মূলপাতা নিবন্ধ সার্কঃ সূচনা ক্রমবিকাশ ও সাফল্য-ব্যর্থতার পর্যালোচনা

দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং নিজেদের মধ্যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠিত হয়েছে। উন্নয়ন আঞ্চলিক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে সার্ক স্থাপিত। এটি মূলত একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতার আঞ্চলিক সংগঠন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার মাধ্যমে পূর্ণতা প্রদানই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। এই দর্শনকে সামনে রেখেই ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের তৎকালীণ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেন। ১৯৮০ সালের মে মাসে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে এ মর্মে বাংলাদেশের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেন। জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন এ অঞ্চলের জনগণের মধ্যে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, কারিগরি, সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে সহজ ও স্বাভাবিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন ও সম্ভাবনা দৃঢ় হোক। দক্ষিণ এশীয় সাতটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানরা এ প্রস্তাবে প্রাথমিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সাড়া দেন। ১৯৮১ সালের ২১ থেকে ২৩ এপ্রিল কলম্বোতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রথম পররাষ্ট্র সচিব সম্মেলনে কাঙ্ক্ষিত সংগঠন গঠনের ব্যাপারে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়। এরপরই ১৯৮৩ সালের আগষ্ট মাসে এ অঞ্চলের সাতটি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা দিল্লিতে তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। এ বৈঠকে মন্ত্রিবর্গ একীভূত বা যৌথ কর্মসূচী বা Integrated Programme of Action (IPA) নামে একটি প্রোগ্রাম গ্রহণ করেন। এ কর্মসূচির আওতায় সার্কভুক্ত রাষ্টগুলোর মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের জন্য নয়টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়। অতঃপর ১৯৮৫ সালের ৭-৮ ডিসেম্বর ঢাকা সম্মেলনের মাধ্যমে সার্কের (SAARC- South Asian Association for Regional Co-operation) বা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদিত হয় এবং তার যাত্রা শুরু হয়। 

সার্ক ৭টি রাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ৮। এ পর্যন্ত সার্কের ১৬টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সার্কের সদর দপ্তর নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত।
সার্কের সদস্য রাষ্ট্র
দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য ১৯৮৫ সালে শুরু হওয়া সার্ক ইতিমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করেছে। সার্কে আফগানিস্তানের অন্তুর্ভুক্তির ফলে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটে। এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে: ১. বাংলাদেশ, ২. ভারত, ৩. পাকিস্তান, ৪. নেপাল, ৫. শ্রীলংকা, ৬. ভুটান, ৭. মালদ্বীপ, ৮. আফগানিস্তান।
সার্কের পর্যবেক্ষক দেশসমূহ
চীন ও জাপানের মতো উন্নত প্রযুক্তিশীল রাষ্ট্র সার্কের পর্যবেক্ষক। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইরান ও মরিশাসকে সার্কের পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দেয়া হয়।
সার্কের অবকাঠামো
সার্ক সনদে এ সংস্থার জন্য একটি পাঁচ স্তর বিশিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিধান রাখা হয়েছে। এই কাঠামো হচ্ছেঃ
1. সদস্য দেশসমূহের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন: সার্ক সনদ অনুযায়ী প্রতি বছরই এই শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। নিয়ম অনুযায়ী সব সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হতে পারে না। প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত সার্কের ১৬ টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
2. পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সাধারণত বছরে দু’বার মিলিত হন। সম্ভব না হলে বছরে অন্তত একবার মিলিত হবেন। এ সম্মেলনগুলোতে বিভিন্ন এজেন্ডা ও সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করা হয়।
3. স্ট্যান্ডিং কমিটি: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র সচিবদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠিত। সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর পরিকল্পনা, অনুমোদন, তদারকি ও সমন্বয় সাধন এ কমিটির প্রধান কাজ। এ কমিটি প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো সময় বৈঠকে বসবেন এবং সংস্থার কার্যাবলী সম্পর্কে স্বস্ব দেশের মন্ত্রিপরিষদের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট পেশ করবেন।
4. টেকনিক্যাল কমিটি: সার্কের সব কর্মসূচি কতোগুলো নির্দিষ্ট সহযোগিতার ক্ষেত্রের মাধ্যমে পরিচালিত। এসব কর্মসূচির টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে এ কমিটি গঠিত।
5. সচিবালয়: সার্ক সনদের ৮নং ধারায় সার্ক সচিবালয় সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। বাঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত সার্কের দ্বিতীয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সচিবালয়ের গঠন ও কার্যাবলী সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নেপালের কাঠমান্ডুতে সার্ক সচিবালয় স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৮৭ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। সার্কের কর্মকান্ড পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে সচিবালয় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে থাকে।
সার্কের মূলনীতি
সার্কের মূলনীতিগুলো হলো:
