মূলপাতা নিবন্ধ অশ্লীল সিনেমা, ইভটিজিং-প্রেক্ষিত পর্দা নিষিদ্ধের পায়তারা

প্রতিটি মানব জাতির থাকে স্বকীয় স্বাতন্ত্র অাভিজাত্য ও জীবনের মর্যাদা বোধ। যাকে ভিত্তি করে পরবর্তী প্রজন্ম বেঁচে থাকে বছরের পর বছর। এ ভিত্তি গড়ার চাইতে ভাঙ্গার কাজে চলতি প্রজম্ম লিপ্ত হলে সময়ের পরিক্রমায় সব নিঃশেষ হয়ে জীবনাচরনণে বিকৃতি ঘটে। আর এ স্বাতন্ত্র বোধ, আভিজাত্য ও মর্যাদা বোধকে রক্ষা বা বিকৃতি ঘটানোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে শাসক গোষ্ঠি। রাষ্ট্রযন্ত্রই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করে মানুষের জীবন বোধকে মর্যাদাবান বা বিকৃতির দ্বারপ্রান্তে উপনিত করার অন্যতম সোপান হিসেবে কাজ করে। আজকাল আমাদের দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতার ধুয়া তুলে দেশের মানুষের মর্যাদাবোধ ও স্বাতন্ত্রতাকে বিকৃতির চরম শিখরে অতিদ্রুত নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সরকার অশ্লীল সিনেমা-নাটক চালু ও পর্দা নিষিদ্ধ করে ইভটিজিং বন্ধ করতে চায়। এটা এক ধরনের অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই নয়। পাগলের বৃথা প্রলাপ বললে যুথসই মানাবে। কারণ সরকারি পৃষ্ট-পোষকতায় অশ্লীল সিনেমা, নাটক, ফিল্ম, টেলিফিল্ম প্রতিনিয়ত নির্মিত হচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে সেনসর বোর্ড অহরহ অশ্লীল ছরির অনুমোদন দিচ্ছে। হাজার হাজার নারী ইভটিজিং এর শিকার হচ্ছে, করছে আত্মহত্যাও। ছবিগুলোতে ইভটিজিং দিয়ে শুরু আর প্রেম দিয়ে শেষ হয় । আর বাস্তবে অনুশীলন করতে গিয়ে অপরাধের ফাঁদে পড়ে কোমল মতি কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে সব বয়েসর নারী-পুরুষ ,হয়ে পড়ে বিবেকহীন। তাহলে ভাববার উপযুক্ত সময় এসেছে- এ অপরাধ সংঘঠনের জন্য দায়ী কে? এক সময় আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল খুবই চমৎকার। যে সাংস্কৃতি মানুষের ভিতর সৃষ্টি করত মমত্ব, সৌহার্দ্য ও দেশাত্মবোধ। জারি-সারি, মঞ্চ নাটক-যাত্রা ছাড়াও সামাজিক সিনেমা। যেগুলো মা- বাবা সহ পরিবারের সকলে দেখতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তথা কথিত মর্ডান-আল্ট্রা মর্ডান হওয়ার নাম করে পশ্চিমা গোষ্ঠিদের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে আমাদের নাটক সিনেমার বেজেছে বারোটা। ভারতীয় নগ্ন সিনেমার চলছে ব্যাপক দাপট। এ দাপট থেকে রেহাই পাওয়ার কোন গত্যান্তর নেই। অনায়াসে আকাশ পথে যে কোন দেশের চ্যানেল ঢুকছে আমাদের দেশে। অথচ আমেরিকা, বৃটেন ও ভারতসহ অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোতে অন্য যে কোন দেশের চ্যানেল অনুঃপ্রবেশ করতে পারে না। আমাদের তো অনেকগুলো টিভি চ্যানেল আছে, অন্য কোন দেশে খুব বেশী সেগুলোর সম্প্রচার নেই বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।
সরকার একদিকে ইভটিজিং বন্ধ করতে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য নানান ধরনের উদ্যোগ গ্রহন করছে আবার ইভটিজিং যুক্ত অশ্লীল সিনেমাগুলো বাজারে ছাড়ার অনুমতি দিচ্ছে। যেগুলো প্রতিনিয়তই প্রদর্শন হচ্ছে সিনেমা হলগুলোতে। তাহলে সরকারই কী এর জন্য দায়ী নয় ? এক মুখে দু’রকম ভাষা অযৌক্তিক ও আপত্তিকর নয় কি? কারণ আমদের দেশে সচরাচর প্রতিটি সিনেমা, নাটক ইভটিজিং অবমুক্ত নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা চলে একজন নায়ক-নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন। এ অভিনয় নায়ক নায়িকাকে মনোযোগ আকর্ষিত করার জন্য কোন না কোন ভাবে নায়িকাকে অর্থাৎ একজন ছেলে একজন মেয়েকে অথবা একজন মেয়ে একজন ছেলেকে ইভটিজিং করছে তারপর ভালোবাসার চুড়ান্ত পর্যায়ে প্রেম হয়। উল্লেখিত অভিনয় কোমলমতি তরুন-যুবকেরা প্রাক্টিস করতে গিয়ে বাঁধায় যত সব ঝামেলা।
