মূলপাতা নিবন্ধ ইসলামী আইনের শ্রেষ্ঠত্ব

ভূমিকা
আল্লাহ তা‘য়ালা প্রদত্ত ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পথনির্দেশ মেনে চলা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এটি ছাড়া পৃথিবীতে যত পথ ও মত রয়েছে সবই মানব রচিত। এসব মানব রচিত মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে নিজ জীবন পরিচালনা করা মানুষের জন্য শোভনীয় নয়। এজন্য আল্লাহ তা‘য়ালা প্রদত্ত বিধান ব্যতিরেকে অপর কোন বিধানকে কোন মুসলিম আইন হিসেবে গ্রহণ করবে এটা ইসলাম অনুমোদন করেনা। এরপরও গভীর পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমান বিশ্বে এমন অনেক মুসলিম দেশ রয়েছে যেখানে মানব রচিত আইন কার্যকর রয়েছে। জ্ঞানের স্বল্পতা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেকেই এই ত্রুটিপূর্ণ ও ভারসাম্যহীন আইনকে ইসলামী আইনের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে যা অন্যায় ও অনভিপ্রেত। তাই মানব রচিত আইনের উপর ইসলামী শরী‘য়াহ আইনের শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন।
আইনের সংজ্ঞা ও পরিচয়
আইনের ইংরেজী প্রতিশব্দ হলো Law, যা আরোপিত কর্ম সম্পর্কিত নির্দিষ্ট বিধি-বিধানকে বুঝায়। আর পরিভাষায় আইন হলো, এমনকিছু নীতিমালা যা সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির আচরণকে বাধ্যতামূলকভাবে শৃংখলিত করে, যে তার বিরোধিতা করে তাকে শাস্তি প্রদান করে এবং সকল নাগরিকের মর্যাদা সংরক্ষণে যথার্থ ভূমিকা পালন করে। অন্যভাবে বলা যায়- আইন হলো, কিছু শিক্ষা ও মানবীয় নীতিমালার সমষ্টি যা নাগরিকের জীবন, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে শৃংখলিত করে। সাধারণ আইনের প্রদত্ত সংজ্ঞায় দু’টি দিক পরিলক্ষিত হয়। এক. দেশভিত্তিক আইন, দুই. বিষয়ভিত্তিক আইন। দেশভিত্তিক আইন বলতে বুঝায়- যেকোন দেশের জন্য রচিত নিজস্ব কার্যকর নীতিমালার সমষ্টি, যেমন- ফ্রেন্স আইন, বৃটিশ আইন, মিসরীয় আইন, বাংলাদেশী আইন ইত্যাদি। আর বিষয়ভিত্তিক আইন বলতে বুঝায়- নি©র্দষ্ট বিষয়ের জন্য রচিত সাজানো-গোছানো কিছু নীতিমালার সমষ্টি যা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্তৃত্বশীল কর্তৃক প্রণীত হয়ে থাকে, যেমন- বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, আত্মরক্ষার আইন ইত্যাদি।
আরবী অভিধানে ‘তাশরী‘ শব্দটি আইনের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যা شرع ধাতু থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো পানির উৎপত্তিস্থল। এছাড়া কঠিন, বিস্তৃত ও বৃহৎ কিছু বুঝানোর ক্ষেত্রেও শব্দটির প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন- বড়
রাস্তাকে شارع বলা হয়। অনুরূপভাবে মাটি কঠিন বা শক্ত হলে বলা হয় ‘شرعت الارض’। অপরদিকে কর্ম অনুসন্ধান ও চলার পথকে তাশরী‘ বা আইন বলা হয়। আর পরিভাষায়- الشريعة ما شرع الله لعباده من الدين والعقا ئد والاحكام ‘‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য দ্বীন, ‘আকীদা এবং আহকাম বিষয়ে যে আইন প্রবর্তন করেছেন তাই শরী‘য়াত’’। সাইয়েদ কুতুব শরী‘য়াতের যে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, তা অত্যন্ত অর্থবহ ও যুক্তিপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, فشريعة الله تمثل منهاجا شاملا متكاملا للحياة البشرية يتناول بالتنظيم والتوصية والتطوير كل جوانب الحياة الانسانية فى جميع مجالاتها و فى كل صورتها واشكالها ‘মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য পরিপূর্ণ নির্ভেজাল এক সুষ্ঠু নিয়ম পদ্ধতিকে আল্লাহর শরী‘য়াত হিসেবে অভিহিত করা হয়। এদ্বারা মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের উন্নয়নের জন্য আরোপিত নিয়ম পদ্ধতি ও রীতি-নীতিকে বুঝায়’।
সংজ্ঞা বিশ্লেষণ