1. সার্কের যে কোনো সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হতে হবে।
2. দ্বিপক্ষীয় বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো এ সংস্থায় তোলা হবে না।
3. প্রত্যেকটি সদস্য রাষ্ট্র পরস্পরের আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, কেউ কারুর অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। তদুপরি তারা পারস্পরিক লাভালাভের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকবে।
4. এ অঞ্চলের দেশগুলোর আশা-আকাঙ্খার প্রতি লক্ষ্য রেখে সার্ক ভূমিকা পালন করবে।
সার্কের সহযোগিতার ক্ষেত্র
সার্কের সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে:
১. কৃষি, ২. পল্লী উন্নয়ন, ৩. স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, ৪. নারী উন্নয়ন, ৫. পরিবেশ ও আবহাওয়া, ৬. বনায়ন, ৭. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ৮. মানবসম্পদ উন্নয়ন, ৯. পরিবহন ও যাতায়াত, ১০. পর্যটন, ১১. ডাক ও তার, ১২. শিশু অধিকার সংরক্ষণ, ১৩. মাদক পাচার ও ব্যবহার রোধ, ১৪. শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি।
সার্ক সনদ
১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই অনুমোদিত হয় সার্ক সনদ। এ সনদের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে-
1. দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণ সাধন এবং তাদের উৎকর্ষ বৃদ্ধি।
2. এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ দ্রুততর করা।
3. দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যৌথভাবে আত্মনির্ভরশীলতার প্রসার ও শক্তিবর্ধনে সাহায্য করা।
4. পরস্পরের সমস্যা অনুধাবন, পারস্পরিক বিশ্বাস ও বুঝাপড়ায় সাহায্য করা।
5. অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, কারিগরি, বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে সক্রিয় সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সাহায্যের পরিস্থিতি সৃষ্টি।
6. অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি।
7. সম স্বার্থ বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সংগঠনসমূহের মুকাবিলায় নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার প্রসার।
8. অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা।
সার্কের সচিবদের নাম ও মেয়াদকাল
1. আবুল আহছান, ১৬ জানুয়ারি ১৯৮৭-১৫ অক্টোবর ১৯৮৯
2. কান্ট কিশোর বারগেভা, ১৭ অক্টোবর ১৯৮৯-৩১ ডিসেম্বর ১৯৯১
3. ইবরাহিম হোসাইন জাকি, ১ জানুয়ারি ১৯৯২-৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৩
4. যাবদ কান্ট সিলওয়াল, ১ জানুয়ারী ১৯৯৪-৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৫
5. নাঈম ইউ হেসাইন, ১ জানুয়ারি ১৯৯৬-৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৮
6. নিহাল রডরিগো, ১ জানুয়ারি ১৯৯৯-১০ জানুয়ারী ২০০২
7. কিউ এ এম এ রহিম, ১১ জানুয়ারী ২০০২-২৮ ফেব্রম্নয়ারী ২০০৫
8. চেনকিয়া দরজি ১ মার্চ ২০০৫-বর্তমান কাল পর্যন্ত।
সার্কের সফলতা
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক তৃতীয় দশকে পদার্পণ করেছে। সময়টা খুব দীর্ঘ না হলেও একটি আঞ্চলিক সংগঠনের পরিপক্বতার জন্য যথেষ্ট। এদিক থেকে সার্ককে মোটামুটিভাবে সফল বলা যায়। এই প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকার মতো যথেষ্ট সামর্থ্য দেখিয়েছে বলে মনে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্প্রসারণের জন্য এটি একটি প্লাটফরম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ প্লাটফরম এ অঞ্চলে অরাজনৈতিক বিষয়ে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে। সার্কের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেছে যা আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এর একটি আনুষ্ঠানিক সনদ রয়েছে এবং কাঠমান্ডুতে সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সার্ক এ অঞ্চলে রাজনৈতিক নেতাদের থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাইকে একে অপরের কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে একে অন্যের সমস্যা, আশা-আকাঙ্খা সম্পর্কে জানতে পারছে। এতে অনেক ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটানোর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
সার্কের সাফল্যগুলো নিম্নরূপঃ
 প্রতিষ্ঠার পর থেকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বড় কোনো সংঘাত হয়নি। এর কারণ সার্কের মূল্যবোধ।
 সদস্য রাষ্টগুলোর মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রায়ই আন্তর্জাতিক ফোরামে অভিন্ন নীতি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে।
 সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
 সার্কের আওতায় কৃষিতথ্য কেন্দ্র (Agricultural Information Centre), খাদ্য সুরক্ষণ ব্যবস্থাপনা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের কমিশন গঠন সার্কের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
 সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাফ গেমস সার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক বিষয়।
 সার্ক সদস্য দেশগুলো সন্ত্রাস দমন সংক্রান্ত একটি কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। এটি কার্যকর হলে সদস্যভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ও সীমান্তবর্তী সন্ত্রাস হ্রাস পাবে।
 সার্ক দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে UNCTAD-এর সঙ্গে সার্কের একটি সমঝোতা স্মারক, দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য ESCAP ও UNDP এর সঙ্গে এগ্রিমেন্ট, অর্থনেতিক উন্নয়নের জন্য জাপানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক, শিশুদের অধিকার নিশ্চিতকরণ ও উন্নয়নের জন্য ইউনিসেফের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে এ ধরনের পদক্ষেপ সার্কের অন্যতম সাফল্য।