আমাদের জাতি অনুকরণ প্রিয়। আমাদের যুবকেরা এ ক্ষেত্রে আরেকটু ইমোশনাল। এ যৌন সন্ত্রাস থেকে জাতিকে উদ্ধারের জন্য অশ্লীল, ইভটিজিং যুক্ত সিনেমা বন্ধ করেতে সরকার কী প্রয়োজনীয় কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহন করবেন? আমরা ভেবে অস্থির হই। এ লজ্জা রাখি কোথায়? এখন ইভটিজিং এর শিকার হতে বয়ােবৃদ্ধ মহিলা থেকে শুরু করে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েরা পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। অপমান সহ্য করতে না পেরে রূপালী’র মত নাম না জানা কত নারী আত্মহত্যা করছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে শিক্ষক মিজানুর রহমানের কত মিজান তার ইয়াত্তা আর কে রাখে?

যে নারী জাতিকে আল্লাহ অনেক বেশি সম্মান দিয়েছেন। মায়ের জাতিকে রাসূল (সঃ)ও অনেক বেশী সম্মানিত করেছেন। একদিন আল্লাহর রাসূলের কাছে এক সাহাবী এসে জিজ্ঞেসা করলেন, সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে? রাসূল (সঃ) বললেন তোমার মা, আবার জিজ্ঞেস করলেন তারপর কে? তিনি বললেন তোমার মা, তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন তারপর কে? তিনি বললেন তোমার মা। চতুর্থবার বললেন তোমার বাবা। এ ভাবেই বিশ্ব দরবাবে তুলে ধরেছেন তাঁদের মর্যাদা। তৈরী করেছিলেন এক নিরাপদ সমাজ। রাসূল (সঃ) একদা বলেছিলেন, “আজ যদি অলংকার পরিহিতা কোন এক সুন্দরী রমনী গভীর রাতে মদীনা থেকে হাজরে মাওত পর্যন্ত পাড়ি দেয় তাহলে তার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ব্যতিত কারো ভয় থাকবেনা।” যেখানে ছিল না কোন বখাটে। কারণ সকল তরুণ- যুবকদের হৃদয় জুড়ে ছিল আল্লাহর ভয়। আজ সমাজে চলছে যৌনসন্ত্রাস। অথচ আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের ব্যভিচার বা অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, “আর তোমরা ব্যভিচার তো করবেই না এর ধারে কাছেও যেয়োনা। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং অসৎ পন্থা” (সূরা বনী ইসরাঈল-৩২)।

আল্লাহ লজ্জাহীনতার সকল কাজ বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। লজ্জা নিবারণের পরিবর্তে সকল উপায়-উপযোগ উম্মুক্ত করে ইভটিজিং বা ব্যভিচার বন্ধ করার নির্দেশটি হচ্ছে কলঙ্কজনক। আল্ল­াহ তায়ালা বলেন, “লজ্জাহীনতার যত পন্থা আছে উহার নিকটেও যেয়ো না, তা প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক” (সূরা আনআম-১৫১)।
ব্যভিচার বা অশ্ল­ীলতা ছড়ানোর মাধ্যমে পুরো জাতিকে নগ্ন ও অসৎ জাতি হিসেবে গড়ার কোন সুযোগ নেই। যারা এ কাজ করে তাদের জন্য শাস্তি জরুরী। আল্লাহ তায়ালা তাদের শাস্তি প্রসঙ্গে বলেন, “ব্যভিচারিনী (নারী) ও ব্যভিচারী (পুরুষ) তাদের প্রত্যেককে তোমরা একশত বেত্রাঘাত করবে, আর আল্ল­াহর বিধান পালনে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্ল­াহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক, আর মু’মিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি অবশ্যই প্রত্যক্ষ করে” (সূরা নূর-২)।