অভিধানে শরী‘য়াহর দুটি অর্থ পাওয়া যায়- প্রথমত: সরলপথ, অর্থাৎ দ্বীনের সরলপথ। আর দ্বীনকে শরী‘য়াত নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যেহেতু দ্বীন একটি সরলপথ যাতে কোন বক্রতা বা সন্দেহের অবকাশ নেই। আল্লাহ তা‘য়ালা ইরশাদ করেন, لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا ‘‘আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য শরী‘য়াত ও এর কর্মপন্থা ঠিক করে দিয়েছি’’। দ্বিতীয়ত: প্রবাহিত পানির ঘাট, যেমন- বলাহয় ‘شرعت الابل’ যখন পানির ঘাটের সন্ধান পাওয়া যায়। ফিক্হবিদগণ বিভিন্নভাবে একে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
1. বিভিন্ন জাতির জনগণকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ‘আকীদা, ‘ইবাদাত, আখলাক ও জীবনাচার সম্পর্কিত আল্লাহ প্রদত্ত বিধান যার মাধ্যমে তাদের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ নিশ্চিত হবে।
2. বান্দার জন্য আল্লাহর দেয়া বিধি-বিধান যার প্রতি তারা বিশ্বাস স্থাপন এবং একে কার্যকর করার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যবান হবে।
3. বান্দার জন্য আল্লাহর দেয়া বিধি-বিধান যা তিনি তাঁর রাসূলের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন।
প্রদত্ত সংজ্ঞাগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলে এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, ইসলামী শরী‘য়াতের উদ্দেশ্যই হলো, এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও কার্যকর করার মাধ্যমে উভয় জগতের কল্যাণ নিশ্চিত করা ।
শরী‘য়াতের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থের মধ্যে সমন্বয় সাধন করলে আমরা বলতে পারি-প্রথম অর্থে, এসব বিধিবিধানকে শরী‘য়াত এজন্য বলা হয়েছে যেহেতু এর সবকিছুই সরল সঠিক। এর মাঝে কোনরূপ বক্রতা নেই, এটি তার উদ্দেশ্য থেকে কিছুমাত্র এদিক সেদিক হবেনা। দ্বিতীয় অর্থে, এসব বিধি-বিধানের পানির ঘাটের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে, কারণ পানির ঘাট যেমন জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন তেমনি এসব বিধি-বিধান আত্মা ও বিবেকের পরিশুদ্ধতার জন্য খুবই প্রয়োজন।
শরী‘য়াহ ও কানূন
প্রথম যুগের মুসলিম আলিমগণ ইসলামী শরী‘য়াহ বা শরী‘য়াতের বিধান আলোচনা করতে গিয়ে কোথাও আইন (কানূন) শব্দ ব্যবহার করেননি। এমনি ভাবে কোন শরী‘য়াহ বিশেষজ্ঞ তাঁর গবেষণা কর্মে কানূন শব্দ ব্যবহার করেননি। পরবর্তী সময়ে এসে কিছু কিছু আলিম যারা মানব রচিত আইনের সাথে পরিচিত হয়েছেন, তাঁরা ইসলামী শরী‘য়াহর ক্ষেত্রে কানূন শব্দ ব্যবহার করেছেন। তবে ইসলামী ফিক্হের পরিভাষায় এটাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে। শরী‘য়াতের বিধানাবলীর ক্ষেত্রে কানূন শব্দ প্রয়োগ করা কোন ভাবেই বৈধ নয়। অনুরূপভাবে দলগতভাবে প্রণীত নীতিমালার ক্ষেত্রেও শরী‘য়াত শব্দ প্রয়োগ করা বৈধ হবে না। আল্লাহ তা‘য়ালা ইরশাদ করেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُواْ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُواْ إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُواْ أَن يَكْفُرُواْ بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلاَلاً بَعِيدًا
‘‘হে নবী! আপনি কি ঐসব লোকদের দেখেননি, যারা দাবী করে, তারা ঈমান এনেছে ঐ কিতাবের উপর, যা আপনার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং ঐসব কিতাবের উপরও, যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা নিজেদের ব্যাপারে বিচার-ফায়সালা করার জন্য তাগূতের নিকট যেতে চায়। অথচ তাগূতকে অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে আদেশ করা হয়েছিল। শয়তান তাদেরকে পথহারা করে সঠিক পথ থেকে বহু দূরে নিয়ে যেতে চায়’’। আল্লাহ তা‘য়ালা আরও ইরশাদ করেন,
