১৮৩৮ খ্রি : উল্লেখ করেছেন।
. আশ্ শাওকানী , প্রাত্তক, জালাল উদ্দীন, প্রাত্তক
. আয্ যাহাবী, আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন, খ. ২, পৃ. ২৪৯।
. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ১৩।
. জালাল উদ্দীন, প্রাগুপ্ত, পৃ. ১৫।
. আশ্ শাওকানী, আল্ বাদরুত্ তালি‘, খ. ২, পৃ. ২৩।
. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ২৩।
. যায়দিয়া মাযহাবের পরিচিতির জন্য পৃ. ৫, টীকা নং ৩০ দ্র.।
. আয্ যাহাবী, আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন, খ. ২, পৃ. ২৪৯; শাওকানী, নাইলুল আওতার, খ. ১, ভূমিকা, পৃ. ف।
. আয্ যাহাবী, প্রাগুক্ত; শাওকানী প্রাগুক্ত, পৃ. ص-ف ।
. লুইস মা‘লুফ, আল্ মুনজিদ, (বৈরুত : দারুল মাশরিক,, ১৭শ সংস্করণ, ১৯৬০ খৃ.) পৃ. ৬৫৯।
. সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেস, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৮৬ ইং,) খ. ১, পৃ. ৪২০।
. ইবনুল কাইয়্যিম, ই‘লামুল মুয়াক্কি‘ঈন, খ. ২, পৃ. ১৭৯।
. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৬।
. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৬-৭।
. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৭।
. শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ দেহলবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, (দিল্লী : মাকতাবায়ে থানুবী, ১৯৮৬ খৃ.) খ. ১, পৃ. ৩৬৮-৩৬৯।
. সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, খ. ১, পৃ. ৪২০।
. ইবনুল কাইয়্যিম, ই‘লামুল মুয়াক্কি‘ঈন, খ. ১, পৃ. ২।
. শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ দেহলবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, (দিল্লী : মাকতাবায়ে থানুবী, ১৯৮৬ খৃ.) খ. ১, পৃ. ৩৬৮।
. ইবনুল কাইয়্যিম, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৯১।
. সংক্ষিপ্ত ইুসলামী বিশ্বকোষ, খ. ১, পৃ. ৪২০-৪২১।
* এখানে সে হাদীছের কথা বলা হয়েছে যে, যখন মা‘আয (রা.) কে ইয়ামানে পাঠালেন, তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন,সেখানে গিয়ে তুমি কিসের দ্বারা ফায়সালা করবে? উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাবের দ্বারা। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সেখানে যদি না পাও? তিনি বললেন, তাহলে সুন্নাহর দ্বারা, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবার বললেন, সেখানেও যদি না পাও? তিনি বললেন, তাহলে তখন আমি আমার চিন্তার দ্বারা ইজতিহাদ করব। একথা মুণে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত খুশী হয়ে বলেছিলেন, শুকরিয়া সেই আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের দূতকে এমন সামর্থ দিয়েছেন, যার কারণে তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট।


. শায়খ মুহাম্মাদ ‘আব্দুহু, তাফসীরূল কুরআনিল হাকীম (আল মানার), (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ্, তা.বি) খ. ৭, পৃ. ২০৬-২০৯
. আশ্ শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, খ. ২, পৃ. ১৮৯; যাহাবী, আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাস্ সিরুন, খ. ২, পৃ. ২৫৩-২৫৪।
. আশ্ শাওকানী, প্রগুক্ত, পৃ. ১৮৭; যাহাবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৪
. আয্ যাহাবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৫।
. ‘আব্দুল কারীম মিরাক ও ‘আব্দুল মুহসিন ‘আববাদ, মিন আত.&ইয়াবিল মানহি ফি ‘ইলমিল মুসতালিহ.&, (মাদীনা : মাতাবি‘উ জামি‘আতিল মাদীনাতিল মুনাওয়ারা, ১৪১০ হি.) পৃ. ৭৮।
. শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, উর্দু মুতারজাম, (দেওবন্দ : মাকতাবাহ্ থানুবী, ১৯৮৬ ইং ) খ. ১, পৃ. ৩৮০।
. ইবনুল কাইয়্যিম, ই‘লামুল মুয়াক্কি‘ঈন, খ. ২, পৃ. ১৯৫।
. প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৮৩।
. শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, খ. ১, প. ৩৭৫।
. উদ্ধৃতিগুলোর জন্য দ্র. ‘আব্দুল কারীম মিরাক. ও ‘আব্দুল মুহসিন ‘আববাদ, মিন আত.ইয়াবিল মানহি ফি ‘ইলমিল মুসতালিহ.& পৃ. ৭৯; শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, খ. ১, পৃ. ৩৮০।
. শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, হু.জ্জাতুল্লাহিল বালিগা, খ. ১, প. ৩৭৯।
. আব্দুল কারীম মিরাক. ও ‘আব্দুল মুহসিন ‘আববাদ, প্রাগুক্ত।
. ইবনুল কাইয়্যিম, ই‘লামুল মুয়াক্কি‘ঈন, খ. ২, পৃ. ১৮৩; ‘আব্দুল কারীম মিরাক. ও ‘আব্দুল মুহসিন ‘আববাদ, প্রাগুক্ত; শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, হু.জ্জাতুল্লাহিল বালিগা, খ. ১, পৃ. ৩৮০-৩৮১।
. শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, প্রাগুক্ত। খ. ১, পৃ. ৩৮১।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭২।
. ‘আল্লামা ইউসুফ কারযাবী, আল্ হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম, বঙ্গানুবাদ, মাও. ‘আব্দুর রহীম, ইসলামে হালাল হারামের বিধান, (ঢাকা : খাইরুন প্রকাশনী, ১২ সং, ২০০৬ ইং) পৃ. ১৭।
. ইবনুল কাইয়্যিম, ই‘লামুল মুয়াক্কি‘ঈন, খ. ২,পৃ. ১৬৯।
. প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৮৮
. প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৪২।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৫৫।
. প্রাগুক্ত।
. মুহাম্মাদ ‘আব্দুহু, আল মানার, খ. ৭, পৃ. ২০৬-২০৭।
. আয যাহাবী , প্রাওক্ত , প্র, ২৫৬-২৫৬।
. কুরআনের আয়াতগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে্। ১. মুহকাম ২. মুতাশাবিহ । এ প্রসঙ্গে সূরা আলে ‘ইমরানের ৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে
هو الذي انزل عليك الكتاب منه ايات محكمة هن ام الكتاب و اخر متشابهات ط فاما الذين في قلوبهم زيغ فيتبعون ما تشبه منه ابتغاء الفتنة و ابتغاء تأويله
‘‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যার কতক আয়াত মুহকাম, সেগুলোই হলো কিতাবের মূলাধার; আর কতকগুলো হলো মুতাশাবিহ্। যাদের অন্তরে রয়েছে বক্রতা, তারা বিপর্যয় ঘটানোর মতলবে এবং অসঙ্গত তাৎপর্য বের করার উদ্দেশ্যে তন্মধ্য হতে মুতাশাবিহ্ আয়াতগুলোর অনুসরণ করে থাকে।’’
মুহকাম ও মুতাশাবিহ্ আয়াতের পরিচিতিঃ মুহকাম এর অর্থ সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, সূদূঢ়, যার অর্থ বুঝতে কোন সন্দেহ-সংশয় সৃুষ্টি হয় না। আর মুতাশাবিহ এর অর্থ হলো দ্ব্যর্থ বোধক, অস্পষ্ট ও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ । এ প্রসঙ্গে আবুল কাসিম আল হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ (রাগিব ইসফাহানী) বলেন,
فالمحكم الذي ما لا يعرض فيه شبهة من حيث اللفظ و لا من حيث المعني
‘‘মুহকাম হলো সে সকল আয়াত যে গুলোতে শব্দের বা অর্থের কোন দিক দিয়ে সন্দেহ-সংশয় উপস্থিত হতে পাবে না ।’’
و التاشبه من القران ما اشكل تفسيره لمشابهته بغيره اما من حيث اللفظ او من حيث المعني
‘‘শব্দের বা অর্থের দিক দিয়ে অন্যের সাথে সাদৃশ্য থাকার কারণে যে বিষয়ে ব্যাখ্যা করা দুষ্কর বোধ হয়, সেগুলোই হচ্ছে কুরআনের মুতাশাবিহ। (রাগিব ইস্ফাহানী)।
ইমাম ইবন জারীর বলেন, اما المحكمات فانهن اللواتي قد احكمن بالبيان و التفصيل
‘‘যে আয়াতগুলো বিশদভাবে বর্ণনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ় করা হয়েছে, সেগুলোই হলো মুহকাম।