 SAFTA চুক্তি সম্পাদন সার্কের একটি বড় ধরনের সাফল্য। সার্কভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংযুক্তিকরণ এবং দক্ষিণ এশীয় বাণিজ্যে পারস্পরিক পক্ষপাতমূলক কাঠামো রচনার আলোকে এই চুক্তি সম্পvাদত হয়। ১৯৯৩ সালে SAPTA স্বাক্ষরিত হয় যা ১৯৯৫ সালে কার্যকর হয়। SAFTA-এর আওতায় প্রতিটি পণ্যের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করে শুল্কহার কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা নেয়া হয়। চাহিদাভিত্তিক একটি উৎপাদনব্যবস্থা পরিচালনার স্বার্থে একাধিক দেশের উৎপাদনের উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিকাশের একটি নতুন পরিবেশ তৈরি এবং একটি অভিন্ন বাজার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বকে সার্ক স্বীকৃতি দিয়েছে। SAFTA -এর একটি উদ্দেশ্য হলো ক্রমান্বয়ে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের উদারীকরণ, যার মাধ্যমে SAFTA (South Asian Free Trade Area) বা মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার একটি স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। ১৯৯৭ সালের ১২ থেকে ১৪ মে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত নবম শীর্ষ সম্মেলনে ২০০১ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াকে একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল এবং একটি অর্থনৈতিক গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। SAPTA এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সম্পদ, সেবা , বিনিয়োগ এবং জনগণের মুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করবে। অবাধ বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে SAPTA-এর আওতায় ২২৬ পণ্য এবং দ্বিতীয় দফায় ২০০ পণ্যের ১০% থেকে ৫০% শুল্ক কমানো হয়।
 সার্কের উদ্যোগে সার্ক টিউবারকিউলোসিস সেন্টার (SAARC Tuberculosis Centre), সার্ক ডকুমেন্টেশন সেন্টার (SAARC Documentation Centre), সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র (SAARC Meta Research Centre) প্রভৃতির মাধ্যমে এ অঞ্চলে উল্লিখিত বিষয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
 চতুর্দশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সার্ক পাসপোর্ট প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সার্কভুক্ত দেশগুলোতে অবাধ চলাচল বৃদ্ধি পাবে। বিভেদের দেয়াল অর্থহীন হয়ে পড়বে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জনবসতি ঘনত্বের সমতা আসবে। এছাড়া সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন ‘সার্ক মুদ্রা’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। অভিন্ন সার্ক মুদ্রা চালু হলে উন্নত দেশের মুদ্রানীতির আধিপত্য থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণ রেহাই পাবে।
 সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চতুর্দশ সম্মেলনে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস হবে নয়াদিল্লিতে, বাংলাদেশে হবে একটি শাখা ক্যাম্পাস। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সার্কভুক্ত অঞ্চলে শিক্ষার বিস্তার ঘটবে।
 জরুরি খাদ্য সঙ্কট, খাদ্য ঘাটতি এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় সার্ক ফুড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ব্যাংকে থাকবে ২ লাখ ৪১ হাজার ৫৮০ মেট্টিক টন চাল ও গম।
 দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে পণ্য ও জনগণের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে সার্ক দেশগুলোর রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চতুর্দশ সম্মেলনের মূল বিষয়বস্ত্ত ছিল কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগ।
 চতুর্দশ শীর্ষ সম্মেলনে সার্কের অবয়বগত পরিবর্তন ঘটেছে। কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্তি সার্ককে দক্ষিণ এশিয়ার পরিচিতির ক্ষেত্রে পরিপূর্ণতা প্রদান করেছে। সার্ককে পূর্ণ অবয়বে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের অন্তুর্ভুক্তি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক।
 দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোতে উৎপাদিত ও বাজারজাত করা পণ্যের অভিন্ন মান নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সার্কের দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর সদর দপ্তর ঢাকায়।
 নারী ও শিশু উন্নয়ন, শান্তি প্রতিষ্ঠা, দরিদ্রতা দূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য ২০০৪ সাল থেকে সার্ক অ্যাওয়ার্ড দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সার্ক কার্যক্রমের একটি বিশ্লেষণ
প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত প্রায় আড়াই দশকে সার্কের আওতায় ২১টি চুক্তি এবং অনেকগুলো ঘোষণা আসলেও তার অধিকাংশই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ২০০০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য সার্ক যে অঙ্গীকার করেছিল তা যেমন বাস্তবায়িত হয়নি তেমনি ২০০২ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াকে দারিদ্র্যমুক্ত করার ঘোষণাও এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে। বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে SAPTA ও SAFTA-র মতো চুক্তি করা হলেও গত ২৫ বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেড়েছে মাত্র ৫.৮ শতাংশ। সন্ত্রাস দমনে একযোগে কাজ করার কথা থাকলেও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিস্তার ও উৎস নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহের বেড়াজাল। পক্ষান্তরে সদস্য দেশগুলোর সাধারণ মানুষ মনে করে যে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সার্ক নেতৃবৃন্দ যে সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ার চেহারা পাল্টে যেত। অনেকে মনে করেন সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, তাদের মধ্যে সম্প্রীতির অভাব এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সার্ককে অনেকটাই অকার্যকর করে তুলেছে।
বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশ নিয়ে সার্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ২০০৭ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত চতুর্দশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে আফগানিস্তানকে অষ্টম সদস্য দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইতোমধ্যে গত ২৫ বছরে সার্কের আওতায় ২১টি চুক্তি এবং ১৬টি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য সাপটা চুক্তি এবং সন্ত্রাস দমন সংক্রান্ত সনদ সার্কের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হলেও তা এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। ২০০৪ সালে ইসলামাবাদ সম্মেলনে সাফটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরের বছর থেকে তা কার্যকর করার কথা থাকলেও স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা নিয়ে দুই প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চুক্তিটির বাস্তবায়ন আটকে আছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভারতের বেনিয়া ও সংরক্ষণনীতি। এছাড়াও আছে স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পরস্পর পরস্পরকে ছাড় না দেয়ার প্রবণতা। ফলে আন্তঃবাণিজ্য সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ১৯৮৫ সালে সার্ক যখন যাত্রা শুরু করেছিল তখন এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের হার ছিল ৩.২ শতংাশ। ২৫ বছর পর এখন এই হার মাত্র ৫.৮ শতাংশ। পক্ষান্তরে আসিয়ানের (ASEAN) ক্ষেত্রে আন্তঃবাণিজ্যের হার ২৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে তা ৬০ শতাংশের বেশী, সার্কের আওতায় প্রথমে সাপটা (SAPTA) ও পরে সাফটা (SAFTA) স্বাক্ষরের পরও আন্তঃবাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসেনি। বস্ত্ততঃ ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগের কথা বলা হলেও সার্ক দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ড এখনও খুব কম। এর আগের কয়েকটি শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির অঙ্গীকার করা হলেও আশানুরূপ তেমন অগ্রগতি আসেনি। নিকট প্রতিবেশী হওয়া সত্বেও সার্ক দেশগুলোর সাধারণ মানুষ পরস্পর পরস্পরের বন্ধু হতে পারেনি।
প্রায় প্রতিটি সম্মেলনে সন্ত্রাস দমনে সার্ক নেতারা জোরালো অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ফলপ্রসূ কোনও পদক্ষেপের অভিব্যক্তি ঘটেনি। বরং বড় একটি সদস্য দেশ প্রতিবেশী দেশগুলোতে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে মদদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং মাওবাদী সন্ত্রাসে জর্জরিত এই দেশটি নিজ দেশে সন্ত্রাস দমনে ব্যর্থ হয়ে তা অন্যদেশে রফতানী করে ভার লাঘবে এখন বদ্ধপরিকর। প্রতিবেশী দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় দেশটি সন্ত্রাসকে এখন পুঁজি হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়। সন্ত্রাসের বিস্তার ও সন্ত্রাসীদের আশ্রয় নিয়ে প্রতিবেশী দেশসমূহের মধ্যে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ চলছে।
২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কায় পঞ্চদশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে চারটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ এশীয় উন্নয়ন তহবিল গঠন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর হবার কথা থাকলেও তার বাস্তবায়ন অবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে। তিনশ’ মিলিয়ন ডলারের এই উন্নয়ন তহবিলটি দু’বছরের মধ্যেও পূর্ণতা না পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ-সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে এসডিএফ গঠনের ধারণাটি গৃহিত হয়। পরে ১৯৯৬ সালে সার্ক ফান্ড ফর রিজিওনাল প্রজেক্টস (SFRP) ও সার্ক রিজিওনাল ফান্ড (SRF) একীভূত করে এসডিএফ গঠন করা হয়। সার্ক দেশগুলোর গৃহিত উন্নয়ন কর্মসূচী বিশেষ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচীসমূহ বাস্তবায়নের জন্যই এসডিএফ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২০০৪ সালে পাকিস্তানের করাচীতে এসডিএফ-এর গভর্নিং বোর্ডের অষ্টম সভায় সার্কের সদস্য দেশগুলোর প্রস্তাবিত সকল কর্মসূচী অনুমোদন করা হয়। এছাড়াও এই অঞ্চলে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য কর্মসূচী প্রণয়নের লক্ষ্যে সার্ক মহাসচিবের সমীক্ষা প্রস্তাব ও তখন গৃহিত হয়েছিল। ২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং প্রস্তাবিত এসডিএফ-কে ১০০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার ঘোষণা দেন। এর পর থেকে এসডিএফ সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়। পরে নয়া দিল্লীতে অনুষ্ঠিত চতুর্দশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে উন্নয়ন তহবিলে ভারত ২০০ মিলিয়ন দেয়ার প্রস্তাব করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩৪ মিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। ২০০৪ সালে ইসলামাবাদ শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশীয় ফুড ব্যাংক গঠনের প্রস্তাব করা হয়। সদস্য দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা এবং আপৎকালীণ সময়ে খাদ্য ঘাটতির দেশগুলোতে খাদ্য সরবরাহ এই ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য। তবে সব দেশ এখনো ফুড ব্যাংকের এই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। প্রস্তাবিত ফুড ব্যাংকে ২,৪১,৫৮০ টন চাল ও গম মওজুদ রাখার কথা বলা হয়েছে। নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত চতুর্দশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সার্কের আওতায় দক্ষিণ এশীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কয়েক দফা স্থান পরিবর্তনের পর এখন কোলকাতার শান্তি নিকেতনে সার্ক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে।