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
‘‘(যদি তারা আল্লাহর আইন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়) তাহলে কি তারা আবার জাহিলিয়াতের বিচার-ফায়সালা চায়? অথচ যারা আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, তাদের নিকট আল্লাহ থেকে কে বেশি ভালো ফায়সালাকারী হতে পারে?’’। আল্লাহ তা‘য়ালা আরও ইরশাদ করেন,
فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللّهِ إِنَّ اللّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
‘‘এখন যদি তারা আপনার এ দাবী পূরণ না করে, তাহলে বুঝে নিন যে, তারা আসলে তাদের নাফসের দাসত্ব করছে। আর যে আল্লাহর হিদায়াত ছাড়া নিছক মনগড়া পথে চলে, তার চেয়ে বেশি পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন না’’।
এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তা‘য়ালা শরী‘য়াতকে বাধ্যতামূলক ভাবে অনুকরণীয় করে দিয়েছেন এবং এ বিধানাবলীকে কার্যকর করা উম্মাতে মুসলিমার উপর অপরিহার্য করে দিয়েছেন। পাশাপাশি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বিধান কার্যকর করাকে তাগূতের বিধান কার্যকর করা, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং জাহিলিয়াতে পুনঃপ্রবর্তন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই নি:সন্দেহে বলা যায়, কিছু কিছু মুসলিম রাষ্ট্রে যেখানে মানব রচিত আইন বিদ্যমান রয়েছে, সেখানে তাগূত, প্রবৃত্তি ও জাহিলিয়াতের অনুসরণ করা হচ্ছে। আর আল্লাহ তা‘য়ালা এরূপ আনুগত্যকে একইসঙ্গে কুফর, যুলম ও ফিসক বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং কোন অবস্থাতেই এরূপ মানব রচিত আইনের আনুগত্য করা বৈধ হবেনা। এমনকি সেগুলো নিয়ে গবেষণা করাও যাবেনা, তবে যদি একাজ মানব রচিত আইনের দুর্বলতা, অপূর্ণাঙ্গতা ইত্যাদি বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে হয়, তবে অবশ্যই বৈধ হবে। কারণ সত্য ও সঠিক বিধানের দাবী এটিই।
ইসলামী আইনের শ্রেষ্ঠত্ব
এক. পূর্ণাঙ্গতা ও উৎপত্তিগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামী আইনের মূল উৎস হলো মহাগ্রন্থ আল-কুরআন যা আল্লাহ তা‘য়ালা কর্তৃক মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি অবতীর্ণ পরিপূর্ণ, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আর এই পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আইন গ্রন্থের প্রণেতা হলেন মহান আল্লাহ তা‘য়ালা। এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আইনগ্রন্থ, এতে সন্দেহ ও সংশয়ের কোনই অবকাশ নেই। এতে বিশ্ব পরিচালনার সঠিক ও নির্ভুল দিক-নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে, এবং মানব সমাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সকল নীতিমালা প্রদত্ত হয়েছে। সুতরাং ইসলামী চিন্তাবিদগণের মূল দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামী আইনসমূহকে ভালভাবে অধ্যয়ন এবং পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ইসলামী আইন হলো চিরন্তন আইন যা সবসময়ই নিত্য-নতুন। এটি পরিবর্তনশীল আইন নয়। কেননা এই আইনের প্রণেতা মহান আল্লাহ তা‘য়ালা জানেন, মানুষের জন্য কখন কোন্ জিনিসের প্রয়োজন। তাই তিনি এই নীতিমালাসমূহকে এমনভাবে তৈরি করে দিয়েছেন যা সর্বকালে-সর্বযুগে সকল মানুষের উপযোগী। এটি নির্দিষ্ট কোন দল, সম্প্রদায়, রাষ্ট্র ও যুগের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। অপরপক্ষে, মানব রচিত আইনের ভিত্তি খুবই দুর্বল, কেননা এটি ত্রুটি-বিচ্যুতিপূর্ণ, অস্বচ্ছ, সীমাবদ্ধ এবং অসম্পূর্ণ ও ক্ষণস্থায়ী যা মানব জীবনের সকল চাহিদা মেটাতে একেবারেই অক্ষম। মানব রচিত আইনসমূহ যুগ, শতাব্দী, দেশ ও