اما متشايهات فان معناه متشايهات في التلاوة مختلفات في المعني
‘‘যে গুলোর তিলাওয়াত বা পঠনে কোন পার্থক্য নেই, কিন্তু অর্থের দিক দিয়ে পরস্পরে পার্থক্য রয়েছে, মুতাশাবিহাত বলতে সে গুলোকেই বুঝায়।’’ (তাফসীরে তাবারী, খ. ৩, পৃ. ১১৩-১১৪)
হাফিজ ইমাদুদ্দীন ইসমা‘ঈল ইবন কাছীর বলেন,
يخبر تعالي أن في القرأن ايات محكمات هن ام الكتاب أي بينات واضحات الدلالة لا التباس فيها علي احد
‘‘আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, কুরআনের কতক আয়াত হচ্ছে মুহকাম, যেগুলো হলো কুরআনোর মা বা মূলাধার। অর্থাৎ যেগুলো বর্ণিত হয়েছে সুস্পষ্টভাবে এবং যেগুলোর প্রতিপাদ্য নির্ধারণে কাউকে কোন সন্দেহে পড়তে হয় না।’’
‘‘এবং তার অন্য কতকগুলো আয়াত রয়েছে যার প্রতিপাদ্য বুঝতে বহু লোকের বা কতক লোকের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। (তাফসীরুর কুরআনিল আজীম ( মিশরঃ দারূল কুতুব তা বি) খ. পৃ, ৩৪৪)
ইমাম শাফি‘ঈ বলেন, المحكم ما لا يحتمل من التأويل الا وجها واحدا ‘‘একটি মাত্র তাৎপর্য ব্যতীত অন্য কোন তাৎপর্যের সম্ভাবনা থাকেনা যাতে, তাই হলো মুহকাম।’’ و المتشابه ما احتمل من التأويل وجوها ‘‘পক্ষান্তরে একাধিক তাৎপর্য গ্রহণ করার সম্ভাবনা থাকতে পারে যাতে, সেগুলো হচ্ছে মুতাশাবিহ।’’
(মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুহু, আল মানার, খ. ৩, পৃ, ১৯০; আলাউদ্দীন আলী ইবন মুহাম্মাদ আল খাযিন, তাফসীরুল খাযিন, (লাহোরঃ নু‘মানী কুতুবখানা, তা. বি) খ. ১, পৃ. ২৩০)
ইমাম আহমাদ বলেন, المحكم ما استقل بنفسه و لم يحتج الي بيان ‘‘যেগুলো স্বত:সম্পূর্ণ ও অন্য নিরপেক্ষ এবং যেগুলোর তাৎপর্য অন্য ব্যাখ্যা সাপেক্ষ নয়, সেগুলো হচ্ছে মুহকাম।’’
و المتشابه ما احتج الي بيان ‘‘পক্ষান্তরে যেগুলো ব্যাখ্যা সাপেক্ষ, সেগুলোই হলো মুতাশাবিহ।’’ (মাওলানা আকরাম খাঁ, বাংলা তাফসীর (ঢাকাঃ ঝিনুক পুস্তিকা ) খ. ১. পৃ. ৩৭০)
আল্লামা আলাউদ্দীন আলী ইবন মুহাম্মাদ আল খাযিন বলেন, محكمات يعني مبينات مفصلات أحكمت عبارتها من احتمال التأويل و الاشتباه ‘‘মুহকাম অর্থ হলো বিশদভাবে বর্ণিত ও সুস্পষ্ট, যা বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও সন্দেহ- সংশয় হতে সুরক্ষিত।’’ متشابهات يعني لفظه يشبه لفظ غيره و معناه يخالف معناه ‘‘মুতাশাবিহাত অর্থ হলো, যে শব্দ অন্য শব্দের মতই, কিন্তু তার অর্থ ভিন্ন ।’’ (তাফসীরুল খাযিন, প্রাগুক্ত)
মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর অর্থ দ্ব্যর্থবোধক, অস্পষ্ট ও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ হওয়ায় বক্র হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ ফিৎনা-ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টির লক্ষ্যে ইচ্ছামত এগুলোর ব্যাখ্যা করে থাকে । কিন্তু এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, এগুলোর বাহ্যিক অর্থের পরিবর্তে ভাবার্থ, রূপক অর্থ ও অন্তর্নিহিত অর্থ গ্রহণ করতে হবে। আর সে অর্থ গ্রহণ করতে হবে মুহকাম আয়াতের আলোকে । এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবন কাছীর বলেন ,
فمن رد ما اشتبه الي الواضح منه و حكم محكمه علي متشابهه عنده فقد اهتدي و من عكس العكس
‘‘যে ব্যক্তি সন্দেহ-সংশয় যুক্ত (মুতাশাবিহাত) বিষয়কে সুস্পষ্ট বর্ণনার সাথে মিলিয়ে নেয় এবং মুহ্কাম আয়াতগুলোর সাথে সন্দেহের বিষয়গুলো যাচাই বাছাই করে নেয়, তাহলে সে সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। কিন্তু এর উল্টা করবে যে ব্যক্তি, সে হবে বিপথের যাত্রী।’’ (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত )
এ ব্যাপারে মুফতি মুহাম্মাদ শাফী বলেন, ‘‘ দ্বিতীয় প্রকার আয়াত (মুতাশাবিহ আয়াত ) অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট হওয়ার কারণে এগুলো সম্পর্কে বিশুদ্ধ পন্থা এই যে, এসব আয়াতকে প্রথম প্রকার (মুহকাম) আয়াতের আলোকে দেখতে হবে। যে অর্থ প্রথম প্রকার আয়াতের বিপক্ষে যায়, তাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে বক্তার এমন উদ্দেশ্য বুঝতে হবে, যা প্রথম প্রকার আয়াতের বিপক্ষে নয়।’’ (মা‘আরিফুল কুরআন, বঙ্গানুবাদ, বাদশা ফাহাদ কুরআন মুদ্রণ প্রকল্প, পৃ, ১৬৪)
. আয্ যাহাবী, আত্ তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন, খ. ২, পৃ. ২৫৭-২৫৮।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৮।
. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৬। হাদীছটির পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা নিম্নরূপ :‘মাসরূক (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রাজিয়াল্লাহু ‘আনহু) কে ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলোনা বরং তারা জীবিত, তারা তাদের রবের নিকট জীবিকা পায়’ এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, তাদের রূহসমূহ সবুজ পাখির উদরে থাকে, যা আরশের সাথে ঝুলানো একটি পিঞ্জিরায় অবস্থান করে। সেখান থেকে জান্নাতের যেথায় খুশি ভ্রমণ করে। অত:পর আবার সে পিঞ্জিরায় ফিরে আসে। অত:পর আল্লাহ তাদের দিকে দৃষ্টি দেন এবং বলেন, তোমরা কি কিছু চাও? তারা বলবে, আমরা আর কি চাব? আমরা তো জান্নাতের যেথায় ইচ্ছা ঘুরে বেড়াচ্ছি। আল্লাহ তাদেরকে তিনবার জিজ্ঞেস করবেন। তারা (শহীদরা) যখন দেখবেন যে, কোন কিছু না চাওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে ছাড়বেন না, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব, আমরা চাই আমাদের রূহসমূহকে আমাদের দেহে ফিরে দেয়া হোক, যাতে আমরা আবার আপনার রাস্তায় নিহত হতে পারি। আল্লাহ যখন দেখবেন যে, তাদের আর কোন চাওয়া পাওয়া নেই, তখন তাদেরকে ছেড়ে দেবেন। ( ওয়ালিউদ্দীন মুহাম্মাদ , মিশকাতুল মাসাবীহ্ কিতাবুল জিহাদ, আল ফাসলুল আওয়াল মুসলিমের উদ্ধৃতিতে ইবনুল কায়্যিম , যাদুল মাআদ, খ.২ ফাসলু ফাজজলুল শাহীদ ওয়া মাযিয়াতুশ শাহাদাত)
. জালালউদ্দিন প্রাগুক্ত পৃ. ২৩-২৪।
. আশ্ শাওকানী, নাইলুন আওতার, খ. ১, ভূমিকা, পৃ. ل।
. আশ্ শাওকানী ,আল্ বাদরুত তালি‘, . খ. ২, পৃ. ২১৯।
. আশ্ শাওকানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৯-২২৩।
. জালালউদ্দিন প্রাগুক্ত পৃ. ২৫।
. জালাল উদ্দিন প্রাগুক্ত. পৃ. ২৬-২৭।
. প্রাগুক্ত পৃ.২৫।
. কবিতাগুলোর জন্য দ্র. আশ্ শাওকানী. আল বদরুন তালি‘, খ. ২, পৃ. ২২৫।
. জালাল উদ্দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬।

. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭।
. প্রাগুক্ত।
. প্রাগুক্ত।
. আয্ যাহাবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪৯; শাওকানী, নাইলুল আওতার, ভূমিকা, পৃ. ل
. The Encyclopaedia of Islam, vol. ix, p. 378.
. শায়খ মুহাম্মাদ ‘আব্দুহু, তাফসীরে আল মানার, খ. ৭, পৃ. ১৪৫।
. نحن نزلنا الذكر و انا له لحافظون انا ‘‘নিশ্চয়ই আমি স্মারক (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক। (আল হিজর : ৯)
. সুলাইমান ইবন আশ‘আছ, সুনানু আবি দাউদ, (দিল্লী : মাত.বা‘উ মুজতাবাঈ, ১৩৪৬ হি.) কিতাবুল মালাহিম, খ. ২, পৃ. ২৪১।
. সায়্যিদ আবুল আ‘লা মওদূদী, তাজদীদ ওয়া এহ্ইয়ায়েদীন, অনুবাদক আব্দুল মান্নান তালিব, ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন, (ঢাকা : আধুনিক প্রকাশনী, ৯ সং, ২০০৫ ইং) পৃ. ২৫-২৬।

. প্রাগুক্ত।