প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার অবনতি, পণ্য মূল্য, ঋণের বোঝা, বহিঃসম্পদের সীমিত অবস্থা, অসম বাণিজ্য এবং উন্নত বিশ্ব কর্তৃক সংরক্ষণ নীতি অনুসরনের ব্যাপারে সার্ক নেতৃবৃন্দ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে নারীদের অংশ গ্রহনের অনুকুলে ও মাদক দ্রব্যের ব্যবসা বন্ধে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া রেডিও, টেলিভিশনসহ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বেতার কর্মসূচী গ্রহণ, পর্যটন, ছাএ শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি, বৈজ্ঞানিক ও উন্নয়ন বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময়ের জন্য ডকুমেন্টশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তৃতীয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি খাদ্য ভান্ডার গড়ে তোলা, রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের দেশ থেকে বিতাড়ন করে অভিযোগকারী দেশের হাতে তুলে দেয়া এবং পরিবেশ রক্ষায় আঞ্চলিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়। সার্কভুক্ত দেশগুলোর সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি না করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে সার্ক দেশসমূহের সুপ্রীম কোর্টে বিচারপতি ও পার্লামেন্টের সদস্যদের বিশেষ সার্ক ভ্রমণ দলিল দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পঞ্চম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দারিদ্র্য দূরীকরনের লক্ষ্যে কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন ১৯৯২ সালে তাদের রিপোর্ট পেশ করে এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সম্মেলনে তা অনুমোদিত হয়। এই রিপোর্টে ১০ বছরের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচনের প্রস্তাব করা হয়। ষষ্ঠ সম্মেলনে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাপটা গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। পরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সাপটা স্বাক্ষরিত হয়। চzুক্ত অনুযায়ী ১৯৯৫ সাল থেকে সাপটা কার্যকর হয়। এর আওতায় ২২৬টি পণ্যের ক্ষেত্রে শূণ্য থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক রেয়াত ঘোষণা করা হয়। সপ্তম সম্মেলনে ঢাকা ঘোষণায় সার্ক তৎপরতার ক্ষেত্রে সমন্বিত কর্মসূচীকে আরো সংহত ও জোরদার করা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অবক্ষয় রোধে জাতীয়, দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকসহ সব রকমের কর্মসূচী বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ১৯৯৫ সালে নতুন দিল্লীতে অনুষ্ঠিত অষ্টম শীর্ষ সম্মেলনে একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আহবান জানানো হয়। মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত নবম শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণায় সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অবাধ বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে দক্ষিণ এশীয় অবাধ বাণিজ্য এলাকা (সাফটা) গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দশম সম্মেলনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ত্বরান্বিত করা, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা বিধান, বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং সস্ত্রাস ও মাদক চোরাচালান বন্ধের অঙ্গীকার করা হয়। এছাড়া ২০০২ সালের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচনে সার্কের অঙ্গীকার অব্যাহত রাখা এবং নারী ও শিশু পাচার রোধে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলা হয়। শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত একাদশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার দৃঢ় অঙ্গীকার, অবাধ বাণিজ্য এলাকা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। ২০০৫ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ শীর্ষ সম্মেলনে ৪৩ দফা ঘোষণায় খাদ্য নিরাপত্তা কার্যকর, এইডস প্রতিরোধে ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণসহ অভিন্ন স্বার্থে বহুপাক্ষিক ফোরামে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেয়ার কথা বলা হয়। এই সম্মেলন থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জনগনের জীবন মানের উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে সার্ক সামাজিক সনদ এবং সন্ত্রাস দমনে অতিরিক্ত প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন গঠনের অঙ্গীকার করা হয়। এছাড়া সম্মেলনে আঞ্চলিক সহযোগিতা, দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সন্ত্রাস নির্মূল ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও একযোগে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। ২০০৭ সালে নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত চতুর্দশ শীর্ষ সম্মেলনে সন্ত্রাস দমন ও যোগাযোগ বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। দিল্লী সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঞ্চলিক ফুড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
২০০৮ সালে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত পঞ্চদশ শীর্ষ সম্মেলনে বহুমুখী যোগাযোগ ও ট্রানজিট সুবিধা, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানানো হয়। এতে সন্ত্রসীদের ব্যাপারে তথ্য বিনিময় ও আইনগত সহায়তা প্রদান, এসডিএফ সনদ অনুমোদন, দক্ষিণ এশীয় ষ্ট্যান্ডার্ড টেষ্টিং ল্যাবরেটরী প্রতিষ্ঠা এবং সাফটার আওতায় আফগানিস্তানকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সার্কের চ্যালেঞ্জসমূহ