জাতি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, একই আইন সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। কেননা এই আইন প্রণয়নের পেছনে রয়েছে মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও স্বেচ্ছাচারিতা । প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ এতে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন ও বিয়োজন করতে পারে। সুতরাং এটি দীর্ঘস্থায়ী আইন নয় যা মানুষের কল্যাণ সাধনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে মানব রচিত আইনের অধিকাংশই স্বল্প সময়ের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অপর পক্ষে, ইসলামী আইন চিরন্তন ও শাশ্বত হওয়ায় তা আজও অক্ষত রয়েছে।
দুই. ভিত্তিগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামী আইনের মূল ভিত্তি হচ্ছে ওহী বা আল কুরআন যা পূত:পবিত্র, সুস্পষ্ট ও ত্রুটি-বিচ্যুতিমুক্ত মহাগ্রন্থ। এতে মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগের জন্য সুস্পষ্ট বিধি-বিধান তুলে ধরা হয়েছে এবং ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ‘‘যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই কি জানবেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্ম জিনিসও দেখেন এবং সবকিছু জানেন’’। ইসলামী আইন দাতা মহান আল্লাহ সকল প্রকার মানবিক দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী,قَالَ عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي فِي كِتَابٍ لَّا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنسَى ‘‘আমার রব পথহারাও হন না, ভুলেও যান না’’। ইসলামী আইনের মধ্যে এমন সব অকাট্য মূলনীতি রয়েছে, যা মানব জীবন পরিচালনার জন্য যথেষ্ট। কেননা এসকল মূলনীতির ধারক ও বাহক হলেন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি সরাসরি ওহীর মাধ্যমে এসকল মূলনীতি লাভ করেছেন। আল-কুরআনের নির্দেশনা হচ্ছে, إِنْ أَتَّبِعُ إِلاَّ مَا يُوحَى إِلَيَّ ‘‘আমি তো শুধু ঐ ওহী মেনে চলি, যা আমার উপর নাযিল করা হয়’’। তিনি ওহী তথা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। সুতরাং আমাদেরও কর্তব্য হচ্ছে, ইসলামী আইনের মূলভিত্তিকে সংরক্ষণ করা, যাতে এটি একটি মানদন্ড হিসেবে পরিগণিত হবে। অপর পক্ষে, মানব রচিত আইনের ভিত্তি খুবই দুর্বল। এই আইন রচনার পেছনে রয়েছে মানবীয় দুর্বলতা, আবেগ, অনুভূতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার প্রভাব, যাতে ন্যায়বিচার করা কোন ভাবেই সম্ভব হয়না। ফলে, অনেক সময় সত্য গোপন হয়ে পড়ে এবং মিথ্যা এর উপর প্রভাব বিস্তার করে। মানব রচিত আইন দ্বারা সঠিক তথ্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয় না। পরিবর্তনশীল ও অস্থিতিশীল আইন দ্বারা সমাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা যায়না, কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, এই আইন আজকে যে জিনিসকে বৈধতা প্রদান করেছে আগামীকাল সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করবে। অর্থাৎ ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্যই এসকল আইন প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। ইসলামী আইন এই সব ত্রুটি থেকে মুক্ত। সুতরাং সামাজিক ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে ইসলামী আইনের ভূমিকা অপরিসীম।
তিন. টেকসই ও গ্যারান্টির দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামী আইন হলো, চিরন্তন-শাশ্বত আইন যা প্রায় ১৫০০ বছর ধরে অবিকৃত আছে এবং কিয়ামাত পর্যন্ত এর ধারা অব্যাহত থাকবে। এটি একটি নিত্য-নতুন যুগপোযোগী আইন যা যুগ বা কালের আবর্তনের সাথে পরিবর্তনশীল নয় বরং টেকসই ও গ্যারান্টিযুক্ত আইন। অপরপক্ষে, মানব রচিত আইন সর্বদা পরিবর্তনশীল এবং ত্রুটিপূর্ণ আইন। কেননা এর ভিত্তি খুবই দুর্বল, ফলে এর দ্বারা সুষ্ঠুভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা একেবারেই অসম্ভব। সুতরাং সকল ক্ষেত্রেই ইসলামী আইনকে প্রাধান্য দেয়া উচিত।