আল্ল­াহ তা’য়ালা কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়াকে সহ্য করেন না। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা নূরের ৪নং আয়াতে বলেন, “আর যারা সতী সাধ্বী রমনীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করে অতঃপর ৪জন (পুরুষ) সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে তোমরা ৮০টি বেত্রাঘাত করবে এবং তাদের সাক্ষ্য কখনও গ্রহন করবে না, আর ওরাইতো ফাসেক।”
রাসূল (সঃ) কঠোর ভাবে নারীদের সতীত্ব রক্ষার খাতীরে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগকে ধ্বংসাত্বক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, “অচেতন পবিত্র ঈমানদার মহিলাদের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনা থেকে তোমরা বিরত থাক”। (বোখারী, মুসলিম)।

সরকারের আরো একটি উপহাসমূলক আচরনে আজ দেশের মানুষ ক্ষুদ্ধ-বিক্ষুদ্ধ। দেশের মানুষের কাছ থেকে ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ম্যান্ডেট নিয়ে দেশের মানুষের চিন্তা-চেতনার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মানুষকে ধর্মহীন করার চরম পায়তারা চালাচ্ছে। সরকার নারীদের বোরকা-নেকাব উৎখাতের পরিকল্পনা করে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। সরকারের উচ্চ মহল থেকেও আজ চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য উপস্থাপিত হচ্ছে। ডিপুটি স্পীকার শওকত আলী বলেন-“যে সকল নারীরা কুৎসিত তারাই কেবল বোরকা পরে”। দায়িত্বহীন বক্তব্য দিয়ে এসব ব্যক্তি পদের মর্যাদাকে ভুলুন্ঠিত করছে। তাদেকে জাতি আজ ঘৃণাভরে ধিক্কার জানায়। অথচ আল্লাহ তা’য়ালা পর্দা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন- “নিজেদের ঘরে থাক এবং আগের জাহেলী যুগের নারীদের ন্যায় সাজগোজ করে বের হয়ো না”(সূরা আহযাব-৩৩)। পর্দা রক্ষা করে চলা এটা আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। রাসূল (সঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন-“মহিলারা হলো পর্দায় থাকার বস্তু সুতরাং তারা যখন (পর্দা উপেক্ষা করে) বাহিরে আসে, শয়তান তাদেরকে সুসজ্জিত করে দেখায়”।(তিরমিজি)।
আবার পর্দা পালনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নারী নয় পুরুষদেরকেও পর্দা মানতে নির্দেশ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমাদের ছেলেরা যখন বুদ্ধির পরিপক্কতা পর্যন্ত পৌঁছাবে, তখন তারা যেন অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। যেমন তাদের বড়রা অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকে, এভাবেই আল্ল­াহ তার আয়াত সমুহ তোমাদের সামনে উম্মুক্ত করে দেন, তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়”। (সূরা আন নূর-৫৯)
অন্যত্র বলা হয়েছে- “হে ঈমানদারগন! নিজেদের গৃহ ব্যতিত অনুমিত ছাড়া কারো গৃহে প্রবেশ করো না, যতক্ষন পর্যন্ত না ঘরের লোকদের নিকট থেকে অনুমতি পাবে এবং যখন ঢুকবে তখন ঘরের অধিবাসীদেরকে সালাম বলবে। এ নিয়ম তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আশা করা যায় এর প্রতি তোমরা অবশ্যই খেয়াল রাখবে”। (সূরা নূর-২৭)