১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঐক্যবদ্ধভাবে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ৭টি দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর মোকাবেলা এবং সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সাতটি দেশ পরস্পর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা আসিয়ানের ন্যায় তাদের মধ্যে আন্তঃবাণিজ্যের হার বৃদ্ধি পায়নি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নতুন বাজার সৃষ্টি, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত। এই শর্ত পূরণে আঞ্চলিক এই সংস্থাটির ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত বলে প্রতীয়মান হয়। সদস্য দেশগুলোর উপর ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা এর জন্য প্রধানতঃ দায়ী। সার্কের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের সমস্যাও রয়েছে। একটি বড় ও শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারত অন্যান্য দেশগুলোকে সার্কের সম অংশীদার বলে মনে করে না। সার্ক দেশসমূহের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের অভাব, প্রতিবেশী দেশসমূহের সাথে ভারতের সম্পর্কের তিক্ততা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা আঞ্চলিক এই জোটের ঐক্য ও সংহতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে বাণিজ্যিক চুক্তিসমূহের ফলপ্রসূ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে করে সদস্য দেশগুলোকে জোট ও চুক্তির বাইরে এসে একক ও দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ গ্রহণ করে স্বস্ব বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
সার্কের দুই দশকের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, দক্ষিণ এশিয়ার আর্থ সামাজিক নীতির স্থপতি হিসেবে নয়, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও সম্মেলনের মাধ্যমে আঞ্চলিক আলাপ-আলোচনা উৎসাহিত করার একটি ফোরাম হিসেবেই সার্কের কর্মকান্ড বেশী পরিচিত লাভ করেছে। একটি আঞ্চলিক সংস্থা বা জোট হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা কতিপয় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
সার্কের কাঠামোটি প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক সহযোগিতার অনুকূল নয়। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনই হচ্ছে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক কর্তৃপক্ষ। শীর্ষ সম্মেলনের অংশীদার যে কোনও একটি দেশ অনীহা প্রকাশ করলে সম্মেলন পন্ড হয়ে যেতে পারে। কার্যতঃ হয়েছেও তাই। সার্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২৫টি বছরে এর সনদ অনুযায়ী ২৫টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র ১৬টি। অবশিষ্ট ৯টি হয়নি। এর প্রধান কারণ ভারতের বিরোধিতা। ভৌগোলিক আয়তন, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামরিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব এর সব ক’টি দৃষ্টিকোণ থেকেই ভারত দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে একটি শক্তিধর দেশ। এ প্রেক্ষিতে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী একটি শক্তি হিসেবে ভারতের সম্ভাবনা আসিয়ানের তুলনায় সার্ককে একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জোটে পরিণত করেছে। সার্ক ভারতীয় আধিপত্যবাদের খপ্পরে পড়ে যাবে এই ভয়ে প্রাথমিক অবস্থায় পাকিস্তান এতে যোগ দিতে চায় নি। ভারত সার্ককে তার স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একাধিক নজিরও ইতোমধ্যে স্থাপন করেছে। এর ট্রানজিট ও আঞ্চলিক হাইওয়ে এবং কানেক্টেভিটি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে ছিল ভারত-প্রভাবিত। বাংলাদেশের উপর দিয়ে তার উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সংঘাত মুখর রাজ্যগুলোতে সৈন্য ও অস্ত্র সম্ভার পরিবহন এবং এই রাজ্যগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের আনা নেয়া নিশ্চিতকরণই ছিল এর লক্ষ্য। প্রতিবেশী প্রত্যেকটি সদস্যদেশ সার্ক এর উপর ভারতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিরোধী; তাদের ধারণা এর ফলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ ক্ষুন্ন হতে বাধ্য। আবার ভারতের তরফ থেকে কয়েকটি প্রতিবেশী দেশকে নাম মাত্র কয়েকটি প্রস্তাব দেয়া ছাড়া দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর ভয় ও আশংকা দূর করার কোনও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তাদের প্রতি ভারতের আচরণ কখনো বন্ধসুলভ ছিল না, এখনো নেই। অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে ভারত বাংলাদেশে কৃষি ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র ধ্বংসের সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানও তার আগ্রাসনের শিকার। বাংলাদেশের সাথে ভারতের দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে সমুদ্র সীমা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ, ছিটমহল বিনিময়সহ স্থল সীমানা নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানি ভাগাভাগি ও ব্যবস্থাপনা সমস্যা, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মান, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হর হামেশা বিনা উষ্কানিতে গুলি বর্ষণ, বাংলাদেশীদের হত্যা ও তাদের ছত্রছায়ায় বাংলাদেশ ভূখন্ডে ঢুকে ভারতীয়দের জমি দখল, চাষাবাদ, লুটপাট প্রভৃতি। এই সমস্যাগুলো জিইয়ে রেখে ভারত কেŠশলে বাংলাদেশের ভারতপন্থী সরকারের কাছ থেকে বন্দর, করিডোর, ট্রানজিট ও গ্যাস, কয়লা ব্যবহারের সুবিধা আদায় করে নিয়েছে যা দেশের ১৫ কোটি মানুষ সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। সাধারণ মানুষের এই প্রতিক্রিয়া উভয় দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে রয়েছে যা সার্ক-এর দর্শনকে দুর্বল করছে।