চার. আদর্শ চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব
চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান হলো, ইসলামী আইন যা মানুষকে সুমহান আদর্শের প্রতি সর্বদা আহবান করে। কেননা ইসলাম কর্তৃক নির্দেশিত প্রত্যেকটি বিধানের মধ্যে মানুষের কল্যাণ নিহিত রয়েছে, অপর পক্ষে ইসলাম কর্তৃক নিষিদ্ধ জিনিসের মধ্যে রয়েছে মানুষের জন্য অকল্যাণ । উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ তা‘য়ালার ইবাদাত সকল কল্যাণের মূল ভিত্তি, যা মানুষকে করে মর্যাদাবান, সম্মানিত ও গুণান্বিত। এর মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ হয় এবং মানুষের মাঝে ভালবাসা, সহানুভূতি ও সাহায্য-সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পায়। এ আইন মানুষকে ত্রুটিমুক্ত করে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। মহান আল্লাহর বাণী,
اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاء وَالْمُنكَرِ
‘‘(হে নবী!) আপনার প্রতি ওহীর মাধ্যমে যে কিতাব পাঠানো হয়েছে, তা আপনি তিলাওয়াত করুন এবং সালাত কায়েম করুন। নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে’’।
মানুষের চরিত্র গঠনের পরিপস্থী এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। যেমন- সুদ, ঘুষ, ধোঁকা ও প্রতারণা, অবৈধভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য, ওজনে কম দেয়া, অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষন, মদ্য পান, পরনিন্দা, হিংসা প্রভৃতি। এসকল জিনিস পরিত্যাগ করলে মানুষের মাঝে ভালবাসা ও সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পাবে এবং ধনিক শ্রেণী গরিবদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে উৎসাহ পাবে। ফলে এটি হবে চরিত্র গঠনের জন্য একটি মানদন্ড। পক্ষান্তরে, মানব রচিত আইনসমূহের মধ্যে চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদানসমূহ অনুপস্থিত। এটি মানুষকে নিন্দনীয় ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম নয়। চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ। যদি এটি ঠিক না থাকে তাহলে মানুষ, সমাজে মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়না। সুতরাং অন্তঃসারশূন্য মানব রচিত আইন পরিহার করে স্থায়ী প্রভাব বিস্তারকারী ইসলামী আইন গ্রহণ করা আবশ্যক।
পাঁচ. অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা প্রদানে শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামী আইন এমন আইন যা ব্যক্তি ও সমাজ তথা সকলের অধিকার নিশ্চিত করে। যখন দুইজন ব্যক্তি একই সমস্যায় পতিত হয় তখন যার সমস্যা বেশি তীব্রতর হয় তার সমস্যা সমাধানের উপরই ইসলামী আইন প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ইসলাম মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সালাত, সাওম ও এ জাতীয় অন্যান্য ইবাদাত সকলের জন্য ফরয করেছে অথচ হাজ্জ ও যাকাত সকলের উপর ফরয করা হয়নি। ইসলাম ব্যবসাকে হালাল আর সুদকে হারাম ঘোষণা করেছে। পরিবারের সাথে সমন্বয় সাধন করা, প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণ করা, অঙ্গীকার পূর্ণ করা, জন সাধারণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ইসলামী আইন প্রশাসনকে ক্ষমতা প্রদান করেছে। যেমন- মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, কবরস্থান নির্মাণের জন্য জায়গা ক্রয় করা, রাস্তা প্রশস্ত করা এবং নদী খনন করা। ইসলাম মানুষকে ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রদান করেছে। এ কারণেই স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর তার প্রতি নির্যাতনের নিমিত্তে আটকে রাখাকে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,
وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النَّسَاء فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ سَرِّحُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ وَلاَ تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لَّتَعْتَدُواْ
‘‘আর যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং তাদের ইদ্দতকাল পুরা হয়ে আসে, তখন হয় বিধিমতো তাদেরকে রেখে দাও আর না হয় বিধিমতো তাদেরকে বিদায় দাও। যাতনা দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটক করে রেখোনা, কেননা তাতে সীমা লঙ্ঘন হবে’’।
শাসক যদি পাপ কাজের নির্দেশ দেয় অথবা জনগণের কল্যাণের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে, তাহলে তার আনুগত্য পরিহার করতে ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘‘একজন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে যতক্ষন পর্যন্ত ঐ শাসক তাকে পাপ কাজের নির্দেশ না দেয়। যদি পাপ কাজের নির্দেশ দেয়, তাহলে আনুগত্য করবে না’’। ইসলাম সম্পদের ১/৩ অংশ ওয়াসিয়ত করা বৈধ করেছে। এর বেশি ওয়াসিয়ত করলে উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি হবে। হযরত সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়া সালস্নাম) বলেছেন, ‘‘১/৩ অংশ ওয়াসীয়ত কর। উত্তরাধিকারীদেরকে দরিদ্র অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে সম্পদশালী করে রেখে যাওয়াটাই উত্তম। অর্থাৎ তাদেরকে তোমরা মুখাপেক্ষী করে রেখে যেওনা, যাতে তারা মানুষের নিকট হাত পাতে’’।
জমি হতে প্রাপ্ত আয়করের মাধ্যমে রাষ্টীয় কোষাগারকে সমৃদ্ধশালী করার জন্য জনগণের মাঝে পতিত জমি বন্টন করা, জমি-জমা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অংশীদার বা প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেয়া, অন্যের জমিতে সেচের জন্য নিজের জমির পাশ দিয়ে নালা করে দেয়া এ ধরনের আরো অনেক জনকল্যাণ মূলক কাজ রয়েছে যা ইসলামী আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
ছয়. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামী আইনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো ইসলামী নীতিমালাসমূহ প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন করা। কেননা ইসলামী আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ভাল মানুষ গড়া এবং তার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধন করা। আধুনিক যুগে এমন অনেক বিষয় সামনে এসেছে, যে সম্পর্কে ইসলাম পূর্বেই ধারণা দিয়েছে। যেমন-ইন্স্যুরেন্স, ব্যাংকিং। মানুষের সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রত্যেকটি বিষয়ে ইসলামী নীতিমালা বিদ্যমান। এর জন্য নতুন করে নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন হয় না। অপরপক্ষে, মানব রচিত আইন এর বিপরীত। কারণ মানব রচিত আইন অস্থিতিশীল ও পরির্বতনশীল হওয়ায় মানুষের কল্যাণ সাধনে ততটা কার্যকর নয়।
সাত. পুণ্য ও প্রতিদান প্রাপ্তির দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামী আইনে দুই ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। একটি পার্থিব, অপরটি পারলৌকিক। ইসলামী শরী‘য়াহ দুনিয়াবী শাস্তিকে দুইভাগে বিভক্ত করেছে-একটি হলো নির্ধারিত শাস্তি, অপরটি হলো অনির্ধারিত শাস্তি। নির্ধারিত শাস্তি, যেমন-চুরি করলে হাত কাটা, যিনা করলে বেত্রাঘাত, হত্যার পরিবর্তে হত্যা করা ইত্যাদি। অনির্ধারিত শাস্তি, যেমন- কোন ব্যক্তির দোষ-ত্রুটির জন্য তাকে ভৎর্সনা করা। পরকালীন শাস্তি যা মানুষের গোপনীয় পাপ কাজের দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে, এর জন্য পৃথিবীতে শাস্তি হয়না। যেমন-ঘৃণা, হিংসা বিদ্বেষ করা। এগুলো মনস্তাত্বিক ব্যাপার। এগুলোর শাস্তি আল্লাহ তা‘য়ালা পরকালে প্রদান করবেন।
ইসলামী শরী’য়াতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রতিদান রয়েছে। যেমন-ইসলাম আদেশ ও নির্দেশ পালনের জন্য সাওয়াব বা প্রতিদান রেখেছে। আবার নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য প্রতিদান রেখেছে। অপরপক্ষে, মানব রচিত আইন এর সম্পূর্ণ বিপরীত, এতে এরকম কোন সুযোগই নেই। এই আইন দ্বারা শুধু প্রকাশ্য অপরাধের শাস্তি প্রদান করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে নির্দোষ ব্যক্তিও শাস্তি পেয়ে থাকে। সুতরাং ইসলামী আইনই শ্রেষ্ঠ আইন যা মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে থাকে।
আট. স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতার দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামী আইন সর্বজনীন ও চিরস্থায়ী আইন। কেননা এর মূলনীতিসমূহ চিরন্তন ও চির নতুন, যা কোন অবস্থাতেই পরিবর্তনশীল নয়। যেমন- সম্মতির ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয় করা, ক্ষতিপূরণ দেয়া, অপরাধ নিয়ন্ত্রন করা, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সর্ম্পকে মানুষকে সচেতন করা, এসবই ইসলামী আইনের বৈশিষ্ট্য। সময় এবং কালের আবর্তনের সাথে ইসলামী নীতিমালার মধ্যে পরিবর্তন সাধিত হয়না বরং নতুন কোন সমস্যা দেখা দিলে ইসলামী আইনকে বিশ্লেষণ করে সমাধান খুঁজে বের করা হয়। যা মানব রচিত আইনের মাঝে একেবারেই অনুপস্থিত। কেননা নতুন নতুন সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সময়ের পরিবর্তনের সাথে আইনেরও পরিবর্তন ঘটে। এটি মানব রচিত আইনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
নয়. বিশ্বজনীনতার দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব
ইসলামী আইন একটি আন্তর্জাতিক মানের আইন, যা সর্বযুগের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন,
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ لا إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ
‘‘(হে রাসূল!) আপনি বলুন, হে মানব জাতি! আমি তোমাদের সবার জন্য ঐ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল, যিনি আসমান ও জমিনের বাদশাহীর মালিক’’। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘য়ালা আরও বলেন, وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا ‘‘(হে নবী!) আমি আপনাকে গোটা মানব জাতির জন্য সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি’’।
উপসংহার
ইসলামী আইন সর্বকালের সকল মানুষের প্রয়োজন মেটাতে ও কল্যাণ সাধন করতে সক্ষম। ইসলামী আইনের মাঝে কোন বৈপরিত্য বা দ্বৈতনীতি নেই বরং মানব কল্যাণের প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ এতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। ইসলামী আইন মানুষের জীবনের সকল দিককে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যেমন- ইবাদাত, পারস্পরিক সম্পর্ক, লেনদেন, পারিবারিক জীবন, বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা, রাজনৈতিক বিষয়, অর্থনৈতিক বিষয়, যুদ্ধ-সন্ধি, আদর-আপ্যায়ন, পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবলার শিষ্টাচার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি।
মানুষের জীবনের এমন কোন দিক নেই, যে বিষয়ে ইসলামী শরী‘য়াহ আল-কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে অকাট্যভাবে নির্দেশনা প্রদান করেনি। যেমন-কোন মানুষের জন্য কোন্টি ভাল, কোন্টি মন্দ, কোন্টি সঠিক, কোন্টি ভুল সবকিছুই বিস্তারিত আলোচনা করেছে এবং মানুষের জন্য ভাল কাজ করা আবশ্যক করেছে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকাকে বাধ্যতামূলক করেছে। অপরপক্ষে, মানব রচিত আইনের মধ্যে এসকল বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত। বিধায়, এটি আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছুতে সক্ষম নয়।