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে বিশাল ঘাটতি। আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যে এই ঘাটতির পরিমাণ গড়ে বছরে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য বিশেষ করে চোরা কারবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে এর পরিমাণ বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে। সার্ক এর সাপটা, সাফটা কিংবা উভয় দেশের মধ্যে সম্পাদিত কোনও প্রকার বাণিজ্য চুক্তিই এই ব্যবধান হ্রাস করতে পারছেনা। ভারতের শুল্ক ও শুল্ক বহির্ভুত বিধি নিষেধ এর জন্য প্রধানতঃ দায়ী। এ ক্ষেত্রে তাদের গৃহিত ব্যবস্থাসমূহের স্বচ্ছতাও নেই। শুল্ক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পণ্যের শ্রেণী বিন্যাস নিয়ে বিরোধ, রাসায়নিক পরীক্ষা ও ইন্ডিয়ান কাষ্টমস্ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব মূল্যায়নের উপর গুরুত্বারোপ রুলস অব অরিজিন সার্টিফিকেট গ্রহণে অস্বীকৃতি, একতরফাভাবে ট্যারিফ মূল্য চাপিয়ে দেয়া, আইএসআই সার্টিফিকেট গ্রহণের বাধ্যবাধকতা, বিএসটিআই সনদ গ্রহণে অস্বীকৃতি, কোয়ারেন্টাইন সনদের বাধ্যবাধকতা প্রভৃতি ভারতে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশকে অসম্ভব করে তুলেছে। ফলে সার্ক-এর বাণিজ্যিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় একই রকমের অবস্থা অন্যান্য দেশেও বিরাজ করছে। আবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্যের সুযোগ দেশটিকে প্রতিবেশীদের প্রতি উদ্ধত ও আপোসহীন করে তুলেছে। দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারতের সাথে প্রতিবেশী দেশসমূহের দীর্ঘ মেয়াদী বিরোধ সার্ক-এর কার্যকারিতার উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। আবার দ্বিপাক্ষিক বিষয় সার্ক ফোরামে না আনার নীতি বিরোধকে আরো গভীরতর করছে। আঞ্চলিক বাণিজ্যের উপর এর প্রভাব পড়ছে। বস্ত্ততঃ আঞ্চলিক বিরোধসমূহকে নিষ্পত্তির চেষ্টা না করে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রচেষ্টা সার্ক-এর একটি দুর্বলতম দিক। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সার্কের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বা শাস্তির বিধান নেই। বিরোধ কিভাবে সার্কের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করতে পারে তার কয়েকটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় এলটিটিআই বিদ্রোহীদের দমনের ব্যাপারে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপ ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে অবনতির সৃষ্টি করেছিল তা সার্কের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়নে শ্রীলঙ্কার মধ্যে উন্মাসিকতার সৃষ্টি করেছিল। সদস্য দেশগুলোর উপরও এর প্রভাব পড়েছিল।
ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ এর দ্বিতীয় উদাহরন। নূতন দিল্লীর সাথে বাণিজ্যিক বিষয়ে আলোচনার পূর্বে পাকিস্তান ভারতের সাথে তার দ্বিপাক্ষিক বিরোধসমূহ বিশেষ করে কাশ্মীর সমস্যার মীমাংসার উপর গুরুত্বারোপ করে এসেছে। কিন্তু ভারত সে পথে এগোয়নি। বরং পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। পরমাণু শক্তিধর এ দু’টি দেশ অস্ত্র প্রাতিযোগিতায়ও নেমেছে। পাকিস্তানের মোকাবেলায় ভারত সার্ক এলাকায় বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানের সমন্বয়ে গঠিত একটি উপ-আঞ্চলিক গ্রুপে যোগদান করেছে। তারা নেপালের সাথে একটি বাণিজ্য ও ট্রানজিট চুক্তিও করেছে। দেশটি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও হস্তক্ষেপ করছে এবং তার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন রাজনৈতিক দল/দলসমূহকে অর্থবিত্তের প্ররোচনা ও প্রলোভন দেখিয়ে কাবু করে এবং প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে ক্ষমতায় এনে স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় ব্যাপৃত রয়েছে। ২০০৯ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে বাংলাদেশে বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যাকান্ডের সময় ভারত কর্তৃক ঘটনার সার্বক্ষণিক মনিটরিং, তাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন শেখ হাসিনা সরকারকে উদ্ধার করার জন্য প্রয়োজনে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও সেনা প্রেরণের প্রস্তাব এই অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠারই ইঙ্গিত বহন করে। একইভাবে সম্প্রতি ঢাকায় চূড়ান্তকৃত সার্ক গণতন্ত্র সনদ ও গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় প্রশ্নের অবতারনা করেছে। এই সনদে সদস্য দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হলে অন্য দেশের হস্তক্ষেপের বিধান রাখা হয়েছে যা সার্ক দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। এই বিধান ভারতীয় আধিপত্যবাদকে উৎসাহিত করবে। মজার ব্যপার হচ্ছে এই বিধানটি এমন একটি সরকারের উদ্যোগে সংযোজন করা হয়েছে যে সরকার তার দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ভারত তাদের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে।
সার্ককে যদি টিকে থাকতে হয় তাহলে তার সদস্য দেশগুলোর জনসাধারণের সমস্যাবলী সমাধানের পথ ধরেই টিকে থাকতে হবে। জোটবদ্ধ উন্নয়নের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেই এটা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে আসিয়ান ও ইইসি থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।