ইসলামী শরী‘য়াহ আইনের এই বিশেষত্বই প্রমাণ করে, এটি সর্বকালে এবং সর্বযুগে মানবতার কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সমাজ যত সমৃদ্ধশালীই হোক না কেন ইসলামী শরী‘য়াহ সেখানেও চির নতুন। এটি মানব জীবনের সকল দিক তথা ইবাদাত-মু‘আমালাত, ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ-রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক, যুদ্ধ-শান্তি, চুক্তিগত-কূটনৈতিক ইত্যাদি বিষয়াবলীকে অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়া এতে রয়েছে আহার-পরিধান ও আলাপচারিতার অনুপম নীতিমালা। এক কথায়, সকল বিষয়ের যুক্তিগ্রাহ্য ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের মাধ্যমে মন্দ থেকে ভালো, অপবিত্র থেকে পবিত্র, পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পরিশুদ্ধ হওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থাপনা এতে রয়েছে। মানব রচিত আইনের পক্ষে এতটা ব্যাপক হওয়া কখনই সম্ভব নয়। বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রচলিত মানব রচিত আইনের অবস্থাই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। 
[প্রবন্ধটি ২১শে মে, ২০০৯ তারিখে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক আয়োজিত স্টাটি সেশনে উপস্থাপিত হয়।]

 

রেফারেন্সঃ

. The New Encyclopaedia Britannica, Vol. 10 (New York, 1949), 701
. ইবনুল মানযুর, লিসানুল ‘আরাব, ১০ম খন্ড (বৈরুত: দারু সাদির, ১৪০২ হি.), ৪০-৪২
. The Encyclopaedia of Islam, Vol. 6 (London: E. J. Brill, 1971), 321
. রাগেব আল-আস্বাহানী, আল মুফরাদাত (মিসর: আল-মাতবাতুল মায়মানিয়্যাহ), ২৪৫৯
. সাইয়েদ কুতুব, ফী যিলালিল কুরআন, ১ম খন্ড (বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইসলামিয়্যাহ, ১৯৭৯ খ্যী.), ৮৯
. সূরা আল মায়িদাহ : ৪৮
. মোহাম্মদ আলী, তারিখুল ফিক্হুল ইসলামী (আল আযহার), ৫
. মান্নাআল কিত্তান, আত্তাশরী‘ ওয়াল ফিক্হ ফিল ইসলাম, ২য় খন্ড (বৈরুত, ১৪০২ হি.), ১৫
. মোহাম্মদ আলী, প্রাগুক্ত
. ড. ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ, আল মু‘তাসির ফী তারিখিত তাশরীঈ‘ল ইসলামী (সৌদী আরব, ১৪১৮ হি.) , ৬
. মোহাম্মদ আলী, প্রাগুক্ত
. মান্নাআল কিত্তান, প্রাগুক্ত, ১৪
. সূরা আন্ নিসা: ৬০
. সূরা আল মায়িদাহ : ৫০
. সূরা আল কাসাস : ৫০
. ড. মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ আস সালেহ, আল মাসাদিরুল আসলিয়্যাহ ওয়াত্তাবয়িয়্যাতু লিশ্ শারী‘য়াতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়া কাওয়ায়িদুল ফিক্হ (সৌদী আরব, ১৪১০ হি.), ৭১
. সূরা আল মুলক: ১৪
. সূরা ত্বাহা : ৫২
. সূরা আল আন’আম: ৫০
. মান্নাআল কিত্তান, প্রাগুক্ত, ২১
. সূরা আল আনকাবুত: ৪৫

. সূরা আল বাক্বারাহ: ২৩১
. মুসনাদে- আহমাদ
. সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম
. ড. আব্দুল কাদির ’আওদাহ, আত-তাশরী’ঈল জিনাঈ’, ১ম খন্ড (বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবী, তা.বি.), ২২
. প্রাগুক্ত, ২২-২৩
. ড. ওয়াহাবাতুয যুহায়লী, আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, ১ম খন্ড (দামেস্ক: দারুল ফিকর, ১৪১৩ হি.), ২৩
. ড. আব্দুল কাদির ’আওদাহ, প্রাগুক্ত, ২৩
. সূরা আল আ’রাফ: ১৫৮
. সূরা সাবা: ২৮
. ড. আব্দুল করিম যায়দান, আল-মাদখাল লি দিরাসাতিশ্ শারী’আতিল ইসলামিয়্যাহ, ষোড়শ খন্ড (বৈরুত, ১৪২১ হি.), ৩৯-৪০
. মান্নাআল কিত্তান, প্রাগুক্ত, ১১২