ইইসি একটি পুরাতন প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক অবস্থায় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গ এই জোট গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। জোটটি ইউরোপীয় কৃষক ও শিল্প মালিকদের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সমস্যার নিরসন এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। এই জোটের সদস্যপদ এখন ২৫ এ এসে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ বণ্টন ও রফতানীর ক্ষেত্রে ইইসি তার সদস্য দেশগুলোর সমবায় সমিতি গুলোকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। ইইসির কয়েকটি নির্বাচিত সদস্য দেশের কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণে সমবায়ের হিস্সা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ২০০৮ সালে জার্মানীর কৃষি পণ্য বিশেষ করে খাদ্য শস্যের ৬৭ শতাংশ, ফ্রান্সের ৬৬ শতাংশ, ইতালির ২৬ শতাংশ, ইংলা্যন্ডের ৭০ শতাংশ, বেলজিয়ামের ২৫ শতাংশ, লুক্সেমবার্গের ৯০ শতাংশ, ডেনমার্কের ৬০ শতাংশ এবং আয়ারল্যান্ডের কৃষি পণ্যের ৬৫ শতাংশ বাজারজাতকরণ সমবায়ের মাধ্যমে হয়েছে। একইভাবে দুগ্ধপণ্য বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও ইইসি দেশগুলো ব্যাপকভাবে সমবায়ের উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে সমবায়ের উপর জার্মানীর নির্ভরশীলতা হচ্ছে ৭৮ শতাংশ, ফ্রান্সের ৫৮%, ইতালীর ৪৫%, ইংল্যান্ডের ৮৭% বেলজিয়ামের ৬৮%, লুক্সেমবার্গের ৯০%, ডেনমার্কের ৮৭% এবং আয়ারল্যান্ডের নির্ভরশীলতা হচ্ছে ৯০%।
ইইসি দেশগুলো কর্তৃক গৃহিত সাধারণ কৃষি নীতির আওতায় প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রোডাকশন, মার্কেটিং ও কনজুমার কোঅপারেটিভগুলোকে ব্যাপক ভিত্তিতে তাদের সার্বিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে সাহায্য করেছে। আশির দশকের পর থেকে এসব দেশে সমবায় সমিতির সংখ্যা কমতে শুরু করেছে এবং বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপে সমবায়ের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে কিংবা সমবায়ের উপর থেকে ইউরোপবাসী আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। সমবায়ের ক্ষেত্রে ইইসি দেশগুলোতে এখন amalgamation, absorption ও reconstruction কর্মসূচী বাস্তবায়িত হচ্ছে। Economies of Scale-কে সামনে রেখে তারা ছোট ছোট সমবায়গুলোকে ভেঙ্গে দিয়ে বড় সমিতিগুলোর সাথে একত্রিভুত করছে। একত্রিভুতকরণের এই প্রক্রিয়া কোন কোন ক্ষেত্রে জাতীয় সীমানাকেও অতিক্রম করছে। ড্যানিস ডেইরী কোঅপারেটিভের সাথে নরওয়ে ও সুইডেন তাদের ডেইরী সমিতি একত্রিভুত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের স্বার্থে তারা যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অথবা গিল্ড গঠনে ঐকমত্য প্রকাশ করছে। দুধ উৎপাদন, গম উৎপাদন, আলু উৎপাদন, গোশত উৎপাদন সর্বক্ষেত্রে তারা কৌটা প্রথা চালু করেছে। বাজারের স্বার্থে কৌটার অতিরিক্ত উৎপাদন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ কায়েমের মাধ্যমে এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দেয়া তাদের প্রধান লক্ষ্য। ইইসিতে কয়েক বছর আগে নতুন আরো ১০টি দেশের সদস্য পদ প্রদান ইইসি ও ইউরোপীয় কমন মার্কেটের লক্ষ্য অর্জনকে সহজতর করেছে।
উপসংহার
প্রযুক্তির উৎকর্ষ বিশাল দুনিয়াকে এখন মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এই প্রযুক্তি উন্নত দেশগুলোকে অনুন্নত দেশগুলোর উপর প্রাধান্য দিয়ে Survival of the fittest নীতিকে জোরদার করতেও সহায়তা করছে। এ প্রেক্ষিতে বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মোকাবেলায় ক্ষুদ্র অর্থনীতিগুলোকে টিকে থাকতে হলে ক্ষুদ্র ও অনুন্নত দেশগুলোর ঐক্য ও জোট গঠনের বিকল্প নেই। সার্ক এ ক্ষেত্রে একটি প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। সস্তা শ্রম শক্তি, সস্তা কাঁচা মাল, উর্বর কৃষি ভূমি ও অনুকূল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও বাইরের অর্থনৈতিক আগ্রাসন মুকাবিলার জন্য সার্কের সূচনাও এই অঞ্চলের মানুষের মনে একটি অঙ্গীকারের সূচনা করেছিল। কিন্তু ভারতের মোড়লিপনা ও ভারত-পাকিস্তান Cross Cultural Conflict এর শিকার হয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সার্ককে তৎপর ও শক্তিশালী করতে হলে নিম্নোক্ত দু’টি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী।
1) সার্ক সনদ সংশোধন করে সার্কের বিদ্যমান শীর্ষ সম্মেলনকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করা জরুরী। এর উচ্চতর কক্ষে থাকবে সকল সদস্য দেশ এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামগ্রিক অগ্রগতির মূল্যায়ন ও পরিধারণ হবে তার কাজ। সামিট এর নিম্ন কক্ষে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব থাকবে না। এই কক্ষের সদস্য দেশগুলো বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন এবং বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি বছর একবার শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হবেন। শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠানের জন্য সকল দেশের ১০০ ভাগ সম্মতির বিধানটিও রহিত করতে হবে। ভারতীয় আধিপত্য ও ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বকে যদি সার্কের কাঠামোতে গৌণ করে তোলা যায় তা হলে এই প্রতিষ্ঠানটির গতিশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
2) উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও আন্তঃবাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সার্ক দেশগুলো ইইসি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সমবায়সহ স্ব স্ব দেশের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে পারে। এক্ষেত্রে ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’- এই নীতির অনুসরণে সার্ক বহির্ভুত দেশসমূহের পরিবর্তে তারা তাদের আমদানী-রফতানী বাণিজ্য যথাসম্ভব নিজেরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ও সম্প্রসারিত করার পদক্ষেপ নিতে পারে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান Tarrif-Non-Tarrif বাধাসমূহ অবশ্যই দূর করতে হবে। ভারত-পাকিস্তান যদি এক্ষেত্রে অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে চায় আপত্তি নেই। তবে তারা যাতে বাধা না হতে পারে সে জন্যই সনদ সংশোধন জরুরী।

প্রবন্ধটি ১৩ নভেম্বর, ২০১০ তারিখে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসেবে উপস্থাপিত হয়।